‘Gitanjali second series’ ও সি. এফ. অ্যান্ডরম্নজ : একটি নেপথ্য কাহিনি

লেখক:

সুভাষ মুখোপাধ্যায়

খ্যাতি অখ্যাতির সৌরীন্দ্র মিত্র মন্তব্য করেছেন যে, রবীন্দ্রনাথ নোবেল পুরস্কারে অলংকৃত হয়ে বিশ্বসাহিত্যে আসন লাভ করার পর অনেকেই সন্দেহ করেছিলেন ‘এ কীর্তি নিশ্চয় তাঁর একক শক্তিতে সম্ভব হয়নি, নিশ্চয় তাঁর রচনা সংশোধন করবার জন্য – হয়তো বা পুরোটাই লিখে দেবার জন্য – কোনো এক প্রচ্ছন্ননামা ব্যক্তি নেপথ্যে ছিলেন। কে সেই ব্যক্তি? কেউ অনুমান করলেন অ্যান্ডরম্নজ, কেউ বা বললেন ডবস্নু বি য়েট্স।’

এই প্রসঙ্গে সেŠরীন্দ্র মিত্র নানা তথ্যাদি সহযোগে য়েট্স-সম্পর্কিত ধারণাটি মিথ্যা প্রমাণ করার চেষ্টা করলেও অ্যান্ডরম্নজের বিষয়টি এড়িয়ে গেছেন।

প্রশ্ন হলো রবীন্দ্রনাথের ইংরাজি গীতাঞ্জলি প্রসঙ্গে য়েট্সের নাম উত্থাপিত হওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে; কিন্তু এই প্রসঙ্গে অ্যান্ডরম্নজের নাম উঠে আসার কারণ কী?

গীতাঞ্জলির কথা বলতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথও অনেকবার য়েট্স- প্রসঙ্গ আনলেও অ্যান্ডরম্নজের বিষয়ে তেমন উচ্চবাচ্য করেননি। কিন্তু দিলীপকুমার রায়ের সঙ্গে ‘আলাপ-আলোচনা’য় রবীন্দ্রনাথ তাঁর ইংরাজি গীতাঞ্জলি কেমন করে ‘ইংরেজ সাহিত্যিক কুলে’ সমাদর লাভ করল সে-কথা বলতে গিয়ে য়েট্সের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ, নিজের ইংরেজি জ্ঞানের দৈন্য স্বীকারের পাশাপাশি হঠাৎ করে অ্যান্ডরম্নজের প্রসঙ্গ তোলেন। অকপটেই যেন বলেন –

‘…আমার ইংরেজি তরজমাও আমি সসংকোচে কোনো কোনো ইংরেজি-জানা বাঙালি সাহিত্যিককে শুনিয়েছিলেম, তাঁরা ধীর গম্ভীর শান্তভাবে বলেছিলেন মন্দ হয়নি, আর ইংরেজি যে অবিশুদ্ধ তাও নয়। সে-সময়ে এ-রম্নজের সঙ্গে আমার আলাপ ছিল না।’

গীতাঞ্জলির অনুবাদের ‘অবিশুদ্ধ’ ইংরাজি বা ‘মন্দ’ না হওয়ার সঙ্গে ‘সে-সময়ে অ্যান্ডরম্নজের সঙ্গে’ আলাপ না থাকার কী সম্পর্ক? সৌরীন্দ্র মিত্র তাঁর গ্রন্থের ৩৪ পাতায় এ-বিষয়ে মন্তব্য করেছেন –

‘এর মধ্যে [গীতাঞ্জলির পাঠ সংস্কার] য়েট্স অথবা অপর যে-কোনো ব্যক্তির সহযোগিতায় পা-ুলিপি-সংস্কারের যে একটা বিশেষ প্রণালীর আভাস পাওয়া যাচ্ছে…, তার তাৎপর্যটাও লক্ষণীয় এবং স্মরণীয়। অর্থাৎ

পা-ুলিপি-সংস্কারের কাজে এই যে collaboration তাতে য়েট্সের যেটুকু ভূমিকা ছিল সেটা correct করারও নয়, revise করারও নয়, শুধুমাত্র suggest করার।’

‘এর মধ্যে [গীতাঞ্জলির পাঠ সংস্কার] য়েট্স অথবা অপর যে-কোনো ব্যক্তির সহযোগিতায় পা-ুলিপি-সংস্কারের যে একটা বিশেষ প্রণালীর আভাস পাওয়া যাচ্ছে…, তার তাৎপর্যটাও লক্ষণীয় এবং স্মরণীয়। অর্থাৎ পা-ুলিপি-সংস্কারের কাজে এই যে collaboration তাতে য়েট্সের যেটুকু ভূমিকা ছিল সেটা correct করারও নয়, revies করারও নয়, শুধুমাত্র  suggest করার।’

রবিজীবনীকার প্রশান্তকুমার পাল এই ব্যাপারে ‘অপর যে-কোনো ব্যক্তির সহযোগিতা’র আভাস পেলেও নির্ভরযোগ্য তথ্যের অভাবে শনাক্ত করতে পারেননি। কিন্তু রবিজীবনী ষষ্ঠ খ–র ৩২৩ পৃষ্ঠায় গীতাঞ্জলির পাঠ সংস্কার বিষয়ে ‘Everyman’s Library Series’-এর সম্পাদক Ernest Rhys-এর একটি পাঠ পর্যালোচনা তুলে ধরে মন্তব্য করেছেন –

‘এইসব পরিবর্তনের চেয়েও গুরম্নতর প্রভেদ দেখা যায় প্যারাগ্রাফের গঠনে ও কবিতাগুলির বিন্যাসে। বিন্যাসে কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যায়নি।’

সৌরীন্দ্র মিত্র অপর ব্যক্তির সহযোগিতায় গীতাঞ্জলির পাঠ-সংস্কারের ক্ষেত্রে ‘বিশেষ প্রণালী’র ব্যবহার লক্ষ করেছেন শুধু নয়, পরবর্তী কয়েকটি উদ্ধৃতির দ্বারা যা সমর্থিত হবে’ বলেও জোর দিয়েছেন সেই তিনিই আবার তাঁর গ্রন্থের উপরোক্ত বক্তব্যের মাত্র এক পৃষ্ঠা আগে অর্থাৎ ৩৩ পৃষ্ঠায় মন্তব্য করেছেন –

‘ইংরেজি গীতাঞ্জলির সংস্কারকার্যে একমাত্র য়েট্সকেই কবির সঙ্গে সহযোগিতা করতে দেখা যায়, তার কারণ তখন পর্যন্ত ইংলন্ডের সাহিত্যিক মহলে কবির বিসত্মৃত ঘনিষ্ঠতা বা পরিচয় হয়নি।’

গীতাঞ্জলির অনুবাদের ব্যাপারে ‘চিরোল বিতর্কে’র পর চিরোলের মতকে তথ্যপ্রমাণাদির সাহায্যে বলিষ্ঠভাবে যাঁরা খ-ন করতে প্রয়াসী হয়েছিলেন তাঁদের মধ্যে সৌরীন্দ্র মিত্র অন্যতম। সুতরাং তাঁর মতামতের গুরম্নত্ব আছে। কিন্তু তাঁর উক্ত স্ববিরোধী মন্তব্যে আমাদের থমকে যেতে হয়।

তাহলে এর একটা ব্যাখ্যায় আসা যেতে পারে যে ‘অপর যে-কোনো ব্যক্তি’ বলতে তিনি কোনো সাহিত্যিক নন এমন কাউকে বোঝাতে চেয়েছেন।

প্রশ্ন হলো এঁরা কারা? সংখ্যায় এঁরা একজন না কি তার বেশি?

গীতাঞ্জলির অনুবাদের কাজে য়েট্সের গুরম্নত্বকে খর্ব করবার জন্যেই প্রমাণ হিসেবে সৌরীন্দ্র মিত্র ব্যবহার করেছেন দুজনের নাম; একজন রোদেনস্টাইন অন্যজন অ্যান্ডরম্নজ। প্রথমজন শিল্পী, দ্বিতীয়জন মিশনারি। তাঁর মন্তব্যটি ছিল –

‘কিন্তু রোটেনস্টাইন ছাড়াও ওই সময়ে রবীন্দ্রনাথের এবং য়েট্সের অন্তরঙ্গ সান্নিধ্যে আরও কেউ কেউ ছিলেন যাঁরা রোটেনস্টাইনের মতোই ইংরেজি গীতাঞ্জলির পা-ুলিপি-সংস্কারের ব্যাপারে প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য দেবার অধিকারী ছিলেন।’ (বাঁকা হরফ সংযোজিত) দুজনের কেউ সাহিত্যিক নন।

আমাদের রেখাঙ্কিত অংশটি লক্ষ করবার মতো। অর্থাৎ ইংরাজি গীতাঞ্জলির পা-ুলিপি সংস্কারের ক্ষেত্রে ‘আরও কেউ কেউ’-এর গুরম্নত্বটা রোদেনস্টাইনের মতোই বলে তাঁর অভিমত। তাই হয়ত প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য দেওয়াটা তাঁদের অধিকারের মধ্যে পড়ে।

ওই কাজে রোদেনস্টাইনের ভূমিকা কী ছিল সে-বিষয়ে বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছেন অশ্রম্নকুমার সিকদার তাঁর রবীন্দ্রনাথ ও রোদেনস্টাইন গ্রন্থে।

ইদানীংকালে উইলিয়াম রাদিচে গীতাঞ্জলির নতুন অনুবাদ করতে গিয়ে গ্রন্থের ভূমিকার পাঁচ নম্বর অধ্যায়ে এই বিষয়ে কিছুটা আলোকপাত করেছেন। সেখানে তিনি ইংরাজি গীতাঞ্জলির প্রকাশনার কাজে ‘Andrews was a part of the group’ বলে উলেস্নখ করেছেন। সৌরীন্দ্র মিত্র অ্যান্ডরম্নজের গুরম্নত্বটাকে স্বীকার করেও সযত্নে এড়িয়ে গেছেন; যেহেতু ইয়েট্সের দাবিকে খর্ব করাই ছিল তাঁর প্রধান উদ্দেশ্য। তাই সযত্নে তাঁর এড়িয়ে যাওয়া মন্তব্যটি ছিল –

‘য়েট্স ছাড়াও এযাবৎ গীতাঞ্জলির পা-ুলিপির উপর মতামত প্রকাশ করেছেন ব্রাডলি, ব্রম্নক, মে সিনক্লেয়ার প্রমুখ অনেকে – এগুরম্নজ এবং রোদেনস্টাইনের কথা না হয় নাই ধরলাম।’৭

চিরোলের মতকে খারিজ করতে গিয়ে তিনি অ্যান্ডরম্নজ-প্রসঙ্গটি এড়িয়ে গেলেও অ্যান্ডরম্নজের বিষয়টি বোধহয় এতটা গুরম্নত্বহীন ছিল না।

রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে অ্যান্ডরম্নজের প্রথম প্রত্যক্ষ পরিচয় হয় ৭ জুলাই ১৯১২ হামস্টেড হিথে রোদেনস্টাইনের বাড়িতে ইংরাজি গীতাঞ্জলির কবিতা পাঠের আসরে। বাংলা ২৩ আষাঢ় ১৩১৯ রবিবার।৮

৭ জুলাই ১৯১২ রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে অ্যান্ডরম্নজের প্রথম প্রত্যক্ষ পরিচয় ঘটলেও রবীন্দ্রসাহিত্যের সঙ্গে অ্যান্ডরম্নজের পরিচয় হয়েছিল আরো অনেক আগে। তার প্রমাণ The Modern Review, মার্চ, ১৯১২ সংখ্যার ২৯২ পৃষ্ঠায় প্রকাশিত অ্যান্ডরম্নজের ‘To Rabindranath Tagore’ শীর্ষক কবিতা। এটির টাইপ কপি বর্তমানে রবীন্দ্রভবন সংগ্রহালয়ে ‘Andrews papers’-এর অন্তর্গত ৩২ নম্বর ফাইলে (image No.159) রক্ষিত আছে।

 

To Rabindranath Tagore

Rabnndra, lord of a new world of song,

Heir of the sacred rishis [Sic] of old time,

This homage comes from a far distant clime

To hail thee crowned amid the immortal throng,…

রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে আগে থেকেই তাঁর ধারণা থাকার উলেস্নখ পাই তাঁর ‘An evening with Rabindra’ নামক প্রবন্ধেও।

‘I had never been able to meet him in my short visits to Calcutta, though I had read with profound and increasing interest every translation of his poems I could find, and heard of him from a hundred admirers.’১০

রবীন্দ্রনাথও যে অ্যান্ডরম্নজ সম্পর্কে অবহিত ছিলেন তা অনুমান করে প্রশান্তকুমার পাল লিখেছেন –

‘১৯০৭ থেকে মডার্ন রিভিয়্যু ও অন্যান্য পত্রিকায় অ্যান্ডরম্নজের অনেক লেখা ও ভাষণের প্রতিবেদন মুদ্রিত হয়েছিল। রবীন্দ্রনাথ নিশ্চয়ই তার অনেকগুলি পড়ে আকর্ষণ বোধ করেছেন।’১১

অ্যান্ডরম্নজ যেভাবে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে তাঁর প্রথম সাক্ষাৎকারটির বর্ণনা দিয়েছেন তাতে মনে হয় রবীন্দ্রনাথও তাঁকে দেখে উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠেছিলেন –

‘Oh! Mr. Andrews I have so longed to see you, I cannot tell you how I have longed to see you.’১২

এখানে উলেস্নখ্য যে, ১৯০৬ সালে কলকাতায় জাতীয় কংগ্রেসের অধিবেশনে রবীন্দ্রনাথ এবং অ্যান্ডরম্নজ দুজনেই আমন্ত্রিত ছিলেন; কিন্তু অ্যান্ডরম্নজ উপস্থিত থাকলেও রবীন্দ্রনাথ সম্ভবত উপস্থিত থাকতে পারেননি, নাহলে সেদিনই দেখা হবার সম্ভাবনা ছিল।

অন্যদিকে প্রশান্তকুমার পাল তাঁর রবিজীবনীর ষষ্ঠ খ– নানা তথ্যাদিসহযোগে দেখিয়েছেন যে য়েট্স এবং রবীন্দ্রনাথ একত্রে বসে উক্ত পাঠ-সংস্কারের কাজ শুরম্ন করেছিলেন ১৮ জুলাই ১৯১২ (বাংলা ২ শ্রাবণ ১৩১৯ বৃহস্পতিবার) থেকে; এবং তা সমাধা হয়েছিল ২ আগস্ট ১৯১২, বাংলা ১৭ শ্রাবণ সোমবার এর দুদিন আগে।

দিনের হিসাবে এই সংখ্যা চার-পাঁচ দিনের বেশি হবে না বলে তিনি মন্তব্য করেছেন; যদিও ১৮ জুলাই থেকে ২ আগস্ট এর দুদিন আগে পর্যন্ত হিসাব দাঁড়ায় ১২ দিন। সৌরীন্দ্র মিত্র এই সময়কাল ধরেছেন ১৭ জুলাই থেকে ৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত অর্থাৎ ‘দেড়মাস’।

হামস্টেড হিথে কবিতা পাঠের আসর বসার তারিখ রবিজীবনীকারের মতে ৭ জুলাই। য়েট্সের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের প্রথম বসার তারিখ সৌরীন্দ্র মিত্রের মতে ২৭ জুন। এ বিষয়ে তাঁর যুক্তিটি হলো – ‘২৭ শে জুন তারিখেই যে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে তাঁর প্রথম সাক্ষাৎ ঘটে ফ্লোরেন্স ফারকে (মিসেস এমেরি) ওই তারিখেই লিখিত একটি চিঠিতে তার প্রমাণ আছে।’১৩

অর্থাৎ অ্যান্ডরম্নজের সঙ্গে প্রথম সাক্ষাৎ ও য়েট্সের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের প্রথম সাক্ষাৎ – এই দুই তারিখের মধ্যে ব্যবধান কোনোমতেই ১০ দিনের বেশি হবে না। অথচ রবীন্দ্রনাথের লেখার সঙ্গে অ্যান্ডরম্নজের পরিচয় আরও অনেক আগে।

সুতরাং ‘ইংরাজি গীতাঞ্জলির সংস্কারকার্যে একমাত্র য়েট্সকেই কবির সঙ্গে সহযোগিতা করতে দেখা যায়, তার কারণ তখন পর্যন্ত ইংল্যান্ডের সাহিত্যিক মহলে কবির বিসত্মৃত ঘনিষ্ঠতা বা পরিচয় হয়নি’ বলে সৌরীন্দ্র মিত্রের বক্তব্যটি পুরোপুরি সমর্থনযোগ্য নয়।

১৯১২-য় রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে অ্যান্ডরম্নজের সাক্ষাতের অনেক আগেই মডার্ন রিভিউতে রবীন্দ্রনাথের লেখা প্রকাশিত হয়েছিল। অ্যান্ডরম্নজ সেখান থেকেই রবীন্দ্র কবিতার কিছু নমুনা পেয়েছিলেন। তাছাড়া রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে যদি অ্যান্ডরম্নজের কোনো ধারণা নাই
থাকত তাহলে বিনা আমন্ত্রণে কেনই বা তিনি রোদেনস্টাইনের বাড়িতে ছুটে গিয়েছিলেন শুধুমাত্র রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য? সেই সময় রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে দেখা করার ব্যাপারে অ্যান্ডরম্নজের মধ্যে যে অস্বাভাবিক আগ্রহ দেখা গিয়েছিল তা রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে পূর্ব ধারণা না থাকলেও কখনোই তা দেখা যেত না।

দ্বিতীয়ত সাহিত্যিক ছাড়াও আরো কারম্নর বিশেষত অ্যান্ডরম্নজের, কাছ থেকে রবীন্দ্রনাথ যে-সাহায্য পেয়েছিলেন তার উলেস্নখ সৌরীন্দ্র মিত্র নিজেই করেছেন। এবং এ-বিষয়ে প্রশান্তকুমার পাল ও উইলিয়াম রাদিচেরও সমর্থন পাওয়া যায়; এমনকি গীতাঞ্জলির পাঠ-সংস্কারের কাজে অ্যান্ডরম্নজের গুরম্নত্ব হঠাৎই বেড়ে গিয়েছিল। বিশেষত নির্ভুল ইংরাজি হয়েছে কিনা এ-ব্যাপারে রবীন্দ্রনাথকে অ্যান্ডরম্নজের ওপর কিছুটা বেশিই নির্ভরশীল হতে দেখা যায়। প্রসঙ্গত আরো একটা বিষয় উলেস্নখ্য যে, ‘৩০ শে জুন তারিখে রোটেনস্টাইনের গৃহে আর্নেষ্ট রিজ, এলিস মেনেল, মে সিন্ক্লেয়ার, ইভ্লিন আন্ডারহিল, এজরা পাউন্ড, নেভিনসন, অ্যান্ডরম্নজ প্রমুখ সুনির্বাচিত শ্রোতৃগোষ্ঠীর উপস্থিতিতে য়েট্স উক্ত টাইপ-কপি থেকে কয়েকটি কবিতা পাঠ করে শোনান’১৪ বলে সৌরীন্দ্র মিত্রের মন্তব্যটিতে উলিস্নখিত তারিখটিও যে ঠিক নয় তা প্রশান্তকুমার পাল নানা তথ্যসহযোগে প্রমাণ করেছেন।১৫

রোদেনস্টাইনের বাড়িতে ৭ জুলাই কবিতা পাঠের আসর এবং ১০ জুলাই [বুধ, ২৬ আষাঢ়] ‘স্ট্রোকাডেরো রেসেত্মারাঁয়’ ইন্ডিয়া সোসাইটির উদ্যোগে রবীন্দ্রনাথের সংবর্ধনা দেওয়ার অনুষ্ঠান – এই দুটোতেই অ্যান্ডরম্নজ উপস্থিত ছিলেন।১৬

পরে ‘An Evening with Rabindra’, এবং ‘With Rabindra in England’ দুটি প্রবন্ধেই তিনি সেই প্রসঙ্গ উলেস্নখ করেছেন। পাশাপাশি সেদিন য়েট্সের মুখে শোনা রবীন্দ্র-কবিতার ভূমিকা এবং Song offerings-এ প্রকাশিত ভূমিকার যে কোনো তফাৎ ছিল না সে-প্রসঙ্গও উলেস্নখ করেছেন। গ্রন্থ-সমালোচনা করে তিনি য়েট্সের লেখা ‘introduction’-কে ‘super ficial’ বলেছেন। তিনি দাবি করেছিলেন যে, রবীন্দ্রনাথের কোনো ‘interpreter’-এর প্রয়োজন নেই। তাই য়েট্সের ভূমিকাটি তিনি প্রকাশিতব্য! Song offerings থেকে বাদ দেবার পরামর্শ দিয়েছিলেন।  ‘I have written to Mr. Rothenstein about that sentence in the Introduction. I do hope it may be omitted. I wish this Introduction were more worthy of the poems.’১৭

বক্তব্যের তীক্ষনতা দেখে চিঠিটা পরামর্শমূলক বলে মনে হয় না, বরং প্রস্তাব বলে মনে হয়। এটি বাদ দেওয়ার কারণ হিসেবে উলেস্নখ করেছেন, ‘…It was altogether unsatisfying and very superficial. However the poems will be their own interpreters to all really spiritual minds among the multitude who will read them.১৮ এই বিষয়ে তিনি রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে আলোচনা করতেও রাজি আছেন বলে লিখেছেন –

‘It is quite possible that the revised proof may be out by that time and we could go

through it together.১৯ তাই তাঁর অনুরোধ ‘if a copy of the proof addressed to me comes to your address would you keep it for me?২০

৬ অক্টোবরের চিঠিতে তার আগে জানিয়েছিলেন যে ট্রেনে যেতে যেতে তিনি গীতাঞ্জলির কবিতাগুলি পড়েছেন, পড়ে তাঁর চোখে জল এসেছিল। তাই মনে হয়েছে গীতাঞ্জলি প্রকাশ পাবার আগে একবার রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে তাঁর সামনাসামনি বসা দরকার। সে-কথা জানিয়ে ৬ তারিখের চিঠিতে লিখেছিলেন –

‘I am coming up to London on Thursday Oct. 10. I wonder if we might go up to Mr. Rothenstein’s together. I want to spend Friday with you if possible. … I will call for you on Thursday morning probably about 12 O’clock. We might go to Mr. Rothenstein’s to lunch and spend the afternoon with him.’২১

কিন্তু ওইদিন (‘Thursday’) রোদেনস্টাইন ব্যসত্ম থাকবেন জেনে অ্যান্ডরম্নজ পরের দিন ৭ তারিখ লেখেন –

‘Mr. Rothenstein tells me he is busy on Thursday. Perhaps we could go to him on Friday instead.’২২

অ্যান্ডরম্নজ বিষয়টাকে কতটা গুরম্নত্ব দিয়েছিলেন তা বোঝা যায় রোদেনস্টাইনের সঙ্গে বৈঠক বানচাল হয়ে যাবার পরও রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে বসতে চাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ থেকে। এক্ষেত্রে কোথাও তাঁর একটা নাছোড়বান্দা মনোভাবের পরিচয় পাওয়া যায়।

নীরদচন্দ্র চৌধুরী এই ঘটনাকে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে য়েট্সের ‘ঝগড়া বাধাইবার চেষ্টা’ বলে মন্তব্য করেছেন এবং য়েট্সের ‘Introduction’ সম্বন্ধে অ্যান্ডরম্নজের করা সমালোচনা প্রসঙ্গে লিখেছিলেন, ‘অ্যান্ডরম্নজ নিছক ঈর্ষাপরায়ণতা হইতে ইহার নিন্দা করিয়াছিলেন।’ এমনকি ‘‘গীতাঞ্জলি’’র ইংরেজি সম্বন্ধে অ্যান্ডরম্নজ যাহা বলিয়াছিলেন, উহাও ঈর্ষারই বশে। য়েট্স রবীন্দ্রনাথের ইংরেজিতে পরিবর্তন করিতেছেন ইহা অ্যানড্রুজের কাছে অমার্জনীয় অপরাধ বলিয়া মনে হইল ।’২৩এই সময়কার অ্যান্ডরম্নজের আচরণকে মাত্রাধিক রবীন্দ্রপ্রীতি বলে খুঁজে পেয়েছিলেন বিকাশ চক্রবর্তীও। তাঁর লেখা ‘টমসন ও রবীন্দ্রনাথ’ প্রবন্ধে টমসনের কথা বলতে গিয়ে মন্তব্য করেছেন –  ‘১৯১৩-তেই রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে টমসনের ঘনিষ্ঠতার শুরম্ন। এই যাত্রাতেই রবীন্দ্রনাথ টমসনকে একগুচ্ছ ইংরেজি অনুবাদ দিয়েছিলেন পরিমার্জনের জন্য।… রবীন্দ্রনাথ অবশ্য টমসনের সব সংশোধন গ্রহণ করেননি। কিন্তু টমসন সে যাত্রায় এই ধারণা নিয়ে বাঁকুড়া ফিরেছিলেন যে অনুবাদের ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথ তাঁকে সহযোগী হিসেবে পেতে চান। টমসন যে কোনো অলীক ধারণা নিয়ে ফিরেছিলেন তা নয়, যদিও কার্যক্ষেত্রে ঘটনাটি ঘটে ওঠেনি। ঘটে ওঠেনি, তার একটি কারণ নিঃসন্দেহে অ্যান্ড্রুজের মাত্রাধিক রবীন্দ্রপ্রীতি।’২৪

বিষয়টা আমাদের কাছেও কম আশ্চর্য ঠেকে না। য়েট্সের Introduction বাদ দেবার জন্য এ-রম্নজের জোরাজুরি প্রসঙ্গে তাঁর জীবনীকার নিউ টিংকার পর্যন্ত মন্তব্য করেছেন –

‘It was rather surprising that an unknown missionary from India should feel competent to criticize the leading romantic poet of the day; yet with all his doubts and self-questioning, Andrews never doubted his own authority in the realm of literature.’২৫

এই মাত্রাটা কতদূর পর্যন্ত গিয়েছিল তার একটি নমুনা পাওয়া যাবে ইংরাজি গীতাঞ্জলির ৫২ নম্বর কবিতা সম্পর্কে
রবীন্দ্রনাথ-য়েট্স কথোপকথনে। ওই কবিতাটি সম্পর্কে য়েট্স এক চিঠিতে রবীন্দ্রনাথকে লিখেছেন (চিঠির তারিখ-৯/১/[১৯১৩]) –

‘The other day I started to read out No. 52 to a friend. When I came to the last paragraph I was most sorrowful to find that magnificent ‘no more coyness and sweetness of demeanour’ [as I see] was changed and the whole poem half ruined. I fell on Rothenstein at once and accused that Fox Strangways of it. He defends Fox Strangways but I do not believe him. …’২৬

ওই পরিবর্তনের জন্য য়েট্স স্ট্র্যাংওয়েজকেই দায়ী করেছিলেন। রোদেনস্টাইনকে ৭ সেপ্টেম্বর [১৯১২] লেখা চিঠিতে লিখেছিলেন –

‘I have had an interminable letter from a man called Strangways suggesting alterations in Tagore’s translation. He is the sort of man societies like the India Society fatten. He is a manifest goose. I want you [to] get the Society to understand that I am to edit this book and that they are to send me proofs as any other Publisher would.’…’২৭

কিন্তু এক্ষেত্রে য়েট্সের ধারণা ভুল ছিল। এই পরিবর্তন করেছিলেন অ্যান্ডরম্নজ। বিষয়টা জানা যাবে পরে য়েট্সকে লেখা রবীন্দ্রনাথের চিঠিতে। বিষয়টি বিকাশ চক্রবর্তীও তাঁর Poets to a Poet গ্রন্থে তুলেছেন।

২৬ জানুয়ারি ১৯১৩ উরবানা থেকে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন –

‘I am very sorry for some corrections made at the instance of Mr. Andrews in Gitanjali when it was too late to submit them to you. I am so absolutely ignorant of the proprieties of your language and Mr. Andrews was so insistent that my nervousness drove me to these corrections. I do hope you will take the trouble of once going over the proofs of the second edition and make all the restorations you think necessary….’২৮

অ্যান্ডরম্নজের নিজের লেখাতেও বিষয়টা কিছুটা উঠে এসেছে। ‘The proofs of ‘Gitanjali’ were now coming in from the press, and I was able to go through them all twice over from beginning to end with Rabindra himself. This took up many mornings. In the afternoon we would meet at Mr. Rothenstein’s house and then I would hurry away by the evening train back to Cambridge.’২৯

এখানে বোঝা যায় রোদেনস্টাইন কেন স্ট্র্যাংওয়েজের ওপর য়েট্সের সন্দেহকে সমর্থন করেননি। কোন মানসিকতা থেকে অ্যান্ডরম্নজ এই বিরোধিতা করেছিলেন তা জানার জন্য পরের কয়েকটি অনুচ্ছেদও তুলে ধরা হল।

‘Rabindra told me much, during the last days, of his own life and of the history of the literature of his own country . From all that he thus told me, and from all that I saw with my own eyes, I was able to understand both the truth concerning the poet’s  ‘Renaissance’ spirit which Yeats had described, and also the incompleteness of that description. Rabindra, it is true, rejoiced in the many-sidedness of human life to the full.  Just as the play of dazzling sunlight was a joy to him, which he was never tired of watching : so the dazzling variety of the play of human life was to him an unending wonder and delight. On this side he is the true prophet of the Indian Renaissance with its bewildering play of new forces. But he is far more than this. Just as Shakespeare and Milton represented the Renaissance spirit of Europe, while reaching, each in his own way, the universal note beyond it: so also Rabindra, in his own way, reaches the universal, and is not merely a poet of the age. …

এখানে প্রশ্ন হলো প্রশান্তকুমার পালের শনাক্ত করতে না পারা ব্যক্তিটি কি তবে অ্যান্ডরম্নজ? অ্যান্ডরম্নজের সক্রিয় ভূমিকা থাকার কথা পাওয়া যায় রবীন্দ্রনাথকে লেখা অ্যান্ডরম্নজের ৬, ৭ এবং ১২ অক্টোবরের চিঠিতে। এছাড়া অজিতকুমারকে লেখা রবীন্দ্রনাথের একাধিক চিঠিতেও পাওয়া যায়। ১ অক্টোবর ১৯১২ অজিতকুমারকে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, ‘আমার গীতাঞ্জলির তর্জ্জমাগুলো ছাপাখানায় গেছে –  বোধহয় অক্টোবরের মাঝামাঝি বেরম্নতে পারবে । অ্যান্ডরম্নস সাহেব প্রম্নফগুলো দখল করে নিয়ে এখনি এর একটা সমালোচনা লিখতে বসে গেছেন। নভেম্বরের কন্টেম্পোরারিতে সেটা বের হবার কথা আছে ।’৩০ তিনি কেবলমাত্র সমালোচনা লেখাতেই যে সীমাবদ্ধ ছিলেন না; সেকথা আগেই উলিস্নখিত হয়েছে।

 

রবীন্দ্রনাথের ইংরেজি গীতাঞ্জলির মূল পা-ুলিপি এবং প্রকাশিত Song Offerings-এর মধ্যে যে তফাৎ লক্ষ্য করা যায় সেখানে সব থেকে ‘গুরম্নতর প্রভেদ’ বলতে প্রশান্তকুমার পাল লক্ষ করেছেন ‘প্যারাগ্রাফের গঠনে ও কবিতাগুলির বিন্যাসে’। আবার সৌরীন্দ্র মিত্র খুঁজে পেয়েছিলেন ‘বিশেষ প্রণালীর আভাস’ যা মূল পা-ুলিপিতে ছিল না। দুজনেই খেয়াল করেছেন যে তা য়েট্স ছাড়াও অন্য কারো সাহায্যে করা হয়ে থাকতে পারে। কিন্তু এই তৃতীয় ব্যক্তিটি কে? উইলিয়ম রাদিচের মতে ‘Andrews was Part of the group that helped Tagore to prepare Gitanjali for publication (sometimes to the annoyance of Yeats.), so could he have played a Part in persuading Tagore to introduce many more paragraph divisions into his translations to give them a Biblical ring?’৩১

 

পুরো বিষয়টার দিকে যদি আর একবার তাকানো যায় তাহলে দেখা যাবে য়েট্সের উষ্মার যথেষ্ট কারণ ছিল। গীতাঞ্জলিকে ইওরোপের ‘ভাবুক সমাজে’র সামনে তুলে ধরার ক্ষেত্রে মুখ্য উদ্যোক্তা ছিলেন রোদেনস্টাইন। তিনি কোনোভাবেই চাননি রবীন্দ্রনাথের লেখা অতি সাধারণ পাঠকের কাছে গড়াগড়ি যাক। তাই য়েট্সের মাধ্যমেই সকলের সামনে রবীন্দ্ররচনার পরিচিতি ঘটাতে উদ্যোগী হয়েছিলেন। বিষয়টা আরো স্পষ্ট করে ধরা পড়েছে অজিতকুমারকে লেখা রবীন্দ্রনাথের চিঠিতে; কিন্তু এই করতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথকেও যে যথেষ্ট বিড়ম্বনার মধ্যে ফেলেছিলেন তা বোঝা যাবে অজিতকুমারকে লেখা রবীন্দ্রনাথের কয়েকটা চিঠি দৃষ্টান্তস্বরূপ তুলে ধরা হল।

 

ক) ‘অজিত, আমি এখানকার পাকের মধ্যে পড়ে গেছি।… … ‘wisdom of the East’ Series-এর  (Editor Cranner Byng এর সঙ্গে কাল আমার আলাপ হলো – তিনি চান আমার তর্জমার একটা selection তাদের Serie-এ তিনি বের করেন – তিনি নিজে আমার সঙ্গে Collaborate করে লিখতে চান। Rothestein বলেস্নন, তোমার লেখা একেবারে সর্বোত্তমভাবে ছাড়া বের করতে আমরা দেব না। ওঁদের ইচ্ছা Yets-এর সঙ্গে পরামর্শ করে কাজ করেন। Rothenstein বলেস্নন Yets তোমাকে জানেন এবং লেখা ঠিক তার মনের মত হবে। ইতিমধ্যে একদিন Yets-এর সঙ্গে আমার দেখা হবে। Wells Bernard Shaw প্রভৃতি এখানকার সাহিত্যিকদের চক্রের মধ্যে আমার পড়বার সম্ভাবনা আসন্ন হয়ে এসেছে। কিন্তু এই নাগরদোলস্না ami কি সইতে পারব? বাইরের এই আঘাতে আমার হয়ত বিশেষ উপকার হবে কেননা বাইরের মন্থনেই ভিতরকার মাখন্ জমে ভেসে ওঠে। কিন্তু এই জিনিসটা আমাদের পক্ষে এত অনভ্যসত্ম যে উৎসাহ বোধ করচিনে। যাই হোক আমি হাল ছেড়ে দিয়ে দেখতে চাই আমার বিধাতা কেন আমাকে সমুদ্র পার করে এখানে নিয়ে এলেন।’৩২

 

খ) ২ আগস্ট ১৯১২ আবার অজিতকুমারকে লিখলেন –

‘শুধু আমার কবিতা তর্জমার কথা জিজ্ঞাসা করেছ। … সবসুদ্ধ বোধহয় একশটা পেরিয়ে গেছে। সেই লেখাগুলো নিয়ে Yets Normandy-তে গেছেন। সেখানে বসে তিনি তার একটা introduction লিখবেন – তার পরে Indian Society থেকে ছাপা হবে।…’৩৩ 

গ) ২১ আগস্ট ১৯১২-র চিঠিতে পুনরায় একই প্রসঙ্গ –

‘গীতাঞ্জলির তর্জ্জমাগুলো যে খাতায় লিখেছিলুম সেটা ভর্ত্তি হয়ে আরও ছাপিয়ে পড়েছে। একশোর বেশি হয়ে গেছে। Yets সেগুলি দিবারাত্রি সঙ্গে করে ঘুরে বেড়াচ্চেন। হয়ত অক্টোবরে ছাপা হয়ে বেরতে পারে। তার খাতাটা রোটেনস্টাইন আমার কাছে উপহারস্বরূপ নিয়েছেন।’৩৪

ঘ) ৩০ আগস্ট ১৯১২ –

‘অক্টোবরে আমার বই ছাপবার কথা আছে, কিন্তু হয়ে উঠবে কি-না সন্দেহ। কেননা  Yets-এর introduction লেখা এখনো হয়নি – তিনি Ireland-এ গেছেন। তাঁর সেটা পেলেই ছাপা হতে দেরি হবে না।’৩৫

এগুলো তুলে ধরার একটাই কারণ, এর থেকে আমরা বুঝতে পারব গীতাঞ্জলির কবিতা ছাপার ক্ষেত্রে য়েট্সের ‘introduction’-কে কতটা গুরম্নত্ব দেওয়া হয়েছিল।

৬ অক্টোবর ১৯১২ চারম্নচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়কে লেখা রবীন্দ্রনাথের চিঠি থেকে জানা যায় –

য়েট্স যে বইটা Edit করছেন সেটা ভূমিকা সমেত ছাপাখানায় গেছে – বোধ হচ্ছে অক্টোবর মাসের মধ্যেই বের হতে পারবে। হাতে আরো অনেকগুলো জমেছে।’৩৬

উলেস্নখ্য যে, যে-চিঠিতে অ্যান্ডরম্নজ য়েট্সের ভূমিকাটা বাদ দিতে বলেছিলেন তারও তারিখ ৬ অক্টোবর। অর্থাৎ য়েট্স-এর লেখা যে ‘introduction’-এর জন্য গীতাঞ্জলির ছাপাখানায় যাওয়া আটকে ছিল, যাঁর মাধ্যমে রোদেনস্টাইন গীতাঞ্জলি ‘সর্বোত্তমভাবে’ প্রকাশ করার কথা ভেবে  ‘wisdom of the East’-এর Editor Cranner Byng-এর সঙ্গে রবীন্দ্রনাথকে কাজ করতে দেননি, সেই য়েট্সের লেখা ভূমিকাকে অ্যান্ডরম্নজ বাদ দেবার কথাই শুধু বলছেন না, কেন বাদ দিতে চাইছেন তার ব্যাখ্যাও দিয়েছিলেন এবং বাদ দেবার জন্য চাপ সৃষ্টি করেছিলেন। তাও সেটা ছাপাখানায় চলে যাবার পর। অর্থাৎ সবকিছু ঠিক হয়ে যাবার পর! এর থেকে অনুমান করা যায় রবীন্দ্রনাথকে এই ব্যাপারে কীরকম বিড়ম্বনার মধ্যে পড়তে হয়েছিল।

খুব স্বাভাবিক কারণেই এ-রম্নজের ইচ্ছা এখানে রক্ষা করা হয়নি। ১৯১২ সালের নভেম্বর মাসের গোড়ার দিকে লন্ডনের ইন্ডিয়া সোসাইটি থেকে যখন ইংরাজি গীতাঞ্জলি Song offerings নামে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হলো য়েট্সের লেখা ভূমিকাটাকেও রাখা হয়েছিল।’

কিন্তু অ্যান্ডরম্নজের জোরাজুরি করার থেকেও ততোধিক আশ্চর্যের বিষয় এই ব্যাপারে রবীন্দ্রনাথের সম্পূর্ণ নীরব থাকা। যেভাবে গীতাঞ্জলি ছাপার ব্যাপারে য়েট্সের প্রসঙ্গ বিভিন্নজনকে লেখা চিঠিতে পাওয়া যায় অ্যান্ডরম্নজের এই সম্পর্কিত বিষয়ে তেমন কোনো মন্তব্যই সেভাবে চোখে পড়ে না। অনেকেই বিষয়টি অ্যান্ডরম্নজের প্রতি রবীন্দ্রনাথের সৌজন্যবোধ বলে মনে করতে পারেন। কিন্তু তাই যদি হতো তাহলে সিমলায় অ্যান্ডরম্নজকৃত রবীন্দ্রজীবনী পাঠ প্রসঙ্গ, বা অন্যান্য ক্ষেত্রেও রবীন্দ্রনাথ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন কেন?

তবে কি ওই ব্যাপারে অ্যান্ডরম্নজের মতের প্রতি রবীন্দ্রনাথেরও কোথাও প্রচ্ছন্ন সমর্থন ছিল? যদি ধরেও নেওয়া যায় যে সমর্থন ছিল না, তথাপি অ্যান্ডরম্নজের ওপর কোনো বিরক্তিসূচক মন্তব্য বা ব্যবহারও তো চোখে পড়ে না; বরং মনের দিক থেকে কোথাও যে অ্যান্ডরম্নজের দিকে বেশি ঝুঁকে ছিলেন তার প্রমাণ পাওয়া যায় ‘গীতাঞ্জলির দ্বিতীয়ভাগ’ প্রকাশে অ্যান্ডরম্নজের প্রতি আনুগত্য প্রকাশের ঘটনায়।

ইংল্যান্ড থেকে ফিরে এসে কলকাতা থেকে ১৯১৩-র ১১ অক্টোবর অ্যান্ডরম্নজকে লিখেছিলেন – ‘I am sending you in a separate registered cover the manuscript of Gitanjali second series

so that we may be able to discuss them when we meet next.’৩৭

রবীন্দ্রনাথ যদি মনঃক্ষুণ্ণই হতেন তবে কি আবার অ্যান্ডরম্নজের সঙ্গে আলোচনার কথা ভাবতেন? চিঠিটি অন্য একটি কারণেও গুরম্নত্বপূর্ণ। আমরা এখানে যে ‘the manuscript of Gitanjali Second Series’-র কথা পাই এখনো পর্যন্ত ওই শিরোনামে কোন সংকলন বা পা-ুলিপি আমাদের নজরে পড়েনি। কৌতূহল জাগে, যে পা-ুলিপি অ্যান্ডরম্নজের কাছে পাঠানোর কথা বলা হয়েছে এটির কী হল? এর উত্তর আজও অজানা। রবীন্দ্রভবনে রক্ষেত অ্যান্ডরম্নজের সমসত্ম তথ্যাদি যা ‘Andrews Papers’ নামে চিহ্নিত সেখানেও এর কোন হদিস পাওয়া যায়নি। যদি পাওয়া যেত তাহলে গীতাঞ্জলি অনুবাদের ব্যাপারে এ-রম্নজের ভূমিকাটি ঠিক কতটা ছিল তা আরো স্পষ্ট হতো।

তবে কি অন্য কোন নামে কবিতাগুলি বেরিয়েছে? সে ব্যাপারে কিছু জানা যায় না। কেবল অজিতকুমার চক্রবর্তীকে লেখা ১২ আগস্ট ১৯১২-র চিঠিতে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন –

‘অজিত, আমার নতুন বইয়ের প্রম্নফ নিয়ে ব্যসত্ম আছি। আমার নিজের ইচ্ছা ছিল গীতাঞ্জলির দ্বিতীয়ভাগ বের করব – একখানা পুরো বইয়ের মত তর্জ্জমাও জমে আছে – কিন্তু য়েট্স্ প্রভৃতি কবি ও বন্ধুর দল বল্ছেন মাঝে সম্পূর্ণ অন্য ধরনের কবিতা বের করে পাঠকদের স্বাদ বদল করে দেওয়া দরকার। তাই ক্ষণিকা চিত্রা সোনারতরী প্রভৃতি থেকে প্রেমের কবিতা এবং অন্য দু’চার রকমের জিনিস সাজিয়ে দেওয়া গেছে…’৩৮

চিঠির তারিখটি লক্ষণীয়। এক বছর আগে তিনি তাঁর ‘নতুন বইয়ের প্রম্নফ’ অর্থাৎ ‘গীতাঞ্জলির দ্বিতীয়ভাগ’ বের করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন কিন্তু য়েট্স স্টার্জ মুর প্রমুখের ইচ্ছাকে প্রাধান্য দিয়েই রবীন্দ্রনাথ নিজের ইচ্ছাকে চেপে রেখেছিলেন তাঁর উলেস্নখ উক্ত চিঠিতে পাই।

‘গীতাঞ্জলিতে নিছক প্রশংসা পাওয়াতে একদল লোকের চিত্তবৃত্তি স্বভাবতই বিরম্নদ্ধ হয়ে ওঠবার কথা, তারা এবারে মুখনাড়া দেবার চেষ্টা করবেই – এই জন্যেই ইয়েট্স সেই ধাক্কাটা অন্য শ্রেণীর কবিতার উপর দিয়ে চালাবার চেষ্টায় আছেন; আবার এটা যখন আপনিই ভাঁটিয়ে যাবে তখন আবার একবার গীতাঞ্জলির ঢাকা খোলবার আয়োজন করা যাবে।’

কিন্তু দেখা গেছে গীতাঞ্জলির দ্বিতীয় ভাগের ‘ঢাকা’ একবছর পরেও খোলা হয়নি। রবীন্দ্রনাথের মনের ইচ্ছা মনেই পুষে রেখে দিতে হয়েছে। অথচ এ-বিষয়ে তাঁর আগ্রহের অভাব যে ছিল না সে-বিষয়টা স্পষ্ট।

অ্যান্ডরম্নজ রবীন্দ্রনাথকে লিখেছিলেন –

44 city Road,

18

Birmingham

Oct, 12 [1912]

My dear Rabindra Babu,

How could I have been so hasty as to speak less highly of the second series of poems after only reading 2 or 3 pages! I have now finished them and read them over again, and when the translation has been improved they will be simply glorious. There are quite new and beautiful thoughts and more than once I found tears steal to my eyes while reading them over. I have been feeling very tired and weary today and slightly unwell after the din of railway trains and tubes and it has been such a happiness to read over and over again some of your beautiful thoughts. There will clearly be a second volume here, with perhaps some further additions, and it will make a new and deep impression on the best thought in the West. There will be needed perhaps some omissions and I think you have others which might be added. If that were done the new volume would be certain of success.

My poor article for the Contemporary seems fated to remain unfinished, but I will do

my best to get it done before I go.

Thank your son for sending the book so promptly with kindest farewells and

remembrance.

Your affectionate friend

  1. F. Andrews

 

I will send the typed copies without fail, by registered letter on Monday. I have written to Cambridge about Dr. Seal and will pay personal visits on Tuesday. You will be glad to hear I found my mother a little better.’৩৯ নানা দিক থেকে চিঠিটির গুরম্নত্ব আছে। এতে কেবল গীতাঞ্জলির দ্বিতীয়ভাগের কথাই নেই, সমালোচনা এবং কিছু পরামর্শও আছে। সাহিত্য আলোচনার মধ্যে দিয়ে দুই বন্ধুর নিবিড়তার দিকটিও ফুটে উঠেছে। মনের অন্তরঙ্গতা কি রবীন্দ্রনাথ প্রথম দিন থেকেই অ্যান্ডরম্নজের মধ্যে খুঁজে পেয়েছিলেন যা পরবর্তীকালে ১৯৪০ পর্যন্ত অবিচ্ছেদ্য ছিল? রবীন্দ্রনাথের ইংরাজি অনুবাদ নিয়ে টমসনও কিছু কাজ করতে চেয়েছিলেন এবং তা অ্যান্ডরম্নজের কারণেই সম্ভব হয়নি বলে বিকাশ চক্রবর্তী অভিযোগ করেছিলেন। অর্থাৎ মাত্র কয়েকদিনের মধ্যে রবীন্দ্রনাথ অ্যান্ডরম্নজের মধ্যে কী এমন পেয়েছিলেন যার জন্য য়েট্স স্টার্জ মুর প্রমুখের বিপরীত মেরম্নতে অবস্থান সত্ত্বেও অন্যদের দূরে সরিয়ে অ্যান্ডরম্নজকে কাছে টেনে নিয়েছিলেন? মনের কোন গভীর ‘আত্মীয়তা’র খাতিরে গীতাঞ্জলির দ্বিতীয় সিরিজ প্রকাশ তিনি অ্যান্ডরম্নজের সঙ্গে মিলে করতে চেয়েছিলেন?

১১ অক্টোবর ১৯১৩ এ-রম্নজকে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন –

‘I am sending you in a separate registered cover the manuscript of Gitanjali second series so that we may be able to discuss them when we meet next.’৪০

অর্থাৎ গীতাঞ্জলির প্রথম ভাগ যদি হয় য়েট্সের সম্পাদিত তবে ‘গীতাঞ্জলির দ্বিতীয়ভাগ’ যেন হয় অ্যান্ডরম্নজের সংস্পৃষ্ট – এভাবেই কি রবীন্দ্রনাথ একটা সামঞ্জস্য টেনে সম্পর্কের সৌজন্য রক্ষা করতে চেয়েছিলেন দুই বন্ধুর সঙ্গে? এখান থেকেই বোঝা যায় রবীন্দ্রনাথের কাছে অ্যান্ডরম্নজেরও গুরম্নত্ব য়েট্সের থেকে কিছু কম ছিল না। কিন্তু কেন এই গুরম্নত্ব? রবীন্দ্রনাথের কোন মানসিকতা এক্ষেত্রে কাজ করেছিল?

রবীন্দ্রনাথ তাঁর কবিতাকে যে কেবলমাত্র সাহিত্যের সীমানায় আবদ্ধ করে রাখতে চাননি একথা স্পষ্ট করে লিখেছিলেন অজিতকুমারকে। ‘আমার লেখাগুলিকে এঁরা সাহিত্যের বিষয় করে রাখেননি, জীবনের বিষয় করে গ্রহণ করেছেন – সেইটেই আমার পক্ষে সকলের চেয়ে আনন্দের কারণ হয়ে উঠেছে।…’৪১

আর অ্যান্ডরম্নজ রবীন্দ্রনাথকে লিখেছিলেন –

 

‘I have written a second article to the Modern Review to go with it and I also wrote a review of Gitanjali which went the round of all the Indian papers. … I turn again and again to the book, which you have sent me, of your own wonderful and beautiful poems. I wish I could tell you how they speak to me and what they mean to me! I have been on the borders only of that country which you have explored; but I can follow you in part and see more clearly through your vision… I find in them the nearness of God’s Presence 20 and that is all-suffering, for all our questionings and difficulties are resolved in that; and calmness comes back when that attained.’৪২ (বাঁকা হরফ আমাদের) রবীন্দ্র কবিতা এইভাবেই সাহিত্যের আঙিনা পেরিয়ে পাশ্চাত্যের কাছে (যাঁরা কেবল সাহিত্য পাঠক নন) প্রাচ্যকে চেনার সেতু রচনা করেছিল।

রবীন্দ্রনাথ তাই চেয়েছিলেন। অজিতকুমারকে লিখেছিলেন –

‘এঁরা মনে করচেন আমার এই লেখাগুলি এঁদের পক্ষে একটা অত্যন্ত প্রয়োজনের সামগ্রী শুনে আমার মনে খুব আনন্দ হল।… বাংলা ভাষাতেও এগুলো ঠিক সাহিত্যের মধ্যে গণ্য হবার যোগ্য নয় -… গীতাঞ্জলি তাঁকে অঞ্জলি করে দেওয়া হয়েছিল  বলেই সকলকে দেওয়া হয়েছে।’৪৩

 

অ্যান্ডরম্নজ তাঁর দ্বিতীয় সমালোচনা লেখার আগে রবীন্দ্রনাথের জীবনস্মৃতি যে পড়েছিলেন তার উলেস্নখ আমরা আগেই করেছি। (অজিতকুমারকে লেখা রবীন্দ্রনাথের চিঠি, ১/১০/১৯১১, দ্র, ভক্ত ও কবি)। অন্যদিকে সম্ভবত অ্যান্ডরম্নজের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের ব্যক্তিগত আলোচনাতেও গীতাঞ্জলিকে সাহিত্যের মধ্যে গণ্য না করা, ‘তাঁকে অঞ্জলি করে দেওয়া’, প্রভৃতি প্রসঙ্গ ওঠা অস্বাভাবিক নয়। আমরা এই সময় রবীন্দ্রনাথের মানসিকতার দিকে যদি তাকাই তাহলে দেখা যাবে ধর্ম নিয়ে তিনি অনেক বেশি চিমত্মাভাবনা করছিলেন। বিভিন্ন ধর্মের মধ্যে মানুষের মঙ্গল বিষয়ক ভাবনাগুলিকে গ্রহণ করার কথা বলছিলেন। এক্ষেত্রে তিনি যেন অনেকটা সমন্বয়বাদী। অজিতকুমারকে নিজের ধর্মমত সম্পর্কে পরিষ্কার করেই বলেছেন – ‘অয়কেনের সঙ্গে আমার যথেষ্ট মিল আছে; কিন্তু একটা বিষয়ে আমার মজা লাগে। অয়কেন খ্রিস্টেরদিব্যত্ব মানেন না, ত্রিত্ববাদ

মানেন না, বাইবেলের বর্ণিত অলৌকিক ঘটনায় বিশ্বাস করেন না, অথচ বলেন তিনি খ্রিস্টান এবং খ্রিস্টান ধর্মই শ্রেষ্ঠ ধর্ম্ম। অর্থাৎ অন্যান্য ধর্ম্মকে অতীতের ইতিহাসে এক জায়গায় দাঁড় করিয়ে দেখেন এবং তার সঙ্গে এমন একটা ধর্ম্মের তুলনায় করেন যেটাকে তিনি নিজের আদর্শের দ্বারা গড়ে তুলচেন। অবশ্য হিন্দুধর্ম্ম সম্বন্ধে আমারও এই রকমের ‘position’।৪৪

এই রকম ‘position’ অ্যান্ডরম্নজেরও। তাঁর জীবন চর্চা করলে এই ভাবনাটা বোঝা যাবে। এই মানসিক নৈকট্যের কারণেই হয়তো এত বলিষ্ঠভাবে য়েট্সের ভূমিকা বাদ দেবার কথা বলতে পেরেছিলেন। তাঁর মনে হয়েছিল য়েট্সের ভূমিকা হয়ত রবীন্দ্র কবিতার ভাবনাকে আচ্ছন্ন করে দিতে পারে। অ্যান্ডরম্নজের প্রধান আপত্তির জায়গা ছিল এখানে। তাই ‘With Rabnidra In England’ প্রবন্ধে বলেছেন –

‘It is interesting to me now to read the introduction to that book which Yeats has since written. Much that he told us during his recital on that memorable evening re-appears in the introduction. I remember especially two points. He spoke of the ‘richness of the oriental imagery and what he called the ‘Renaissance’ spirit of Rabindra, Í the poet’s joy in the fullness of life rather than in its self-emptying through the pathway of asceticism. He mentioned the story of the monk S. Bernard crossing the alps and shutting his eyes to the beauties of nature lest they should beguile his soul. This , he said, was the opposite of Rabindra’s spirit as revealed in the words, Í

‘In one salutation to thee, my God, let all my senses spread out and touch this world at thy feet.’  অ্যান্ডরম্নজ তবে কেবল য়েট্সের ভূমিকাকেই সমালোচনার মুখে দাঁড় করান নি, সমকালীন গীতাঞ্জলির কিছু সমালোচনারও সমালোচনা করেছেন। ২০ ডিসেম্বর [১৯১২] রবীন্দ্রনাথকে লিখেছিলেন –

 

‘I have seen some reviews of Gitanjali, one a very stupid one Í in the Academy, which praised you for qualities you do not possess (and I hope will never possess). Í The stupid man actually said that the calm about them was ‘without colour’ and had a ‘studied flavourlessness’ and contradicted himself almost in the next line by a quotation It is pitiable that a paper like the Academy could publish such stuff. He used the highest possible terms about them, but one does not want this from a bad critic.

 

On the other hand the ‘Nation’[’s] appreciation appears to me both great and true.  That is quite on a different level. It is the best criticism I have not yet seen. I wonder what the ‘Times’ said. I have yet seen the Spectator. … I wish I had been able to see some of the best literary critics before leaving and explain a little the things I know. …’৪৫

বোঝা যায় যে গীতাঞ্জলির কোনো আলোচনাই অ্যান্ডরম্নজের চোখ এড়িয়ে যায় নি। রবীন্দ্রনাথের কবিতাই এ-রম্নজের মনে বাংলা ভাষার প্রতি আগ্রহ জাগিয়ে তুলেছিল।

‘I have started Bengali and intend to be very industrious about it, if only I can get good teaching. I feel more and more that it will become the one language in India with a true literature of the people, living, emotional and in touch with reality.’৪৬

মনে রাখতে হবে রবীন্দ্রনাথ তখনো নোবেল জয়ী নন। তাছাড়া ভারতবর্ষে অ্যান্ডরম্নজের ১০ বছরের ওপর কাটানো হয়ে গেছে। বিভিন্ন ভাষাভাষী এবং গুণী ব্যক্তিদের সংস্পর্শেও এসেছিলেন। তারপরেই অ্যান্ডরম্নজের ওই মন্তব্য যথেষ্ট তাৎপর্যবাহী। বাংলা ভাষা সম্পর্কে তাঁর এই মনোভাব জেগে উঠেছিল রবীন্দ্র কবিতার সূত্র ধরেই। বহু ভাষাভাষী ভারতবর্ষে একজনমাত্র কবির সূত্র ধরে বাংলা ভাষাকে শ্রেষ্ঠত্বের আসনে বসাতে চাওয়ার ঘটনা রবীন্দ্রনাথের কবিপ্রতিভাকেই কুর্নিশ করে। শুধু তাই নয় ১৯১৩ সালের ২৬ মে সিমলার এক সভায় লর্ড হার্ডিঞ্জ রবীন্দ্রনাথকে ‘দি পোয়েট লরিয়েট অফ্ এশিয়া’ বলে অভিনন্দিত করেছিলেন। ইংরেজ রাজ কর্মচারীদের কাছে রবীন্দ্রপ্রতিভাকে তুলে ধরার কাজে মনোযোগী হয়েছিলেন অ্যান্ডরম্নজ। লর্ড হার্ডিঞ্জের ওই অভিনন্দনের পিছনে যদি অ্যান্ডরম্নজেরও ভূমিকা থেকে থাকে তবে তা কোন অস্বাভাবিক ঘটনা নয়। অর্থাৎ নোবেল প্রাইজ দেবার আগেই তাঁরা রবীন্দ্রনাথকে দিয়ে শ্রেষ্ঠত্বের শিরোপা দিয়ে সাহিত্য বোধের পরিচয় তুলে ধরেছিলেন।

সুতরাং গীতাঞ্জলি সম্পর্কে অ্যান্ডরম্নজের সমসত্ম সমালোচনাকে ফুৎকারে বোধহয় উড়িয়ে দেওয়া যায় না। অন্তত রবীন্দ্রনাথ এটা বুঝেছিলেন বলেই গীতাঞ্জলি দ্বিতীয় সিরিজ প্রকাশের ক্ষেত্রে এ-রম্নজের উপর নির্ভরশীল হয়েছিলেন।

রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে এই সাহিত্যিক ঘনিষ্ঠতা যে পরবর্তীকালে আরও নিবিড় হয়ে উঠেছিল তা বোঝা যায় ১৯১৪-য় ইন্ডিয়া প্রেস, এলাহাবাদ ও ইন্ডিয়া পাবলিশিং হাউস (কলকাতা)-র স্বত্বাধিকারী চিমত্মামণি ঘোষের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের গ্রন্থ প্রকাশের যে চুক্তি হয় তাতে সাক্ষী হিসেবে অ্যান্ডরম্নজ উপস্থিত থাকায়।৪৭

 

সূত্র নির্দেশ

১. খ্যাতি অখ্যাতির নেপথ্যে, সৌরীন্দ্র মিত্র, আনন্দ, দ্বি সং, দ্বি মু, এপ্রিল ২০১১ পৃ ২১-২২।

২. চিঠিপত্র ৮, পৃ ৩১৬।

৩. রবিজীবনী (ষষ্ঠ), প্রশান্তকুমার পাল, আনন্দ, সেপ্টেম্বর ২০০৪।

৪.  About Sir Valentine Chirol, Sj Prabhat kumar Mukhopadhyaya gives us the following information : Sir Ignatius Valentine Chirol, British journalist : clerk in the British Fireign Officer (1872-76) : in charge of Foreign Department of London Times (1909-12) : served on the Royal Commission on Indian Public Service (1912-15) :  author of ‘Indean Unrest’ and other books on Eastern questions. His remarks on Lokamanya Tilak and the Chitpavan Bramhins landed him in litigation filed by Tilak in which Chirol was defeated.

In a letter to William Rothenstein Gurudev wrote :

It will amuse you to learn that at a semi-public conference…, valentine Chirol gave his audience to understand that the English Gitanjali was practically written by Yeats. Naturally such rumours get easy
credence among our piople who can believe in all kinds of miracles except genuine worth in their own men, It is annoyingly insulting for me to be constantly suspeted of being capable of enjoying a reputation by fraud and it makes with that the chance had never been given to me to come out of the quiet corner of my obscurity…

দ্র. টীকা নং ২ : ‘ Visva-Bharati News;  Jan 1969, P 366-67.

এই ব্যাপারে ২৫ মার্চ [১৯১৪] অ্যান্ডরম্নজ রবীন্দ্রনাথকে লিখেছিলেন –

‘I can not tell You how indignant I was to hear from him about Chirol’s utterance concerning Yeats and your poems. It is hateful and miserable and contemptible. I was afraid that libel would be raised by some one Í but by one in the position of Chirol, I hardly expected that! But Chirol was always a busy-body. It pained me deeply to think what you must have suffered under an imputation so subtly cruel Í like a stab in the back. You must tell me on my return if anything suggests itself to you to put it right in India itself. There is not a breath of a rumour of it over here and there never will be. I wonder where Chirol picked it up. The lie must be stopped Í I feel that strongly… I only wished at once to tell you the intense pain it had given me.’

দ্র. V.B.N., Jul 1968-69, Vol. 37, p 120.

৫. খ্যাতি অখ্যাতির নেপথ্যে, পৃ ৩৪।

৬. Gitanjali Song offerings Rbindranath Tagore a new translation, William Radice, penguin books, 2011, p 34.

৭. খ্যাতি অখ্যাতির নেপথ্যে, পৃ ৩১।

৮. ‘রবিজীবনী’, ষষ্ঠ, পৃ ৩১৫। অনেকে এই দিনটিকে ৩০ জুন বলে মনে করে থাকেন, কিন্তু রবিজীবনীকার নানা তথ্যযোগে এই মতটি খ-ন করেছেন।

৯. এই নামে আরও একটি কবিতা পাওয়া যায়। প্রকাশিত হয়েছিল 24 ‘The Visva-Bharati Quarterly’-এ। কবিতাটির টাইপ কপি রক্ষেত আছে রবীন্দ্রভবন সংগ্রহালয়ে, ‘Andrews papers’, file No. 32, image No. 169. টীকায় দেওয়া আছে 2 ‘This sonnet was written for Tagore’s birthday nearly twenty years ago, but was revised by the Author and given to the Poet, on his 78th Birth Day this year.

১০. The Modern Review, Aug Vol. 7, No. 7-12, July-Dec, 1912, P 225-26.

১১. রবিজীবনী, ষষ্ঠ, পৃ ৩২৭।

১২. ‘An Evening with Rabindra’, The Modern Review, Aug 1912, p 227.

১৩. খ্যাতি অখ্যাতির নেপথ্যে, পৃ ৩০।

১৪. তদেব।

১৫. রবিজীবনী, ষষ্ঠ, পৃ ৩১৫-৩১৬।

১৬. ‘An Evening with Rabindra’.

১৭. ৬ অক্টোবর ১৯১২ রবীন্দ্রনাথকে লেখা চিঠি। দ্র. Visva Bharati News, Vol. xxxv, No. 9, March 1967, P 162.

১৮. তদেব।

১৯. ৭ অক্টোবর ১৯১২, দ্র Visva Bharati News, Vol. xxxv, No. 9, March 1967, P 163.

২০. তদেব।

২১. Visva Bharati News, Vol. 35, No. 9, March 1967, P 162.

২২. ৭ অক্টোবর ১৯১২, দ্র Visva Bharati News, Vol. 35, No. 9, March 1967, P 163.

২৩. আত্মঘাতী রবীন্দ্রনাথ (অখ-), নীরদচন্দ্র চৌধুরী, মিত্র ও ঘো’ষ, দ্বি. মু. ১৪১৭ পৃ ১০৮-০৯।

২৪. টমসন ও রবীন্দ্রনাথ’, বিকাশ চক্রবর্তী, বিশ্বভারতী পত্রিকা, বৈশাখ-আষাঢ়, ১৪০২, পৃ ৩০-৩১।

২৫. The Ordeal of love C.F. Andrews and India, Hugh Tinker, Delhi Oxford university Press, oxford, 1979, p 62.

২৬. Letter No. 06, Poets to Poet, edited by Bikash Chakravarty, Visva-Bharati, Calcutta, 1998, p 146.

২৭. Imperfect Encounter, Mary M. Lago, Harvard University Press, Cambridge, 1972,  p 41.

২৮. Letter from Tagore to Yets, Urbana, Illinois, 26 jan 1913. Yeats Papers [Xeroxed], New York Public Library, Poets to a Poet, p 162-63.

২৯. ‘With Rabindra in England’ : The Modern Review, Jan, 1913, p 74.

৩০. চিঠি নং ৭৫, ভক্ত ও কবি, রম্নদ্রপ্রসাদ চক্রবর্তী, প. ব. বা. আ., জানু ২০০৭, পৃ ১১৩।

৩১. ‘Introduction’, ‘Gitanjali Song offerings Rbindranath Tagore a new translation’, William Radice, penguin books, 2011, p 39.

৩২. চিঠিসংখ্যা ৬৫, ভক্ত ও কবি পৃ ৯৭।

(চিঠিতে কোন তারিখের উলেস্নখ নেই। চিঠির শেষে তৃতীয় বন্ধনীতে উলে্রখ আছে ‘জুন-জুলাই ১৯১২?’। চিঠির শেষে তৃতীয় বন্ধনীতে উলেস্নখ আছে ‘আষাঢ়-শ্রাবণ ১৩১৯?’ তাই বোঝা যাচ্ছে না রোদেনস্টাইনের বাড়িতে ৭ জুলাই কবিতা পাঠের আসরের পরে লেখা, নাকি তার আগে।)

৩৩. চিঠিসংখ্যা ৬৬, তদেব, পৃ ৯৮।

৩৪. চিঠিসংখ্যা ৭০, তদব, পৃ ১০৫।

৩৫. চিঠিসংখ্যা ৭১, তদেব, পৃ ১০৬।

৩৬. চিঠিসংখ্যা ৫৩, চিঠিপত্র ১৪, পৃ ৪৯।

৩৭. Typed copy of letters from Rabindranath Tagore to C.F.Andrews, Rabindra-Bhavana Archive, ‘Andrews papers’ file No. 3.

৩৮. ভক্ত ও কবি, পৃ ১০১।

৩৯. Original letters from C.F. Andrews to Rabindranath Tagore, Rabindra-Bhavana Archive, ‘Andrews papers’, file No. 4.  আরো দ্র. Visva Bharati News, vol. xxxv, No. 9, March 1967, P 164.

৪০. Typed copy of letters from Rabindranath Tagore to C. F. Andrews, Rabindra-Bhavana Archive, ‘Andrews’s papers,’ file No. 3.

৪১. ৬ আগস্ট ১৯১২, ভক্ত ও কবি পৃ ১০০।

৪২. letter from Andrews to Tagore, Dec 12 1912, delhi. Visva Bharati News, Vol. xxxv, No. 9, March 1967, P 164-65.

৪৩. তারিখ ২ আগস্ট, ১৯১২, তদেব, পৃ ৯৮।

৪৪. চিঠিসংখ্যা ৭২, তারিখহীন, আগস্ট-সেপ্টেম্বর, ভক্ত ও কবি, পৃ ১০৮।

৪৫. Original letters from C. F. Andrews to Rabindranath Tagore, Rabindra-Bhavana Archive,
‘Andrews papers’, file No. 4;) দ্র. Visva Bharati News, vol. xxxv, No. 9, March 1967, P 167.

৪৬. 20 Dec [1912] Letter from Andrews to Tagore, Visva Bharati News, march 1967, P 167.

৪৭. চিঠিপত্র ১৪, পৃ ২৮৪।

উলেস্নখ্য যে, সাক্ষী হিসেবে যাঁরা স্বাক্ষর করেছিলেন তাঁরা ছিলেন ক্রম অনুযায়ী সি. এফ. অ্যান্ডরম্নজ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (লেখক), এ. পি. সেন (লখনউ), চিমত্মামণি ঘোষ (Proprietor, Indian Press, Allahabad), অপূর্বকৃষ্ণ বসু, (Printer, Indian Press), নিত্যচন্দ্র মুখার্জ্জী (Artist, Indian Press), এবং Indian Publishing House, Calcutta।প্রবন্ধগ্রন্থ এবং কাব্যগ্রন্থ মিলে মোট ৮৭টি গ্রন্থ নিয়ে চুক্তি হয়

শেয়ার করুন

Leave a Reply