শ্রদ্ধান্জলি
-

একজন আনিসুজ্জামান!
আমি কোথায় পাব তাঁরে? আমার বাবা অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের মৃত্যুর পর তো বটেই, জীবদ্দশাতেই আমার তাঁকে ঘিরে সবসময় এই প্রশ্নটা মনে হতো বারবার। বাবা আনিসুজ্জামানকে আমি এবং আমার বোনেরা সারাজীবন খুঁজেই বেড়িয়েছি, কিন্তু তাঁকে আমাদের করে আমরা কখনোই পাইনি; পেয়েছি অনেক মানুষের ভিড়ে, কখনো মঞ্চে, কখনো আন্দোলনে। তাঁকে জেনেছি তাঁর লেখা পড়ে অথবা অন্যের সম্ভাষণে। তাই…
-

অজস্রতায় তিনি
কালি ও কলমের স্মারক সংখ্যার আয়োজন হলেই একটা চাপা ব্যথা অনুভব করি। এই কর্মতৎপরতার মধ্য দিয়ে যেন বিষাদভরে নিশ্চিত হই কোনো বিশেষ ব্যক্তির প্রস্থান সম্বন্ধে। আরেকটা নক্ষত্র খসে পড়ল, আলো একটু কমে গেল। সামনের সারির সাহিত্য-পত্রিকার কাছে এরকম একটি সংখ্যা সকলেই প্রত্যাশা করেন। এটাই তো কাজ। তাই কবি শামসুর রাহমান থেকে শুরু করে রবিউল হুসাইন…
-

বাংলা ভাষার বৈশ্বিক রূপ দেওয়ার স্বপ্ন দেখতেন তিনি
এক মাস হয়ে গেল পিতৃসমতুল্য একজন অভিভাবকের প্রস্থান হলো। জাতি হারাল একজন শিক্ষাবিদকে, যিনি ছিলেন আপাদমস্তক একজন অসাম্প্রদায়িক মানুষ। ১৪ মে ৮৩ বছর বয়সে বাংলাদেশ সময় বিকেল ৪টা ৫৫ মিনিটে ঢাকায় সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় বাংলাদেশের জাতীয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামান প্রাণত্যাগ করেন। মৃত্যুর পর নমুনা নিয়ে পরীক্ষা করা হয় সিএমএইচে। হাসপাতালের চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, তাঁর…
-

অখণ্ড বাংলার চারণিক – আনিসুজ্জামান
কথাটা নতুন নয়। সকলেই জানেন। তবু এই মরণোত্তর রচনার ভিত গড়ার খাতিরে এ-কথা আরেকবার বলা থাকুক যে বাংলায় আত্মজীবনী লেখার চল বেশিদিনের নয়। সাহেবি আমলেই এতে আমাদের হাতেখড়ি। খ্রিষ্টীয় উনিশ শতকের মাঝামাঝি। পাকা হাতের দু-চারটে লেখা বেরোতে না বেরোতেই ভিক্টোরিয়ান মর্যালিটি আর ব্রাহ্ম ন্যায়নীতিবোধ তাকে এমনভাবে পেড়ে ফেলেছিল যে হাত খুলে লেখার রেওয়াজ কোনোদিনই গড়ে…
-

আনিসুজ্জামান : পরিমিতির প্রতীক
তখনো পর্যন্ত সামনাসামনি দেখা হয়নি, শুধু তাঁর স্বরূপের সন্ধানে পড়েছি। চট্টগ্রাম সরকারি কলেজে সাহিত্যের স্নাতক শ্রেণির পাঠ্যে কাজে লাগাই আনিসুজ্জামান-রচিত গ্রন্থটি। চর্যাপদ, মধ্যযুগ, বাঙালি মুসলমান লেখকদের তথা বাংলাদেশের সৃজনশীল-মননশীল সাহিত্য ও সমাজের বিশ্লেষণে তাঁর লেখা গ্রন্থর্ভূত চারখানা প্রবন্ধ সত্যিকার অর্থেই ছিল দিকনির্দেশনামূলক। সেই বিখ্যাত লেখক টানা করিডোর ধরে হেঁটে যান ধ্যানী-মৌন এক ভঙ্গিতে আর আমরা…
-

আরো এক সূর্যময় মান : আনিসুজ্জামান
সে আমি আমার সামনে যেই চিত্র মেলি, তিনি তার রূপ শুদ্ধ করেন – আমি যে আমার মাটি যেই কর্মে ধরি, তিনি তার ঘ্রাণ মুগ্ধ করেন – বৃত্তের কেন্দ্রে তিনি অবলম্বনের অনিবার্য শ্বাস হয়ে থাকেন। জনপথে, গণযাত্রায়, কল্যাণের নিত্য সুতোয় বাঁধেন সময়ের সম্মিলিত আখ্যান। আলো ও মুক্তি যেন পরস্পর ভালোবাসা দিয়ে, বোধ দিয়ে, দায় দিয়ে নির্ণয়…
-

রবীন্দ্রনাথ : আনিসুজ্জামানের চোখে
১৮৮৬ সালে মাত্র পঁচিশ বছর বয়সে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কড়ি ও কোমল কাব্যগ্রন্থের ‘প্রাণ’ কবিতায় লিখেছিলেন – মরিতে চাহি না আমি সুন্দর ভুবনে, মানবের মাঝে আমি বাঁচিবারে চাই। সুন্দর পৃথিবীতে মানুষের মধ্যে বেঁচে থাকার এই প্রার্থনা ও প্রবর্তনাকে নিজের জীবনে পূর্ণমাত্রায় আত্মস্থ ও অঙ্গীকার করেছিলেন তিনি; উত্তরসূরি আনিসুজ্জামানেও সুলক্ষ তারই অবিকল অনুরণন, তাঁর জীবনকৃতি প্রবল প্রতাপে…
-

আনিসুজ্জামানের গবেষণার দুয়েকটি দিক
অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র আনন্দ জামান ফেসবুকে লিখেছেন, ‘এত ভক্তি, এত শ্রদ্ধা, এত ভালবাসা! আব্বার আর চাওয়ার কিছু নেই। একটি পরিপূর্ণ জীবনের সমাপ্তি।’ সত্যি, তাঁর জীবন ভালোবাসা ও পরিপূর্ণতায় ভরা। তিনি ছিলেন শিক্ষক। কৈশোরে ছবি বিশ্বাসের অভিনয় দেখে তাঁর ইচ্ছে হয়েছিল আইনজীবী হওয়ার। কিন্তু শেষ পর্যন্ত হলেন শিক্ষক। শিক্ষক হিসেবে তাঁর সাফল্য কিংবদন্তিতুল্য।…
-

স্মৃতির সঙ্গে রয়ে গেল আরো অনেককিছু
আনিসুজ্জামানকে এ-সময় পৃথিবীর খুব দরকার ছিল। এখন এমন একটা সময় এসেছে, যখন প্রযুক্তি আমাদের হাতের মুঠোয় আর কুসংস্কার আমাদের হৃদয়ে গেড়ে বসেছে। মোবাইল ফোন ব্যবহার করে আজ মুহূর্তে ছড়ানো যায় অবৈজ্ঞানিক গুজব, ঘটানো যায় ভয়াবহ রক্তপাত। এই সময়ে আনিসুজ্জামানের প্রয়াণ খুব বড় ক্ষতি করে দিলো বাংলাদেশের, ভারতবর্ষের। এটা বললেও অত্যুক্তি হবে না, গোটা পৃথিবীর ক্ষতি…
-

আমার শিক্ষক ডক্টর আনিসুজ্জামান
১৯৬৫ সাল। উত্তাল ষষ্ঠ দশকের মধ্যলগ্ন। বাঙালি জাতীয়তাবাদ তখন উত্তুঙ্গে উঠছে। আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে অনার্স পাঠের জন্যে ভর্তি হয়েছি। ততদিনে আমি ঢাকার পত্রিকামহলে এক খুদে দুঁদে সাংবাদিক হয়ে উঠছিলাম। পেশায় জায়মান হলেও কিন্তু ডিগ্রি অর্জনে কয়েক বছর পিছপা ছিলাম। আমার সহপাঠীরা কেউ কেউ আমাকে ডাকে ‘চাচা’ বলে। আবার, সার্বক্ষণিক ছাত্র ও…
-

আনিস স্যারকে যেমন দেখেছি
অসুস্থ হয়ে শেষবারের মতো হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার সম্ভবত মাসখানেক আগে একদিন সকাল দশটা-সাড়ে দশটার দিকে আনিস স্যার ফোন করে আমাকে জানিয়েছিলেন, তাঁকে নিয়ে আমার লেখাটি তাঁর ভালো লেগেছে। তিনি সেদিনই সকালে ভোরের কাগজে লেখাটি পড়েছেন বলায় আমি তাঁকে জানিয়েছিলাম যে, লেখাটি আমার নতুন কোনো লেখা নয়; সেটি আমার আগের লেখা এবং তাঁকে নিয়ে চন্দ্রাবতী একাডেমি…
-

আনিসুজ্জামান : তাঁর মনীষী-বীক্ষণ
স্মৃতিই হারিয়ে যাওয়া সময় ও মানুষকে ফিরিয়ে আনে। ‘স্মৃতি সততই সুখের’ – প্রবচনতুল্য এই কথাটির দ্যোতনা অস্বীকার না করেও বলা যায়, এই সুখের আড়ালে আবার লুকিয়ে থাকে কত না দুঃখের ইতিহাস, শোক-বেদনা-বিচ্ছেদের দীর্ঘশ্বাস আর হাহাকার – বিস্ময়ের জাগরণ, লুপ্ত রত্নের উদ্ঘাটন। অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের মনীষী-বীক্ষণ দুই পর্বে বিন্যস্ত : বিদ্যাসাগর ও অন্যেরা (২০১৮) গ্রন্থে আলোকপাত করেছেন…
