হাড়ের জোড়ে তেজ

লেখক:

সুশান্ত মজুমদার

মেজাজ খারাপ হবে কি, তা প্রায় এক যুগ রোকেয়া নগণ্য পাড়াগাঁ ছেড়েছেন, বয়সও তিন কাল পার, বর্তমান বাসের এলাকা ছাড়া যাঁর কাছে ঢাকা আজ অবধি অপরিচিতই, এই তিনি বোঝেন – রাজধানী নামের শ্রীহীন মহানগরে মাথা গোঁজার পরিবেশ পুরো অযোগ্য। বরাবর এমন বোধোদয় তাঁর বাইরে থেকে ফিরলে। ধুলো ও ধোঁয়ার মধ্য দিয়ে হেঁটে রুগ্ণ শরীর টেনে তিনতলায় উঠে তিনি থমকে যান। বাসার সদর দরজা আধখোলা, নিশ্চয় ড্রয়িংরুমে মানুষ আছে। পা গুটিয়ে নেন তিনি। লম্বা ঘোমটা টেনে পরনের একরঙা কাপড় তিনি ঠিকঠাক করেন। পরিণত আয়ুষ্কালে এসেও এখনো অচেনা চাহনির সামনে তাঁর অস্বস্তি লাগে। ভিন্ন পুরুষ বলে কথা, কার কী নজর, পরিচয় তো নেই। তাছাড়া পর্দার পেছনে  থাকা উপায়হীন আজন্ম অভ্যাস ঢাকার খোলামেলা পরিবেশে এসেও তাঁর পালটেনি। পুরনো গড়নের এই বাসার উত্তরে বড় কয়েকটা বাড়ির পর ভাড়া থাকে টাবুরা। চলতে-ফিরতে নিচে দেখাদেখি, ছুটকো আলাপ, একসময় এই টাবুর মায়ের সঙ্গে সেণহের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। বাসার কাজের মেয়েকে দিয়ে আচানক গতকাল সে খবর পাঠিয়েছিল, সময়-সুযোগ পেলে খালাম্মাকে বেড়াতে আসতে বলিস। পড়শি বউটা কেমন লতার মতো বেয়ে এসে তাঁর সঙ্গে জড়িয়েছে, ভালো আলাপি। বাচ্চাটার ওপরও টান তিনি টের পান। হোক অন্য পরিবারের, অন্য ঘরের, তবু মেয়েটাকে কত কাছের আপন মনে হয়। বেড়াতে গেলে পর টাবু নানি-নানি বলে কোলে চড়ে বসে। নিজের নাতি-নাতনি কাছাকাছি কেউ থাকে না। ঢাকায় থাকলেও দূরে, কেউ বিদেশে, কালেভদ্রে এরা এলে টাবুর মতো নিবিড় জড়িয়ে ধরে না, তাদের অন্তরঙ্গ মনে হয় না। টাবুদের বাসায় গল্প-গুজবে কোত্থেকে যে সময় কেটে যায় – মনটা ফুরফুরে থাকে। এমনিতেই চার চৌহদ্দিতে নিঃসঙ্গ থাকতে-থাকতে রোকেয়া হাঁপিয়ে ওঠেন – মাথার খুব ভেতরে হঠাৎ-হঠাৎ চিল কাঁদে। উথলে-ওঠা কান্না দমন করতে তখন তাঁকে হিমশিম খেতে হয় – অশক্ত শরীরটা কাঁপে। রুমের মধ্যে যেন নিশ্বাস আটকে আসতে চায়। হায়, কখন সে একা মরে থাকবে, তখন কেউ কাছে থাকবে না। আজ স্বামী নেছারউদ্দিন বাসায় আছেন দেখে বেড়ানোর সুযোগ তিনি হারাতে চাননি।  হাত-পায়ের খিল তো ছাড়ানো যাবে। দ্যাখো দুরবস্থা, এখন বাইরে থেকে ফিরে ভেতরে ঢুকতে তাঁর পা সরছে না। সিঁড়ির মাথায় দাঁড়িয়ে থাকবেন কতক্ষণ! ড্রয়িংরুমে মানুষগুলো কারা? নিচুগলায় কিসের এত কথা চালাচালি? কানে যেতে পারে ভেবে কি অমন অনুচ্চ স্বর? তাহলে দরজা দিয়েই তো আলাপ করা উচিত। কী জানি বাপু! কখনো রোকেয়া স্বামীর বাইরের জীবনযাপন, রোজগার, কাদের সঙ্গে মেলামেশা – কিছুই তিনি জানতে চাননি।

ঘরের পুরুষ বউকে দূরে-দূরে যদি সরিয়ে রাখে, চূড়ান্ত অবহেলা দিয়ে তুচ্ছ করে রাখে, তবে আগ বাড়িয়ে বিষয় বলো, বৃত্তান্ত বলো জানার আগ্রহ তাঁর হবে কেন? বয়স পড়ে আসছে, বহুকাল ঘাড় গুঁজে দিন গুজরান, বাকি জীবনটাও তিনি তা-ই করবেন। বিয়ের পর থেকে ঘাটে-মাঠে এত ঘুরলেন, ওই অমার্জিত স্বামীর পেছনেই তিনি আছেন।

দরজার পাশে খুট্ করে শব্দ হয়। উঁকিমারা মুখে নেছারউদ্দিন ইশারা দিলে রোকেয়া ড্রয়িংরুম ভাঙা দৌড়ে পার হন। বেডরুমে বড় মেয়ে নার্গিস বসে টিভি দেখছে। তাঁর গলা জড়িয়ে তিন বছরের বাচ্চাটা মাথার পাশ দিয়ে চেয়ে আছে। মাকে হাঁপ ধরা চেহারায় ঢুকতে দেখে নার্গিস জিজ্ঞাসুদৃষ্টি ধরে রাখে। মেয়েকে পেয়ে রোকেয়ার শুকনো মন খানিক সরস হয়। তার প্রভাব ছলকে আসে স্বরে – ‘তোরা আছিস বইলে বাঁইচে আছি মা।’ নাতনির গোল গাল টিপে দেন – ‘আমার সতীন বুঝি অনেকক্ষণ

ধইরে -।’ শুকনো বুড়ো আঙুলের ছোঁয়া বুঝি নাতনির পছন্দ নয়, মায়ের শরীরের আড়ালে সে সরে যায়। সন্তানকে কোলে টেনে

নিতে-নিতে নার্গিস সংসার করা পাকা কণ্ঠে বিরক্তি ছড়িয়ে দেয় – ‘আম্মা, তুমি মুখ বুইজে এহনো সয্যে করতিছো? করো-করো। আববা সেই আগের মতোনই, তুমি কিছু কও না ক্যান? নিষেধ করো।’ মস্নান মুখ নিয়ে রোকেয়া নিশ্চুপ। মেয়ে কি তাঁর আববার স্বভাব, আম্মার নিচু তুচ্ছ অবস্থান্তর নতুন জানে? তিনি করবেন নিষেধ? মেয়েটা কেন যে পুরনো ঘা খুঁচিয়ে নতুন করে রক্ত ঝরাতে আসে। নেছারউদ্দিন সুযোগ পেলে তাচ্ছিল্যের সঙ্গে তাঁকে পোকামাকড়ের সারিতে নিয়ে ফেলে – ‘গাঁইয়া থাইকা গেলে। অমন কইরা দ্যাহো কি? বুঝবা কিছু? আমারে চেনবা, অত্তো সহজ না।’ তাকানোও বুঝি অপরাধ। তা মাথা তাঁর মোটাই, নইলে দুই মেয়ে এক ছেলেকে এই মোটা মাথা দিয়ে ঠেলে কীভাবে বড় করলেন? প্রায় বছর পঞ্চাশ পার তো হবে, মাথায় সংসারের ওজন ধরে আছে, কীভাবে? রোকেয়া মনের অতল খানাখন্দ থেকে উঠে এসে বুঝি শ্বাস ফেলেন – ‘তোরে চা দি।’ নার্গিস চা পছন্দ করে। রোকেয়া করে না। বহু আগে চুমুক দেওয়ার পর ঠোঁটে গরম ছেঁকা লেগেছিল রোকেয়ার – ব্যস, ওই পর্যন্ত। তবু দিনে চার-পাঁচবার তাঁকে চা বানাতে হয়। নেছারউদ্দিন শুক্রবার বাসায় থাকেন, তখন চা তৈরি হয় বেশি। কোত্থেকে বয়স্কগোছের লোকজন আসে! খাইয়ে হুজুর পেটুকরা এলে তো কথাই নেই – ড্রয়িংরুম থেকে মুড়ি-বিস্কুট-কলার অর্ডার আসতেই থাকে। গোড়ার দিকে চা তৈরিতে কী গোলমাল, দুধ-চিনির বেশি পরিমাণে চা হয়ে যেত গরম শরবত। নেছারউদ্দিনের কী ঠেস বাক্য! উপযুক্তমতো চা বানাতে না পারার অপটুতার জন্য শুধু কি রোকেয়ার, তাঁর

বাপ-দাদার চৌদ্দগোষ্ঠী নেছারউদ্দিন গালির তোড়ে আদাড়ে-বাদাড়ে নিয়ে ফেলতো। কেমনে এ-লোক শিক্ষিত হয়?

মায়ের কিছু খেতে দেওয়ার প্রস্তাব নার্গিস মাথা নেড়ে না করে – ‘টাইম নাই আম্মা। আমার ছোট জার বাচ্চা হইচে, ক্লিনিকে আছে, দেখতি আইছিলাম। এহন না ফিরলি দেরি হইয়ে যাবে। কাছদে যাওয়ার সময় ভাবলাম তোমারে একটু দেখে যাই।’ নার্গিস যাবে কলাবাগান। যাচ্ছেতাই রাস্তা ও যানজটের কারণে ফিরতে ভোগান্তি, সঙ্গে আবার বাচ্চা। রোকেয়া মেয়ের ফেরা নিয়ে উদ্বিগ্ন হন – ‘তাইলে তোর বসা ঠিক না। তা, জামাইরে নিয়া আসলি পারতিস।’ নার্গিসের মুখের আলো মুহূর্তে বদল হয় – ‘আর জামাই!’ মেয়ের মনস্তাপ ছোঁয়া দুটি শব্দে অকথিত যে কষ্ট রোকেয়ার না-বোঝার কথা নয়। নিজেও তিনি নারী। উহু, কোন ক্ষণে মন খারাপের অসুখটা মাথার মধ্যে ঢুকে জমিয়ে বসেছে। ক্লান্তি-আক্ষেপ-বিলাপ পুরোপুরি তাঁকে দখল করে নিলে তিনি টের পান, শরীর থেকে শরীর বুঝি খুলে পড়ছে। খাটের স্ট্যান্ড ধরে বিছানায় ধীরে-ধীরে শুকনো পাতার মতো তিনি ঝরে পড়েন। নার্গিস মেয়েকে কুড়িয়ে নিয়ে চলে যাচ্ছে দেখতে-দেখতে তাঁর নজর ক্রমশ নিভে আসে।

জামাই দূর, নিজের স্বামীকেও এত দীর্ঘ বছর বেড়ালের মতো পায়ে-পায়ে নির্বিরোধ ঘুরে আধখানাও কি চিনতে পেরেছেন তিনি? সীমাবদ্ধ জিন্দেগি তাঁর। কি বাপের বাড়ি, কি স্বামীর বাড়ি, সর্বত্র অন্দর নামের ঘোপের মধ্যে থাকতে-থাকতে খাটো বুদ্ধি দিয়ে ঘরের মানুষের চালচলন, স্বভাব-চরিত্রের ভেতর অবধি ধরার ক্ষমতা তিনি কোথায় পাবেন! অল্প বয়সে বিয়ে, তার আগে সময় গেছে গম্ভীর বাপের শাসনের ছায়ায়, আর বিয়ের পর স্বামীর উঠতে-বসতে ধমক ও খোঁচার কারণে হাত-পা ছড়িয়ে দাঁড়ানোর সাহসই হয়নি তাঁর – কেমনে চোখ খুলে তিনি ভালো-মন্দ আসল-নকল শনাক্ত করেন। এই যে নিজের মেয়ে নার্গিসের বিয়ের পর কানাঘুষা থেকে বাঁশঝাড়ের কানাকুয়োও জানল, জামাইর খুঁত আছে। অথচ ছেলেটাকে দেখার পর খুশির চাপে রোকেয়া জায়নামাজে বসে যায়। দুহাত তুলতেই চোখ ভেঙে তাঁর বৃষ্টি নামে – মেয়েটার জীবন আলস্নাহ আমার মতো যেন না হয়। তাঁর মেয়ে যেন স্বামী-সোহাগী হয়। তাঁদের মিলমিশ আস্ত অটুট রেখো আলস্নাহ। ছেলেপক্ষের অনুরোধে তাড়াহুড়ো বিয়ের কারণে গ্রামের কোনো-কোনো আত্মীয়কে দাওয়াত করা যায়নি। পরে কেউ-কেউ ফোড়ন কেটেছে – ‘মনে থাকপে ক্যান? আপনেরা যে উঁচুতে থাহেন।’

পাড়াগাঁর কাদা-পানি-ছায়া-ঝোপঝাড় থেকে ধুলোমলিন ভাঙাচোরা ছোট্ট মফস্বল শহরতলি, সেখান থেকে বাস তুলে ঢাকাতেই এখন অনেক বছর পার। সত্যি তো একটু-একটু করে সবার সঙ্গে দূরত্ব বেড়েছে, অগোচরে ওঠা দেয়াল আত্মীয়-স্বজন থেকে তাঁদের ভিন্ন করে দিয়েছে। স্বামী নেছারউদ্দিনের নিকট জ্ঞাতি-কুটুম্ব কে-কে আছে কোনোদিনই তাঁদের চেহারা তিনি দেখেননি। চোখের ব্যবধানে তাঁর বাপের বাড়ির মানুষও তাঁদের মনের থেকে প্রায় মুছে দিয়েছে। আরে, এক ঘরে একসঙ্গে থেকেও মানুষ থেকে মানুষ কীভাবে আলাদা হতে পারে, তা নিজের জীবন দিয়ে তিনি টের পাচ্ছেন। স্বামী পুরুষের সঙ্গে ফাঁক বাড়তে-বাড়তে এমন স্তরে পৌঁছেছে যে, এক ছাদের নিচে অথচ কোনো-কোনো দিন দুজনের আদৌ কথাও হয় না। বেদনার ছোবলে ভেতরটা চরম দংশিত হওয়া সত্ত্বেও জীবনের বিভিন্ন ছিদ্র ঢাকার জন্য পুরনো দিনের ছবি জোর করে তিনি মনে টেনে আনেন। হারানো ছবি নিজের মধ্যে খুঁড়ে তুলে তিনি নিষ্কৃতি খোঁজেন। মনোযন্ত্রণায় রোকেয়া গলে যেতে যেতে অনুজ্জ্বল ছবিগুলি একের পর এক জোড়া দিলে ঝাপসা স্মৃতি যথাসম্ভব সাজিয়ে-গুছিয়ে নেন। কোথাও না কোথাও মন তো রাখতে হবে।

নেছারউদ্দিন উপযোগী পাত্র, তৎক্ষণাৎ পছন্দ করে তাঁর হাতে বাপ রোকেয়াকে দিতে রাজি হন। পাড়াগাঁয় জোর কোলাহল পড়ে যায়, ব্যাপার কী, মেহের মিয়া ঘরে বড় মেয়ে রেখে ছোট রোকেয়াকে কেন বিয়ে দিচ্ছেন? মেয়ে দেখতে এসে ছেলেপক্ষের ছোটকেই দেখে পছন্দ। বড় আপাকে সঙ্গে নিয়ে পাত্রপক্ষের সামনে জড়ো পায়ে হাজির হলে সাজগোজশূন্য নিরাভরণ রোকেয়াকে ছেলের মামার মনে ধরে। এখন, এমন সুপাত্র যদি হাতছাড়া হয় ভেবে, বাপ তাঁর নিজের ঘরের কোনো আপত্তির তোয়াক্কা করেননি। গ্রামের বহু মানুষের দাওয়াত, গরু জবাই হয় তিনটা – খাওয়া-দাওয়ার সে এক জমাট আয়োজন। হোক ছেলে সাধারণ ঘরের, লেখাপড়া জানা বিদ্বান, জমি-জিরেত-সম্পদ বড় পরিচয় নয়, আজ নেই কাল হবে – বরাত খুলতে কতক্ষণ। হলোও তাই। হাতের বই-খাতা-কলমের গন্ধ মুছতে না মুছতে বিয়ে, আবার বিয়ের পরপরই নেছারউদ্দিনের হাতে উঠলো চক-ডাস্টার, সে এবার স্কুলমাস্টার – ভাগ্য বটে। রটনা হয়, শ্বশুরের দৌড়ঝাঁপ-সুপারিশে নাকি জামাইয়ের মাস্টারি পাওয়া। এই পাওয়া-পাওয়ির ব্যাপারটা বুঝি নেছারউদ্দিনের হজম হতে চায় না – ছাত্রের তারুণ্যে সে কেবল ওড়াউড়ি করে। স্কুল ছুটির পরও নেছারউদ্দিন কোথায় – ঘরে ফেরেনি, ব্যাপার কী। খোঁজ নিয়ে জানা গেল, মাঠে ছেলেপেলেদের সঙ্গে ফুটবলে সে লাথি মারছে। হেমন্তে খাঁ-খাঁ মাঠ, উঠোনে উঠে গেছে ধান, শিশির-কুয়াশা, শালিক-চড়ুইয়ের দখলে প্রান্তর, তখন যাত্রাপালার আয়োজনে উত্তরের ডাঙ্গায় প্যান্ডেল তৈরি হচ্ছে – আমুদের খুশি। হঠাৎ শোনা গেল, এই আনন্দ-আয়োজন নাজায়েজ বলে যারা বাধা দিয়েছে তাদের সামনের কাতারে মারমুখী নেছারউদ্দিনকে দেখা গেছে। মানুষ পরস্পর মুখ চাওয়াচাওয়ি করে – মেহের মিয়ার বড় মুখ করে পরিচয় দেওয়া জামাই কি মাথাপাগলা, না কপটাচারী! রোকেয়াও কিছু বোঝে না। তখন এমনকি বুঝপড় সে, তাবাদে নতুন বিয়ে, মা-চাচির বয়ান – আরে, লেখাপড়ার জন্য বাইরে-বাইরে থাকা ছেলে, বয়সই বা কী, ঘরের টানে মাথা আসতে সময় তো লাগবে।

কিন্তু একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে কোনো উচ্চারণ না রেখেই, এমনকি ঘরের বউয়ের কাছেও টুঁ-শব্দটি গচ্ছিত না রেখে নেছারউদ্দিন আকস্মিক উধাও। স্বীয় হিতের উদ্দেশ্যে তল্লাট ছেড়ে অন্য কোথাও গা-ঢাকা যদি দিতেই হয়, তবে একা কেন?

নদী-খাল-বিল পার হয়ে তখনো গ্রামের ভেতর ঘাতক পাক আর্মি, রাজাকার আসেনি। শোনা যাচ্ছে, যে-কোনো দিন এ-অঞ্চলে চরম অপারেশনে নৃশংস শত্রুরা চলে আসবে। চারপাশ থেকে উড়ে আসে হত্যা-ধ্বংসের ভয়ংকর সব খবর। ত্রাস-শঙ্কায় পল্লিপাড়ার কাদা-মাটি ছানা, হালচষা মানুষের হাত-পা ঠান্ডা হয়ে যায়।

কারো-কারো বুকের কলকব্জাও জমে যাওয়ার উপক্রম। জ্যান্ত বলিষ্ঠ একটা জোয়ান অচেনা ভূভাগের কতদূর যেতে পারে? সামান্য বিপদের গন্ধ পেলেই ঝোপঝাড়-বনবাদাড়-নলবন-শরবনে মানুষ লুকাতে তৎপর। নিজের ছায়া দেখেও আঁতকে ওঠা অমন বিরুদ্ধ সময়ে কে কার খোঁজ রাখে। দুর্ভাবনায় মেয়ের চেহারা দিন-দিন শুকিয়ে যাচ্ছে দেখে জামাইয়ের সন্ধানে উদ্বিগ্ন মেহের মিয়া নিজেই ঝুঁকি নেন। জনমনুষ্যির মুখোমুখি হওয়ার আগেই এক ভোরে দ্রুত কদমে হেঁটে গ্রামীণ জনপদ ছেড়ে পশ্চিমের নদী তিনি পার হন। পারতপক্ষে মানুষ দূরান্ত থেকে আর শহরে আসে না; বরং শহর থেকে পালাতে চায়। মুঠোয় প্রাণ ধরে মেহের মিয়া তন্নতন্ন করে দেখার মতো করে বিভিন্ন মোড়, ডাকবাংলোর শত্রু-ঘাঁটির সামনের প্রায় জনশূন্য রাস্তা,

বড়-বড় গাছভর্তি ছায়াচ্ছন্ন থানার এলাকা, আধপাড়া অবস্থায় দাঁড়ানো বাজারসহ পুরনো ছোট্ট ক্ষতিগ্রস্ত শহরটা তিনি চষে ফেলেন – তাঁর হাতে ধরা তসবিহ, মাথায় টুপি। মানুষের ফিসফিসানি থেকে জানা গেল, আর্মির কোনো বড় কমান্ডার যশোর ক্যান্টনমেন্ট থেকে এসে টেনিস কোর্টে জড়ো করা পাকবাহিনীর উদ্দেশে বক্তৃতা দিচ্ছে, রাজাকাররা এখন ওস্তাদদের পাহারা দিচ্ছে। সুযোগ হয় মেহের মিয়ার – নির্বিঘ্নে একই রাস্তায় তাই একাধিকবার তিনি যাতায়াত করতে পারেন। জিজ্ঞাসাবাদ ও গলাধাক্কা ছাড়াই নির্দয় রাজাকারদের চৌকি এড়িয়ে নদীর এপারে ফিরে ভয়-ব্যাকুল তিনি দৌড়চালে বাড়ি ফেরেন। দুশ্চিন্তাগ্রস্ত ক্লান্ত মেহের মিয়ার নিজের মগজ নিয়ে এবার ঘোর সন্দেহ হয় – তাঁর মাথায় হয়তো গোলমাল ঘটেছে, প্যাঁচ এঁটে বুদ্ধি বুঝি অচল এখন, নচেৎ খুনের শহরে ওইভাবে হেঁটে নিরুদ্দেশ জামাইকে কি খুঁজে পাওয়া যায়! আর বললো কে ওখানে জামাই আছে? থাকলে, নির্দিষ্ট ঠিকানা ছাড়া দুষ্কালে কেমনে হদিস সম্ভব? মেহের মিয়ার বিবরণ শুনে মৃত্যুপুরী থেকে তাঁর জীবিত ফেরার সৌভাগ্যের জন্য পুরো পরিবার নফল নামাজের উদ্যোগ নেয়। পেরেশানে গলে যাওয়া বাপের পায়ের কাছে রোকেয়া ভেজা চোখে এসে বসলে মেয়ের মাথায় ধৈর্য ধারণের হাত তিনি বুলিয়ে দেন।

নতুন চেষ্টার নামে টাকার লোভ ঝুলিয়ে এবার নেছারউদ্দিনের আরেক দফা খোঁজে কাঁহা-কাঁহা মুল্লুকে পাঠানো হলো চালু পুরুষ। এরা ঘরসন্ধানী – বিয়ের সময় মেহনত দিয়েছে, যাতায়াতকালে দেখা-সাক্ষাৎ হয়, জামাইয়ের চেহারা তাই ভালোই মুখস্থ। দুই ইউনিয়ন দূরে লবণাক্ত দক্ষিণের পূর্ব জলাবাড়ি গ্রামে তালাশের উদ্দেশ্যে সক্রিয় হতে জামাইয়ের আত্মীয়দের খবর পাঠানো হলে তাঁরা মহাবিরক্ত হয়ে মেহের মিয়ার উদ্দেশে আজেবাজে বাক্য ছুড়ে জবাব দেয়। বিয়ে হলেও রোকেয়ার আর কত বয়স, এখনো অবোধই, তাঁর সন্দেহ – নিশ্চয়, স্বামীর বাপ-মা বলে কিছু নেই, থাকলে নিজের সন্তানের জন্য টান থাকত তাঁদের। আচ্ছা, বিয়ের সময় কি শ্বশুর-শাশুড়ি কেউ এসেছিল? আসলে তো পুতের বউয়ের মুখ দেখার নামে পরিচয় হতো। সহায়-সম্বল আর রক্তের আত্মীয় না-থাকার কারণে কি নেছারউদ্দিনের ঘরজামাই হয়ে থাকা। বাপ তাঁর সংসার, ক্ষিত-খামার দেখভাল, কামলা-কিষান খাটিয়ে নিতে দড়। হয়তো বাপ আখের ভেবে কর্মের হিসাব করে নেছারউদ্দিনের সঙ্গে ছোট মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন। এমন এলেমদার জামাইয়ের কা- কী? বিপদ গোনা-গুনতি করে আপন প্রাণ বাঁচাতে সে হাওয়া হয়ে গেল। কোথাও নেছারউদ্দিনের নিশানা নেই শুনে মনের কুডাক চাপা দিতে বুঝি মেহের মিয়া ঘন-ঘন মোনাজাতে বসেন। রোকেয়াও বাপের পেছনে এসে জায়নামাজ পাতে। ভেতর থেকে মেয়ের মা ও বড় মেয়ের কান্নার ফোঁপানি এসে মোনাজাতে হামলা করে, তা ঘর-দরজা আর বাইরের চরাচরে পৌঁছে হাহাকার হয়ে যায়। কোনো-কোনো নিকষ রাতে শোনা যায় কুকুরের জোরালো ডাক। বুড়ো-বুড়িরা বলে, কুকুরের এমন কান্না খুবই অলক্ষুনে – মড়ার হাড় ছড়াবে। নির্ঘুম রোকেয়া হিমশরীরে পাশ ফিরতেই বোঝে, বাপও তাঁর মতো জেগে আছেন। চুপি-চুপি দরজা খুলে তিনি অমঙ্গল ডাকের লক্ষ্য ধরতে বাইরে যাচ্ছেন। এক শেষ রাতে ফজর শুরু হবে হবে, গেল তো গেল মেহের মিয়া আর ফেরে না। ঘটনা কী? মুক্তিবাহিনীর সমেত্মাষপুর ক্যাম্প থেকে লুকিয়ে কালাম এসেছে তাঁর বাপ-মাকে দ্রম্নত একনজর দেখতে। নির্ভরযোগ্য গোপন খবর পেয়ে অন্ধকারে মিশে মেহের মিয়া গিয়ে কালামের হাত ধরে কেঁদে-কেটে জামাইয়ের তত্ত্ব চায়। কিছুতেই ইন্ডিয়ার ক্যাম্প, জানাশোনার মধ্যে মুক্তিযোদ্ধাদের ট্রেনিং সেন্টার, বর্ডারের ওপারের সীমানা রাস্তাঘাট মিলিয়ে কোথাও বর্ণিত চেহারার নেছারউদ্দিনকে দেখেছে বলে কালামের মনে পড়ে না।

একটু-একটু করে মুখে-মুখে চাউর হয় গণহত্যার সঙ্গে নারী নির্যাতনের ভয়াবহ খবরও। রাস্তাঘাটে, আনাচে-কানাচে লাশ ফেলে পাক মিলিটারি মেয়ে-বউদের ক্যাম্পে ধরে নিয়ে পিষে দিচ্ছে। ইতোমধ্যে অসংখ্য নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছে। শুনে চরম ঘাবড়ে যান মেহের মিয়া – বলে কী? এই কি ইসলামি সিপাহিদের জায়েজ কাজ? উহ্, জঘন্য মনোবৃত্তি! জীবন কণ্ঠায় ধরে শহর পালিয়ে যারা গাঁয়ে ঢুকেছে, পেট চেপে এবাড়ি-ওবাড়ির আশ্রয়ে আছে, তাঁরা শিউরে ওঠার মতো নির্যাতনের বিবরণ দেয়। নারীর জন্য লোভে পাকিস্তানি মিলিটারি অস্ত্র উঁচিয়ে ঘর তছনছ করে। মেহের মিয়ার শিরদাঁড়া বেয়ে ঠান্ডা স্রোত নেমে আসে। বিবাহিত-অবিবাহিত মিলিয়ে দু-দুটি মেয়ে তাঁর অন্দরে। এখন মুশকিল নিবারণের ব্যবস্থা? জোত-জমি, ঘর-দরজা, ধানের গোলা, বাস্ত্তভিটে ফেলে তাঁরা পালাবে কোথায়? শোনা যাচ্ছে, অগুনতি মানুষ দেশ ছেড়ে শরণার্থী হচ্ছে। বর্ডার এখান থেকে অনেক দূর – তিনটি জেলার ওপারে। স্থলপথে পালিয়ে আত্মরক্ষা তাঁর পরিবারের জন্য সহজ নয়। পাড়া-পড়শির সঙ্গে পরামর্শ করেও বোঝা গেল, আশু বিপদ থেকে রেহাই পাওয়ার উপযুক্ত উপায় নেই। শেষাবধি সাব্যস্ত হয়, দুই গাঁ ডিঙিয়ে মেহের মিয়াসহ কজন মুরুবিব আফসারউদ্দিন চেয়ারম্যানের কাছে যাবেন – পাকবাহিনীর গ্রামে আসা কীভাবে নিবৃত্ত করা সম্ভব। কোনো বিবেচনা তাঁর কাছে পাওয়া যেতে পারে।

আফসারউদ্দিন চেয়ারম্যান নিজ বাড়ির নিকানো-পুছানো উঠোনের একপাশে হাতলওয়ালা কাঠের চেয়ারে বিপুল বপু রেখে আজকাল মজলিশে বসেন কাজেকর্মে, দেখাসাক্ষাতে বা খেজুরে আলাপে আমলোক এলে যে-বয়সী হোক তারা দাঁড়িয়ে থাকেন, কখনো বা বসার সুযোগ হয় নিচে-পাতা হোগলা চাটাইয়ে। কাঁচাপাকা দাড়ির মধ্যে আঙুল চালাতে-চালাতে চেয়ারম্যান জিজ্ঞাসু নজরে প্রত্যেকের মুখ দেখেন। ঘটনা কী? সন্ত্রস্ত গাঁও-বয়স্কদের অমঙ্গল ঠেকানোর আরজ শুনে আকস্মিক আগতদের আস্ত নির্বোধ ভেবে স্বরে তীব্র শ্লেষ ঢেলে ধমকে ওঠেন আফছারউদ্দিন – ‘যাও, করোগে এহন জয় বাংলা।’ পশ্চিমে ঘাড় ঘুরিয়ে তিনি দৃষ্টি পাঠিয়ে দেন অদৃশ্য শক্তিময় আকাশের শূন্যে – ‘মিয়ারা পাকিস্তান হচ্ছে গিয়ে আল্লাহর দান। বোঝবার পারো নাই। মাথা খারাপ ভেরেন্ডাবাজ ছেইলেপেলে আর অকথা-কুকথা বলা কতগুলো ফালতু নেতার পাল্লায় পইড়ে তোমরা খোদার উপর খোদকারি করিছো। এহন ভাঙ্গাভাঙ্গি করোগে। জয়বাংলা বইলে দেশ চাও। চাও এহন। সাহস কী? পাকিস্তান আর্মির সঙ্গে ফাজলামো? চেনো তাগো? তারা ইসলামের সেরা খাদেম। তাগো হাতেতে দুই-চারডা কাফের তো মরবেই।’

প্রাণের আশা বুঝি নেই, মরণ নিশ্চিত – ভয়ে শরীরের শক্তি হারিয়ে সবাই যখন নুয়ে পড়ো-পড়ো আফসারউদ্দিন বক্তৃতার ঢঙে তখন নির্দেশ দেন – ‘কতা শোনো। যা কই তাই করো।’ দুঃসময়ে এখন তুমি কেন তুই বললেও কারো কিছু করার নেই। তাঁর চেয়ে বড়, জেঠা বয়সীকে মান্যিগণ্যির তোয়াক্কা করে না চেয়ারম্যান। তাঁর গলা হুকুম জারি করে চলে – ‘আমাগো এলাকায় এহন থেইকে নৌকো মার্কার দল বন্দ্যে। এই দল করা হচ্ছে নাজায়েজ কাজ। তওবা করো। এইবার আসল কাজের কতা কই।’ আজ্ঞার রাশ টেনে ক-মুহূর্ত থেমে এবার সে যেন চরম মৌখিক পরোয়ানা প্রকাশ করে – ‘যার যার জোয়ান ছেইলে আছে, পাডাও আমার কাছে। উপরদে রাজাকার বাহিনী তৈরির এলান আইছে। তৈরি হলি পর আমার ইউনিয়নে কিচ্ছু হবে নানে। সাচ্চা মুসলমানের ডর নাই।’ ভয়ডর না থাকলে তো ভালো, জানের জন্য ছদকা, কিন্তু ওই বাহিনী তৈরির ব্যাপারটা ভয়তরাসে পচেগলে যাওয়া কারো মাথার ঘিলুতে কিছুতেই খোলাসা হয় না – শুকনো অবুঝ মুখে সবাই চাওয়াচাওয়ি করে।

রাতে নিশাচর জন্তু-জানোয়ারেরও অগোচরে প্রায় এক কুড়ি জোয়ান ছেলে যে-যার বাড়ি ছেড়ে নিরুদ্দেশ হয়। আবার উলটো ঘটনা হলো : একদিকে যুবা বয়সীরা শব্দশূন্য একজোট পায়ে অন্ধকারে গ্রাম ছেড়ে গেল, আরেক পাশ দিয়ে ভোর ঘুরে ফুটন্ত সকাল কেবল এ-সময় সম্পর্কে রোকেয়াদের খালাতো ভাই নজরুল দারুণ কাহিল শরীর, চামড়া ছড়ে যাওয়া খালি পায়ে মেহের মিয়ার চৌদুয়ারি ঘরের দরজায় পৌঁছে হাঁটু ভেঙে ঢলে পড়ল। দুদিন ধরে অভুক্ত সে। লুকিয়ে এক বস্ত্রে কোনোক্রমে নদীর এপার পৌঁছে সেখান থেকে খাল-বিল-নলবন ভেঙে লোকমুখে সন্ধান পেয়ে এখন এ-বাড়িতে। মেহের মিয়া নিরুচ্চার, ঘোর বিপদের মধ্যে আত্মীয় না-হলেও ঠাঁই দেওয়া ফরজ কাজ। মনুষ্যশূন্য, বেড়া খসেপড়া অপরিচ্ছন্ন বৈঠকখানার পাটাতনের ওপর নজরুলের থাকার ব্যবস্থা হয়। দশ দিক আলো ভর্তি দিনেও যে কেউ বৈঠকখানাটা পরিত্যক্ত নড়বড়ে দাঁড়ানো একটা কাঠামো মনে করবে। দুষ্কালে মেরামত খারিজ করে দেওয়া এই বৈঠকখানার খোসার মধ্যে এক যুবক লুকিয়ে দিনগুজরান করছে তা বাইরে থেকে কিছুতেই বোঝা যায় না। সবার নজরের আড়ালে গামছায় বাঁধা ভাত-তরকারি মেহের মিয়া নিজেই নজরুলকে পৌঁছে দেন। রাতে ছেলেটা নেমে এসে খাওয়া-দাওয়া সেরে খানিক পায়চারি করে হাত-পায়ের খিল ছাড়ায়। সামান্য পাতাঝরার শব্দেও তাঁর চমকানি এখনো যায়নি। একসময় অন্ধকার আরো ঘন হলে তাঁর অবস্থানে ফিরে সে শ্বাস ফেলতে-ফেলতে মশার কামড় খায়।

মেহের মিয়া মনোযোগের সঙ্গে লক্ষ করেছেন – নজরুল সর্বক্ষণ ভীতিগ্রস্ত। তাঁর মুখ এতোই শুকনো থাকে যে, রক্ত বুঝি কেউ শুষে নিয়েছে। পেট ভরে খেতেও তাঁর অনীহা। নির্ঘাত ছেলেটি ভয়ানক তাড়া খেয়ে পথচ্যুত হয়ে এদিকে এসে পড়েছে। তাঁর বউয়ের খালাতো বোনের এই ছেলে নজরুলের মাকে কখনো তিনি দেখেছেন বলে মনে করতে পারেন না। অথচ রোকেয়ার মা অনায়াসে বোনপোকে শনাক্ত করতে পেরে কেঁদেকেটে একশা। ছেলেটা ছিল কোথায়, এলো কোত্থেকে, বাড়ি থেকে কেন বিচ্ছিন্ন, দূর এই অঞ্চলে সম্পর্কে তাঁর আত্মীয় আছে নিশ্চিত এমন খবরই-বা পেল কোত্থেকে – প্রশ্নগুলো মেহের মিয়ার মাথার মধ্যে উদিত হয়ে থাকলেও একবারও সে আগ বাড়িয়ে জিজ্ঞাসা করেনি। দরকার কী! এখন সবাই সবার জন্য – কতজন হাতের মুঠোয় প্রাণ ধরে শহর পালিয়ে গ্রামে ঢুকেছে, নিজেদের বিপন্ন অবস্থার ভেতর উটকো ঝামেলা মনে করে গাঁয়ের বাসিন্দারা তাঁদের তাড়িয়ে দেয়নি। একসঙ্গে বাঁচা, একসঙ্গে মরা।

মেহের মিয়া আগে মাঝেমধ্যে হুঁকো টানতেন। তামাক কাটা থেকে কল্কি সাজানো নিজ হাতে করা পছন্দ ছিল তাঁর। তবে কস্মিনকালেও তামাকখোর বলতে যা বোঝায় তিনি তা ছিলেন না। দেশজুড়ে মানুষ হত্যার উৎসব শুরু হলে প্রবল দুর্ভাবনা ও মানসিক অস্থিরতার তোড়ে হুঁকো টানা অজান্তে চাপা পড়ে যায়। এই মানুষটা কোন খেয়ালে তাঁর পুরনো হুঁকোটা মুছে ফের টানার উপযোগী করেন। চাষের মৌসুমে পরবাসী কিষানদের জম্পেশ নেশার জন্য তামাক গুড়ক মজুদ থাকে। তার থেকে এক ছিলিম তামাক সাজিয়ে মালসায় আগুন নিয়ে চোখ বুজে তিনি টানতে থাকেন। তাঁর সামনের চারপাশের পরিবেশ বুঝি মুছে গেছে। কপালে হিজিবিজি ভাঁজ দেখে বোঝা যায় কী সব গোনাগাথা তিনি করছেন। না, ছেদপড়া হুঁকোর পুরনো নেশায় এখন আর মজা নেই। মুখ থেকে হুঁকোটা নামিয়ে চালার বাঁশের খুঁটিতে হেলান দিয়ে রাখেন। ধাঁ করে উঠে লম্বা পায়ে মেহের মিয়া এবার উঠোনে খানিক পায়চারি করেন। ভুরুর ওপর ভাবনা রেখে এবার বৈঠকখানার পেছন অংশে ফেলে রাখা শেওলাধরা ইটের পাঁজা, তারও পাশের লতাপাতার ঝোপে, আঁতিপাঁতি চাউনি টেনে সোজা চলে যান উত্তরে। দিগন্ত অবধি ধানক্ষিত, মাঝে আঁকাবাঁকা একাধিক খাল, কাদা-পানি ভেঙে বিসত্মৃত খোলা ভূমি পার হয়ে হানাদার শত্রুর হামলা আসার সম্ভাবনা নেই, ভেবে খানিক স্বস্তি পেয়ে মেহের মিয়াকে নির্ভার মনে হয়। মুখে জমে থাকা দুর্ভাবনা খানিক মুছে যায়। হাওয়ায় উড়ো খবর আসতে থাকলে কাঁহাতক মাথা আর ঠান্ডা থাকে। এই শোনা গেল : নদী পার হয়ে মিলিটারি এসে গোটাপাড়া-কান্দাপাড়ায় ঝাঁকে-ঝাঁকে মানুষ মেরেছে। আবার রটে গেল : যে-কোনো মুহূর্তে তলস্নাটে পাক আর্মি এলো বলে। ইহজনমেও গ্রামের মানুষ মিলিটারি, কি অস্ত্রপাতি দেখেনি। আতঙ্কের স্বর কেবল ছোটাছুটি করে – মিলিটারিদের মানুষ মারার মতো নির্ভুল ট্রেনিং দেওয়া আছে। অস্ত্রগুলো নাকি ভয়ংকর, মাথার ফুটো থেকে ঝলকে-ঝলকে আগুন বের হয়, কোনো অস্ত্র একসঙ্গে চার-পাঁচজনকে খতম করে, কোনো-কোনো অস্ত্র ডাঙ্গা ও পানিতে সমান চলে। এতসব পিলে-চমকানো বর্ণনা শুনে মানুষ হাঁটাচলাই ভুলে যায়। এদিকে নেছারউদ্দিনের কোনো খবর কাকপক্ষীও এনে দিতে পারল না। রোকেয়া খালি কাঁদে, কাঁদতে-কাঁদতে কখনো মেয়েটা নীল হয়ে যায়। ঘরে-বাইরের অসহ্য দুর্গতির চাপে নেছারউদ্দিন শরীরের ভাঙন রোধ করে কেমনে।

নজরুলের বাড়ির মানুষ মুখের খবর ধরে খুঁজতে-খুঁজতে লাপাত্তা ছেলেকে পেয়ে তখুনি নিয়ে উড়াল দিতে উদগ্রীব। নিজেকে লুকিয়ে রেখে নজরুলও হোক সম্পর্কে খালা-খালু, এ-বাড়ির অন্ন আর খরচ করতে চায় না। মাসখানেকের কাছাকাছি হলো, হুট করে তাঁর আশ্রয় নেওয়ার কারণে এই সংসারের মানুষদের কি কম ঝক্কি পোহাতে হচ্ছে? দ্বিধা-লজ্জায় গুটিয়ে থাকে সে। এই বাড়ির ছোট জামাই নিখোঁজ, ইতোমধ্যে মানসিকভাবে সবাই চুরমার হয়ে আছে। এমন উৎকণ্ঠার মধ্যে বাড়তি একটা মানুষের দেখভাল কতক্ষণ আর সম্ভব! ভাইপোকে নিতে আসা নজরুলের ছোট চাচা ঋণী বোধে মেহের মিয়ার হাত ধরে ভাবাবেগে গলে যান – ‘আপনি মিয়া ভাই যা করিছেন, এডা শোধ করার -’ এই অবধি বলার পর তাঁর স্বর বাষ্পাচ্ছন্ন হয়ে যায়।

যাওয়ার দিন নজরুল সর্বক্ষণ চেপে রাখা মেহের মিয়ার উদ্বেগ লাঘবে বড় মেয়ে আমেনাকে কোরান শরিফে হাত রেখে স্ত্রী হিসেবে সঙ্গে নিতে চায়। নজরুলের চাচারও অমত নেই। শুনে রোকেয়ার বুকভাঙা অঝোর কান্নায় চোখ তাঁর আঠা হয়ে যায়। কোথায় ধুমধাম সাড়া ফেলে বড়বুর শাদি হবে, তা না, ঘরে বয়স্থা মেয়ে রাখার সাহস আগেই গুঁড়ো হয়ে যাওয়ায় শুধু কবুল উচ্চারণের পর বাপ যুদ্ধের মধ্যে মেয়েকে ছেড়ে দেন। ওই ছিল বুবুর সঙ্গে তাঁর শেষ দেখা। জোরে কান্নাকাটি করা নিষেধ। আওয়াজ বাইরে গেলে মানুষজনের সন্দেহ হবে – মিয়াবাড়িতে হচ্ছে কী? আমেনাও বাপ-মাকে সালাম করে বিদায় নেওয়ার সময় তাঁর দুচোখের নোনা পানি ও শব্দ

মুখে কাপড় চেপে ধরে রাখে। নতুন দুলাভাইয়ের সঙ্গে জমিয়ে আলাপ-পরিচয়ই তাঁর হলো না। চলাচলে সামনাসামনি দেখা হতো রাতে। মুখে তাঁর ওই এক সরস কথা – তোমার রোকেয়া নামের আদ্য বর্ণ ‘রো’ বাদ দিলে থাকে কেয়া। কেয়া কখন ফোটে জানো? বর্ষায়। কেয়া ফুলের ছড়ায় অনেক রেণু থাকে, হাতের ছোঁয়ায় এই রেণু ধুলোর মতো ওড়ে। নজরুলভাইয়ের এসব বইয়ের ভাষার মতো করে বলা শুদ্ধ কথার কিছুই রোকেয়া বোঝেন না। প্রাইমারির ক্লাস ফাইভে পৌঁছে স্কুলমুখো আর হয়নি সে – বাপও লেখাপড়ার জন্য জোরাজুরি করেননি। ব্যস, বিদ্যা অর্জনের নামে অক্ষর তিনি চেনেন, পড়তে বাধো-বাধো অবস্থা হয়।

বড়বুর ছিল বইপড়ার নাছোড় নেশা। পড়শিদের বাড়ি থেকে আনা নামাজ শিক্ষা, খাবনামা ফালনামা, আদর্শ পাকপ্রণালি, বেহেশতি শিক্ষা, আসমানি ফরমান পড়া শেষ তো বুবু এবার কোথায় বাড়ির অবলা এক চাকরানি নিয়ে আমেনা গেছে বান্ধবী গীতাদের বাড়ি। ফিরে আসার সময় তাঁর শাড়ির আড়ালে গল্পের বই। সেই পড়ুয়া বোন আর মধুরভাষী নতুন দুলাভাই বিজয়ের মাত্র সাত-আটদিন আগে রাজাকারদের হাতে জীবন হারালেন। রোকেয়া শুনেছেন, দুজনের পেটে বেয়নেট ঢুকিয়ে ফেড়ে দুশমনরা লাশ পুকুরে ফেলে রেখেছিল। শরীরে রক্ত ছিল না, ঝরে গেছে সব, উপরন্তু ঠান্ডা পানিতে ফেলে রাখার কারণে সর্বাঙ্গ তাঁদের সাদা হয়ে যায়। বাপ তাঁর গুমরে-গুমরে কাঁদে, নিজের কপাল চড়ায় – ‘জামাই-মাইয়েডারে তহন ক্যান রাইখে দিনি।’ মেয়ে-জামাইয়ের শোকে আম্মার হাড়ের মালা সেই যে পড়লো আর উঠে আসতে পারেনি। কোনো অসুখে না-ভুগেই কেবল প্রথম সন্তানের জন্য শোকে কিছুদিনের মধ্যে তিনি মাটির নিচে ঘুমাতে চলে যান। যুদ্ধ শেষের পরপরই জানাজানি হলো : এক মওলানা নাকি রাজাকারদের কানে কথা তুলে দেয়, নজরুলকে শহরে মিটিং-মিছিলে সে দেখেছে, জয়বাংলা লোক। ওই মওলানা রাজাকারদের আত্মসমর্পণের আগেই দূর কোন মুল্লুকে পালিয়ে যায়। মুক্তিযোদ্ধারা মাইল-মাইল চষেও ব্যাটার চিহ্ন পায়নি।

আশ্চর্য, দীর্ঘ নয় মাস পর হঠাৎ উদয় হলো নেছারউদ্দিন। ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে নিজেই নিরুদ্দেশ মানুষটা ঘোর অন্ধকার ফুঁড়ে হাজির। অনেক শুকিয়ে গেছে সে, নিষ্প্রাণ, চেহারায় টাটকা ভাব নেই। এতোদিন ছিল কোথায়, কেন কারো কাছে টুঁ-শব্দটি না রেখে বউ ফেলে তাঁর উদ্দেশ্যহীন অজ্ঞাতবাস? জুলুমে মুল্লুক খাক হয়ে গেল, উজাড় হলো গাঁ, নিরুপদ্রব বেচারাদের জীবননাশ, এমন চরম দুঃসহ দোজখ যন্ত্রণার সময়ে নেছারউদ্দিন ছিল কোথায়? তাঁর মুখময় কেমন ভীতির ছায়া। তার পীড়নে সে বুঝি কথাই ভুলে গেছে। অস্পষ্ট শব্দে দাবি করে – সক্রিয়ভাবে সে যুদ্ধে ছিল।

নেছারউদ্দিন কেমন কুণ্ঠার সঙ্গে জানায় : উত্তরের গোটাপাড়া, ভাসা, পানিঘাট, বিষ্ণুপুরে পাকিস্তান আর্মির বিরুদ্ধে তুমুল যুদ্ধ করে ওই দানব শত্রুদের তাঁরা হটিয়ে দিয়েছে। তা এমন ইনিয়ে-বিনিয়ে বলা কেন? মুখখাইট অঞ্চলে খোয়াভর্তি রাস্তার পাশের বড় তেঁতুলগাছটার গোড়ায় তাঁর রাইফেলের গুলিতে দুই রাজাকার মরেছে। এইসব বীরত্বময় কাহিনি শ্বাস আটকে শুনতে-শুনতে গৌরবের শরিক হয়ে রোকেয়া পরমানন্দে স্বামীর মুখে অপলকে চাহনি ধরে রাখে। অমন দৃষ্টির সামনে কেন জানি নেছারউদ্দিন অস্বস্তির সঙ্গে বারবার মুখ ঘুরিয়ে নিতে থাকে। দেখে, রোকেয়ার খুশির মউজে হালকা চিড় ধরে – তাঁর স্বামীর চেহারায় জয়ের চেয়ে ভয়ের ছাপই যেন বেশি। হতে পারে মৃত্যুর মুখোমুখি জীবনপণ লড়াই করার দরুন ক্লান্তি এখনো মুছে যায়নি। শরীরের চামড়া তো রোদে পুড়ে ঝলসে গেছে, দুই কনুইয়ে ফুটে আছে ঘষা-খাওয়া কালো দাগ। এই একই এলাকায় রোকেয়ার ফুপাতভাই কালামও মুক্তিযুদ্ধে ছিল, নিশ্চয় যুদ্ধের মধ্যে তাঁর সঙ্গে কথায়-কথায় জানাজানি হয়েছে আত্মীয়পরিচয়। কালাম সম্পর্কে জিজ্ঞাসায় নেছারউদ্দিন থেকে আদৌ কোনো উত্তর পাওয়া গেল না। বরং এমন নামের কোনো যুবক মুক্তিযুদ্ধে ছিল সে মনে করতে পারল না। তাজ্জব ব্যাপার, কালামের নেতৃত্বে সেপ্টেম্বরে যে-যুদ্ধ হয় ওই প্রতিরোধের কারণে পাকিস্তান আর্মি-রাজাকাররা নদী পার হয়ে গ্রামে ঢুকতে পারেনি। মানুষের মুখে-মুখে ফেরা মাত্র চার মাস আগের ওই টাটকা যুদ্ধের ঘটনা নেছারউদ্দিনের কপালে ভাঁজ ফেলে মনে করতে হবে, তা কী করে হয়! এবার বুকের কঠিন কষ্ট, রাজাকারদের হাতে আমেনাবু-নজরুল দুলাভাইয়ের মৃত্যুর ঘটনা রোকেয়া খুলে বললে এটা সাধারণ কোনো প্যাঁচাল ভেবে নেছারউদ্দিন ক্ষিপ্ত হয়ে উঠলে সে হতভম্ব হয়ে যায়। মানুষের যে হুঁশ তার গোড়া এই লোকটা কি কেটে ফেলেছে? কোথায় অকালে মেয়ে-জামাই হারানোর মর্মান্তিক যন্ত্রণা-পীড়নে মুষড়েপড়া শ্বশুর-শাশুড়িকে সে সন্তবনা দেবে, তা না, মুক্তিযোদ্ধার মর্যাদাপূর্ণ আচরণের বদলে নেছারউদ্দিনের দস্যুপনাই যেন বেশি। প্রায় তিনশো দিন পর কোন দূরাঞ্চল থেকে ফিরে এসে শুরুতেই অভব্য দাপট দেখাতে মানুষটা অস্থির – বিষয় কী! স্বামীর এই ব্যবহার নিয়ে রোকেয়া সাফ-সাফ কিছু বুঝে ওঠার আগেই চারদিনের মাথায় নেছারউদ্দিন ছিঁড়ে নেওয়ার মতো বাপের বাড়ি থেকে তাঁকে বোঁটাচ্যুত করে। তাঁর চট্জলদি তৎপরতা দেখে মনে হচ্ছিল – বউকে নিজের কোনো রোখে সে তাড়িয়ে নিয়ে চলেছে। রোকেয়ার বিস্ময়ের ঘোর কিছুতেই কাটে না – স্বাধীন দেশ প্রতিষ্ঠায় অংশ নেওয়া এক মুক্তিযোদ্ধা চলবে বীরদর্পে, তার বদলে তড়িঘড়ি রাতের অন্ধকারে তাঁর গা-ঢাকা দেওয়া কেন!

নিঝুম ছায়াচ্ছন্ন, প্রায় জনবিরল অঞ্চলের যে খড়ো দোচালায় রোকেয়া স্বামীর পেছন ধরে এসে ওঠেন তা কি তাঁর শ্বশুরবাড়ি? কাকে তিনি জিজ্ঞাসা করেন – শ্বশুর-শাশুড়ি, আত্মীয়-পরিজন পরিচয়ের কোনো মুরুবিব এখানে নেই। কোথায় তাঁরা – কোনো উত্তরও নেই। বিয়ের সময় ছেলেপক্ষের যে-মানুষজন তাঁর বাপের বাড়ি গিয়েছিল কোথায় তাঁরা? তাঁর বিচক্ষণ হুঁশিয়ার বাপ ছোট মেয়ের বিয়েতে কোনো ভুল করেছে? তাহলে তাঁর স্বামী কি সত্যি-সত্যি এতিম? এতসব প্রশ্নের জবাব এক ছাউনির নিচে একসঙ্গে এতকাল সংসার যাপনের পরও রোকেয়া পাননি। কী করে পাবেন? মাত্র মাস দেড় তাঁরা এক গ্রামে থেকেছেন। নেছারউদ্দিন ঘরে বেশিরভাগ সময় ঘুমিয়ে কাটায়। পাড়া-পড়শির কেউ কখনো তত্ত্ব-তালাশে এলে তাঁদের অনিচ্ছাসত্ত্বেও শিখিয়ে দেওয়া মিথ্যা বলেছে রোকেয়া – ঘরে নেই। দেখা গেল, বেড়ার ফুটোয় চোখ রেখে দম আটকে আছে নেছারউদ্দিন কিংবা খিড়কি দুয়ার দিয়ে দ্রুত পেছনের ঝোপের মধ্যে সে হাওয়া। যে-মানুষ বিয়ের পরও মুল্লুক মুল্লুক উড়ে বেড়িয়েছে, এই সে ঘরে থেকেও নেই – এমন মিথ্যা বলা কেন? গ্রাম-গঞ্জে, হাটে-মাঠে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উড়ছে, বাচ্চাকাচ্চারা পর্যন্ত নেচে-গেয়ে আনন্দ করছে; আর মানুষটা কিনা অন্ধকারে ঘাপটি মারার মতো আছে – ব্যাপার কী! কেবল নেছারউদ্দিনের ফ্যাকাশে মুখে বারবার রোকেয়ার কাছে এক জিজ্ঞাসা – ‘তোমার বাপের বাড়ির ওদিকির কেডা-কেডা মুক্তিযোদ্ধা, কতি পারো?’ কে যুদ্ধে গেছে – রোকেয়া কেমনে তা জানবেন। যুদ্ধদিনে তিনি কি পাড়া বেড়াতে যেতেন? তার কাছে কি যুদ্ধের ঘটনা, যোদ্ধাদের পরিচয় কেউ এনে জমা রেখে যেত? যত্তসব। যে-মেয়ের স্বামী বাঁচা-মরা যুদ্ধের মধ্যে হঠাৎ লাপাত্তা, তাঁর মনের নিশিদিন কষ্ট দুর্ভাগিনী ছাড়া কে বুঝবে? তাঁর কি অতো রক্তারক্তি খুনজখমের মধ্যে স্বামীর জীবন্ত থাকার খবর পাওয়া ছাড়া অন্য কিছুতে মনোযোগ ছিল।

এক রাতে নিষ্কর্মা নেছারউদ্দিন জরুরি কাজ আছে বলে দুদ্দাড় পায়ে বেরিয়ে যায়। রাতের বেলা কাজ – বিস্ময়ে মন মচকে যায় রোকেয়ার। ফেরে না ফেরে, মহামুসিবত – নির্ঘুম রাত গেল। খটকা লাগতে শুরু করে – মানুষটা আবার নিখোঁজ হলে আনখা এই বিভুঁইয়ে একা কেমনে তাঁর দিন যাবে! রোকেয়ার জেগে ওঠা আশঙ্কা নস্যাৎ করে পরের রাতে ফিরে এলো নেছারউদ্দিন। তাঁর চুরমার ধ্বস্ত চেহারাই বলে, বুঝি বনজঙ্গল ভেঙে দৌড়ে ফিরেছে সে। দারুণ হন্তদন্ত ভাব – এখুনি রওনা দেবে তাঁরা। বলে কী – রওনা দেবে মানে? নেছারউদ্দিন ঘরের তুচ্ছ ঠোলামালা, সম্বলমাত্র কাপড়-জামা পুরনো ময়লা চাদরে বেঁধে বউকে তাড়িয়ে নিয়ে চলে। পথ মুখস্থ না থাকলে অন্ধকারে হাঁটা কি সহজ! পায়ের নিচে পড়া মাটির টুকরো, ঢেলা-পাটকেলের চাপ তালু ফুঁড়ে উঠে আসে। হড়কে পড়তে-পড়তে পা জোড়া নিয়ে শক্ত করে দাঁড়াতে হয়। গর্ত আর ঢিবির মধ্যে অপ্রস্ত্তত পদক্ষিপ তো ঝুঁকিপূর্ণ। তরাসে অন্ধকার ঠেলতে-ঠেলতে তাঁরা যাচ্ছে কোথায়? জিজ্ঞেস করবে কি, তাঁর পিছিয়েপড়া দেখে নেছারউদ্দিন মুখ যাচ্ছেতাই নোংরা করে। নিজের বউকে সে মাগি-উগি অকথ্য শব্দ ছুড়ে রাত আরো কালো করে ফেলে। উপচানো নিঃশব্দ কান্না চেপে ধরে এগিয়ে চলে রোকেয়া। সামনে এই মানুষটা কি তাঁর কথিত শিক্ষিত স্বামী, না কোনো নির্দয় রাজাকার, তাকে জবাই করার জন্য নিয়ে যাচ্ছে।

ওই রাতে ফেরারির চালে আসতে-আসতে অশ্রাব্য গালি, পর্যায়ক্রমে চরম তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য, তার ধাক্কায় মনের ধারাভাঙা কান্না, স্বামীর ইতর ব্যবহার অক্ষমা রোকেয়ার কপালে এমন স্থায়ী হলো যে, শত ঘষাঘষি আর বর্তমান সুখের ওমেও তা মুছল না। ইহজনমের মতো নিজের প-ভাগ্য নিয়ে কোনো অভিযোগ তাঁর নেই। এই যে দূরান্তের গাঁ ছেড়ে কোথাকার অচেনা ভাঙাচোরা, পুরনো, ধুলোভর্তি ভিন্ন এক শহরতলির শেষ মাথায় জঘন্য স্যাঁতসেঁতে ঘরে বছরের পর বছর কাটিয়ে শেষাবধি ঢাকায় বাস তুলে আনার সচ্ছলতার হদিস সে পায়নি। কোত্থেকে আয়-বরকত, নসিবে সৌভাগ্য, জিনিসপত্রে ঘর ভর্তি হলো, স্বামীর কোন উপার্জনে আঙুল ফুললো, পষ্টাপষ্টি এসব জানার আগ্রহ তাঁর হয়নি। আরে, মানুষ তো উন্নতি-শ্রীবৃদ্ধি জানাতে আত্মীয়-বান্ধবকে ডাকে, মুঠও আলগা করে – নেছারউদ্দিনের কিছুই না, সে এমনভাবে কঠিন কোন খোলস দিয়ে নিজেকে মুড়িয়ে নিয়েছে যে, সেখানে কারো প্রবেশাধিকার নেই। হায়, বাপ তাঁর জামাইয়ের ওপর অভিমান করে মেয়েরও খোঁজখবর নেয়নি, চিরকালের পর করে দেয়, এই সে কবেই কবরে চলে গেছে, চোখের শেষ দেখা আর হয়নি। কিন্তু তাঁর নিজের সন্তানরা কতখানি আপন আছে? মেয়ে নার্গিসের পর জন্ম আর এক মেয়ের; শেষে ছেলে আরিফ – সবাই একে-একে দূরে এখন, দৃষ্টির বাইরে। ছোট মেয়ে স্বামী-সন্তানসহ আছে কানাডায়। নিজের বাপের সঙ্গে আরিফের আদৌ বনিবনা নেই। এ-বছর দূর কোনো জেলায়, পরের বছর আরেক জেলায় ছেলে বদলির চাকরি করছে। বিয়ের কথা বললে আরিফের এমন ভাব তাঁর যেন বয়সই হয়নি। ছুটিছাটায় এসে মায়ের আঁচলের নিচে দু-তিনদিন থেকে দ্রম্নত সে ফিরে যায়। কিছুতেই বাপ-বেটা এক ছাদের তলে থাকতে পারে না। কথায়-কথায় মতভেদ, খিটিমিটি, রুখো মেজাজ লেগেই থাকে। রোকেয়ার কানে এসেছে মুক্তিযুদ্ধ, একাত্তর নিয়ে দুজন গরম স্বরে বেজায় তর্ক করছে। ছেলে একবার বাপকে ওল্ড ক্রিমিনাল, কিলার বলে গর্জন করে বাসা থেকে গেল তো গেল তো আর আসেনি। গত ঈদেও ছেলে এ-মুখো হয়নি। রোকেয়া মিল-মহববত, কি নরম-গরম, ঝগড়া-বিবাদ, অনাসৃষ্টির কিছুই বোঝেন না। তিনি বুঝতেও চান না। দূরে-দূরে থাকেন, তাঁর কোনো পক্ষ-বিপক্ষ নেই।

রোকেয়ার ঝাড়া হাত-পা, বাসার চৌহদ্দিতে তাঁর অখন্ড ফুরসত। মুশকিল হচ্ছে নিরর্থক সময় নিয়ে – অযথা নষ্ট। তাই তো এদিক-ওদিক, টাবুদের বাসা, নিচতলার ফুটফুটে বাচ্চা ফাহিমদের বাসা, তার ওপাশে প্রিয়ন্তিদের বাসায় গিয়ে মাঝেমধ্যে তিনি সময় খরচ করে আসেন। তাঁর মতো চুপচাপ নির্ঝঞ্ঝাট একজন বয়স্ক মহিলার সঙ্গ পেয়ে বাচ্চাদের মায়েরা সাংসারিক খুঁটিনাটি, সন্তান লালন-পালনের পরামর্শ শোনে। এদের কেউ শহরের মেয়ে, পাড়াগাঁ নিয়ে তাঁর শোনা ধারণা। তাই রোকেয়া থেকে মাঠ-ঘাট, আলো-বাতাস, ফসলের ঋতুর কথা তাঁরা মনোযোগ দিয়ে শোনে। এদের কাছে রোকেয়া এখন খালাম্মা। বাচ্চারা নানি-নানি বলে মন তাঁর ভরিয়ে দেয়। অকাতরে তিনিও নিজেকে উজাড় করে দেন। তবে কাজের লোকের রান্নাবান্না, ঘর মোছা, কাপড় কাচা তাঁর পছন্দ হয় না। বুয়ার সব কাজ যেন আধাআধি। তাড়াহুড়ো করার নামে বরং কাজ  ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রেখে যায়। ভাবতেই তাঁর স্মৃতির খাদ থেকে কখনো দাগ উঠে আসে। কাজের মানুষ যখন ছিল না তখন ঘরকন্না কে করেছে? চৌপর খেটে-খেটে হাত যার ক্ষয়, আঙুলের চামড়া খরখরে হয়েছে, গোঁজামিল দিয়ে হলেও সংসার একসময় চালু রেখেছে, এমনও গেছে পাড়া-পড়শি থেকে ধার-কর্জ, চেয়েচিন্তে চাল, শাক লতাপাতা সিদ্ধ করেছে, তাঁর কাছে এখনকার অলস সময় তো নির্যাতনের শামিল। আশ্চর্য, নেছারউদ্দিনের লোক খাটানোর মুরদের উৎস কোথায়! স্বামীর এমন কোনো তালুকদারি ছিল না যা নিয়ে সে বড়াই করবে। খাওয়ার পানি আনতো পাশের বাড়ির টিউবওয়েল চেপে, সে কিনা বাসায় মিনারেল ওয়াটার কিনে খায়। রোকেয়া জানে, তাঁর একটা খুঁত আছে – কোনো কিছু দেখার ভেতর অবধি ধরার উদ্দেশ্যে পুরো নজর সে ঢেলে দেয়। হয়তো আজন্ম নিতান্ত গেঁয়ো মেয়ে বলে। কথারও মানে বোঝার জন্য এমন মূঢ় চাহনিভাবে চেয়ে থাকে যেন কথার ওপরই সে নজর ফেলে আছে। বুঝি চেহারায় এতে হাবাগোবার ছায়া ভেসে ওঠে। এখানেই নেছারউদ্দিনের খামোকা ধন্ধ : বউয়ের নজর কেমন তেরছা লাগে বা তাঁর নিজস্ব কোনো গোপনীয়তা দেখতে পাচ্ছে ভেবে চোয়াল সে শক্ত করে বিবাদের প্রস্ত্ততি নেয়। প্রায়শই রুক্ষ স্বরে নেছারউদ্দিন ধমকে ওঠে – ‘দ্যাহো কি? অমন ঢ্যালা চক্ষি কি দ্যাহো? বোঝো কিচ্ছু?’ কিসের বোঝাবুঝি? কখনো স্বামীর তুই-তোকারি কানে জমিয়ে সারারাত নীরবে কান্নার মধ্যে রোকেয়া তন্নতন্ন করে বুঝতে চায় – জীবনের গলদ তাঁর কোথায়? অজান্তে এমন কী পাপ করেছে যার কারণে এই দোজখভোগ তাঁর? নিজের ত্রুটি খুঁজতে-খুঁজতে ক্লান্ত হয়ে তিনি কিছুই পান না। তাহলে উপায়? যাবেন কোথায়? বাড়ির রাস্তা কবেই তাঁর থেকে দূরে সরে গেছে। শুনেছেন, খেদ-তাপ-আক্ষিপে বাপের গলা ভেঙে যায়, মরার আগে আর কাঁদতে পারতেন না – কণ্ঠের অস্পষ্ট শব্দ গোঙানি হয়ে ছড়িয়ে পড়তো। অমন পরহেজ করা-চলা বাপের ভিটেয় এতো কাল পর কোন মুখ নিয়ে তিনি পা দিতে যাবেন?

রোকেয়ার ধারণা, বয়সের এই পড়ন্ত বেলায় এসে না-জানি কোন আঘাটায় তিনি জীবন হারান। মেয়ে না হয়ে আগে ছেলেটা যদি জন্মাতো অন্তত তাঁকে আঁকড়ে ফুরিয়ে আসা আয়ু গড়িয়ে-খুঁড়িয়ে তিনি পার করে দিতেন। না, এটা কোনো উচিত ভাবনা হলো না। নিজের চিন্তা বাতিল করে দেন রোকেয়া। তাঁর বাপের তো ছেলেই ছিল না – দু-দুটো সন্তানই মেয়ে। কই, ছেলের জন্য বাপকে তিনি হা-হুতাশ করতে দেখেননি। মনের গভীরের অপূর্ণ আকাঙক্ষা কখনো তাঁকে পীড়া দিলে চেহারায় কখনো না কখনো তা দৃষ্টিগোচর হতো। তাঁর বড় জামাই, বড় মেয়ে মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হয়েছেন বলে মায়ের কান্নাকাটি ঠেকাতে বাপ তাঁর মোলায়েম স্বরে কতবার প্রবোধ দিয়েছেন। বাপ নিজেও স্বজনের

অভাব-শূন্যতার কষ্টে কদিন চুপচাপ চোখের লবণ ফেলে পরে ভেতরের কোন শক্তিতে বলীয়ান হয়ে ওঠেন – ‘কত্ত মনুষ্যি দ্যাশের জন্যি দান দিছে, আমি নয় মাইয়ে আর জামাইরে দিছি। এডাই ভালো হইছে, মাইয়েরে আমার বিধবা দেখতি হয়নি। এডাও কই, আমেনা মাইয়ে না হইয়ে যদি বেটা হইতো, তারে কি মুক্তিযুইদ্ধে যাতি আটকাতি পারতাম? স্বাধীন দ্যাশের জন্যি সবারই কিছু না কিছু দিতি হইছে, আমিও দিছি।’ খুঁটিতে কখনো হেলান দিয়ে, কখনো আত্মীয়-পড়শিদের কাছে অন্তরের কথাগুলো বলার সময় রোকেয়া খেয়াল করেছেন, অকথিত বেদনার ছায়া মুছে বাপের মুখ হয়েছে গৌরবদীপ্ত। কিন্তু তাঁর তো ছেলে আছে, সাবালক এখন, তাঁকে নিয়ে কতখানি ভরসা করা সম্ভব? ছেলেকে এখুনি কেন জানি তাঁর অচেনা ও দূরের মনে হয়। পেটমোছা এই শেষ সন্তানটা মাকে কি মনে করে? টান যদি থাকতো, তবে নিয়মিত না হলেও মাঝেমধ্যে খোঁজখবর তো নিতো। দিন কি অনেকদিন হয়ে গেছে? ধীরে-ধীরে বেড়ে ওঠা ছেলের মুখটা নিবিড়ভাবে দেখার উদ্দেশ্যে স্মরণশক্তি তিনি খনন শুরু করলে হঠাৎ বাজখাঁই রকমের ধমক এসে তাঁর প্রয়াস বরবাদ করে দেয়। তন্দ্রামাখা দুচোখ খুলে রোকেয়া দেখেন, তাঁর স্বামীর ক্রুদ্ধ মুখ – ‘তোমারে ডাকতিছি না?’

এতক্ষণ পিঠের নিচে বালিশ ফেলে হাঁটু ভাঁজ করে পাতলাভাবে শুয়ে থাকা রোকেয়া মুখ তুলে দেখেন, নেছারউদ্দিন বচসার উদ্যোগ নিয়ে সটান দাঁড়িয়ে। স্বামীর এই রুষ্ট ভঙ্গির সঙ্গে তাঁর পুরনো পরিচয়। এখন শুয়ে থাকা হবে বাড়তি বিপত্তি। ঝাঁ করে উঠে বসেন তিনি। রুগ্ণ শরীর এতে অল্প-অল্প কাঁপে। বউয়ের অমন জলদি উত্থান, মুখের ওপর পালটা কোনো জবাবের সম্ভাবনা ভেবে নিজেকে গুটিয়ে নেন নেছারউদ্দিন। তাঁর স্বর নিচু খাদে নেমে আসে – ‘ঘরেতে মেহমান। খাইতে দেওয়ার কিছু আছে?’ শুনে রোকেয়া যে নিঃস্ব নজরে চেয়ে থাকে তার মানে একটাই – খাওয়া না আনলে থাকবে কেন? এই শূন্য অনুচ্চার নেছারউদ্দিনের পছন্দ নয়, তাঁর ঠাঁট এমন যে, এই নেই মান-সম্মানের সঙ্গে খাপ খাচ্ছে না। অতএব, খেঁকিয়ে তাঁকে উঠতেই হয় -‘তোমার জন্যি চারবেলার অ্যাটটা কাজের মনুষ্যি রাখতি পারি না। এহন কারে দোকানে পাডাই?’ গোঁয়ার চোয়ালে নেছারউদ্দিন গজগজ করতে-করতে রুম ছেড়ে গেলে রোকেয়া তাঁর পানের বাটা খোঁজেন। আজকাল মনের ভুলে কোথাকার জিনিস কোথায় রাখছেন খেয়াল থাকে না। খাট-টেবিল-চেয়ারের নিচে উঁকি দিয়ে তিনি দেখেন – নেই। এক খিলি পান মুখে না দেওয়া অবধি শান্তি নেই। পাড়াগাঁ ছেড়ে পয়লা যে পুরীতে এসে ঠাঁই নিয়েছিলেন, তার পাশের এক ঘরামির সাদাসিধা মিশুক বউয়ের পালস্নায় পড়ে তাঁর পান খাওয়া। একটা দুটো করে আজ অভ্যাসে দাঁড়িয়েছে। কখনো-কখনো মনে হয়, পানের রস পেটে চালান হলে পর তাঁর অকেজো শরীরের কলকব্জা বুঝি চালু হয়ে গেল। নেশা বলে কথা। পানের নাছোড় আসক্তি তিনি আর ছাড়তে পারেননি – ধুর। জমাট বিরক্তি নিয়ে রোকেয়া অস্থির পায়ে পাশের রুমে এসে পান রাখা পিতলের বাটাটা খোঁজেন। মাথার ধার হয়তো পুরো গেছে, নচেৎ নেহাত সাধারণ ঘটনাও আজকাল মনে থাকছে না। ড্রয়িংরুমের ফ্যানের বাতাসে ভেতরের দরজার পর্দাটা উড়ছে। ওপাশের টুকরো-টুকরো হওয়া চড়া স্বর পরিষ্কার রোকেয়ার কানে আসে। – ‘আপনে নেছার সাহেব লিবিয়া কানেকশন রাইখ্যা যান। ডরায়েন না। ওই বালামুসিবত সব বাতাস।’ ডরাবেন না,  আবার বালামুসবিত – বিষয় কী! রোকেয়া পর্দার ফাঁকে চোখ রেখে দেখে – মানুষগুলো উঠে দাঁড়িয়েছে। বুঝি চলে যাবে। জোববাপরা ঢ্যাঙা কিসিমের এক মওলানার হাত নেছারউদ্দিনের ডান হাতের মধ্যে – ‘আরে বেরাদর, অখনো দীনি কামে ইস্তাফা দ্যাই নাই। সেভেনটি ওয়ানে আছিলাম রাজাকার। কুনো লুকাছাপা নাই, সাফ সাফা কতা। অহনো ডেইলি আদাব উদাব পাই। ডরাইয়েন না।’ শুনেই রোকেয়ার নিস্তেজ শরীরে ঝাঁ-ঝিনঝিন শিহরণ বহে যায়। পরমুহূর্তে ভয়ে পিছিয়ে আসেন তিনি। বলে কী – রাজাকার! যে রাজাকারের হাতে তাঁর বড়বু, নতুন দুলাভাই খুন হয়েছিলেন? খুন করে ঘাতকরা আবার লাশ পানিতে ফেলে তাঁদের আজাব দিয়েছিল? এই রাজাকারই তো গাঁয়ের বেড়িবাঁধের ওপর দাঁড় করিয়ে নজন হাটুরে মানুষকে হত্যা করেছিল। বড়বুর বান্ধবী গীতা দিদির আধাবয়সী নিরীহ বাপকে মেরে নদীর চরের কাদায় পুঁতে রেখেছিল। সেই পুরনো দুশমন রাজাকার তাঁর স্বামীর কাছে! সেই একাত্তর থেকে আজ পর্যন্ত অনেক বছর, তা চলিস্নশ পার, নেছারউদ্দিনের লুকোছাপা, এঘাটে-সেঘাটে দূরকূলে ভেড়া, নজরের বাইরে-বাইরে স্থিতির কারণ তাহলে এই। আর সত্যি-সত্যি সে যুদ্ধের মাঠে থাকলে সেই লড়াইয়ে লোক পতনের ময়লাভর্তি পচা ত্যাজ্য ডোবায় নামে কী করে? বহুদিনের জমানো বিলাপে চাপ পড়লে তা বুক ধরে রোকেয়ার তলপেটে নেমে আসে। নিজেকে তিনি আর সামাল দিতে পারেন না। বাথরুমে ঢুকে বেসিনে মুখ নিচু করেন। লালাঝোলে মেশা দুপুরের অজীর্ণ কয়েকটা ভাত দ্রুত বেরিয়ে আসে। গলার কণ্ঠায় টক-টক অস্বস্তি। হঠাৎ মাথার দুপাশে চিকন একটা ব্যথা চিড়িক মেরে উঠলে ঝিম মেরে দাঁড়িয়ে থাকেন তিনি। পরে চোখে-মুখে তিনি পানির ঝাপটা দেন। খোলা ট্যাপ থেকে তোড়ে পানি ঝরছে – ছরছর শব্দ, নাকি রা-জা-কা-র জঘন্য শব্দটা জোর করে ছোট্ট বাথরুমের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ছে! অসম্ভব, রাজাকারকে তিনি দেবেন প্রশ্রয়? বয়সী শরীরের হাড়ের জোড়ে ছনছনিয়ে ওটা তেজ নিয়ে রোকেয়া ড্রয়িংরুমে যেন উড়ে আসেন। – ‘তুমি না মুক্তিযোদ্ধা ছিলে? তাইলে ক্যামনে তোমার কাছেতে রাজাকার আসে? ছিঃ! ওই খুনিডার সঙ্গে তুমি হাত মেলাও?’ সামনের দরজার ছিটকিনি আটকাতে গিয়ে রোকেয়ার তীব্র কঠিন প্রশ্নে আচমকা অভাবনীয় গ্লানিতে নেছারউদ্দিন ঘায়েল হয়ে গেছেন। তাঁর এতদিনের পুরনো চেহারা নিয়ে ঘুরে দাঁড়াবেন কি, শক্ত হয়ে তিনি জমে গেছেন।

সোশ্যাল মিডিয়া

নিউসলেটার