অনাহূত স্বপ্নের চিৎসাঁতার

ঘরে ঢোকার মুহূর্তে ভেবেছিল ভেতরটা অন্যরকম হবে। হওয়ারই কথা। বেলা দুপুর, শেষ ফেব্রুয়ারির আলো-হাওয়ায় রমরমা আকাশ-মাটি। কিন্তু তার মন বলছিল
দরজা-জানালা আটকানো ঘরে পা দিয়ে দেখবে অল্প ওয়াটের বাল্বে ঝিমঝিমে
আলো-আঁধারি। বাস্তবে মোটেও সেরকম হলো না। মাঝারি আয়তনের ছিমছাম ঘর – করপোরেট অফিসে যেমন অভ্যাগতদের জন্য বসার বা অপেক্ষা করার সুব্যবস্থা থাকে। পর্যাপ্ত আলো ঘরের ছাদে-দেয়ালে-মেঝেতে, এসি ছাড়াই ফ্যানের বাতাসে ঝিরিঝিরি আরাম। হাসান অবশ্য এখানে কারো সঙ্গে দেখা করা দূরের, নিজের ইচ্ছায়ও আসেনি। সে জানে এখান থেকে তাকে অন্য কোনো ঘরে নিয়ে যাওয়া হবে। বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হলো না। যে দুজন তাকে নিয়ে এসেছিল, তারা ইঙ্গিত করতে যন্ত্রচালিতের মতো সে উঠল।

টানা করিডোর ধরে মিনিট তিনেক হাঁটতে এক পাল্লার ভারী লোহার দরজা। লোহা না, উজ্জ্বল ঝলকানিতে মনে হলো স্টিল। হাসান মোটামুটি আন্দাজ করতে পারল সামনে কী হতে যাচ্ছে। দরজাটা পেরোতেই বিকট ধাতব শব্দে সেটা বন্ধ হবে, কানে তালা লাগা শব্দে বুক ধড়ফড় করবে, আতঙ্কে জ্ঞান হারানোও অস্বাভাবিক নয়। সে শুনেছে শুরুটা এভাবেই হয়, হয়ে থাকে। একটা দরজার পর আরো দরজা পড়বে, সে ঢুকবে, পায়ে পায়ে পেরোবে, পেছন পেছন রক্ত হিম করা শব্দটা।

কিছুই হলো না। দরজাটা সামান্যতম শব্দ না তুলে বন্ধ হলো। তার সামনে একজন, পেছনে অন্যজন। কয়েক পা এগোতে দ্বিতীয় দরজা। হাসান ভাবল, এবার। নাহ্, নিঃশব্দে, অনেকটা চুপিসারে ভারী দরজা বন্ধ হলো। মিলছে না। তারপর আরো দুটো একই রকম দরজা পেরিয়ে যেখানে পৌঁছল সেটা একটা আলো-হাওয়াময় মাঠের মতো ঘর। মাঠ না কে বলবে! দেয়ালে ধানক্ষেতের বিশাল ছবি, গরু চরছে ক্ষেতের পাশে, দূরে সাপের খোলসের মতো ফর্সা খালের ঝিলিক। গরুগুলো ঘাসে মুখ দিয়ে আয়েশি মেজাজে লেজ নাড়ছে, চাইলেই ছবির ফ্রেম টপকে নেমে পড়তে পারে।

এ-ঘরে কোথাও তাকে বসতে বলা হবে। একটা ছোট চারকোনা টেবিলের একদিকে সে বসবে, অন্যদিকে আরেকজন। এবার মিলল, যেমন ভেবেছিল। ছোট, এইটুকু একটা বার্নিশহীন টেবিল – এত ছোট যে একজন মানুষ টাইট হয়ে বসে কোনোমতে ভাত খেতে পারবে; তরকারির দু-তিনটা বাটি, ভাতের ডিশ, প্লেট-গ্লাসে টেবিলটা
টায়-টায় ভরে যাবে, পানির বোতল বা জগ মনে হয় না ধরবে। কিন্তু ঘটনা যা, তাকে এখানে কেউ খেতে ডাকেনি। যে দুজন তাকে সঙ্গে করে মাঠমতো ঘরে ঢুকেছিল, তারা অদৃশ্য হয়ে যেতে তৃতীয় একজন কোথা থেকে উদয় হয়ে তাকে টেবিলে আহ্বান জানাল। হাসান লোকটাকে দেখে একরকম হতাশ হলো – রোগাপটকা চেহারা, পানখাওয়া লালচে দাঁত, চুল না আঁচড়ানোয় দুই গোছা কোঁকড়া চুল কানের দুপাশের ঢাল বেয়ে ভুরু ছুঁয়েছে। পরনে গাঢ় নীল শার্টের বুকের দিকে খানিকটা কোঁচকানো। কার সঙ্গে যেন এই চেহারার মিল রয়েছে, কার সঙ্গে? এমনও হতে পারে কোথাও দেখেছে। আজকাল সে প্রায়ই অচেনা লোককে চেনা বলে ভুল করে। যেভাবে একই রকম চেহারার লোকজন ঘুরে বেড়াচ্ছে!

‘কেমন আছেন’ জিগ্যেস করে লোকটা উৎসুক মুখে তাকাল। হাসান ভাবতে পারল না এমন একটা প্রশ্নের জবাব পেতে তাকে এখানে নিয়ে আসা হয়েছে। কথার জবাবে সে মাথা নাড়ল। লোকটা কী বুঝল কে জানে, বলল, ‘এবার বলেন।’

থতমত খেয়ে সে চুপ করে থাকলে লোকটা একটা পরিচিত মিনি সিগারেট প্যাকেট বাড়িয়ে বলল, ‘আপনার ব্র্যান্ড। ইদানীং আমারও।’ লোকটা তাকে সিগারেট সাধছে, এর মতো আশ্চর্যের কী হতে পারে! সে সিগারেট নিল না। ‘বলেন’, বলে লোকটা খানিকটা সামনে ঝুঁকতে হাসান দেখল তার থুতনির বাঁ পাশে একটা গাঢ় কাটা দাগ। সময়মতো স্টিচ পড়লে দাগটা চামড়ায় মিশে যেত। তার নিজের থুঁতনিতেও কাটা দাগ রয়েছে, ছোটবেলায় চোখ বেঁধে হাঁড়িভাঙা খেলতে গিয়ে হোঁচট খেয়ে একটা মাটির হাঁড়ির ওপরে হুমড়ি খেয়ে পড়ার ফল। স্টিচ লেগেছিল তিনটা, দাগটা খুঁটিয়ে দেখলে নজরে পড়ে, মিশেই গেছে প্রায়।

দুইবার ‘বলেন’ বলার পরও লোকটা ধৈর্য হারাল না। বলল, ‘তা হলে আমি বলি। আপনি হাসান, স্ত্রীর নাম হাসনা।

স্বামী-স্ত্রীর নামে এমন মিল বড় একটা পাওয়া যায় না। কেউ ভাবতে পারে হাসনা নামটা আপনার দেওয়া, কিংবা নামটা হাসনাই ছিল, আপনি নামের টানেই ভিড়েছেন। আসলে তো এসব কিছু না, অ্যারেঞ্জড ম্যারেজ, ব্যাপারটা কাকতালীয়, তাই তো? আপনাদের একটা দশ বছরের ফুটফুটে মেয়ে আছে, নাম জুঁই। আপনি কাজ করেন রেড অ্যাপেল নামে একটা মার্চেন্ডাইজিং ফার্মে, উত্তরা বারো নম্বর সেক্টরে অফিস। সেলারি … থাক, আপনি জানেন এটা আমাদের জানা। শুধু এটা না, আরো অনেক কিছু। এবার আপনার মুখ থেকে শুনি, বলেন তো আপনাকে এখানে কেন আনা হয়েছে?’

বেশভূষা বা চেহারায় লোকটাকে যত সাধারণই মনে হোক, এই মাঠমতো ঘরে যে তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য কাঠকাঠ বসিয়ে রেখেছে, সে কেউকেটা না হয়ে যায় না। তবে তার কথা বলার ধরন অমায়িক, ভেক ধরেও কারো পক্ষে এত শান্ত, সৌহার্দ্যময় গলায় কথা বলতে পারা সহজ নয়। কিন্তু তাকে যে জিগ্যেস করছে এখানে কেন নিয়ে আসা হয়েছে, এ-প্রশ্ন তো তার নিজেরও। সে কি পাল্টা জানতে চাইবে কেন তাকে নিয়ে আসা, মানে ধরে আনা হয়েছে? যদি করে, লোকটা কি রেগেমেগে নিজের আসল, মানে রুদ্রমূর্তি ধারণ করবে? লোকটার অপেক্ষমাণ মুখের দিকে তাকিয়ে সাহস করে সে একসময় বলেই ফেলল – সে জানে না। মুখোমুখি চেহারায় সামান্যতম ভাবান্তর ফুটল না, যেন জানত এমন জবাবই শুনবে। লোকটা সিগারেট ধরিয়ে সবটুকু ধোঁয়া গিলে শান্ত গলায় থেমে থেমে বলল, ‘প্রথম-প্রথম সবাই এমনই বলে। নির্দোষ, বেকসুর ভাবাই মানুষের কাজ – খুন, রাহাজানি, ব্যাংক ডাকাতি, রেপ, মানি লন্ডারিং যা-ই করুক, মনে করতে পারে না। ভুলে যায়, ভুলে না গেলে মানুষ আর মানুষ থাকে না।’

হাসান বলতে চাইল সে এসব কিছুই করেনি, আর তখনই লোকটার কথা মনে করে দমে গেল – সে বলেছে, মানুষ ভুলে যায়। সেও কি ভুলে গেছে? সামনে হাত দুই দূরত্বে

সিগারেট-ঠোঁটে লোকটা তাকিয়ে তার মুখে, যেন সাহায্য করছে তাকে মনে করিয়ে দিতে। উসখুস করে হাসানও তাকিয়ে থাকে, তবে লোকটার মুখে নয়, তার চোখ বার্নিশহীন টেবিলের এক কোণে, যেখানে একটা পেরেকের মাথা বাঁকা হয়ে উঁচিয়ে আছে – যেন কান পেতে অপেক্ষায় হাসান কী বলবে শুনবে।

পরপর কয়েক রাতে একই ঘটনা। স্বপ্নটা একই কায়দায় ঘুম চটকে দিয়ে যাচ্ছে। ওই মাথা কাত করা পেরেক পর্যন্ত। হাঁসফাঁস করে জেগে উঠে সে পানি খায়। ফের বালিশে মাথা ঠেকাতে ভয় – পরের অংশটা না জানি কেমন! যদি পরেরটুকু দেখতে হয়! আবার কৌতূহলও হয় দেখতে।

বারবার স্বপ্নটা হানা দেওয়ার মানে কি তাকে মনে করিয়ে দিতে? স্বপ্নের মাথামুণ্ডু বলে কিছু নেই, কে না জানে! একসময় সে মোটামুটি এক ধাঁচের স্বপ্ন দেখত। যেমন – কোথাও যাবে, ট্রেনে বা বাসে, কিন্তু কিছুতেই ট্রেন স্টেশনে বা বাস টার্মিনালে  পৌঁছতে পারছে না। একই ধারার অন্য স্বপ্নও আছে – পরীক্ষার হলে ঘণ্টা পড়ে গেছে, সে একটা বিশ্রী ঝামেলায় আটকে যেতে পারছে না। এ-ধরনের স্বপ্ন যতক্ষণ চালু থাকে, হাঁসফাঁস লাগে, তবে ঘুম ভাঙার পর পাশ ফিরে শুতে আর মনে থাকে না।

কিন্তু এ-স্বপ্নটা যে ঘুরেফিরে আসছে, কোনো কার্যকারণ নেই কী করে বলে!
চার-পাঁচবার তো দেখা হয়ে গেছে, বার্নিশহীন টেবিল সামনে নিয়ে সে গাঢ় নীল শার্টের মুখোমুখি কাঠকাঠ বসে। দৃশ্যগুলো যে পরপর একই ভাবে আসে তা নয়, কিছু অদলবদল হয়। যেমন পেরেকটার শেষে আসার কথা, কখনো সেটা আগেই হাজির হয়।

ব্যাপার যদি হয়, তাকে মনে করিয়ে দিতে স্বপ্নটা পিছু নিয়েছে, তা হলে মনে না করা পর্যন্ত স্বপ্নের ঘটনাটা ঘটতেই থাকবে। লোকটা বলেছিল মানুষ ভুলে যায়, ভুলে যায় বলেই নাকি মানুষ। এমন কথা হাসান জীবনে শোনেনি। সেও হয়তো অনেক কিছু ভুলে বসে আছে, তাই বলে খুন, রাহাজানি, ব্যাংক ডাকাতি, মানি লন্ডারিং?

বউ হাসনাকে বলতে সে পাত্তা দিলো না, ‘ধুর, স্বপ্নে মানুষ কত কিছুই দেখে। আমি দেখি না? তোমারে বলছি কোনো দিন? বললে তো বিশ্বাস করবা না।’ বলে মুখ টিপে রহস্য করে হাসল।

হাসনা যত সহজে উড়িয়ে দিলো, হাসানের পক্ষে তা সম্ভব হলো না। কয়েক দিন যেতে সে খেয়াল করল কাজকর্মের ফাঁকে হঠাৎ হঠাৎ মাঠের মতো ঘরের ছোট টেবিলে সে মাথা ঝুঁকিয়ে বসে, টেবিলের ওপাশ ফাঁকা, কেউ নেই। স্বপ্নটা তাকে পেয়ে বসেছে, এক রকম দখলই করে ফেলেছে। একটা কারণ হতে পারে সে বেশি বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। না দিয়েই-বা কী করে! রাতের পর রাত জ্বালাতেন। তবে এ-কথা ঠিক, প্রথম রাতে স্বপ্নটা যেমন ফাঁপরে ফেলেছিল, তা অনেকটা কমে এসেছে। অস্বস্তি হয়, ওই পর্যন্ত। আর সেটা রয়েও যায়।

কয়েক দিন গেল। স্বপ্নের কথা বাদ দিলেও তার মনে হলো অতীতে জেনে বা না-জেনে কোনো খারাপ কাজ মানে পাপ-টাপ যদি করে থাকে, সেটা মনে করতে দোষ কোথায়? কিন্তু পারছে কই? কী এমন হতে পারে যা মুছে গেছে, কোনো চিহ্নই রেখে যায়নি! নাকি আছে কোথাও, কোনো গহন তলে! ছাড়া-ছাড়া ভাবে কিছু ঘটনা মনে পড়ে, সেসব বেশিরভাগই হাস্যকর – স্কুলের অ্যানুয়েল স্পোর্টসে কবে কাকে চুপকে ল্যাং মেরে দুশো মিটার দৌড়ে ফার্স্ট হয়েছিল, বাবার পকেট থেকে টাকা চুরি করে চাকর রমজানের ওপর দোষ চাপিয়ে বেদম মার খাইয়েছিল। এ রকম অনেক ঘটনাই আছে। বড় হয়ে চাকরিতে এসে সবাই যা করে সেও কিছু কিছু করেছে, চুরি-চামারি ছাড়া চাকরি ভাবা যায়! তবে অনেক দিন সে-পথ বন্ধ, প্রাইভেট ফার্ম, বেতন-টেতন মন্দ নয়, তবে সুযোগ পেলে করবে না তা কি বলা যায়? 

হাসনাকে বললে হাসবে জেনেও একদিন সুযোগ বুঝে সে মুখ খুলল, ‘মনে তো করতে পারছি না কিছু।’

‘কী?’

‘আর কী, পাপ-টাপ। বলেছিল না মানুষ ভুলে যায়?’

‘কী আবোলতাবোল বকছ, কার কথা বলছ।’

‘আরে সেই লোকটা? স্বপ্নের।’

হাসনা সন্দিগ্ধ চোখে তাকাল, কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে বলল, ‘তোমার কেইসটা কী, এখন তো মনে হয় ঘটনা আছে। আমারে কও নাই, এখন কও। কী আকাম করছ …’

 ‘খালি ইতরামি।’

ছোট অফিস, মাঝে মাঝে কাজের খুব ব্যস্ততা থাকে। প্রাইভেট ফার্ম বলে কাজকর্ম না থাকলেও যে যার টেবিলে গ্যাঁট হয়ে বসে থাকে। সেদিন একটা অদ্ভুত ঘটনায় সে যারপরনাই চমকে উঠল। একটু ঝিমুনি এসেছিল, এমন সময় মনে হলো সে সেই মাঠের মতো ঘরে, সামনে সেই বিখ্যাত পেরেকওয়ালা মিনি টেবিল। এত দূর ঠিক আছে, এমন তো আজকাল হচ্ছে। কিন্তু অদ্ভুতুড়ে ঘটনা হলো, টেবিলের ওপাশটা ফাঁকা নয়, সেখানে একদৃষ্টে যে তার মুখে তাকিয়ে সে অ্যাকাউন্টসের নীলরতন। এক মুহূর্ত, চটকা ভেঙে সে উঠে পড়ল। বাথরুম ঘুরে সিগারেট খাবে বলে ব্যালকনিতে গেল। মিনিট পাঁচেক পরে ফিরে আসছে, নজরে পড়ল কোণের দিকের একটা কিউবিকলে নীলরতন কম্পিউটারে চোখ গুঁজে বসে। পায়ে পায়ে সেদিকে এগোতে নীলরতন মুখ তুলে চাইল। কাজের সময় বিরক্ত করবে কি না ভাবছে হাসান, নীলরতন হাত ইশারায় ডাকল। মুখোমুখি বসতে নীলরতন বলল, ‘মনে হয় একটু রোগা হয়েছেন, ডায়েট করছেন?’ বলে হাসল, পান খাওয়া লাল দাঁত, হাত দিয়ে চুল ঠিক করে জুত হয়ে বসবে, হাসান দেখল দুই গোছা চুল কানের দুই পাশ থেকে তার ভুরুতে এসে ঝুলোঝুলি করছে। চমকে উঠল হাসান, এর চেহারার সঙ্গে সেই লোকটার আশ্চর্য মিল। আগে তো মনে পড়েনি। নীল শার্টওয়ালাকে দেখে মনে হয়েছিল কার সঙ্গে যেন চেহারার মিল। এ যে তারই অফিসের কাজপাগল গোবেচারা নীলরতন! শুধু নীল শার্টের জায়গায় নীলরতনের পরনে দাবার বোর্ডের মতো সাদাকালো ঘরকাটা নিপাট ফুল শার্ট। থুঁতনিতে কি ওর কাটা দাগ আছে, গাঢ় কাটা দাগ? নীলরতন চায়ের কথা বলল। চায়ে চুমুক দিয়ে সে তার বড় মেয়ের জিআরই স্কোর নিয়ে বকবক শুরু করল। পড়াশোনায় মেয়েটা ভালো এটুকুই সে জানত, জিআরইতে এত ভালো করবে সে নাকি কল্পনাও করেনি। মেয়েকে একটা ভালো ল্যাপটপ গিফট করবে। চা শেষ করে হাসান উঠে পড়বে, কিন্তু ভেতরে ভেতরে উসখুস। কাটা দাগের খবরটা যদি জানতে পারত!

আরো কয়েকদিন যেতে তার মনে হলো এভাবে চলতে পারে না, স্বপ্নের দখলদারি থেকে বেরোতে হবে। মনে মনে সে প্রস্তুতি নিল। যখনই মনে পড়ে, সে কাজকর্মের কথা ভাবে, তেমন কিছু করার না পেলে ফোনে কারো সঙ্গে আলাপে মেতে ওঠে। পুরনো বন্ধু-বান্ধব যাদের সঙ্গে অনেক দিন দেখা নেই, তাদের খোঁজখবর করে। অকারণে বাসায় হাসনাকেও ফোন করে, কী রান্না জানতে চায়। নতুন একটা নিয়ম চালু করেছে, ভোর-ভোর হাঁটতে বের হয়। ফাঁকা পথঘাট, খোলা হাওয়ায় ভালোই লাগে। ঘরে ফিরে লম্বা গোসল শেষে ফুরফুরে মেজাজে রুটি-আলুভাজি-অমলেট নিয়ে বসে। একান্ত অবসরে সিগারেট ছাড়ার কায়দা-কানুন দেখে ইউটিউবে। অফিস সেরে টিভিতে মন দিয়ে সিরিয়াল দেখে। এমনকি যা কখনোই করেনি, মাঝে মাঝে জুঁইকে তার হোমওয়ার্কে সাহায্য করতে বসে। জুঁইকে নীলরতনের মেয়ের গল্প করে। তার কলিগের মেধাবী মেয়েকে দেখতে একদিন জুঁইকে নিয়ে যাবে, এমন কথাও বলে। এই করে করে একসময় মনে হলো স্বপ্নের ঘোর থেকে সে বেরিয়ে পড়ছে। ঠিকই ভেবেছিল, খামোকা স্বপ্নটাকে গুরুত্ব দিয়ে ফালতু সমস্যা তৈরি করেছিল। স্বপ্ন নিয়ে কেউ এত ঘাঁটাঘাঁটি করেছে তার জানা নেই।

একটা বিষয় অবশ্য কখনো কখনো মাথায় নড়েচড়ে ওঠে – অনেকটা বেখেয়ালে। স্বপ্নটা যদি স্বপ্ন না হতো, বাস্তবে যদি এমন কিছু ঘটত!

 অফিসের কাজে ব্যাংকে গিয়েছিল একটা ইমপোর্ট এলসি নেগোশিয়েট করতে। ব্যাংকের অফিসার কফি খাওয়াল, খুচরা গল্পগুজবও হলো দেশের ফরেন রিজার্ভ নিয়ে, নতুন এলসি খুলতে আগামীতে সেন্ট্রাল ব্যাংকের নানা বায়নাক্কা মেটাতে হবে। বেরিয়ে সিগারেট ধরাবে না ধরাবে না করেও ধরিয়ে ফেলল, দুপুর পর্যন্ত চারটার বেশি খাবে না প্রতিজ্ঞাটা ভাঙতে হলো। হাঁটতে মন্দ লাগছিল না, অফিস পর্যন্ত মিনিট বিশেক লাগবে, সে হাঁটতেই মনস্থ করল। এদিকের ফুটপাত হকারদের দখলে যায়নি, যাবে হয়তো শিগগির, পুলিশই হকার বসাবে। কোথায় যেন পড়েছিল শুধু ঢাকার ফুটপাতের হকারদের থেকে মাসে দশ কোটির বেশি টাকা ওঠে। কত যে রুজির পথ এ-শহরে! সেদিন ইউটিউবে দেখল উঁচু রোড ডিভাইডার পেরোনোর জন্য এক লোক ছোট মই নিয়ে লোক পারাপার করছে, জনপ্রতি পাঁচ টাকা, মন্দ কি! অফিসে গিয়ে বেশি সময় থাকবে না, লাঞ্চ সেরে উঠে পড়বে, মতিঝিলে ওয়ালটনের শোরুমে যাবে। কিস্তিতে এসি দিচ্ছে। যা গরম পড়েছে, একটা এসি না হলে চলছে না। আনমনে এসির কথা ভাবছিল, হাসনাকে বলা হয়নি, দুর্দান্ত একটা সারপ্রাইজ হবে। উইনডো না, কিছু বেশি পড়লেও স্পিøটই লাগাবে, বেডরুমে। জুঁইসহ তিনজন একসঙ্গে শোবে, শুধু রাতেই চালাবে, ঘণ্টাদুয়েক চালালে ঘর ঠান্ডা হয়ে যাবে। বিল বাড়বে, কী আর করা! পেছনে এ-সময় হঠাৎ ভারী পায়ের শব্দে সে চমকে উঠল, তাও কয়েক জোড়া পায়ের। একনজর ঘাড় ফিরিয়ে কিছু দেখতে পেল না। কী শুনল? সামনে পা বাড়াতে শব্দটা যেন আরো জোরদার হলো। ফের ঘাড় ফেরাতে একই দৃশ্য, কেউ নেই। সাদা ছড়ি হাতে এক অন্ধ ভিখারি মন দিয়ে টাকা গুনছে, অনেক টাকা। একটা কুকুর ঘেউ ঘেউ করে তার কাছে ভিড়তে সে তার ছড়ি নিয়ে তাড়া করে আবার টাকা গোনায় মন দিলো। তাড়া খেয়েও কুকুরটার হাবভাবে ভয়-ডরের লক্ষণ নেই, সরে গিয়েও ফের এগোনোর পাঁয়তারা করছে, গলায় ঘেউ। কেন জানি দৃশ্যটা অন্যরকম লাগল, টাকা হাতে ভিখারি একবার চোখ তুলে তাকে দেখল। হাসান পা চালাল; কিন্তু পেছনে শব্দটা যে থামছে না। কী মনে করে সে হাঁটায় জোর বাড়াল। সঙ্গে সঙ্গে পেছনের শব্দটাও কাছাকাছি হতে লাগল। কয়েক জোড়া ভারী জুতা ফুটপাতের স্লাবে আছড়ে পড়ছে, যেন মাত্র কয়েক পা পেছনে। হাসান দ্বিতীয় দফা চমকাল। পরমুহূর্তে শিউরে উঠল। এবার তবে স্বপ্নের ঘটনাটা ফলতে যাচ্ছে, এই মাঝদুপুরে! তার মনে পড়ল ঘটনাটা মাঝদুপুরেরই। জোরে হাঁটার কারণে ঘাড়ের ওপর বাতাসের ঝাপটা, নাকি গন্ধভারী নিশ্বাস? সে ছুটতে শুরু করল। মন বলল, ঘাড় ঘুরিয়ে তাকিয়ে কিছুই পাবে না। হকারহীন ফাঁকা ফুটপাতে শুধু অন্ধ ভিখারি ও কুকুর। তারপরও এ-অবস্থায় ছোটা ছাড়া কী করে! ছুটতে তাকে হচ্ছেই। নিজের ধাওয়া থেকে পালানো অসম্ভব জেনেও।