অনিরুদ্ধ টান

লেখক:

চন্দন আনোয়ার
এই গ্রামের মাটির নিচে কোথাও গুপ্তধন লুকানো আছে – চা-স্টলে আদা-চায়ে চুমুক দেওয়ার একফাঁকে হঠাৎ এ-কথাটি বলে যুবক। সে এই প্রথম কোনো গ্রামের চা-স্টলে বসে চা খাচ্ছে। তার দিকে উপস্থিত সকলের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য গুপ্তধনের কথা বলে, না সত্যি করেই বলে, এই দ্বিধা নিয়ে সবাই যখন তার মুখের দিকে তাকায়, সে তখন আরেকবার বলে, আপনাদের এই গ্রামের মাটির নিচে কোথাও গুপ্তধন লুকানো আছে। শিক্ষিত-পরিশীলিত মার্জিত পোশাক-পরিহিত এই শহুরে যুবককে তারা এই প্রথম দেখছে। হঠাৎ গুপ্তধনের কথা তোলায় যুবকের দিকে বিস্ময় ও সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকায়। বিস্ময় ও সন্দেহের ঘোর কাটার আগেই সাদা কাগজে কাঁপা-কাঁপা হাতে আঁকা  গ্রামের একটি মানচিত্র মেলে ধরে যুবক, এবং বলে, গ্রামের ঠিক এ-জায়গাটিতে গুপ্তধন লুকানো আছে। মানচিত্রটির দিকে সকলেই একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। উপস্থিত কেউই জায়গাটি ঠিক ধরে উঠতে পারে না। তাদের মধ্যে যারা চালাক ও বুদ্ধিমান তারা ধরতে চেষ্টা করে, এটি জাদুর মানচিত্র কিনা এবং তাদের মধ্যে একজন বলেই ফেলে, যুবক জাদুকর। ধীরে ধীরে উৎসুক ও কৌতূহলী মানুষের ভিড় জমে ওঠে। যুবক আর বসে থাকতে পারেনি। চা-স্টল থেকে বেরিয়ে এসে মোড়ের ওপরে দাঁড়ালে উৎসুক মানুষ তাকে ঘিরে একটি বৃত্ত তৈরি করে। তিরিশ-পঁয়ত্রিশ বছরের শক্তসামর্থ্য শরীর নিয়ে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে থাকা সম্ভব হলেও নির্ভয়ে থাকা সম্ভব হচ্ছে না। এত মানুষের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সে কোনোদিনই কথা বলেনি।  গ্রামের মানুষের মধ্যে উৎসাহ ও কৌতূহল সৃষ্টির জন্য এমন নাটকীয় কৌশল গ্রহণ করাটা ঠিক হলো কিনা – এ-কথা ভাবে। একবার মুখ থেকে বেরিয়ে যাওয়া কথা ধনুকের ছুটে যাওয়া তীরের মতো, কিন্তু গুপ্তধনের প্রকৃত রহস্যটা এখনই খোলাসা করা ঠিক হবে না। বৃত্তের দক্ষিণপ্রান্ত থেকে এগিয়ে আসেন পঞ্চগ্রাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের রিটায়ার্ড হেডমাস্টার আশি বছরের প্রবীণ জাহের আলি। তার ঘোলাটে চোখ যুবকের শরীর প্রদক্ষিণ করে এমন নিবিষ্টভাবে, যেন তার হারিয়ে যাওয়া সন্তান ফিরে এসেছে। যুবকের শরীরের গন্ধ নেওয়ার জন্য প্রায় শরীর ঘেঁষে দাঁড়ায়। উপস্থিত মানুষের সামনে নিশ্চল জড়বস্ত্তর মতো দাঁড়িয়ে থাকা যুবকের চোখ জাহের আলি মাস্টারের ঘোলাটে চোখের ওপরে পড়তেই চমকে ওঠে, তার বাবার চোখ দুটি যেন এই প্রবীণের চোখে লাগানো। জাহের আলি মাস্টারের এই রহস্যঘেরা আচরণে ক্ষুব্ধ এক যুবক এগিয়ে আসে এবং জাহের আলি মাস্টারকে আড়াল করে যুবকের নাক বরাবর দাঁড়ায়। এখন ইরি ধান কাটার মৌসুম। মাঠে ধান কাটা রেখে এসেছে। এই ব্যস্ততার মধ্যে এই যুবক হঠাৎ করে বাজপাখির মতো উড়ে এসে কী খবর নিয়ে এসেছে, আর তাই নিয়ে সবাই কৌতূহল দেখাচ্ছে, এ-বিষয়টি গ্রামের যুবকের ভালো লাগেনি। সে প্রথম থেকেই উসখুস করছিল। মাস্টার কথা বলছে বলে চুপ করে ছিল। আর চুপ করে থাকতে পারেনি বলে বাধ্য হয়েই শহরের যুবকের সামনে হাজির হয়। খাপ খোলা তলোয়ারের মতো তার চিকন হিলহিলে শরীর বাতাস লাগা ধানগাছের মতো তিরতির করে কাঁপছে উত্তেজনায়। প্যান্ট-শার্টপরিহিত শহরের শিক্ষিত যুবক, দেখতে সুদর্শন, কালো ফ্রেমের চশমা আঁটা চোখের দিকে তাকিয়ে গ্রামের যুবক জিজ্ঞেস করে, আপনে কইত্তে আইছেন? আপনে কি সরকারি লোক? কইন, কী গুপ্তধন আছে আমাদের গ্রামে?

এখন কিছু বলা ঠিক হবে না। শহরের যুবক বলে।

গ্যাসের খনি?

না।

তেলের খনি?

না।

কয়লার খনি?

না।

সোনার খনি?

সময় হলেই জানবেন। আপনারা উত্তেজিত হবেন না।

রাজা-টাজার বাড়ি…

আমার অনুরোধ, আপনারা উত্তেজিত হবেন না।

এবার গ্রামের যুবক তির্যক ও লক্ষ্যভেদী চোখে তাকায় শহরের যুবকের দিকে এবং সে ধরতে চেষ্টা করে, মানুষটি জাদুকর কিনা। গুপ্তধনের নামে গ্রামের সহজ-সরল মানুষকে ঠকানোর মতলব নিয়ে এসেছে কিনা? কিন্তু জাদুকর বা ঠকানোর মতলব নিয়ে এলে চোখে-মুখে যে চালাকি থাকার কথা, শহরের যুবকের চোখে-মুখে তা খুঁজে পায় না। আরো গভীর রহস্যে প্রবেশ করার সামর্থ্য বা ধৈর্য কোনোটিই না থাকায় ভীষণ বিরক্তি নিয়ে গ্রামের যুবক পেছনে হটে। উপস্থিত সবার দিকে তাকিয়ে নিজের বিরক্তি প্রকাশও করে।

জাহের আলি মাস্টারের ঘোলাটে চোখের দিকে তাকিয়ে শহরের যুবক ভাবে, এমন একজন প্রবীণ বেঁচে আছে এই গ্রামে, অথচ এ-খবরটি ওরা কেউ জানে না যে, ওদের মাটির নিচে গুপ্তধন আছে। এই মানুষটাই কি…। এবার  সে জাহের আলি মাস্টারকে জিজ্ঞেস করে, আপনি সত্যিই জানেন না? গুপ্তধনের খবর আপনি জানেন না বলছেন? জাহের আলি মাস্টার মাথা নামিয়ে নিলে যুবকের সন্দেহ আরো প্রবল হয়। আমি শিগগির আসছি, বলে বৃত্তের ভেতর থেকে বেরিয়ে গেল। যতক্ষণ পর্যন্ত যুবকের শরীর দেখা গেল, ততক্ষণ পর্যন্ত জাহের আলি মাস্টার এবং উপস্থিত সকলেই যুবকের হাঁটার গতিবিধি লক্ষ করল। বিকেলের রোদপড়া শরীরের একটি লম্বা ছায়া নিবিষ্টমনে তাকে অনুসরণ করে। তারা লক্ষ করে, জাহের আলি মাস্টারের ঘোলাটে চোখ অশ্রুসিক্ত এবং মুখের জড়ানো প্যাঁচানো চামড়ার ভাঁজে ভাঁজে ক্ষীণ একটি অশ্রুর ধারা। শরীর কাঁপছে স্বাভাবিকের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি গতিতে। কয়েকজন ধরাধরি করে চা-স্টলের বেঞ্চের ওপরে বসিয়ে দিলো। এই যুবককে সে চেনে কিনা, এই বিষয়ে জিজ্ঞেস করলে মাস্টার বলে, হঠাৎ মাথাটা ঘুরে গেল।

যুবকের গুপ্তধনের সংবাদের সূত্র ধরে একটি একটি করে গুপ্তধন আবিষ্কারের কল্পকাহিনি বেরিয়ে আসতে লাগল এবং কল্পকাহিনি মানুষের মুখেমুখে ঘুরে শহরের যুবকের কথিত গুপ্তধনের সঙ্গে মিলে যেতে লাগল। এসব কল্পকাহিনি মানুষ ভুলে গিয়েছিল।

ক. সৈয়দ আলি খানের দিঘির লোহার সিন্দুকটির কথা মনে পড়ে গ্রামবাসীর। একদা এক হিন্দু জমিদারের দিঘি ছিল এটি এবং বহুকাল আগে এই দিঘিতে লোহার সিন্দুক ভেসে উঠত। সিন্দুক ভেসে ওঠা দেখেছে এমন কেউ বেঁচে না থাকলেও গল্পজানা লোকের অভাব নেই। রাত্রির শেষ প্রহরে, ফজরের আজানের ঠিক আগে একটি লোহার সিন্দুক ভেসে উঠতে দেখা যেত দিঘির ঠিক মধ্যিখানে। মানুষের উপস্থিতি টের পেলেই সিন্দুকটি ডুব দিত। পরে খোঁজাখুঁজি করে সন্ধান মিলত না। শহরের যুবক নিশ্চয় এই লোহার সিন্দুকটির কথাই বলেছে। কিন্তু এখন তো আগের সেই দিঘি নেই, লোহার সিন্দুকও ভেসে ওঠে না। মাটির কোন অতলে লুকিয়ে আছে কে জানে। বছরে দুবার দিঘির পানি সেচে মাছ ধরা হয়। সিন্দুকটি যদি মাটির নিচে পাতালে দেবে থাকে, তবে অবশ্য খুঁজে পাওয়ার সম্ভাবনা নেই।

খ. গ্রামবাসীর মনে পড়ে জাহের আলি মাস্টারের বাঁশঝাড়ের মাটির নিচে সোনার কলসটির কথা। কলসের কল্পকাহিনি খুব বেশিদিন আগের নয়। এখন আর কেউ স্বপ্ন না দেখলেও বিশ-পঁচিশ বছর আগেও বয়স্ক লোকেরা দেখত এবং প্রতি চন্দ্রমাসের ১৫ তারিখ দ্বিপ্রহর রাতে কলসটি মাটির ওপরে ভেসে উঠত। গোপনে গোপনে যারাই কলসের সন্ধানে বাঁশঝাড়ের ভেতরে ঢুকেছে, তারা কেউ-ই বলেনি কলসটিকে দেখেনি। সবাই বলে দেখেছে, কিন্তু কলসটির মুখে ফণা তুলে বসেছিল একটি বিষাক্ত সাপ। একজনই সাহস করে এগিয়েছিল, সকালে তার লাশ পড়েছিল।

এইসব কল্পকাহিনির মধ্যে ছোট একটি গল্পও মানুষের মনে মনে স্বেচ্ছাভ্রমণ করে, কিন্তু মুখ ফুটে কেউ বলে না। আকাশের চাঁদ-সূর্য উঠলে যেমন মুখ ফুটে বলার কিছু নেই, তেমনি রইছ চৌধুরী রাতারাতি ধনী হয়ে গেল কী করে, এই গল্পটিও বলার কিছু নেই। কারণ, সে নিজের মুখেই বলে বেড়িয়েছে, সোনার বাটি পেয়েছে স্বপ্নে। মুক্তিযুদ্ধের নয় মাস সে কোথায় লুকিয়েছিল কেউ জানে না, দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে পাকা বাড়ি, জমিজিরাত করে মানুষটা ধনী হয়ে গেল এক বছরেই।

গ্রামের মানুষের চাপা উত্তেজনা আর তুমুল আগ্রহের দিকে সামান্য ভ্রূক্ষেপ নেই জাহের আলি মাস্টারের। নির্লিপ্ত স্বভাবের এ-মানুষটা নিজেকে আরো গুটিয়ে নিয়েছে। কেউ কিছু জিজ্ঞেস করলে ঘোলাটে চোখে তাকিয়ে থাকে ফ্যালফ্যাল করে। কী এক দ্বিধা, কী এক ভয় যেন বাঘের মতো পেছন থেকে তাড়া করে ফিরছে। গুপ্তধনের রহস্যের মতো জাহের আলি মাস্টারও আরেক রহস্য। কী গুপ্তধন আছে, কোথায় লুকানো আছে, এই খবর এ-মানুষটা জানলে জানতেও পারে। কিন্তু যদি সে জেনেই থাকবে, এতদিন সে বলেনি কেন? সে এই গুপ্তধন হাতিয়ে নেয়নি কেন? ইত্যাদি প্রশ্ন সঙ্গে সঙ্গে উঠে আসায় জাহের আলি মাস্টারের নির্লিপ্ততার রহস্য ঐচ্ছিক হয়ে প্রধান হয়ে ওঠে গুপ্তধনবিষয়ক আলোচনা।

এই চাপা গুঞ্জনের মধ্যেই গ্রামের মানুষ দুই ভাগ হয়ে গেল। যারা শহরের যুবকের কথায় বিশ্বাস স্থাপন করেছে, আর যারা বিশ্বাস স্থাপন করেনি, এই দুই দল ধীরে ধীরে আলাদা হতে   হতে রাত ৮টার মধ্যেই সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন ও আলাদা হয়ে মোড়ের দুটি চা-স্টল দখলে নিয়ে বিতর্ক চালিয়ে যেতে লাগল। এর মধ্যে একদল আছে যারা দুই চা-স্টলেই পাঁক খাচ্ছে। রাত ১০টা পর্যন্ত চলার পরে চা-স্টল বন্ধ করে দেওয়ায় বিতর্ক অসমাপ্ত রেখেই চলে যেতে বাধ্য হয়। বিশ্বাসী-অবিশ্বাসী উভয় দলের কিছু যুবক রাস্তার ওপর দাঁড়িয়ে এই বিতর্ক চালিয়ে যেতে লাগল। উদ্দেশ্য রাত গভীর হলে গাঁজা টানবে, জুয়ার আসর পাতবে।

গ্রামটা প্রায় জেগেই ছিল সারারাত। কারো না কারো ঘরে বাতি জ্বলতে দেখা গেছে। মসজিদে আজান পড়ার অপেক্ষা করে অধৈর্য হয়ে কেউ কেউ ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ে সুবেহ সাদিকে। গরিবের যুবতী রূপবতী কন্যার শরীর সোনা দিয়ে মুড়িয়ে দিলে যেমনটা হয়, ঠিক তেমনি গ্রামের দরিদ্র রূপটা যেন পালটে গেল। গ্রামের প্রত্যেকেই নিজেদের গুপ্তধনের মালিক ভাবছে। মধ্যরাতে ঘুম ভেঙে গিয়েছিল এবং প্রকৃতির ডাকে ঘর থেকে বেরিয়ে রাস্তায় এসেছিল খাঁবাড়ির কাজের ছেলেটি। সেই-ই দেখেছে, দুজন মানুষ পাশাপাশি হেঁটে বেড়াচ্ছে রাস্তা দিয়ে এবং তারা ফিসফিস করে কথা বলছে। তার উপস্থিতি টের পেয়ে দুজন দুদিকে হাঁটা ধরে এবং অন্ধকারের মধ্যে হারিয়ে যায়। তার কিছুক্ষণ পরেই একজন মানুষকে এদিকে আসতে দেখেছে, সেও অন্ধকারের মধ্যে কোথায় হারিয়ে গেছে ধরতে পারেনি। গুপ্তধনে যারা অবিশ্বাসী তাদের একজন বলে, খাঁবাড়ির এই কাজের পোলাডা চোহে কম দেহে। বানায়া বানায়া কথা বলার ওস্তাদ। ওর কথা বিশ্বাস করে কেডা! বিশ্বাসী দলের লোকেরা ওকে চা-স্টলে ডেকে নিয়ে যায় এবং অত্যন্ত সম্মানের সঙ্গে চা খেতে দেয়। তুই হাছাই দেখলি রে, নাকি…? বিশ্বাসী দলের এক যুবক জানতে চাইলে সে গরম চায়ের ধোঁয়া ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দিতে দিতে বলে, ‘তো কী? আমি চোহে কম দেহিনি? আমি কি রাইতকানা?’

গুপ্তধন নিয়ে  গ্রামের মানুষ এখন দুভাগে বিভক্ত। এই বিভক্তির মধ্যে পিতা-পুত্র-কন্যা, ভাই-বোন, স্বামী-স্ত্রী বলে কোনো কথা নেই। একই বাড়ির বাবা বিশ্বাস করে তো ছেলে অবিশ্বাস করে, স্বামী অবিশ্বাস করলে স্ত্রী বিশ্বাস করে, প্রত্যেকে নিজের দিকে টেনে কথা বলে। কথাকাটাকাটি চলছেই। কারো কারো বাড়িতে হট্টগোলের শব্দও শোনা যায়। এর মধ্যে একটি মর্মান্তিক ঘটনাও ঘটতে যাচ্ছিল – বিশ্বাসী স্ত্রী রাবেয়ার সঙ্গে কথায় না পেরে কাঠমিস্ত্রি খলিল বাটালি ছুড়ে মেরেছিল, কপাল ভালো রাবেয়ার, লাগেনি। আরো কিছু ছোট ঘটনা ঘটে বটে, কিন্তু এসব নিয়ে কারো মাথাব্যথা নেই।

পরপর দুদিন চলে গেল। কিন্তু শহুরে যুবক আর এদিকে আসেনি। ফলে বিশ্বাসী দলের উৎসাহে ভাটা পড়ার কথা ছিল,  কিন্তু তা ঘটেনি, কারণ, এই দুরাতে সৈয়দ আলি খানের দিঘির লোহার সিন্দুক আর জাহের আলি মাস্টারের বাঁশঝাড়ের মাটির নিচে পোঁতা কাঁচা টাকার কলস স্বপ্নে দেখেছে, এরকম বেশ কয়েকজন দাঁড়িয়ে গেছে। এর মধ্যে একজনের স্বপ্ন ভেঙে গেলে বাঁশঝাড়ে গিয়েছিল এবং সোনার কলসটা দেখেছেও, কিন্তু সেই সাপটা এখনো ফণা তুলে বসে আছে কলসের মুখে। এর মধ্যেই তৃতীয় দিন সকালে খবর রটে, জাহের আলি মাস্টার বাড়ি নেই, জাহের আলি মাস্টার নিখোঁজ। হাঁটতে গেলে বাতাসে ধাক্কা খায়, পায়ে পায়ে বেঁধে পড়ে যায়, আশি বছরের ভঙ্গুর শরীর নিয়ে কোথায় যেতে পারে মানুষটা? বউ মারা গেছে বছর দশেক আগেই। ছেলেরা, ছেলের বউরা, নাতি-নাতনিরা মোটামুটি শান্ত এবং জিজ্ঞেস করলে একবাক্যে উত্তর দেয়, তারা কিছুই জানে না। একজন জলজ্যান্ত মানুষ হারিয়ে গেল, অথচ পরিবারের কারো কোনো হা-হু নেই। ছেলে দুটি যে যার মতো কাজ করে বেড়াচ্ছে। বাবা যেন কোথাও বেড়াতে গেছে, দু-একদিন পরে ফিরে আসবে, এরকম এক নিশ্চয়তা তাদের চোখে-মুখে। বুড়ো বলদ বাড়ি থেকে বের করতে পারলে গেরস্তের মনে যেমন বরং আনন্দই ঠেকে, আপদ বিদায় হয়েছে ভাবে, ঠিক এমন একধরনের আনন্দ জাহের আলি মাস্টারের ছেলের বউদের চোখে-মুখে। বরং দুই বউ এক হয়ে বলে বেড়াচ্ছে, কয়দিন ধইরাই বুড়াটার ভাবগতিক উলটা-পালটা দেখছি, খাইতে দিলে খায় না, তিনমাথা হয়্যা কী য্যান ভাবে। তো এই বয়সে যে বাড়ি ছাইড়া পালাইবো ক্যাডা জানে?’

গ্রামের মাটির নিচে গুপ্তধন আছে, খবরটি এ-দুদিন গ্রামের চৌহদ্দির মধ্যেই ঘোরাফেরা করে বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দোলনায় চড়ে। বাইরে বের হওয়ার সাহস পায়নি। কারণ, এ-খবর জানাজানি হলে মেম্বার-চেয়ারম্যান আসবে, তারপর আসবে সরকারিদল বিরোধীদলের নেতা-পান্ডারা। সরকারি লোকজন খবর নেবে। সত্যি হোক, মিথ্যা হোক, গ্রাম খুঁড়ে একশেষ। শেষে সকলকেই বাস্ত্তভিটা হারাতে হবে। কিন্তু জাহের আলি মাস্টারের নিখোঁজ হওয়ার সংবাদটি জানাজানি হলে আর গোপন রাখা সম্ভব হবে না।

গুপ্তধনের সংবাদ নিয়ে এসেছিল যে-যুবক, সে জাহের আলি মাস্টারকে গুম করে ফেলেছে কিনা – এই কথা ভাবে গ্রামবাসী। অথবা এমনও হতে পারে, গুপ্তধনের লোভে গ্রামেরই কেউ বা কয়েকজন মিলে মাস্টারকে গুম করে ফেলতে পারে। কেননা, এই প্রবীণ মানুষটাই বলতে পারে গ্রামের কোথায় গুপ্তধন লুকানো আছে। জাহের আলি মাস্টারের নিখোঁজ অথবা গুম হয়ে যাওয়ার ঘটনায় গ্রামবাসীর মনে উৎকণ্ঠা এবং ভয় জন্মে। রাত নামার এবং রাত গভীর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে জাহের আলি মাস্টারের নিখোঁজ অথবা গুম হওয়ার ঘটনাটিকে ঘিরে তৈরি হওয়া উৎকণ্ঠা ও ভয় আতঙ্কে রূপ নেয়। আতঙ্কে আক্রান্ত প্রাপ্তবয়স্ক সকল নারী-পুরুষের মনে এই ভয়ংকর সম্ভাবনাটাও উঁকি মারে, মানুষটা খুন হয়ে গেল কিনা। সম্পদের লোভে কী না হয়! যারা সবলচিত্তের তারা উৎকণ্ঠা, আতঙ্ক, ভয়ের মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়তে পারে, দুর্বলচিত্তের যারা তারা ঘুমাতে পারেনি এবং তাদের প্রত্যেকেই সকালে সাক্ষ্য দেয়, তারা গভীর রাতে রাস্তা দিয়ে মানুষের চলাচলের শব্দ শুনতে পেয়েছে। জাহের আলি মাস্টারের মতো নিখোঁজ বা গুম অথবা খুন হয়ে যাওয়ার ভয় মনে ছিল বলে কেউ-ই সাহস করে ঘর থেকে বের হয়নি। আজো খাঁবাড়ির কাজের ছেলেটিই সাক্ষী দাঁড়িয়ে গেল, কারণ দুপুররাতে প্রকৃতির ডাকে ঘুম ভেঙে যাওয়া ও-ঘর থেকে বের হওয়া তার জন্য বাধ্যতামূলক। রাস্তায় বাঘ দাঁড়িয়ে থাকলেও তাকে যেতেই হবে। সে যখন রাস্তার ঢালুতে বসে মাথা নিচু করে কাজ করছিল, তখন অন্ধকার নড়ে ওঠে, মানুষের কালো ছায়া দেখতে পায় এবং মানুষের পদশব্দ শুনতে পায়। ছায়াগুলোর আকৃতি ছোট-বড় ঢেউ খেলানো। শারীরিক অবয়বও আলাদা। ছায়াগুলো পা ফেলেছিল অত্যন্ত সতর্কভাবে। নিশ্বাস ফেলছিল নিঃশব্দে। সে বলে, ‘ভয়ে তহন আমার হাত-পাও কাঁপছিন। পেটে পায়খানা আটকায়া গ্যাছিন, নালি মানুষগুলির পিছনে পিছনে…।’

দুজন মধ্যবয়সী মেয়েমানুষ ধীরে ধীরে হেঁটে মোড়ের দিকেই আসছে। চা-স্টলে যারা বসা ছিল, আশপাশের বাড়ি থেকে যারা দেখতে পেল, তারা প্রত্যেকেই থমকে দাঁড়াল মেয়েমানুষ দুটির শারীরিক আভিজাত্য ও হাঁটার ধরন দেখে। তারা চারদিকের গাছপালা, ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট, সামনে পড়া মানুষজনের দিকে কৌতূহলী চোখে তাকাচ্ছে আর এতটা ধীরে হাঁটছে যে, তারা যে এই গ্রামেই এসেছে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। কিন্তু খটকার জায়গা অন্যখানে। মেয়েমানুষের মাথার সিঁথিতে রক্তরাঙা সিঁদুর, হাতে শাঁখা-বালা। তারা কার খোঁজে এসেছে? একঘর হিন্দুরও তো বসতি নেই এ-গ্রামে। তারা মোড়ের ওপর এসে দাঁড়ালে অনেক উৎসুক ও জিজ্ঞাসু চোখ ঘিরে ধরে তাদের। তারা এ-ধরনের পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য পূর্বপ্রস্ত্ততি নিয়ে এসেছে, তাই কোনো প্রকার বিব্রত বা অপ্রস্ত্তত না হয়ে সোজা চা-স্টলের ভেতরে ঢুকে পড়ে এবং সবাইকে বিস্মিত করে সকলের দিকে চোখ ঘুরিয়ে কুশল জিজ্ঞেস করে, ‘আপনারা কেমন আইছেন? প্রত্যুত্তরে সবাই নীরব থাকলেও খাঁবাড়ির কাজের ছেলেটি কথা বলে, ‘আপনেরা কেডা? কইত্তে আইছেন?’ কার বাড়ি আইছেন?’ তারা দুজনেই মৃদু হেসে বলে, কেন? আমাদের বাড়ি এসেছি। আমাদের গ্রামে এসেছি। খাঁবাড়ির কাজের ছেলেটি অপ্রস্ত্তত হয়ে গেল।

খাঁবাড়ির কাজের ছেলেটির চোখেই পড়ে, অতিশয় থুত্থুরে এক বৃদ্ধ ধুলোবালি উড়িয়ে এদিকে আসছে। ধুলোবালি মাখিয়ে শরীর সাদা করে ফেলেছে। তার পেছনে ওইদিনের আগন্তুক যুবক। যুবকের পেছনে জাহের আলি মাস্টার। তারা মোড়ের ওপরে দাঁড়ালে একে একে সবাই বেরিয়ে আসে চা-স্টল হতে। উপস্থিতদের মধ্যে মোড়ের মসজিদের মুয়াজ্জিনও ছিলেন, তিনি মসজিদের মাইকে জাহের আলি মাস্টারের ফিরে আসার সংবাদ প্রচার করেন। চারদিক থেকে মানুষের হাঁকডাক ও ছোটাছুটি শুরু হয়। দশ মিনিটের মধ্যে মোড় লোকারণ্য। কোথায় গিয়েছিল, কারা নিয়ে গিয়েছিল, তার সঙ্গে আসা মানুষগুলো কারা, তারা কেন এসেছে ইত্যাদি প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্যে চা-স্টলের একটি বেঞ্চ এনে সেই বেঞ্চের ওপরে জাহের আলি মাস্টারকে ধরাধরি করে বসানো হয়। জাহের আলি মাস্টারের ভঙ্গুর ও নড়বড়ে শরীর ধনুকের মতো বাঁকা হয়ে আসে। শরীরের কাঁপুনি থামছে না এবং থামার কোনো সম্ভাবনাও নেই। এই কাঁপুনির মধ্যেই কথা বলতে শুরু করে, যেন অতিশয় প্রবীণ নেতা তার অনুসারীদের উদ্দেশে সংক্ষিপ্ত ও শেষ বক্তব্য রাখছেন। আমি এই দিনের জন্য বেঁচে আছি। নরেন সান্যালের আসার অপেক্ষায় বেঁচে আছি। নরেন আমার বন্ধু। আমরা একসঙ্গে খেলেছি, একসঙ্গে স্কুলে গেছি, একই ক্লাসে একই স্কুলে পড়েছি। জাহের আলি মাস্টারের এই কথাগুলো খুব স্বাভাবিক বলেই মনে হয়। কারণ, স্বাধীনতার পরও বেশ কয়েকঘর হিন্দু ছিল এই গ্রামে। একঘর একঘর করে যেতে যেতে বছর বিশেক আগেই যাওয়া শেষ। কিছুক্ষণ দম নিয়ে জাহের আলি মাস্টার ফের এই কথাগুলো বলতে শুরু করে, নরেন সান্যালের বাবা খগেন সান্যাল তার বাবার ন্যাংটোকালের বন্ধু ছিলেন। দেশভাগাভাগির পরে, এই দেশ পাকিস্তান হয়ে যাওয়ার কিছুদিন পরেই নরেন সান্যালের মা মারা গেল। যে-রাতে গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে গেল, সে-রাতে তার বাবাকে বাড়ি ডেকে নিয়ে খগেন সান্যাল বলেছিলেন, এই বাড়ি তোমার জিম্মায় রেখে গেলাম। আমার চৌদ্দ-পুরুষের সোনার অলঙ্কারভর্তি একটা পিতলের কলস আমার ভিটার মাটির নিচে লুকিয়ে গেলাম। খালি হাতে চলে যাচ্ছি। তুমি ছাড়া আর কাউকে বলে যাইনি। দেশভাগ আমার কলিজাটা দুভাগ করে ফেলছে। একভাগ এখানে রেখে গেলাম। দেশে আর ফিরতে পারি কিনা ভগবান জানে! নিজের দেশ থেকে চোরের মতো পালিয়ে যাচ্ছি!

জাহের আলি মাস্টার দ্বিতীয়বারের মতো দম নিল। প্রার্থনার ভঙ্গিতে আকাশের দিকে মুখ করে কিছু একটা ভাবল অথবা এমনও হতে পারে দীর্ঘদিনের কাঙ্ক্ষিত প্রার্থনা সেরে নিল।

বন্ধু নরেনের হাত ধরে বুক টান করে সাবলীলভাবে পা ফেলে সামনে এগিয়ে চলে জাহের আলি মাস্টার, তার পেছনে গ্রামের নারী, পুরুষ, ছোট-বড় সব বয়সের মানুষ হাঁটে মিছিলের মতো। ওরা যখন বাঁশঝাড়টির সামনে পৌঁছায়, ঠিক তখনই জাহের আলি মাস্টারকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে নরেন সান্যাল। প্রথমে বাঁশঝাড়টির ভেতরে প্রবেশ করে জাহের আলি মাস্টার, তার পেছনে নরেন সান্যাল, তার পেছনে তার ছেলে ও দুই কন্যা। বাঁশঝাড়ের চারদিকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা গ্রামের মানুষ ধীরে ধীরে গোল হয়ে আসে, হাত ধরাধরি করে দাঁড়ায়।

বাঁশ, গাছগাছালি, লতাপাতার বাঁধা ডিঙিয়ে ভিটার ওপরে পৌঁছতে বেশ সময় লেগে গেল। নরেন সান্যাল ঠিক সেই স্থানটিতে গিয়ে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে গেল, যেখানে সোনার গহনাভর্তি পিতলের কলসটি পোঁতা আছে। জাহের আলি মাস্টার বিস্ময়ের চোখে তাকালে আঙুল উঁচিয়ে সে বলে, ওই যে, মোটা বাঁশটা দেখছো না জাহের, ওখানে ছিল আমার মায়ের পূজার ঘর। তুমি ভুলে গেছো, পিঠ ফিরিয়ে অন্য একটি বাঁশ দেখিয়ে বলে, ওখানে আমরা মার্বেল খেলতাম। আমি কিছুই ভুলিনি জাহের। হামাগুড়ি দিয়ে উপুড় হয়ে একমুঠো মাটি হাতে নিয়ে নরেন সান্যাল বলে, এ আমার বাস্ত্তভিটার মাটি। এই মাটির গন্ধ আমার শরীর থেকে কখনোই যায়নি। তাই আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি, এবার ছেলেমেয়েদের চোখের দিকে তাকিয়ে কিছু একটা বলার চেষ্টা করে থেমে গিয়ে বলে, আমি আর কলকাতা ফিরছি না। ওরা ফিরে যাক। এখানে একটা ঘর বানিয়ে নেব। এই ভিটায় আমার ঠাকুরদাদা আছে, ঠাকুরমা আছে, মা আছে, আমার শৈশব-কৈশোর আছে, জীবনের আর বাকি কটা দিন এখানেই থাকব। আশি বছরের পরে আর কয় বছর থাকে মানুষের জীবনের। এদেশে জন্মেছি, এদেশেই মরতে চাই। দেশ কোনোদিন পর হয় না, বিদেশ কোনোদিন নিজের দেশ হয় না। পারবে না জাহের আমার মুখাগ্নি করতে? তোমার ছেলেরা তো আমারই ছেলে, ওরাই না হয় করবে।

দুজন লোলচর্ম বৃদ্ধ পরস্পরকে জড়িয়ে ধরে শিশুর মতো কাঁদে।