অনুবাদ-কলা : দুটি সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা

লেখক: হাসান ফেরদৌস

এক

বাংলার বাইরে কবি হিসেবে রবীন্দ্রনাথের পরিচয় প্রধানত তাঁর নিজের করা ইংরেজি অনুবাদের জন্য। যে সরল ও নিরাভরণ ইংরেজি কবিতা পাঠের পর ইয়েটস একসময় তাঁর গীতাঞ্জলির পা-ুলিপি হাতে নিয়ে উদ্ভ্রামেত্মর মতো ঘুরে বেড়িয়েছেন, সেই তিনিই পরবর্তীকালে ব্যঙ্গ করে বলেছিলেন, রবীন্দ্রনাথ ইংরেজি জানেন না। শুধু রবীন্দ্রনাথ কেন, কোনো ভারতীয়ই ইংরেজি জানে না। বিশ শতকের আরেক কবি ফিলিপ লারকিন রবীন্দ্রনাথের কবিতার প্রতি নিজের মনোভাবকে আরো সুনির্দিষ্ট করে তিরস্কারের ভাষায় বলেছিলেন, ‘ফাক টেগোর’। নবোকফ, রুশ থেকে ইংরেজিতে অনুবাদের জন্য যাঁর যোগ্যতা ও সাফল্য প্রশ্নাতীত, তিনি রবীন্দ্রনাথ, টমাস মান ও রোমা রোঁলাকে এক কাতারে ফেলে ঢালাওভাবে ‘ফরমিডিবল মিডিওক্রিটি’ অর্থাৎ অতি সাধারণ – বলে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন।

কোনো কবি বা লেখককে যদি শুধু তাঁর অনুবাদের মাধ্যমে টিকে থাকতে হয়, তাহলে পুশকিন, গ্যেটে, বোদলেয়ার বা নেরুদা আমাদের কাছে হয় বড়জোর তাঁদের কাব্যকীর্তির ‘দুর্বল অনুকরণ’ অথবা মহান অথচ অপাঠ্য কবি হিসেবেই পরিচিত হতেন। এঁরা যে হননি তার বড় কারণ কবি হিসেবে এঁরা যাঁর যাঁর নিজের ভাষার শ্রেষ্ঠ শিল্পী হিসেবে শুধু স্বীকৃতই নন, গভীর ভালোবাসায় সিঞ্চিত। যেমন আমাদের রবীন্দ্রনাথ। অনুবাদে কী প্রকাশিত হলো তাতে ফারাক সামান্যই হয়, কারণ মূলে রবীন্দ্রনাথ তাঁর পাঠকদের অনন্ত আনন্দের উৎস। একই কথা নেরুদা সম্বন্ধে, যাঁর প্রেমের কবিতা লাতিন আমেরিকার সব বয়সী পাঠককে এখনো সমানভাবে আকৃষ্ট করে। এলিয়ট ঠিকই বলেছেন, একজন কবির প্রধান আনুগত্য তাঁর নিজের ভাষার প্রতি, তাঁর কাজ সে-ভাষার সংরক্ষণ ও সম্প্রসারণ। রবীন্দ্রনাথ অথবা নেরুদা ঠিক সে-কাজটি তাঁদের পরবর্তী প্রজন্মের জন্য করে গেছেন।

এ-কথার অর্থ এই নয়, অনুবাদ অর্থহীন অথবা অপ্রয়োজনীয়। বরং পৃথিবীর সাহিত্যের সঙ্গে সংযুক্ত হওয়ার জন্য – অথবা আমাদের সাহিত্য পৃথিবীর কাছে পৌঁছে দিতে – অনুবাদ ভিন্ন আমাদের অন্য কোনো আশ্রয় নেই। রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে যে এখনো মাঝেমধ্যে বাঙালির মনে হ্রস অথবা দীর্ঘশ্বাস শোনা যায়, তা তো এই কারণে যে, এই মহান লেখকের যোগ্য অনুবাদ আজো লিখিত হলো না।

লিখিত হয়নি তার সম্ভবত একটি প্রধান কারণ এক ভাষা থেকে অন্য ভাষায় যে-কোনো রূপান্তর বড়জোর মূল রচনার ‘দুর্বল অনুকরণ’। প্রতিটি ভাষার নিজস্ব আবহ বা মেজাজ রয়েছে – যেমন প্রকৃতির রয়েছে নিজস্ব রোদ, বৃষ্টি ও তাপ – যা কখনো অন্য ভাষায় রূপান্তর সম্ভব নয়। মার্কিন অধ্যাপক বার্টন রাফায়েল মনে করিয়ে দিয়েছেন, এমন দুটো ভাষা নেই যার ফনোলজি বা ধ্বনিবিজ্ঞান অভিন্ন। কোনো দুই ভাষা নেই যার সাংস্কৃতিক ইতিহাস অভিন্ন, সে-কারণে এক ভাষা থেকে অন্য ভাষায় তার সাংস্কৃতিক চরিত্র – রাফায়েলের ভাষায় ‘লিটারেরি ফর্ম’ – পুনরুদ্ধার সম্ভব নয়। আর তা সম্ভব নয় বলেই অনুবাদে যা অর্জন সম্ভব তা বড়জোর মূলের একটি ভাষান্তর, বাঙালি অনুবাদক রাধা চক্রবর্তী রবীন্দ্রনাথ প্রসঙ্গেই যাঁকে বলেছেন ‘ইন্টারপ্রিটেশন’। ঠিক একই কথা বলেছেন ইংরেজ লেখক থিয়োডোর সাভোরি। তাঁর কথায় ‘দোভাষী’ হিসেবে অনুবাদকের কাজ ‘মূল লেখক ও তাঁর পাঠকদের মধ্যে একটি সেতুবন্ধের দায়িত্ব পালন।’ এই কারণে একই রচনা ভিন্ন ভিন্ন অনুবাদকের হাতে স্বতন্ত্র রূপান্তর অর্জন করে। কবি শঙ্খ ঘোষ এই সীমাবদ্ধতার স্বীকৃতি হিসেবে প্রস্তাব করেছিলেন অনুবাদকে ‘অনুসর্জন’ বলাই অধিক সংগত।

ইংরেজ অধ্যাপক লরেন্স ভেনুতি এই ভিন্নতার কথা মাথায় রেখে স্ক্যান্ডালস অব ট্রান্সলেশন গ্রন্থে অভিমত দিয়েছেন, অনুবাদক যতই বলুন তিনি নিজের অনুবাদের মাধ্যমে মূল রচয়িতার কণ্ঠস্বর উদ্ধারে ব্রতী হয়েছেন, আসলে তিনি যা করেন তা মূলের আলোকে সম্পূর্ণ নতুন একটি রচনা নির্মাণ। এজরা পাউন্ড অথবা ইয়েটস যে রবীন্দ্রনাথের গীতাঞ্জলি পড়ে বিস্মিত ও বিমুগ্ধ হয়েছিলেন তার কারণ অনুবাদে নয়, মূল ইংরেজিতেই তাঁরা সে-গ্রন্থভুক্ত কবিতাসমূহ পাঠ করেছিলেন। মনে রাখা ভালো, ইংরেজি ভাষার কবি হিসেবেই  রবীন্দ্রনাথ সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন।

পাউন্ডের কথা যখন উঠল, তখন এই বদমেজাজি মার্কিন কবির নিজের অনুবাদের কথা মনে করা যাক। ১৯১৩ সালে, যখন রবীন্দ্রনাথের গীতাঞ্জলির একগুচ্ছ কবিতা তাঁর হাত ধরে শিকাগোর পোয়েট্রি পত্রিকায় মুদ্রিত হয়েছে, প্রায় সেই সময় তাঁর হাতে আসে আর্নেস্ট ফেনোলসার লেখা চীনা কবিতার ওপর সংক্ষিপ্ত আলোচনা ও অনুবাদ। সেই নোটের ভিত্তিতে দুই বছর ঘষামাজার পর মোট ১৪টি অনূদিত চীনা কবিতা ‘ক্যাথে’ এই নামে তিনি প্রকাশ করেন। আমরা অধিকাংশই চীনা ভাষা জানি না। ফলে সে-কবিতা আদতে কতটুকু মূলানুগ, তা উদ্ধার আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। কিন্তু চীনা ভাষাবিদের অভাব নেই, তাঁদের মধ্যে যাঁরা এই কবিতা মূলের সঙ্গে মিলিয়ে দেখেছেন, তাঁদের সবার অভিন্ন মত – পাউন্ড অনুবাদ নয়, ইংরেজি ভাষায় চীনা ভাবধারাভিত্তিক নতুন কবিতা লিখেছেন। এমনকি এলিয়ট, যাঁকে পাউন্ড নিকট-বন্ধু জ্ঞান করতেন, তিনিও এই কবিতার চৈনিক চরিত্র নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। তিনি পাউন্ডকে ইংরেজি ভাষায় চীনা কবিতার আবিষ্কারক বলে বাহবা দিয়েছেন বটে; কিন্তু এমন কথাও বলেছেন, এখন না হোক, পরে কোনো একসময় এই কবিতা অনুবাদ নয়, বরং ‘বিশ শতকের নিজস্ব চমৎকার কাব্যকীর্তি’ হিসেবেই নন্দিত হবে। অর্থাৎ, অধ্যাপক জন উইলিয়ামসের কথা ধার করে বলতে পারি, পাউন্ডের সেই চীনা কবিতায় খুব সামান্যই চীন রয়েছে।

অনুবাদে ‘স্ক্যান্ডালে’র উদাহরণ হিসেবে ভানুতি পাউন্ডের চীনা অনুবাদের যে-কথা উল্লেখ করেন, তাঁর তাত্ত্বিক ভিত্তিতে ছিল ঔপনিবেশিক ও উপনিবেশের আদি জনগণ – কলোনিয়াল ও কলোনাইজড – এই দুইয়ের মধ্যে বিদ্যমান আততিকে কেন্দ্র করে। ইংরেজি ঔপনিবেশিক ভাষা, চীনা সে-উপনিবেশের আদি বাসিন্দাদের ভাষা। একটি ক্ষমতার কেন্দ্র, অন্যটি সে-ক্ষমতার প্রান্তসীমা। অনুবাদের মাধ্যমে প্রান্তবর্তী ভাষার নিজস্বতা লোপ পায় ও তা অধিক ক্ষমতাবান কেন্দ্রীয় ভাষার নিজস্বতার অন্তর্গত হয়। এটি ভানুতির বিবেচনায়, অনূদিত ভাষা ও সাহিত্যের ‘ডোমেস্টিকেশন’ বা স্থানীয়করণ।

কেন্দ্রীয় ক্ষমতার হাতে প্রান্তবর্তী ভাষা ও সাহিত্য কীভাবে স্বদেশিকরণের শিকার হয় পাউন্ডের ‘ক্যাথে’র চেয়েও অধিক ‘উজ্জ্বল’ উদাহরণ ফিটসজিরাল্ডের ওমর খৈয়ামের রুবাইয়াত। এখন আমরা জানি, ফিটসজিরাল্ড যাকে অনুবাদ বলে চালিয়েছেন তার তিন-চতুর্থাংশ চতুর্পদীতে আদৌ কোনো ওমর খৈয়াম নেই, সবই ফিটসজিরাল্ডের মনের মাধুরী। ঔপনিবেশিক প্রভুদের ভাষার মাধ্যমে আমাদের হাতে আসায় তাকেই আমরা এতদিন ধ্রম্নব সত্য বলে জেনে এসেছি।

পাউন্ড কীভাবে চীনা কবিতার স্বদেশিকরণ করেছেন, তার ব্যাখ্যায় অধ্যাপক জন উইলিয়ামস তিনটি প্রবণতার কথা উল্লেখ করেছেন। এক, পাউন্ড চীনা ভাষার লিখন-পদ্ধতিতে এতই মুগ্ধ ছিলেন যে, তার ধ্বনিপ্রকরণ সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে লিখিত কবিতার দৃশ্যমানতার – পাউন্ড যাকে ‘ইডিওগ্রাফ’ হিসেবে জানতেন – ওপর নির্ভরশীল ছিলেন। চীনা ভাষা তিনি জানতেন না, ফলে আক্ষরিক অনুবাদের পাশাপাশি ওই দৃশ্যমানতা ছিল তাঁর অনুবাদের রসদ। দুই, তিনি কেবল সেসব কবিতাই অনুবাদের জন্য বাছাই করতেন, যা তাঁর ভালো লাগত বা তাঁর প্রয়োজন মেটাত। এবং তিনি মাঝেমধ্যে এতটা অনুপ্রাণিত বোধ করতেন যে, মূল কবিতা ছেড়ে নিজ ব্যাখ্যায় ও কাব্যান্বেষণে আত্মমগ্ন হতেন। অন্য কথায় অন্যের কবিতায় নিজের মনের মাধুরী মেশাতেন। (বিস্তারিত দেখুন :

আর জন উইলিয়ামস, ওরিয়েন্ট অ্যান্ড ওরিয়েন্টালিজমস

ইন ইউএস-আমেরিকান পোয়েট্রি অ্যান্ড পোয়েটিঙ, পিটার ল্যাং পাবলিশিং গ্রম্নপ,  বার্লিন  ২০০৯,  পৃ ১৪৫) এর সঙ্গে তুলনীয় ভস্নাদিমির নবোকফের সুপরিচিত ‘আর্ট অব ট্রান্সলেশন’ প্রবন্ধে উলিস্নখিত অনুবাদের তিন ‘ইভিল’ বা অশুভ লক্ষণ : জ্ঞানের ও বোধের অজ্ঞতা, অস্বচ্ছ অথবা অশস্নীল এই বিবেচনায় ইচ্ছাকৃত

বিকৃতি এবং কল্পিত পাঠকের কথা মাথায় রেখে ভাব ও ভাষার অহেতুক অলংকরণ।

পরিহাসের মতো শোনাবে, আমাদের  রবীন্দ্রনাথ নিজেও যখন গীতাঞ্জলির কবিতা অনুবাদ করেন, অনেক ক্ষেত্রে তিনিও ঠিক একই ইচ্ছাকৃত অপরাধের শিকার হন। তাঁর ক্ষেত্রে অবশ্য এই অনুবাদকে ভানুতি-চিহ্নিত কেন্দ্রের হাতে প্রান্তবর্তীর ‘স্থানীয়করণ’ বলা অন্যায় হবে। কাজটি ঘটেছে প্রান্তবর্তীর হাতে কেন্দ্রভুক্ত হওয়ার প্রাণান্ত ইচ্ছার কারণে। পরে, অনেক পর – যখন সত্যি সত্যি বড্ড বিলম্ব হয়ে গেছে – রবীন্দ্রনাথ তাঁর চেষ্টার অর্থহীনতা স্বীকার করেছিলেন। এখানে সে-আলোচনা অবান্তর।

বাংলা থেকে ইংরেজি অনুবাদে রবীন্দ্রনাথের যে-সীমাবদ্ধতা, ইংরেজি থেকে বাংলায় অনুবাদের ক্ষেত্রে তা একদমই নেই। অনুবাদের কাজটিকে তিনি শিক্ষকের দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। ইংরেজির সাহায্যে ফরাসি, চীনা ও ইতালীয় ভাষার কবিতাও তাঁর হাত দিয়ে আমরা পেয়েছি। ১৯১৭ সালে শান্তিনিকেতনের শিক্ষার্থীদের জন্য তিনি অনুবাদ-চর্চা এই নামে একটি পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থ রচনা করে অনুবাদ-কলার চ্যালেঞ্জসমূহ

হাতে-কলমে বোঝানোয় ব্রতী হয়েছিলেন। গদ্য-পদ্য দু-ধরনের লেখাই সে-গ্রন্থে উদাহরণ হিসেবে সংকলিত হয়েছিল। কবিতা অনুবাদের কাজটি যান্ত্রিক নয় – শুধু শব্দান্তর দ্বারা কাব্যের মৌল চরিত্র উদ্ধার সম্ভব নয়, সে-কথা বোঝানোর জন্য তিনি নীরেন্দ্রনাথ রায়-অনূদিত শেলির একটি কবিতা সংস্কার করে দিয়েছিলেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, মূল কবিতার প্রতি সুবিচার করতে হলে কবির ভাবেচ্ছা – তাঁর ইনটেন্ট – অনুধাবন করতে হবে। আবার ‘নিশিদিন ভরসা রাখিস, ওরে মন হবেই হবে’, এই গানটির ইংরেজি অনুবাদের ব্যাপারে  রবীন্দ্রনাথ নিজেই পরামর্শ দিয়েছিলেন, ‘ভরসা’ শব্দের প্রতিশব্দ দুটি – courage I expectation। কিন্তু এখানে ওই দুই শব্দের একটিও চলবে না। তখন বলতে হবে, Keep firm thy faith, my heart, it must come to happen.

ভাবেচ্ছা বা ইন্টেন্ট ব্যাপারটি রবীন্দ্রনাথ কতটা গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করেছিলেন তা বোঝানোর জন্য কবিগুরু-অনূদিত ‘ডে প্রফান্ডিস’ কবিতার কথা ভাবা যাক। কবিতাটির লেখক ইংরেজ রোমান্টিক কবি আলফ্রেড টেনিসন। আমরা জানি রবীন্দ্রনাথ ইংরেজি ভাষার রোমান্টিক ধারার কবিদের দ্বারা ভীষণভাবে প্রভাবিত ছিলেন। তাঁর কাছে এই কবিতার অনুবাদ ছিল বিগত শতকের এক নমস্য কবির প্রতি গুরুদক্ষিণা। কবিতাটি ইংরেজ

লেখক-সমালোচকদের কাছে কদর পায়নি। বাংলাদেশেও পাঠককুল পশ্চিমা প–তদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে এই কবিতাকে অপাঙ্ক্তেয় জ্ঞানে তা হেলায় প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। তাঁরা ভুল – এ-কথা প্রমাণের জন্য একই নামে এক নাতিদীর্ঘ প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ কবিতাটি কেন ব্যতিক্রমী তার সবিস্তার ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর কথায়, টেনিসনের সমসাময়িক পাঠক-লেখক-বুদ্ধিজীবীদের কাছে এই কবিতাটি কদর পায়নি, যদিও কবিতাটির বিবেচ্য বিষয় অত্যন্ত গভীর, গুরুতর। ‘ইহাতে এমন কতকগুলি ভাব আছে যাহা সাধারণত ইংরেজরা বুঝিতে পারেন না, আমরা সে-সকল ভাব যথার্থ বুঝিবার উপযুক্ত।’ তাঁর প্রথম পুত্র হাল্লামের জন্মে উলস্নসিত কবি ১৮৫২ সালে কবিতাটি লিখেছিলেন মুখ্যত নবজাতককে পৃথিবীতে সাদর আমন্ত্রণ হিসেবে। কবির কাছে এটি ছিল এক গভীর আত্মিক অভিজ্ঞতা, যা সমকালীন লেখক-সমালোচকদের কাছে হাস্যকর ঠেকেছিল। ম্যাথু আর্নল্ড এই কবিতা লেখার জন্য টেনিসনকে গারদে আটকে রাখার প্রস্তাব করেছিলেন। বাঙালি কবি স্পষ্টতই এই মূল্যায়নের সঙ্গে একমত নন। তাঁর চোখে এই কবিতার যে গভীর ভাব তা শুধু তাঁর মতো ভাবুক কবির চোখেই পড়া সম্ভব। ‘সদ্যোজাত শিশুর মধ্যে একটি অপরিসীম মহান ভাব, অপরিমেয় রহস্য আবদ্ধ আছে, টেনিসন তাহাই প্রকাশ করিয়াছেন – সাধারণ পাঠকেরা তাহা বুঝিতে পারিতেছে না অথবা এই অচেনা ভাব হৃদয়ের মধ্যে আয়ত্ত করিতে পারিতেছে না।’

এই গভীর ও প্রচ্ছন্ন ভালোবাসায় আপস্নুত কবি টেনিসনের পুরো কবিতাটি নয়, তার অংশবিশেষ বাংলায় অনুবাদ করেন। কবিতাটি গভীরভাবে ঈশ্বরমুখীন, অন্তিমে একটি প্রার্থনা এই নৈবেদ্যকে আরো তীব্রতর করে। অনুবাদের সময় রবীন্দ্রনাথ ঈশ্বরের প্রতি আত্মসমর্পণের বিষয়টি বিশেষ বিবেচনায় আনেন। গীতাঞ্জলির কবিতা মুখ্যত ঈশ্বরের প্রতি নিবেদিত, অথচ ইংরেজি অনুবাদে এই কবিতায় যে ‘এক্লেজিয়াস্টিক্যাল’ বা যাজকীয় ভাবরস রয়েছে, রবীন্দ্রনাথ তাঁর অনুবাদে সেই ভাব অর্জনে ব্যর্থ হয়েছেন, এই অজুহাতে ইংরেজ কবি রবার্ট ব্রিজেস গীতাঞ্জলির ‘তুমিই আকাশ তুমিই নীড়’ কবিতাটি নতুন করে লেখার প্রস্তাব করেছিলেন। ‘ডে প্রফান্ডিস’ কবিতার বাংলা অনুবাদে শুধু কাব্যের গম্ভীরতাই রক্ষিত হয়নি, এর প্রার্থনামন্ত্রও যথাযথ রক্ষিত হয়েছে।

 

Out of the deep, my child, out of the deep,

Where all that was to be, in all that was,

Whirl’d for a million æons thro’ the vast

Waste dawn of multitudinous-eddying

light –

Out of the deep, my child, out of the deep,

Thro’ all this changing world of changeless

law,

And every phase of ever-heightening life,

And nine long months of antenatal gloom,

With this last moon, this crescent – her

dark orb

Touch’d with earth’s light – thou comest,

darling boy;

Our own;

 

অগণ্য আবর্তমান আলোকের আদিম উষায়

হে মহাসমুদ্র মাঝে ভবিতব্য ভূতগর্ভতলে

হতেছিল ভ্রাম্যমাণ প্রাণিশূন্য লক্ষযুগ ধরি’ –

সেই মহাসিন্ধু হতে, বৎসে মোর, সেই সিন্ধু হতে, –

নিত্য বিধানেতে বাঁধা অনিত্য বিশ্বের মধ্য দিয়া

ক্রমে প্রাণবিকাশের পর্বে পর্বে করিয়া নির্ভর

যাপি দীর্ঘ নয় মাস জন্মপূর্ব গর্ভ অন্ধকারে

গতরাত্রে চন্দ্রোদয়ে – যে-চন্দ্রের ম-লার্ধখানি

হয়েছিল আলিখিত ধরিত্রীর আলোকছায়ায় –

আসিয়াছ, প্রিয় বৎস, আমাদের আপনার ধন।

(রবীন্দ্রনাথ,  কবিতা  সমগ্র,  পঞ্চম খ-,  আনন্দ,  কলকাতা ২০১০, পৃ ১৩৯)

উনিশ শতকীয় কবিতার যে ‘আরকেয়িক’ ভাষা তা অনুসরণ করেও  রবীন্দ্রনাথ টেনিসনের হৃদয়মথিত আনন্দ-আর্তিটুকু এখানে ঠিকই উদ্ধার করেছেন। আর এটা সম্ভব হয়েছিল কবিতার বহিরঙ্গ অতিক্রম করে তার অন্তর্গত আনন্দ ও বেদনার মল্লার ধ্বনিটুকু তিনি ঠিক বুঝতে পেরেছিলেন বলেই। ভারতী পত্রিকায় এক চিঠিতে  রবীন্দ্রনাথ কবিতার বাণী তাঁর কাছে কীভাবে ধরা দেয়, সে-কথা উল্লেখ করে লিখেছিলেন, ‘যে মহা অতীতের মহা-কারখানায় বিশ্বব্রহ্মা–র পূর্বকারণসমূহ অযুত যুগ ধরিয়া সংঘৃষ্ট, একত্রিত, ঘূর্ণিত, বিচ্ছিন্ন হইয়া অবশেষে জগৎরূপে প্রকাশিত হইয়াছে, সেই অনাদি অতীতের রাজ্যে যুগযুগান্তর ধরিয়া গঠিত, পরিবর্তিত, সংস্কৃত হইয়া অবশেষে একটি শিশু আজ পৃথিবীতে আবির্ভূত হইল। কিছুকাল পূর্বে সে কেহই ছিল না, আর আজ পৃথিবীর সহিত আমার সহিত তাহার অতি ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধ হইল। বিষয়টি অতি গভীর, অতি মহান।’

(কবিতা সমগ্র, পৃ ৫৬১)

রবীন্দ্রনাথ থেকে এই দীর্ঘ উদ্ধৃতির একমাত্র কারণ এই কথা স্মরণ করা যে, অনুবাদ – বিশেষত কবিতার অনুবাদ – কিছুতেই একটি স্বয়ংক্রিয় বা মেকানিক্যাল প্রক্রিয়া হতে পারে না। ‘গুগল ট্রান্সলেশনে’ ফেলে আর যাই হোক কবিতার অনুবাদ সম্ভব নয়, কারণ অনুবাদের লক্ষ্য কেবল আক্ষরিক অর্থ উদ্ধার নয়, কবিতায় নিহিত ভাব – কবির কাব্যচিন্তার হৃদস্পন্দন – আবিষ্কার ও উদ্ধার। একমাত্র একজন কবিই পারেন সে-কাজটি সম্পন্ন করতে, রবীন্দ্রনাথের এই কথায় কোনো অতিরঞ্জন নেই।

রুশ কবি গুমিলিওফও একই কথা বলে গেছেন, যদিও তাঁর বক্তব্য আরো কঠোর ও রক্ষণশীল। গুমিলিওফের বক্তব্য ছিল, শুধু একজন কবিই যে কবিতার অনুবাদক হবেন তাই নয়, তাঁকে হতে হবে একজন যত্নশীল অনুসন্ধানী এবং সৎ ও সংবেদনশীল সমালোচক, যিনি সাবধানে মূল কবির প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ বাছাই করবেন এবং প্রয়োজন হলে গুরুত্বপূর্ণ নয় এমন বৈশিষ্ট্য বর্জন করবেন। গুমিলিওফ আরো একটি পরামর্শ দিয়েছেন। অনুবাদককে নিজের ব্যক্তিত্ব ভুলে যেতে হবে, তাঁকে শুধু মূল কবির ব্যক্তিত্বের কথা মাথায় রাখতে হবে। সবচেয়ে ভালো হয় যদি অনুবাদকৃত কবিতা অনুবাদকের নাম বা স্বাক্ষর ছাড়া প্রকাশিত হয়। আমার মনে হয়েছে, শেষেরটি ছাড়া রবীন্দ্রনাথ ‘ডে প্রফান্ডিস’ অনুবাদের ক্ষেত্রে গুমিলিওফের এই পরামর্শসমূহ অক্ষরে অক্ষরে অনুসরণ করেছেন।

এই প্রারম্ভিক আলোচনার উপসংহার হিসেবে এখন আমরা কবিতা অনুবাদের মোদ্দা নীতিমালা নির্দেশ করতে পারি। এ-ব্যাপারে আমাদের পরামর্শদাতা হতে পারেন থিয়োডোর স্যাভোরি। লন্ডনের এই স্কুলশিক্ষক বিজ্ঞানের ভাষা নিয়ে তাঁর গবেষণার জন্য খ্যাতিমান ছিলেন। ল্যাঙ্গুয়েজ অব সায়েন্স নামে একটি গ্রন্থ লিখতে গিয়েই তিনি কাব্যানুবাদের কলাকৌশল নিয়ে আগ্রহী হয়ে পড়েন। তারই ফসল দি আর্ট অব ট্রান্সলেশন। অনুবাদের কোনো ধরাবাঁধা ও সর্বজনস্বীকৃত নিয়মকানুন নেই, কারণ পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ অনুবাদকবৃন্দ এ নিয়ে সর্বসম্মত কিছু বলে যাননি। এই স্বীকৃতি জানিয়ে স্যাভোরি বৈপরীত্যময় ছয় জোড়া নীতিমালার কথা বলেছেন :

১। অনুবাদে মূলের শব্দার্থ রক্ষিত

থাকবে। অনুবাদে মূলের ভাব রক্ষিত থাকবে।

২। অনুবাদ পড়ে মনে হবে যেন মূল কবিতাই পড়ছি। অনুবাদ পড়ে মনে হবে যেন অনুবাদ পাঠ করছি।

৩। অনুবাদে মূল রচনার ‘স্টাইল’ রক্ষিত হবে। অনুবাদে মূলের নয়, অনুবাদকের নিজস্ব ‘স্টাইল’ প্রতিফলিত হবে।

৪। অনুবাদ পড়ে মনে হবে মূল লেখকের সমসাময়িক একটি রচনা পাঠ করছি। অনুবাদ পড়ে মনে হবে অনুবাদকের সমসাময়িক কোনো লেখা পড়ছি।

৫। অনুবাদে মূল লেখার সঙ্গে নতুন শব্দ যোগ বা বিয়োগ সম্ভব। অনুবাদে কখনো নতুন শব্দ যোগ বা বিয়োগ করা  যাবে না।

৬। কবিতার অনুবাদ গদ্যে রূপান্তরিত হতে হবে। কবিতার অনুবাদ কবিতায় রূপান্তরিত হতে হবে।

 

দুই

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে প্রকাশিত বেশকিছু চমৎকার অনুবাদ বই আমাদের হাতে এসেছে। এর মধ্যে কায়সার হকের অনুবাদে পোয়েমস অব শহীদ কাদরী নানা কারণে আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। পঞ্চাশ ও ষাটের দশকের সেরা আধুনিক কবিদের একজন শহীদ কাদরী, নাগরিক অভিজ্ঞতার আলোকে তাঁর কবিতায় যে-পরিশীলিত কণ্ঠস্বর শুনি তা অনেকার্থেই এই কবিকে স্বাতন্ত্র্যম–ত করেছে। পরিহাসপ্রিয়তা, শব্দের পরিমিত ব্যবহার, সামান্য আটপৌরে প্রতীকে এক গভীরতর অর্থ অন্বেষণের

প্রেষণা, দ্ব্যর্থবোধক ইঙ্গিতময়তা, এসবই তাঁর কবিতার পরিচিত অনুষঙ্গ। সর্বোপরি, এসব কবিতায় রয়েছে রাজনৈতিক নীতিবোধ, স্বদেশচেতনা ও কবিতার শক্তিতে অবিচল আস্থা। এই কাব্য কণ্ঠস্বর অর্জনে শহীদ কাদরী কখনো তারস্বরে চিৎকারের কোনো প্রয়োজন দেখেননি, কবিতাকে কখনো ‘স্টেটমেন্টে’র পর্যায়ে নামিয়ে আনেন না, এমনকি যখন তাঁর কবিতার ‘স্টেটমেন্ট’টি চিহ্নিত করা দুর্লক্ষ্য হয়ে ওঠে না, তখনো। এসব কারণে আধুনিক বাংলা কবিতায় শহীদ কাদরী একদম একটি ভিন্ন প্রজাতি। এই কবির কাব্যভাষ্যের মূল চেতনা, তার অন্তর্গত কণ্ঠস্বর, ক্ষুণ্ণ না করে অনুবাদ তাই খুব সহজ নয়। একমাত্র একজন জাত কবি, যিনি উভয় ভাষায় সমান পারঙ্গম, তাঁর পক্ষেই সম্ভব শহীদ কাদরীর এই তীব্র, তীক্ষন, নাগরিক ও নির্জন কবিতাসমূহের নিরাপদ ভাষান্তর। আমাদের সৌভাগ্য, কায়সার হক ঠিক তেমনি একজন কবি ও অনুবাদক।

শহীদ কাদরী, সিলেকটেড পোয়েমস (বেঙ্গল লাইটস বুকস, ঢাকা ২০১৮) শহীদ কাদরীর সমগ্র কবিজীবনের একটি সারসংক্ষেপ। জীবদ্দশায় চারটি ও মৃত্যুর পর একটি, এই সর্বমোট পাঁচটি বই রেখে গেছেন কবি তাঁর উত্তরসূরিদের জন্য। মোট কবিতার সংখ্যা আড়াইশোর বেশি নয়। কায়সার হক এই পাঁচটি বই থেকে মোট ৫৫টি কবিতা নির্বাচন করেছেন। কবির সবচেয়ে পরিচিত ও আলোকিত কবিতাসমূহ এই নির্বাচনের অন্তর্গত, তা থেকে অনুমান করি কায়সার হক ব্যক্তিগত প্রাধান্যের বাইরে কবির পাঠকদের নির্বাচনকেও কদর দিয়েছেন। শহীদ কাদরীর দু-একটি কবিতা আমার কাছে মনে হয়েছে কার্যত অনুবাদ-অসম্ভব। কায়সার হক তাদেরও বাদ দেননি। তা থেকে মনে হয় এটি অগ্রজ কবির প্রতি তাঁর ব্যক্তিগত শ্রদ্ধাঞ্জলিও বটে। পরবর্তী প্রজন্ম যেন এই কবিকে তাঁর সেরা কাব্যকীর্তির জন্য মনে রাখে, কায়সার হকের নির্বাচন থেকে সে-আস্থা জন্মায়।

মূল বাংলার কথা মনে না রেখে যদি শুধু ইংরজি কবিতাগুলি পড়ি, তাহলে এসব কবিতার অনাড়ম্বরতা অথচ প্রবল দৃশ্যমানতা, সর্বোপরি ভাব ও ভাষার পূর্ণ স্বতঃস্ফূর্ততা আমাদের মুগ্ধ না করে পারে না। শহীদ কাদরী আটপৌরে ভাষায় অভ্যস্ত ছিলেন, আমাদের চেনা ভাষা ও চেনা শব্দের পৃথিবী, তাকেই তিনি বিশিষ্টতা প্রদান করতেন। কায়সার হক শহীদ কাদরীর সেই ‘অকৃত্রিম ব্যগ্রতা’ উদ্ধার করেছেন নিষ্ঠায় ও নিরাপদ স্বাচ্ছন্দ্যে। উদাহরণ হিসেবে এই কয়েকটি লাইনের দিকে নজর দেওয়া যাক।

Deep within the flesh

in each one of us

lives a singing bird.

One day

it abruptly takes wing

in a fresh breeze

and flies away,

perhaps to perch

on the bench

of another

lush green tree. Our death occurs.

 

‘ডেথ’ নামের এই সামান্য কয়েক লাইনের কবিতাটি স্মরণীয় একদিকে তার পরিমিতি ও বাহুল্যহীনতার জন্য – ইংরেজিতে যাকে বলা হয় ব্রেভিটি – এবং অন্যদিকে তার নির্জন পরিভবতার জন্য। মৃত্যু একটি পরিবৃত্তি মাত্র, এক অনাস্থায়ী-অনিত্য জীবনধারণ থেকে স্থায়ী ও নিত্যের পানে যাত্রা। সে কি কেবলই বেদনার ও বিচ্ছেদের? অবশ্যই, কিন্তু বিদায়ের সঙ্গে যুক্ত থাকে ভিন্ন এক যাত্রার অপরিজ্ঞাত সম্ভাবনা। সেজন্যই ‘ফ্রেশ ব্রিজ’ ও ‘লাশ গ্রিন ট্রি’। মূল কবিতাটির সঙ্গে অপরিচিত হয়ে এই রূপান্তরটিকে অনায়াসে একটি চমৎকার কবিতা হিসেবে গ্রহণে আমাদের কোনো আপত্তি থাকে না।

ইংরেজি অনুবাদের ক্ষেত্রেও কায়সার হক শহীদ কাদরীর কবিতার অন্তর্গত স্বরটি উদ্ধার করেন লক্ষণীয় সাফল্যের সঙ্গে। সাংস্কৃতিক ব্যবধান অতিক্রম করে মূল কবিতার গতি ও ধাবমানতা পুনর্নির্মাণে তাঁর সাফল্য ঈর্ষণীয়।

Sudden panic sends colorful homebound

crowd –

even the drowsy ones among them –                                                                         scuttling

like scared red roaches every which way

as if someone in cold forbidding tones,

tolling familiar bells,

had come to warn of imminent plague,

emptying homes and city spares.

 

সহসা সন্ত্রাস ছুঁলো। ঘরে ফেরা রঙিন সন্ধ্যার ভিড়ে

যারা ছিল তন্দ্রালস দিগ্বিদিক ছুটল, চৌদিকে

ঝাঁকে ঝাঁকে লাল আরশোলার মতো যেনবা মড়কে

শহরে উজাড় হবে, – বলে গেল কেউ – শহরের

পরিচিত ঘণ্টা নেড়ে নেড়ে খুব ঠান্ডা এক ভয়াল গলায়

(‘Rain Rain’/ ‘বৃষ্টি বৃষ্টি’)

শহীদ কাদরীর এই সুপরিচিত কবিতাটির দুটি লক্ষণীয় বৈশিষ্ট্য : আসন্ন দুর্যোগের চিত্র নির্মাণে শহুরে আটপৌরে ইমেজারির ব্যবহার, এবং একই সঙ্গে উদ্বেগ ও প্রত্যাশার বিপরীতমুখী আবহ নির্মাণ। উভয় বৈশিষ্ট্য প্রতিষ্ঠায় একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান গতি। ‘জল, জল, জল/ তীব্র, হিংস্র/ খল।’ কায়সার হকের অনুবাদে এই বৈশিষ্ট্য রক্ষিত হয়েছে, এ-কথায় কোনো সন্দেহ নেই।

প্রমাণ হিসেবে প্রথমে মূল কবিতাটি ও পরে তার অনুবাদ পাঠ করা যাক :

এবং হঠাৎ

সুগোল তিমির মতো আকাশের পেটে

বিদ্ধ হলো বিদ্যুতের উড়ন্ত বলস্নম!

বজ্র-শিলাসহ বৃষ্টি, বৃষ্টি। শ্রম্নতিকে বধির করে

গর্জে ওঠে যেন অবিরল করাত-কলের চাকা,

লক্ষ লেদ-মেশিনের আর্ত অফুরন্ত আবর্তন।

 

And then

a flying harpoon of lightning rips through

the rounded whale’s belly of the sky,

Deafening thunder and hail and rain

as if circular saws had roared into ceaseless

motion

while a million lathes let out a whine of

torment.

এককথায় অপূর্ব!

এই সাফল্য সত্ত্বেও কোনো কোনো ক্ষেত্রে কবির ‘ইনটেন্ট’ পুরোপুরি রক্ষিত হয়েছে, আমার তা মনে হয়নি। উদাহরণ হিসেবে এই কবিতার নামকরণ ধরা যাক। ‘বৃষ্টি বৃষ্টি’ কবিতায় অবিরল বৃষ্টির কথা থাকলেও এটি অলস সন্ধ্যায় মন্থর বর্ষণের গল্প নয়। এটি এক পস্নাবনের গল্প, যে-পস্ন­vবনে দূর হবে নগরের ক্লেদ ও সকল বর্জ্য, পালাবে ‘রাজস্ব আদায় করে যারা, চিরকাল গুনে নিয়ে যায়’ তারা। তাদের স্থলে রাজত্ব গড়বে বাউন্ডুলে ও লক্ষ্মীছাড়া, উন্মূল, উদ্বাস্ত্ত ভিক্ষুক, চোর ও অর্ধ-উন্মাদের দল। অন্যত্র শহীদ কাদরীর এই

পস্ন­vবনকে আমি একাত্তরের সঙ্গে তুলনা করেছি। ‘এই কবিতায় তিনি স্বদেশকে দেখেছিলেন ক্লেদময়, অপ্রসন্ন ও বিপন্ন এক অভিজ্ঞতা হিসেবে, যে ঊষর অথচ পরিবর্তনের সম্ভাবনায় উন্মুখ। এখানে বর্ষণের প্রতীকে বিপস্ন­বের মানচিত্র নির্মাণ করেছিলেন কবি।’ ফলে, এই কবিতার শিরোনাম বাংলায় ‘বৃষ্টি বৃষ্টি’ যে দ্যোতনা বহন করে, ইংরেজিতে ‘Rain rain’ তা বহন করে না বলেই আমার কাছে মনে হয়েছে। বরং, ‘Rain rain go away, come again another day’ এই নার্সারি রাইমটি আমাদের মাথায় থাকায় কবি যে-দ্যোতনা প্রতিষ্ঠায় প্রাণিত ছিলেন, ঠিক তার বিপরীত ঘটে।

অন্য সমস্যা, কায়সার হক এই কবিতায় কখনো কখনো বাক্য সংকোচন করেছেন, শব্দ বিসর্জন দিয়েছেন বা ইচ্ছাকৃত ভুল অনুবাদ করেছেন। এই বাক্যসমূহ লক্ষ করুন :

ভেসে যায় ঘুঙুরের মতো বেজে সিগারেট-টিন

ভাঙা কাঁচ সন্ধ্যার পত্রিকা আর রঙিন বেলুন

মসৃণ সিল্কের স্কার্ফ, ছেঁড়া তার, খাম নীল চিঠি

 

কায়সার হকের অনুবাদে তা পরিণত হয় :

a cigarettetin floats by with a sound like

tambourines,

and broken glass, torn wire, envelopes

blue air letters’

 

ঘুঙুরের ভাষান্তরে ‘ট্যাম্বুরিন’ হয় কিনা, সে-বিতর্ক ভিন্ন, কিন্তু ‘ঘুঙুর’ ব্যবহারের পেছনে যে সাংস্কৃতিক মানচিত্র নির্মাণ কবির লক্ষ্য তা পুরোপুরি হারিয়ে যায়। এই বাক্যের পরের অংশ, ‘রঙিন বেলুন/ মসৃণ সিল্কের স্কার্ফ’ পুরোপুরি অনুপস্থিত। এমন বর্জন কতটা ইচ্ছাকৃত, কতটা অনবধানতা, আমাদের পক্ষে উদ্ধার সম্ভব নয়।

আমি আগে উল্লেখ করেছি, কবিতার অনুবাদ শুধু অক্ষর গুনে গুনে পালটা শব্দ জুড়ে দেওয়া নয়। অনুবাদকের একটি প্রধান লক্ষ্য থাকে সেই শব্দের পেছনে কবির ‘ইনটেন্ট’, তাঁর ইঙ্গিতময়তা উদ্ধার। শহীদ কাদরীর সবচেয়ে পরিচিত কবিতা, ‘তোমাকে অভিবাদন, প্রিয়তমা’; কায়সার হক এই শিরোনামের অনুবাদ করেছেন ‘Greetings, Dearest’। আমরা জানি শহীদ কাদরীর এই কবিতাটি মার্কিন কবি এড্রিয়ান হেনরির ‘ডোন্ট ওয়ারি/ এভরিথিং ইজ গোয়িং টু বি অলরাইট’ কবিতা দ্বারা অনুপ্রাণিত। গঠনগতভাবে আপাত-নৈকট্য সত্ত্বেও কবিতাদুটির বিবৃত উচ্চারণ সম্পূর্ণ ভিন্ন – হেনরির কবিতাটি কিছুটা চতুর ও ভাবালুতাময় হাইস্কুল ছাত্রের প্রেমের কবিতা, শহীদ কাদরীর কবিতাটি স্বদেশের প্রতি আবেগ ও আনুগত্যের বল্গাহীন উচ্চারণ। সেই কারণে ‘অভিবাদনের’ শব্দান্তর ‘গ্রিটিংস’ হয় না বলে আমার কাছে অনুমিত হয়েছে। অনুবাদের শরীরে কায়সার অভিবাদনের শব্দান্তর ‘স্যালুট’ ব্যবহার করেছেন, শিরোনামে যার ব্যবহার অধিক সংগত হবে বলে মনে হয়।

কবির অভিমত প্রসঙ্গে আরো একটি উদাহরণ নেওয়া যাক। ‘সংগতি’ কবিতাটি শহীদ কাদরীর কবিতার দ্ব্যর্থবোধকতার একটি চমৎকার উদাহরণ। এই কবিতার অন্তিম বাক্যদ্বয় এবং তার অনুবাদ এরকম :

প্রেমিক মিলবে প্রেমিকার সাথে ঠিক-ই

কিন্তু শান্তি পাবে না, পাবে না, পাবে না

 

Lovers will have their tryst alright

But never, never, never find peace …

এই শব্দান্তর মূলের প্রতি বিশ্বস্ত, কিন্তু কবির অভিমতির প্রতি তা কি ন্যায়বিচার করেছে? বাংলায় কবি যাকে ‘শান্তি’ বলেছেন, তা কি আটপৌরে, নির্ভেজাল গার্হস্থ্য-শান্তি, নাকি গভীরতর ইঙ্গিতবাহী এক ভিন্ন অনুভূতি, যাকে আমরা সুখ, অথবা প্রসন্নতা বলে উল্লেখ করতে পারি, যার সঠিকতর অর্থান্তর, এই আলোচকের বিবেচনায় জয়

অথবা হ্যাপিনেস। কবি জয় গোস্বামী আমাকে একসময় বলেছিলেন, ‘এ হলো কবির অভিশাপ’। এ ব্যাখ্যায় – কাব্যিক ‘ইন্টারপ্রিটেশনে’ – আমরা দ্বিমত পোষণ করতে পারি, কিন্তু মূল কবিতার পুনঃপুন পাঠ আমাদের এই চিন্তায় উৎসাহী করে যে, কবি শান্তি নয়, সুখের কথাই বলেছেন।

 

তিন

ইংরেজির বাইরে অন্য ভাষায় আমাদের জ্ঞান সীমিত, ফলে অনেক ক্ষেত্রেই অনুবাদের জন্য আমরা মূল ভাষার বদলে ইংরেজির আশ্রয় নিই। এতে সমস্যা হয়, এক বা তার অধিক ভাষার হাত ঘুরে ভাষান্তরিত হলে মূলের ভাবরস কিয়দংশ হলেও ক্ষুণ্ণ হতে বাধ্য। সম্প্রতি মোরশেদ শফিউল হাসানের অনুবাদে লোরকার একগুচ্ছ কবিতা পড়ার সুযোগ হয়েছে (লোরকার কবিতা, মাওলা ব্রাদার্স, ঢাকা ২০১৩)। মূলের সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে গিয়ে কিছু তারতম্য চোখে পড়ল। প্রাসঙ্গিক বিবেচনা করে এই গ্রন্থের শুধু একটি কবিতা, ‘মৃত্যু’, নিয়ে আলোকপাত করা যাক।

‘মৃত্যু’ এই নামের কবিতাটি অনেকের মতো আমারও প্রিয়। লোরকার কবিতায় মৃত্যু বারবার এসেছে এক গভীর সুখহীনতা ও মানসিক উদ্বেগ প্রকাশে। যুবা বয়সে লেখা হলেও এক গভীর প্রতীকময়তায় কবিতাটি আবৃত। ‘মৃত্যু’ কবিতাটি স্থান পেয়েছে, আমার বিবেচনায় লোরকার সেরা কাব্যগ্রন্থ, নিউইয়র্কে কবি, কাব্যগ্রন্থে। এই শহরটি আমার চেনা, তাকে আমি ভালোও বাসি, ফলে লোরকা সে-শহরের যে-চিত্র এঁকেছেন, তা আমাকে আন্দোলিত করে।

কবিতাটি কবির নিউইয়র্কের বাইরে ভারমন্টে স্বল্পকালীন বাসের সময় লেখা। তাঁর আমেরিকান বন্ধু ফিলিপ কামিংসের আমন্ত্রণে লোরকা ভারমন্ট এসেছিলেন, মূলত শহরের একঘেয়েমি কাটাতে। ভারমন্ট তার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য সুপরিচিত। মোট দশ দিন ছিলেন লোরকা এই শহরে। প্রথম কদিন তাঁর ভালোই কেটেছিল।  নদী, পাহাড়, অরণ্য তাঁকে আন্দালুসিয়ার কথা মনে করিয়ে দিয়েছিল। লোরকা খুব সহজেই ফিলিপের মা, যিনি স্প্যানিশ বা ফরাসি জানতেন না, তাঁর সঙ্গে আত্মীয়তা গড়ে তোলেন। দুজনে একসঙ্গে রসুইঘরে একে অপরকে রান্না শেখাতেন। লোরকা তাঁকে নিজের কবিতা পড়েও শোনাতেন। সম্ভবত নিজের মায়ের ছবিই লোরকা দেখেছিলেন ফিলিপের মায়ের ভেতর। একদিকে ভারমন্টের কোমল প্রকৃতি, অন্যদিকে স্বল্পপরিচিত এই মার্কিন পরিবারের সহৃদয়তা লোরকাকে ঘরকাতর করে তোলে। তিনি বিষণ্ণ ও আত্মমুখী হয়ে পড়েন। ‘মৃত্যু’ কবিতাটি এই ‘নির্জন’ পর্যায়ের।

জর্জিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনামূলক সাহিত্যের অধ্যাপক বেটি জিন ক্রেইগ লোরকার এই কবিতার অন্য একটি গূঢ়তর অর্থ ধরিয়ে দিয়েছেন। তাঁর বিবেচনায়, শুধু ‘মৃত্যু’ নয়, নিউইয়র্কে কবি কাব্যগ্রন্থের প্রতিটি কবিতাই কোনো না কোনোভাবে খ্রিষ্টীয় ভাববাদ দ্বারা প্রভাবিত, যা তিনি প্রকাশ করেন পরাবাস্তব রূপকের আড়ালে। স্বর্গ থেকে বিতাড়িত মানুষ – আধুনিক মানুষ – তার সঙ্গে স্বর্গ বা মর্ত্যের কোনো নৈকট্য নেই, এই দুইয়ের সঙ্গে কোনো আত্মীয় সম্পর্ক নির্মাণে সে সমর্থ হয়নি। সে-কারণে তাকে দিন অতিবাহিত করতে হয় ‘অপূর্ণ যন্ত্রণায়’। একমাত্র মৃত্যুর মতো বলিদানের মাধ্যমেই তার পক্ষে সম্ভব এই যন্ত্রণার উপশম। ঈশ্বর, প্রকৃতি ও ব্যক্তির মধ্যে যে-ব্যবধান, সম্ভব তার উত্তরণ। এই কাব্যগ্রন্থে  মানবের এই অপূর্ণতা বোঝাতে লোরকা তাই ‘হস্তহীন কবি’ অথবা ‘শেকড়বিহীন বৃক্ষ’ ইত্যাদি মেটাফর ব্যবহার করেছেন।

আলোচনার সুবিধার্থে আমি প্রথমে মূল স্প্যানিশ, পরে তার ইংরেজি অনুবাদ পাশাপাশি তুলে দিচ্ছি।

 

MUERTE

 

এবার মোরশেদ শফিউল হাসানের অনুবাদের দিকে নজর দেওয়া যাক।

 

মৃত্যু

 

ইসিদেরো দে বস্নাস-কে

কী-যে চেষ্টা!

কী-যে চেষ্টা ঘোড়ার

কুকুর হওয়ার জন্য!

কী-যে চেষ্টা কুকুরের পাখি হওয়ার জন্য!

কী-যে চেষ্টা পাখির মৌমাছি হওয়ার জন্য!

কী-যে চেষ্টা মৌমাছির ঘোড়া হওয়ার জন্য

আর ঘোড়া,

কী ধারালো তীর সে টেনে আনে গোলাপের বুক থেকে!

কী বিবর্ণ গোলাপ উঠে আসে টার ঠোঁট থেকে।

আর গোলাপ

কী রকম ঝাঁকঝাঁক উজ্জ্বলতা ও চিৎকার

তার গুঁড়ির জিয়ন্ত শর্করায় বাঁধা আর শর্করা,

কী ছোরা সে স্বপ্ন দেখে পাহারায় টার!

আর ক্ষুদে ছোরাগুলো,

কী রকম আস্তাবলহীন ছাঁদ, কী রকম উদোম,

শাশ্বত ও আরক্তিম ত্বক খুঁজে ফেরে!

আর আমি, ধারিতে দাঁড়িয়ে,

কী রকম জ্যোতির্ময় সত্তাকে খুঁজি এবং হয়ে উঠি।

অথচ প­স্তারার খিলান,

কী বিশাল, কী দৃষ্টি অগোচর, কী অনুপুঙ্খ

চেষ্টা ছাড়াই।

দেখা যাচ্ছে ইংরেজি অনুবাদের প্রতি মোরশেদ মোটের ওপর বিশ্বস্ত থেকেছেন। ভাষান্তরের ফলে মূল স্প্যানিশের সংগীতময়তা ক্ষুণ্ণ হয়েছে, সন্দেহ নেই; কিন্তু ভাষার এই সীমাবদ্ধতা এড়ানোর কোনো জো নেই। লোরকা কবি না হলে হয়তো গায়ক বা সংগীতশিল্পী হতেন। শুধু ক্ল্যাসিক্যাল পশ্চিমি গীতধারাই নয়, আন্দালুসিয়ার নিজস্ব সাংগীতিক ঐতিহ্যের সঙ্গেও তাঁর ছিল নিবিড় পরিচয়। কবিতায় সেই গীতময়তা নির্মাণে সমর্থ হয়েছিলেন লোরকা, তাঁর কবিতার মূল পাঠ শ্রাবণেও সে-অভিজ্ঞতার পরিচয় মেলে। কিন্তু অনুবাদে তাঁর কোনো কিছুই অর্জন সম্ভব নয়। এমনকি স্পেন্ডারের মতো কবি যখন তাঁর অনুবাদে হাত লাগান, তখনো নয়।  কিন্তু আমি সমস্যা দেখি অন্যত্র। মুখ্যত ইংরেজি অনুবাদ থেকে তৃতীয় ভাষায় রূপান্তরের ফলে এই অনুবাদে কোথাও কোথাও বিচ্যুতি ঘটেছে। Y la rosa,/ ¡qué rebaño de luces y alaridos/ ata en el vivo azúcar de su tronco!-এর অনুবাদে মোরশেদ লিখেছেন : ‘আর গোলাপ,/ কি রকম ঝাঁকঝাঁক উজ্জ্বলতা ও চিৎকার/ তার গুঁড়ির জিয়ন্ত শর্করায় বাধা!’ ধুপপধৎ শব্দের আক্ষরিক অর্থ শর্করা বটে, কিন্তু সে-কথার আক্ষরিক প্রয়োগ এই কবিতায় অর্থপূর্ণ মনে হয় না। ‘আর শর্করা, কী ছোরা সে-স্বপ্ন দেখে পাহারায় তার।’ এ-কথার আদৌ কি কোনো অর্থ হয়? যদি ধরেও নিই কোনো পরাবাস্তব ইমেজারি এর পেছনে রয়েছে, তারপরও ধন্ধ রয়ে যায় ‘জিয়ন্ত গুঁড়ির শর্করায় বাঁধা’ এই বাক্যাংশের সঙ্গে পরবর্তী বাক্যাংশের সংযোগ-সূত্র কী?

বস্ত্তত, নতুন যে ইংরেজি অনুবাদটি আমি উদ্ধৃত করেছি, তাতে ‘ধুঁপধৎ’ অনুবাদ হয়েছে ‘sap’ যার বাংলা অর্থ (গাছের) প্রাণরস। এই ভিন্ন শব্দার্থে লোরকার বাক্যটি সম্পূর্ণ ভিন্ন দ্যোতনায় প্রকাশিত হয় এভাবে : And the rose,/ what a flock of lights and cries/caught in the living sap of its stem!

অনুবাদ কাজটি কেন প্রায়-অসম্ভব কাজ তার প্রমাণ হিসেবে golondrina! শব্দটির কথা ভাবা যাক। মোরশেদ এর সঠিক অনুবাদ করেছেন পাখি, কিন্তু ঠিক কোন ধরনের পাখি, এখানে তা বোঝার উপায় নেই। golondrina! ইংরেজিতে বলা হয় ংধিষষড়।। বাংলায় এর কোনো সঠিক প্রতিশব্দ আমার জানা নেই। এই ক্ষুদে পাখিটির বৈশিষ্ট্য হলো এরা পরিযায়ী বা ‘মাইগ্রেটরি বার্ড’। শীতকালে ঠান্ডার দেশ থেকে উড়ে আমাদের মতো গরমের দেশে আশ্রয় নেয়। লোরকা সোয়ালোর এই ‘ভ্রমণশীল’ চরিত্রের কথা মনে রেখে গলন্দ্রিনা শব্দটির প্রয়োগ করেছিলেন। হয়তো নিজেকেই সেরকম একটি পরিযায়ী পাখি ভেবেছিলেন, যে স্বল্পকালের জন্য ভারমন্টের নৈসর্গিক স্বর্গে আশ্রয় পেয়েছিলেন। সঠিক শব্দার্থের অনুপস্থিতিতে এই সংকটের একটা সমাধান হয় যদি সঙ্গে একটি ফুটনোট জুড়ে দেওয়া হয়।

আরো একটি কথা। প্রতিটি কবিতার একটি সময়কালীন ও স্থানগত পরিপ্রেক্ষিত থাকে, কবিতা পাঠের সময় যা মাথায় না রাখলে সে-কবিতার অর্থ অনুসরণে বিভ্রান্তি জাগতে পারে। এই কবিতার ক্ষেত্রে যে-কারণে লোরকার নিউইয়র্ক থেকে ভারমন্ট ভ্রমণ মনে রাখা জরুরি। একই কথা এই গ্রন্থের বাকি কবিতা সম্বন্ধেও বলা চলে। আধুনিক অনুবাদের একটি অপরিহার্য উপাদান তাই ‘অ্যানোটেশন’। এই বইয়ের যদি আরো একটি সংস্করণ হয়, তাহলে তেমন কোনো অ্যানোটেশন যুক্ত করা গেলে পাঠক উপকৃত হবে বলে আমার বিশ্বাস।

কিন্তু এসবই ছিদ্রান্বেষণ। বইয়ের প্রতিটি কবিতা ধরে এভাবে কাটাছেঁড়া করলে দু-চারটি বিচ্যুতি অনায়াসে ধরা পড়ে। কিন্তু

এ-কথা বলা অত্যুক্তি হবে না, মাত্র ৪০টি কবিতায় মোরশেদ আন্দালুসীয় এই কবির কাব্য-চরিত্রের মোদ্দা সুরটি তুলে ধরে তাঁর কাব্য-প্রতিভার প্রতি সুবিচার করেছেন। বাঙালি পাঠকের কাছে লোরকা অপরিচিত। এই বইয়ের সূত্র ধরে তারা লোরকার কবিতার বিষয়ে একটি সাধারণ পরিচিত লাভ করবে, এ-কথায় কোনো সন্দেহ নেই। আমি নিজে বিশ্বাস করি, অনুবাদের ক্ষেত্রে আক্ষরিক আনুগত্যের বদলে কবিতার ধমনি – তার ‘ইথোস’ – যদি উদ্ধার করা যায়, সেটাই হয় মূল লেখকের প্রতি অনুবাদকের সেরা পুষ্পাহার। মোরশেদ শফিউল হাসান সে-কাজটুকু যোগ্যতার সঙ্গে করেছেন বলেই

আমার বিশ্বাস।

২০ জানুয়ারি, ২০১৯

নিউইয়র্ক

Leave a Reply

%d bloggers like this: