অধ্যাপক মুরশিদ স্মরণে

লেখক:

মন্ময় জাফর

অধ্যাপক খান সারওয়ার মুরশিদের (১৯২৪-২০১২) মৃত্যুবার্ষিকী কড়া নাড়ছে দরজায়। বহুবর্ণিল কর্মযজ্ঞময় জীবন ছিল তাঁর : অনুকরণ, অনুসরণ, সম্মানের যোগ্য। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেছেন দীর্ঘকাল। মাঝখানে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের দায়িত্ব পালন করেছেন, স্থাপন করেছেন ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ স্টাডিজ। পোল্যান্ড এবং হাঙ্গেরিতে বাংলাদেশের এককালীন রাষ্ট্রদূত অধ্যাপক মুরশিদ ছিলেন কমনওয়েলথ কমিশনের সহকারী মহাসচিব। পড়ালেখা করেছেন ঢাকা, নটিংহ্যাম এবং হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে। দীর্ঘ কুড়ি বছর ধরে সম্পাদনা করেছেন নিউ ভ্যালুজ নামে উচ্চমার্গের একটি প্রগতিশীল পত্রিকা। যুক্ত ছিলেন বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে, সক্রিয়ভাবে। সব পরিচয় ছাপিয়ে তিনি ছিলেন আধুনিক, ধর্মনিরপেক্ষ এবং সময়ের চেয়ে অগ্রসর একজন মানুষ। তাঁর সুদীর্ঘ জীবনের অর্জন সহজে পুনরাবৃত্তি সম্ভব নয় অন্য কারো পক্ষে।

অধ্যাপক মুরশিদের সঙ্গে হয়তো সাক্ষাৎ হতোই না আমার, যদি না দৈববলে অবসরগ্রহণের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে পুনরায় পাঠদান করতে তিনি আসতেন। আমরা তখন মাস্টার্সের ছাত্র। পড়িয়েছিলেন ফরাসি কবি শার্ল বোদলেয়ারের কাব্যগ্রন্থ শয়তানের পুষ্পাবলি। অধ্যাপকের পাঠবৈদগ্ধ্যে মুগ্ধ হতে সময় লাগেনি। ওঁরও বোধহয় সাহিত্য-অনুরাগী আমাকে বেশ পছন্দ হয়েছিল। প্রিয় ছাত্রের তকমা তাই গায়ে লাগল অবলীলায়। কোনো একদিন পাঠদান শেষে নিজেই গাড়ি চালিয়ে নিয়ে গেলেন চিত্রকলাসমৃদ্ধ ধানম–র বাড়িতে। সে-সময় সত্তরোর্ধ্ব এ-অধ্যাপক এভাবেই মিশেছেন বিশ বছর বয়সী ছাত্রের সঙ্গে। শ্রেণিকক্ষে অধ্যাপকের পা–ত্যের তারিফ করেছি, ওঁর গৃহে করেছি সংগৃহীত চিত্রকর্মের মুরশিদের মতো একজন শিল্পসচেতন, জীবনপ্রেমী ও আধুনিক মানুষের সঙ্গে পরিচিত হতে পেরে ধন্য বোধ করেছিলাম।

শ্রেণিকক্ষে কেমন দেখেছি অধ্যাপক মুরশিদকে? ইংরেজি উচ্চারণ নিখুঁত, পোশাক পরিপাটি, কবিতার প্রতি আগ্রহ খাদহীন এবং বিশ্লেষণ করোটিভেদী। চলনে, বলনে, উচ্চারণে, মননে সুদর্শন মুরশিদ আট ছটাক বাঙালি, ছ-ছটাক ইংরেজ এবং দুছটাক ফরাসি। ফরাসি কবিতার প্রতি ওঁর ভালোবাসা সঞ্চারিত হয়েছিল আমাদের মধ্যেও। ফলে, বিভাগের বসন্ত উৎসবে কলাভবনের বটতলায় আবৃত্তি করেছিলাম আর্তুর র্যাঁবোর সেই অসাধারণ কবিতা ‘ওফেলিয়া’। বেশ মনে আছে ফরাসি কবিতা ইংরেজিতে অনুবাদের সমস্যা নিয়ে অধ্যাপক মুরশিদের আলোচনা। বোদলেয়ারের বেশকটি ইংরেজি অনুবাদ পাশাপাশি রেখে, তুলনা করে, মুরশিদ যেন প্রমাণ করতে চেয়েছিলেন রুশ লেখক বরিস পাসেত্মরনাকের অনুবাদ সম্পর্কিত সেই সতর্কবাণী : ‘অনুবাদে হয় কবিতার হনন।’ শার্ল বোদলেয়ারের পতিতাগমন কিংবা ইংরেজ কবি ডবিস্নউ. এইচ. অডেনের সঙ্গে ঔপন্যাসিক ক্রিস্টোফার ইশারউডের সমকামী প্রেম – সমাজের চোখে আপত্তিকর জীবনযাপনের তথ্যও অধ্যাপক মুরশিদ বলেছেন নির্দ্বিধায়, বদ্ধ বাংলাদেশবাসী আমাদের। মনে পড়ে, অডেনের মৃত্যুতে ক্রিস্টোফারের শোকের কাহিনি বয়ান স্পর্শ করেছিল আমাদের গভীর অতল। এ যেন অন্য দেশের অন্য কোনো লাইলি-মজনুর অব্যক্ত গল্প। সাহিত্যপাঠ যে জীবনপাঠের সমার্থক, অধ্যাপক মুরশিদের আলোচনায় তা উঠে এসেছে বারবার। স্পর্শকাতরবিষয়ী যৌন স্বাধীনতার যে-ক্ষেত্র থেকে বাঙালি মূল্যবোধের দোহাই দিয়ে সরে দাঁড়ায় সংকোচে, অধ্যাপক মুরশিদ এভাবেই সেখানে আমাদের নিয়ে গেছেন সদর্পে।

সারাজীবন পড়াশোনা করেছেন ব্যাপক; তবে সে-তুলনায় লেখার পরিমাণ তাঁর কম, যা নিয়ে নিরন্তর অভিযোগ করেছেন প্রিয়জনরা। নিজের লেখা সম্পর্কে খুব নির্মম ছিলেন অধ্যাপক মুরশিদ, ছিলেন নিখুঁতবাদী; ইংরেজিতে যাকে বলা যেতে পারে পারফেকশনিস্ট। তাঁর একমাত্র প্রকাশিত মৌলিক গ্রন্থ কালের কথায় প্রজ্ঞার পরিচয় প্রতি পাতায়। তাঁর সুনির্দিষ্ট শব্দচয়নে এবং বাক্য রচনায় ঋজুতা, পরিমিতিবোধ এবং কুশলী চিন্তার যে-ছাপ আমরা পাই, তা বইমেলা, সাময়িকপত্র কিংবা ঈদ-পুজোকে সামনে রেখে রচিত অজস্র সাহিত্য-জঞ্জালে অনুপস্থিত। কালের কথায় স্থান পেয়েছে ছাবিবশটি প্রবন্ধ। আলোচনার পরিধিতে রয়েছে রাষ্ট্রনীতি, বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাধীনতা এবং সমাজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পারস্পরিক সম্পর্ক-সংশিস্নষ্ট প্রবন্ধ। ইয়েটস ও রবীন্দ্রনাথের তুলনামূলক আলোচনাসমৃদ্ধ এ-গ্রন্থে আরো যুক্ত হয়েছে রবীন্দ্রনাথের শিক্ষাভাবনা, আঁদ্রে মালরো, বঙ্গবন্ধু, তাজউদ্দীন ও মুক্তিযুদ্ধ প্রসঙ্গ, লেখকের মুক্তিযুদ্ধকালীন অভিজ্ঞতা, প্রকাশনার সংকট এবং পুস্তক সমালোচনা; সেই সঙ্গে রবীন্দ্রজন্মশতবর্ষ উদ্যাপন কমিটির সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দেওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষাৎকার।

মুরশিদের মুক্তিযুদ্ধ-সম্পর্কিত প্রবন্ধগুলো অবশ্যপাঠ্য। বঙ্গবন্ধুকে তিনি মহামানব হিসেবে উপস্থাপন করেছেন, বসিয়েছেন গান্ধীর সঙ্গে এক আসনে। লিখেছেন, মুক্তিযুদ্ধের নায়ক ‘অবশ্যই জনগণ কিন্তু তাদের মহান এবং অনন্য প্রতিভূ ছিলেন’ মুজিব। ‘তাঁকে স্মরণ করে তাঁর বাণী মুখে নিয়ে’ জীবন উৎসর্গ করেছেন অনেক বাঙালি। কিন্তু সেইসঙ্গে এ-কথা বলতেও কুণ্ঠিত বোধ করেননি যে, যুদ্ধ চলাকালীন ঘটনা-পরিক্রমে মুজিব ছিলেন অনুপস্থিত এক দেবতার মতো। ভরত যেমন রামের পাদুকা সিংহাসনে রেখে রাজ্য শাসন করেছিলেন, ঠিক তেমনিভাবে তাজউদ্দীন আহমদ মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে শত্রম্নর অতর্কিত আক্রমণে ছত্রভঙ্গ, দ্বিধাগ্রস্ত, অগোছালো বাঙালিদের যোগ্য নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। ভারতে প্রবেশ করে তাজউদ্দীন দেখেছিলেন ভারতীয় সেনাবাহিনীর বাংলাদেশের পক্ষে এগিয়ে আসার ধারণাটি একটি মিথ্যা বই কিছুই নয়।  তারপরও তিনি ইন্দিরা গান্ধীর সামনে নিজেকে বাংলাদেশের কার্যকর প্রধানমন্ত্রী হিসেবেই উপস্থাপন করেছিলেন। ভারত ও রাশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থকে সুকৌশলে বাংলাদেশ সৃষ্টির উদ্দেশ্যে কাজে লাগান তাজউদ্দীন। আওয়ামী লীগের অন্তর্দ্বন্দ্বগুলো যথাসম্ভব মিটিয়ে, এমনকি তাঁর প্রাণনাশের উদ্যোগগুলোর মোকাবিলা করে সুদৃঢ় নেতৃত্বসহকারে তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা সুনিশ্চিত করেছেন। একাত্তরের ভয়াবহ পস্নাবনযুদ্ধে সেই উদ্ধারকারী অলৌকিক নৌকার কারিগর ছিলেন বঙ্গবন্ধু, তাঁর নামেই মুক্তিযুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল। তবে সুদক্ষ নাবিকের মতো হাল ধরে নৌকাটিকে অভীষ্ট বন্দরে ভেড়ানোর কৃতিত্ব মুরশিদ তাজউদ্দীনকেই দিয়েছেন। যুদ্ধের ময়দানে তাজউদ্দীন প্রকৃতার্থেই ছিলেন বাংলার চার্চিল। যুদ্ধ-পরবর্তী মুজিব-তাজউদ্দীনের অসমঝোতাকে মুরশিদ মহাভারতের দুই সহোদরের দ্বন্দ্ব হিসেবে দেখেছেন। রাম-লক্ষ্মণের এই দুঃখজনক বিচ্ছেদ পঁচাত্তরের ট্র্যাজেডির পথ সুগম করে দেয়।

মুজিব এবং তাজউদ্দীনের পাশাপাশি আর যে-মানুষটি, মুরশিদের মতে, মুক্তিযুদ্ধকে বিশেষত বিদেশের কাছে ভাস্বর করে তুলেছিলেন তিনি সত্তর-বর্ষীয় ফরাসি আঁদ্রে মালরো। লেখক, মুক্তিযোদ্ধা, বুদ্ধিজীবী, মন্ত্রী মালরো তৎকালীন বিশ্বকে দারুণ চমকে দিয়েছিলেন সেই বয়সেও পাকিসত্মানের বিরুদ্ধে এবং বাংলাদেশের সপক্ষে একটি ট্যাংক ব্রিগেড পরিচালনার প্রসত্মাব দিয়ে। যুদ্ধ চলাকালীন ইন্দিরা সরকার নিরাপত্তার অজুহাতে মালরোকে ভারত কিংবা বাংলাদেশে প্রবেশের অনুমতি দেননি। বাংলাদেশের এই বন্ধুকে মুরশিদ সম্মাননা জানান রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি বিশেষ সমাবর্তন অনুষ্ঠানে ডি-লিট ডিগ্রি প্রদানের মাধ্যমে।

পাকিসত্মান আমলে সরকারি বাধার মুখে রবীন্দ্রশতবার্ষিকী উদ্যাপন কমিটির মুরশিদ ছিলেন পুরোধা। সুফিয়া কামাল রবীন্দ্রসংগীত শ্রবণকে একদা ‘এবাদতের’ সঙ্গে তুলনা করে বাংলাদেশে হয়েছিলেন বিতর্কিত। রবীন্দ্রনাথকে বিতর্কিত করার প্রয়াস কিন্তু শুরু হয়েছিল পাকিসত্মান সৃষ্টির পর থেকেই। ব্রাহ্ম ধর্মমতে বিশ্বাসী বিশ্বকবিকে হিন্দু বানিয়ে বাঙালি মুসলমানের জীবন ও উপলব্ধির জগৎ থেকে নির্বাসিত করার যে-ষড়যন্ত্র তার বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নেওয়ার কারণে রবীন্দ্রশতবার্ষিকী পালন সম্ভব হয়েছিল তৎকালীন পূর্ব পাকিসত্মানে। করদরাজ্য পূর্ব পাকিসত্মানের অবসানে যে-বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটেছিল, স্বভাবতই সেটিকে একটি সেক্যুলার রাষ্ট্র হিসেবে দেখতে চেয়েছেন মুরশিদ। এ-বিষয়ে স্পষ্ট করেছেন তাঁর অবস্থান : ‘খাঁটি মুসলমান, খাঁটি হিন্দু, খাঁটি খ্রিষ্টান বা খাঁটি বৌদ্ধ তৈরী করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের নয়। তার দায়িত্ব সুনাগরিক তৈরীতে সাহায্য করা।’ পনেরো বছর আগে প্রকাশিত এই গ্রন্থটির লেখাগুলো সেজন্যে এখনো সমসাময়িক।

আগেই বলেছি, মুরশিদ লিখতেন কম; পুস্তক আকারে প্রকাশ করেছেন স্বল্প। প্রতিটি বাক্য নিয়ে তিনি ভাবতেন। শব্দচয়ন এবং শব্দনির্মাণ তাঁকে ব্যস্ত রাখত। কালের কথায় দেখা মেলে এক-একটি ঠাসবুনোট বাক্য, যার ব্যাপ্তি কখনো পুরো অনুচ্ছেদসমান। মাঝেমধ্যে দুবার কিংবা তিনবারও পড়তে হয়েছে মর্মোদ্ধার এবং রসাস্বাদনের নিমিত্তে। অনুপ্রাসপ্রধান বাক্যগুলোয় কখনো বিশেষণের আধিক্য এবং যতিচিহ্নের অনুপস্থিতি পীড়াদায়ক মনে হয়। তবে বোঝা গেছে, মুরশিদ বিষয়বস্ত্ত এবং রচনাশৈলী – এই দুটিকেই পাঠকের কাছে চ্যালেঞ্জ হিসেবে ছুড়ে দিতে পছন্দ করতেন। অলস-অবহেলার পাঠক তাঁর না-পছন্দ; তাঁর লেখা পড়তে হলে সিরিয়াসনেসের প্রয়োজন, যার চর্চা তিনি করেছেন সারাজীবন অধ্যাপক, উপাচার্য, রাষ্ট্রদূত, লেখক কিংবা শিক্ষক-নেতা হিসেবে। এ সবকিছুই প্রমাণ করে অধ্যাপক মুরশিদের আগ্রহ, চিন্তাভাবনা এবং জ্ঞানের পরিধি। যাঁরা অধুনা বাংলাদেশে অবিরাম উৎপাদিত, জন্মনিয়ন্ত্রণবিহীন, ক্ষণিকের মুখরোচক ঝালমুড়ি সাহিত্যের আগ্রাসনে যারপরনাই শঙ্কিত, তাঁদের সবাইকে কালের কথা পড়ার জরুরি আহবান জানাই।

২০১২ সালে অধ্যাপক মুরশিদের জীবদ্দশায় বাংলা একাডেমি যে-সংবর্ধনাগ্রন্থ প্রকাশ করেছিল তাতে লেখার সুযোগ আমার হয়েছিল। অস্ট্রেলিয়ার কুইন্সল্যান্ড এবং বিলেতের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখার সুবাদে দেশের বাইরে ছিলাম বেশ ক-বছর। প্রত্যাবর্তনের পর স্যারের জন্মদিনে ওঁর সঙ্গে আমার শেষ দেখা। মৃত্যুর ওপারে যদি অন্য জগৎ বলে কিছু থাকে, ভাবতে চাই সেখানে অধ্যাপক মুরশিদ ভালো আছেন। ওঁর কর্মযজ্ঞ, আধুনিকতা, ধর্মনিরপেক্ষতা এবং সর্বোপরি শিক্ষক হিসেবে অসাধারণ সাফল্য সমস্যাক্লিষ্ট বাংলাদেশে উদাহরণ হয়ে থাকুক; অনুপ্রেরণা জোগাক সৎ, প্রকৃত শিক্ষিত, মননশীল মানুষ তৈরির। r