অগ্রন্থিত গল্প বসির মিঞা

লেখক: সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্

সংগ্রহ ও টীকা : মাসুদুজ্জামান

বাংলাদেশে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ (১৯২২-৭১) গ্রন্থিত ও অগ্রন্থিত ছোটগল্প সংগ্রহ করে যাঁরা সংকলন করেছেন তাঁদের মধ্যে উলেস্নখযোগ্য হচ্ছেন আবদুল মান্নান সৈয়দ, সৈয়দ আবুল মকসুদ, সৈয়দ আকরম হোসেন ও হায়াৎ মামুদ। তাঁর গল্প উদ্ধার করে সংকলিত করতে আরো যাঁরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন তাঁরা হলেন লায়লা জামান, সাজ্জাদ আরেফিন ও সাজ্জাদ শরিফ। এছাড়া কলকাতা থেকে পবিত্র সরকারের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়েছে ওয়ালীউল্লাহ্ গল্পসমগ্র

গত ১০ আগস্ট প্রথম আলোর সাহিত্য সাময়িকীতে ভূঁইয়া ইকবাল সংগৃহীত আজাদ পত্রিকায় ছাপা হওয়া ‘সাগরতীরে’ নামক একটি অগ্রন্থিত গল্প প্রকাশিত হয়েছিল। তিনিই জানিয়েছিলেন বুলবুল, পূবর্বাশা, চতুরঙ্গ, পরিচয় ও দৈনিক স্বাধীনতা থেকে কোনো গল্প এখনো উদ্ধার করা যায়নি। ওয়ালীউল্লাহ্ শনিবারের চিঠি, কৃষক, আজাদইমরোজ পত্রিকাতেও গল্প প্রকাশ করেছিলেন।

সাজ্জাদ আরেফিন কৃষক থেকে ‘শূন্যতা’ শীর্ষক গল্পটি সংগ্রহ করে প্রকাশ করেন (ঈদসংখ্যা প্রথম আলো, ২০১৫)। এর আগে এক্ষণ শারদীয় ১৩৮৮ সংখ্যায় কার্তিক লাহিড়ী জানিয়েছিলেন, অরণী পত্রিকায় ওয়ালীউল্লাহ্র দুটি গল্প প্রকাশিত হয়েছিল। এ-দুটি গল্প এখনো উদ্ধার করা যায়নি।

আমাদের সৌভাগ্য, দৈনিক স্বাধীনতা পত্রিকায় ওয়ালীউল্লাহ্র যে-গল্পটি প্রকাশিত হয়েছিল, সেটিই হচ্ছে এখানে মুদ্রিত ‘বসির মিঞা’ শীর্ষক গল্প। গল্পটি ৫ মে ১৯৪৬ সালে দৈনিক স্বাধীনতা পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। গল্পটি কলকাতার এক বন্ধুর সহায়তায় উদ্ধার করে এখানে প্রকাশ করা হলো। মূল বানান এখানে অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে।

 

***

গঞ্জের ঘাট থেকে কিছু দূরে বসির মিঞার পানসিটা বাঁধা। ওধারে দিগন্তের কাছে নিশ্চল মেঘ বসে আছে সেই সকাল থেকে, আর হাওয়া নেই। নৌকার পিছনে চুলায় হাঁড়ি, ভাত ফুটছে, আর কেমন হাল্কা শাদা ধোঁয়া উঠে খটখটে রোদে মিলিয়ে যাচ্ছে। ছইয়ের সামান্য ভেতরে বসে মাঝি বসির মিঞা পা ছড়িয়ে দড়ি পাকাচ্ছে।

বসির মিঞার বয়স যথেষ্ট। অঙ্কে তার হিসাব নেই, কিন্তু কপালের কাঁচাপাকা ভ্রূ ঝুলে পড়ে কোটরাগত চোখের ওপর, আর গায়ের চামড়া জ্যৈষ্ঠমাসের মাঠের মত খড়খড়ে, ফাটা ফাটা। বয়স হয়েছে বলেই হয়তো মেজাজটা একটু চড়া, মই-দেয়া ক্ষেতের মত বন্ধুর। এমন খিটখিটে যে লোকেরা তার নৌকায় কাজ করতে চায় না, কেউ যদি বা আসে দু-বেলা দেখেই পালায়। বুড়ো আরো বিকৃত হয়ে ওঠে, বিড়বিড় করে আর ঘন ঘন থুথু ফেলে নদীর পানিতে। শেষে সে পানিতেই ওজু করে মাথায় গামছা বেঁধে যখন নামাজ পড়তে বসে তখন তার শাদা দাড়ি হাওয়ায় ওড়ে, মনটা হাল্কা হয়ে খরস্রোতের মত তরতরিয়ে ওঠে। শেষে সন্ধ্যার পরে গঞ্জে জাহাজটা এলে যাত্রীরা আসে এবং সে যাত্রী নিয়ে নদীর বাঁক ঘুরে আবছা অন্ধকারে মিলিয়ে যায়। কোনদিন হয়তো খালে-বিলে রাত কাটে, কোনদিন আবার মাঝরাতেই যাত্রী পৌঁছে যায়। যাত্রীদের নিয়ে লেচ্ছড়ামি করা তার স্বভাব নয়। ওটি করে তার মতে যারা ছোট জাতের মাঝি তারা। কেউ এলে সে তাকাবেই না, ডাকাডাকি তো দূরের কথা। যাত্রী দর কষাকষি করলে বলবে, বাবু অন্য নাও দেহেন।

দড়ি পাকানোর যেন শেষ নেই। এক সময়ে তাই বসির একবার ওধারে তাকিয়ে দেখলে। সামনে পাড়টা উঁচু, খাড়া। তারই ঠিক ওপরে বসে একটা ছোঁড়া একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ভাতের হাঁড়ির পানে, দেখে হঠাৎ বিড়বিড় করে উঠলো মাঝি, কিন্তু কিছু বললে না, চোখ নামিয়ে দড়ি পাকাতে লাগলো। একটু পরে আবার চোখ তুলে তাকিয়ে দেখলে ছেলেটি তেমনি বসে তাকিয়ে আছে। দেখে এবার হঠাৎ সে দাঁত খিঁচিয়ে উঠলে, – এই ব্যাটা দেহস কী?

তার কথায় ছেলেটি একবার মুখ ফিরিয়ে তাকালে তার পানে, কিন্তু তা মুহূর্তের জন্য, তারপর তার চোখ নিবদ্ধ করলে হাঁড়ির পানে। বুড়োও চোখ ফিরিয়ে নিয়ে গজর গজর করলে, এক সময় হাতা দিয়ে তুলে একটা ভাত টিপে দেখলো, তারপর কিছুক্ষণ দড়ি পাকিয়ে আবার যখন ছেলেটির পানে তাকালো, তখন তার শরীর রাগে গিরগির করে উঠলো, ঝুলে পড়া ভ্রূর তলায় চোখ দুটো ঘুলিয়ে এলো ক্রোধে। একটু সামান্য ঝুঁকে গলা বাড়িয়ে সে চেঁচিয়ে উঠলো :

– হই মরার ব্যাটা দেহস কী, তোর বাপের মাথা রাঁধি দেহস?

ছেলেটি পূর্ববৎ। বসিরের খামচিতে সে বিচলিত হলো না। হয়তো জগত তার কাছে খামচি দিয়ে আছে বলে বৃদ্ধের এ-খামচি তুচ্ছ বলে মনে হলো।

– দ্যাখ, দ্যাখ ব্যাটা – সাবধান কইরা দিলাম। আমারে তুই চিনছ না?

ছেলেটি আশ্চর্য রকমে নিশ্চল। দুটো হাঁটু তুলে পিঠ সোজা করে বসে আছে, একটু নড়চড় নেই। শেষে নিষ্ফল ক্রোধে সারা মুখ বীভৎস করে বুড়ো বললে :

– দ্যাখ ভালো কইরা চাইয়া দ্যাখ, তোর বাপের মাথা রাঁধি। শেষে আবার বললে, তোর চৌদ্দগুষ্টির মাথা রাঁধি, দ্যাখ চাইয়া!

একটু পরে নামাজ পড়লে বুড়ো ফিকে লাল রঙের গামছা মাথায় জড়িয়ে। বাইরে রোদ, নদী ভরে তার চিকচিকে বিসত্মৃতি। দূর-আকাশে মেঘ, দুঃখের মত জমাট। বুড়োর ঠোঁট বিড়বিড় করলে, ক্ষুদ্র চোখ ঝিকমিক করলো তার ধাক্কায়, আর তার মধ্যে মন যেন কেন্দ্রচ্যুত হয়ে ছড়িয়ে গেলো। নামাজ শেষ করে সে খেতে বসবার আগে হঠাৎ তাকিয়ে দেখলে ওপরের পানে, দেখলে ছেলেটি তখনো তেমনি বসে, পিঠ বাঁকা করে হাঁটু তুলে। দেখে মুহূর্তের মধ্যে বসির মিঞার চোখ চক্কর খেয়ে এলো ক্রোধে, কিন্তু এবার কিছু না বলে কেবল তার দিকে পিঠ দিয়ে বসে খেতে শুরু করলো, মাথায় তখনো গামছটা। কেবল খেতে-খেতে চাপা রাগে বেশী মরিচ ডলে তার গলাটা জ্বলে গেলো ঝালে।

খাওয়া শেষ করে বর্তন ধুতে-ধুতে ছেলেটির পানে তাকিয়ে তার রাগের আবার চক্কর দিয়ে ওঠা চোখ হঠাৎ কেমন স্তব্ধ হয়ে গেলো, কী যেন সে ভাবলো। তারপর তীক্ষনকণ্ঠে চেঁচিয়ে বললে :

– হই পাঙ্গাসের ছা, এদিকে আয়।

কিন্তু কী কারণে আসবে ব্যাখ্যা করে না-দেয়াতে পাঙ্গাসের ছা নড়লো না। কয়েক মুহূর্ত অপেক্ষা করে বুড়ো তেমনি চড়া কণ্ঠেই ডেকে বললে :

– আহস না দেহি, হই ছা-এর ছা! খাইবার মন লইছে তো আয়।

তারপর নদীর নিস্তব্ধতার সঙ্গে নিজের কণ্ঠের রুক্ষতাকে মিলিয়ে দেবার জন্য যেন অস্ফুট গজর-গজর করতে থাকলো। ছেলেটি খানিক ইতস্তত করলে, কিন্তু একসময়ে উঠে কয়েক পা এগিয়ে এসে ঝুপ করে লাফিয়ে পড়লো নীচে, তার একটা পা পড়লো কাদায় আরেকটা পানিতে এবং কিছু পানি ছিটকে উঠলো মাঝির পাটাতনের উপর। মাঝি আবার খ্যাচখ্যাচ করে উঠলো। ছেলেটি রোগা। বুকের হাড়গুলো বীভৎসভাবে বেরিয়ে আছে, আর পেটের চামড়া টেনে রয়েছে। আপাদমস্তক তাকে তাকিয়ে দেখে বুড়ো প্রশ্ন করলে :

– তোর ঘর কোনহানে?

মাথা আর ঘাড় বাঁকিয়ে ঘুরে আঙুল দিয়ে একসঙ্গে যেন উত্তর-দক্ষিণ দেখিয়ে ছেলেটি কোথায় ইঙ্গিত করে অস্ফুট গলায় কী বললে। বুঝলে কী বুঝলে না, কিন্তু বুড়ো আবার প্রশ্ন করলে :

– তোর বাপ নাই?

– আছে।

– তোর বাপে তোরে ভাত দিবার পারে না?

– বাবা জেলৎ।

বসির মিঞা হঠাৎ স্তব্ধ হয়ে গেলো। যেন পালিয়ে গেলো কিছু একটা অপ্রীতিকর কথা থেকে। আর কোন প্রশ্ন না করে উঁচু হয়ে ছইয়ের মধ্যে ঢুকে রাতের জন্য রাখা ভাতটা বর্তনে ঢেলে সঙ্গে কিছু নুন আর দুটো মরিচ দিয়ে ছেলেটির সামনে এনে দিয়ে আবার ঘ্যানঘানিয়ে বললো :

– ল খা, তোর বাপের মু-ু খা।

তারপর মাঝি সরে এসে ছইয়ের ঝুলিয়ে রাখা হুঁকোটা পেড়ে কল্কেতে থম্বুরি তামাক ভরতে লাগলো, তারপর আগুন ধরিয়ে দম কষতে লাগল চোখদুটো আধো বুজে। দম দিতে দিতে শেষে আধ বোজা সে-চোখ হঠাৎ ঝাপসা হয়ে এলো। আর কী যেন ভেসে উঠে এলো অন্তরে, যেন খটখটে ফাটা মাঠের ভেতর হঠাৎ পানি উপচে এলো। কিন্তু এত খটখটে শুষ্কতা যে তা ভিজলো না, কেবল সামান্য সে সজলতায় জ্বালা আরো বেড়ে গেলো, পাথরের মত ভারী বেদনায় থেঁতলে গেলো অন্তর।

বহুদিন আগে তার এক ছেলে ছিলো, আজ নেই। হয়তো আজো বেঁচে আছে, কিন্তু আর কখনো সে ফিরবে না। ছেলে ছিলো ভালো, আর গাড়ুরের মত মস্ত বড় হয়ে উঠেছিল। কিন্তু একদিন সে মানুষ খুন করলো, তারপর জীবনের মত তার দ্বীপান্তর হয়ে গেলো। মানুষ খুন করছে তাতে বাপের লজ্জা নেই কিন্তু লজ্জায় সে মুষড়ে যায় যখন ভাবে তার ছেলে পয়সার জন্য একটা নিরপরাধ মানুষ খুন করেছে। গাঁয়ে দুই মাতববরের রেষারেষিতে একজন শেষে জ্ঞানশূন্য হয়ে তার ছেলেকে আর আরেকজনকে পয়সার লোভ দেখিয়ে তাদের মাথা নষ্ট করলে এবং এক রাতে তারা নিরীহ লোকটিকে পাটক্ষেতে নিয়ে দা দিয়ে টুকরো টুকরো করে কাটলো। কিন্তু শেষে ধরা পড়ে গেলো। বসির মিঞা শুনে হঠাৎ রেগে ক্ষেপে গেলো, দারোগাবাবুকে গিয়ে বললে : বাবু, ওরে তোমরা শুধু আমার হাতে ছাইড়া দাও, আমি তারে দেইখা লই কেমন বাপের ছেইলা ও। দারোগা সে-কথা শুনলে না, কিন্তু এ কথা সত্য যে সরকারের কাছে গিয়ে তার প্রাণ বেঁচেছে, নইলে বাপের হাতে এলে তার মাথাটি আস্ত থাকতো না। তারপর তার দ্বীপান্তর হয়ে গেলো।

বুড়োর মেজাজ আগে হয়তো ভালোই ছিল। কিন্তু সেই থেকে হঠাৎ কোথায় বিকল হয়ে গেছে। মন কেবল ঘটখট করে, জড়তায় থরথর করে। এবং এ রুক্ষতায় মানুষের জন্য দয়ামায়া নাই। আর জগতের জন্য কেবল হিংস্র বিদ্বেষ।

কিন্তু আজ হঠাৎ এ-ছেলেটির বুকের হাড় দেখে আর তার বাপ জেলে শুনে মাঝির মনটা বহুদিন পর হঠাৎ ছলছলিয়ে উঠে শেষে আত্মবিস্মৃতিতে স্তব্ধ ও সুদৃঢ় হয়ে উঠলো।

ছেলেটি এর মধ্যে খাওয়া শেষ করে বারে বারে বহু উপায়ে বাসনটা চেঁছে-পুঁছে খেয়ে সেটা ধুতে যাবার জন্য উঠে দাঁড়ালো। আত্মবিস্মৃত বুড়োকে চেতন না করেই হয়তো সে সরে পড়তো, কিন্তু হুঁকোতে টান দেবার সাধ হলো বলে বললো :

– কাগা দিবা মাঝি ?

বুড়া চমকে উঠে শেষে নিভে আসা প্রায় হুঁকোটা হাত বাড়িয়ে তাকে দিয়ে আবার দড়ি নিয়ে পা ছড়িয়ে বসলো। একসময়ে কেবল মুখ না তুলেই প্রশ্ন করলে :

– তোর বাপ চোর না ডাকাইত? তুইও বড় হইয়া ডাকাইত হইবি।

ভবিষ্যৎ সম্পর্কে কোন খসড়া তৈরী নেই বলে না হয় বুড়োর ভাত খেয়েছে বলে ছেলেটি নির্বাক থেকে কথাটা যেন মেনে নিলো। তারপর ঠান্ডা-প্রায় হুঁকোটা হাত বাড়িয়ে ফিরিয়ে দিয়ে এবার সে যাবার জন্য প্রস্ত্তত হলো। বুড়ো তাকালে, তাকিয়ে হঠাৎ ঠিকরে উঠলো তার চোখ। ক্ষীণকণ্ঠে বললে : চলছস কই? ভাত মাগনা পাইচ্ছস? এই ভাত আমি দানায় দানায় উসুল না কইরা তোরে আমি ছাড়ুম ভাবছস?

ছেলেটি এবার যেন বিহ্বল হলো হঠাৎ। কিন্তু মুহূর্তের জন্য। তারপর হঠাৎ পাটাতন থেকে কাদায় লাফিয়ে নেমে বিদ্যুৎগতিতে ছুটে পালিয়ে গেল। নিষ্ফল ক্রোধে বসির মিঞা কতক্ষণ পলায়মান ছেলেটির পানে তাকিয়ে রইলো, তারপর আবার তার চোখ দুটো চক্কর দিয়ে উঠলো, মনটা অদ্ভুত রুক্ষতায় খটখটে হয়ে উঠলো। মুখ বীভৎসভাবে বিকৃত করে সজোরে থুথু ফেলে সে আবার দড়ি পাকাতে বসল।

সন্ধ্যার পর সেদিন কেমন শ্রান্ত বোধ করলে মাঝি। যাত্রী এলে তাকালো না, উত্তরও দিলে না। শেষে লোকটি তাকে কালা বলে সন্দেহ করলে সে মুখ তুলেই বললে :

– না বাবু, কালা না আমি, তবে কিনা হগল কথা এই মরার কান দিয়ে যায় না। কোনস্থানে যাইবেন?

– মকিমপুর।

– সে গো বাবু অনেক দূর, অনেক ভাড়া পড়বো।

– দেখ মাঝি, আমি পুলিশের লোক, আমার লগে তেড়িবেড়ি করবা না। শুনে মাঝি কিছু বললে না। পুলিশের লোক শুনে ভয় পাবার মত লোক সে নয়, কিন্তু আজ পুলিশের লোককে হঠাৎ আপন মনে হলো বলে সে নীরবে তার কথা মেনে নিলো। শুধু তাই নয়, যত্ন করে লোকটির বিছানা পেতে দিলো, তারপর লগি তুলে দড়ি খুলে আবছা অন্ধকারে নৌকা ভাসালো।

সামান্য উত্তরে গিয়ে খালের মধ্যে নৌকা পড়লে মাঝি হঠাৎ কথা কইলো।

– বাবু একটা কথা কই।

– কও।

– আমরা মুকখ্য মানুষ, তাই কথাটা জানবার চাই।

– কও।

– তাছাড়া আপনারা হইলেন এই সবের হর্তাকর্তা মালিক, তাই জিগাই : একটু নড়ে উঠে ছইয়ের তলায় অন্ধকার থেকে লোকটি আবার বললে :

– কও।

মাঝি একটু কাসলো। তারপর বলল :

– আমার ছেইলাগা দ্বীপান্তরে। ও কী বাইচা আছে?

পুলিশের লোকটির হয়তো তন্দ্রার অবসাদ জমে এসেছিল, দ্বীপান্তরের কথায় এবার সচকিত হয়ে উঠে বললে :

– তোমার ছেইলা বুঝি দ্বীপান্তরে? থেমে তারপর বললে : আমরা তো তা কইবার পারুম না মাঝি, সে বাইচা আছে কী মইরা গেছে। সে খবর জানলে তুমিই জানবা।

বুড়ো উত্তর না দিয়ে হঠাৎ চমকিত হয়ে ঈষৎ বাঁদিকে তাকালো, মনে হলো মস্ত এক গোপালপুরী নৌকা ঠিক সামনে অন্ধকার করে আছে। চীৎকার করে উঠবে এমনি সময় সে-ধারণা কেটে গেলো। এমনি ভ্রম তার মাঝে মাঝে হয়। হয় চোখ নয় বুক তার দুর্বল হয়ে উঠেছে।

কপালের ঘাম মুছে একবার আকাশের তারা দেখলে মাঝি, তারপর অবাক, বললে : ব্যাটা আমার দ্বীপান্তরে তাতে বাবু দুঃখ নাই, কিন্তু আমার দুঃখ এই যে নিজের হাতে তার মাথাটা ভাইঙ্গবার পারলাম না, ব্যাটারে দেখাইবার পারলাম না কেমন বাপের পোলা হে।

নীতিকথায় আকর্ষণ নেই পুলিশের লোকটার, তাই একটু আওয়াজ করে থেমে গেলো, কিছু বললো না। মাঝিও আর অনেকক্ষণ কিছু বললো না। নদীর পানিতে আওয়াজ, আকাশে অন্ধকার, দূরে রহস্য – জীবনের মত রহস্য। আর তারই মধ্যে নানা কথা ঘনিয়ে আসে, আসে ঐ রহস্যের মধ্যে থেকে, আর মন বেদনায় ভারী হয়ে ওঠে। রুক্ষ মেজাজের কাঠিন্য এসে যায় তাতে, আর নিঃসঙ্গ মানুষ কেঁদে ওঠে অসহায়ভাবে।

এই সময় নদীতে বানের টানের দেহে রক্তের টান পড়ে। গুমরে গুমরে ওঠে মন। যে ব্যাটার মাথা সে নিজে ভাঙতে পারেনি, যার গর্দান সে নিজের হাতে দু-ফাঁক করতে পারেনি, সে কোথায়? দ্বীপান্তরে! ছেলেটি হয়ত বেঁচে নেই। বেঁচে থাকলে হয়ত সে কাঁদে, বাপজানগো বলে, হয়তো মাটি কামড়ে থাকে। গাড়ুরের মত শরীর বটে, কিন্তু সে মানে না কত বড় বেকুব ছেলেটি, কত দুর্বল তার অন্তর। স্মৃতি ঠিক কাজ করে, আরও কথা মনে পড়ে। ও তখন ছোটো। একদিন নদীতে ঝড় উঠেছিল। বাড়ি ফিরতে অনেক রাত হল মাঝির। গাঁ থেকে তখনও সে দূরে, হঠাৎ জলা থেকে একটা তীক্ষন আর্তনাদ তার কানে এল। এমন তার আওয়াজ যে তা শুনে মাঝির বুক খচ করে উঠল। ঘাটের কাছে গিয়ে বুঝল তার ছেলেই বিরাট অন্ধকারের মধ্যে দাঁড়িয়ে আর্তনাদ করে ডাকছে আর কাঁদছে। ঝড় হয়েছে, বাপ যদি তার না আসে? পরে সে ছেলেই বড় হয়ে উঠল, গাড়ুরের মতো ভারী উঠল। শেষে পয়সার লোভে তাকেই কাটল। কিন্তু সেই ছেলেই তো সেদিন তাকে ডেকেছিল – কালো আকাশের নীচে দাঁড়িয়ে, ডেকেছিল, তার আর্তনাদ ওই মহা আকাশের মধ্যে শব্দ হয়ে আছে। আজকাল মাঝির বড় ভ্রম হয়, তেমনি অন্তরেও ভ্রম হয়। আকাশ থেকে তার সেই ব্যাটার আর্তনাদ হঠাৎ আচমকা ছুটে আসে কানে। মাঝি দিশেহারা হয়ে যায়। সে বোঝে ওটা তার মনের ভুল।

হঠাৎ কথা কয়ে উঠল মাঝি। আবছা অন্ধকারে বলল, বাবু একটা কথা।

– কও।

– আমারে ব্যাটাগারে আপনারা শাস্তি দিলেন, কিন্তু আমারে যে সে খুন কইরা গেলো, তার শাস্তি দিলেন কই।

এ-সব আত্মবিলাপ লোকটার অন্তরে পৌঁছে না। তাই হঠাৎ ভারী গলায় সাধারণভাবে বললে :

– দ্বীপান্তর হইল শাস্তির বাড়া – আর কি হইব?

– না বাবু, কথাটা বুঝলেন না। আপনারা বিচার একতরফা, আপনাগো বিচার সুবিচার না। আমারে যে ব্যাটা জীবনের মত খুন কইরা গেলো তার কিছু আপনারা করলে না, হেই কথা কই।

লোকটি নীরব থাকা বাঞ্ছনীয় বোধ করল। তাই আগের মত একবার গলার একটি আওয়াজ করে চুপ করে গেলো।

আবার নীরবতা। মহাকাশে আবার কথা জাগে। পাটক্ষেতে যে-মানুষটিকে তারা কচুর মত কোপে-কোপে কেটেছিলো, তার শেষ আর্তনাদও যেন হঠাৎ ভেসে ওঠে তার মধ্যে। কিন্তু সারা আকাশে এত নিঃসঙ্গতা যে বুকে সহ্য হয় না। আজ দুপুরে যে-ছেলে হাঁড়ির পানে চেয়ে সারা রোদ মাথায় করে অতক্ষণ বসেছিলো, শেষে সেও পালিয়ে গেলো। এই পুলিশের লোকের কাছে বিচারের কথা আলোচনা করবে ভেবেছিলো মাঝি কিন্তু লোকটার যেন অন্তর নেই, তার দেহ বয়ে নিয়ে যাবার জন্য কেবল এ-রাতের বুকে দাঁড় বাইছে মাঝি। এবার এ-কথা হতে কী করে হঠাৎ একটা ক্রোধ ফুঁসে উঠলো মাঝির সারা অন্তর ছেয়ে, যেন সাপ ফণা তুলে হিংস্র হয়ে উঠলো। জগতটাকে আবার শত্রম্ন মনে হলো, মনে হলো যেন দোযখ। মানুষের অন্তর নাই এখানে, কেবল দেহে দেহে ঘষাঘষি, কেবল দেহগুলোকে পারাপার করা। তারপর তার খেয়াল হলো যে নৌকাটা সামান্য টাল খেয়ে আছে। ভারী দেহ যাত্রীর। একদিকে সরে শুয়ে আছে বলে সে ধারটা নেবে আছে সামান্য। শুধু দেহ, ভারী দেহ।

একটু পরে গলা কেশে মাঝি বললে, – বাবু, একটু মাঝখানটায় সইরা শোন গো, পাশে ভার পড়ছে।

কিন্তু বাবু এতক্ষণ তন্দ্রায়-তন্দ্রায় থেকে কখন হঠাৎ ঘুমিয়ে পড়েছে, তাই তার কোন সাড়া পেলো না বসির। তার ঘুমের জন্য মাঝির মনে একটা তিক্ত ক্রোধ খিটখিট করে উঠলো। মনে হলো ঐ মস্ত দেহটা এত ভারী যে নৌকাটা ডুবে যাবে, একবার আস্তে তলিয়ে গিয়ে নৌকাটা উল্টে আসবে। তাছাড়া সামনে মনে হলো মস্ত এক গোপালপুরী নাও, দৈত্যের মত অন্ধকার করে রয়েছে।

হঠাৎ তীক্ষনভাবে খনখনিয়ে উঠলো বুড়ো – বাবু, অ বাবু, একটু ঠিক হইয়া শোন গো, নৌকায় কেমন টাল খাইছে। কিন্তু পুলিশের লোক, শান্তির তার শেষ নাই, একবার যখন ঘুমে পেয়েছে সে-ঘুম মরার ঘুম। নিষ্ফল ক্রোধে আরো পেচিয়ে গেলো মাঝির অন্তর, দড়ির মত পাকিয়ে গিয়ে অদ্ভুত হয়ে উঠলো। সামনের পানে তাকালে মাঝি। ওটা কী সেই গোপালপুরী নাও? দৈত্যের মত মস্ত, অন্ধকার করে আছে সামনেটা। তাড়াতাড়ি দাঁড় সরিয়ে বাঁয়ে করলো নৌকো। ওধারেও কেমন অন্ধকার, সন্দেহজনক জমাট ভাব। তবে এবার গোপালপুরী নাওকে ধাক্কা দেবার ভয় হলো না মাঝির, কেবল যাত্রীর দেহের ভার অসহ্য হয়ে উঠলো। মাঝি মানুষ, নৌকার কাঠে তার প্রাণ। সে কাঠে ভার পড়লে তার দেহও ভার বোধহয়। অসহায়ভাবে বিড়বিড় করতে লাগল মাঝি, আর অন্ধকারের মধ্যে ক-বার তার চোখ দুটো চক্কর খেয়ে এলো।

বহুক্ষণ পর আসল কথা বুঝলে সে। স্রোতে বড় টান ধরেছে। বর্ষার পানি ক-দিনে ভরে তুলেছে নদী। পানির কোথায় কেমন চেহারা হয়েছে সব কথা জানা নেই মাঝির। আনামপুরের ঢালের মুখ বলে মনে হচ্ছে এ-জায়গা, কিন্তু স্রোতটা এমন কড়া হলে দক্ষিণে ভেসে যাবে নৌকা, দাঁড়ে মানবে না।

– বাবু, হই বাবু! একটু জাগেন গো বাবু! লোকটা হঠাৎ হুড়মড়িয়ে উঠলো। ভারী গলায় বললে :

– ঘাট আইছে মাঝি?

– ঘাট নয় বাবু, আনামপুরের ঢালে সোতের ঠেলায় নাও পড়ছে, একটু মধ্যখানে সোজা হইয়া বহেন। সোতের জবর টান। কেমন আওয়াজ করতাছে শোনেন না?

লোকটি কথা শুনলে। সরে এসে মাঝখানে কাত হয়ে শুলো, তারপর একটা বিড়ি ধরিয়ে টানতে লাগলো নির্বাকভাবে।

কিন্তু একটু পরে আরো বুঝলো মাঝি। এটা আনামপুরের ঢাল নয়, পদ্মার মুখ। কয়েক মুহূর্ত সে চুপ করে রইলো, তারপর আস্তে বললে :

– বাবু কপাল মন্দ আমাগো।

– ক্যান? হঠাৎ চমকে উঠে প্রশ্ন করলে যাত্রীটি।

– নেড়ার খাল না ধইরা পরেরডা নিছিলাম। পথ ভুল হইছে। এখন পদ্মায় গিয়া নাও পড়েছে বাবু। লোকটি হঠাৎ গর্জে উঠলো। বললে :

– কী কইলা, পদ্মায় পড়েছে নাও? আমার লগে খেলা কর মাঝি, আমি যে পুলিশের লোক – খেয়াল আছে নি হে কথা!

রাতের আবছা অন্ধকারে মাঝির দেহ আছে কী নেই। একটা কথাও বললে না উত্তরে, হঠাৎ কেমন শক্ত হয়ে উঠে সে নীরব হয়ে গেলো। কিন্তু লোকটি ক্রোধে আর বিহবলতায় অস্থির হয়ে উঠলো। হামাগুড়ি দিয়ে তিন হাত পেছনে এসে আবার গর্জে উঠলো :

– কথা কও না ক্যান মাঝি!

অন্ধকার থেকে একটা হাল্কা আওয়াজ এলো এবার :

– কী কমু বাবু, নাও আগে থামাই।

– নাও থামাইবা তুমি, তুমি থামাইবা। তুমি মারবার চাও আমারে?

অন্ধকারে অস্পষ্ট দেহ দেখা যায় কী যায় না। কিন্তু সেখান থেকে এবার শান্ত উত্তর এলো :

– ভয়ের কী কথা আছে বাবু। পদ্মায় পড়েছে, তা এমন কী কথা! সেই তীর ধনুকের কাছে কতবার একলা পাড়ি দিছে না এই বসির মাঝি? আপনে বাবু খালি থির হইয়া বইয়া থাকেন।

কিন্তু ভরসা হয় না। হাড়-চামড়ার পাতলা দেহ, ঝুলে পড়া ভ্রূর তলে জ্যোতিশূন্য চোখ তো নয় – চোখের ছায়া। ধরা-পড়া জন্তুর মত ফুঁসে উঠলো লোকটি, ক্রোধে ঠোঁট কাঁপছে। কিন্তু মাঝির দেহ শক্ত, স্রোতের মধ্যে শক্ত করে ধরে থাকা দাঁড়ের মত শক্ত।

দেহ শক্ত হলেও সে কিন্তু হাঁপাতে শুরু করলো, ঘামে ভরে এলো মুখ। একসময়ে দমের ফাঁকে সে বললো, শুধু থির হইয়া বইয়া থাকেন কত্তা, ভয় করবেন না।

কিন্তু বিশাল দেহ লোকটি ভয়ে কেমন হয়ে গেল। পদ্মার স্রোতে পড়ে ভেসে যাচ্ছে নৌকা – রাতের অন্ধকারে ভয়ঙ্কর ও ভীতিজনক বলে মনে হলো কথাটা : হামাগুড়ি দিয়ে এগিয়ে এসে একটা অদ্ভুত ভঙ্গিতে সে যে বসেছিলো নিশ্চল স্থিরতায়, তার পানে চেয়ে মাঝির চোখের ছায়া হঠাৎ বহুদিন পরে যৌবনের কৌতুকে আর শক্তিতে হেসে উঠলো। কিন্তু হয়তো কেবল নানা জঞ্জালের সত্মূপের আড়ালে ঢাকা পড়া মনটিই হাসলো, চোখে তার আভাস এলো না। একটু পরে তেমনি দমের ফাঁকে-ফাঁকে সে বললে :

– ভয়ের কোনো কথা নাই বাবু। মানুষের জান কী এত সসত্মা? আমারে পোলাগা খুন কইরা গেলো – তবু চুল পাকলো না, বুড়া হইলাম না আমি? আমার জানডারে শেষ কইরা গেলো হেই ব্যাটা, তবু আমার হদ্দাগা ধুক ধুক করে না?

আবার গর্জে ওঠে লোকটা :

– প্যাচাল পাইড়ো না মাঝি, নৌকা সামলাও আগে।

কিন্তু বৃদ্ধের নেশা লেগেছে। কিসের নেশা – শক্তির না মৃত্যুর, কে জানে! টানা টানা কথায় আবার বললে :

– রাগেন ক্যান, রাগের কী আছে কত্তা। খালি দুঃখের কথা কই আর কী! দুঃখে না পড়লে দুঃখের কথা শুনবার চায় না কিনা মানুষ।

লোকটি আরো ক্ষেপে উঠলো। চোখ হিংস্র করে বললে :

– তোমারে আমি ফাটকে দিমু, তুমি আমারে চিনো না মাঝি।

– চিনি বাবু। চিননের কথা আমি কই। হেরা চিনে বইলাই আছে না আমার নায়ে। আমারে তারা চিনে। কিন্তুক বাবু সোত পার হইছি, কইয়া দেহেন।

কিছুক্ষণ পর বিপদ থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত হয়ে মাঝি হঠাৎ কেমন ক্ষুদ্র হয়ে এলো, আর অন্তরটা শুষ্কতায় ঘষাঘষি খেয়ে রুক্ষ হয়ে উঠলো। বিরাট নদীর প্রচণ্ড স্রোতে পড়ে তার অন্তরে যে প্রতিহিংসা প্রশমনের মত একটা নেশাময় অনুভূতিতে তার অন্তর পিচ্ছিল হয়ে উঠেছিলো, সে-নেশা সরে গিয়ে এখন কেবল শুষ্ক বালুরাশির বিসত্মৃতি। জগতকে আবার তার শত্রম্ন মনে হলো – যে-জগতে বিচার নেই, আর যে-জগতের মানুষের অন্তর নেই। তাছাড়া আবার মনে হলো সামনে যেন একটা গোপালপুরী নাও, দৈত্যের মত মস্ত, অন্ধকার করে আছে রাতের অন্ধকারের মধ্যেও। কেমন ভয়ও পেলো; মাঝি ক্ষীণকণ্ঠে বললে, ঘুমাইতেছেন নি বাবু!

একটু আগে ভয়ে ক্রোধে যে লোকটি বীভৎস হয়ে উঠেছিল, সে-লোক এবার নিরাপত্তার জ্ঞানে আবার ঘুমিয়ে পড়েছে, দেহ কেবল ভারী হয়ে আছে মরার মত। সে-দেহে কেবল ভয় আর ক্রোধ, যেমন মস্ত দেহটার আছে ক্ষুধা। সে-দেহে অন্তর নেই। অন্তরের কথা স্পষ্টভাবে মাঝি বুঝলে কী বুঝলে না, কিন্তু সে-দেহের ভার যেন তার গায়ে এসে লাগলো, মেজাজটিও তার খিটখিটে হয়ে উঠলো, চোখ চক্কর খেয়ে এলো ক্রোধে। আবার সামনে নৌকা ভ্রম করে তীক্ষনভাবে চেঁচিয়ে উঠে বললে, বারে বারে – কিন্তু পরক্ষণেই তার দেহ যেন ভেঙে গেলো, ঝুলে এলো গ্রন্থিশূন্য হয়ে। মনটা বিড়বিড় করলে, গজর গজর করলে, ব্যাটা বাপের হাড্ডি গিল্যা তুই হজম করবার পারবি ভাবলি? সেই দুপুরে রাতের জন্য রাখা ভাত ছোড়াটাকে দিয়েছিলাম, সে ছোড়ার উপর খোদার গজব পড়বে, ছোড়া বাপের মু-ু খেয়েছে বলে ওলাউঠা হয়ে মারা যাবে।

ক্রোধে বসির মাঝির মন কেবল ধিক ধিক ধিক করলে, কিন্তু ঠোঁটে কোনো কম্পন নেই।

[বানান অপরিবর্তিত]

(দৈনিক স্বাধীনতা, ৫ মে ১৯৪৬]

Leave a Reply

%d bloggers like this: