অতিদানবের ঈশ্বররসনা

লেখক:

কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীর
অতিমানবের ঈশ্বর বাসনা
হুমায়ূন মালিক

জোনাকী প্রকাশনী
ঢাকা, ২০১৩

১৫০ টাকা

অতিমানবের ঈশ্বর বাসনা হুমায়ূন মালিকের চতুর্থ পূর্ণদৈর্ঘ্য উপন্যাস। আমরা গ্রন্থটির পাঠ শুরুতেই বুঝতে পারছি যে, এ-উপন্যাসের ভেতর দিয়ে বহুমাত্রিক জীবনবিন্যাসই শুধু প্রকাশ পায়নি, এর অন্তর্জগতে ভ্রাম্যমাণ আছে সামাজিক-সাংস্কৃতিক বাস্তবতার এক ব্যাপক ইতিবৃত্ত। আমরা উপন্যাসটির শুরুতেই দেখবো উষা নামে জায়গাটি কার্যত এক সাম্রাজ্যবাদী থাবার বিশাল বিস্তার। আমরা গ্রন্থটির পাঠ শুরুতেই উষা নামের ভেতর ঘুরপাক খাবো। কারণ আমরা হিসাব মেলাতে পারব না, আসলে লেখক উষা বলতে কী নির্ণয় করতে চেয়েছেন? তবে আমাদের ঘোর কাটতে খুব বেশি সময়ও লাগবে না। কারণ আমরা ঘোর লালনবিরোধী। আমরা আমাদের লালিত সত্যের কাছে যাই। ঔপন্যাসিকও তাঁর পাঠককে ক্রমাগত এক ঘোরের ভেতর রাখাটা হয়তো পছন্দ করছেন না! আমরা অচিরেই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলব, এই ঊষা যেন টঝঅ-এর সংক্ষিপ্ত রূপ! এখানে পেষণ আছে, আছে সাম্রাজ্যবাদী থাবা। আমরা কেন এমনটি ভাবতে গেলাম? প্রথমত তা ভাবতে গেলাম, কারণ সাম্রাজ্যবাদ আমাদের এভাবেই ভাবায়, দখলের রাজনীতি শেখায়, সবকিছু দখলে নেওয়ার বাসনা লালন করে। এখানেও শ্যামরাজ্য দখলের পাঁয়তারা দেখি, একে দখল তারা করেও। শাদামাটা দখলেই তারা ক্ষান্ত হয় না। আমরাও আশা করি না যে উষা নামের সাম্রাজ্যের অধিপতি মার্কেল শান্ত-ক্ষান্ত-ক্লান্ত হবেন। সাম্রাজ্যবাদের যে-প্রতিভূ তার তো এমনটি করারও কথা নয়। সাম্রাজ্য নামের ভেলকিবাজির কিছু নমুনা আমরা এভাবে পাই – ‘এ সবই না হয় সওয়া গেল কিন্তু দ্বীপ দেশটির সবচে বড় কবি লিউ, প্রগতিশীল শিল্পী-সাহিত্যিকদের যিনি আদর্শিক গুরুও বটেক, মোবাইল ফোনের সিম ও সেটের বিজ্ঞাপন করেন জাতীয় শহীদ দিবসকে পটভূমি করে। শহীদ মিনারে যাওয়ার আহ্বান জানিয়ে জনপ্রিয় তরুণ ঔপন্যাসিক লুইসকে তিনি বহুজাতিক কোম্পানির ফোনে কন, দিবসটি উপলক্ষে গ্রিন ওশান নেটওয়ার্ক – জিএনের ফ্রি কলের সুযোগ ছিল বলেই-না আজ আমরা সম্মিলিতভাবে শহীদদের শ্রদ্ধার আয়োজন করতে পারছি।’ (পৃ ১৪)
আমরা এর শুরুতেই ইঙ্গিত পাব যে, শ্যামরাজ্য লণ্ডভণ্ড হয়ে যাচ্ছে, সেখানে যোগাযোগের সব পথই কার্যত বন্ধ, এমনকি ল্যান্ডফোনেও যোগাযোগ করতে পারে না রোজা নামের চরিত্র। আমরা সমস্ত উপন্যাসে এই এক চরিত্র পাই, যাকে বলা যেতে ব্যক্তিত্ব বিকাশের এক প্রতিভূ, যাকে সলিড চরিত্র বললেই বোধকরি যথাযথ বলা হয়ে যায়। তারই মনোজগতের ভেতর দিয়ে, কাজের ভেতর দিয়ে, সর্বোপরি নিজেকে উজাড় করে দেওয়ার ভেতর দিয়ে আমরা এমন এক জগতের নাগাল পাই, বা সে-জগতের কথা মনে করতে পারি, যেখানে সব হারানোর পরও আশা মরে না। কার্যত জীবন ক্ষয় হয় না। পরাজয়ের ভেতর দিয়ে বেঁচে থাকে। আমরা দেখি, মার্কেলের অপতৎপরতায় কীভাবে একেকটা রাজ্য বিনাশ হয়ে যায়। দুঃস্বপ্নের চাষাবাদ চলে। মানুষের সামগ্রিক আদল যেন বদলে যায়, মানুষ মরতে থাকে, মৌলবাদের চরম উত্থান ঘটে – তাদের ব্যক্তিত্বের পরিবর্তনই হয় না, দৃশ্যময় মানবও যেন বদলে যায়। আসলে আমরা যা দেখি বা দেখতে বাধ্য হই, তা যে দেখব তা তো আমাদের দৃশ্যমান বাস্তবতা দেখেই বুঝে নিতে পারি।  মার্কেলও জানান, পরের জন্মে তার নামের পরিবর্তন ঘটবে!
রোজার মাধ্যমে যে-শ্যামদ্বীপের নাগাল আমরা পাই, তা আমাদের এই ব-দ্বীপের কথা মনে মনে ধরলেও যে তাতে তেলসম্পদের কথা উঠে আসে, তাতে যে কালো কালো মানুষের একেকটা জগৎই দেখি। এতে লাতিন আমেরিকা, ওয়েস্ট ইন্ডিজ যেন বারবার প্রতিভাত হয়। হয়তো তা তৃতীয় বিশ্বের সারাৎসার। অধিবাস্তবতার ভেতর দিয়েই তার চেহারা পালটে যায়। লেখক এখানে তাঁর সৃজনশীলতা উদযাপনে ছিলেন ষোলো আনা। আমরা যে দৃশ্যমান বাস্তবতা দেখি, তিনি সেই বাস্তবতার ভেতর যেন প্রতিবাস্তবতা নির্মাণ করেন। আমরা লেখকের এক জগৎ পাই, যেখানে, যার ভেতর দিয়ে আমাদের এই জগৎ, শোষণে শোষণে নিমজ্জিত জগতের বিকল্প জগৎ দেখি। আমরা আমাদের অতিপরিচিত রাজনৈতিক ইতিবৃত্ত ওয়ান-ইলেভেনের কথা মনে করতে বাধ্য হই। সমগ্র জাতিকে নেতৃত্বশূন্য শুধু করা নয়, আন্দোলনশূন্যতার ভেতর দিয়ে জাতিসত্তাকে সাংস্কৃতিকভাবে বিনাশের ইশারা দেখি। যেন রাষ্ট্রহীনের গল্প শুরু হয়। এর ভেতর দিয়ে এই জাতিসত্তাকে জাগরণের এক মেকি আবহ দেখি, একটা মাত্রায় একে উন্নীতকরণের ইশারা পাই। সেখানে বিদ্রোহীও লালন করা হয়, একধরনের অভিনয় চলে, একটা লিমিটেশনের কড়া গন্ধ পাই।
এখানে আমরা রেলের একটা চরিত্র দেখি, সে আসলে একটা প্রতিষ্ঠানকে একধরনের বিকাশের ভেতর রাখার বাসনা লালন করেন, এটিকে লেখক দৃশ্যত পজিটিভ ক্যারেক্টর হিসেবে প্রেজেন্ট করেন, সেখানে তিনি কোনো দৃশ্যমান অনিয়মে থাকেন না। আমরা অবশেষে এক হত্যাকাণ্ড দেখি, যেখানে তিনি মারা যান। রেল বন্ধ হতে দেখি, চলে নানান কার্যধারা। আমরা রোজার গর্ভে সন্তান আসতে দেখি। এ-জায়গাটায় লেখক এক চমৎকার জাদুবাস্তবতার আশ্রয় নিয়েছেন। শ্যামরাজ্যকে একেবারে ভেতর থেকে ধ্বংস করার জন্য নানান তৎপরতা দেখি। এই দ্বীপের মেয়েমানুষদের গর্ভকে তাদের বীর্য দিয়ে দৃশ্যত ব্লক করা হয়। আমরা এখানে গ্রন্থটি থেকে কিছু অংশ পাঠ করতে পারি – ‘ইউসেনারা সেই সব নারীদের ধরে ধরে গর্ভপাত ঘটায় যাদের তাদের সন্দেহ হয় যে এরা শ্যামবীর্যে গর্ভবতী। আর বাকি রমণীদের আগেরই মতো ধর্ষণে ধর্ষণে গর্ভধারণ করিয়ে ব্লক করে রাখে যেন তারা শ্যামসন্তান ধারণ করতে না পারে। যে শিশুকেই চৌকস মনে হয় তারা তাকে টর্চার সেলে পাঠানোর মতো খনি বা কারখানার এমন কাজে নিয়োগ দেয় যে কিছুদিন যেতে না যেতে সে অসুস্থ-বিকৃত হয়ে পড়ে।’ (পৃ ৯৬)
তবু মানুষ পরাজয়ের চিহ্ন লালন করতে চায় না, তারা আবার জেগে উঠতে চায়, তাই তো আমরা যা দেখি তা এর শেষাংশ থেকেই পাঠ করা যাক, ‘তারা এসব করে আতঙ্কে সন্দেহবাতিকগ্রস্ত হয়ে পড়া থেকেই কিন্তু এতো কিছুর পরও কৃষ্ণ কিংবা মূসার জন্মের মতো এক অসাধারণ ক্ষমতাধর শিশু শ্যামদ্বীপে জন্ম নেয় এবং তাদের দৃষ্টি এড়িয়ে চোখের সামনেই বেড়ে উঠতে থাকে। নিশ্চয়ই তার সম্পন্ন মানব হয়ে ওঠা এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। কিন্তু প্রকৃতই তেমন কেউ জন্ম নিয়ে বেড়ে উঠছে কিনা, হলে ও কার সন্তান, টিনা না তার নিজের কিংবা অন্য কারো তা নিয়ে রোজা এক ঘোরের মধ্যে, প্যাঁচের মধ্যে পড়ে। আসলে এ তার স্বপ্ন, না বাস্তব তা নির্ণয়ের সামর্থ্যই বুঝি হারিয়ে ফেলেছে ও!’ (পৃ ৯৬)
অবশেষে আমরা এমন এক কাহিনি শুনি, যা আমাদের আশাবাদী করে, তা হচ্ছে এরকম, ‘কিন্তু, তার পরও, নাটকের অন্তিম দৃশ্যের মতো ইতিহাস কোথাও স্থাণু হয়ে যায় না। তবে কিনা কাশ্ফ শক্তিধরের মতো দূরদর্শী কোনো সমাজ বা ইতিহাস গবেষকও বলতে পারবেন না, এভাবে কতকাল চলবে, তার পরের অধ্যায়েইবা কী রচিত হবে!
বক্ষ্যমাণ এই রচনা কোনো ফিকশনই নয়, এ গ্রিন ওশানের কোনো এক দ্বীপের নিরেট সত্য এক ইতিহাস অথচ দুনিয়ার আর সব মানুষ, এমনকি এই মহাসাগরের বাকি দ্বীপগুলোর অধিবাসী যারা এর সবই জানে তাদের বোধেও এ এক ফ্যান্টাসিই।’ (পৃ ৯৬)
এইভাবে আমরা ফ্যান্টাসির ভেতর দিয়েও জীবনের গল্প শুনি। শ্যামরাজ্যের ভেতর দিয়ে আমরা আমাদেরই কথা শুনি, ঈহাই নামের এক গোষ্ঠীকে দেখি; তারা ধর্মের কথা বললেও কার্যত যুদ্ধাপরাধী, দেখি মৌলবাদের ভেতর দিয়ে বেড়ে ওঠা একধরনের সন্ত্রাসকে। আমরা একে প্রতিহত করার বাসনায় থাকি। প্রগতিশীলদের নানান কার্যকারিতা আমরা লক্ষ করি। এভাবেই আমরা এক ব্যাপক কর্মযজ্ঞের ভেতর যাতায়াত করি। এবারের একুশে বইমেলায় প্রকাশিত এক গ্রন্থটি মাত্র ৯৬ পৃষ্ঠার হলেও এর ভেতরকার যে আয়োজন তা ভিন্ন এক আবহ সৃজন করে। আমরা তাতে নিমগ্ন হই; বলা যায়, মনোযোগে তাতে সময় পার করি। এতে রূপকের যে-আধিক্য আছে, অনেক কথাকে অল্পকথায় পরিণত করার যে কায়দা আছে, স্বপ্নবাস্তবতার রূপ আছে, তা গ্রন্থটিকে আলাদা এক অবস্থান দিয়েছে। তবে এর ভেতর দিয়ে পাঠস্বাদুতার এক গড়পরতা আমেজ যদি আমরা নির্ণয় করতে চাই, তাহলে সেই পাঠক কার্যত আশাহত হবেন। গল্পের ভেতর গল্প দেওয়ার যে হুমায়ূনীয় প্রবণতা আছে, তা পেরিয়ে গ্রন্থপাঠে সতত মনোযোগী থাকা খুব সহজ কাজ নয়। এর পাঠ-অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে আরো কিছু কথাবিনিময় আমাদের কাছে অপরিহার্য মনে হয়, আমরা বারবার ভাবতে শুরু করি, এর নামকরণটি এমন কেন? মার্বেলের মতো ক্ষমতাপাগল, কৌশলে ত্রাসপয়দাকারী একজন জান্তবীয় স্বভাবের মানুষ কী করে অতিমানব হন? তার ভেতর ঈশ্বরবাসনা হলে তার স্বরূপ তো লেখকই নির্ধারণ করে দেবেন। এই ঈশ্বর তো ধর্ম-প্রযোজিত ঈশ্বর হতে পারেন না। এত দখল, এত সত্তাবিনাশকারী মার্কেলের এমনতর নামে আমরা বরং অবাকই হতে পারি কেবল!
হুমায়ূন গল্প বলেন তাঁর নিজস্ব বয়ানে, তিনি অনেককিছুই প্রকাশের পক্ষে থাকেন (এখানে সায়েন্স ফিকশন, মেটাফিকশন, ফ্যান্টাসিকে একাকার করেছেন); সমাপিকা ক্রিয়া কখনো কখনো লুপ্ত হয়। বাক্যের ভেতর লৌকিক ভাষার একটা আবহ তাঁর বয়নকে আলাদা এক মাত্রা দিয়েছে, নানান ভাষা এতে মিশ খেয়েছে। ফলে, তিনি তাঁর মতো করেই কথাশৈলীর এক রূপময়তা প্রকাশ করলেন। আবারো একই কথা বলতে হয়, পাঠকের সঙ্গে এর তেমন সংযোগ হচ্ছে বলে মনে হয় না। ফলে, এর কথা অনেকটাই লেখকের কথা হয়েই নিঃসঙ্গতা পালন করবে!