লেখক:

অরিন্দম বসু

পিউদের বাড়ির বেড়ালটা ছেলে কিন্তু ওরা তাকে সোনা মা, লক্ষ্মী মা বলে ডাকে।

এমনিতেই ওদের বাড়িটা আমার ছিটিয়াল মনে হয়। চার বোন। কারো বিয়ে হয়নি। বড় তাপসীদি – ঘুরে-ঘুরে কমিশনে আলতা-সিঁদুর বিক্রি করে। চল্লিশ-বেয়াল্লিশ তো হবেই। মেজ তনিমাদি ছত্রিশ-সাঁইত্রিশ। বাজারে যায়, মুদি সামলায়, রেশন তোলে, কেরোসিন ধরে, রান্না করে। মেজ খেয়ালি তিরিশ-একত্রিশ। অ্যাডহেসিভ তৈরির কারখানায় কাজ করে। পিউ এখন সাতাশ। একদম আমার বয়সী। ওর দেবলীনা নামটা আড়ালে থাকে। একটা ডিটিপি সেন্টারে যায়। সকাল এগারোটা থেকে সন্ধে সাতটা। বাড়িতেও কম্পোজের কাজ করে। এদের মা অনেকদিন আগেই মারা গেছেন। বাবা যে-চাকরিটা করতেন সেখানে পেনশন ছিল না। হতে পারে শুধু মাইনের টাকায় চার-চারটে মেয়ের কোনটাকে পাত্রস্থ করবেন ভাবতে-ভাবতেই তাকে চলে যেতে হয়েছিল। শুধু একটা কাজই তিনি করে যেতে পেরেছেন। কলোনির জমিতে একতলা একটা বাড়ির খাঁচা দাঁড় করিয়ে দিয়ে গেছেন।

বাড়িটার প্লাস্টার জোটেনি। ইটের গায়ে-গায়ে জল, নোনা, শ্যাওলার নানারকম কারিকুরি। কলোনির সরু গলির ভেতরে চারপাশে গায়ে-মুখে রং-মাখা ফ্ল্যাট। তাদের মাঝখানে পিউদের বাড়িটাকে দেখলে মনে হয় সেটা যেন মাটিতে বসে যাচ্ছে দিনকে দিন। তার মধ্যেই আমি লোহার ছোট গেটের আংটা টুং করে খুলে ঢুকি। একফালি জায়গা পেরিয়ে ঘরে ঢোকার দরজা। তার আগে বাঁ দিকে ছাদে ওঠার সিঁড়ি। ডান হাতে আর একটা ঘর আছে। তার দরজা খোলা থাকলে এক-একদিন সন্ধের পর বড়দিকে সেখানে আবছা দেখতে পাওয়া যায়। আবছা, কেননা তখন সে ঘরে একখানা নীল আলো জ্বলে। ভেতরে খালি পায়ে কালো, লম্বা বড়দি চুল খুলে পায়চারি করে। সারাদিন তো ঘুরতে হয়, তার পরেও। বোধহয় অভ্যেস হয়ে গেছে। অথবা ওটা কমিশনের বাইরের হাঁটা। অন্য আরাম আছে। শক্ত চোয়াল, মুখে মেছতার দাগ। শেষেরটা ভেবে নিয়েছি। কারণ একদিনও ওই মহিলাকে দিনের বেলায় দেখিনি।

আমি সোশ্যাল ওয়ার্ক নিয়ে এমএ করেছিলাম। অনেকে শুনে অবাক হয়। এরকম কিছু আছে নাকি? আছে তো নিশ্চয়ই। অনেক যুগ থেকেই আছে। আমি অবাক হই না। তার দৌলতেই তো একটা কাজ পেয়েছি। হেলথ ডিপার্টমেন্টের আন্ডারে। সোশ্যাল ওয়ার্ক নয় অবশ্য। ঠিকা শ্রমিক। চুক্তির চাকরি। এনআরএসে যেতে হয়। সেখানে এইচআইভি, এসটিআইর পেশেন্টদের সাইকোলজিক্যাল কাউন্সিলর আমি। আমার মত আরো তিনজন আছে। এগুলো সরকারি প্রজেক্ট। যতদিন চলে। তবে বন্ধ হবে বলে মনে হয় না। এরকম রোগ তো বাড়ছে – এই ভরসায় আছি।

বরং আমার অন্য একটা ব্যাপার আছে। সেটাকে সোশ্যাল ওয়ার্ক বলা যেতে পারে। ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানোকে তো তাই বলে। আমরা কয়েকজন বন্ধু মিলে একটা লিটল ম্যাগাজিন বের করি। তিন মাসে একবার। এক-এক বিষয়ে এক-একটা সংখ্যা। আগের মতো গল্প, কবিতা, প্রবন্ধের পাঁচফোড়ন মিশিয়ে লিটল ম্যাগাজিন বন্ধ হয়ে গেছে বললেই হয়। এখন সব ইস্যুই স্পেশাল ইস্যু। না হলে পত্রিকা বিক্রি করা যায় না, গুরুত্বও পায় না। আমাদের সংখ্যাগুলো গায়েগতরে খারাপ হয় না। সেসব ম্যাটার কম্পোজ করাতে পিউদের বাড়িতে যেতে হয়। প্রম্নফ আনা আছে, দেখে ফেরানো আছে, পেজ মেকআপ করা আছে। সব মিলিয়ে খাটনি কম নয়। সময়ও লাগে। দুবছর ধরে এ-ই চলছে।

এ ছাড়া আরো একটা ব্যাপার আছে। পিউকে আমার ভালো লাগতে শুরু করেছে। এর আগে একটা প্রেম চটকে গেছে। সেই কলেজে থাকার সময়ে। তারপর কোথাও কিছু ছিল না। এখন সমস্যাটা হল পিউকে আমি কিছু বলে উঠতে পারিনি। সে বুঝতে পারে কিনা তা আবার আমি বুঝতে পারি না। আমার ধারণা, এর মাঝখানে বেড়ালটার কোনো ভূমিকা আছে। সেটা কী, ধরতে পারছি না।

ওদের বাড়ি গেলেই বেড়ালটার সঙ্গে দেখা হয়। আর দেখা হলেই মেজাজ খিঁচড়ে যায়। সাদা বেড়াল। শুধু কোমরের কাছে একটা কালো দাগ আছে। এই এক ইঞ্চি হবে। বেড়ালটা আলতো পায়ে হাঁটে, জিভ দিয়ে থাবা চাটে, গোঁফ নাচায়, চোখ মিটমিট করে দেখে। বাইরে বেরোলে ধমক খেয়ে ভেতরে ঢোকে। বসে থাকলে বেড়ালের লেজ ৎ হয়ে পড়ে থাকে। ? হয় উঠে দাঁড়ালে। আমার নাম জয়জিৎ। সেখানেও ৎ আছে, তবে উলটে দিলে তার কোনো মানে থাকবে না। অথচ বেড়ালটার বেলায় দুটোই ঠিক? জানি লিঙ্গ পরিবর্তনে ওর কোনো হাত নেই। পৃথিবীর তাবৎ বেড়াল একই ভাষায় কথা বলে। হয় মিউ, মিয়াও, নয়তো ম্যাও। বড়জোর ফ্যাঁচ। কাজেই তাকে যেভাবেই ডাকা হোক না কেন, তাতে তার কিছু আসে-যায় না। তবু তার ওই আদুরে ভাব দেখলেই কেমন পিত্তি জ্বলে যায়। মনে হয় সিমেন্টের দেয়ালে কেউ শিরীষ কাগজ ঘষছে। সহ্য হচ্ছে না, তবু দাঁড়িয়ে রয়েছি। আমাদের বাড়িতে বেড়াল-কুকুর-পাখি কিচ্ছু নেই। বাবা, মা, বোন – আমরা কেউই এসব পোষা সহ্য করতে পারি না।

একদিন খোঁচাব বলেই কথাটা তুলেছিলাম। ‘এই ছেলে বেড়ালটাকে তোমরা এরকম ছদ্মবেশ পরিয়ে রেখেছ কেন বল তো?’

পিউ কিবোর্ডে খটাখট শব্দ তুলে হাত চালাচ্ছিল। কম্পিউটারের স্ক্রিনে চোখ। ঝট করে মুখ ঘোরাতেই ঘাড় অবধি চুল দুলে উঠল। সরু গলায় বলল, ‘ছদ্মবেশের কী আছে?’

গোড়ার দিকে ওকে আপনি বলতাম। ও-ও তাই। বছরখানেক ধরে তুমিতে পৌঁছানো গেছে। বললাম, ‘অদ্ভুত তো। ছেলেটাকে বেকার মেয়ে বানিয়ে ডাকবে! লোকে শুনে হাসে না?’

পিউর গলাটা এবার খরখরে হয়ে উঠল। ‘ওকে না রাস্তায় ফেলে দিয়ে গেছিল। তখন এইটুকু। বৃষ্টিতে ভিজে-ভিজে মরেই যেত। মিউ মিউ করে খালি ডাকছিল। কেউ তাকিয়েও দেখেনি। সেজদি তুলে এনেছিল। লোকের কথায় কিছু আসে-যায় না। আমাদের বেড়াল, আমরা যেমন খুশি ডাকব।’

লোকের কথায় যে এরা কান দেয় না তা যদিও আমার জানা হয়ে গেছে। দেবে কী করে। আশপাশের কারো সঙ্গে কথা বলে কিনা তাতেই আমার সন্দেহ আছে। এদের সঙ্গেও কেউ মেশে না। হয়তো কলোনিতে যখন বাড়িগুলো ছিল তখন কিছু ছিল। এখন তো সেগুলোর বেশিরভাগই প্রমোশন পেয়ে ফ্ল্যাট হয়ে গেছে। এরা ফেল করা পার্টি। এই দুবছরে আমি যতবার এসেছি, তখন অন্তত কাউকে পিউদের বাড়িতে আসতে দেখিনি। ওরাও কোথাও গেছে বলে জানি না। বেড়ালটাকে বাদ দিলে আমিই একমাত্র বাইরের লোক এবং পুরুষ, যে এখানে আসে। এদের কি কোনো আত্মীয়স্বজন নেই? তাদের এরা ত্যাগ করেছে, নাকি তারা এদের? চারজনের কেউ কখনো প্রেম করেনি? কোনো ছেলে প্রেমে পড়েনি এদের? এ এক রহস্য।

তবে মাঝে-মাঝে খেয়ালিকে দেখে মনে হয় আমি বোধহয় ভুল ভাবি। পিউ আর তনিমাদি ফর্সা। বড়দিকে তো নীল আলোয় কালোই দেখি। টিউবের আলোতেও খেয়ালি শ্যামলা। সে খুব সাজে। মাশকারা, লিপস্টিক, নেলপলিশ, ঝুমকো দুল নিয়ে স্টিলের আলমারির গায়ে লাগানো লম্বাটে আয়নার সামনে দাঁড়ায়। আমি পিউর পাশে চেয়ার থেকেই দেখতে পাই। সেও আয়না থেকেই চোখ নাচিয়ে বলে, ‘কী, আজ আপনাদের কতক্ষণ চলবে?’

আমি বলি, ‘আপনি কোথায় চললেন?’

‘এই যে, পাশেই বিবেকানন্দ মেলা হচ্ছে, সেখানেই যাচ্ছি। কেন, আপনি যাবেন নাকি?’

বললাম, ‘মেলায় আর যাব কী করে। কাজ নিয়ে বসেছি তো।’

‘সেই ভালো। আপনি কাজই করুন। না হলে পিউ আবার রেগে যাবে। গিয়েই বা কী হবে! কিছু নেই।’

‘আপনি যাচ্ছেন যে!’

‘আমার তো শুধু-শুধু ঘুরতেও মজা লাগে। পাড়ার দু-চারটে মেয়ে আছে, তারাও আমারই মতো। তাদের সঙ্গে যাই।’ বলতে-বলতে সে হেসে ওঠে। নিজেকে দেখা শেষ করে ঘুরে দাঁড়িয়ে শোকেসের ওপর থেকে পার্স নেয়। ঘরে চেয়ার ছাড়াও একটা বড় আর ছোট সোফা আছে। ছোটটায় সামনের দু-পা গুটিয়ে আর পেছনের পা-দুটো ছড়িয়ে আয়েশে বসে রয়েছে বেড়ালটা। খেয়ালি ঝুঁকে পড়ে তার মাথায় নাক ঘষে। ‘লক্ষ্মী হয়ে থাকবে, দুষ্টুমি করবে না, ছোটর কথা শুনবে, বুঝতে পেরেছ।’

ছোট মানে পিউ। সে একবারও তার সেজদির দিকে তাকায় না। আমি দেখতে পাই সোজা হয়ে দাঁড়ানোর পর খেয়ালির কামিজ পেছনের খাঁজে ঢুকে গেছে। সে টেনে ঠিক করে নেয়। তারপর চোখে চোখ রেখে হেসে বলে, ‘আসি।’

মেজ তনিমাদি বড় সোফাটায় রোগা পা মেলে হেলান দিয়ে রয়েছে। হাতকাটা নাইটি ছাড়া অন্য কিছুতে তাকে দেখিনি কখনো। আমি পিউর সঙ্গে কাজ করতে বসলে সেও এসে বসে। আগে প্রায়ই বলত, ‘এ বাবা, আপনার দিকে পা করে বসছি, মনে করবেন না যেন।’

আমাকে বলতে হত, ‘না না, ঠিক আছে।’ এখন তনিমাদি পা মেলে দিলে কিছুদূর অবধি লোম দেখতে পাই। মনে হয় সবসময় যেন ভিজে জড়িয়ে রয়েছে। নাইটি গায়ে লেপটে থাকে বলে বোঝা যায় পেটের জায়গাটা উঁচু, বুকদুটো ডেবে গেছে।

পা ছাড়া আরো একটা ব্যাপারে কথা বলে তনিমাদি। মাঝে-মাঝেই উঠে রান্নাঘরে যায়। কলঘরেও। ফিরে এসেই বলে, ‘আমাদের বাড়িতে টিভি নেই। সময় কাটতেই চায় না। কী মুশকিল বলুন তো। শুধু বাজার করতে আর রান্না করতে ভালো লাগে, বলুন?’

পিউ তখনো খটাখট। তার মধ্যেই বলল, ‘তুই টাকা দে না, তাহলেই টিভি হয়।’

মেজদি সোফায় বসে পড়ে। ‘আমার টাকা থাকলে তোদের বলতাম নাকি! কবেই কিনে ফেলতাম। আমার তো আর তোমাদের মত রোজগার নেই। সেজন্যই বাড়িতে খেটে মরছি।’ বলতে-বলতে আমার দিকে তাকিয়ে হাসে। ‘টিভি থাকলে কি আমি একা দেখব? সবাই তো দেখবে, বলুন।’

আমি পিউকে বললাম, ‘টিভি ছাড়া বাড়ি এই তোমাদেরটাই দেখি। কিনতে পার তো একটা।’

পিউ সেই কম্পিউটারেই চোখ রেখে বলল, ‘আমাদের টাকা নেই, টিভির কোনো দরকারও নেই। যথেষ্ট ভালো আছি। ফালতু সব সিরিয়াল হয় আর যত খুনোখুনির খবর। ওই মেজদিটাই খালি  বলে। তোর ইচ্ছে হলে অন্য কোথাও গিয়ে দেখে আয় না।’

তনিমাদি সঙ্গে-সঙ্গে মুখ বেঁকায়। ‘বাবা, রক্ষে করো। কোথায় যাব? কারো সঙ্গে কথা বলা যায় নাকি! দিনরাত খালি পরের মুখের ঝাল খাচ্ছে আর পরের নিন্দেমন্দ করছে।’

‘তাহলে চুপ করে বসে থাক। কাজে ডিস্টার্ব করিস না।’

মেজদি বসে থাকে না। চুপচাপ উঠে চলে যায় পাশের ঘরে। তখন বেড়ালটা ছোট সোফাটা থেকে নেমে বড়টায় উঠে আসে। তার পর টেবিলে। শেষে টুক করে ছোট্ট আর একটা লাফে একেবারে কম্পিউটারের ওপরে। তার লেজটা এসে দুলতে থাকে স্ক্রিনের মাঝ-বরাবর।

পিউ বলে, ‘এই পেজ দুটোয় কার হাতের লেখার স্ক্যান যাবে বললে, জায়গা ছেড়ে রেখেছি, দেখে নাও।’

একটা বেড়াল তার লোমওয়ালা পুরুষ্টু লেজ ঝুলিয়ে বসে রয়েছে স্ক্রিন আড়াল করে। তার মধ্যে পিউর ওই কথা। রেগে উঠে বললাম, ‘কী করে দেখব? এভাবে দেখা যায়! ওকে সরাও।’

পিউ বলল, ‘সরাতে হবে কেন? আগে ও এখানে বসত না। এখন মাঝে-মাঝেই বসে। আমার তো কাজের কোনো অসুবিধে হয় না। তুমি দ্যাখো, ঠিক দেখা যাবে। ওকে এখন নামানো যাবে না। ও আমার কাছাকাছি থাকবে বলে এখানে এসেছে।’

আমার রাগ বেড়ে যায়। ‘সারাদিন তো তোমাদের সঙ্গেই রয়েছে। তারপর আবার এত কাছাকাছি থাকার কী আছে।’ পিউ আবার চুল ঝামরে আমার দিকে তাকায়। বড়-বড় চোখ ছোট-ছোট করে এনে বলে, ‘তাতে তোমার কী সমস্যা হচ্ছে?’

বেড়ালটার দিকে তাকাই। সেও চোখ কুঁচকে রেখেছে। ভাবখানা এমন – সবকিছুই খুব উপভোগ্য। পিউর দুটো ঠোঁটই বেশ পুরু, কথা বলার সময় যেন ভিজে ওঠে। খেয়ালি তো নাক ঘষল। পিউ কি ওই ঠোঁট ঘষে বেড়ালের গায়ে? গা পাকাচ্ছে বলে আমি তাড়াতাড়ি কম্পিউটারে দেখি। বেড়ালটার লেজের বাঁ দিকের লেখাগুলো পড়ি। তারপর ডানদিকের। ৎ-এর মাপে জায়গাটা বাকি থেকে যায়।

তনিমাদি চা নিয়ে এসেছে। পেস্নটে দুটো বিস্কুট। টেবিলে রেখে বলে, ‘অফিস থেকে বাড়ি গিয়েছিলেন, নাকি সোজা এখানে? নিন, চা খান।’

আমি চা কাপ পেস্নট বিস্কুট সব আড়চোখে কিন্তু খুঁটিয়ে দেখতে থাকি। যতদিন এরকম দিয়েছে ততদিনই না দেখে পারিনি। তার পরেও সন্দেহ যায় না। বেড়ালটা তো যত্রতত্র ঘুরে বেড়ায়।

পিউ বলে, ‘সেই আবার দেখছ! বলেছি না, আমার সোনা মায়ের গা থেকে একটুও লোম ঝরে না। ওকে আমরা সবসময় পরিষ্কার রাখি। ব্রাশ দিয়ে লোম আঁচড়ে দেওয়া হয়, দাঁতও মাজানো হয় মাঝে-মাঝেই।’

ভাবলাম বলি – সোফায় তাহলে অত লোম পড়ে থাকে কেন? আর বেড়ালকে দাঁত মাজানোর আদিখ্যেতাই বা কীসের? যতই যা কর, মানুষ তো আর হবে না রে বাবা।

এসব না বলতে পেরে বললাম, ‘তোমার দিদি বন্ধুদের সঙ্গে মেলায় গেল। তোমার বন্ধু নেই? দেখিনি তো কোনোদিন।’

তনিমাদি চলে গেছে। পিউ টেবিলের ডানদিকে প্রিন্টারের পাশে কীসব কাগজ ঘাঁটাঘাঁটি করছিল। মুখ না ফিরিয়েই বলল, ‘না, আমার বন্ধু নেই। আর সেজদিও বন্ধুদের সঙ্গে যায়নি। ও প্রেম করতে গেছে।’

আমি চমকিত। এ-বাড়িতে প্রেম! পিউর সাড়াশব্দ পাই না বলে ওরটা আমি আদ্ধেক বলে ধরে নিয়েছি। খেয়ালি একটা গোটা প্রেম চালাচ্ছে! কার সঙ্গে?

পাশেই ওদের রান্নাঘর আর বাথরুম। আড়াল করে পর্দা ঝোলানো। সেদিকে দেখে নিয়ে পিউ বলল, ‘জানি না। ওর অনেক আছে। যেখানে কাজ করে সেখানে। পাড়াতেও। তাদের টাকায় খায়, জিনিস কেনে, ঘোরে।’

‘বিয়ে করবে না?’

‘না। ও শুধু মজা নিতে যায়। প্রেম করলেই বিয়ে করতে হবে? এ-বাড়িতে কারো বিয়ে হবে না কোনোদিন।’

আমার বাকি কথাটা চায়ের ঢোকের সঙ্গে গিলে ফেলি। তাকিয়ে দেখি বেড়ালটা এখন চোখ খুলে আমাকেই দেখছে। পাখার হাওয়ায় ফুরফুর করছে ওর কয়েকটা গোঁফ। ইচ্ছে করছে ঘেটি ধরে ফেলে দিই। কিন্তু সেরকম কিছুই করা যাবে না।

আরো একদিন ওদের বাড়ি গিয়ে দেখি সবাই খুব চিন্তিত। কোথাও চোট লাগেনি তবু বেড়ালটা পা টেনে-টেনে হাঁটছে, তাই। সেই চিন্তার চোটে সেদিন আমার কাজ লাটে উঠল। পিউ আর খেয়ালি বেড়াল নিয়ে চলল ডাক্তারের কাছে। পরে জানলাম ওর কৃমি হয়েছিল। এ জন্য যে পিউকে কথা শোনাব তার উপায় নেই। আমার কৃমি নেই কিন্তু অন্য দুর্বলতা রয়েছে।

হাসপাতালে কাজের মধ্যেও পিউর কথাটা আমার মাথায় ঘোরে। তিন দিদির না হয় বিয়ে হয়নি, হবেও না। পিউ কি আলাদা হয়ে উঠতে পারে না? ওদের ঘরের দেয়ালে বাবা-মায়ের ছবি টাঙানো। তারা বেঁচে থাকলে কী হত কে জানে। সামনে পেশেন্ট বসে। এইচআইভি  পজিটিভ ধরা পড়েছে। সি-ডি-ফোর কাউন্ট এখনো দুশোর নিচে নামেনি। এইডস বলা যাবে না। তার কাউন্সেলিংয়ে মন দেওয়ার চেষ্টা করি। এরকম তো কতজনকে বোঝাই। পিউরও মনে হয় কাউন্সেলিংয়ের দরকার। যাঃ, কীসের সঙ্গে কী! তবে বেড়ালকে ভালবাসা কোনো অসুখ না হতে পারে কিন্তু মানুষকে ভালবাসতে না পারাটা অসুখ। ওরা কি সিজোফ্রেনিক? কোনো একটা মেডিক্যাল জার্নালে পড়েছিলাম – সবসময় বেড়ালের সঙ্গে থাকলে ওরকম হয়ে যেতেও পারে। বাড়ির বেড়ালের সঙ্গে মিশলে সিজোফ্রেনিয়া হয়? কতটা মেশে ওরা? ওই বেড়ালটা কারো সঙ্গে প্রেম করে না? ওরা যতই মেয়ে বলুক, আসলে তো ছেলে। হুলো। কোনো মেনি নেই ওর?

একদিন দেখতে পেলাম – আছে। সেদিন পিউদের বাড়িতে ঢোকার মুখেই দাঁড়িয়ে যেতে হয়েছিল। পিউ, তনিমাদি আর খেয়ালি গেটের বাইরে। ভেতরের অন্ধকার মতো জায়গাটায় মিশে রয়েছে তাপসীদি। উলটো দিকের ফ্ল্যাটের পাঁচিলের ওপর মুখোমুখি দুটো বেড়াল সামনের পা বাড়িয়ে দিয়েও থমকে।

পিউ আঙুল তুলে চাঁছা গলায় বলল, ‘তুমি যাবে না কিন্তু বলছি, নেমে এস, এক্ষুনি চলে এস ঘরে।’

খেয়ালিও বলল, ‘বদমাইশি করিস না, আয়, চলে আয়। কথা শোন।’

আমি এই স্থিরচিত্র ভেঙে একটু এগিয়ে তনিমাদির কাছে জানতে চাইলাম, ‘কী হয়েছে?’

সে নাঁকিসুরে বলে উঠল, ‘দেখুন না, ওই মেনিটা কীরকম করছে। ডাইনি একটা। ভুলিয়ে-ভালিয়ে আমাদেরটাকে নিয়ে যেতে চায়। কয়েকদিন ধরেই দেখছি, ছোঁক-ছোঁক করছে আশপাশে। সুর করে করে ডাকে আবার।’

খেয়ালি বলল, ‘আমাদেরটাও তেমন। দরজা বন্ধ করে রাখছি, সেখানে আঁচড়াচ্ছে, লাফঝাঁপ দিচ্ছে। তোকে বলেছিলাম মেজদি, জানালা খুলে রাখিস না। সেই বেরিয়ে গেল। সারাদিন বাড়িতে থাকিস, এটুকু খেয়াল রাখতে পারিস না!’

তনিমাদি আরো নাঁকি গলায় বলল, ‘কী করব, বেশিক্ষণ সব বন্ধ থাকলে হাঁফ ধরে, শরীর গরম হয়ে যায়।’

‘জানি না বাবা, কী এত গরম। আমাদের শরীর নেই নাকি!’

 

এবার বড়দির গলা পেলাম। ‘ওটাকে তাড়া। ঢিল মেরে তাড়া। না হলে এ চলে যাবে ওর সঙ্গে।’

আমি মেনিটার দিকে তাকালাম। সেও আমাকে দেখছে। গলির হলুদ আলো আর ফ্ল্যাটবাড়ির ছায়ায় চোখদুটো ছাড়ানো আঁশফলের মতো টসটসে। এখানে আমিই একমাত্র নিরপেক্ষ। ও কি বুঝতে পেরেছে?

এর মধ্যে খেয়ালি রাস্তা থেকে ইটের ছোট টুকরো কুড়িয়ে হাত উঁচু করে বলল, ‘এই যাঃ, হুশ, যাঃ’।

পিউ পা ঠুকে ধপ করে শব্দ করতেই মেনিটা কেঁপে উঠে উলটোদিকে ঘুরে গেল। তারপর পাঁচিলের ওপর দিয়েই ছুটে লাফ দিয়ে চলে গেল কোথায়। পিউদের বেড়ালটাও নেমে এল টুপ করে। ওদের পায়ের ফাঁক গলে সুড়ুৎ করে ঢুকে পড়ল বাড়িতে।

বাকি তিনজনও চলে গেল বেড়ালের সঙ্গে-সঙ্গেই। পিউ বলল, ‘এস ভেতরে।’

আমি বললাম, ‘একটা ন্যাচারাল ব্যাপারকে এরকমভাবে আটকানো যায়?’

মুখ নামিয়ে নিল পিউ। গেটের আংটা ফেলল। তার পর সেভাবেই বলল, ‘গত বছরও তিনটেকে তাড়িয়েছি। কিচ্ছু হয়নি। এবার এটা খুব জ্বালাচ্ছে। যার-তার সঙ্গে মিশতে দেব নাকি ওকে?’

হেসে ফেললাম আমি। ‘ওর ব্যাপারটা ওকে বুঝতে দাও না। একদিন না একদিন যাবেই।’

কথাটা বলার সময় মনে হল, কবে যে যাবে! কিন্তু পিউ গোঁজ হয়ে বলল, ‘উঃ, যেতে দিলে তো। আমরা আদর দিই না ওকে!’

কথাটা ফেলে রেখে পিউ চলে যাচ্ছিল। আমার পা আটকে গেল। কী আদর দেয় ওরা ছেলে বেড়ালটাকে ধরে রাখার জন্য? গোলমাল আছে কিছু একটা।

ভেতরে ঢুকতে না ঢুকতেই দেখি বেড়ালটা এসে পিউর পায়ে মুখ ঘষছে। খেয়ালি বলল, ‘আমাদের কাছেও এসেছিল। একেবারে তোল্লাই দিবি না। ছেলেগুলো সব এরকমই হয়। শয়তান
এক-একটা।’

পিউ বলল, ‘যাও সর, আর ঢং করতে হবে না। একদম অসভ্য হয়ে গেছ তুমি।’

এসব বলার পরেও দেখলাম সে পিউদের পায়ে-পায়ে ঘুরতে লাগল। তার ৎ এখন উলটো হয়ে উঁচুতে ওঠে ? হয়ে এপাশ-ওপাশ করছে। নাকি ? হয়ে গেছে ৎ। সোজা-উলটোর খেলা। কিছুতেই বোঝা যায় না। তার মুখে মিয়াও।

একটু পরেই পিউ তাকে বুকের কাছে তুলে নিয়ে হাত বুলোতে থাকল। তার পর নামিয়ে দিতেই বোঁ করে ছুটে গেল বেড়ালটা। রান্নাঘরের দিক দিয়ে এবার বোধহয় বড়দির ঘরে চরণধুলার তলে। ম্যানেজ মাস্টার। সেয়ানা চিজ।

এই সংখ্যার ফাইনাল প্রম্নফ দেখা হয়ে গেছে। আজ ট্রেসিং নিয়ে কাল প্রেসে ছাপতে দিয়ে দেব। পরেরটার ম্যাটার দিতে দেরি আছে। আমি চেয়ার টেনে বসে খেয়ালিকে বললাম, ‘ছেলেদের ওপর আপনাদের খুব রাগ দেখছি।’

‘রাগই তো। একেবারে সহ্য হয় না।’

‘আমিও তো ছেলে।’

গলার ভেতরে কীরকম গুবগুব শব্দ করে উঠল খেয়ালি। যেন হাসিটা বাইরে আসতে দিতে চাইছে না। ‘আপনাকে আমরা ছেলে বলে মনেই করি না।’

আমি থম মেরে গেলাম। পিউ, তনিমাদিও তো কিছু বলল না। মনে পড়ে গেল – ম্যাগাজিনের আগের সংখ্যাটায় খুব তাড়া পড়েছিল। ম্যাটার পেতে-পেতে দেরি হয়েছিল সেবার। শেষের দিকে পিউকে বললাম, ‘একদিন যদি সকালে আসি, অসুবিধে হবে তোমার?’

পিউ বলল, ‘আমায় তো সাড়ে দশটায় বেরিয়ে যেতে হয়। সকাল আটটায় আসতে পারবে?’

এসেছিলাম। পিউ দরজা খুলল। একটু আগে উঠে মুখ ধুয়েছে বোঝা যাচ্ছে। কানের পাশে ভিজে চুল জড়িয়ে। সুন্দর দেখাচ্ছিল।

ভেতরে ঢুকলাম। দুটো জানালা খোলা তবু তাতে তেমন আলো নেই ঘরে। দেখি মেঝেয় পাতা বিছানা। এখান থেকেই উঠে এসেছে পিউ। এখনো শুয়ে তনিমাদি ও খেয়ালি। তনিমাদি পাশ ফিরে। নাইটি উঠে গিয়ে থেমেছে হাঁটুর খানিক নিচে। খেয়ালি চিত হয়ে। এক হাত বুকের ওপর, অন্যটা মাথার পাশে বালিশে। পরিষ্কার কামানো বগল। দুজনের মাঝখানে গুটিসুটি হয়ে ঘুমোচ্ছে বেড়ালটা। খুব পেচ্ছাপ পেয়ে গেল আমার। পিউকে বললাম, ‘বাথরুমে যাওয়া যাবে?’

‘যাবে। খেয়াল করে এস।’

দুই ঘুমন্ত নারীকে সাবধানে পা ফেলে-ফেলে টপকাতে হল। পিউ চা করছিল। বাথরুমের টিনের দরজা ভেজিয়ে এসে বললাম, ‘সবাই এত বেলা অবধি ঘুমোচ্ছে! কেউ বেরোবে না?’

পিউ সাদামাঠা গলায় বলল, ‘আমাদের রান্না শেষ হয় এগারোটায়। খেতে-খেতে বারোটা-সাড়ে বারোটা বাজে। ঘুমোতে যাই একটায়। সকালে সবাই দেরি করে ওঠে। বড়দিও।’

বুঝেছিলাম এ-বাড়িতে কোনো ছেলে নেই বলে মেয়েরা নিজেদের মতো করে রুটিন বানিয়ে নিয়েছে। কিছুতেই এদের আসে-যায় না।

ফিরে ঘুরে ঢুকতেই খেয়ালির গলা পেয়েছিলাম। ‘আপনি কিন্তু পিউকে ভীষণ জ্বালাচ্ছেন। আমাদেরও।’ বলতে-বলতে সে চোখ বুজেই ফিচ করে হেসে পাশ ফিরল। তার মানে জেগেই ছিল। তখন পা সরাল না তো!

আমাকে ছেলে বলে মনে করে না বলেই ওরা সেদিন ওরকম করেছিল? তাহলে পিউ কী ভাবে তা জানতেই হবে। এ-বাড়ির একটা মেয়েকে বের করে নিয়ে যাওয়া সোশ্যাল ওয়ার্কে এমএ করার চেয়ে কম সোশ্যাল ওয়ার্ক হবে না।

মাঝখানে আমাদের একটা স্পেশাল ট্রেনিং শুরু হল হাসপাতালে। আমার বাকি বন্ধুদের কেউ পিউদের বাড়ি যায় না। সেখানকার কাজটা আমার ওপরেই ফেলে রেখেছিল ওরা। তিন সপ্তাহ পরে গেলাম আবার। গিয়ে অবাক। বাইরের গেটটা খোলা কিন্তু ভেতরে পুরো অন্ধকার। মোবাইলের টর্চ জ্বেলে দেখলাম ঘরের দরজায় তালা। চারজনেই একসঙ্গে কোথায় গেল এরা? আমি তো আজ সকালেও ফোন করে বলে দিয়েছিলাম আসব।

বেরিয়ে এসে আবার গেট খুলতে যাব, পাঁচিলের গা ঘেঁষে একচিলতে জায়গায় বসানো মিটার ঘরের ওপরে ঝুপ করে লাফ দিয়ে পড়ল বেড়ালটা। চমকে উঠেছিলাম। তারপর বুঝলাম জানলার সানশেড থেকে লাফিয়ে নেমেছে। ওরা কি একে বাড়ির বাইরে ছেড়ে রেখে গেছে? ব্যাপারটা কী?

ঠিক তখনই বেড়ালটা তিন পায়ের ভরে সোজা হয়ে বসে এক পায়ের থাবা তুলে মুখটা মুছল। তারপর এক চোখ মটকে ফ্যাঁসফেঁসে গলায় আমাকে বলল, ‘বাড়ি চললে নাকি জয়জিৎ?’

আমি অবাক হয়ে গিয়ে নড়তেই পারছিলাম না আর। অনেকদিন থেকেই মনে হচ্ছিল কোথাও একটা গোলমাল আছে; কিন্তু এ-বেড়াল যে কথা বলতে পারে তা ভাবিনি। গলি দিয়ে রিকশা যাচ্ছে, দু-একজন হেঁটেও গেল, সামনের ফ্ল্যাট থেকে টিভির আওয়াজ আসছে। তার মধ্যে একটা বেড়াল আমার চোখের সামনে কথা বলবে!

সে তখন আবার বলল, ‘বাথরুমে পড়ে গিয়ে তনিমার পা ভেঙে গেছে। ওরা সবাই ডাক্তারের কাছে গেল।’ আমি বলে ফেললাম, ‘তুমি বাইরে ঘুরছ কী করে?’

বেড়ালটা আবার  নিঃশব্দে লাফ দিয়ে মিটার ঘরের ওপর থেকে মাটিতে পড়ল। আমি সরে দাঁড়ালাম। সে বলল, ‘এখানে আমার সঙ্গে কথা বললে লোকে তোমাকে পাগল মনে করবে। চল, ভেতরে চল। ওখানে কেউ আমাদের দেখতে পাবে না।’

ধীর পায়ে হেঁটে সে এগিয়ে যাচ্ছিল। আমিও তার সঙ্গে-সঙ্গে অন্ধকারে ঢুকে পড়লাম। সাদা বলে তাকে সেখানেও দেখতে পাচ্ছিলাম। শুধু কোমরের কাছে কালো দাগটা মিশে গেছে কালোয়।

আমি দরজার সামনে বসে পড়েছি। বেড়ালটা ছাদে ওঠার সিঁড়ির কয়েক ধাপ বেয়ে উঠে সেখানেই বসে বলল, ‘আমাকে ওরা ঘরেই আটকে রেখে গেছিল। কিন্তু তাই কখনো পারে! একটা জানালার পাল্লা নড়বড়ে। ওরা জানে না। সেখান দিয়েই গলে বেরিয়ে এসেছি।’

আমি বললাম, ‘তোমরা এরকম পার, না?’

‘হ্যাঁ।’ আবার থাবা দিয়ে মুখ মুছল সে। ‘আমাদের তো কলারবোন বলে কিছু নেই। শিরদাঁড়াও ইচ্ছেমত বাঁকানো যায়। আমরা ওরকম পারি। এই তো রাস্তার ধারে মাছের কাঁটাফাটা খেয়ে ছাদে উঠে খানিকটা ঘুরে নিয়ে সানশেডে নামলাম। তার পর তোমার কাছে। তা তুমি চলে যাচ্ছিলে কেন? পিউকে ফোন করতে পারতে।’

কথাটা আমার কানে গেলেও আমি সেদিকে গেলাম না। বললাম, ‘তুমি রাস্তার জিনিস খেয়ে এলে! ওরা তো তোমার জন্য বাজার থেকে আলাদা করে মাছ কিনে আনে।’

‘জানি-জানি। কিন্তু সবসময় এক জিনিস খেতে ইচ্ছে করে? তোমরাও তো হোটেলে গিয়ে খাও। সবাই স্বাদ বদলে নিতে চায়। না হলে একঘেয়ে হয়ে যাবে না!’ বলেই ফ্যাঁচ করে যেন হাসল বেড়ালটা।

‘ওরা তোমাকে খুব ভালবাসে।’

‘তাও জানি। সেজন্য যে তোমার গায়ে ছ্যাঁকা লাগে সেটাও জানা আছে।’

কথাটা শুনে ঘাবড়ে গিয়ে বললাম, ‘না, ঠিক তা নয়। আসলে -।’

সে আমাকে মাঝপথে থামিয়ে বলল, ‘ওরা আমায় শুধুই একটা বেড়াল ভাবে বলে মনে কর?’

আরও অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকি। ওর চোখ দুটো জ্বলজ্বল করছে। বেড়ালটা বলল, ‘তনিমা দুপুরবেলা বাথরুমের দরজা খুলে রেখে আমার সামনে চান করে, বলে – কোত্থাও যাবে না, সব দ্যাখো তুমি। তনিমা সাবান মাখে, জল ঢালে, গা মোছে, চুল ঝাড়ে, তার পর নাইটি গলিয়ে নেয়। জল ছিটলে ভাল লাগে না বলে আমি একটু দূরে বসে দেখি। তনিমা খুব রোগা। পুষ্টি নেই। তাপসী তো সকালে তাড়াতাড়ি বেরিয়ে যায়। সন্ধেবেলায় যখন ফেরে তখন সেও ওর ঘরে আমার সামনেই শাড়ি ছাড়ে। শায়ার দড়ি আলগা করে পাখার নিচে বসে থাকে। শক্ত করে কষি বেঁধে-বেঁধে ওর কোমরে দাগ ধরে গেছে কবে। ও ব্লাউজও খুলে ফেলে একসময়। দুদিকে দুটো দরজা বন্ধ করে সব খুলে ঘরের ভেতরে হাঁটে। তুমি বাইরে যা দেখেছ তা তো কিছুই নয়। আমি খাটে বসে-বসে দেখি। তখন অন্ধকার থাকে কিন্তু তাপসী জানে আমি তাতেও দেখতে পাই।’

আমার গলা শুকনো হয়ে যাচ্ছে। তবু বললাম, ‘পিউ? তাকেও কি তুমি দেখেছ?’

‘দেখেছি। পিউ কাজ থেকে ফিরে গা ধুতে যায়। সালোয়ার-কামিজ বাথরুমে ছেড়ে ব্রা আর প্যান্টি পরে বেরিয়ে আসে। বাড়িতে যে-জামাটা পরবে সেটা নিয়ে ঢুকতে পারে, আগে তাই করত – এখন বাইরের হুকে ঝুলিয়ে রাখে। ওসব পরতে-পরতে বলে –  অ্যাই, ওদিকে তাকাও। আমি চোখ সরাই না। কেন সরাব! পিউ তো তবু বলে। খেয়ালি কিছুই বলে না। হুক খুলে ব্রা ফেলে দিয়ে আমায় কোলে নেয়। আরামে বসে থাকি। সববাইকে আমি খালি গায়ে দেখেছি। ওদের মধ্যে বেশি সুন্দর ওই খেয়ালি। পিউ তত কিছু নয়। তুমি তো প্রেমটা খেয়ালির সঙ্গে করতে পারতে।’

আমি ঝট করে উঠে দাঁড়ালাম। ‘তুমি বাজে কথা বলছ। ওরা তোমার বাইরে গিয়ে মেশা আটকেছে বলে বানিয়ে বলে চলেছ।’

বেড়ালটা আবার হাসছে মনে হল। ‘কে বলল আটকেছে?  তনিমা যখন দুপুরে ঘুমোয় তখন আমি বেরিয়ে যাই ওই জানালা গলে। আবার পাঁচটার আগে ফিরে আসি। আমার কাজ আমি ঠিক সেরে নিয়েছি। শোন, ওরা আমায় একটা ছেলে ভাবে। ভাবে দখল করে রেখেছে। তাতে ক্ষতি কিছু নেই। আমিও এ-জায়গা থেকে কোথাও নড়ছি না। ওদের দেখতে আমারও ভাল লাগে। এক-একজন এক-একরকম। বেশ ব্যাপারটা। বানিয়ে বলছি কিনা পরখ করে দেখতে চাও? রোববার সন্ধেয় এস। ওই দরজাটার যেখানে তালা ঝুলছে তার ঠিক ওপরেই একটা ফুটো আছে। আমি জানি আর তুমি জানলে। এসে চোখ রেখ। কিন্তু পায়ের শব্দ যেন না থাকে। আসবে বেড়াল হয়ে।’

রোববার সন্ধেবেলা আমি পিউদের বাড়ির সামনে এসে দাঁড়ালাম। গেটের আংটা এমন সাবধানে খুলতে হবে যাতে আওয়াজ না হয়। খুলেও ফেললাম সেভাবে। চুপিসারে অন্ধকার জায়গাটা পেরোলাম। হোঁচট না খেয়ে সিঁড়ির ধাপে উঠে দরজার কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম। তারপর হাঁটু ভাঁজ করে গোড়ালিতে ভর দিয়ে বসলাম। হ্যাঁ, দরজার হুড়কোটার ওপরে একটা ফুটো আছে তো সত্যি। ভেতর থেকে কোনো শব্দ আসছে না কিন্তু আলো আসছে। চোখ রাখলাম।

চারজনই ঘরের মেঝেয় পা ছড়িয়ে বসে। একেবারে ডানদিকে তনিমাদি। ডান পায়ে গাবদা প্লাস্টার। তাপসীদির লম্বা চুল পিঠের খানিকটা ঢেকে রেখেছে। বাকিদের খোলা পিঠ শুধু নয়, কারো গায়েই কিছু নেই। ওদের হাত নড়াচড়া করছে। মিয়াও। বেড়ালটাকে আদর করছে ওরা। সে এক কোল থেকে আর একজনের কোলে চলে যাচ্ছে। মিয়াও। ঘষা লেগে ওদের বুক দুলে উঠছে নিশ্চয়ই। ঊরুতে বেড়ালের থাবা বসে যাচ্ছে। মিয়াও। ওদের নাভিতে বেড়ালের গোঁফ সুড়সুড়ি দিচ্ছে। মিয়াও। এত মিয়াও কেন? ও, এ তো বেড়াল ডাকছে না। ওরাই ডাকছে।

এর মধ্যেই খেয়ালির কোল থেকে বেড়ালটা মেঝেয় নেমে পড়ল। সেখানে একটুও না নড়ে সোজা তাকাল এই ফুটোটার দিকে। তারপর ঠিক মিচকে হাসির ভঙ্গিতে আওয়াজ করল – মিয়াও।

আমি ঘামছি না কিন্তু খুব তাত লাগছে। চোখ সরিয়ে নেব কিনা ভাবছিলাম। তখনই দেখতে পেলাম ওদের চারজনেরই কোমরের শেষ ভাঁজের নিচে একটা করে কালো দাগ। মাপে এক ইঞ্চি মতোই হবে, জানি।

সরিয়েই নিলাম চোখ। আর দেখার কী আছে। এদিক-ওদিক আজকের সন্ধেবেলা কত উজ্জ্বল, ঝলমলে। অথচ বাড়িটার গায়ে লেপটে আছে অন্ধকার। আমার ওপরে এসে পড়েছে ছায়া। এখন কেউ হেঁটে যাচ্ছে না এই গলিপথে। এই বাড়ি একটা ৎ। না কি? জানি না। শুধু জানি এখানে আমার কোনো জায়গা নেই। আমি বেড়াল-পায়ে হেঁটে সরে যেতে থাকি। r

শেয়ার করুন

Leave a Reply