হাওয়া-মেঘের পালাবদল কিংবা পাঙ্গাশের চাষবাস

লেখক:

ওয়াসি আহমেদ

মুক্তাগাছা থেকে ছয়-সাত কিলোমিটার পশ্চিমে ময়মনসিংহ-টাঙ্গাইল হাইওয়ের পাশে ঝুপড়ি চায়ের দোকানের বেঞ্চিতে লিকার-চা নিয়ে বসত এ-লোকটা। বছর পঁয়তাল্লিশের মোটাঘেঁষা শরীর, মাথায় না-আঁচড়ানো ঘন আধপাকা চুল, মুখের চামড়া পোড়া-পোড়া, কপালে বাঁ-ভুরুর ওপরে টেপ-খাওয়া বাসন-কোসনের মতো অন্তত ইঞ্চি তিনেকের গর্তে-বসা তেরচা কাটা দাগ। পরনে পাতলা সাদা ফতুয়ার নিচে লুঙ্গি। এদিকে পায়ে অন্তত চার ইঞ্চি পুরু রাবার সোলের চপ্পল। পরে খেয়াল করতে চোখে পড়েছিল, শুধু ডান পায়ের চপ্পলেরই সোল বেখাপ্পা পুরু, বাঁ-পায়েরটা বড়জোর এক-দেড় ইঞ্চি। কপালের কাটা দাগটাই নজর টানার কথা। তবে অস্বাভাবিকত্বব জাহির করতে চপ্পলও কম যায় না বোঝা গেল।

মুখ খুলতে লোকটা যা বলল সেটাও জাহির করাই। ‘আমি পোস্টমাস্টার’ বলে একটু ইতস্তত করে হাত উঁচিয়ে হাইওয়ের ওপারে খানিকটা দূরে বাজারের দিকে ইঙ্গিত করল। হাত বরাবর চোখ তাক করে  পোস্টাপিসের মতো মার্কমারা কিছু নজরে পড়ল না। টুকটুকে লাল ও বিকট বড় হরফে এখানে পাঙ্গাশ মাছের ফিড পাওয়া যায় লেখা সাইনবোর্ডের পাশে একটা স’মিল, ভুসিমালের সারবাঁধা দোকানপাট।

‘এখানে খুব পাঙ্গাশের চাষ হয়?’

‘চাষের তো শেষ নাই, কত কিছুরই হয়। ব্যাঙেরও হয়। বেড়াতে আসছেন?’

‘ওইরকমই। আজ কি আপনাদের ছুটি?’

‘না ছুটি হবে ক্যান? কাজকর্ম নাই তাই ঘোরাফিরা…’

‘কতদিন আছেন এখানে?’

‘বাড়ি আমার এইখানেই।’ বলে এবার সামনের দিকে হাত না উঁচিয়ে পেছনে সদ্য-কাটা বোরো ক্ষেতের ওপারে বেশ তফাতে গাঢ় সবুজ গাছপালায় নিশ্ছিদ্র দ্বীপের মতো জায়গাটাকে নিশানা করল।

‘ভালোই তো। বাড়ির ভাত খেয়ে সরকারি চাকরি।’

‘আপনে ভুল বুজতাছেন। আমরার চাকরি নামেই সরকারি। সরকারি চাকরিতে তো বেতনের ইস্কেল থাকে, আর আইজকাইল তো বেতনও লম্বা। আমরা যারা এইসব পোস্টাপিসে আছি, তাগো ইস্কেল-ফিস্কেলের কারবার নাই। আমরা এক্সট্রা। নামকাওয়াস্তে কিছু দেয়, মানে বলার না। কাম নাই কাজ নাই, দিবই-বা কী কামে!’

কথাবার্তা সাফ্সুতরা, তবে কাটাকাটা। রবীন্দ্রনাথের পোস্টমাস্টারের সঙ্গে এর মিল নেই। গল্পের গবেট পোস্টমাস্টারের সঙ্গে তো না-ই, শাজাদপুর  কুঠিবাড়ির চাপাবাজ পোস্টমাস্টারের সঙ্গেও না।

‘কাজকর্ম একদম নাই?’

‘নাহ্। চিঠি-ফিটি তো আসে না, আগে মানিঅর্ডার আসত, তাও বন্ধ।’

‘একবারেই আসে না – চিঠিপত্র?’

‘আমার আমলে এই দশ বছরে না। কদাচিৎ যুদি সরকারি  এক-আধটা আসে বা কোর্ট-কাছারির সমন। মাইনষ্যে চিঠি লেখব কী কামে! মোবাইল আছে না, যখন-তখন দেশ-দুনিয়া ঘুরান দেওয়া যায়। আর চিঠিখান তো লেখতে অয়। মোবাইল টিপাটিপি আর চিঠি লেখা কী এক জিনিস!’

‘ঠিক। আচ্ছা, পাঙ্গাশের ফিড কি আলাদা? ওই যে সাইনবোর্ডে লেখা।’

পোস্টমাস্টার জবাব দিলো না। দিলো চা-দোকানি। ‘বড় ছুত্রা মাছ। হে তার খাওন পানির উরপে থাইকা নেয়, মাটিত পড়লে ছোঁয় না। এই যে লাইনধরা রাস্তার দুই ধারে পুষ্কনি দেখতাছুইন, পানি আড়াই-তিন হাতের বেশি না। পাঙ্গাশের খাওনটা পানির উরপে ভাসে, ডোবে না। সেমাই আছে না, সেমাইয়ের কাঠির মতো ভাসে – গপ্গপাইয়া খায় আর পাঁচ-ছয় মাসে ধরেন কম কইরা অইলেও তিন-সাড়ে তিন কেজি। কাছেই আড়ত, পাইকাররা আইসা নিয়া যায়। হাছা-মিছা জানি না, বিদেশেও হুনছি এসপুট করে।’

‘যে-কতাটা জিগাইলেন, হেইডার কিছু তো কইলা না।’ পোস্টমাস্টার।

‘কুন কতা? পাঙ্গাশের কতাই তো কইলাম।’ চা-দোকানি।

‘মেহমান পাঙ্গাশের কতা জিগান নাই। জিগাইছেন ফিড আলাদা কি না।’

‘কী কইলাম তাইলে! ফিডের কতাই তো কইলাম। উনারে  জিগান জওয়াব পাইছে কি না। ছার্, আপনে কইন জওয়াব পাইছেন না?’

‘উনি কইব কী! সাফ্ কতাটা ঘুরাইয়া পেঁচাইয়া কইলা। উনি আন্দাজে ধইরা নিছেন পাঙ্গাশের ফিড আলাদা; তুমি একবারও কও নাই।’

‘কইছি। যুদি না কইয়া থাকি সমুস্যা উনার, তুমার না। আজাইরা প্যাঁচাল পাড়ো! কাম তো নাই। ছার্ কি আরেক কাপ চা খাইবেন, এই চা তো ঠান্ডা হয়া গেছে।’

‘হ্যাঁ, আর মাস্টারসাবকেও দেন।’

‘মাস্টার চা খাইলে তো হইছিলই। মাথা খুলতো, বেকামা প্যাঁচালে দিন বরবাদ হইত না। মাগনা পাইলে খায়।’

‘চিঠি-টিঠি তাহলে কেউ লেখে না?’

‘আপনে নিজে লেখেন? মনে কইরা দেখেন, গত দশ-পনেরো বছরে কয়টা লেখছেন।’

‘তাও তো কথা।’

‘লেখছেন অন্য জিনিস – ইমেল, এসএমএস – হাজারে  হাজার, ঠিক না? মাইনষ্যের দোষ কী! আগে যখন গেরামের সাধারণ মানুষজন চিঠি লেখত – লেখাপড়া তেমন জানে না, কিন্তু চিঠি লেখতে দেখলে বুকটা মোচড় দিয়া উঠত। দস্ত্তরমতো বুদ্ধিজীবীর কাম।’

‘চিঠি লেখা?’

‘জি জনাব। বুদ্ধিজীবীরা যে পত্র-পত্রিকায় লেখে, লেখার আগে কত চিন্তাভাবনা কইরা সাবজেক্টটা মগজে খেলায়, চিঠি লেখারও এক ধাত। মনে করেন একজন তেমন পড়ালেখা না-জানা মানুষ, মনে করেন এই খাইস্ট্যা চা-ওলা, কাগজ-কলম নিয়া চিঠি লেখতে বসছে, ওরে তো তখন চিনা যাবে না। কন চিনা যাবে?’

‘কী কইলা আরবার কও। খাইস্ট্যা কইলা না? আমার দুকানো বইয়া আমারে কয় খাইস্ট্যা! ছার্, কার কথা হুনেন! মাগনা আপনের পয়সায় চা খাইতাছে আর হমকে বইয়া আমারে কী কইল! তুমার মাস্টারি বাইর করতাছি, রাখো। দেখি, সামনেরবার তুমারে কে বাঁচায়!’

‘খাইস্ট্যা কী এমনে কইলাম! মায়া কইরা কইলাম, মায়াও বুঝে না, বেক্কল!’

‘আরবার! বেক্কলের কী পাইলা?’

‘কী পাইলাম এইডা গুপ্তকথা, কওন যায় না। মেহমান যা বুজার বুজছেন। কইলাম না তুমি একখান চিঠি লেখতে বসছো, দেইখা তুমারে চিনা যায় না।’

‘কতার মানে কী? চিনন যাইব না ক্যান?’

‘এইডাই গুপ্তকতা রে বেক্কল। মেহমানরে যে কতাটা কইতে লাগছিলাম – ভাইবা দেখেন, টুকটুক কইরা লেখতাছে, কিন্তু কী লেখবো মাথায় খেলাইয়া চিন্তা-ভাবনা কইরা আগাইতাছে, বানান-ফানানের ঠিক নাই, দাড়ি-কমার আগামাথা নাই। কিন্তু চিঠি তো চিঠিই।’

সকাল থেকে টিপটিপ বৃষ্টি। এই দুপুরবেলা বৃষ্টি না থাকলেও আকাশের অবস্থা সুবিধার না। জ্যৈষ্ঠ মাসের মাঝামাঝি, গরমটা যেমন হওয়ার কথা এ-জায়গায় তেমন না, কাছে-দূরে খোলা রাখঢাকহীন প্রান্তরে হঠাৎ-হঠাৎ ঘূর্ণি তুলে হাওয়া উঠছে। মেঘমাখা, ঠান্ডা প্রায় সপ্সপে হাওয়ায় বৃষ্টিটা মনে হয় এখনি নামবে, জোরেশোরে নামবে। নামছে না। শুধু হাওয়া। সপ্সপে আর মেঘমাখা।

চা-দোকানির বিক্রিবাট্টা নেই। সে একটা স্টার ফিল্টার ধরিয়ে কাকে যে লুকাচ্ছে, আধবোজা মুঠোয় আড়াল করে মুখ ঘুরিয়ে বেদম কয়েক টান দিয়ে নিভিয়ে মাথা বাড়িয়ে আকাশ দেখল। বিড়বিড় করে বলল, ‘বিষ্টি অইলে বালা। খেতের ধান উইঠা সারা, এই বিষ্টিতে পাঙ্গাশের বাড় বাড়ে।’

খালি কাপ রেখে পোস্টমাস্টার উঠে পড়ে। বিদায় নিয়ে চলে যেতে চা-দোকানি কট্মট্ চোখে তাকিয়ে ভেংচি কাটল, ‘যাও, গিয়া ভেরেন্ডা ভাজো। কাম নাই, খালি আকাম।’

এতক্ষণে দেখা গেল লোকটা হাঁটে খানিকটা খুঁড়িয়ে-খুঁড়িয়ে। একপাটি চপ্পলে বাড়তি সোল জুড়ে ঠেকা দেওয়ার ব্যাপারটা এবার বেশ পরিষ্কার।

সেদিকে নজর করে চা-দোকানি বিষয়টা খোলাসা করার প্রয়োজনে হোক বা লোকটার ওপর রাগ ঝাড়তেই হোক, বলল, ‘বেকামার ঢেঁকি। কাম নাই কাজ নাই, খালি আজাইরা প্যাঁচাল।  পোস্টাপিসে তো কুনু কাম নাই, হের নিজের মুখেই হুনলেন। খামোকা ঘরটা পইড়া রইছে, গেরামের পোলাপাইন মানে সরকার পাট্টির কিছু পোলাপাইন আর কী, কেলাব করব বইলা তারে বুজাইলো ঘরটা ছাইড়া দেও, আমরা কেলাব করি। সরকারি জায়গায় ঘর, সরকার পাট্টির হক্ আগে। তারা কইলো তুমি চুপেচাপে ছাইড়া দেও, আমরা দখল নিয়া এমপি টিকলুসাবের লগে তদবির কইরা বন্দোবস্ত পাক্কা করুম। এমনও বুজাইলো, তুমার সরকারি চাকরি, পোস্টাপিস থাউক না থাউক চাকরি থাকব, বেতন যে-কয়ডা পাও, পাইবা। হে হুনলে তো! এখন দ্যাখেন কেমুন ল্যাংচাইয়া বান্দরের লাকান আটে। জুতায় তালি মাইরাও ল্যাংচানি বন্ধ অয় নাই।’

‘একলা ফাইট দিলো!’

‘এর নাম যুদি ফাইট কন! আর একলা না তো দুকলা কারে পাইবো! পোস্টাপিস আগলাইয়া পইড়া রইলো, হে ঘর ছাড়বো না। মাইর খাইয়া যায়-যায় অবস্থা। চোখের সামনে মরতে লাগছে, আমরাই কয়েকজনে টাইনা-টুইন্যা ডাক্তরখানায় দিয়া আইলাম। হুনলেন তো আমারে কইলো খাইস্ট্যা। ঠ্যাং তো মনে অইছিল জোড় লাগব না, কপালে কাটা দ্যাখছেন না? রামদার কোপ। নিমকহারাম, আমারে কয় বেক্কল!’

অনেকক্ষণ ধরে হাইওয়ের পাশে দাঁড়ানো একটা ট্রাক হর্ন দিচ্ছে। ত্রিপলমোড়া পাহাড়-পর্বতের নিচে, কী রহস্য আন্দাজ করা অসম্ভব। অকারণে নিশ্চয় না, কান ধরে কারো মনোযোগ আকর্ষণ করতেই হর্ন দিচ্ছে। হতে পারে ড্রাইভার তার হেলপারকে ডাকছে। হর্ন টেপার ধরনটা বদরাগী, খুবসম্ভব হেলপারকেই। দৃশ্যটায় কিছু নেই, তবে কৌতূহল জমে উঠলে করার কিছু থাকে না। হেলপার যদি হয়, তেমন সম্ভাবনাই বেশি, সেক্ষেত্রে তার ছোকরা বয়সী হওয়ার সম্ভাবনাও জোরালো, হর্ন শুনে ছুটে-ছুটে যখন আসবে, স্রেফ খিস্তিতে হয়তো পোষাবে না, বেমক্কা জোড় পায়ের লাথি যদি জোটে দেমাগি ড্রাইভিংসিট থেকে বুক বা গলা-কাঁধ বরাবর!

‘ছার কি পাঙ্গাশ নিবেন? পাইকারি দরে পাইবেন, আমার ভাইয়ের নিজের পুষ্কনি আছে দুইটা, ভাই-বইনের মইদ্যে আমিই গাতায় পইড়া রইছি, চা বেচি। লগে তো গাড়ি আছে, কন তো এক ডজন দিয়া দেই। ফেরেশ মাল, আত্মীয়-স্বজনরেও বিলাইতে পারবেন।’

এবার শুধু ভেজা হাওয়া না, বৃষ্টিই আসছে। দূরে মাঠ-প্রান্তরে  ধোঁয়ার মতো পাকিয়ে-পাকিয়ে। কোনো ফাঁকে হর্ন-টেপা ট্রাকটা হাওয়া।

সোশ্যাল মিডিয়া

নিউসলেটার