অচেনা মানুষ, একটি বৃক্ষ ও দুটি শালিক

লেখক:

সাইফুর রহমান

 আজেবাজে নেশার কোনোটিই আজ পর্যন্ত শাহেদকে গ্রাস করতে পারেনি। গ্রাস তো অনেক দূরের কথা, এসব বাজে নেশা তাকে স্পর্শ পর্যন্ত করতে পারেনি এখনো।

তার একটিই নেশা, সেটাকে অবশ্য বাজে কিংবা ভালো কোনটি ভাববে সেটা কিছুতেই বুঝে উঠতে পারে না সে। ঘণ্টায় ঘণ্টায় চা না খেলে শাহেদের জীবনাত্মা যেন শরীর থেকে বেরিয়ে যেতে চায়।

শাহেদ ভাবে, অনেকের অনেকরকম নেশাই তো থাকে, কেউ ঘণ্টায় দু-চারটে সিগারেট না ফুঁকলে বাঁচেন না, কেউবা আবার ঘণ্টায় ঘণ্টায় পান চিবোন। কেউ রোজ রাতে পালা করে গলা পর্যন্ত সুরা

 

পান না করে বিছানায় যেতে পারেন না।

প্রাচীনকালেও এদেশে মানুষজন দোকান থেকে রীতিমতো আফিম কিনে নেশা করতেন।

বিশিষ্ট ঔপন্যাসিক বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর কৃষ্ণকান্তের উইল উপন্যাসে আফিম খাওয়ার বিষয়টি কৃষ্ণকান্ত লাল রায়ের চরিত্রের মধ্য দিয়ে ভালোভাবেই যেন ফুটিয়ে তুলেছেন।

শাহেদ তার বাঁ-হাতের মণিবন্ধে হাতঘড়িটির দিকে চোখ রাখলেন। ঘড়ির কাঁটা সাতটা ছুঁই-ছুঁই করছে। ডাক্তার এখনো আসছে না কেন? এই তো পনেরো মিনিট আগেও ডাক্তার হাসান মাহমুদের সঙ্গে কথা হলো, বেশ জোর দিয়েই বলছিলেন।

– শাহেদ তুই, একটু অপেক্ষা কর, আমি আসছি এক্ষুনি।

শাহেদ নিজেও পেশায় একজন ডাক্তার। পুরো নাম ডাক্তার শাহেদুর রহমান, অর্থোপেডিক সার্জন। এফআরসিএস করেছে স্কটল্যান্ডের এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে।

ডাক্তার হাসান মাহমুদ তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু। শাহেদ যখন এডিনবরায় এফআরসিএস করছিলেন, হাসান মাহমুদ তখন মনোবিজ্ঞানে এমএসের ছাত্র। শাহেদ আবার চোখ রাখলেন তার সুইস-নির্মিত টিসট হাতঘড়িটার দিকে। সাতটা পনেরো বাজছে। সময় যেন কিছুতেই যেতে চাচ্ছে না। আজ তার একটু বিশেষ তাড়া আছে। তিনি যে-হাসপাতালটিতে কাজ করেন, সেখান থেকে একটা জরুরি কল এসেছিল। একজন মুমূর্ষু রোগী ভর্তি হয়েছে হাসপাতালে। মোটরসাইকেল অ্যাক্সিডেন্ট। খুবই খারাপ অবস্থা। হাসপাতাল থেকে তার জুনিয়র ডাক্তার তাকে জানিয়েছেন, বাঁ-পাটা হয়তো কেটে ফেলে দিতে হতে পারে।

শাহেদ এখন আর এসব খবরে মন খারাপ করেন না। অনেকটা যেন গা-সওয়া হয়ে যাওয়ার মতো। একটা সময় ছিল, যখন তিনি বিদেশ থেকে সদ্য পাশ করে দেশে ফিরেছেন। অনেক সময় অপারেশন করে যখন রোগীদের পা কেটে ফেলে দিতে হতো কিংবা কোনো রোগীর প্রাণসংহার হতো, মনটা খারাপ হয়ে থাকত বেশ কয়েকদিন। প্রচন্ড দুঃখবোধ-আচ্ছন্ন হয়ে থাকত মনটায়।

তার সিনিয়র ডাক্তার মাসুদ মনসুর সবকিছু অনুভব করে একদিন বললেন – শাহেদ শোনো, সব সমস্যা তুমি যদি পার্সোনালি নাও, তবে তো বেঁচে থাকাটাই তোমার জন্য বেশ দায় হয়ে দাঁড়াবে। শোকে-শোকে কাটবে তোমার জীবন। ইউ উইল ট্রাই ইয়োর বেস্ট। যে বাঁচার সে বাঁচবে। এতে তোমার-আমার কিছু করার নেই।

এত কঠিন কথাগুলো কীভাবে অকপটে বলে যান তার সিনিয়র ডাক্তার মাসুদ মনসুর, সেটি কিছুতেই ভেবে পান না শাহেদ। তিনি মনে মনে ভাবেন, তার সিনিয়রের কথাই সত্যি হবে হয়তো। কারণ তার চারপাশে দুঃখ-ভারাক্রান্ত একজন ডাক্তারও তার চোখে পড়ে না। একটা সময়ে হয়তো সবারই এসব গা-সওয়া হয়ে যায়।

কীসব আজগুবি বিষয় ভেবে চলেছেন শাহেদ এতটা সময় ধরে। শাহেদ নিজের ছেলের কথা এতক্ষণ বেমালুম ভুলেই গিয়েছিলেন। যাকে তিনি আজ ডাক্তার দেখাতে নিয়ে এসেছেন, তার নয়নের মণি একমাত্র আত্মজ কৌশিকের দিকে তাকালেন শাহেদ – না, পাশেই আছে ছেলেটি। নিঃশব্দে একমনে ম্যাগাজিনের পাতা ওল্টাচ্ছে সে।

– বড্ড চায়ের তেষ্টা পেয়েছে কৌশিক।  তুই একটু বোস। এক্ষুনি ডাক্তার চলে আসবে।

– ঘাড় ঘুড়িয়ে বাবার দিকে তাকাল কৌশিক।

-ঠিক আছে, তুমি যাও চা খেয়ে চটজলদি চলে এসো। বেশি দেরি করো না কিন্তু।

– একটুও দেরি হবে না। যাব আর অমনি চা খেয়ে যত দ্রুত সম্ভব চলে আসব।

ডাক্তারের চেম্বার থেকে বের হয়ে আসলেন শাহেদ। চারদিকে তাকালেন অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টি নিয়ে, কোথাও কোনো চায়ের দোকানের দেখা পাওয়া যায় কি-না। ধানমন্ডি লেকের ধারের এ-জায়গাটি বেশ মনোরম ও চমৎকার। পাশেই লেকের জলাধার এবং অজস্র বৃক্ষরাজির সমারোহ।

মনোচিকিৎসার চেম্বারের যথোপযুক্ত জায়গা দেখে মনে হয়, এরকম জায়গাতেই মনের চিকিৎসা হওয়া উচিত। ঈষৎ দূরে একটি গাছের পাশে চায়ের একটা দোকান দেখা গেল। শাহেদ দ্রুত পা চালালেন সেদিকে।

– এককাপ চা দাও তো চটপট, ছেলেটিকে উদ্দেশ করে বললেন তিনি।

– স্যার, লাল-চা না দুধ-চা?

– আদা দিয়ে লাল-চা দাও এককাপ।

– স্যার, আদা তো নাই। শুধু লাল-চা হইবে। দিমু নাকি এককাপ। আর তা না হইলে দুধ চা-ই দেই।

– ঠিক আছে তাহলে দুধ-চা দাও।

চা-ওয়ালা ছেলেটি চায়ের কাপে দুধ ঢেলে চামচ দিয়ে নাড়তে গিয়ে টুং-টুং-টুং করে এক অদ্ভুত শব্দ তৈরি করল। সেই টুং-টুং শব্দে এক মুহূর্তের মধ্যে শাহেদ ফিরে গেলেন তার শৈশবে। চোখ বুজলেই যেন সব ছবির মতো ভেসে ওঠে, এতটুকু খাদ নেই তাতে।

তার একটি সাইকেল ছিল ফনিক্স কোম্পানির তৈরি। তার বৃত্তির টাকার সঙ্গে মায়ের দেওয়া কিছু টাকা যোগ করে সেকেন্ডহ্যান্ড একটি সাইকেল কিনেছিলেন তিনি। গায়ের মেঠোপথ ধরে সাইকেলে দৌড়ে বেড়াত কিশোর শাহেদ সকাল-দুপুর। আর সন্তর্পণে মানুষের পিছু ধাওয়া করে হঠাৎ তার বেলটি বাজিয়ে দিত। টুং-টুং-টুং। অকস্মাৎ এই শব্দে প্রচন্ডভাবে ভড়কে যেত পথিক আর এজন্য হরহামেশা তাকে অনেক খিস্তিখেউর শুনতে হতো।

– স্যার, চা লন।

চা-ওয়ালা ছেলেটির কথায় শৈশব থেকে শাহেদ ফিরে এলো বর্তমানে।

শাহেদ হাত বাড়িয়ে চায়ের কাপটি হাতে তুলে নেয়। আয়েশ করে কাপে চুমুক দেন শাহেদ। মুহূর্তেই মনটা বিষিয়ে উঠল শাহেদের। চা এত মিষ্টি হয়েছে যে, কলিজা পর্যন্ত মিষ্টি হয়ে গেল নিমিষেই। দোষটা অবশ্য তারই। তিনি একদম ভুলেই গিয়েছিলেন, চায়ে কতটুকু চিনি লাগবে সেটি বলতে। উপরন্তু মেজাজটা আরো বিগড়ে গেল চায়ের কাপে পিঁপড়ে দেখে।

– এই ছেলে, চায়ের মধ্যে পিঁপড়ে এলো কোত্থেকে?

– স্যার, চিনির গন্ধ পাইলে পিঁপড়া তো একটু আইবোই। না দেখনের ভান কইরা চুমুক দিয়া খাইয়া ফেলেন। পিঁপড়া খারাপ কোনো কিছু না। ‘পিঁপড়া খাইলে সাঁতার শিখন যায়।’

– আমাকে দেখে কী মনে হয় আমি সাঁতার জানি না? ছেলেটির সঙ্গে মিছে তর্ক করে সময় নষ্ট করার কোনো মানে হয় না। চায়ের দাম মিটিয়ে দিয়ে সোজা চেম্বারের দিকে হাঁটা দেন শাহেদ।

শাহেদকে দেখে হাত দিয়ে ইশারা করে ডাকল তার ছেলে কৌশিক রহমান। অভ্যাগতদের ভিড়ে সমস্ত জায়গা পরিপূর্ণ। দেখে মনে হচ্ছে, সমস্ত দেশ আজ ভরে গেছে মানসিক রোগীতে। শাহেদ তার ছেলের পাশে গিয়ে বসলেন। অপেক্ষা করে করে বেশ খানিকটা ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন তিনি। ক্লান্তিতে তার চোখদুটো যেন মুদে আসছিল।

চোখদুটো বন্ধ করতেই কৈশোরের আরো কিছু স্মৃতি মনে পড়ে গেল শাহেদের। বিশেষ করে রাতে বাড়ির পাশে মেঠোপথ ধরে তারই ইয়ার বন্ধুরা অনেকে মিলে হল্লা করে ছুটে যেত কোনো যাত্রা বা নাচগানের অনুষ্ঠানে।

যাওয়ার সময় গলা চেঁচিয়ে জোরে হাঁক দিত – শাহেদ  যাবি নাকি রে যাত্রা দেখতে? মধুপুরগড়ের মাঠে রহিম-রূপবানের যাত্রা হচ্ছে। কলকাতা থেকে নট-নটীরা এসেছে। শাহেদের বাবা নেই। তিনি তাঁর বাবাকে হারিয়েছেন সেই ছোটবেলায়। তখন কেবল হামাগুড়ি দিতে শিখেছেন। মায়ের মুখ থেকে বাবার অনেক গল্প তিনি শুনে মুগ্ধ হন। তার বাবা হাট থেকে কলা কিনে এনে লুকিয়ে রাখতেন তার বালিশের নিচে। শাহেদ হামাগুড়ি দিয়ে কী এক আশ্চর্য প্রতিভার জোরে সেই লুকোনো কলা বের করে আনত বালিশের নিচ থেকে। বাবা নাকি মাকে উদ্দেশ করে বলতেন, তোমার এই ছেলে অনেক প্রতিভাবান হয়েছে। দেখো, ও একদিন অনেক বড় হবে।

শাহেদ আব্দারের দৃষ্টিতে মায়ের দিকে তাকায়, যাত্রা দেখতে যাওয়ার অনুমতি প্রার্থনা করে। শাহেদের মা দুলজান বেগম অত্যন্ত কঠিন প্রকৃতির মানুষ। তিনি জানেন তাঁর এই সবেধন নীলমণি একমাত্র সন্তানকে কিছুতেই নষ্ট হতে দেওয়া যাবে না। তা যত কষ্টই হোক না কেন। দুলজান বেগম লেখাপড়া না জানলেও একজন বিচক্ষণ নারী। তিনি জানেন একটি কিশোরকে কীভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখতে হয়।  তিনি শাহেদকে উদ্দেশ করে বললেন, বাবা, আমরা অতিগরিব মানুষ। আমাদের জন্য গান, বাজনা, যাত্রা, নাটক এগুলো হারাম জিনিস।

– বাজান, এই কয়েকটা বছর একটু ধৈর্য ধরে লেখাপড়ায় মন দাও, ডাক্তার হয়ে যা খুশি করো। তখন তোমাকে কেউ মানা করবে না। স্কুলে গিয়ে শাহেদের ইয়ার বন্ধু ইসহাক, মধু, বাসেত আরো অনেকের সঙ্গে দেখা হয়। তারা শরীরের বিভিন্ন অঙ্গভঙ্গিমায় যাত্রার নট-নটীদের রঙ্গ-তামাশাগুলো অভিনয় করে দেখায়। শাহেদের বড্ড লোভ হয় একবার যাত্রা কিংবা সেসব নাচগান দেখার। শাহেদ মনে মনে ফন্দিফিকির করে, যেভাবেই হোক একবার দেখতেই হবে ওগুলো। নিষিদ্ধ বস্ত্তর প্রতি মানুষের যেন আজন্ম আকর্ষণ, শাহেদের আর তাতে দোষ কী?

এক হেমন্তে মধুপুরের গড়ের মাঠ সাজসাজ করে সেজে ওঠে। যাত্রাপালার উৎসবে যেন চারদিক প্লাবিত হতে থাকে। পাটনা থেকে নামকরা বাইজি প্রভাতী বিনোদিনী এসেছে। মধুপুরের ধনাঢ্য ব্যক্তি ইয়াজুদ্দিন তালুকদারের অর্থায়নে সুদূর পাটনা থেকে এসেছে             এ-যাত্রাদল।

এক নিকষকালো অন্ধকার রাতে মা ঘুমিয়ে যাওয়ার পর ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন শাহেদ। দূরে দাঁড়িয়ে বন্ধু ইসহাক, মধু ও বাসেতকে সঙ্গে নিয়ে জোরকদমে হাঁটা দেন গ্রামের হালট ধরে।

একী এলাহিকান্ড! নিজের চোখকে শাহেদ যেন কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছেন না। সহস্র হ্যাজাক লাইটের আলোয় ঝলমল করছে মঞ্চটির চারপাশ। অপ্সরার মতো দেখতে এক নর্তকী শরীর দুলিয়ে নাচছেন। এত মনোযোগ দিয়ে শাহেদ নাচ দেখছিল যে, চারপাশে কী ঘটছে তা খেয়ালই করেনি সে। হঠাৎ তার চোখ পড়ল হলমঞ্চের নিচে প্রথম সারিতে বসা একটি লোকের দিকে। লোকটির গায়ে ঝলমলে জরির কুর্তা, অনেকটা পাঞ্জাবির মতো দেখতে, বুকের দিকটায় ফাঁড়া। সঙ্গে সাদা ধবধবে চোস্ত পায়জামা। পায়ে পরেছেন জরির কাজ করা নাগড়া।

এত সুন্দর পরিধেয় শাহেদ আগে কখনো দেখেনি। এমনকি ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের কালেক্টর যাকে কি-না শাহেদ সবচেয়ে বড় মানুষ বলে মনে করেন, তিনিও যখন তাদের গাজনার বিলে পাখি শিকার করতে আসেন, তার পরনে থাকে ফুলহাতা চেক শার্ট, ইংলিশ প্যান্ট ও সাধারণ মানের পাম্প-শু।

শাহেদ মনে মনে ভাবেন, জরির পোশাকপরা লোকটি সম্ভবত ইয়াজুদ্দিন তালুকদার হবে। সবার মধ্যমণি হয়ে বসে আছেন সুন্দর নকশাকরা একটি কেদারায়। খানিক পরপর আলবোলার নল মুখে ঢুকিয়ে ভসভস করে ধোঁয়া ছাড়ছেন বাতাসে। ইয়াজুদ্দিন তালুকদার যে অসম্ভব প্রাণশক্তিসম্পন্ন মানুষ, সেটি বোঝা যাচ্ছে তার আলবোলার নলটানার ভঙ্গি দেখে। যখনই তিনি সজোরে নলে টান দিচ্ছেন আর অমনি আলবোলার ওপরের কয়লাগুলো রক্তিম বর্ণ ধারণ করে পটপট করে আওয়াজ তুলছে। এরকম দৃষ্টিনন্দন হুঁকো আগে কখনোই দেখেননি শাহেদ। তাঁর পাশের বাড়ির বিশু ব্যাপারি নারিকেলের খোলটিকে হুঁকো বানিয়ে বাড়ির পূর্বদিকটার ছাতিম গাছে গা এলিয়ে আয়েশ করে তামাক খায়। শাহেদের মাঝেমধ্যে প্রবল ইচ্ছা জাগে ওরকমভাবে একটু তামাক টানার।

অনেক হর্ষধ্বনির মধ্যে সম্বিৎ ফিরে পেল শাহেদ। এবার মঞ্চেনৃত্য পরিবেশন করছেন অনুষ্ঠানের প্রধান আকর্ষণ সুন্দরী বিনোদিনী। তার নাচের ভঙ্গি ও অঙ্গ-সঞ্চালন আগের নর্তকীর চেয়ে স্বতন্ত্র ও বেশ জোরালো। বিনোদিনী কোমর ও শরীর দুলিয়ে মঞ্চের এ-পাশ থেকে ও-পাশ যাচ্ছে, আর নিচে উপবিষ্ট আমজনতার মধ্যে থেকে কেউ কেউ চেঁচিয়ে উঠছে – ‘ওরে কোপ, ওরে কোপ’ বলে। তালুকদার সাহেবের চ্যালা-চামুন্ডা। ও স্যাঙ্গাৎদের মধ্যে কেউ বিনোদিনীকে টাকা দিচ্ছেন খেলিয়ে। এক হাতে বাড়িয়ে ধরছেন টাকা। বিনোদিনী নিতে আসছে, ওমনি চ্যালাটি অন্য হাতে টাকাগুলো সরিয়ে নিচ্ছে কোশলে। দেখে মনে হয় যেন একেবারে পাকা খেলুড়ে; কিন্তু চাতুর্যময়ী বিনোদিনীও কম যাচ্ছেন না। কোনো কোনো সময়ে  চালাকির খেলায় তালুকদারের স্যাঙ্গাৎকে হারিয়ে টাকাগুলো অন্য হাতে সরিয়ে ফেলার আগেই ছোঁ মেরে কেড়ে নিচ্ছে।

এসব সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতেই মনো-বিশেষজ্ঞ ডাক্তার হাসান মাহমুদ এসে ঢুকলেন চেম্বারে।

– সরি দোস্ত, রাস্তায় অসম্ভব ট্রাফিক-জ্যাম। তোকে মনেহয় বেশ খানিকটা সময় বসিয়ে রাখলাম। কথাগুলো বলার সময় কিছুটা অপরাধবোধের আভা ফুটে ওঠে হাসানের মুখবয়বে।

– না, না। ঠিক আছে। এভরিথিং ইজ আন্ডারস্ট্যান্ডেবল।

– ওহ্! আমি তো লক্ষই  করিনি। তুই তো তোর ছেলেকেও সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিস।

কেমন আছ … কী যেন নাম তোমার?

কৌশিক এবার দাঁড়িয়ে কিছুটা ঋজু হয়ে হাসানকে সালাম জানাল।

– ওয়ালাইকুম আসসালাম। হাসান এবার দুজনকেই একসঙ্গে তার রুমে নিয়ে গিয়ে বসালেন তার টেবিলের সামনে রক্ষিত কেদারায়। কলিংবেল টিপে বেয়ারাকে ডাকলেন।

– দোস্ত কী খাবি বল?

– না, না। কিছু না। শুধু চা হলেই চলবে।

– সেটা কী করে হয়? এতদিন পর এসেছিস।

হাসান বেয়ারাকে উদ্দেশ করে  বলল, ‘স্যান্ডুইচ ও কোল্ড ড্রিংক্স নিয়ে এসো।’

– এবার বলো কী বৃত্তান্ত? হাসান জিজ্ঞাসুদৃষ্টিতে তাকান শাহেদের দিকে।

– তোকে তো ফোনে কিছুটা বলেছি।

– ও হ্যাঁ, ভুলেই গিয়েছিলাম। এবার মনে পড়েছে। বিষয়টি কৌশিককে নিয়ে।

এবার হাসান কৌশিকের দিকে বেশ স্নেহময়ী দৃষ্টিতে তাকালেন এবং বললেন,

– বাবা কৌশিক, তুমি একটু বাইরে গিয়ে বসো। তোমাকে একটু পরে ডেকে পাঠাব।

কৌশিক সলজ্জভাবে মাথা নেড়ে মুহূর্তেই রুম থেকে অদৃশ্য হয়ে গেল।

– এবার গোড়া থেকে সবকিছু খুলে বল আমাকে। কিছুই বাদ দিবি না কিন্তু। হাসান শাহেদের দিকে তাকিয়ে বললেন কথাগুলো।

– তুই তো সবই জানিস। আমার স্ত্রী দীর্ঘদিন ক্যান্সারের সঙ্গে লড়াই করে আমাদের সবাইকে কাঁদিয়ে চিরতরে অন্তর্ধানে চলে গেলেন। তখন কৌশিক খুবই ছোট। আমি চাইলে অনায়াসে আরেকটি দার গ্রহণ করতে পারতাম। কিন্তু আমার একমাত্র সন্তান কৌশিকের কথা ভেবে সে-পথ আর মাড়াইনি। আমি তিলে তিলে আমার এই প্রাণপ্রিয় আত্মজকে নিজেই বড় করে তুলতে লাগলাম। লেখাপড়ায় প্রচন্ড ভালো সে। ক্লাসেও সবসময় সে আশাতীত ভালো রেজাল্ট করেছে। সবকিছুই চলছিল সুন্দর ও সাবলীলভাবে।

একদিন হঠাৎ আমি ভোরে উঠেছি। ফজরের নামাজের ওয়াক্ত তখনো শেষ হয়ে যায়নি। আকস্মাৎ দেখলাম কৌশিক চোখ রগড়াতে-রগড়াতে বুয়ার রুম থেকে বেরিয়ে তার নিজের রুমে ঢুকে গেল। বিষয়টিতে আমার মনের মধ্যে বেশ খটকা লাগল। এত ভোরে কৌশিক বুয়ার ঘরে কী করছিল? ভাবে যেন মনে হলো, সে রাতে বুয়ার ঘরেই ঘুমিয়েছিল।

হাসান এবার শাহেদকে থামিয়ে দিয়ে বললেন,

– আগে আমাকে বল তোদের বাড়ির ঝিয়ের বয়স কত?

– আর কত? তা হবে আনুমানিক বত্রিশ বছর। আরো বেশিও হতে পারে। মেয়েটির শরীরের গঠন বেশ ভালো। বেশি বয়স হলেও বয়স কম বলে মনে হয়।

– তারপর কী হলো বলে যা।

– আমি তক্কে-তক্কে রইলাম প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটনের জন্য। একটি প্রচন্ড বর্ষণমুখর রাতের কথা। সে-রাতে সমস্ত আকাশ যেন ফুটো হয়ে গিয়েছিল। আকাশ ভেঙে বৃষ্টি ঝরছিল অঝোরে। সঙ্গে বিদ্যুৎ ও বজ্রপাত। আমি প্রায় ঘুমিয়েই পড়েছিলাম। কিন্তু মধ্যরাতে বেশ ঠান্ডা অনুভূত হওয়ায় ঘুমটা ভেঙে গেল। ভাবলাম দেখে আসি কৌশিক ঘুমিয়ে পড়েছে কি-না। কিন্তু তাকে তার রুমে আবিষ্কার করা গেল না। আমি দ্রুতবেগে ধাবিত হলাম বুয়ার রুমের দিকে। বুয়ার রুমের দরজা খুলতেই বাইরে বিদ্যুৎ চমকাল। আর সে-আলো জানালা গলে রুমটিতে প্রবেশ করামাত্র আমার তড়িৎপৃষ্ট হওয়ার মতো অবস্থা হলো। দেখলাম, দুটি সম্পূর্ণ নগ্ন দেহ সাপের মতো পেঁচিয়ে নিথর হয়ে পড়ে আছে মেঝেতে।

সকালে কৌশিককে উত্তমরূমে প্রহার করা হলো। আমি বারবার তার কাছ থেকে একটি জিনিস জানার চেষ্টা করছিলাম আর সেটি হচ্ছে, সে কেন এমনটি করেছে? কিন্তু তার মুখ থেকে সদুত্তর পাওয়া গেল না। শুধু সে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল পুরোটা সময় ধরে। একবার মনে হলো সব দোষ ওই ঝিয়ের। তাই তাকে অত্র বাড়ি থেকে বিদেয় করা হলো। রাখা হলো নতুন একটি ঝি; কিন্তু যেই লাউ সেই কদু। কিছুদিন পর ঘটল সেই একই ঘটনা। দুজনকে পাওয়া গেল একই রুমে এবং বেশ আপত্তিকর অবস্থায়। ভাবলাম বয়স্ক একটি বুয়া রাখলে হয়তো এই সমস্যাটির একটি সমাধান হবে। সে-অনুযায়ী একটি বয়স্ক বুয়া রাখা হলো। কিন্তু একরাতে দেখলাম, আমার ছেলেটি সেই বয়োবৃদ্ধ বুয়ার কাছে শুয়ে আছে। তবে শরীরের পরিধেয়গুলো দুজনেরই সম্পূর্ণরূপে অটুট ছিল। প্রভাতে বুয়াকে জিজ্ঞেস করলাম, কৌশিক তোমার পাশে শুয়ে ছিল কেন?

বুয়া মুখ-ঝেমটি দিয়ে বলল, ‘হেইডা আপনি আপনার পোলারেই জিগান। আমি কি তারে আমার কাছে শুইয়া থাকতে কইছি?’

আমি প্রায় পাগলের মতো হয়ে গেলাম। ভেবে পেলাম না, আমি এখন কী করব? একবার ভেবেছি ছেলেটিকে বিয়ে করিয়ে দিলে কেমন হয়? কিন্তু পরক্ষণেই ভেবেছি ও সবে মাত্র একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষের ছাত্র। এই সময়ে বিয়ে-শাদি হলে জীবনটাকে একটি সুন্দর অবস্থানে নিয়ে যেতে পারবে না। তাই অনেক ভেবেচিন্তে তোর শরণাপন্ন হলাম।

সবকিছু শুনে একটি বড় দীর্ঘশ্বাস ফেললেন ডাক্তার হাসান। এবার তোর ছেলের মুখ থেকে কিছু শোনা যাক।

কৌশিককে রুমে ডাকা হলো। হাসান শাহেদকে চোখ দিয়ে ইঙ্গিত করলেন বাইরে গিয়ে বসার জন্যে।

হাসান প্রায় দেড় ঘণ্টা ধরে কথা বললেন কৌশিকের সঙ্গে। এই পুরোটা সময় ধরে শাহেদকে অপেক্ষা করতে হলো বাইরে।

কথা শেষ হওয়ার পর হাসান কৌশিককে নিয়ে বাইরে বেরিয়ে এলেন। শাহেদকে উদ্দেশ করে বললেন, দোস্ত, তোর ছেলের মুখ থেকে সবকিছুই শুনলাম। বিষয়টি অত্যন্ত জটিল ও দুর্বোধ্য। আমি দু-একদিন সময় নিচ্ছি বিষয়টি নিয়ে কী করা যায় তা ভাবার জন্যে। তাকে আমি যথাসময়ে ফোন করব।

শাহেদ কৌশিককে নিয়ে হাসানের চেম্বার থেকে প্রস্থান করলেন।

দুদিন পর এক দুপুরে  অতিসাধারণ কিছু ব্যঞ্জন দিয়ে শাহেদ তার মধ্যহ্নভোজ শেষ করে শবেমাত্র চেয়ারটিতে হেলান দিয়ে একটু ঝিমুচ্ছিলেন। ঠিক সে-সময়েই হাসানের ফোন এলো।

– হ্যালো, শাহেদ।

– হ্যাঁ, বলছি।

– আজ বিকেলে একটু আসতে পারবি আমার চেম্বারে?

– অবশ্যই। আমি ঠিক ৫টায় হাজির হয়ে যাব তোর ওখানে।

৫টা বাজার কিছু আগেই শাহেদ শশব্যস্ত হয়ে ঢুকলেন হাসানের চেম্বারে। হাসান শাহেদকে ইঙ্গিত দিয়ে তার সামনে রাখা চেয়ারে বসতে বললেন।

– দোস্ত,  কিছু কি সমাধান পাওয়া গেল?

– আগে একটু শান্ত হয়ে বোস। তারপর সব বলছি। তুই জীবনের হিসাব  মেলাতে অনেক ভুল করে ফেলেছিস। তুই যে বলেছিলি তিল তিল করে তোর একমাত্র আদরের ধন কৌশিককে অপরিমিত প্রশ্রয়ে বড় করে তুলেছিস, ও যখন যা চেয়েছে সেটাই তুই ওকে দেওয়ার প্রাণান্ত চেষ্টার কোনো ত্রুটি করিসনি। অথচ ওর জীবনে যে-জিনিসটির প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি ছিল, ও সেটা থেকেই বঞ্চিত হয়েছে।

হাসান এবার খানিকটা আফসোসের স্বরে বললেন, ও তো মায়ের আদর-ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত হয়েছেই, প্রবঞ্চিত হয়েছে তার বাবার ভালোবাসা থেকেও। বাবা থেকেও তার কাছ থেকে আলাদা করে এতটুকু সময় ওর জন্য ও পায়নি। তুই একজন ব্যস্ততম চিকিৎসক হওয়ায় ভুলেই গিয়েছিলি পুত্রের প্রতি তোর কী দায়িত্ব ও কর্তব্য। তাই কৌশিক তার জীবনের বেশিরভাগ সময়ই কাটিয়েছে বাড়ির ঝিয়ের সঙ্গে। ও বড় হয়ে উঠেছে মা ও বাবার ভালোবাসাহীন, প্রকৃত আদর-যত্নহীনভাবে। হাসান এবার শাহেদকে উদ্দেশ করে বললেন, তুই কি শেক্সপিয়রের ম্যাকবেথ পড়েছিস?

– হ্যাঁ, অবশ্য পড়েছি। শুধু একবার না বহুবার পড়েছি। কিন্তু আমার ছেলের সমস্যাটি সঙ্গে ম্যাকবেথের কী সম্পর্ক?

– ম্যাকবেথ নাটকে, ম্যাকবেথ ও তার ভার্যা লেডি ম্যাকবেথ যখন স্কটল্যান্ডের দয়ালু রাজা ডানকানকে দুটি ড্যাগার দিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করল, তখন তাদের দুজনের মধ্যে একরকম অনুভূতি জাগ্রত হলো যে, তারা এক অসীম পাপাঙ্কে নিমজ্জিত হয়েছে। তাদের দুজনের মধ্যেই মানসিক ভারসাম্যহীনতা দেখা দিলো। ম্যাকবেথের হাতে শুধু রাজা ডানকানই নন, খুন হয়েছিলেন রাজার আস্থাভাজন আরেক বীর সেনাপতি ব্রাঙ্কো। কিংসম্যান ম্যাকডাফের নিরপরাধ স্ত্রী-পুত্রসহ আরো অনেকে। ম্যাকবেথ মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে বিভিন্ন খুন সম্পর্কে বিভিন্ন ওল্টাপাল্টা কথা বলতে শুরু করলেন। লেডি ম্যাকবেথ তার হাতে সবসময় কাল্পনিক রক্তের অস্তিত্ব ও গন্ধ পেতেন, যদিও তারা দুজনে খুনটি সম্পন্ন করার সঙ্গে সঙ্গেই হাত ভালোভাবে ও উত্তমরূপে ধুয়ে ফেলেছিলেন।

হাসান এবার খানিকটা ভয়ার্ত চোখে শাহেদের দিকে চেয়ে বললেন, তোর মনে আছে কি-না জানি না, লেডি ম্যাকবেথ বারবার তার হাত প্রক্ষালন করে ধুয়ে নেওয়ার পরও উন্মাদিনীর মতো আচরণ করতে থাকেন এবং তার সেবায় নিয়োজিত হেকিম চিকিৎসকদের উদ্দেশ করে বলতে থাকেন, আরবের সমস্ত সর্বোৎকৃষ্ট সুরভিত পারফিউমও আমার এ-রক্তের গন্ধ দূরভিত করতে পারবে না। অবশেষে মানসিক ভারসাম্যহীনতা চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছাল এবং লেডি ম্যাকবেথ দোতলা থেকে লাফিয়ে আত্মহত্যা করলেন।

এবার শাহেদ বললেন, এসবের সঙ্গে আমার ছেলের সমস্যার সম্পর্ক কিন্তু এখনো আমার কাছে পরিষ্কার হলো না।

– একটু অপেক্ষা করো। কিছুক্ষণের মধ্যেই সবকিছুই পরিষ্কার হবে। লেডি ম্যাকবেথের এ-অবস্থাটিকে মনোবিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় অবসেসিভ ইস্পালসিভ ডিসঅর্ডার। অর্থাৎ যদিও তার হাতে রক্তের কোনো গন্ধ নেই, তবু তিনি রক্তের অস্তিত্ব ও গন্ধ পাচ্ছেন।

আর তোর ছেলে কৌশিকের ক্ষেত্রে যেটা হয়েছে, দীর্ঘদিন বাবা-মায়ের প্রকৃত আদর ও ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত হয়ে এবং বাড়ির কাজের ঝি কিংবা বুয়াদের সঙ্গে থেকে থেকে ওর শরীরের মধ্যে একরকম মানসিক ভারসাম্যহীনতা জন্ম নিয়েছে।

কৌশিকের ধীরে ধীরে কাজের বুয়াদের শরীরের গন্ধ যেমন ধর, পেঁয়াজ, রসুন আদা কিংবা বিভিন্ন মসলাজাতীয় দ্রব্যের গন্ধের প্রতি আসক্তি জন্মেছে। এখন ও সেসব গন্ধের আভাস না পেলে ঘুমোতে পারে না এবং ওর মধ্যে সবসময় একটি অবসেসিভ কম্পালসিভ ডিসঅর্ডার কাজ করে।

– এখন আমি কী করব? শাহেদের কণ্ঠে এক নিদারুণ অসহায়ত্বের ভাব ফুটে ওঠে।

– এ-মুহূর্তে ওর ওপর কোনো ধরনের চাপ প্রয়োগ করা ঠিক হবে না। আমি ভেবেচিন্তে ওর ওপর কিছু থেরাপি প্রয়োগ করব।

হাসান কথা শেষ করে শাহেদকে বলল, তুই তাহলে আজ বাড়ি যা। কৌশিককে একটু সময় দে। কোথাও গিয়ে না-হয় বেড়িয়ে আয় কয়েকদিন।

শাহেদ বুকের মধ্যে একটি চাপা ব্যথা নিয়ে চেম্বার থেকে বেরিয়ে এলো। সন্ধের  তখনো বেশ খানিকটা বাকি। বাইরে লেকের জলাধারের বৃক্ষগুলোর মাথায় শেষ বিকেলের রৌদ্রের ঝলমলে আলো তখনো খেলছিল। হাসানের মুখ থেকে সবকিছু শুনে নিজের রক্ত-মাংসের চিরচেনা আত্মজকে আজ অনেক অচেনা মানুষ বলে মনে হলো। আরো মনে হলো এই কৌশিক তার নিজের সন্তান নয়। অন্য এক মানুষ। দুঃখ-কষ্ট-বেদনায় বুক আরো ভারি হয়ে এলো শাহেদের। অশ্রু-আদ্রিত নয়নে দূরে তাকাতেই একটি বৃক্ষের নিচে দুটি শালিক দেখতে পেল শাহেদ এবং ক্ষণেই শালিক দুটো উড়ে গেল দূরে এবং সম্ভবত বহু দূরে।