অন্ধ্রের অপ্সরা

লেখক: বুলবন ওসমান

ভাদ্রের আকাশ। ভিক্টোরিয়ার মাথায় মেঘের ছায়া। আকাশ ঘোলাটে। শরৎ নির্বাসনে। পাঁচজনের দলে ফজল টিকিট কাউন্টার থেকে অনেকটা পেছনে। পথনির্দেশক মানিক সর্বাগ্রে।
প্রহরায় পুরুষকর্মীর মধ্যে একজন যুবতী। একহারা চেহারা। হালকা খয়েরি ইউনিফর্মে বেশ সপ্রতিভ। টেপাপুতুলের অবয়ব। যৌবনের শ্রীশোভিত।
ফজলের কানে আসছে … টিকিটমূল্যের দস্তুর।
সঙ্গে চারজন বাংলাদেশি …
একশ টাকা … পার হেড …
ফজল মেয়েটির সামনে গিয়ে বললে, আমাদের কিছু নাশতা-টাশতা দেবে।
না স্যার … হাসল মেয়েটি। ভারতীয়দের দশ রুপি। ফরেনারদের জন্যে সাতশো রুপি।
শুধু আপনারা বাংলাদেশিদের জন্যে একশ টাকা। আসলে সার্ক কান্ট্রির জন্যে …
ধরবে কী করে আমি বাংলাদেশি?
স্যার, তা ধরার উপায় নেই। এটা নির্ভর করছে আপনাদের সততার ওপর।
টিকিট কাটা শেষ। সবাই গন্তব্য অভিমুখে।
ফজলকে দলের পিছু না নিতে দেখে মেয়েটি বললে, আমি অন্ধ্রের মেয়ে।
বাংলা বলছ সুন্দর।
তিন বছর পোস্টিং হয়েছে … অতি ভালো বলতে পারি না। কাজ চালান …
অদূরে মানিক। হাঁক। দাদা, সময় সংক্ষেপ।
আসছি।
কদিন থাকবেন?
বিকেলে প্লেন ধরব। এখান থেকে সোজা নেতাজি সুভাষ।
আপনি আগে দেখেননি?
বেশ কয়েকবার। সঙ্গের সবাই প্রথমবার কলকাতায়। আমার না গেলেও চলে। তবে দলে বলে আসা …
তা ঠিক।
চলি। আবার দেখা হবে। আমি ফজল … আমার বাড়ি এদিকে। আরামবাগ …
আরামবাগ চিকেন … সারা কলকাতায় বিখ্যাত।
নাম জিজ্ঞেস করিনি …
মীনাক্ষী … আসলে মিনাক্সি … আপনারা বলেন মীনাক্ষী।
ঠিক। পদম, আমরা বলি পদ্য। পদমা, আমরা বলি পদ্মা।
চলি।
নমস্কার …
নমস্কার …
দল বেশ এগিয়ে। পায়ের নিচে নুড়ি-পাথরে চলার গতি বাড়ানো যাচ্ছে না। শত শত লোকের পদভারে পুরো অঞ্চল মস্ মস্ …
ধ্বনি-প্রতিধ্বনি …
নুড়িতে পা দেবে যাচ্ছে। স্যান্ডেল বলে আরো অসুবিধা। ফোসকা না পড়ে। আস্তে আস্তে ফজল ডানের বাঁধানো ফুটপাতের দিকে এগোয়।
ফুটপাতে উঠে একটু জিরোয়। গাছের ছায়া আর শীতল সমীর গা জুড়িয়ে দেয়। ডানের ঝিলটা হালকা হাওয়ায় তিরতির করে কাঁপছে। তার মন অতীতমুখী হয়। মনে পড়ে বাল্যে দেখা এমনি দৃশ্য মামাবাড়ি ঝামটিয়া গ্রামে। হাওড়া জেলার ওই গ্রামটিতে তার জন্ম। প্রায় দশ বছর কেটেছে। গ্রামের প্রতিটি অঞ্চল ছিল তার নখদর্পণে। চার নানার পাশাপাশি চারটি সমমাপের প্লট Ñ নাম বড়বাগান। এই বাগানের পাশে মাটি কাটার জন্যে একটা ছোট খাত ছিল। প্রায়ই জল জমে থাকত। সামান্য বাতাসে এর উপরিভাগ এমনি তিরতির করে কাঁপত। এই খাতের পাশেই ছিল ক্রিকেট খেলার মাঠ। প্রতি রোববার কলকাতা থেকে আসত সব মামা। তারা ব্যাট-বল হাতে সকাল নটায় নামত মাঠে। সে বল কুড়িয়ে দিত। ব্যাট ধরতে ভয় লাগত।
১৯৫০-এর দাঙ্গায় তার দেশ ছাড়তে হয়।
সেইসব নানা-মামা প্রায় সবাই প্রয়াত। তাদের অবয়ব এখনো স্পষ্ট। ভাবলেই মন বিষণœতায় ভরে ওঠে। কেমন করে সব ওলটপালট হয়ে গেল। আজ নিজ দেশে পরদেশি।
স্যার … স্যার … ফজলের মগ্নতায় চিড়। কানে আসছে আরো একটা ধ্বনি। কেউ যেন নুড়ি ভেঙে দ্রুতপায়ে এগিয়ে আসছে।
পিছু ফিরে সে অবাক।
মীনাক্ষী।
মীনাক্ষী হাঁপাতে হাঁপাতে ফুটপাতে আসে। দম নিতে থাকে। বুকটা উঠছে-নামছে।
স্যার, যদি কিছু মনে না করেন, একটা কথা জিজ্ঞেস করব?
নির্ভয়ে …
এটা আমার অনুমান স্যার, ভুল হলে ক্ষমা করবেন, আপনি কি একজন রাইটার? চমকে ওঠে ফজল।
সামলে নিয়ে সে গম্ভীর হয়ে যায়। ভাবে, মেয়েটি কেমন করে ধারণা করল! মানুষ পাহারা দিতে দিতে বেশ একটা ক্ষমতা অর্জন করেছে।
প্রশ্নের উত্তরে না গিয়ে সে বলে, মীনাক্ষী, ছুটির দিনে বা অবসর সময়ে তুমি রেড রোডের ধারে মাদুর বিছিয়ে বড় একটা গাছের নিচে বসে যাও, আর পেছনে একটা প্ল্যাকার্ড লাগাও, হস্তরেখাবিদ …
এবার আমি তোমাকে একটা প্রশ্ন করি, তুমি কি কবিতা লেখো?
মীনাক্ষী গম্ভীর হয়ে গেল। বললে, স্যার রেড রোডে মাদুর তো দুটো পাততে হবে।
কেন?
পাশেরটা আপনার জন্যে।
এবার দ্বৈত হাসি।
ফজল হাত বাড়িয়ে দেয়।
মীনাক্ষী হাতে হাত রাখে।
উষ্ণতা লুকোতে পারছে না কেউ।
তোমাদের অন্ধ্রে মূল ভাষা কী?
তেলেগু। তবে উর্দু আর হিন্দিও চলে।
তুমি কোন ভাষায় লেখো?
তেলেগু। অল্পস্বল্প লিখি স্যার।
ছাপা হয়েছে?
হয়েছে কয়েকটা।
অনুবাদ করোনি?
না। তা করা হয়নি। আমার কবিতা অনুবাদের যোগ্য কিনা তা তো জানি না।
তখনো তাদের হাতে হাত।
আমি তোমার পাণি গ্রহণ করলাম।
রক্ত খেলে গেল মীনাক্ষীর মুখে। আমি মাত্র দশ মিনিট বিরতি নিয়ে এসেছি স্যার।
সে হাত ছাড়িয়ে দ্রুত পদক্ষেপে ফিরে যেতে থাকে।
ফজলের চোখ ফেরে না।
মীনাক্ষী, ঢাকায় তোমার নিমন্ত্রণ। জোর গলায় হাঁক ফজলের।
মীনাক্ষী ঘুরে দাঁড়ায়। তারপর দ্রুতপায়ে ফিরে আসে।
তুমি পাসপোর্ট করেছ?
না।
তাহলে ঢাকা যাবে কী করে?
কেন যে-দেশটা ভাগ হলো … মীনাক্ষীর স্বগতোক্তি।
দেশ ভাগ হওয়ায় আমরা মারা পড়েছি Ñ বাঙালি আর পাঞ্জাবিরা। তোমাদের কী?
এই যে আমি ঢাকা যেতে পারছি না! শুনেছি আপনাদের মেয়েরা আমাদের চেয়ে অনেক এগিয়েছে?
তা ঠিক শুনেছ।
দেখছেন তো আমরা কীভাবে এফেক্টেড হয়েছি!
ঠিক তো! এমন করে তো কখনো ভাবিনি!
আমি শুনেছি আপনাদের এনজিওগুলো মেয়েদের মোটরসাইকেল কিনে দিয়েছে। তারা গ্রামে গ্রামে মানুষকে শিক্ষিত করে তুলছে।
এসব সঠিক শুনেছ। গ্রামোন্নয়নে সরকারের পাশাপাশি এনজিওগুলোর কন্ট্রিবিউশন একটা বড় ব্যাপার। এনজিও করে আমাদের দেশে একজন তো নাইট উপাধি পর্যন্ত পেয়েছেন। বিশাল অরগানাইজেশন। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত আছে।
স্যার চলি। সত্যি আমার কালক্ষেপণের উপায় নেই। অনেক কনটেস্ট করে চাকরিটা পেয়েছি।
না, তুমি যাও। শুধু আমার নিমন্ত্রণের কথা ভুলো না।
মনে থাকবে স্যার।
প্রায় ডাবল মার্চ করে মীনাক্ষী এগোয়।
মীনাক্ষী চলে যাওয়ার পর ফজলের মনে হলো, আরে ওর তো একটা ছবি তোলা হলো না!
অনেকটা এগিয়ে গেছে। এখন আর ফেরানো যায় না।
দলের প্রতি আনুগত্য না দেখিয়ে ফজল ধীরপায়ে মেমোরিয়ালের পাশ দিয়ে এগিয়ে চলে। স্থাপত্যকর্মটি যেমন প্রকা-, তেমনি খুঁতহীন। স্থপতি স্যার উইলিয়াম এমারসনকে ধন্যবাদ জানান। ১৯০৬ সালে লর্ড কার্জন কর্তৃক ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন। এই মেমোরিয়ালের চিন্তাও তাঁর। ১৯০১ সালে। জনগণের জন্যে উন্মুক্ত ২৮ ডিসেম্বর ১৯২১। তাজমহল লেগেছিল ২০-২২ বছর … এটিও ১৫ বছর। বিংশ শতকের দ্বিতীয় তাজমহল বলা চলে। সাতান্ন একর জায়গা জুড়ে অবস্থান। কলকাতার অন্যতম শ্রেষ্ঠ আকর্ষণ।
সে বেশকিছু ছবি নেয় নানা অ্যাঙ্গেলে। হঠাৎ তার লেন্সে বাধা দেয় দূরের একটা খ্যাংরাকাঠি। এটি একটি ভবন। কলকাতা কেন সারা ভারতবর্ষের সর্বোচ্চ স্থাপনা। ৪২নং চৌরঙ্গীতে অবস্থিত বলে এর নাম হয়ে গেছে ৪২নং বাড়ি। ৬৪ তলা ভবনটি ক্যামেরায় একটা কাঠির মতো লাগছে। আর ভিক্টোরিয়া? সাদা মার্বেলে। ওজনটা মাপ করা যাবে না। ভবনশীর্ষে কালো রঙের শুধু ব্রোঞ্জের বিজয় দেবীর ওজনই তিন টন। উচ্চতা ১৬ ফুট। মূর্তির কালো রং ফজলের ভালো লাগে না। শুধু মূর্তিটি তাক করে ছবি তুলতে গিয়ে দেখে এটা ধূসর হয়ে যাচ্ছে। আর প্রতিবার ওটা মীনাক্ষীর আদলে রূপান্তরিত।
সে ছবি তোলা বন্ধ করে। বরং নজর দেয় উদ্যানে। সবুজের সমারোহ। কোথাও কোনো ময়লা নেই। পরিপাটি। চোখজুড়ানো। স্নিগ্ধ।
আবার সিদ্ধান্ত, ভেতরে যাবে না।
ভবনের পেছনদিক দেখবে। সেভাবে অগ্রসর।
পেছনটায় তদারককারীদের বসবাস।
কিছুটা শ্রীক্ষুণœ। ভারতীয় পাঁদাড় কি একেবারে উবে যাবে! তবু যতটা রক্ষা করা যায় তেমন।
দলবলের নিষ্ক্রান্তের সময়।
সামনের অভিমুখ।
খানিক পর।
মানিকের চিৎকার।
ওই যে দাদা!
আমরা সবাই আপনাকে খুঁজে বেড়াচ্ছি।
আমি বেড়াচ্ছি।
খুব ভালো। একটা খবর দেবেন তো!
ভিক্টোরিয়ার মাথায় দেখেছ?
দেখেছি।
কী ওটা?
পরি।
পরি!
তবে কী?
বিজয় দেবী। মা কালী।
তা-ই বটে।
এটাই এ-ভবনের খুঁত। আমার মতে।
সাদা-কালো সবসময় খড়্গহস্ত।
কী হলে ভালো হতো?
ধূসর।
তাহলে মীনাক্ষীকে পাওয়া যেত … মনে মনে উচ্চারণ ফজলের।
চলো, এগোনো যাক … এয়ারপোর্টে বেশ আগে পৌঁছতে হয়।
প্রবেশপ্রান্তে এসে পিছিয়ে পড়ে ফজল।
মীনাক্ষী ব্যস্ত।
মিস অন্ধ্রে …
মুখ তোলে মীনাক্ষী।
মনে আছে তো … পাসপোর্ট …
আমরা যারা সিকিউরিটিতে চাকরি করি, পাসপোর্ট পেতে বেশ ঝামেলা স্যার …
আচ্ছা, ঝামেলা কিসে নয়। জন্মগ্রহণও তো একটা সবচেয়ে বড় ঝামেলা। মাকে তো সরাসরি কষ্ট … বাড়ির সবারও উৎকণ্ঠা … মায়ের পেটে তোমার শ্বাসের কোনো ঝামেলা ছিল না? যেই মহাশূন্যে আগমন … চিৎকার … এ কোথায় এলাম … এত আলো … এত শব্দ … নিজেকে শ্বাস নিতে হবে … ওষুধের গন্ধ … তুমি চিৎকার … বাড়ির সবার মুখে হাসি …
আমার জন্মের সময় বাড়ির কারো মুখে হাসি ফোটেনি স্যার।
মানে!
আমি মেয়ে …
অন্তরাত্মা স্তব্ধ ফজলের। সে নিজেও হাসতে পারল না। বড় গভীর অভিযোগ। প্রসঙ্গান্তর। সে বললে, মীনাক্ষী, তোমার একটা ছবি নেব?
মীনাক্ষীর চোখ-মুখে অপরাধের ছায়া।
স্যার, এত সিকিউরিটির যন্ত্রপাতির মধ্যে ছবি নেওয়া … সরি স্যার …
তার কণ্ঠ শুনে ফজলের মনে হলো কোথায় যেন মিয়া কি টোড়ি রাগে কেউ সরোদে আলাপ ধরল।

Leave a Reply

%d bloggers like this: