ছোট গল্প
-

বন অন্নপূর্ণা
প্রথম মুহূর্তের স্মৃতির অভিঘাত বেশি। মাঝবয়সী এ-নারীকে এখন ঠিক মেলাতে পারছি না। ঘণ্টাখানেক আগে আর এই মুহূর্তের মধ্যে বিস্তর ফারাক। কৃষ্ণা সম্ভবত একটি কথাও সহজে বলতে পারে না। যাই জিজ্ঞেস করি বলে, কেন পত্রিকায় দিবেন? দুপুরে ভাতের সঙ্গে তরকারি কী ছিল জানতে চাইলেও সম্ভবত একই প্রতিক্রিয়া দেখাবে। অবশ্য তার দুপুরের মেন্যু নিয়ে আমার কোনো আগ্রহ…
-

কালো গোলাপের ঘ্র্রাণ
পকেটে শিং মাছ নিয়ে ঘুরে বেড়ানো আর মুনিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা করে চলা একই ব্যাপার। মুনিয়া রাহাত আলমের প্রথম ও একমাত্র স্ত্রী। প্রথমদিকে রাহাতের মনে হতো, মেয়েটা খানিক দুষ্টু, পাজিও কম নয়; সময়ে একদিন সব ঠিক হয়ে যাবে। একসময় সে বুঝতে পারে, তার ধারণা ও প্রত্যাশা ভুল ছিল। কিছই ঠিক হয়নি, মুনিয়ার জেদ ও নখরামি…
-

ঘুমঘোরে এলে মনোহর…
সকালটা অন্যরকম। তোমার মুখের মতো সুন্দর। মোর ঘুমঘোরে এলে মনোহর। এভাবেই আজ মনে পড়লো তোমাকে। ভুলে থাকার সব ধরনের চেষ্টা ভণ্ডুল করে দিয়ে। দিনের শুরুতে যখন চোখের পাতা মেলে ধরে বুঝতে পারলাম, তুমি এসেছিলে আমার একান্ত গোপন স্বপন মাঝারে। আমি ঠিক যেভাবে চাই সেভাবেই, আবার যেভাবে চাই না সেভাবেও! এতোদিন পরে এমন অপ্রত্যাশিত রোমান্টিকতায় পূর্ণ…
-

ঊন-শিথানে রুপালি চাঁদমাছ
আমার ঘরের পাশ দিয়ে লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্সটা শাঁ করে উড়ে গেল। আমি জানি কোনো বিশেষ মানুষের নিথর শরীর বয়ে নিয়ে যাচ্ছে এই সাদা রঙের গাড়ি। মোহন – এক অভিমানী নক্ষত্র। সূর্য ওঠার আগেও ধানমণ্ডি সাতাশ নম্বরে ছিল সে। আর এখন? কিছুদূর এগিয়েই গাড়িটা ব্রেক কষে দাঁড়িয়ে আছে। এই মহামারিকালে থেমে থাকা অ্যাম্বুলেন্স দেখেই লোকজন আতঙ্কে ছুটে…
-

একদিন সাগরে
নগরজীবনে তো আমরা এডিট করে কথা বলি। সব কথা সব জায়গায় বলতে পারি না। কথায় আমরা এডিট করি না ভ্রমণে গেলে। মুখে যা আসে তা-ই বলি। এই ব্যাপারে এক ধাপ এগিয়ে জিসান। সে হাসির কারিগর। তার কথায় হাসতে হাসতে আমাদের পেট ফাঁকা হয়ে যায়। প্রত্যয় কিছুটা ইন্ট্রোভার্ট। তবে যখন কথা বলে তখন হাসির এমন জোয়ার…
-

বিহঙ্গডানার মেয়ে
বটমলি হোমের বারান্দায় সিস্টার মেরি পেটরা দাঁড়িয়ে আছেন অনেকক্ষণ। টান করা পিঠের পেছনে হাতজোড়া দৃঢ় আবদ্ধ আর চোখ দুটো গভীর মনোযোগে নিবদ্ধ মাঠের অ্যাসেম্বলির দিকে। তিনি যেখানে দাঁড়িয়ে তার পাশের দেয়ালেই স্বচ্ছ কাচবন্দি যিশু কাঠের ক্রুশের ওপর ঝুলছেন। দুঃসহ যন্ত্রণা নিয়ে কাতর শীর্ণ শরীর – একদিকে কাত হয়ে থাকা আর্ত-ব্যথিত মুখে তবু সান্ত্বনা ও সাহসের…
-

এক নষ্ট মেয়ের আপ্তবয়ান
আমার ঘুমের ঘোরেই তিনি আমাকে ধর্ষণ করলেন। হ্যাঁ, ধর্ষণ। ইচ্ছের অমতে যৌনকর্মকে ধর্ষণই তো বলে। কিন্তু যেহেতু সেই রাতে আমি তার স্ত্রীর তকমা গলায় জড়িয়েছি; সমাজ তাই আমার অভিযোগ গ্রহণ করবে না। তাকে শাস্তি দেওয়ার জন্য আমাকে অনেকদিন অপেক্ষা করতে হয়েছে। কথাগুলো বলেই আনমনা হলো রাখি – এক আমার বিয়ে হতে যাচ্ছে তারই সঙ্গে যিনি…
-

কন্যাকাটা ভিটা
‘শীতের দিনেও এখানে হাঁটুজল থাকতো। ভাই-বেরাদাররা মাছ ধইরা আনতো। কত পদের মাছ। আর ওই মাছের স্বাদও আছিল অনেক। আর শ্রাবণ মাসে তো থইথই জল। ডিঙি নিয়া লোকজন ফসল তুলতো। পাট কাটতো। ওরে আল্লাহ, সাপের কথা আর কী কমু! কতজনরে যে সাপে কাটলো, তা ওঝার বাপেও জানে না। ‘এখন এ জায়গা চেনা যায় না। চেনার কোনো…
-

রেহানা ও তার গাছ
তখনো একটা মুনিয়া পাখি তেঁতুলগাছের মাথায় বসে একগুঁয়ের মতো আলোর একটা প্রান্ত টেনে ধরে রেখেছিল। নয়তো সন্ধ্যা কবেই নেমেছে। বাড়ির আঙিনায়, গোয়ালঘরে, বাঁশঝাড়ে, সর্বত্রই। শুধু গাঙ্গুলিদের বাড়ির মস্ত তেঁতুলগাছের পেছনে ক্ষেত থেকে তুলে আনা পাকা টমেটোর মতো একফালি আকাশ। মুনিয়া পাখির দাপাদাপি আর অসময়ের গানে বিকেলটা যেন থেমে আছে সেখানে। সন্ধ্যার শিহরণ ধীরে ধীরে ছড়িয়ে…
-

হাইফেন
একটু আগেই ড্রাইভারকে ছুটি দিয়েছিল সোহানা। সে জানত না আকরাম এতো তাড়াতাড়ি অফিস শেষ করে এসেই বলবে, ‘চলো, তোমাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাই। অনেক কষ্টে সিরিয়াল পেয়েছি এখানে অনেক রোগীর ভিড়ে। এক মাস আগেই নাকি সিরিয়াল নিতে হয়। তোমার নয় নম্বর। অনেক কষ্টে ম্যানেজ করেছি। তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে নাও।’ একটানে কথাগুলি বলে যায় আকরাম। যদিও…
-

নিঃসঙ্গ কলতান
ফেব্রুয়ারির সকালবেলার হালকা শীত শীত ভাবটা গায়ে যেন মখমল কাপড়ের মতো আরামে জড়িয়ে থাকে। ভোরের দিকে মাখনের মতো নরম কাঁথাটা আরো ভালো করে গায়ে জড়িয়ে নিলাম। পুরনো শাড়ি দিয়ে হাতে সেলাই করা নরম কাঁথা। মফস্বল শহরগুলোতে এখনো এসব সহজেই পাওয়া যায়। ছোটবেলায় দেখেছি, মা তার পুরনো শাড়িগুলো জমিয়ে, সেগুলো দিয়ে কাঁথা বানাতে দিয়ে দিত। খুলনায়…
-

একটি লাল ফড়িংয়ের গল্প
এক পুবের আমগাছের ছায়াটা গুটিগুটি পায়ে যেন সেতু মিয়ার দিকে এগিয়ে আসছে। ছায়াটা ঠিক নিরেট ছায়া নয়, রোদের খানিকটা লুকোচুরি আছে ছায়ার ভেতর। কিন্তু সেতু মিয়ার প্রয়োজন নির্ভেজাল রোদ। সে নির্ভেজাল রোদের জন্য এরই মধ্যে তিনবার জায়গা বদল করেছে। পিঁড়ি পেতে সে প্রথমে বসেছিল ঘরের দাওয়ায়। রোদটা সেখান থেকে সরে যেতেই সে গিয়ে পুবের খোলা…
