অপ্রকাশিত জীবনানন্দ দাশ

লেখক:

৩৩-সংখ্যক কবিতার পাণ্ডুলিপির খাতা থেকে

৩৩/৩৬

ধানের পেলব শীর্ষ১ মাইল-মাইল খেতে
মণিমালা – শঙ্খমালা – নারীর মতন
কৃষকের সরলতা থেকে জেগে উঠে
ঈষৎ অনন্যসাধারণ২।

নিমেষে হারায়ে যাবে পৃথিবীর আলোর বাজারে
নিমেষে হারায়ে যাবে পৃথিবীর রাতের বাজারে
যেখানে ভূমিকা নেই সেই দেশ মূল গায়েনের হাতে তুলে
অভিজ্ঞ পেঁচা’র শ্লেষে ফেলে রেখে যাবে শূন্যতারে।

বিকল্প : ১. ছেঁয়াচে মুখ; ২. দাঁড়ায়েছে গণিকার মত বিচক্ষণ

৩৩/৩৭

আমরা ভোরের বেলা জানালার পাশে এসে দেখি
সুশৃঙ্খল হয়ে আছে নদী মাঠ আকাশ ও মেঘ
তবু তারা১ জনতার চোখে২ ভালো সৎ৩ মত নয়
এনে দেয় হেঁয়ালির মতন উদ্বেগ

যেই সব মহত্তর মন আছে আমাদের মাথার উপরে৪
শৃঙ্খলার কাজ নিয়ে, থেকে-থেকে হয়ে ওঠে ভীত
যেন এক বাঘ এল তাহাদের সৌকর্যের পথে
বহু দিন এ-রকম ভাবে আসে নি তো

খৃস্ট’র মৃত্যুর পরে – তাহাদের শৃঙ্খলার কাজ
এক চুল ভয়াবহ বিশৃঙ্খলা নিয়ে আসে তাই
না হলে আমরা সব তাহাদের চিহ্নিত মানুষ
প্রশান্তি, প্রসাদি, রতি শেষ হলে মিহি মৃত্যুর বালাই৫

চালিয়েছি চিপটেন কেটে খেয়ে, খেটে খেয়ে ‘‘এ-রকম মরামাস, বারবেলা’৬, বড়
হেডলাইনে

প্রলাপের কথকতা কখনও ছিল না এই দেশে’’
ভেবে তারা তায় দিয়ে সদ্রূপ প্রাসাদ বানিয়ে৭
তবুও কারবার সব চালাল কি এসে

বিকল্প : ১. সুসজ্জিত/ অবিরত; ২. মুখে/ জলে; ৩. অবতারণার, ৪. আমাদের মাথার উপরে আছে যেই সব মহত্তর মন; ৫. জীবন ও মৈথুনের শেষে শুদ্ধ/ মিহি মৃত্যুর বালাই; ৬. ভয়, মৃত্যু, বারবেলা; ৭. ভেবে তারা কান কেটে গর্দভ’এর মাথা রক্ষা করে/ নিজেদের হ্রস্বতর দুইটি কানের কায়ক্লেশে/ না হলে বেহেড হয়ে যেত অবশেষে।

৩৩/৩৮

সপ্রতিভ লোক সব১ রয়ে গেছে সময়কে ঘিরে
ঘড়ি ধ’রে শৃঙ্খলার বেগে
আরও এক তিল দীপ্তি পেয়ে গেলে তারা
মিশে যেত নীলিমার মেঘে

যেন দূর রৌদ্রালোকে হাওয়ার মতন
তাহাদের কলরব আমাদের দেশে
অত্যন্ত গভীর, সুস্থ, জ্ঞানময় – তবু –
মনে হয়২ টাকশাল থেকে উঠে এসে

হৃদয়ে ঝিমায়ে থাকে আমাদের সারা-দিনমান
বংশালে পেয়ে যায় লয়৩
নির্মল প্রাণের৪ স্পর্শে পরিচ্ছন্ন স্পষ্ট ব্যক্তিদের
শুভ কামনার লোভে তাদের হৃদয়

হয়তো-বা ভুল ক’রে খেটে যায় সারা দিনরাত
হয়তো-বা আমাদের জীবনের হিসেবের ভুল
তবুও যতই তারা আমাদের নিষ্কলুষ ক’রে দিতে চায়
ভেড়া’র লোমের থেকে তত বার হয়ে আসে উল৫

বিকল্প : ১. সজ্জিত মানুষ সব; ২. অবিকল আফিমের মতন আবেশে অবিস্মরণীয় সুরে; ৩. পথে ঘাটে আমাদের মূঢ় শরীরের মৃত্যু হয়; ৪. হাতের; ৫. আমাদের মাংস মিহি/ সূক্ষ্ম হয়ে মন হয় তত স্থূল/ ততই দুঃসহ ঘ্রাণে মেতে ওঠে/ হয়ে উঠি গন্ধগোকুল।

৩৩/৩৯

আমাদের সুহৃদেরা পীঠ মানমন্দিরগুলো নিজেদের চিনেছিল না-কি?১
এত সব সঙ্কল্পের পিছে ফিরে হেমন্তের বেলাবেলি দিন
নির্দোষ আমোদে সাঙ্গ ক’রে ফেলে বারে
চা’এর অকথ্য ক্যান্টিন।

আমাদের নেতাদের উত্তমর্ণদের কাছে প্রতিজ্ঞার শর্ত চেয়ে চারি-দিকে বেড়ে গিয়ে – তবু২
তাহাদের খুঁজে পাই ছিমছাম কনুইএর ভরে
ব’সে আছে প্রদেশের৩ দূর বিসারিত সব ক্ষমতার লোভে
কোথাও প্রেমিক নেই দীপ্তির৪ ভিতরে

কোথাও সময় নেই আমাদের ঘড়ির আঁতুড়ে৫
আমাদের স্পর্শাতুর কন্যাদের মন
বিচ্ছৃঙ্খল বিপণির৬ সর্বনাশ হয়ে গেছে জেনে
সপ্রতিভ রূপসির মত বিচক্ষণ

যে-কোনও রাজার কাজে উৎসাহিত৭ নাগরের তরে;
যে-কোনও ত্বরান্বিত উৎসাহের তরে
পৃথিবীর বারগৃহ ধ’রে তারা উঠে যেতে চায়।
নীরবতা আমাদের ঘরে।

আমাদের শস্যক্ষেতে পৃথিবীর সোনা ফ’লে আছে
পিতাদের দৈব মায়াবলে – মনে হয়
তবুও মৃত্যুর থেকে অপর মৃত্যুর সাথে আজ
তাহাদের কোনও পরিচয়

নেই। ভেবে এই সব ফসলের দিকে ৮
চেয়ে থেকে হতবুদ্ধি হয়ে যেতে ভয়
পাই তবু৯ – আমাদের শস্য আজ অবিকল পরের জিনিস
আমাদের মিডলম্যান’দের কাছে পর নয়১০

তাহারা চিনায়ে দেয় আমাদের ঘিঞ্জি১১ ভাঁড়ার;
আমাদের প্রৌঢ়দের – তহবিলদারদের – মুখ; ১২
আমাদের মননের বায়ুকুণ্ড লোভাতুর জিনিসগুলোকে –
আমাদের দাগীদের১৩ সভাকবিদের মতন কৌতুক।

আকাশে কোথাও কোনও স্পষ্ট সরকার খাজাঞ্চির কালিমার রেখা নেই
রাজপথে থেকে-থেকে বেড়ে ওঠে মূঢ় নিঃশব্দতা
এর ওর দিবারৌদ্রে মৃত্যু হয়ে গেল
অনুভব ক’রে তবু কাউকে বলে না কেউ কথা

বিকেলে গা ঘেঁষে সব নিচু তেজ সরজমিনে ব’সে১৪
মূর্খ, দালাল, ভাঁড়, বেহেড মাথারা সব চেয়ে থাকে সূর্যাস্তের পানে
খালি মনে হয় জানাজানি হলে
কত ধান হয়, কত চাল হয় কেউ কি তা জানে?

ভাবে তারা খুঁজেছিল, খুঁড়ে বিমোহিত হয়ে সিকি-পৃথিবীর যত ধানে
ভেনে নিয়ে খেয়ে ফেলে নরকের থেকে পাপীতাপীদের গালাগালি
সরায়ে মহান সিংহ – অনুভাবনায় িস্নগ্ধ হয়ে
সূর্যাস্তে যত ক্ষণ ছিল যাকে তাকে পুনরায় মনে হয়েছিল সোনালি হেঁয়ালি।

কবিতাটা শেষ হয়ে গেলে নিচে এই দুটো লাইন লেখা আছে :
থেকে নিভে যায় এক পৃথিবীর তিমির রাত্রির লোকসানে
দেখেছে ভোরের বেলা বার-বার সঞ্চারিত হয় ইতিহাসে

বিকল্প : ১. (পরিবর্তিত হওয়ার আগে প্রথম স্তবক)
আমাদের যুবকেরা নিজেদের হৃদয় চেনে না
এই সেই সঙ্কল্পের পিছে ফিরে হেমন্তের বেলাবেলি দিন
নির্দোষ আমোদে নষ্ট ক’রে ফেলে অবশেষে মাঠের ভিতরে
আমাদের পিতামহ, পিতা, মাতা আজ অনভিজ্ঞ মৃত্যুতে বিলীন

২. আমাদের কন্যাদের কাছ থেকে প্রতিজ্ঞার শর্ত চেয়ে Ñ তবু; ৩. পৃথিবীর; ৪. দেশের; ৫. ভিতরে; ৬. বারিকের; ৭. সমুত্তীর্ণ; ৮. অথবা অখণ্ড/নিষ্কম্প চোখে সেই সব ফসলের দিকে; ৯. পেয়ে যাই; ১০. আমাদের মধ্যবর্তীদের কাছে পর নয়; ১১. নিঘৃণ; ১২. আমাদের কন্যাদের লোভাতুর মুখ; ১৩. ছেলেদের; ১৪. (পরিবর্তিত হওয়ার আগে শেষের দুটো স্তবক)

অপরাহ্নে পরস্পর রুগ্ন সারস’এর মত ব’সে
মূর্খ, মানুষ, ভাঁড় চেয়ে থাকে সূর্যাস্তের পানে
কিছু আছে। না হলে প্রতিটি দিন উপতিত, স্পষ্ট জনতায়
জীবন ও শতাব্দীর মানে

বোঝা যেত। যে-রকম অপরেরা অনুভব করে নি কখনও
তবুও সময়, মৃত্যু, নরকের থেকে পাপীতাপীদের গালাগালি
ভেদ ক’রে বড় বাঘ আসে যায় – অনুকম্পায় িস্নগ্ধ হয়ে
সূর্যাস্তের/ অরুণের রঙে তাকে পুনরায় মনে হয় সোনালি হেঁয়ালি।

সৌজন্য :
অমিতানন্দ দাশ
প্রিয়ব্রত দেব