মাজাম ওস্তাগারের পোলা

লেখক:

মাহবুব রেজা

আমি মোজাম ওস্তাগারের পোলা। আমার দাদায় আছিল ঢাকা শহরের সেরা ওস্তাগার গো মইদ্যে এক লম্বর। হের নাম হুরমত। হুরমত ওস্তাগার। হের নাম হুনে নাই পুরান ঢাকায় এমন আদম খুঁইজা পাওন যাইব না। বেকতে অই হেরে চিনে-জানে। খুব নাম-ডাক আছিল হের। আমার দাদারা চাইর-পাঁচ পুরুষ ধইরা ওস্তাগারির কাম করে। আদি ঢাকার বহুত দালাল-বাড়ি হেগো হাত দিয়া হইছে। ঢাকার বাইরেও বহুত নকশাদার জমিদারবাড়ি হেরা বানাইছে। আমার বড় দাদার কাম-কাইজে খুশি হইয়া ইংরাজ সাহেবরা ভি হেগো বাড়িঘর, মোকাম বানানের লাইগা হুরমত ওস্তাগারের পিছনে লাইন লাগাইত। বাত্তি দিয়াও ভি খুঁজত।

একবার তো এক ইংরাজ সাহেব আমার দাদার নকশাদার কাম-কাইজ দেইহা এমুন খুশি হইল যে, দালান বানাইবার লাইগা বাড়তি খরচ-বরচ দিয়া হেরে দিল্লি পর্যন্ত লিয়া গেছিল। দাদার দিল্লির কাম-কাইজ এতই নকশাদার আছিল, হেই দেইহা পরের বছর হের ডাক পড়ল পাটনা। পাক্কা দুই বছর আমার দাদায় হের লাল্লু-পাল্লু লইয়া পাটনায় দালান-বাড়ির কাম করছে। পাটনার থিকা ফিরা আওনের পর বড় দাদা যহন বাড়ির উঠানে আয়া খাড়াইছে তহন আমার বড় দাদি পিয়ারি বেগম হেরে দেইহা বড় পোলা জুম্মনরে ধইরা ভূত দেহনের মতো তবদা খায়া গেছিল, হায়! হায়! জুম্মন দেখ, দেখ বাইত্তে আবার কোন দরবেশ-ফকির হান্দায়া গেল!

আরেকবার এক শিখ জমিদার আমার দাদারে লক্ষ্ণৌ লিয়া গেছিল। অহনও বলে হেই বাড়িঘর বহাল-তবিয়তে টিকা আছে। এককালে আমার দাদা, বড় দাদাগো চাইরো দিকে নাম-ডাক আছিল খুব। হুরমত ওস্তাগারের লাল্লু-পাল্লুও আছিল কয়েক ডর্জন। লাল্লু-পাল্লু হইল হেলপার। কাম করণের সময় হেগো লাগে। বাড়িঘরের কাম করাইতে হইলে হের পিছনে লাইন দিতে লাগে। এই লাইন আবার যেমুন-তেমুন লাইন না। এই ধরেন, আইজকা যদি কেউ হের কাছে আইল সিরিয়াল লওনের লাইগা, তাইলে হের সিরিয়াল পড়ত তিন মাস-চাইর মাস বাদে। কপালে খারাপি থাকলে সিরিয়াল পাইতে বছরো ঘুইরা যাইত।

দিন বদলাইছে। ছিন-ছিনারিও ভি পাল্টাইছে। দেখতে দেখতে কত বছর পার হয়া গেল গা! অহন আমার বড় দাদায়ও নাই। দাদায়ও নাই। বড় দাদা, দাদা গো লগে হেগো দিনও খাইছে কাউয়ায়।

কাউয়ায় খাইছে?

এইড্যা আবার কিমুন কথা!

হ, হ, বরাত খারাপ হইলে কাউয়াও ভি মাইনষেগো লগে ঠাট্টা-মশকারি করে।

আমার বাপে হালায় আছিল ভেন্দা কিছিমের। ভেন্দা হইল বেক্কল। কানের হুমকে (সামনে) যে-হালায় হুদা কামে মশার মতন সারাক্ষণ খালি ভ্যান ভ্যান করে। আমার দাদিও কয়, নানিও কয়, তর বাপে অইল ভ্যান্দাকান্ত। মাথার ভিত্তে বুদ্ধি-উদ্ধি কিচ্ছু নাইক্কা। খালি গোবর আর গোবর। মোজামেও বাপের কানাকড়িও পায় নাইক্কা।

আমার দাদায় যা কিছু করছিল হের পোলাপাইন ওইগুলারে তামাদি কইরা ফালাইছে। বরবাদ কইরা ফালাইছে। অহন থাকনের মইদ্যে আছে খালি মোজাম ওস্তাগার। আগে আমার বাপে কাম-কাইজ বালাই করত। নাম-ডাকও আছিল ম্যালা। মাগার কইত্থে হুট কইরা বাপের শ্বাসকষ্টের রোগ হইল, হেরপর থিকা বাপে আমার কাহিল হয়া গেল-গা। এই রোগ হওনের পর আমার দাদি-নানিরা বহুত অবাকই হইছে, আরে! বংশের কাউরো মইদ্যে তো এই বালের রোগ-বালাই আছিল না। এই রোগ মোজামের ভিত্তে হান্দাইলা ক্যামতে?

বাপের যহন হাঁপানির টান বাইড়া যাইত তহন বাপে আমার দম ফালাইবার পারত না। রানীক্ষেত বিমার হইলে মুরগি ক্যামতে ঝিমায় – হাঁপানির টান বাইড়া গেলে বাপেও হেই রকম ঝুমত। এই রকম চলতে চলতে বাপের কাম-কাইজ কইমা যাইবার লাগল। হের লাল্লু-পাল্লুরা তহন নিজেরাই ওস্তাদ হয়া গেল। অহনও মাঝেমইদ্যে বাপেরে দেখবার আহে লাল্লু-পাল্লুরা। বাইত আইলে হেরা আয়া সালাম করে। দোয়া-খায়ের চায়। বাপও হেগো লগে পরান খুইলা বাৎচিত করে। লাল্লু-পাল্লুগো কয়, তরা হইলি আমার গুরুমারা শিষ্য। তগো দেখলে আমার বুক ফুইলা মীর জুমলার কামান হয়া যায়।

বছরের নয় মাস জাজিমের ওপরে ভেটকি মাইড়া পইড়া থাকে মোজাম ওস্তাগার। হের লাইগা কেউ আর অহন মোজাম ওস্তাগাররে কাম-কাইজে ডাকে না।

আমগো ওস্তাগার বাড়িটা লালবাগ কেল্লুর থিকা একটু তাফাতে। পুষ্পরাজ সাহা লেনে। বাপ-দাদাগো আমলে আমগো এই বাড়িটা আছিল একবিঘা জমির মইদ্যে। পরে কোরবানির গরু য্যামতে ভাগ অহে হ্যামতে ভাগ হইতে হইতে ওস্তাগার-বাড়ির চৌহদ্দি কবুতরের বাক্সর লাহান হইয়া গেছে। ভাগাভাগির বাদে আমার বাপের ভাগে পড়ছিল সোয়া দুই কাঠা জমিন। অভাবে পইড়া বাপে এক কাঠা জমিন বেইচা সোয়া কাঠা জায়গার মইদ্যে জোড়াতালি দিয়া বগলা সিগ্রেটের বাক্সর মতন সিধা লম্বা একখান তিনতলা বাড়ি উঠাইছে। বাইরে থিকা আমাগো বাড়িটারে দেখলে যে কেউ বুইঝা লিবো যে, মোজাম ওস্তাগার বুঝি ইটা-মিটা আর লোহা একলগে মিক্সার কইরা, খাড়া কইরা একখান লম্বা সিঁড়িঘর বানায়া রাখছে। আমগো এই সিঁড়িঘরে দুইখান ছোট ছোট খুপরি আছে। লগে একখান বাথরুমও আছে। আমার বাপে যে এক সময় নামকরা ওস্তাগার আছিল হেইটার পরমাণ হ্যায় রাখছে বাড়ির দক্ষিণে কায়দামতন একখান ঝুল বারান্দা রাইখা। হেই বারান্দায় খাড়াইলে দূরে সিধা লালবাগের কিল্লা দেহন যায়। কিল্লার শইল ঘেইষা মরা বুড়িগঙ্গা। এক সময় এইখান দিয়া আসল বুড়িগঙ্গা যাইত। বুড়িগঙ্গার হেইপারে কেরানীগঞ্জ। নদী পার হইলে ইসলামবাগ, কুইশারবাগ, নাইকরোজবাগ, বরিশুর, অাঁটি, খোলামুড়া, জগন্নাথ সাহা রোড, আমলীগোলা, আতশখানা রোড, লালবাগ রোড, শায়েস্তা খান রোড, কাজী রিয়াজউদ্দিন রোড, হরনাথ ঘোষ রোড, পোস্তা, শেখসাহেব বাজার, বিষ্ণুচরণ দাশ, নীলাম্বর সাহা রোড থিকা শুরু কইরা পুষ্পরাজ সাহা লেনের ময়-মুরবিবরা আমগো বাড়ি লিয়া বহুত রঙ্গ-রসিকতা করে। হ্যারা আমগো এই বাড়িটার নাম দিছে কুতুব মিনার।

কয়দিন আগে লালবাগ কিল্লার মোচড়ে আমার চক্ষে পড়ল মহল্লার মুরবিব রহিম চাচারে। রহিম চাচা হুদা কামে আজিরা পক-পক করে। চাপাবাজি করে। উল্টা-সিধা কথা কয়। যের লাইগা হেরে দেখলে আমি তাফাতে ফুইটা যাই। আইজকাও রহিম চাচারে দেইখা আমি চাপলিছে ফুইটা যাওনের ধান্ধা করতাছিলাম, মাগার তার আগেই রহিম চাচা গলা উচায়া আমারে ডাক দিলো, আবে ওই কুতুবমিনার জুয়েল, তুই দেহি দিন দুই ফরে আমার লগে চোর-পলান্তিস খেলবার লাগছছ?

কুতুবমিনার জুয়েল!

হাউয়ার পো ডাউয়ায় কয় কী!

রহিম চাচার মুখে কুতুবমিনার জুয়েল নাম হুইনা আমার চান্দি-মান্দি গরম হয়া শিক কাবাব হওনের জোগাড়! আমার মিজাজ খিচড়ায়া গেল। অর মায়রে বাপ!

হালায় কয় কী!

হাউয়ার পো ডাউয়া কয় কী!

মনে মনে খিচ দিয়া রইলাম। মাগার কিছু কইলাম না। শত হইলেও বাপের বাচপান কি দোস্ত। চাচা বইলা কথা।

হাত দিয়া ইশারা দেওনে রহিম চাচার সামনে গিয়া তারখাম্বার মতন খাড়াইলাম। রহিম চাচায় জিগাইল, মোজামের খবর কী রে? অর কোনো খোঁজখবর নাইক্কা, কেইস কী?

বাপের শইলটা বালা না।

হাঁপানির টান বাড়ছেনি?

মনে হইতাছে।

মোজামরে রেস্ট লিবার কইছ – কথাটা কয়া রহিম চাচা একটু দম লিল। হেরপর কইল, মোজাম কি অহনও গাঞ্জা-মাঞ্জা খায়নি? অরে কত কইলাম, দোছ, এইগুলারে ছাড়ান দে। কে হুনে কার  কথা –

রহিম চাচার কথা হুইনা হের বন্ধু আছলাম মিয়া একখান হাসি দিয়া কইল, তুই যে মোজামরে অ্যাডভাইস দিতাছছ এইটা তো ঠিক কাম না।

আছলামের কথা হুইনা রহিম চাচা খ্যাঁক খ্যাঁক কইরা উঠল, আরে আমার কথা বাদ দে – আমি তো আর মোজাম না। অর তো হাঁপানির ব্যারাম আছে – বুঝছ না ক্যালা? কথাগুলা কয়া রহিম চাচা সিগ্রেটে একটা লম্বা টান মাইরা ধুঁয়ায় চাইরদিক আন্ধার বানায়া ফালাইল। রহিম চাচার লম্বা টানে সিগ্রেটের মুখটা আগুনে দগ দগ কইরা উঠল।

আইচ্ছা, রহিম চাচা কী সিগ্রেট খাইতাছিল, না গাঞ্জা? জুয়েলের মনে সন্দেহ প্যাঁচায়া প্যাঁচায়া উঠতাছে।

না, না, এইটা সিগ্রেটের গন্ধ না।

বাপে যে-জিনিস খায় এইটা হেই জিনিসের গন্ধ।

ঘরে গিয়া দেহি বাপে ময়লা তেল চিটচিটে বিছানায় মুলি বাঁশের মতন লম্বা হয়া চিৎ মাইরা হুইয়া গান গাইতাছে, ‘সব দিল হি টুট গায়া হ্যাম ক্যায়সে কিয়া কারেঙ্গে।’

: বাপজান তুমি কী একখান বাড়ি বানাইছ যে, বেবাকতে কয় কুতুবমিনার।

আমার কথা হুইনা বাপে গান থামায়া একখান হাসি দিলো। দিয়া কইল,

: কোন মগায় তরে এই কথা কইছে?

: রহিম চাচা।

: গাঞ্জুটি রহিম? অয় তো পিচ্চিকাল থিকাই কলকি খায়। অর কথা বাদ দে। রহিম হালায় বাপ-দাদার বাড়ি বিক্রি কইরা ফ্যালাট বাড়ি কিন্যা তাফালিং মারায়। ছাগলের মায়রে-বাপ – বাপে বিড়বিড় করতাছে।

: ফ্যালাট বাড়ি তো সুন্দর – রহিম চাচা জববর কামই করছে।

: আবে! তর কি মাথা-উথা বিগড়ায়া গেল গা! ফ্যালাট বাড়িরে তুই সুন্দর কইতাছ?

: হ, কই। একশবার কই।

: হোন, নিজের বাড়ি হইল আপনা বাড়ি।

: থাকো তুমি তোমার আপনা বাড়ি লিয়া।

: বাপ-দাদার বালা লাগে না। যা, আমি মইরা গেলে এই বাড়ি ভাইঙা তরা যা খুশি করিছ।

: আমি কী তুমারে মইরা যাওনের কথা কইছি?

আমার কথা হুইনা বাপে আমার দিকে চোখ বড় কইরা তাকাইল। হের বাদে কইল,

: বাবা জুয়েল ওস্তাগার, তুমার মিজাজ-উজাজ কি খারাপ অইছে?

দিলে রহম চাগাড় দিয়া উঠলে বাপে আমারে মাঝেমইদ্যে জুয়েল ওস্তাগার কয়া ডাকে। ওয়েস্ট অ্যান্ড হাইস্কুলের মাস্টার ছাবরাও আমারে কয়, জুয়েল তুই নামের শেষ দিয়া কি             ওস্তাগার-মোস্তাগার টাইটেল লাগাইছছ? এইছব পুরানা টাইটেল ফালায়া নয়া টাইটেল ল।

ক্যালা আমি আমার বাপ-দাদার টাইটেল ফালায়া নয়া টাইটেল লিমু? আমি মোজাম ওস্তাগারের পোলা ওস্তাগারই থাকুম।

মাস্টার ছাবগো এই কথা আমি মুখ ফসকায়া আমার বাপেরে কইছিলাম। বাপে আমার কথা হুইনা বহুত বিলা খায়া গেছিল,

হালাগো মাথার তার-মার কি সব ছিঁড়া গেছে! ওস্তাগার হইল আমগো খানদান – আর অরা হেই খানদান ফালায়া নতুন টাইটেল লিবার কয়! হালাগো মুখে মার জুতা।

 

দুই

রাইত বহুত হইছে।

চাইরোদিকে ঝিম আন্ধার।

হেই আন্ধারে তামাম দুনিয়া ভাইসা যাইতাছে। এই আন্ধারে ছিনার ভিত্তে কিমুন জানি ভয় ভয়ও লাগে। কথা নাই, বার্তা নাই আকাশের এইদিক-ওইদিক দিয়া অাঁতকামাইরা বিজলি চমকাইয়া গেল। ওস্তাগার বাড়ির বেবাকতে তহন মরার মতো ঘুমাইতাছে। মাগার আমার ঘুম আহে না। মাঝেমইদ্যে আমার এইরহম হয়। রাইতে ঘুম আহে না। ঘুমে চক্ষু ভাইঙা আহে, মাগার ঘুম হাউয়ার পোলার কোনো নিশানা খুঁইজা পাওন যায় না। এই রহম হইলে আমি তহন ঘর থিকা বাইরায়া বারান্দায় যাই গা। গিয়া বাইরে তাকায়া থাকি। আমাগো বারান্দাটা বহুতি আজিব। একজন মানুষ কোনো রহম চাইপা-চুইপা খাড়াইবার পারে। রাইতে ঘুম না আইলে আমি বারান্দায় খাড়ায়া খাড়ায়া চান-তারা দেহি। পূর্ণিমার চান্দের আলোর মইদ্যে দূরের লালবাগ কিল্লা দেহি। লালবাগ কিল্লার লাল রঙের ওয়াল ছিনা টানটান কইরা খাড়ায়া থাকে। রাইতের আলো-আন্ধারে হেই ওয়াল জানি আরো সুন্দর হয়া যায় – মনে হয় লাল রঙের ঘোড়ার পাল কিল্লার ওয়ালের ওপরে লাইন দিয়া লৌড়ায়া যাইতেছে। কই যে যাইতাছে ক্যাঠায় জানে! আমার যে তহন কী বালা লাগে! নিজেরে তহন ঘোড়া ঘোড়া মনে অয়। লাল ঘোড়া। জুয়ান ঘোড়া। বারান্দায় খাড়ায়া এসব দেখতে দেখতে আমার ঘুম বখতিয়ার খিলজির ঘোড়ার লাহান উইড়া যায়।

ঘরের দরজা দিয়া বারান্দার দিকে পা বাড়াইতে গিয়া আমি ভূত দেহনের মতন চমকায়া গেলাম। দেহি কী, আমার বাপে সিদা তারখাম্বার মতো লালবাগ কিল্লার দিকে মুখ কইরা খাড়ায়া রইছে। বাপেরে এমতে দেইহা আমার জবান বন্ধ হয়া গেল। আমি চুপ মাইরা ঘরের দরজার চিপায় খাড়ায়া থাকি। আরে! আমি আরো চমকায়া যাই যহন হুনি, আমার বাপে একলা একলা কথা কইতাছে, এই লালবাগ কিল্লা আমার বড় দাদার। তার বড় দাদার। আমার বাপের। আমার বড় দাদারা ইংরাজগো লগে এই কিল্লার ভিত্তে যুদ্ধ করছে। রক্ত লুটায়া দিছে। শহীদ হইছে। আর আইজকা আমি হুরমত ওস্তাগারের পোলা মোজাম ওস্তাগারের বেইজ্জইত অবস্থা। অভাবের মইদ্যে পইড়া মইরা রইছি।

জবান-উবান বন হয়া গেছে। কোনো সাড়া-শব্দ নাইক্কা। আমি একটু তব্দা খায়া গেলাম। মাগার কান্দনের একটা সুর ওস্তাদ বিছমিল্লাহ্ খাঁর সানাইয়ের লাহান আমার কানে হান্দাইল। কান্দনটা বাসমতী চাইলের মতন মিহি।

কান্দে কোন হালায়?

চোখের সামনে আমার বাপ। আর আমার বাপের সামনে লালবাগের কিল্লা।

এই সময় জিগান নাই-কওন নাই আন্ধা-কুন্ধা তুফান শুরু হইল। তুফানের লগে দিয়া চাইরদিকে ঝুম বিষ্টি। মনে হইল, তামাম দুনিয়া বিষ্টিতে ডুইবা যাইব। বিষ্টির মইদ্যে, তুফানের মইদ্যে আমার বাপের কান্দনের আওয়াজ ডুইবা গেল।

আমি আমার বাপের পিছে খাড়ায়া খাড়ায়া বাপের কান্দন হুনতে থাকি। ৎ

 

 

কালো মেঘ যখন গ্রাস করে সাদা চাঁদ

মনি হায়দার

 

মেয়েটি সুন্দরী?

অবশ্যই সুন্দরী, অন্তত আমার চোখে। সৌন্দর্য তো একজন মানুষের কাছে একেক রকম। আমি যেটুকু সৌন্দর্য বুঝি, তাতে আমি মেয়েটিকে সুন্দরই মনে করি।

নাম কী?

তারানা।

শুধুই তারানা?

আমি তারানাই জানি। ওর বাবা-মা, ভাই-বোন এ নামেই ডাকে। আমিও ডাকি।

আপনি চেনেন কীভাবে?

তারানার বড় ভাই জাহিদ আমার ক্লাসফ্রেন্ড। আমরা একসঙ্গে ইউনিভার্সিটিতে পড়েছি। জাহিদের বাবা ওয়াসার অনেক বড় কর্মকর্তা ছিলেন। মগবাজারে ওদের বিরাট সরকারি বাসা ছিল। তোমাকে বলছি আজ থেকে প্রায় পঁচিশ বছর আগের ঘটনা। সেই বাসায় আমি অনেক গিয়েছি, থেকেছি, খেয়েছি। ওর মা, মানে খালাম্মা আমাকে ছেলের মতো আদর করতেন। গ্রামের ছেলে, মায়ের কাছ থেকে এসে বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে থাকি, কী খাই না খাই, তিনি চিন্তা করতেন। সে-সময়ে তারানা বোধহয় থ্রি-ফোরে পড়ত। দেখো সময় কীভাবে চলে যায়, সেই ছোট্ট তারানা এখন বিয়ের পাত্রী।

একসঙ্গে গোটা ইতিহাস বলে থামে সুমন।

খুঁতখুঁতে টাইপের ছেলে সোহাগ মাথা নাড়ে, আপনার সঙ্গে পারিবারিক সম্পর্ক?

হ্যাঁ। আমি যখন বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে কেবল একটা ফার্মে ঢুকেছি তখনই তো তিথিকে, মানে তোমার ভাবিকে বিয়ে করলাম কোর্টে গিয়ে। থাকি মেসে, নতুন বউ নিয়ে কোথায় যাব? গেলাম খালাম্মার কাছে। তিনি সাদরে গ্রহণ করলেন আমাদের। অবশ্য আদুরে বকাও দিয়েছেন। আমাদের বাসরও হয়েছিল সেই বাসায়। এখন তারা সরকারি কলোনি ছেড়ে থাকে নিজেদের বাসায় মগবাজারেই। খালু মারা গেছেন। আমি থাকি টিকাটুলী। ফোনে প্রায়ই কথা হয় খালাম্মার সঙ্গে। তোমার ভাবি ও মেয়েদের নিয়ে যাইও মাঝেমধ্যে। তারানার সঙ্গে তিথির খুব চমৎকার সম্পর্ক। আমি যেটুকু জানি এবং চিনি, তারানা খুব ভালো মেয়ে। তুমি ওকে বিয়ে করলে আর কী পাবে জানি না, নিশ্চিত বলতে পারি তুমি ভালো একটা বউ পাবে।

মেয়েটি লম্বা?

হ্যাঁ, লম্বা। বাঙালির গড় মেয়েদের চেয়ে একটু লম্বাই। মাথায় অনেক চুল। মুখটা একটু লম্বাটে – যাবে দেখতে?

আজ একটু ভাবি, কাল আপনাকে জানাব – সোহাগ চেয়ার ছেড়ে চলে যায়।

ঠিক আছে, মনে মনে বিরক্ত সুমন। একই অফিসে জুনিয়র কলিগ সোহাগ আহমেদ। বছরখানেক হলো জয়েন করেছে। ছেলেটা চৌকস। মাত্র তো শুরু চাকরির, অনেকদূর যাবে ও। বিয়ে করতে চায়। অন্তত ডজনতিনেক মেয়েও দেখা হয়েছে, দেখার পর দু-তিনদিন মেয়েটি বা তার পরিবার সম্পর্কে ভালোই বলে সোহাগ। কিন্তু বেশ কয়েকদিন যাওয়ার পর মেয়েটি এবং তার পরিবারের নানা রকম খুঁত বের করে সমালোচনা শুরু করে – বুঝলেন সুমনভাই, ভেবেছিলাম এই মেয়েটিকে বিয়ে করব কিন্তু –

আবার কিন্তু কেন? বিয়ে করলে করো। সময় তো স্থির নয়, সময় চলমান, গতিশীল। দিনে দিনে তোমার বয়স কত হলো?

এই আসছে এপ্রিলে একত্রিশ বছর পূর্ণ হবে।

একত্রিশ বছর বয়সে এখনো বিয়ে করছ না কেন?

করতে তো চাই কিন্তু মনের মতো মেয়ে পাই না।

এই মেয়েটি, যাকে কদিন আগে দেখে এলে, কী যেন নাম? নাদিয়া – ওকে বিয়ে করো। তোমার কাছেই তো শুনলাম নাদিয়া  চাকরিও করে, দুজনে মিলে সংসারটা ভালো চলবে।

বিয়ে করতে তো চেয়েছিলাম কিন্তু এখন ভেবে দেখলাম নাদিয়াকে বিয়ে করা ঠিক হবে না।

নাদিয়া আবার কী দোষ করল?

না, নাদিয়া কোনো দোষ করেনি।

তা হলে?

নাদিয়ার পরপর তিনটি ছোট বোন আছে –

পরপর তিনটি বোন আছে নাদিয়ার, তোমার সমস্যা কী?

একটা থাকলে ভালো হতো, পরপর তিনটে বোন – নাদিয়াকে বিয়ে করলে আমি হবো বড় জামাই। ওদের বিয়ে দেওয়ার দায় পড়বে আমার ওপর।

গাছে না চড়তেই এক কাঁদি! আশ্চর্য ছেলে তো বাবা। ভেতরে ভেতরে তেতে ওঠে সুমন – নাদিয়ার বাবা-মা আছে না?

আছে।

তাদের মেয়ে তারা বিয়ে দেবে। তুমি বড় মেয়ে নাদিয়াকে বিয়ে করে আলাদা সংসার করবে আলাদা জায়গায়। শালিদের বিয়ে দিতে হবে – এমন কোনো শর্ত ওরা তোমাকে দিয়েছে?

না, তা দেয়নি। কিন্তু বড় দুলাভাই হিসেবে একটা দায় তো থাকবে আমার।

দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে সুমন, তুমি যদি এভাবেই চিন্তা করো তাহলে আর কি! অন্য মেয়ে দেখো।

একটা মেয়ের খোঁজ পেয়েছি –

কোথায়?

মালিটোলা বাসা। কিন্তু এখানেও সমস্যা আছে।

চোখ বড় বড় করে তাকায় সোহাগের দিকে, এই ছেলেটা আসলে কী চায়? এতগুলো মেয়ে দেখেছে একটি মেয়েও পছন্দ করছে না। নাকি মেয়ে দেখা ওর রোগ? মনে আছে, গ্রামে           দূর-সম্পর্কের এক চাচা হামিদুল ইসলাম মাস্টার্স করার পর এলাকার বিয়ের বাজারে তার বিপুল চাহিদা বেড়ে যায়। বাবা নিম্নবিত্ত পরিবারের খেটে খাওয়া মানুষ। অনেক কষ্ট করে ছেলেকে লেখাপড়া শিখিয়েছেন। সেই ছেলের বিয়ের বাজার বাড়লে বাবা-মা খুশি। ইউনিয়নের চেয়ারম্যানও মেয়ে বিয়ে দিতে চায় হামিদুল চাচার সঙ্গে। এলাকার নতুন পয়সাঅলা ফয়েজ আলীও মেয়ে দিতে চায় হামিদুলের কাছে। হামিদুল বাজারের চায়ের দোকানে বসে আড্ডা দেয় আর গালগল্প মারে। ফয়েজ আলীর মেয়েটা ম্যাট্রিক পাস, একটু কালো কিসিমের, দেখতে মন্দ নয়। কিন্তু বিয়ে হচ্ছে না। ফয়েজ ঘটকের কাছে প্রস্তাব পাঠায়, মেয়ের বিয়েতে পালংখাট, বিছানা, বালিশসহ এক লাখ টাকা নগদ ক্যাশ দেবে –

নড়েচড়ে বসে হামিদুল আর ওর পরিবার। ফয়েজের প্রস্তাবে প্রায় রাজি, এই সময়ে পাশের ইউনিয়ন থেকে আরেকটি প্রস্তাব আসে, মেয়ের বাবা টাকাঅলা। মেয়েও দেখতে খুব সুন্দরী। হাতের কাজ জানে। একটু শিক্ষা কম, প্রাইমারি পাস। তবে শিক্ষাটাকে পুষিয়ে দেবে  শাল কাঠের পালংখাট, বিছানা-বালিশ, নগদ তিন লাখ টাকা, সঙ্গে একটা মোটরসাইকেল দিয়ে। হামিদুল চাচার বাবা এক কথায় রাজি। মেয়েও দেখে এসেছে সবাই; কিন্তু হামিদুল চাচা একটু নীরব। একজন এমএ পাস শিক্ষিত মানুষ কীভাবে প্রাইমারি পাস মেয়ে বিয়ে করে? লোকে কী বলবে? বন্ধু-বান্ধবদের কাছেই কী করে মুখ দেখাবে? দু’পক্ষের মধ্যে যখন দড়ি টানাটানি চলে, সে-সময়ে কচা নদীর ওপার থেকে আরো ভালো একটি বিয়ের প্রস্তাব আসে। এসব প্রস্তাবের আগে ছোট-বড় অনেক প্রস্তাব এসেছে চাচার জন্য। চাচা পাইক-পেয়াদা নিয়ে গেছে মেয়ে দেখতে, এসে দু-একদিন পর অন্য মেয়ে দেখতে গেছে। হিসাব করে জানা গেছে, হামিদুল চাচা একান্নটি মেয়ে দেখার পর নদীর ওপারে বিয়ে করেছে। কারণ মেয়ের বড় মামা ফরেস্টের রেঞ্জার। নগদ টাকার সঙ্গে ফরেস্টে একটা সরকারি চাকরিও পাওয়া যাবে। চাকরির কাছে জিম্মি হয়ে চাচা বিয়ে করে বউ বাড়ি আনলেন; কিন্তু সেই বউয়ের মুখ দেখে কেউ খুশি হয়নি। মুখটা একেবারে কালো… কালো মানে কালো। অন্ধকারের মতো কালো।

হামিদুল চাচার ফরেস্টে চাকরিও হয়েছে। অনেক টাকা-পয়সার মালিকও হয়েছেন; কিন্তু মাঝবয়সে বাগেরহাটে একটি বিয়ে করেছেন। সেখানেই ছোট বউ থাকে। নতুন ছোট বউকে নিয়ে নতুন বাড়ি করেছেন। বড় বউ থাকে গ্রামে। গ্রামে খুব একটা আসেন না। কখনো এলে বড়রা দ্বিতীয় বিয়ের কারণ জিজ্ঞেস করলে হামিদুল চাচা বলতেন, পাতিলের কালির সঙ্গে আর কত থাকা যায়? অনেক তো থাকলাম।

আমাদের সোহাগের জীবনে এমন ঘটনা ঘটবে না তো, ভাবতে ভাবতে জিজ্ঞেস করে সুমন, মালিটোলার মেয়ের কী সমস্যা?

মেয়েটার বাবা নেই।

থাকে কার সঙ্গে?

বড় ভাইয়ের সঙ্গে।

তা তুমি তো মেয়েটার বাবা-মাকে বিয়ে করছ না। বিয়ে করছ মেয়েটাকে। তুমি সংসার করবে মেয়েটার সঙ্গে –

কিন্তু শ্বশুর-শাশুড়ি না থাকলে জামাই হিসেবে কি মর্যাদা পাব?

সুমন উত্তর দিতে পারে না। সোহাগ এ-কথাটা ঠিক বলেছে। সব জামাই শ্বশুরবাড়ি থেকে আদর-আপ্যায়ন চায়। মেয়ের জামাইয়ের শ্বশুর-শাশুড়ি না থাকলে কিছুই পাওয়ার সুযোগ থাকে না। ফিরে তাকায় নিজের দিকে সুমন। তিথিকে বিয়ের দিনসাতেক পর জাহিদদের বাসা থেকে একটা একরুমের বাসায় নিয়ে উঠেছে মালিবাগের ভেতরে চারতলা বাড়ির দোতলায়। ছোট্ট ঘর, রান্নার চুলাটা পাশের ভাড়াটিয়ার সঙ্গে এজমালি। বাথরুমটা খুব ছোট্ট, যদিও রুমের সঙ্গে অ্যাটাচড। একটা মাত্র জানালা, দক্ষিণের। ভেতরে ভেতরে খুব টেনশনে ছিল সুমন, বাসা দেখে তিথি কী বলে! মিরপুরে ওদের নিজেদের বিরাট বাড়ি। বাড়ির ভেতরে আম, কাঁঠাল, নারিকেল গাছে ভরা। তিথির বাবা ব্যবসায়ী। ঢাকায় আরো বাড়ি আছে। নিজেদের গাড়ি আছে। কেবল ভালোবাসার নৌকায় চড়ে সব ছেড়ে চলে এসেছে সুমনের হাত ধরে।

না ধরে উপায় কী? ক্যাম্পাসে চার বছরের প্রেম সুমন আর তিথির। পাস করে মাত্র একটা চাকরিতে ঢুকেছে সুমন। আরো একটু সময় দরকার ওর। কিন্তু তিথিকে বিয়ে করার জন্য প্রবাসের এক যুবক এক পায়ে খাড়া। তিথিকে একবার দেখলে যে-কোনো তরুণের আরেকবার দেখতে ইচ্ছে করবে। ছুটির দিন সকালে তিথি মেসে হাজির। হাতে একটা ব্যাগ। হাতে ব্যাগ দেখেই সুমন বুঝে গেছে, তিথি চলে এসেছে। বিয়ের আনাগোনা চলছে – জানে সুমন। কিন্তু এমন ভর সকালে? ছুটির কারণে মেসে লোক কম ছিল, রুমের মধ্যে নিয়ে বসায়। রুমের মধ্যে তিনটে খাট পাতা। বিছানা, বালিশ, মশারি এলোমেলো। কী করবে ভেবে পায় না সুমন। রুমের একজন দৌড়ে হোটেল থেকে ডিম-পরাটা আর কোক নিয়ে আসে।

তিথি দিব্যি নাশতা খায়। খেতে খেতে বলে, এখানে তো আমি থাকতে পারব না। একটা রুম দেখো। ছোট হোক – আমার অসুবিধা নেই। আমি থাকতে পারব।

ঠিক আছে। তুমি একটু বসো।

তুমি কী করবে?

জাহিদকে একটা ফোন করব।

কোত্থেকে করবে?

এই তো মোড়ে টেলিফোন করার একটা দোকান আছে।

কতক্ষণ লাগবে?

পাঁচ মিনিট।

ওকে।

ফোনে জাহিদকে সব জানিয়ে রুমে এসে দেখে তিথি ওর বিছানায় শুয়ে রয়েছে। আর কেউ নেই। ধীরে ধীরে তিথির পিঠে হাত রাখে। ফিরে তাকায় তিথি।

জাহিদকে পেলে?

হ্যাঁ। ও আসছে গাড়ি নিয়ে। আধা ঘণ্টার মধ্যে জাহিদ এসে তিথি আর সুমনকে নিয়ে কাজী অফিসে গিয়ে বিয়ের ব্যবস্থা করে। বিয়ের পর সোজা বাসায় নিয়ে যায়। নিজের রুমটা ছেড়ে দিয়ে বেচারা ছোট ভাইয়ের সঙ্গে ডাবলিং করে কয়েক দিন। যদিও বন্ধুর বাসা কিন্তু সময় কেটে যাচ্ছিল সুখের বহুমাত্রিক কম্পনে।

তাকায় তিথির মুখের দিকে ভয়ে ভয়ে, বাসা তোমার পছন্দ হয়নি না?

কে বলল পছন্দ হয়নি?

তোমার মুখ গম্ভীর কেন?

হাসে তিথি, কই আমার মুখ গম্ভীর। হোক ছোট বাসা – সঙ্গে তুমি আছো। আমার আর কী চাই?

তিথিকে আবেগে জড়িয়ে ধরেছিল সুমন, তুমি সত্যিই সুন্দর।

সেই ছোট্ট বাসা থেকে এখন অ্যাপার্টমেন্টে থাকে। দুটি মেয়ে নিয়ে দারুণ সুখের সংসার। তিথির বাবা-মায়ের সঙ্গে প্রায় বছরদুয়েক পর দেখা তিথির। অনেক খুঁজে মেয়েজামাইকে বাসায় নিয়ে যায় তারা। খুব আদর-যত্ন করে। সুমনকে কমপ্লিট স্যুট, ঘড়ি, জুতো দিয়েছে। শাশুড়ি প্রস্তাব দিয়েছে মালিবাগের ওই ছোট বাসা ছেড়ে তাদের বিরাট বাড়িতে উঠতে। কিন্তু তিথি কোনোভাবেই রাজি হয়নি।

আমার স্বামী কেন তোমার বাড়িতে থাকবে?

থাকলে তোর সমস্যা কী? হাসেন শাশুড়ি, আমার দুই ছেলের সঙ্গে সুমনও থাকবে আমার আর একটা ছেলের মতো।

কিন্তু সুমন তোমার ছেলে না। তোমার মেয়ের জামাই। ওর মর্যাদা আছে না? আর আমিইবা কেন থাকব? ও থাকলে থাকতে পারে, আমি থাকব না।

তিথির আত্মসম্মানবোধ সুমনকে প্রবল নাড়া দিয়েছিল। আজকে জীবনে যতটুকু উন্নতি, অর্জন পেছনে তিথির প্রবল জেদ আর সামনের চিন্তার ফল। প্রেম, বিয়ে, সংসার, সন্তান মানুষের জীবনটাকে পূর্ণতা দেয়। কখন, কোথায়, কোন মেয়ের কিংবা কোন ছেলের সঙ্গে একবার দেখা হয়, চোখের ওপর চোখ পড়লে গোটা জীবনের ওপর প্রভাব সৃষ্টি করে, বলা খুব মুশকিল। জীবন ঘটনাচক্রে খুব সহজ আবার কখনো খুব কঠিন। এসব ভাবতে ভাবতে সুমন ভাবে, সোহাগ বোধহয় বিয়েই করতে পারবে না। নিজের সম্পর্কে কোনো স্থির ধারণা নেই। কী যে হবে ওর? অবশ্য এত ভালো একটা ছেলে এভাবেই নিজের সর্বনাশ করবে? অফিসের কাজ খুব যত্নের সঙ্গে করে। অনেক মানুষ সিদ্ধান্তহীনতার কারণেই পিছিয়ে পড়েছে – চোখের সামনে কত উদাহরণ আছে।

দিনকয়েক পর সোহাগ জানায়, সুমনভাই চলেন।

কোথায়?

তারানাকে দেখতে।

সোহাগের দিকে তাকিয়ে থাকে, তাকিয়ে থাকতে থাকতে ভাবে, এরকম সিদ্ধান্তহীন একটা ছেলেকে জাহিদের বোন তারানাকে দেখাতে নিয়ে যাওয়া ঠিক হবে না। আগের অনেক মেয়ের মতো প্রথমে পছন্দ করে যদি পরে খুঁত বের করে? বিয়ে করতে অস্বীকার করে তারানাকে? খালাম্মা কষ্ট পাবেন। তারানার কাছে চিরকালের জন্য ছোট হয়ে যাবে। জাহিদকেই বা কী বলবে? সোহাগকে নিয়ে না যাওয়াই ভালো।

কী ভাবছেন?

তুমি সত্যি বিয়ে করবে সোহাগ?

সুমনভাই, আমি বুঝতে পারি – আপনি আমাকে নিয়ে কী ভাবছেন। কিন্তু আমি কথা দিচ্ছি যদি তারানাকে আমার পছন্দ হয় আর দ্বিতীয় কোনো চিন্তা করব না। বিয়ে করব।  আমিও তো একজন মানুষ, পুরুষ মানুষ। আর পারছি না নিজেকে সামলাতে।

সুমনের ভালো লাগে, না সোহাগের ভেতরের অস্থিরতা শেষ হয়েছে। মানুষ এমনই, যতই স্রোতে নিজেকে ভাসিয়ে রাখুক, এক সময় তাকে তীরে ভিড়তে হয়। সুমন খুব পজিটিভ মানুষ, অন্যকেও পজিটিভ দেখতে চায়। সোহাগের এই পজিটিভ অ্যাপ্রোচ ভালো লাগে – ঠিক আছে, আমি জাহিদের সঙ্গে কথা বলে তোমাকে কাল জানাব।

ওকে।

 

পরদিন বিকেলে অফিস থেকেই জাহিদদের বাসায় চলে যায় সুমন। সঙ্গে সোহাগ, সোহাগের এক ফুফাত বড় ভাই,  সচিবালয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ে ডেস্ক অফিসার, হুমায়ূন রশীদ। ভদ্রলোককে শুরুতে রাশভারী মনে হলেও কিছুক্ষণ পর সুমন বুঝতে পারে হুমায়ূন রশীদ মিশুক মানুষ। যাবতীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে তারানাকে দেখে, কথা বলে বাসায় ফিরতে ফিরতে রাত এগারোটা। সোহাগ তারানাকে খুবই পছন্দ করেছে। ওর চোখ-মুখে কামনার কমলা রং দেখতে পায় সুমন। খাওয়া-দাওয়ার পর ড্রয়িংরুমে সবাই বিশ্রাম নিচ্ছে, এ-ফাঁকে সুমন ছাদে নিয়ে যায় সোহাগ আর তারানাকে। একটু নিভৃতে দুজন দুজনকে একটু পরখ করে দেখুক, জানুক। সব জানার মধ্যে এই সময়টুকু ওদের জীবনে দক্ষিণ জানালার দারুণ স্মৃতি হয়ে থাকবে। দশ মিনিট সময় দিয়ে নিচে নেমে আসে সুমন। হুমায়ূন রশীদ ডেকে নিয়ে যায় বারান্দায়, ভাই – মেয়ে তো আমার পছন্দ হয়েছে।

সোহাগ? সোহাগ কী বলছে?

হাসেন রশীদ, ও তো চায় এখনই বিয়ের কাজটা সেরে ফেলতে।

কীভাবে কী করবেন, কিছু ভেবেছেন?

ভেবেছি। সোহাগের বাবাকে আজ রাতেই আমি মোবাইলে সব জানাব। যত শিগগির সম্ভব তাকে ঢাকায় আসতে বলব – সম্ভব হলে ফুফুকে নিয়ে এলে ভালো হবে।

হ্যাঁ, ছেলে বিয়ে করালে গার্ডিয়ানদের দেখেশুনে করানোই ভালো।

কিন্তু আমাদের ছেলেকে কি পছন্দ হয়েছে আপনার কন্যার পক্ষের?

কেন আমাদের ছেলে ফেলনা নাকি? সরকারের প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তা। দেখতেও চমৎকার। আমি খালাম্মা, জাহিদ – এমনকি তারানার সঙ্গেও কথা বলেছি।

কী বলল ওরা?

ওরা পজিটিভ না থাকলে আমি কখন আপনাদের নিয়ে চলে যেতাম?

রাইট। কিন্তু একটা কথা – হুমায়ূনের কণ্ঠে দ্বিধা।

বলুন।

ওনাদের তো ঢাকায় বাড়ি আছে। আমাদের তো কিছুই নেই। আমি থাকি সরকারি কলোনিতে। সোহাগ থাকে মেসে –

হাসে সুমন, রশীদভাই এই ঢাকা শহরে আমিও মাসের পর মাস মেসে থেকেছি। তারানার বাবাও তার জীবনের শুরুতে মেসে থেকেছেন। ঢাকার বাইরে থেকে যারা আসি সেই আমরা তো উদ্বাস্ত্ত। প্রথমে উদ্বাস্ত্ত থাকলেও পরে কিন্তু সবার ঠাঁই হয় –  এই জনাকীর্ণ ঢাকা শহরের বুকে।

ঠিক বলেছেন। চলুন, অনেক রাত হয়েছে।

আপনি একটু অপেক্ষা করুন, আমি আসছি।

সুমন ছাদে গিয়ে দেখে দুজনে হাত ধরে দাঁড়িয়ে আছে। ওকে আসতে দেখে হাত ছেড়ে দূরত্বে দাঁড়ায় দুজনে। সোহাগের দিকে তাকায় সুমন। সোহাগ অন্যদিকে তাকিয়ে হাসছে। তারানাও অন্যদিকে তাকিয়ে নিজেকে লুকানোর চেষ্টা করছে। হাত ধরে সোহাগের – ভায়া, দশ মিনিটে অনেক এগিয়েছ। এত সাহস আমাদের ছিল না। এখন চলো।

তিনজনে নেমে আসে নিচে।

সোহাগের বাবা এবং এক চাচা এসে তারানাকে দেখে গেছেন। ছেলের বউ হিসেবে তারানাকে দারুণ পছন্দ করেছেন তারা। বিয়ের আনুষ্ঠানিক কথা শুরু হয়েছে। সোহাগ বড় বাসা ভাড়া নিয়েছে ঝিকাতলায়। সুমনের খুব ভালো লাগছে, এই বাসার মানুষদের কাছে কৃতজ্ঞতার কোনো শেষ নেই। অন্তত একটা কাজ তো করে দিতে পারল। তিথি মেয়েদের নিয়ে বিয়ের বাজারে যাচ্ছে। তারানাকে বাসায় নিয়ে সংসারের টিপস দিচ্ছে। ঘণ্টায় ঘণ্টায় সোহাগ আর তিথি সেলে কথা বলছে, এত কথা বলছে, তবু কথা ফুরোয় না। মগবাজার, টিকাটুলী আর ঝিকাতলার তিন বাসা ঘিরে বিয়ের উৎসব চলছে। আর মাত্র আট দিন পর বিয়ে তারানার সঙ্গে সোহাগের।

সোহাগের গ্রামের বাড়ি থেকে বড় দুলাভাই, ভাগ্নি আর ছোট বোন রেহানা আসে ঢাকায়। বিয়ের চারদিন আগে বিকেলের দিকে যায় তারানাদের বাসায়।

রাতেই ফোন করে সোহাগ – সুমনভাই, আপনি কি মানুষ? কঠিন, ভয়ংকর গলা সোহাগের।

চমকে ওঠে সুমন – কী হয়েছে সোহাগ? তুমি এমন করে কথা বলছ কেন?

তারানাদের একটা প্রতিবন্ধী ভাই আছে, আপনি জানাননি কেন?

সোহাগের প্রশ্নে কয়েক মুহূর্ত থমকে যায় সুমন, কী উত্তর দেবে খুঁজে পাচ্ছে না। একটু সময় নিয়ে জবাব দেয়, তুমি বিয়ে করবে তারানাকে – ওর প্রতিবন্ধী ভাই দিয়ে তোমার কী দরকার?

এইটা কোনো কথা বললেন আপনি? আমার ছোট বোন রেহানা গিয়েছিল আজ ওদের বাসায়। বাসার দোতলায় পেছনের একটা রুমের ভেতর থেকে আহত পশুর মতো শব্দ এলে রেহানা ওদিকে যেতে চাইলে তারানা ওকে অন্যদিকে নিয়ে যায়। রেহানা ঘটনাটা জানায় ভাগ্নি রুহিকে। রুহি গোপনে গিয়ে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে দেখে, রুমের মধ্যে একটা মানুষ – চার হাত-পায়ে হাঁটছে আর গো গো করছে। মুখ থেকে লালা পড়ছে – ছি সুমনভাই, আপনি আমার এতবড় ক্ষতিটা কেন করতে চাইলেন? আমি আপনার কী ক্ষতি করেছি?

সোহাগ, আমার কথা শোন। আমি সেই আঠারো-উনিশ বছর ধরে তারানাদের চিনি। ওই প্রতিবন্ধী ছেলেটির নামও সোহাগ।  খুব ভালো ছেলে। আমি ওকে অনেক আদর করি। আর প্রতিবন্ধী সন্তান তো কেউ ইচ্ছে করে জন্ম দেয় না। যদি প্রতিবন্ধী সন্তান হয়, মা-বাবা কি তাকে ফেলে দিতে পারে? প্রতিবন্ধী ভাই সোহাগের জন্য বোন তারানার কী অপরাধ?

সুমন ভাই আমি সরি!

সোহাগ প্লিজ – আমার কথা শোনো।

আমি তারানাকে বিয়ে করতে পারব না সুমনভাই। আমার বাবা-মা, দুলাভাই-বোন কেউ রাজি না। আমাকে আপনি ক্ষমা করবেন। রাখি। সোহাগ সেল কেটে দেয়।

সুমন কথা বলছিল জানালার পাশে দাঁড়িয়ে। আকাশে চাঁদ ভাসছে। সোহাগ ফোনটা কেটে দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সাদা চাঁদটা একখন্ড কালো মেঘে ঢেকে যায়। সুমন অন্ধকারে দাঁড়িয়ে।      দুচোখে জল, জল আর জল…। তারানার জন্য বুকটা হাহাকারে খন্ড খন্ড হয়ে ফেটে যাচ্ছে। চিৎকার করে দুনিয়াকে অভিশাপ দিতে চাইছে। কিন্তু কাকে দেবে অভিশাপ? মানুষ পৃথিবীর কাছে, প্রকৃতির কাছে কত অসহায়, কত ক্ষুদ্র, কত সামান্য? সুমন দেখতে পায়, খালাম্মার কমনীয় মুখের ওপর অভিশাপের সাপ ফণা তুলে নাচছে। জাহিদ বিষণ্ণ যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে। তারানা তা থা থইথই বিষাক্ত আগুন মঞ্চে কত্থক নৃত্য করছে। মনে হচ্ছে পৃথিবীটা একটা অন্ধকার টানেলের ভেতর ঢুকছে শোঁ-শোঁ শব্দের মাতম তুলে। চারদিকে আর্তি আর আর্তনাদের সঙ্গে করুণ বিউগল বাজছে। সুমন প্রাণপণে দুহাতে কান চেপে ধরে…

সোশ্যাল মিডিয়া

নিউসলেটার