Slide
previous arrow
next arrow
  • হাজার মাইল জুড়ে

    হাজার মাইল জুড়ে

    বাস থেকে নেমে আধ ঘণ্টার মতো উত্তরে হাঁটতে হাঁটতে ডানপাশে একাত্তরে মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্প বাগেরহাটের সমেত্মাষপুর স্কুলটা সহজেই শনাক্ত করে রিপন। কিন্তু শহীদ বাবার কবর খুঁজে বের করার অস্থিরতার তোড়ে রওনার সময় তার মাথায় আসেনি যে, আজ সাপ্তাহিক ছুটি – স্কুল বন্ধ। গ্রামগঞ্জের স্কুলে তালা মানে এমন বিরল খা-খা অবস্থা যেন কেউ কোনোকালে এখানে আসেনি, স্কুলটা…

  • হুন্দাস্মৃতি

    হুন্দাপাড়ে বসতের চিহ্ন আর খুঁজেও পাবে না। তেমন দলিল নেই, তিরোহিত পাথুরে প্রমাণ, প্রাচীরের প্রাচীন সীমানা যেন পুরাস্মৃতি প্রায়। রেনেলের সূক্ষ্ম চোখ এড়িয়ে গিয়েছে এঁকে দিতে ভূমির শরীর। আমার দাদুর কণ্ঠে হুন্দা নাম স্মৃতিচারী শৈশবের সমবেত সুখের ফোয়রা। জ্বলন্ত স্বাক্ষীরা নেই, দাদুর নিশ্বাসধ্বনি আজো গেঁথে আছে মর্মমূলে, যেন উপকথা-রূপকথা! ফল্গু নামে নদীটিকে কোথাও দেখি না আজকাল কেবল পুরাণগ্রন্থে স্রোতস্বিনী হয়ে ফুটে আছে ঢাকার বুকের পাশে রামগঙ্গা আর নারায়ণী ক্রমশ তাদের স্থান ইতিহাসে অনুজ্জ্বলরূপে হুন্দা কি তেমন কেউ? নাকি অবিশ্রুত পুরাবৃত্ত! দিদিমার মুখে শোনা কথকতা! তবু স্বপ্ন আঁকি। অদৃশ্য আলোয় খুঁজি মৃত্তিকার গোপন আহ্বানে সময়-স্মৃতির তলে জেগে থাকা রাগাশ্রয়ী সুরে যদিবা কখনো আমি পেয়ে যাই পাথুরে খড়ম- বুঝে নেব হুন্দা আছে জাগরূক শ্রুতিসংহিতায়।

  • কেনই বা এলাম

    কেনই বা এলাম এই দিগন্তবিস্তৃত মাঠে কি যে নেব আর কীই বা দেব এই সৃষ্টি বুঝে ওঠার আগেই সময় ফুরিয়ে এলো এই দিগন্তবিস্তৃত মাঠ সবুজে সবুজে ভরা … সবুজে বিলীন হতেই বিবর্ণ হলুদ দ্রুত বিদায় জানাতে আসে। কেনই বা এলাম এই দিগন্তবিস্তৃত মাঠে …

  • বৈশাখের ভোর

    ১ বৈশাখের পরিপক্ব ভোর আনন্দের কথা নিয়ে সেতার-বাদনে হাঁটে। সর্বত্র সজাগ গতিবিধি; অত্যন্ত সহজ সত্যে সৃষ্টির বিষয়ে ঐক্যবদ্ধ করে দৃষ্টি। আলোক-উপমা হাসে, রুচি অনুসারে গাণিতিক অভিজ্ঞান মাধুর্যের বিশ্লেষণেও ওড়ে। এসব সম্পর্কযুক্ত বিশিষ্ট ক্রিয়াকলাপ আমাকে চিনিয়ে দেয় পথ। এইসব সাবলীল গুঞ্জনের চারিপাশ আমি বিনষ্ট করি না। নজরদারি ঋতুর স্বাক্ষরে নথিভুক্ত হয়েছে গ্রীষ্মকাল, স্বনামধন্যতার পক্ষে অরণ্যের প্রান্তর আলোময়; ব্যাখ্যার আবিষ্ট রূপ কী পথপ্রদর্শক সেজে মুখাপেক্ষী হয় নিজস্ব সংলাপ? ২ বৈশাখের ভোরে মনোরম এক ‘অনুভব’ নিজের ভাষায় – রং ও সৌরভের ভিন্নতা খুঁজে, স্পষ্ট করেছে ছন্দের অনুপ্রাস রূপ। এ-রঙের প্রতীতির সঙ্গে সবেগে চলেছে ছুটে ইতিহাস; নববর্ষের স্বস্তি যে, আলেখ্যের গান শুনিয়ে স্বপ্ন দেখায় – সেহেতু সে সব সুর ঐতিহ্যের কেতন উড়িয়ে বিস্ময়ে বিভোলে স্বকীয়তার অঞ্চলে অভ্যর্থনাও জানায় রোমাঞ্চিত রূপান্তর যেন পরিপূর্ণ হয়ে বরণ আমেজে নতুন বাতাসে ওড়ে। বৈশাখীর ‘অনুভব’ অন্যমনস্ক নয় সৌরভে।

  • যুদ্ধে বিধ্বস্ত শহর

    এই শহরে এখন সময় স্থির নয়, একটি ঝুলন্ত ঘড়ির কাঁটার মতো যার মুখ ভেঙে গেছে শার্পনেলের ছোঁয়ায়। গণকেরা বাতাসে খোঁজে জীবনের রেখা – একটি জুতো, অর্ধেক পোড়া পুতুল, দেওয়ালে আটকে থাকা হাতের ছায়া। তবু হঠাৎ, মধ্যরাতে জেগে ওঠে কঙ্কালের মতো দাঁড়িয়ে থাকা একটি বাড়ি; তার কোনো জানালা নেই, তবু ভিতরে জ্বলে একটি মোমবাতির নিঃশব্দ শিখা – যেন কেউ এখনো অপেক্ষা করে কারো ফিরে আসার। সময় গড়ায়, কিন্তু এখানে ইতিহাস স্তব্ধ। শুধু একগুচ্ছ নীল কবুতর উড়ে যায় একটি ধ্বংসপ্রাপ্ত মিনারের চারদিকে, যেন তারা এখনো বিশ্বাস করে – আকাশ সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ।

  • আঁধারকাল

    যে আলো মনের ভেতর খেলা করে সবটুকু জুড়ে সে এখন চেনা আর অচেনা নগরে এসে ভিড় করে আঁধাররেখায়। যেমন বসে পড়ে শিশু তার মায়ের কোলে তেমনি আঁচলের সব আলো ঝরে পড়ে পৃথিবীর শৈশবপাড়ায়।  যে ভোর ডেকে আনে রোদের আলোভরা চুমুর পরশ, সে কি না অতি দ্রুত চলে যায় বিষাক্ত প্রেমের হাট-ঘাট-মাঠে রোদ আর ছায়ার গোপন চুক্তির অচেনা নগরে এসে, পালিয়েছে মানুষ সুন্দরের সব গান সব সুর সব ভোর থেকে। তবু তারা যেতে চায় অচিন পাখির সুখের নগর আর মনের ভেতর পুষে রাখে জীবননদীর পরাজিত খেলা।

  • বুড়ি সোনাই, রুক্ষ দুপানি

    আমি কি বৃষ্টির সন্তান ছিলাম, নাকি প্রেমিক – কৃত্রিম ঝরনার কাছে এ খবর থাকবে না, শহুরে দৈনিকগুলোও ছাপবে না কোনো কিছু – মাঝে মাঝে নিজেকেও খুব অচেনা মনে হয়, শুধু খোলস আছে খোলসের ভেতর মানুষ, নাকি মাছি – কোথায় ছুটেছি কার পিছু? আমারও তো মাঝে মাঝে একা লাগতে পারে, এসব ওরা বোঝে না এসির বাতাসে কীভাবে নেব বৃষ্টি-হাওয়ার স্বাদ, এই অনিবার্য সন্ন্যাসে – চেনা রাস্তা, চেনা ঘর, শহরের সাজানো গাছপালা সব তবু লাগে অচেনা ত্রস্ত পায়ে এগিয়ে গিয়ে জানালায় হাত বাড়াই – দম বন্ধ হয়ে আসে। দুপানির কোলছাপা ঘোলাজল আর সোনাইয়ের কলকল স্বচ্ছ পানি জেনে রেখো তোমরা, একদিন এইসব হাঁসফাঁস অন্ধকার ছেড়েছুড়ে আবার আসবো ফিরে – ধূসর ছায়াপথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে ঠিকই জানি পৌঁছে যাব তোমাদের কাছে, কোলাহল থেকে দূরে নিমগ্ন মাটির ঘরে। হয়তো তখন স্রোতের আকাল – তোমরাও বন্দি পরাবাস্তব ফাঁদে, আর এই বুক বুড়ি সোনাই, রুক্ষ দুপানি – বেদনার মতো কাঁদে।

সাম্প্রতিক সংখ্যা