অদ্বৈত মল্লবর্মণের মননবিশ্ব

লেখক: সরকার সোহেল রানা

বাংলা সাহিত্যে অদ্বৈত মল্লবর্মণের অবদান কী এবং কেনই-বা আমরা তাঁকে স্মরণ করব, এমন প্রশ্ন যে-কারো মনে জাগা স্বাভাবিক। তিনটি উপন্যাস, চারটি ছোটগল্প, একটি উপন্যাসের অনুবাদ, কয়েকটা কবিতা-প্রবন্ধ-নিবন্ধ ও লোকসাংস্কৃতিক সংগ্রহ এবং সর্বশেষ-আবিষ্কৃত অগ্রন্থিত একটি পুস্তকের লেখাপত্র নিয়ে অদ্বৈত মল্লবর্মণের (১৯১৪-৫১) সাহিত্যিক জীবন। এই অল্প রচনায় কতটুকু গুরুত্বের দাবি রাখতে পারেন অদ্বৈত? আমাদের ধারণা, শুধু অদ্বৈতই নয়, একজন লেখক শুধু একটি লেখার জন্যও গুরুত্বের দাবিদার হতে পারেন, যদি লেখাটি সত্যকার ‘লেখা’ হয় এবং তাতে চিন্তা ও উপস্থাপনাগত নতুনত্ব থাকে। আসলে এ সবকিছুই নির্ভর করে লেখক কীভাবে জীবনকে দেখেন এবং পাঠককে কীভাবে দেখাতে চান তার ওপর। সেদিক থেকে বিচার-বিশ্লেষণ করলে অদ্বৈত মল্লবর্মণ গুরুত্ব পাওয়ার দাবি রাখেন। এ-কথার সপক্ষে এখানে অদ্বৈত মল্লবর্মণের তিতাস একটি নদীর নাম উপন্যাসটির উল্লেখ কতে চাই, কারণ এটির জন্য অদ্বৈত যে বাংলা সাহিত্যে মর্যাদাবান আসন পেয়ে গেছেন, তা এখন সর্বজনস্বীকৃত। কারণ নদী ও জীবনের, খোলাসা করে বললে, কাজী আবদুল ওদুদের (১৮৯৪-১৯৭০) নদীবক্ষে, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের (১৮৯৪-১৯৫০) ইছামতি, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের (১৮৯৮-১৯৭১) কালিন্দী, হুমায়ুন কবিরের (১৯০৬-৬৯) নদী ও নারী, সত্যেন সেনের (১৯০৭-৮১) এ কূল ভাঙ্গে ও কূল গড়ে, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের (১৯০৮-৫৬) পদ্মা নদীর মাঝি, নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের (১৯১৮-৭০) উপনিবেশ, অমিয়ভূষণ মজুমদারের (১৯১৮-২০০১) মধু সাধু খাঁ, কাজী আফসার উদ্দীন আহমদের (১৯২১-৭৫) চর-ভাঙা চর, সমরেশ বসুর (১৯২৪-৮৮) গঙ্গা, শামসুদ্দীন আবুল কালামের (১৯২৬-৯৭) কাশবনের কন্যা, আবু ইসহাকের (১৯২৬-২০০৩) পদ্মার পলিদ্বীপ, দেবেশ রায়ের (১৯৬৩) তিস্তাপারের বৃত্তান্তসহ জল ও জীবন নিয়ে বাংলা সাহিত্যে যত উপন্যাস রচিত হয়েছে, সেগুলো থেকে অদ্বৈতের তিতাস একটি নদীর নাম স্বকীয় বৈশিষ্ট্যে আলাদা ও অনবদ্য। জল ও জীবনের সম্পর্ক নির্মাণে অদ্বৈতের ‘দেখাটাই’ অন্যদের ‘দেখা’ থেকে ভিন্ন। অদ্বৈত মল্লবর্মণের তিতাস একটি নদীর নাম উপন্যাস জল ও জীবনের একমাত্র বিকল্প নন্দন। এক্ষেত্রে আমরা কথাসাহিত্যিক কায়েস আহমেদের বিবেচনা স্মরণ করতে পারি। কায়েস আহমেদ তাঁর ‘ঘূর্ণির টান ও নিরাবেগ বোঝাপড়া’ প্রবন্ধে লিখেছিলেন :

বঙ্গদেশের গ্রাম সমাজের ভাঙা-গড়া সামন্তবাদের অবক্ষয়ের পাশাপাশি মাথা মুড়ানো নব্য ধনিক শ্রেণীর উত্থানের বাস্তব ছবিটি পাওয়ার জন্যে একজন অমার্কসবাদী তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, কি খাঁটি জেলে পরিবারে জন্ম ও আত্মপরিচয়ের প্রতি শ্রদ্ধাশীল অদ্বৈত মল্লবর্মণের কাছেই হাত পাততে হয়। কোন মার্কসবাদী লেখকের হাত দিয়ে তা বেরোয়নি। এমন যে বিপুল শক্তিধর মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, তাঁর বিশাল ব্যাপক সাহিত্য জগতের এই জীবনের সন্ধান মেলে না। জেলে জীবন নিয়ে লেখা ‘পদ্মা নদীর মাঝি’র পাশাপাশি অদ্বৈত মল্লবর্মণের ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ পড়লেই বোঝা যায় একটি শহুরে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মানুষের রচনা অপরটি অপেক্ষাকৃত কম শক্তিমান হাতের লেখা হলেও তা ভেতর থেকে লেখা। […] অবশ্য অদ্বৈত মল্লবর্মণে জেলে জীবনের যে বিশ^স্ত পরিচয় মেলে সেই অর্থে খাঁটি কৃষক জীবন তারাশঙ্করেও নেই, আজ পর্যন্ত রচিত হয়নি (এ ব্যাপারে সবেধন নীলমণি শরৎচন্দ্রের ‘মহেশ’ গল্পটি)।

কায়েস আহমেদের মন্তব্য এই কারণে এখানে উল্লেখযোগ্য যে, ‘ভেতর থেকে লেখা’ কথাটি বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। শিল্প-সাহিত্য, অর্থনীতি, রাজনীতি, সংস্কৃতি তথা জীবনটাকে ‘ভেতর থেকে দেখা’ বিষয়টি ব্যাপক গুরুত্বের দাবি রাখে। দার্শনিকভাবেও ‘দেখা’ ব্যাপারটিই চিন্তার কেন্দ্রীয় ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। ‘ভেতর থেকে দেখা’ – অর্থাৎ খাঁটি ও গভীরভাবে দেখার ক্ষমতা অদ্বৈতের ছিল। আর কেবল ভেতর থেকে দেখা নয়, সেই ‘দেখা’কে যথার্থরূপে সাহিত্যে তিনি উপস্থাপনও করতে সমর্থ হয়েছিলেন। তাই কায়েস আহমেদ উল্লেখ করেছেন : ‘অদ্বৈত মল্লবর্মণে জেলে জীবনের যে বিশ^স্ত পরিচয় মেলে সেই অর্থে খাঁটি কৃষক জীবন তারাশঙ্করেও নেই’ – মানে যে জেলে জীবনকে তিনি তাঁর সাহিত্যে উপস্থাপন করেছেন তা ‘ভেতর থেকে দেখা’ ও লেখা খাঁটি জেলে জীবন। তার মধ্যে কোনো কৃত্রিমতা বা আরোপিত ব্যাপার নেই। আর অদ্বৈত যেভাবে জেলে জীবনের বিশ^স্ত পরিচয় দিয়েছেন তা তারাশঙ্করের কৃষক জীবনে নেই, ব্যাপারটাকে আমরা সেভাবে দেখতে নারাজ। আমাদের দাবি, জলজীবন বা জলসংশিস্নষ্ট জীবনের ওপরে উলিস্নখিত যত উপন্যাস রচিত হয়েছে তার মধ্যে ‘ভেতর থেকে দেখা, কৃত্রিমতা বিবর্জিত খাঁটি জীবনের বিশ্বস্ত পরিচয় একমাত্র অদ্বৈতের তিতাস একটি নদীর নাম উপন্যাসে নিহিত। কারণ গোকর্ণঘাট গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া শান্ত-স্নিগ্ধ ও অথৈ জলে দুকূল উপচেপড়া ছোট একটি নদী তিতাস। এরকম নদীর সংখ্যা বাংলার বুকে দুর্লভ নয়। অদ্বৈত মল্লবর্মণের তিতাস একটি নদীর নাম উপন্যাসের জন্যই আজ তাঁর এত পরিচিতি। কোনো ইতিহাস কিংবা রাষ্ট্রবিপস্নবের খাতায়  কিংবা ইতিহাসের পাতায় পাতায় তিতাসের নাম খুঁজে পাওয়া যাবে না। অদ্বৈতের ভাষায়, ‘তিতাসের বুকে তেমন কোন ইতিহাস নাই। সে শুধু একটা নদী।’ এ-নদীর পাড়ে বসবাসরত অবহেলিত অবজ্ঞাত শিক্ষা ও আধুনিক জীবনের সুবিধাবঞ্চিত গ্রামীণ মানুষের জীবনযাপন। তিতাসকে কেন্দ্র করেই তাদের কষ্ট-বেদনা-হাসি-কান্না-ভালোবাসা উত্থিত হয় আবার মিলিয়ে যায় – এটাই এ-নদীর বিশেষত্ব। পদ্মা-মেঘনার মতো বিশালতা প্রচণ্ডতা এ-নদীর নেই; কিন্তু লেখকের বর্ণনায় তিতাস পাড়ের মানুষ আর তিতাস যেন এক অপরের পরিপূরক – জল ও জীবনের সেই অনবদ্য ছবি ফুটে উঠেছে এই উপন্যাসে। লেখকের ভাষায় :

তিতাস কত শান্ত। তিতাসের বুকে ঝড়-তুফানের রাতেও স্বামী-পুত্রদের পাঠাইয়া ভয় করে না। বউরা মনে করে স্বামীরা তাদের বাহুর বাঁধনেই আছে, মায়েরা ভাবে ছেলেরা ঠিক মায়ের বুকেই মাথা এলাইয়া দিয়া শান্ত মনে জাল গুটাইতেছে।

আবার পরক্ষণেই লেখক নিজেই জানিয়েছেন জীবন ও জলের এই সম্পর্কের কথা ইতিহাসের পাতায় ঠাঁই পায় না। পৃথিবীর লিখিত ইতিহাসের অংশ না হলেও জীবনধর্মের সত্য উচ্চারণে, তিতাস পাড়ের মানুষের মন ও মননে, নিম্নজীবী মানুষের আবেগের ভাষা ধারণে এবং অবহেলিত জেলে সমাজের কথকতায় তা পরিপূর্ণ। লেখকের ভাষায় :

পুঁথির পাতা পড়িয়া গর্বে ফুলিবার উপাদান এর ইতিহাসে নাই সত্য, কিন্তু মায়ের স্নেহ, ভাইয়ের প্রেম, বৌ-ঝিয়ের দরদের ইতিহাস এর তীরে তীরে আঁকা রহিয়াছে। সে ইতিহাস কেউ জানে, কেউ হয়ত জানে না। তবু সে ইতিহাস সত্য। এর পাড়ে খাঁটি রক্তমাংসের মানুষের মানবিকতা আর অমানুষিকতার অনেক চিত্র আঁকা হইয়াছে।

ফলে বলা যায় যে, জলজীবন বা জলসংশিস্নষ্ট জীবনের বিকল্প নন্দন সৃষ্টিতে অদ্বৈতের জুড়ি মেলে দায়। এক্ষেত্রে তিনি এক, অদ্বিতীয় ও অগ্রপথিক। গবেষক-সমালোচক মোস্তাক আহমাদ দীনের বিবেচনায়, ‘অদ্বৈতের তিতাস একটি নদীর নাম উপন্যাসটি মৌলিক, লোকস্পর্শী ও জলমাটিআগুনের কাহিনি হলেও আঙ্গিক বিবেচনায় তা কোনোভাবেই লোকায়ত নয়, বরং তা ছিল এক উচ্চাকাঙ্ক্ষী ধারণারই প্রতিফলন।’ এই মন্তব্যের দুটি দিক খুব গুরুত্বের দাবি রাখে। এক. উপন্যাসের মৌলিকত্ব নিয়ে; দুই. উপন্যাসের আঙ্গিক বিবেচনা নিয়ে। উপন্যাসটি ‘মৌলিক, লোকস্পর্শী ও জলমাটিআগুনের কাহিনি’ বলে দীনের যে বিবেচনা তা অত্যন্ত মৌলিক এবং আঙ্গিক বিবেচনায় ‘উচ্চাকাঙ্ক্ষী ধারণারই প্রতিফলন’ বলে যে মন্তব্য তাও এই উপন্যাস বিবেচনার ক্ষেত্রে নতুনত্বের দাবিদার। কেননা এই উপন্যাসের আঙ্গিকগত দিক বিচারে অধিকাংশ সমালোচক অদ্বৈতের লোকায়ত ভাবনার প্রতিফলন বলে চিহ্নিত করেছেন। এই উপন্যাস বিষয়বস্ত্তর দিক থেকে যেমন অভিনব, ঠিক তেমনি আঙ্গিকগত দিক থেকেও মৌলিক। আর সব থেকে বড় কথা হলো, এই উপন্যাসের গঠনকল্পে লেখকের ‘উচ্চাকাঙ্ক্ষী’ মনন তাঁর শিল্পীসত্তার এক অনন্য দিক বলেই আমাদের ধারণা।

 

দুই

তাহলে তিতাস একটি নদীর নামের জন্যই কি অদ্বৈত কেবল স্মরণযোগ্য কিংবা গুরুত্বের দাবি রাখেন? ব্যাপারটি তা নয়। অদ্বৈতের মননবিশ্বের ধরনটিই ভিন্ন। তাঁর মননবিশ্বের ধরন বিবেচনার জন্য আলাদা নিক্তি প্রয়োজন। কারণ গড় নিক্তিতে পরিমাপ করলে কায়েস আহমেদের মতো অনেকের মনে হতে পারে, ‘অপেক্ষাকৃত কম শক্তিমান’ লেখক! অদ্বৈতের জীবনকে যাপন, জীবনকে ভেতর থেকে দেখার দৃষ্টি, জীবনকে উপস্থাপন, ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের ব্যাপারটি তাঁর নিজস্ব মানে তাঁর মননবিশ্বের স্বরূপটি আরোপিত নয়। কারণ, আমরা যদি খেয়াল করি, তবে দেখব : আমাদের চিন্তার ধরন, চিন্তার পদ্ধতি, কাজের গতি ও প্রকৃতি এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণপ্রক্রিয়া অস্বাভাবিক রকম আরোপিত ও নিয়ন্ত্রিত। কেননা আমরা আসলে বাহ্যিকভাবে উপনিবেশমুক্ত কিন্তু আমাদের মনোজগৎ প্রবলভাবে উপনিবেশযুক্ত ও উপনিবেশের ভাবাদর্শ দ্বারা আলোড়িত ও নিয়ন্ত্রিত। সেক্ষেত্রে অদ্বৈতের চিন্তনপ্রক্রিয়া তাঁর নিজস্ব কথাটি বলা যত সহজ, ব্যাপারটি তত সহজ নয়। উপনিবেশমুক্ত মননের অধিকারী অদ্বৈতের চিন্তা ও কর্মতৎপরতার ধরনটি তাহলে কী? বিষয়টি খোলাসা হওয়ার দাবি রাখে। তাঁর মননবিশ্বের সঙ্গে দায়বদ্ধতার ব্যাপারটি অঙ্গাঙ্গি জড়িত। কায়েস আহমেদের দ্বারস্থ হয়ে বলতে হয়, ‘খাঁটি জেলে পরিবারে জন্ম ও আত্মপরিচয়ের প্রতি শ্রদ্ধাশীল’ তাঁর মননবিশ্ব। অদ্বৈত আত্মপরিচয়ের প্রতি শ্রদ্ধাশীল কতটা ছিলেন তা উপলব্ধি করা যায় তাঁর শাদা হাওয়া উপন্যাস পাঠে। শাদা হাওয়া উপন্যাসে তিনি ভারতবর্ষে ব্রিটিশের শাসন, সাংস্কৃতিক আগ্রাসন-ঘৃণা, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন অবস্থার পরিচয় দিয়েছেন; একই সঙ্গে সবকিছুর বাইরে স্পষ্ট হয়ে ওঠে একটি ঠান্ডা লড়াই। আর তা হলো, প্রাচ্য তথা ভারতবর্ষের দর্শন, রুচি, সংস্কৃতি, সভ্যতা বড় না কি ব্রিটিশের তথা পাশ্চাত্যের দর্শন-সংস্কৃতি-সভ্যতা বড়। রাজায় রাজায় লড়াই হয় আর জীবন দিতে হয় সৈনিককে। কিন্তু ইতিহাস লিখিত হয় রাজার নামেই। প্রজার কাজ কেবল জীবন/রক্ত দান। শাদা হাওয়া উপন্যাসে আমরা দেখি সেই অলিখিত ইতিহাসের কথা। যেখানে অদ্বৈত তাঁর সেই চিন্তাকে প্রকাশ করেছেন গোবিন্দ শর্মের ভাবনায় :

মরতে কেন এরা যুদ্ধ করে। দুনিয়ার সব সৈন্য মিলে এক ঝা-ার তলে দাঁড়িয়ে এই বলে কেন স্ট্রাইক করে না : আমরা সব সৈন্য এক। যুদ্ধ করে ভাই কেবল ভাইকে মারছি আর ভাইয়ের হাতে মরছি। অন্য কেউ তো মরছে না […] কাকে পর্যন্ত কাকের মাংস খায় না! আমরা সৈন্যের মাংস সৈন্যতে খেতে যাই কোন বিবেকের নির্দেশে!

এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো অদ্বৈত মল্লবর্মণের যুদ্ধবিরোধী মানসিকতা ও মানবমুক্তির অনন্য প্রয়াস। অদ্বৈতের মননবিশ্বের সব থেকে উল্লেখযোগ্য দিক হলো তাঁর উপনিবেশ-বিরোধী অবস্থান ও বিউপনিবেশায়ন চিন্তা। লেবার লিডারের মৃত্যুপূর্ব মুহূর্তে তার মুখ দিয়ে লেখক বলিয়ে নেন, ‘পরের অধীন থাকবো না, পরকে অধীন রাখবো না, শুধু এ মন্ত্রের মধ্যেই বিশ্বশান্তি বিরাজিত।’ আত্মশক্তিতে বলীয়ান  ও প্রবল শ্রদ্ধাবান তাঁর সমগ্র চিন্তাজগৎ। তাই শাদা হাওয়া উপন্যাসে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য সংস্কৃতির যে ঠান্ডা লড়াই সমগ্র উপন্যাসের প্রধান বিষয়, সেখানে লেখকের অবস্থান আমরা জানতে পারি জীল চরিত্রের মাধ্যমে। জীলের ভাষায়, ‘আমার প্রফেসর বলেছেন, পাশ্চাত্যজগত যখন তার মারামারি কাটাকাটির পর্ব শেষ করে বিপুলহারে বর্ধিত এক অশান্তির কবলে ক্লান্ত হয়ে নুয়ে পড়বে, সেদিন নাকি বিশ্বশান্তি আনবে এই গান্ধী আর অরবিন্দ।’ তাই মনে হয় শাদা হাওয়া উপন্যাস অদ্বৈতের মননবিশ্বের এক অনন্য উৎসভূমি।

অন্যদিকে অদ্বৈতের ভারতের চিঠি পার্ল বাককে গ্রন্থেও পাওয়া যায় তাঁর উপনিবেশমুক্ত মানসিকতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত। অদ্বৈতের মননবিশ্ব কতটা বৈশ্বিক তার প্রমাণ পাওয়া যায় ভারতের চিঠি পার্ল বাককে গ্রন্থে। তিনি নাৎসিপন্থি ও পুঁজিপতি সাম্রাজ্যবাদী শক্তিকে আলাদাভাবে দেখেননি। তাঁর বিবেচনায় :

সাম্রাজ্যবাদ, নাৎসীবাদ প্রভৃতি এক একটা বিরাট অর্গেনিজেশন জন-শোষণের যা কাজ করছে; তাদের যে অগণ্য সন্ততিসকলে দেশ ছেয়ে আছে, জন-শোষণের ক্ষেত্রে তারাও কম কাজ করছে না। পুঁজিদার, ব্যবসায়ী, কলমালিক, ভূমধ্যিকারী, কৃষক-খাটানে জমি-মালিক-মানুষের শ্রম, সম্পদ ও সুখ-শান্তি অপহরণে তারা কেউই কম পটু নয়। এরা প্রত্যেকেই বৃহত্তর vested interest-এর অসংখ্য খুঁটি।

পঞ্চাশের মন্বন্তর যখন আগ্রাসী রূপ নিয়েছে, অদ্বৈত তখনই বইটি লিখছিলেন। অদ্বৈতের মননবিশ্ব কোনো মতাদর্শে কিংবা কোনো স্বার্থান্বেষী চিন্তায় আবদ্ধ থাকেনি। তাঁর মননবিশ্বের মূলে ছিল মানবের মুক্তি ও কল্যাণ কামনা। ভারতের চিঠি পার্ল বাককে গ্রন্থে পাওয়া যায় তাঁর মননবিশ্বের মর্মকথা। যেখানে তিনি বলেছেন :

মিলিটারী মেজাজ বিশ্বের বুকে যে-ক্ষতের সৃষ্টি  করে চলেছে, তার জন্য শান্তির প্রলেপ তৈরি করার কাজ সাম্রাজ্যবাদী দুনিয়ার নয়; সে-কাজ চিন্তাশীল মননশীল জগতের। এ জগতে যারা বিরাজমান তারা যে-কোন দেশের যে-কোন শক্তিরই অন্তর্ভুক্ত হোক না কেন, তাদের চিন্তা ও ভাবধারায় একটি বিশ্বজনীন কল্যাণ প্রচেষ্টা থাকা চাই।

এতে রয়েছে দ্বিতীয় বিশ^যুদ্ধের প্রসঙ্গ, ভয়াবহ মন্বন্তরের বিসত্মৃত ছবি, ভারতের স্বাধীনতা-আকাঙক্ষার প্রতি ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী চার্চিলের তাচ্ছিল্যভরা প্রতিক্রিয়া, চিয়াং-কাইশেকের ভারত সফরের প্রসঙ্গ, জাপানের কুখ্যাত অধ্যাপক নোগুতির প্রতি রবীন্দ্রনাথের বিখ্যাত চিঠির কথা। পরাধীন দেশের বিপন্নতা ও দুর্বিষহ বিশ^-পরিস্থিতি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল অদ্বৈত জাতীয় ও আন্তর্জাতিক চেতনার যুগলবন্দি প্রেরণায় এই বইটি লিখেছিলেন ১৯৪৪ সালের কাছাকাছি সময়ে। তাছাড়া অদ্বৈত তাঁর কবিতা, ছোটগল্প, প্রবন্ধ ও অন্যান্য রচনায় একদিকে স্বদেশের সংস্কৃতির ইতিবাচক দিক যেমন অসাধারণভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন, তেমনি পাশ্চাত্য সংস্কৃতির আগ্রাসন কীভাবে আমাদের মন-মনন-অস্থিমজ্জার ভেতরকে কলুষিত করছে সে-বিষয়ে তিনি ছিলেন সজাগ। আত্মপরিচয়ের প্রতি কতটা অঙ্গীকারবদ্ধ ছিলেন অদ্বৈত তার পরিচয় পাওয়া যায় তাঁর সমস্ত রচনার নামকরণেও।

তিন

অদ্বৈত মল্লবর্মণের প্রবন্ধের কোনো আলাদা গ্রন্থ প্রকাশিত হয়নি। তিনি সর্বসাকুল্যে প্রায় ত্রিশটির মতো প্রবন্ধ রচনা করেছেন। তাঁর প্রবন্ধগুলো মূলত তাঁর সাংবাদিক জীবনের সাহিত্যিক ফল। কেননা তাঁর অধিকাংশ প্রবন্ধ নবশক্তিদেশ পত্রিকায় কাজ করার সময় লেখা ও ওই দুটি পত্রিকাতেই প্রকাশিত হয়। তাঁর প্রবন্ধের অধিকাংশের আকার-প্রকারও বলা চলে নাতিদীর্ঘ; কিন্তু প্রত্যেকটি প্রবন্ধই মেজাজ ও মর্জিতে যেন স্বতন্ত্র। প্রত্যেকটি প্রবন্ধই তাঁর স্বকীয় চিন্তামূলক। ‘টি. এস এলিয়ট’ নামক প্রবন্ধটি অদ্বৈতের সাহিত্য-সমালোচনামূলক প্রবন্ধ। এই প্রবন্ধ পাঠে যে-কোনো পাঠকই উপলব্ধি করতে পারবেন, অদ্বৈতের সৃজনশীল ও মননশীল মনের স্বরূপ। সমালোচনামূলক প্রবন্ধ যে কেবল মননধর্মী নয় – সৃজনধর্মীও তা সহজেই বুঝতে পারা যায় অদ্বৈতের ‘টি. এস এলিয়ট’ নামক প্রবন্ধে। এই প্রবন্ধে এলিয়ট সম্পর্কে পরিচিতি-জ্ঞাপনসহ বিশ্বসাহিত্যে এলিয়টের প্রভাব, সমালোচক হিসেবে সর্বজনীন স্বীকৃতি, চিন্তাশীল মানবমনে ধর্মবোধ উজ্জীবনার্থে তাঁর প্রতিভা ও অনুশীলন – সব উল্লেখ করে এলিয়টের সাহিত্যাদর্শ সম্পর্কে অদ্বৈত লিখেছেন :

কাব্যশাস্ত্রে তাঁর পা–ত্য অসাধারণ। সর্বযুগের কবিতা সম্বন্ধেই তাঁর অগাধ উপপত্তি। তাঁর ছন্দ ও ব্যঞ্জনা স্বভাবসিদ্ধ স্বতস্ফূর্তিতে প্রবাহিতঃ যেন মনের ঐকান্তিকতা থেকে বিনা চেষ্টায় এগুলি বেরিয়ে আসে। তাঁর রচনা ও জীবন দর্শন ভাষার দিক বিবেচনায় ইংরাজী ও আমেরিকান সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছে। কিন্তু ভাবের দিক দিয়ে সমৃদ্ধ করেছে বিশ^-সাহিত্যকে।

টি. এস এলিয়ট সম্পর্কে অদ্বৈত মল্লবর্মণের এই বিবেচনায় তাঁর গভীর অন্তর্দৃষ্টি ও সাহিত্যভাবনার পরিচয় পাওয়া যায়। সৃজন ও মননের এক অপূর্ব সম্মিলন হলো অদ্বৈতের প্রবন্ধ। অদ্বৈতের বিবেচনাবোধে ছিল অন্তর্দৃষ্টি ও মানবকল্যাণের সমন্বয়। বিচার-বিবেচনার ও বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে সদাসর্বদাই তিনি প্রাধান্য দিয়েছেন সময়, সমাজ ও সংস্কৃতিতে ব্যক্তির প্রভাবকে। তাই রোকেয়া জীবনী নামক বেগম রোকেয়ার জীবনীমূলক গ্রন্থের সমালোচনায় অদ্বৈত লিখেছেন, ‘নারীজাতির জন্য তাঁহার অন্তরের দরদই তাঁহাকে নারীদের কল্যাণের জন্য সর্বস্ব সমর্পণে উদ্বুদ্ধ করিয়াছিল। শুধু মুসলমান নারীগণ নহে, হিন্দু মুসলমান সমভাবে সকল নারীগণেরই তাই এই বিশালপ্রাণা মহিলা প্রাতঃস্মরণীয়।’

অদ্বৈত মল্লবর্মণের মননবিশ্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো তাঁর সংস্কৃতিচিন্তা। অদ্বৈত ‘সংস্কৃতিচিন্তা’ নামে কিংবা সংস্কৃতি নামে অথবা সংস্কৃতির নানাভেদ নামেও কোনো প্রবন্ধ রচনা করেননি। কিন্তু তাঁর একাধিক রচনায় রয়েছে সংস্কৃতিবিষয়ক স্বকীয় চিন্তার মর্মবাণী। অদ্বৈত মল্লবর্মণের সংস্কৃতিচেতনার সঙ্গে গভীরভাবে প্রোথিত হয়েছে ‘শ্রম’সংশিস্নষ্ট বিষয়টি। অদ্বৈতের কাছে শ্রমবিচ্ছিন্ন সংস্কৃতি কোনো অর্থেই সংস্কৃতির মধ্যে পড়ে না। তিনি শ্রমবিচ্ছিন্ন নিষ্ক্রিয়তাকে প্রবলভাবে ঘৃণাও করতেন। তাঁর ‘এদেশের ভিখারী সম্প্রদায়’, ‘সাগরতীর্থে’ ও ‘আম্রতত্ত্ব’ নামক প্রবন্ধে গভীর ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের মাধ্যমে উপস্থাপন করেছেন। ‘এদেশে ভিখারী সম্প্রদায়’ নামক প্রবন্ধে অদ্বৈত ভিক্ষাবৃত্তিকে ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাঁর মনে হয়েছে অলস, কর্মবিমুখ, সেবার আদর্শ, অতিথিপরায়ণতার আদর্শ ভিক্ষাবৃত্তিকে সমর্থন করে। তিনি বৈষ্ণব ভিখারি, গেরুয়া আলখাল্লা পরা ‘দেবতার পূজারী’ সাজা ভিক্ষুক, মুসলমান ফকির ও পঙ্গু-ভিক্ষুক – এই চার শ্রেণির ভিক্ষুকের কথাও উল্লেখ করেছেন এবং তিনি এদের কাউকেই সমর্থন করেননি। অদ্বৈত লিখেছেন :

কর্মহীন অলস জীবনযাত্রায় আর আত্মার এবং দেহের অবমাননাকর ভিক্ষাবৃত্তির মধ্যে ভগবানের কোন সত্তাই যে খুঁজিয়া পাওয়া যায় না একথা তাহাদিগকে বুঝাইয়া বলিবার দিন আসিয়াছে। নিজের শ্রমদ্বারা অর্জিত অন্নদ্বারা ঠাকুরের যে তাহা অধিকতর পরিতৃপ্তির সহিত গ্রহণ করিবেন তাহাতে সন্দেহ নাই।

শুধু তাই নয়, অদ্বৈতের চিন্তার মৌল দিক হলো সমস্যা নিরূপণ এবং সমাধানের পথনির্দেশ। এক্ষেত্রেও তার ব্যত্যয় ঘটেনি। তিনি এই ভিক্ষুকদের নানা কর্মমুখী, দৈহিক খাটুনি ও কুটিরশিল্পে নিয়োগের মাধ্যমে কর্মের আসক্তি জোগানের কথা বলেছেন।

অদ্বৈত মল্লবর্মণ কোনো শিক্ষাবিদ, শিক্ষা-গবেষক কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক কোনো গুরুত্বপূর্ণ পদে না থেকে, না গিয়েও আমাদের দেশের শিক্ষাব্যবস্থার দুর্গতির কথা ভেবেছেন এবং মুক্তির পথও নির্দেশ করেছেন। ‘ছোটদের ছবি আঁকা’ নামক প্রবন্ধে অদ্বৈত মল্লবর্মণ বলেছেন, ‘শিক্ষাকে এখন গ্রন্থ মুখস্ত করানোর মধ্যে আবদ্ধ রাখলে চলবে না। শিক্ষা বলতে এখন আত্মবিকাশ বলে মেনে নিতে হবে।’ তার চেয়েও বড় কথা হলো, অদ্বৈত তাঁর জীবনকে দেখেছেন গভীরভাবে, নানা বাস্তব অভিজ্ঞতার অভিজ্ঞান তাঁর চিন্তাস্রোতকে করেছে তীক্ষন। তিনি জীবনকে দেখেছেন জীবনের ভেতর থেকে। তাই তিনি তাঁর সেই উপলব্ধির কথাই বলেছেন ‘প্রাচীন চিত্রকলার রূপ ও রীতি’ নামক প্রবন্ধে। তিনি ওই প্রবন্ধের এক জায়গায় উল্লেখ করেছেন, ‘মানুষই হোক আর প্রকৃতিই হোক, একান্ত কাছে এসে না দেখলে তাকে ঠিক ঠিক দেখা হয় না।’ তাঁর এই ভাবনা যে কতটা মূল্যবান তা কেবল হৃদয় দিয়ে উপলব্ধি করলেই বোঝা যাবে – নচেত নয়।

যে-কোনো শিল্পী বা লেখকের মননবিশ্বের অন্যতম প্রধান দিক হলো লেখকের দৃষ্টিভঙ্গি। সমাজ, সময়, সংস্কৃতি ও জীবনযাপন এবং জীবনমান নিয়ে ভাবনা-চিন্তায় লেখকের দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ পায়। অদ্বৈতের দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় পাওয়া যায় দেশ, কাল, সমাজ, সংস্কৃতিসংশিস্নষ্ট তাঁর নানা রচনায়। ভারতবর্ষে হিন্দু-মুসলমানের সংঘাতকে যে ‘সাম্প্রদায়িক’ সংঘাত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, সে সম্পর্কে অদ্বৈত এক সম্পাদকীয় নিবন্ধে লিখেছেন :

কারণ যাহাই হোক – বিরোধ-বিদ্বেষ ও ঈর্ষার বিষবাষ্পে বাংলার আকাশ-বাতাস আজ প্রধূমায়িত হইয়া উঠিয়াছে। […] যাহারা মনে করেন, বাঙালি হিন্দু ও বাঙালি মুসলমানের মধ্যে যে বিরোধ আজ মূর্ত হইয়া উঠিয়াছে, তাহা এমনই একটা সংস্কৃতিগত বিরোধ যে ইহার কোন সমাধান নাই। তাহাদের সহিত আমি একমত নই। আমাদের মতে এই বিরোধ এমনই একটা ঠুন্কো কাল্পনিক ভিত্তির উপর দাঁড়াইয়া আছে যে আমাদের শুভবুদ্ধি জাগ্রত হইলেই এই বিরোধের অবসান ঘটান যাইবে। প্রকৃতপক্ষে ইহা সাম্প্রদায়িক বিরোধ নহে, মুষ্টিমেয় লোকের স্বার্থের সংঘাত মাত্র।

এই নিবন্ধের মাধ্যমে অদ্বৈতের মানসগঠন সম্পর্কে অত্যন্ত স্বচ্ছ ধারণা আমরা পাই। এর কেন্দ্রে ছিল মানব ও মানবের কল্যাণ। মানবকল্যাণ ও মানবমুক্তির বোধই তাঁর সাহিত্যচিন্তার মৌল বিষয়। তাই অদ্বৈত গবেষক-চিন্তক ইসরাইল খানের বিবেচনাটি এরকম : ‘পূর্ববঙ্গের মুসলিম অধ্যুষিত নিম্নবর্গের হিন্দু হিসেবে তাঁর সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিতে বর্ণ ও ধর্ম বৈষম্যবোধ বা বিকার বিকৃতি সৃষ্টি করতে পারেনি। এক অসামান্য নির্লিপ্ততায় তিনি হিন্দু ও মুসলমান উভয় সমাজের হত-দরিদ্র কৃষক, শ্রমিক, জলমজুর ও বিত্তহীন অশিক্ষিতদের উন্নতি কামনা করেছেন।’ মূলত তাঁর ছিল এক ‘অখ-’ মানবমন ও নৈর্ব্যক্তিক দৃষ্টিভঙ্গি। মানবের মননস্বরূপের প্রধান উৎস হলো ‘অখ-’ মানবমন। অদ্বৈতের এই নির্মল, নিঃশর্ত ও ‘অখ-’ মানবমনের খোঁজ আমরা পাই তাঁর সব রচনায়। অদ্বৈত মল্লবর্মণ তাঁর ‘অপ্রকাশিত পলস্নী গীতি’ শীর্ষক রচনায় লিখেছেন, ‘শিক্ষিত অশিক্ষিত সকলেই পলস্নী-সঙ্গীতের আদর করেন। তার কারণ এগুলি মনন, চিন্তা বা কল্পনা দিয়া গড়া নয়; পলস্নীবাসীর নির্ভেজাল মনের উৎস হইতে উৎসারিত; এগুলিতে পাওয়া যায় খাঁটী প্রাণের স্পর্শ।’ অদ্বৈতের সাহিত্যসাধনার মূলেই ছিল ‘অখ-’ মানবমনের প্রাণের স্পর্শের সন্ধান। কারণ অদ্বৈতের মননবিশ্বের গড়ন ও ধরন অন্য যে-কোনো লেখক-শিল্পীর থেকে আলাদা। ইসরাইল খান অদ্বৈতের মনন-উৎসের সন্ধান করেছেন এভাবে : ‘তাঁর সাহিত্যভাবনা ও গবেষণার মৌল-উপাদান উপকরণও সংগৃহীত হয়েছে পূর্ব বাংলার জীবন ও জগৎ থেকে। শিল্পী-স্রষ্টার যে-মনন অদ্বৈতের, তাও গড়ে উঠেছে বাংলাদেশ ও বাঙালি-সংস্কৃতিকে অবলম্বন করে।’ অদ্বৈতের মননের গড়ন পূর্ব বাংলার জীবন, জগৎ ও বাঙালি-সংস্কৃতিকে অবলম্বন করে হলেও তাঁর মননবিশ্বের রূপায়ণ ছিল বৈশ্বিক। অদ্বৈতের মননবিশ্বের মেজাজটি সর্বজনীন ও সর্বকালিক। আর তাঁর ‘অখ-’ মানবমনের কেন্দ্রে ছিল মানুষ এবং সে মানুষ হলো দেশ-কাল নিরপেক্ষ নিঃশর্ত মানব।

 

চার

অদ্বৈত সব থেকে সচেতন ছিলেন তাঁর নিজের সম্পর্কে। নিজের সম্পর্কে স্বচ্ছ ও স্পষ্ট ধারণা ছাড়া আত্মপরিচয় সম্পর্কে আস্থাবান হওয়া দুঃসাধ্য ব্যাপার। তাই মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পদ্মা নদীর মাঝি নিয়ে অদ্বৈত মল্লবর্মণের এই মন্তব্যটি বহুল-উদ্ধৃত : ‘মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়  বড় master artist কিন্তু বাওনের পোলা রোমান্টিক। আর আমি তো জাউলার পোলা।’ নিজের সস্পর্কে এরকম পরিচ্ছন্ন ধারণা খুব কম মানুষেরই থাকে। নিজেকে ‘জাউলার পোলা’ হিসেবে পরিচয় দিতে তিনি ছিলেন দ্বিধাহীন। সে-কারণেই হয়তো নজে গা ভাসিয়ে দেননি রোমান্টিক ভাবমানসে কিংবা কোনো তত্ত্ব বা মতাদর্শে। তাই তো সাঁইত্রিশ বছরের চিরকুমার তরুণ হয়েও প্রেম, ভালোবাসা, কাম, ঈর্ষা কিংবা ব্যক্তিগত ক্ষোভ, ব্যথা-বেদনায় মধুর করে তোলেননি তাঁর সৃষ্টিকর্মকে। ‘জাউলার পোলা’ বলে নিজেকে জানতেন বলেই নাগরিক গোষ্ঠীবদ্ধ শিল্প-সাহিত্যচর্চার মাধ্যমে নিজেকে জাহির কিংবা আত্মপ্রতিষ্ঠার জন্য ব্যাকুলতা দেখাননি। তিনি তাঁর সৃষ্টিকর্মে নৈর্ব্যক্তিকভাবে উপস্থাপন করেছেন সমষ্টিকে। কারণ তাঁর ছিল দূরদর্শী ও কল্যাণকামী সমষ্টির বোধ। তাই ‘জাউলার পোলা’ হয়েও একদিকে যেমন আত্মপরিচয়ে দ্বিধাহীন, অন্যদিকে স্বদেশ ও সমাজের প্রতি দায়বদ্ধ তাঁর মননভূমি। শরীরের জল ও কাদামাটির ঘ্রাণকেই করেছেন শিল্পের উপজীব্য। ফলে তাঁর সৃষ্টিকর্ম হয়েছে কৃত্রিমতাবর্জিত ও সামষ্টিক জীবনের মুক্তিপ্রয়াসী। আমরা একটি চিঠিতে তাঁর আত্মপ্রত্যয়ের আভাস পাই, যেখানে তিনি অন্যজনকে (কবি মতিউল ইসলামকে লিখিত পত্রে; তারিখ ২৮শে বৈশাখ, ১৩৫৭ বঙ্গাব্দ) উপদেশ দিচ্ছেন,

কাহাকেও follow করিবেন না। সবর্বদা সবর্বত্র আপন ব্যক্তিত্ব, বৈশিষ্ট্য এবং স্বতন্ত্র বজায় রাখিয়া চলিবেন। অনুসরণ এবং অনুকরণ-এর প্রভেদটুকু আপনি অবশ্যই জানেন। আপনি মধুসূদনের Blank Verse-এর অনুসরণ করিতে পারেন। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের অতীন্দ্রিয়তা বা মরমীবাদ বা Mysticism-এর অনুকরণ করিলে ইহা দোষের কারণ হইবে। আর একটি মাত্র কথা বলিয়াই চিঠি শেষ করিব। সাধনা না করিয়া আত্মপ্রকাশ করিতে নাই। আর যাহা সাধনা করিবেন নীরবে নীরবেই করিবেন। আগুন কখন ছাই ঢাকা থাকে না। আপনার প্রতিভাও একদিন সুধী সমাজের আদৃত হইবে। ইহা আমি জোর করিয়াই বলিতে পারি।

অদ্বৈতের মননবিশ্ব যেন কবি শঙ্খ ঘোষের বাবরের প্রার্থনা (১৯৭৬) কাব্যের ‘মহাজন’ কবিতারই প্রতিধ্বনি – ‘কথা বলেই বা কী হচ্ছিল/ না-ই বললেন কথা -/ চুপচাপ থেকে দেখুন না আজ/ কদ্দুর যায় রথ। […] তারপরে কোনো শুভদিন এলে/ সময় লগ্ন বুঝে/ ছড়িয়ে দেবেন স্ফুলিঙ্গ কিছু/ কিছু ওঁ তৎসৎ।’ অদ্বৈতের সাহিত্য ঠিক স্ফুলিঙ্গ হয়েছে কিনা তা বলা মুশকিল, কিন্তু আজকের দ্বিধাগ্রস্ত ও গন্তব্যহীন সমাজের যে অগ্নিদিশারূপে প্রজ্বলমান তা নির্দ্বিধায় বলা যায়। শিল্পের মান অক্ষুণ্ণ রেখে তিনি এই স্বদেশ ও স্বভূমিকে যে অকৃত্রিমভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন তাঁর সাহিত্যে, তাতে জুড়ি মেলা ভার। অদ্বৈতের ছিল ভেতর থেকে দেখার দৃষ্টি আর অখ- মানবমন, যা সর্বকালে, সব দেশেই দুর্লভ।

 

সহায়কগ্রন্থ

১. অদ্বৈত মল্লবর্মণ (২০১১), অদ্বৈত মল্লবর্মণ রচনাসমগ্র, অচিমত্ম্য বিশ^াস সম্পাদিত, দে’জ পাবলিশিং, কলকাতা।

২. অদ্বৈত মল্লবর্মণ (২০১৫), অদ্বৈত মল্লবর্মণ রচনাবলী (অখ-), ইসরাইল খান সম্পাদিত, সূচীপত্র, ঢাকা।

৩. অচিমত্ম্য বিশ^াস (২০১৪), অদ্বৈত মল্লবর্মণ, সাহিত্য অকাদেমি, কলকাতা।

৪. শান্তনু কায়সার (১৯৯৮), অদ্বৈত মল্লবর্মণ : জীবন, সাহিত্য ও অন্যান্য, নয়া উদ্যোগ, কলকাতা।

৫. কায়েস আহমেদ (২০০১), কায়েস আহমেদ সমগ্র (ভূমিকা : আখতারুজ্জামান ইলিয়াস), মাওলা ব্রাদার্স, ঢাকা।

৬. শঙ্খ ঘোষ (২০০৬), বাবরের প্রার্থনা, দে’জ পাবলিশিং, কলকাতা, সপ্তবিংশ সংস্করণ, ২০০৬।

৭. মোস্তাক আহমেদ দীন (২০১৭), মাটির রসে ভেজা গান, চৈতন্য প্রকাশন, সিলেট।

Leave a Reply

%d bloggers like this: