অমলের মৃত্যুর ক’দিন পর আমি বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়লাম।

কোথায় যাবো মন ঠিক করে বেরোইনি। সুফিয়াকেও কিছু বলে আসিনি। বাড়িতে বলে-কয়ে কি আর গৃহত্যাগ সম্ভব? কোনোমতেই সম্ভব নয়। স্ত্রী-সন্তানেরা কেঁদে-কেটে বুক ভাসাবে। পরিবার-পরিজনের চোখের পানি দেখলে মন গলে যাবে। যা চাই, তা আর করা হবে না …।

সমাজ-সংসার ত্যাগ করা খুবই কঠিন কাজ। সংসারে একবার ঢুকে পড়ো, দেখবে, তোমার দু-পায়ে সর্বক্ষণ লোহার শেকল পরানো। এই শেকল ছিঁড়ে যখন খুশি বেরিয়ে পড়বে, তা তোমার সাধ্যাতীত। সাধু-সন্ন্যাসীরা সমাজ-সংসার ছেড়ে বেরিয়ে পড়তে পারে। মহৎজনেরা পারে। আমরা তো পাপী মানুষ। পদে পদে আমাদের পিছুটান।

মা-বাবার কথা মনে পড়ে, ভাই-বোন ও স্ত্রী-সন্তানের কথা মনে পড়ে; বাড়ির ছাগল-গরু, হাঁস-মুরগি এমনকি কুত্তা-বিলাইয়ের কথা ভেবেও আমরা আকুল হই। সংসার ছেড়ে বেরিয়ে পড়তে পারি না …।

আমি অবশ্য শেষ পর্যন্ত সবকিছু ছেড়ে-ছুড়ে বেরিয়ে পড়েছি …।

আমার একটা সুবিধা আছে। মা-বাবা কেউই বেঁচে নেই। উড়নচণ্ডী স্বভাবের কারণে কি না জানি না; হতে পারে, ভাই-বোনেরা আমাকে তেমন একটা গা করে না। বড়োভাই না-হয় ভিনগাঁয়ে, শ্বশুরবাড়িতে সংসার পেতেছে। মেজোভাই-সেজোভাই তো গাঁয়েই আছে। আমি সবার ছোট। অথচ দেখো, মেজোভাই বা সেজোভাই কারো সঙ্গে পথেঘাটে দৈবাৎ দেখা হয়ে গেলে তারা যেন চোখ বুজে থাকে। বড়োবোন মারা গেছে। কলেরা হয়েছিল। ছোটবোন কদাচিৎ নাইওর আসে। সেজোভাইয়ের ঘরে দুদিন, মেজোভাইয়ের ঘরে তিনদিন থাকে। তারপর দু-ভাইয়ের কাছ থেকে দুটো নতুন শাড়ি নিয়ে চলে যায়। একই গাঁয়ে আমাদের তিন ভাইয়ের বাড়ি। মেজোভাই-সেজোভাইয়ের বাড়ি পাশাপাশি, আমার বাড়ি খানিকটা দূরে। কিন্তু একই গাঁয়ে তো! আমাদের গাঁয়ের পাশে নদী, গাঁয়ের ভেতর দিয়ে গেছে খাল। খাল তেমন দীর্ঘ নয়। খুব বেশি হলে আড়াই কি তিন মাইল হবে। গাঁয়ের পশ্চিমমুখে লৌহজং নদী থেকে বেরিয়ে সোজা পুবদিকে শালিনায় ঝিনুক নদীতে পড়েছে। তবে মেজো বা সেজো ভাইয়ের বাড়ি থেকে আমার বাড়িতে যেতে নদী পার হতে হয় না। খালের সাঁকোতেও উঠতে হয় না। তারপরও ছোটবু যে কেন আমার বাড়িতে পা ফেলে না, জানি না। সুফিয়ার সঙ্গে কোনো দ্বন্দ্ব-সংঘাত আছে কি না, তাও জানা নেই আমার …।

এই যে ভাই-বোনেরা আমার ছায়া মাড়ায় না, আমাকে এড়িয়ে চলে, এ-নিয়ে আমার কোনো শোক-সন্তাপ নেই।

হা-হুতাশ নেই। কখনোই আফসোস করি না। আমি তো জানি, সাধুসঙ্গ করতে গিয়ে কতো জায়গায়, কতো গুরুর মুখে শুনেছি – সংসারে থেকেও, মা-বাবা, ভাই-বোন, স্ত্রী-সন্তানের সঙ্গে থেকেও সব মানুষই বড়ো নিঃসঙ্গ। ঘরে-সংসারে মানুষের মধ্যে যতোই প্রেম-ভালোবাসার বিনিময় ঘটুক না কেন, একজন আরেকজনের সঙ্গে যতোই গভীর বন্ধনে জড়িয়ে পড়ুক না কেন – আসলে প্রত্যেকটা মানুষই মধ্যদুপুরে নিঃসীম আকাশে একাকী উড়ে বেড়ানো চিলের মতো একা …।

আমার দুই মেয়ে, এক ছেলে। মেয়ে দুটোই বড়ো। ওদের বিয়ে দিয়েছি। ভালো ঘর-বর। সুখের সংসার। ছেলে সুলতান হাইস্কুলে পড়ে। নাইনের ছাত্র। জোয়ান হয়ে উঠছে। সুলতান কি কাঁদবে আমার জন্য? আমাকে খুঁজতে বেরুবে? এ-কালের ছেলে তো! দুদিন পরই হয়তো ভুলে যাবে নিজের বাবাকে। ঘরের দরজা বন্ধ করে একা একা কাঁদবে শুধু সুফিয়া …।

মা বেঁচে থাকলে আমার পক্ষে সংসার ত্যাগ করা সম্ভব হতো না। মাকে বাড়িতে ফেলে রেখে আমি ঘর ছাড়তে পারতাম না …।

সন্তানের প্রতি মায়ের ভালোবাসা কোনো বাটখারা দিয়েই পরিমাপ করা যাবে না। দুনিয়ার সব মা তার সন্তানকে নিজের প্রাণের চেয়েও বেশি ভালোবাসে। সন্তান অসুস্থ হলে, বিপদগ্রস্ত হলে, সন্তানের মুখটা একটু শুকনো দেখালে মায়ের প্রাণপাখি শিকারির হাতে গুলিবিদ্ধ পানকৌড়ির মতো ছটফট করে। কীভাবে, কী করে সন্তানের মুখে হাসি ফোটানো যায় – এই চিন্তায় অস্থির হয়ে ওঠে মা। আমার প্রতি আমার মায়ের ভালোবাসা যেন ছিল এর থেকেও বেশি। গরিবঘরে সাধারণত এতো ভালোবাসা থাকে না। কিন্তু আমার মা ছিল অন্যরকম। আমার বয়স যখন চার, তখন বাবা মারা যায়। আমরা ছয় ভাইবোন। চার ভাই, দুই বোন। আমি সবার ছোট। ঘরের হাঁড়ি ঠনঠন করে, চাল বাড়ন্ত; পাকঘরে নিয়ম করে দুবেলা উনুন জ্বলে না। তারপরও মায়ের হাসি হাসি মুখ। এই মুখে দুপুরের রোদ পড়ে জোনাকির আলোর মতো জ্বলজ্বল করে। কোনো-কোনো দিন একবেলা, তাও আধাপেট করে খেতে পাই। কিন্তু মায়ের আদর-সোহাগের কমতি নেই। তার আদর-সোহাগ পেয়ে ক্ষুধা-তৃষ্ণা ভুলে থাকি। মা মণ্ডলবাড়ি কাজ করে। কোনোদিন দুপুরে হয়তো মা বাড়িতে আসে। আমরা এতগুলো ভাইবোন – সবাইকে ডেকে জড়ো করে। আমরা পাঁচজন জড়ো হই। বড়োভাইও মণ্ডলবাড়ি কাজে লেগেছে। মা আঁচলের নিচ থেকে একডাবর পান্তাভাত বের করে। আমরা সবাই ডাবরের চারপাশে গোল হয়ে বসি। তারপর গোগ্রাসে গিলি পান্তাভাত …।

মা আমাদের সব ভাই-বোনকেই খুব ভালোবাসে। কিন্তু আমার মনে হয় – আমাকেই ভালোবাসে সবচে’ বেশি …।

যখন আমি বিয়ে করেছি, তিন সন্তানের বাবা হয়েছি, ভাইদের সঙ্গে পৃথক সংসার; গাঁয়ের পুবপাশে বড়ো সড়কের কাছাকাছি নতুন বাড়ি করেছি, মণ্ডলবাড়ির বিঘা-চারেক জমি বর্গাচাষ করি, নিজেও কিনেছি কিছু জমি, এখন আর সংসারে আধাপেট খেয়ে দিন পার করার মতো অভাব নেই; মা তখনো আমাকে মুরগিছানার মতো আগলে রাখতে চাইতো। চিল এসে যদি আমাকে ছোঁ মেরে নিয়ে যায় …!

অবশ্য এর পেছনে যুক্তিসংগত কারণও ছিল। এটা আমার উড়নচণ্ডী স্বভাব। মা তো আমার যৌবনের শুরু থেকেই তা দেখে আসছে। হঠাৎ করেই আমার খোঁজ নেই। কখনো দু-চারদিন, কখনো বা পাঁচ-সাতদিন। মা ভেবেছিল – ঘরে বউ এলে ছেলের মতিগতি ঠিক হবে। ঘর ছেড়ে আর নিখোঁজ হবে না। মায়ের আশাভঙ্গ হয়েছে। আমি সংসারে থেকেও ভালো সংসারি নই। মা আমাকে নিয়ে সবসময় একটা আতঙ্কের মধ্যে থাকে। গেরস্তঘরের ছেলের কেন এ-স্বভাব! ওই অমলটাই যতো নষ্টের মূল …।

একবার হয়েছে কি, আমাকে মেদিজ্বরে ধরেছে। আঠারোদিন কেটে গেছে, জ্বর পুরোপুরি ছাড়ে না। সকালে একটু ছাড়ে কি ছাড়ে না; দুপুর কি বিকেলের পরই আমার জ্বর বাড়তে শুরু করে। তখন মেদিজ্বরের ভালো কোনো চিকিৎসা ছিল না, দশগাঁয়ে ভালো ডাক্তারও ছিল না। বিক্রমহাটির রবি-ডাক্তারই ভরসা। বড়ো বড়ো কাচের বোতলে ওষুধ দিতেন। বোতলের গায়ে দাগ কেটে দিতেন কাগজ সেঁটে। সাদা বোতলে রঙিন কাগজ, রঙিন বোতলে সাদা কাগজের দাগ। দিনে তিনবেলা এক দাগ করে ওষুধ  খেতে হতো। গাবের মতো কষ্টা আর চিরতা-ভেজা পানির মতো তিতকুটে সেই ওষুধ। রোগী ভালো হলে রবি-ডাক্তারের হাতযশ, আর মারা গেলে ‘সব ভগবানের ইচ্ছা …।’

আমি তখন কেবল বিয়ে করেছি, ছ-মাসও অতিক্রান্ত হয়নি। সুফিয়ার শরীরে নাক ছোঁয়ালে ‘গায়ে হলুদের’ সুবাস মেলে। আমি জ্বরে গর্তে-পড়া হাতির মতো কাবু, সুফিয়া আমার দুশ্চিন্তায় কাহিল। এ কী কপাল তার? শরীর থেকে বিয়ের গন্ধ শুকাতে না-শুকাতেই স্বামী তার এরকম জ্বরে পড়লো। সুফিয়ার চোখ সারাক্ষণ কচুপাতার পানির মতো টলমল করে। সে আমার মাথায় জলপট্টি দিতে চায়, জলপট্টিতে হাত রেখে আমার মাথার কাছে বসে থাকতে চায়, নিজের হাতে একটু সাগু কি বার্লি রেঁধে খাওয়াতে চায় আমাকে; কিন্তু কোনোটাই পারে না। সবকিছুই করে মা। দিনের বেলা তো বটেই, রাতেও কুপিবাতি জ্বালিয়ে ঘুমে ঢুলুঢুলু-চোখে মা আমার পাশে বসে থাকে। সুফিয়া নতুন বউ, শাশুড়িকে কিছু বলতে পারে না। আমি তো বউয়ের মনের কথা বুঝি। আমিই মাকে বলি – ‘মা, তুমি এহন খানিকটা তোমার ঘরে গিয়া ঘুমাও …।’

‘বাছা। তুই কস কী? আমি ঘুমাইলে তরে এই রাইতের বেলা দেখবো ক্যারা …?’

‘ক্যান? সুফিয়া আছে তো …।’

‘সুফিয়া! কী যে কস না তুই কাশেম? বউ একটা চ্যাংড়া মানুষ …।’

নতুন বউটি যে, হোক না স্বামী অসুস্থ, স্বামীর কাছাকাছি থাকতে চায়, স্বামীর সঙ্গসুখ প্রত্যাশা করে – শাশুড়ি এটা বোঝে না। মা ছেলেবউয়ের তত্ত্বাবধানে ছাড়ে না আমাকে। সুফিয়া মনে মনে শাশুড়িকে শত্রুজ্ঞান করে …।

মা চুপচাপ আমার মাথার জলপট্টিতে হাত রেখে বসে থাকে। জল-ছলছল

চোখ …।

রাত বাড়ে। সম্ভবত কৃষ্ণপক্ষের রাত। রাতের আন্ধার বাড়ে। বাড়ির পেছনে ঝাঁকড়া শেওড়াগাছ। ওই গাছে ভুতুম ডাকে।

ভূত-ভুতুম, ভূত-ভুতুম। ভীষণ ভৌতিক ডাক। অজানা আশঙ্কার ডাক। সারাবাড়ি অভূতপূর্ব আতঙ্কে সন্ত্রস্ত। ঘুম-জাগরণের মধ্যে আমিও ভয়ে কাঁপি। কিন্তু মুখে কিছু বলতে পারি না। কে যেন আমার গলা দুই হাতে চেপে ধরে বসে আছে। আমাকে শ্বাসরুদ্ধ করে মেরে ছাড়বে …।

হঠাৎ মা আমাকে ডাকে –

‘কাশেম …।’

আমি তখন বেহেস্ত আর দোজখের মাঝখানে বড়শির সুতোর মতো সরু যে পথ, সেই পথে হাঁটছি। ডানে বেহেস্ত, বাঁয়ে দোজখ। বেহেস্তের সে যে কী অপরূপ সৌন্দর্য। চোখে ধাঁধা লাগে। শহরের ডাকবাংলোর মতো বাড়ি। সব বাড়িই দেখতে একই রকম। সব বাড়ির সামনেই ফুলের বাগান। কতো রঙের বাহারি ফুল যে ফুটে আছে বাগানে! সব বাড়ির চারপাশেই পাকা নর্দমার মতো স্রোতস্বিনী নদী। কুলকুল রব তুলে ছুটে চলেছে পানি। বাড়ির দরজায় দাঁড়িয়ে আছে চিরযৌবনবতী হুর। আর দোজখ! যেন পাহাড়ের মতো বড়ো বড়ো আগুনের গোলা …।

মা আমাকে আবার ডাক দিতেই আমার তন্দ্রা কেটে গেলো। জ্বরের ঘোরে আমি হয়তো স্বপ্ন দেখছিলাম …।

‘কী কও মা …?’

‘ঘুমাইছস …?’

‘না …।’

‘প্রথম ডাকে সাড়া দিলি না …।’

‘তন্দ্রার মতো হইছিল একটু …।’

‘তরে একলা রাইখা ঘুমাইলেই আমি একটা খারাপ স্বপ্ন দেখি।’

‘কী স্বপ্ন মা …?’

‘দেখি, আমি মণ্ডলবাড়ির ঢেঁকিঘরে ঢেঁকিতে ধান ভানতেছি। বৈশাখ মাসের দুপুরবেলা, ঘামে জবজব করছে আমার শরীর। কে যেন খবর দিলো – ও কাশেমের মাও, তাড়াতাড়ি বাইরও, মোল্লাবাড়ির ছেলেরা তোমার কাশেমরে বটতলায় পিটাইয়া মাইরা ফালাইছে। আমি লোকটার কথা শুইনা – ‘ও বাবা কাশেম রে’ – বইলা চিক্কুর দিয়া বটতলার দিকে দৌড় দেই। বটতলা যে কতোদূর! বটতলার আর নাগাল পাই না। দৌড় পাড়তে-পাড়তেই আমার ঘুম ভাইঙ্গা যায় …।’

তখন আমার বালকবেলা। নয়-দশ বছর বয়স। তখন একটা ঘটনা ঘটেছিল। সেদিন আমি মারা যেতে পারতাম। সবাই নাকি বলাবলি করছিল – যেভাবে মাথা ফেটেছে, যে-পরিমাণ রক্ত পড়েছে, মগজও বেরিয়ে গেছে খানিকটা, এই ছেলের আর বাঁচার আশা নেই। কিন্তু সবার আশংকাকে ভুল প্রমাণিত করে আমি বেঁচে গেছিলাম। প্রায় মাসখানেক আমাকে সদরের হাসপাতালে থাকতে হয়েছিল, এই যা। সেদিন আমি মরে গেলে এই আখ্যান আজ সৃজিত হতো না। কিন্তু কী আশ্চর্য, এতোদিন পরেও মা সেই ঘটনা ভোলেনি! ঘটনাটি কিছুটা রূপবদল করে, আমার মৃত্যু হয়ে মায়ের স্বপ্নের মধ্যে আসে …।

মোল্লাবাড়ির এক ছেলে লোহার রড দিয়ে বাড়ি মেরে আমার মাথা ফাটিয়ে দিয়েছিল। বাড়িটা মাসুম দিয়েছিল, নাকি রতন বা অন্য কেউ, ওরা ছয়-সাতজন ছিল, পেছন থেকে বাড়ি দিয়েছিল; আমি দেখতে পাইনি। বাড়ি খেয়েই তো আমি বালুর মধ্যে মুখ থুবড়ে পড়ে গেছিলাম। বাড়িটা এতো জোরে দিয়েছিল যে, এক বাড়িতেই আমার মাথা দুই খণ্ড …।

ছেলেবেলায় আমি মার্বেল খেলায় খুব ওস্তাদ ছিলাম। আমার সমবয়সী ছেলেরা তো আমার সঙ্গে খেলে পারতোই না, আমার চে’ বড়োরাও অনেকে ফতুর হয়ে যেতো …।

নদীর পাড়ে বুড়ো বটতলায় আমাদের মার্বেল খেলার আড্ডা বসে। বটগাছটির গোড়ার নদীর দিকের একটা বৃহৎ অংশের মাটি ইঁদুরে খেয়ে ফেলেছে। বর্ষায় লৌহজং স্রোতস্বিনী হয়ে উঠলে কিংবা বড়ো ঝড় এলে মনে হয় গাছটি নদীতে ভেঙে পড়বে। অনেকদিন ধরেই গাছটির এই পড়ো পড়ো পরিস্থিতি দেখছি। কিন্তু সে পড়ে না। আমরা যারা এখানে মার্বেল খেলতে আসি, আমাদের মনের মধ্যে একটা শংকা আছে, কখন বুঝি বুড়ো বটবৃক্ষটি আমাদের মাথার ওপর ভেঙে পড়ে, আমরা ছেলে-ছোকরারা দলেবলে মারা যাই। কিন্তু তারপরও বটতলা মার্বেল খেলতে না-এলে আমাদের পেটের ভাত হজম হয় না …।

মোল্লাবাড়ির ছেলেরা আসে। সিকদারবাড়ির ছেলেরা আসে। বেশিরভাগ দিনই খেলায় আমি জিতি। জেতা মার্বেল আবার ওদের কাছেই বিক্রি করি। মার্বেল বিক্রি করে অনেকগুলো সিকি-আধুলি যখন আমার হাতে আসে তখন টের পাই, নিজের চোখ তো আর নিজে দেখতে পাই না; অনুভব করি – আমার চোখ দুটো মার্বেলের মতোই জ্বলজ্বল করছে …।

সেদিন মোল্লাবাড়ির ছেলেরা আমার আগেই এসেছে। ওরা যে খেলায় হেরে এই কাণ্ড করবে, বাড়ি থেকে পরিকল্পনা করে, প্রস্তুতি নিয়ে এসেছে, বটের ঝুরিতে লোহার রড লুকিয়ে রেখেছে – এসব আমার কল্পনার মধ্যেও ছিল না …।

ঘণ্টা-দুয়েক খেলার পর যথারীতি ওরা সবাই ফতুর। আমার কাপড়ের থলে তখন বেশ ওজনদার …।

মোল্লাবাড়ির ছেলেদের মধ্যে মাসুম একটু বড়ো। ও সর্দার সেজে বললো – ‘কাশেম, আজ আর তোর কাছ থেকে মার্বেল কিনবো না …।’

‘না কিনলে না কিনবি। এইডা তোগোর ইচ্ছা। তাইলে তো খেলা শ্যাষ। আমি যাই …।’

‘না। তা হবে না …।’

‘মানে …?’

‘আমাদের মার্বেল ফেরত দিতে হবে …।’

‘ক্যান? জিতা মার্বেল ফিরত দিমু ক্যান? এইডা মগের মুল্লুক নাকি …?’

‘নিত্যি নিত্যি তুই জিতবি। আমাদের মার্বেল আবার আমাদের কাছেই বিক্রি করবি। তামাশা পেয়েছিস একটা …।’

‘এইডা কী কথা? তোরা জিতলেই পারিস …।’

‘চোপ শালা। বেশি কথা বললে এক ঘুষিতে তোর চাপার সব দাঁত ভেঙে ফেলবো …।’

ওরা সংখ্যায় ছয়-সাতজন। আমি একা। ওদের সঙ্গে যুঝে পারবো না। তারচে’ কেটে পড়া ভালো। আমি মার্বেলের থলের মুখ শক্ত করে চেপে ধরে দৌড় দিয়েছি, ওরাও আমার পেছনে পেছনে দৌড়াচ্ছে; কিছুক্ষণের মধ্যেই আমার মাথায় লোহার রডের সেই বাড়ি …।

আমার তিন সন্তানের মধ্যে সুলতান সবার ছোট। মেয়ে দুটোই বড়ো। সুলতানের বয়স যখন দুই, তখন মা মারা গেলো …।

ছেলেসন্তান না-থাকলে বংশ টিকে না, বাবার নাম থাকে না; এই বিশ্বাস এখনো, যখন নাকি, কানে আসে এসব কথা; নারী-পুরুষের সঙ্গম ছাড়াও সন্তানের জন্ম দেওয়া সম্ভবপর, দুনিয়ার কোথাও কোথাও নাকি ঘটছে এই ধরনের অলৌকিক ঘটনা; তখন তো এই বিশ্বাস আরো প্রবল ছিল। আমার প্রথম দু-সন্তান মেয়ে, ছোট রুম্পার বয়স আট, আমাদের ঘরে ছেলেসন্তানের জন্ম হয়নি, আমার মায়ের হা-হুতাশের অন্ত নেই। কাশেমের বংশ বুঝি টিকবে না, বিলোপ হয়ে যাবে। আমার বড়ো তিনভাইয়েরই ঘরে ছেলেসন্তান আছে, আমি মায়ের সবচে’ আদরের সন্তান, অথচ আমার ঘরে ছেলেসন্তান নেই, মায়ের মনে এরচে’ বড়ো দুঃখ আর কী থাকতে পারে? নাতির মুখ না-দেখেই বুঝি মাকে এই ধরাধাম থেকে বুকভরা হাহাকার নিয়ে চিরবিদায় নিতে হবে …!

যা-হোক, আমার মনের সান্ত্বনা এতোটুকুই যে, আমার ঘরে, নাতির মুখ না-দেখে মায়ের মৃত্যু হয়নি। মায়ের মৃত্যুর সময় দু-বছরের সুলতান দাদির পাশেই বসে ছিল। সুফিয়াই ওকে শাশুড়ির বিছানায়, তার বুকের কাছাকাছি বসিয়ে রেখেছিল। যদি অন্তিম মুহূর্তে আদরের নাতিকে একটু ছুঁয়ে দেখতে চায় …।

কী যুদ্ধ যে জীবনভর করেছে মা! যাত্রাপালায় দেখা ‘কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ’ আর কী, তার চেয়েও যেন কঠিন যুদ্ধ। যাত্রাপালায় দেখেছি – কুন্তীর বিয়ে হয়নি, কুমারী, কিন্তু তার পেটে সন্তান। এই নিয়ে কতো হইচই, কতো যুদ্ধ! আমার মায়ের যুদ্ধ কুন্তীর যুদ্ধের মতো ছিল না, তার যুদ্ধ ছিল অন্যরকম, কিন্তু ভয়াবহ যুদ্ধ। আমি যখন চার বছরের মা তখন বিধবা হয়, আমরা এতোগুলো ভাই-বোন, আমাদের খাওয়ানো-পরানোর যুদ্ধ তো ছিলই, ভয়ানক যুদ্ধটা ছিল শ্বশুর-ভাশুর-দেবরের সঙ্গে। এই যুদ্ধ ছিল নিজের অস্তিত্ব বজায় রাখার, স্বামীর ভিটেবাড়ির অধিকার টিকিয়ে রাখার …।

বাবার মৃত্যু হয়েছে, কিন্তু দাদা তখনো জীবিত। তখন নাকি নিয়ম ছিল, ধর্মীয় নিয়ম – ‘লা-শরিক’ – অর্থাৎ দাদার জীবিতকালে তার সন্তানদের কেউ মারা গেলে নাতিরা দাদার শরিকত্ব হারিয়ে ফেললো। তারা আর দাদার জমিজমার ভাগ পাবে না। কী নির্দয় নিয়ম …!

জমি বলতে দাদার ভিটেবাড়িটুকুই। এক বাড়িতেই দাদা, বাবা-চাচারা তিনভাই থাকতো। আমার বাবা ছিল মেজো। দাদা মুখে কিছু বলছিল না, চুপচাপ ছিল, হয়তো তারও সম্মতি ছিল, ধর্মীয় নিয়ম বলে কথা, এই নিয়মের অন্যথা করলে জাহান্নাম অবধারিত; বড়ো চাচা, ছোট চাচা লাফালাফি শুরু করে দিলো। মাকে বাড়ি ছাড়তে হবে …।

মা সারাজীবন যুদ্ধ করেছে। কখনোই ভেঙে পড়েনি। ক্লান্ত হয়নি। চোখে-মুখে অন্ধকার দেখেনি। প্রচণ্ড সাহসী ছিল মা। সে রুখে দাঁড়ালো। বললো – ‘এইডা পাকিস্তানের আইন। বাংলাদেশে এই আইন অচল। আমি এই আইন মানি না …।’

শেষ বয়সে মা হয়তো একটু সুখের মুখ দেখেছিল। তার চোখ-মুখের ভাষায় তা বোঝাও যেতো। অন্তত আমি তাই বিশ্বাস করতাম। কারণটা কী? আমি উড়নচণ্ডী স্বভাবের হলেও আমার সংসারে খাওয়ার-পরার অভাব ছিল না। বর্গাজমি তো ছিলই, খেটেখুটে কিছু জমি কিনেছিও, আলাদা বাড়ি করেছি, মেজোভাই-সেজোভাইও সচ্ছল হয়ে উঠেছে, তারা হয়তো মায়ের তেমন খোঁজখবর করে না, না-করুক, নিজের পেটের ছেলে তো; আমাদের এই সচ্ছলতা দেখেই হয়তো মা সুখ অনুভব করতো। আহারে! কী কষ্টভোগ করেই না মা আমাদের মানুষ করেছে …!

মানুষ একটু সুখের মুখ দেখুক, ওপরওয়ালার বুঝি তা সহ্য হয় না। মায়ের শরীর ক্রমশ ভেঙে পড়তে লাগলো। ডায়াবেটিস, কোমরে ব্যথা, দাঁতে ব্যথা, চোখে ছানি – রাজ্যের সব অসুখ উইপোকার ঢিবির মতো বাসা বেঁধেছে মায়ের শরীরে। সদরে নিয়েছিলাম, দুদিন রেখে হাসপাতালের ডাক্তাররা বললো – ‘কাশেম মিয়া, আপনার মাকে বাড়িতে নিয়ে যান, যা খেতে চায়, পারলে তাই খেতে দেবেন …।’

বাবার মুখটা ভালো করে মনে পড়ে না। মনে পড়বে কী? বাবা তো আমাকে কখনো কোলে নিয়ে আদর করেনি। বড়ো ভাই-বোনদের করেছিল কি না, তাও জানি না। হয়তো করেনি। ছেলেমেয়েদের কোলে নিয়ে আদর করার সময়-সুযোগই ছিল না বাবার। সে সারাদিন মণ্ডলবাড়ির কাজ করতো। রাতে যখন সে বাড়ি আসতো, আমরা তখন ঘুমিয়ে পড়তাম। যা হোক, দেখেছি, কোনো সাধুর আখড়ায় বসে, সিদ্ধিসেবন করে একমনে বাবাকে ডাকলে তখন বাবার অস্পষ্ট একটা আকৃতি চোখের সামনে ভেসে ওঠে। মাঝারি উচ্চতার, মা অবশ্য বলতো বেঁটে-ধরনের, মানুষ ছিল বাবা। কমলার মতো গোলগাল মুখ। মাথাভর্তি ঝাঁকড়া চুল। চোখ দুটো মহিষের চোখের মতো বড়ো বড়ো। সবসময় মার্বেলের মতো জ্বলজ্বল করে। তো, বাবার উচ্চতা যা-ই হোক, মাঝারি বা বেঁটে ধরনের, শরীরটা ছিল শালবৃক্ষের মতো সুডৌল। শক্তপোক্ত। বাঘের মতো শক্তি ছিল শরীরে …।

মণ্ডলবাড়ির বছর-কড়ারে কামলা ছিল বাবা। সর্দার কামলা। এক বছরের কড়ার হলেও বাবা বছরশেষে কোনোবারই বাড়ি বদলাতো না। দু-চার টাকা কম আর বেশি, বাবা মণ্ডলবাড়িতেই থেকে যেতো। যেন মণ্ডলবাড়িরই মানুষ সে। বড়ো মণ্ডল খুব বিশ্বাস করতো বাবাকে। বিশাল-বড়ো গেরস্তালি মণ্ডলের। আরো দুজন বছর-কড়ারের কামলা ছিল। কিন্তু গেরস্তালির যে-কোনো কাজে বাবার কথাই ছিল শেষকথা …।

একই গাঁয়ে বাড়ি। বাবা সারাদিন মণ্ডলবাড়ির কাজ করতো। রাতে খাওয়া-দাওয়াশেষে গরুগুলোকে গোয়ালে রেখে, গোয়ালঘর তালা মেরে চাবি নিয়ে বাড়ি চলে আসতো। ভোরের আজান দিতে না-দিতেই আবার চলে যেতো মণ্ডলবাড়ি …।

তখন ভরা বর্ষা। লৌহজংয়ে কূলছোঁয়া পানি। দেশে যুদ্ধ শুরু হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধ। কদিন ধরে আগুন-গরম রোদ উঠছিল। বর্ষাকাল। শ্রাবণ মাস। অথচ বৃষ্টির দেখা নেই। সেদিনও প্রচণ্ড রোদ। পথে বেরুলে যেন শরীরে ফোস্কা পড়ে যাবে। গরুগুলো খুব হাঁসফাঁস করছিল। বাবা বাড়ির দুই কামলা আলিম-কলিমকে নিয়ে নদীতে গরু ঝাঁপাতে এসেছে। হঠাৎ পাড়ার পুবদিকে শোরগোল। ‘মিলেটারি আইছে, মিলেটারি আইছে; শিগগিরই পালাও’ – ভেসে আসছে চিৎকার-ধ্বনি। আন্দ-ঠাকুরের বাড়িতে আগুন দিয়েছে মিলিটারিরা। আগুনের লকলকে জিহ্বা উঠছে আকাশের দিকে, যেন আগুনমুখো সাপ। এখন উপায় …?

বাবা তখন পালের বড়ো ষাঁড়টা নিয়ে পানিতে নেমেছে। ষাঁড়ের নাম বাঘা। বাঘের মতোই লাল-হলুদ ডোরাকাটা গায়ের রং বলে বাবাই এই নাম দিয়েছে। ষাঁড়টি বাবার  খুব ভক্ত। অন্য কেউ বাঘার শরীরে হাত দিতে পারে না, ঝাঁপাতেও পারে না। বাবা বাঘাকে নিয়ে পানিতে নেমে ‘ডুব ডুব’ বলতেই বাঘা মাথা ডুবিয়ে ডুব দেবে। সেদিনও বাঘা কেবল এক ডুব দিয়েছে, আলিম-কলিম গাই-বলদ-বাছুর নিয়ে পানিতে নামছে, তখনই বন্দুক হাতে সাত যম এসে দাঁড়ালো ঘাটপাড়ে …।

ষাঁড়ের গলা জড়িয়ে ধরে বুক-পানিতে দাঁড়িয়েছিল বাবা। এক মিলিটারি-হানাদার বন্দুক তাক করে বাবাকে বললো – ‘এই মালাউনকা বাচ্চা, জলদি বাতাও – মুক্তি কিধার …?’

পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর কাছে বাংলাদেশের মানুষ, সে হিন্দু না মুসলমান তা বিচার করার দরকার নেই, সবাই মালাউন। সবাই হিন্দু। এদেশের মুসলমানরা নাকি নিজেদের খাঁটি মুসলমান হিসেবে দাবি করতে পারে না …।

বাবা ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে বললো – ‘আমরা সবাই মুসলমান …।’

‘মুসলমান! কলেমা বাতাও …।’

বাবা কলেমা পড়তে শুরু করলো – ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু …।’

হানাদার-সর্দার যা বললো, তা শুনে বুকপানিতে দাঁড়িয়ে থেকেও বাবার বুকের ভেতরের সব পানি শুকিয়ে গেলো। হানাদারটি বললো – ‘আমরা খোঁজখবর নিয়েই এসেছি। গাদ্দার মুক্তিদের সাথে তোমার যোগাযোগ আছে। তুমি রাতের বেলা ওদের সড়ক পার করে দাও। খাঁটি মুসলমান হয়ে থাকলে বলো – মুক্তিদের গোপন ঘাঁটি কোথায় …?’

হানাদারদের সঙ্গে কোনো রাজাকার নেই। বাবা ভাবলো – এটা একটা আশ্চর্যজনক ঘটনা। কেউ না কেউ তো তার গোপন কর্মকাণ্ডের খবর জেনে ফেলে হানাদারদের জানিয়ে দিয়েছে। এখন হয়তো বটতলায় দাঁড়িয়ে আছে। গুলির শব্দ শুনলেই ছুটে আসবে …।

বাবা চিৎকার করে বললো – ‘স্যার, বিশ্বাস করেন স্যার। আমি কিচ্ছু জানি না। সব মিছা কথা, স্যার। মুক্তির কেউরে আমি চিনি না …।’

‘আরেকবার বাতাও, শুয়ারকা বাচ্চা …।’

বাবা এবার ডুকরে কেঁদে উঠলো। ‘বিশ্বাস করেন স্যার। সব …।’

হানাদার-সর্দার পরপর দুটো গুলি করলো। প্রথম গুলি লাগলো বাবার মাথায়। দ্বিতীয়টা লাগলো ষাঁড়ের মাথায়। মানুষের রক্তও লাল, গরুর রক্তও লাল। বাবা আর বাঘার মিলিত লাল রক্তে নদীর পানি রঞ্জিত হয়ে গেলো …।

আমি আর অমল দুই হরিহর আত্মা বন্ধু। বন্ধুর চেয়েও বেশি। যেন দুই যমজ ভাই। অমলের পায়ে কাঁটা ফুটলে আমিও পায়ে ব্যথা পাই। এ-নিয়ে মানুষের কটুকথাও শুনতে হয়। আমাদের স্বজাতির লোকেরা, আমাদের সামনেই, হয়তো বাজারের বটতলায় বসে দুজনে গল্প করছি, কেউ একজন বলে ফেললো – ‘কাশেমের ভাব দেইখা বাঁচি না। হিন্দুর ছেলের সঙ্গে কী যে পিতলা খাতির …!’ হিন্দুরা বলে – ‘অমলের জাতধর্ম তো নাই-ই, ঘেন্নাপীতও নাই …।’

আমরা কারো কথায় কান দিই না। সাঁইজি তো বলেই গেছেন – ‘জাত গেল, জাত গেল’ বলে মাথা খুঁড়ে লাভ নেই। জাত কাচের তৈজসপত্রের মতো ঠুনকো জিনিস না। এতো সহজে কারো জাত যায় না। কিন্তু আমার বিপদ হয়েছে, মা অমলকে একদম সহ্য করতে পারে না। অমল যেন মায়ের চোখের কাঁটা। মায়ের বদ্ধমূল ধারণা – অমলের কারণেই তার সোনার ছেলেটা উচ্ছন্নে যাচ্ছে। ঘরে থাকতে চায় না …।

মায়ের ধারণা যে ঠিক না, মাকে কী করে বোঝাই? আমি অমলের সঙ্গে না-গেলে ও আমাকে নিতে পারবে কেন? সাধুসঙ্গ যে আমাকেও চুম্বকের মতো টানে। করোটির ভেতর অণুক্ষণ মৌমাছির মতো গুনগুন করে – ‘কেন বান্ধ দালানঘর …।’

মা একটা সিদ্ধান্ত নিল। জোয়ান ছেলে ঘরে থাকতে না-চাইলে মায়েরা এই সিদ্ধান্তই নেয়। কাশেমের বিয়ে দিতে হবে। ঘরে বউ এলে বাইরের টান আপনাআপনি বন্ধ হয়ে যাবে …।

একদিন সকাল থেকে খুব বৃষ্টি। চকে যাইনি। ঘরের বারান্দায় বসে পলো বানাচ্ছি। পলো চেপে মাছ ধরে আমি খুব আনন্দ পাই। পলোর ভেতর মাছ খলবল করে, এই শব্দ যেন আমার বুকের ভেতরেও সঞ্চারিত হয়। যা হোক, মা এসে আমার কাছে বসলো। হাসি হাসি মুখ …।

মা বললো – ‘কাশেম, তরে একটা কথা কই …।’

‘কী কথা, মা? কও …।’

‘তর জন্য পাত্রী ঠিক করছি। খলদবাড়ি। চান্দের আলোর মতো ফুটফুটে ম্যায়া। আমার ভারি পছন্দ। সামনের মাসেই বিয়া …।’

‘সামনের মাসেই আমার বিয়া! কও কী? এই বয়সেই …?’

‘তর বাপে যেদিন আমারে বিয়া করে তার বয়স আরো কম আছিল …।’

মা পাত্রী পছন্দ করেছে। দিনক্ষণও মোটামুটি ঠিক করে ফেলেছে। কিন্তু মন্দিরাকে আমি কী বলবো? মেয়েটিকে যে আমি কথা দিয়েছি …।

মন্দিরা অমলের ছোট বোন …।

অমলের সুবাদেই ওদের বাড়িতে আমার অবাধ যাতায়াত। কাকা-কাকিমাও আমাকে ছেলের মতোই আদর-স্নেহ করে। নারকেলের নাড়ু, মোয়া-মুড়কি খেতে দেয়। হিন্দু হলেও এই বাড়ির মানুষের শুচিবাই কম। আমি ওদের শোবার ঘরেও ঢুকতে পারি। রাতের বেলাও বাংলাঘরে বসে মন্দিরার সঙ্গে গল্প করতে পারি। কাকা-কাকিমা তো নয়ই, মন্দিরার দাদা-বউদিরাও কিছু মনে করে না …।

অমল তো মাঝে-মধ্যেই দেড়-দু মাস বাড়ির বাইরে থাকে। বলা যায় – নিখোঁজ। কোথায় আছে একটা খবর কি চিঠি পর্যন্ত পাঠায় না। আমি তখনো ওদের বাড়িতে যাই। মন্দিরার সঙ্গে বাংলাঘরে বসে গল্প করি। বাঁশি বাজাই …।

মন্দিরা আমার সামনেই বড়ো হয়ে উঠলো। নাইনে পড়ে। দেখতে ঠিক যেন দেবী দুর্গা। ত্রিনয়না। দুই ভুরুর গোড়ায় একটি বাড়তি চোখ। জারুল ফুলের মতো গাঁয়ের রং। আমরা যখন মুখোমুখি বসে গল্প করি, আমার বুকের ভেতরে যেন ঢেঁকির পাড় পড়ে। ওর হাত-দুটো একটু ছুঁয়ে দেখতে খুব ইচ্ছে করে। কিন্তু এই লোভ আমি প্রাণপণ চেষ্টা করে সংবরণ করি। কাকা-কাকিমা, মন্দিরার দাদা-বউদিরা – এই বাড়ির সবাই আমাকে বিশ্বাস করে। আমি তাদের বিশ্বাসভঙ্গ করতে পারি না। মন্দিরাই বা বিষয়টা কীভাবে নেবে, তাও তো আমার জানা নেই …।

কোনো-কোনোদিন শুরুতেই মন্দিরা বলে – ‘কাশেমদা, আজ কোনো গল্প নয়, বাঁশি বাজাও …।’

মন্দিরা আড়বাঁশির সুর খুব পছন্দ করে। আমি বাঁশি বাজাই, ও আমার মুখের দিকে তন্ময় হয়ে চেয়ে থাকে …।

এক চাঁদনি রাতে বাঁশি বাজাচ্ছি। ঘরের ভেতর থইথই করছে অপরিমেয় সুর। মন্দিরা যেন সুর-সায়রে ডুব দিয়েছে। ওকে আমি দেখতে পাচ্ছি না। একসময় বাঁশি বাজানো বন্ধ করতেই মন্দিরা শুশুকের মতো ভেসে উঠলো। মেয়েটি নিঃশব্দে কাঁদছিল। চোখ-মুখ ওড়না দিয়ে মুছে কেমন যেন একটা ঘোরলাগা স্বরে মন্দিরা বললো – ‘দাদা, তোমার হাত-দুটো একটু ধরবো …।’

আমি চমকে উঠলাম। কী বলে এই মেয়ে! বললাম – ‘আমার হাত ধরবি? কেন …?’

‘যে-হাতে তুমি বাঁশি ধরো, সেই

হাত-দুটো একটু ছুঁয়ে দেখতে চাই …।’

আমি মনে মনে যা চেয়েছি কিন্তু নানা দ্বিধাদ্বন্দ্বে মুখ ফুটে চাওয়ার সাহস পাইনি, মন্দিরা তাই চাইছে। এর অর্থটা যে কী, তা তো আর ভেঙে বলার দরকার হয় না। আমার মনের ভেতর জাগে, মন্দিরা আমাকে ভালোবাসে। কিন্তু আমি হাত বাড়াতে সাহস পাই না। মন্দিরা একবার আমার হাত ধরলে, আমাদের ভবিষ্যৎ কী, কে জানে …!

মন্দিরা হয়তো বুঝতে পেরেছিল – আমি ভয় পাচ্ছি। মেয়েটি হঠাৎ আমাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে শুরু করলো – ‘কাশেমদা, তুমি আমার কৃষ্ণ, আমি তোমার রাধা …।’

অতঃপর আমরা সত্যিকারের রাধা-কৃষ্ণ হয়ে উঠলাম। তখন জোছনা গলে গলে টুপটাপ পড়ছিল টিনের চালে …।

আমরা প্রকৃত অর্থেই তখন রাধা-কৃষ্ণ হয়ে উঠেছি, এ-কথা ঠিক; লৌহজংয়ের তীরে অভিসার করি, কিন্তু আমার ভেতরে যে একটা ভয়, শংকা ও ভীতসন্ত্রস্ত ভাব, এটা আমি কাটিয়ে উঠতে পারি না। কাকা সচ্ছল গেরস্ত। সরকারি চাকরিও করে। ওভারশিয়ার। মন্দিরার দাদারাও, একমাত্র অমল ব্যতিরেকে, সবাই শিক্ষিত। আমার তো দেওয়ার মতো কোনো বংশপরিচয়ই নেই। সর্বোপরি আমি মুসলমান, মন্দিরা হিন্দু – এই বিভেদের কারণেই তো সমাজে মারামারি-কাটাকাটি শুরু হয়ে যেতে পারে, এর আগেও নাকি গাঁয়ে দু-চারবার এই অসামাজিকতার কারণে দাঙ্গা হয়েছে। বালক-বয়সে আমরা শুনেছি, আমাদের বড়োভাইয়েরা আগে থেকেই জানে, স্বাধীনতার দু-বছর আগে, শেখ সাহেব তখন জেলে, দেশে উত্তাল আন্দোলন, ঠাকুরবাড়ির বড়ো মেয়ে কিনু তালুকদার বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসে মণ্ডলবাড়ির ছেলে আলাউদ্দিনকে বিয়ে করেছিল। দুজনই নাকি একসঙ্গে কলেজে পড়তো, আলাউদ্দিন সা’দত কলেজে, কিনু কুমুদিনী কলেজে। দুজনে একসঙ্গে কলেজে যেতো, একসঙ্গে ফিরে আসতো। এরই মধ্যে দেশে আন্দোলন শুরু হয়ে গেছে, দুজনেই যার যার কলেজে আন্দোলনে যোগ দিয়েছে, আন্দোলনের মধ্যেই কখন যেন দুজনের মনবদলও হয়ে গেছে। এই নিয়ে গাঁয়ে হিন্দু-মুসলমানে দাঙ্গা। দাঙ্গায় দুপক্ষের তিনজন খুন হয়েছিল। একজন ঠাকুরবাড়ির, দুজন মণ্ডলবাড়ির ভাড়াটে লাঠিয়াল …।

তখন ঠাকুরবাড়ির প্রতাপ অত্যন্ত প্রবল। জমিদারি নেই বটে, কিন্তু জমিদারের রক্ত তো আছে শরীরে। হুকুম-বরদারেরও ঘাটতি নেই। গাঁয়ের মুসলমান কেউ জুতা পায়ে কিংবা ছাতা মাথায় ঠাকুরবাড়ির সম্মুখ দিয়ে যেতে পারে না। কেউ হঠাৎ ভুল করে বসলে পাইক-বরকন্দাজরা তাকে ধরে এনে চাবকিয়ে তার পিঠের ছাল তুলে ফেলে …।

স্বাধীনতার পরপর এই ঠাকুরবাড়ির ছোট মেয়ে চিনু আন্দ-ঠাকুরের বাড়িতে এসে ওঠে …।

নাম আন্দ-ঠাকুর কিন্তু সে হিন্দু না। আসল নাম আমজাদ আলী মণ্ডল। দেশবিভাগের সময় বিশ্বনাথ ঠাকুর কলকাতা চলে যায়। আমজাদ আলী মণ্ডল তখন বিশ্বনাথ ঠাকুরের বাড়ি কিনে রেখেছিল। সেই বাড়িতেই বসতি স্থাপন করেছে আমজাদ মণ্ডল। … আর তখন থেকেই তার নাম হয়েছে আন্দ-ঠাকুর …।

যা-হোক আন্দ-ঠাকুরের মেজো ছেলে আতোয়ার যুদ্ধে গেছিল। মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ায় পাকিস্তানি হানাদাররা তাদের ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দিয়েছিল। এখন গাঁয়ে আতোয়ারের যেমন সম্মান, প্রভাব-প্রতিপত্তিও প্রচুর। যুদ্ধের আগেই নাকি ঠাকুরবাড়ির ছোট মেয়ে চিনুর সঙ্গে তার সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল …।

কিনু বাড়ি ছেড়ে এসেছিল, তাতে গাঁয়ে দাঙ্গা লেগেছিল; কিন্তু শোকর-আলহামদুলিল্লাহ, চিনু বাড়ি ছাড়বার পর গাঁয়ে দাঙ্গা লাগেনি। তখন আমাদের বয়স কম, তবুও কানে এসেছে, ঠাকুরবাড়ির কর্তামা নাকি বাড়ির তুলসীতলায় পূজায় বসে প্রার্থনা করতো – আতোয়ার আর চিনু যেন রক্তবমি করে মরে, তাহলে সে মা-কালীর মন্দিরে জোড়া পাঁঠা বলি দেবে। আন্দ-ঠাকুরের বউও নাকি নামাজে বসে কান্নাকাটি করতো। আল্লাহর দরবারে দু-হাত তুলে বলতো – ‘হে আল্লাহমাবুদ, তুমি আমার ছেলে আর ছেলেবউকে হায়াত দারাজ করো, আমি জোড়া ষাঁড় কোরবানি দেবো …।’

আমি মণ্ডলবাড়ির ছেলে বা মুক্তিযোদ্ধা নই যে, কোনো হিন্দুঘরের মেয়ে আমার ঘরে চলে এলে আমার পক্ষ হয়ে কেউ দাঙ্গা করবে। আমি নিশ্চিত জানি, মন্দিরার বাবা আমাকে ধরে নিয়ে হাঁড়িকাঠে ফেলে পাঁঠার মতো বলি দিলে রক্তের ফোয়ারাই শুধু ছুটবে, কেউ বাধা দিতে আসবে না। আর অমল মনে করবে – বন্ধুবেশে ওদের বাড়িতে ঢুকে আমি চরম বিশ্বাসঘাতকতা করেছি। সুতরাং, কাশেম, সময় থাকতে তোমার সাবধান হওয়া উচিত …।

আমরা এখন নিয়মিত অভিসার করি। মধ্যরাতে মন্দিরা কীভাবে ঘর থেকে বেরিয়ে আসে দস্যি এই মেয়েটাই তা জানে, আর জানে ওর ভগবান। আমরা লৌহজংয়ের বালুচরে শুয়ে শুয়ে জোছনা পান করি। বালিহাঁসের মতো লুটোপুটি খাই। সবই করি, কিন্তু আমার আড়ষ্টতা কাটে না। আমি উষ্ণ হতে পারি না। কে যেন অদৃশ্য থেকে ফিসফিস করে বলে – ‘কাশেম, সাবধান হও। এখনো সময় আছে …।’

মন্দিরা বোধহয় সবই বোঝে। ওর চোখ-দুটো আকাশের শুকতারার মতো জ্বলজ্বল করে। আমার হাত-দুটো ধরে, দুই হাত ওর দুই স্তনের ওপর স্থাপন করে বলে – ‘তুমি এতো ভয় পাও কেন, কৃষ্ণ …?’

‘আমরা বোধহয় ভুলপথে হাঁটছি

রাধা …।’

‘কী রকম …!’

‘তুমি কোন ঘরের মেয়ে আর আমি কোন ঘরের ছেলে একবার ভেবে দেখেছো …?’

‘ভেবেছি …।’

‘তুমি লেখাপড়া জানা মেয়ে। নাইনে পড়ো। আমি চাষার পোলা চাষা। তাও আবার বর্গাচাষী। লেখাপড়া মাত্র ফাইভ পাশ। হাইস্কুলের মাঠে পা রাখি নাই …।’

‘জানি …।’

‘জাত-ধর্মের প্রশ্নটাও তো ভুলে গেলে চলবে না। তুমি হিন্দু, আমি মুসলমান …।’

‘তোমার সাঁইজি বলে গেছেন, তুমি বলো, অমলদাও বলে, ধর্মের নামে মানুষের মধ্যে বিভেদ তৈরি করতে নেই। এখন তবে এই প্রশ্ন কেন তুলছো, কৃষ্ণ …!’

মন্দিরার বুকে আমার হাত। এবার হাত দুটো ও নিজের হাতের মধ্যে চেপে ধরে বললো – ‘কথা দাও কৃষ্ণ …।’

আমার স্বভাব উড়নচণ্ডী কিন্তু আমি মায়ের খুবই ভক্ত, অনুরক্ত। আমি কখনোই মায়ের কোনো কথার অবাধ্য হই না। জানি তো, কতো কষ্ট করে মা আমাদের মানুষ করেছে। আমি মায়ের পছন্দের পাত্রীকে বিয়ে করতে রাজি হই। শাওন মাসের তৃতীয় শুক্রবার, ঘনঘোর বৃষ্টির রাতে সুফিয়াকে নিয়ে বাসর করি। মা বাড়িয়ে বলেনি। সুফিয়ার মুখটা সত্যিই চাঁদের মতো সুন্দর। কিন্তু বিপদ হলো এই, আমি সুফিয়ার মুখমণ্ডলে সুফিয়ার মুখ নয়, মন্দিরার চোখ-মুখ দেখছিলাম …।

অমলের চিৎকার-চেঁচামেচিতে আমার ঘুম ভেঙে গেলো। ‘কাশেম, কাশেম, তাড়াতাড়ি ওঠ। সর্বনাশ হয়েছে …।’

এতো সকালে অমল! ও বাড়িতেই বা এলো কবে? আজ রাতেই বুঝি এসেছে। কিন্তু কার কী সর্বনাশ হলো …?

আমি ঘরের দরজা খুলে বেরুতেই অমল কাঁদতে কাঁদতে বললো – ‘কাশেম, মন্দিরাকে তুই ধরে রাখতে পারিল না। ও চলে গেছে …।’

‘চলে গেছে মানে? কী বলছিস তুই অমল …?’

‘মন্দিরা আত্মহত্যা করেছে। বাড়ির পেছনে গাবগাছের ডালে ঝুলছে …।’

অমল যে বললো – ‘মন্দিরাকে তুই ধরে রাখতে পারলি না’ – এ-কথার অর্থ কী? আমাদের সবকিছু কি জেনে গেছিল অমল …?

মা ভেবেছিল – ঘরে বউ এলে তার কাশেম আর ঘরের বার হবে না। ঘর-সংসার ছেড়ে বিবাগী হবে না। কিন্তু মায়ের ধারণা ভুল ছিল। সবাই মা-বাবার চাহিদামতো সবকিছু করতে পারে না। সব মানুষকে দিয়ে সবকিছু হয়ও না। ঘর-সংসার পর্যন্ত না। যেমন আমাকে দিয়েই পুরোপুরি ঘর-সংসার হয়নি। আমি ঘরে থেকেও ছিলাম না। মন চাইলেই অমলের সঙ্গে ঝোলা-কাঁধে বেরিয়ে পড়তাম। আমি মায়ের খুবই  ভক্ত-অনুরক্ত ছিলাম, সুফিয়াকেও অসম্ভবপর ভালোবাসতাম, কিন্তু আমি যখন বাইরের ডাক পেতাম, এই ডাক শুনে ডাহুক-পাখির মতো মা কিংবা বউ, পরবর্তীকালে ছেলে-মেয়েরা, কেউ আমাকে আটকাতে পারতো না …।

আমি বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়লেই মা আহাজারি করতো …।

সুফিয়া গোপনে কেঁদে-কেটে বুক ভাসাতো …।

আমার কাঁধে ঝোলা-ব্যাগ দেখলেই ছেলেমেয়েরা বুঝে ফেলতো – এখন আর কিছুদিন বাবাকে কাছে পাওয়া যাবে না। কান্নাকাটি করে লাভ নেই …।

আমি বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ছি, মা কাঁদতো কিন্তু কিছুই বলতো না। সে তো জানে – এখন কাশেমকে কোনো কথা বলে লাভ নেই। বাড়ির গরু-বাছুরগুলোর চোখ পর্যন্ত টলমল করতো। বোবা প্রাণী ওরা। কিছুই বলতে পারতো না …।

সুফিয়াও সাধারণত, আমি যাত্রা শুরু করলে বলতো না কিছুই। কিন্তু একদিন হঠাৎ ও গোখরো সাপের মতো ফোঁস করে উঠলো। দুপুরবেলা। আমি বেরিয়ে যাচ্ছি। সুফিয়া বললো – ‘তুমি কি মন্দিরার শোকেই ঘরে থাকতে চাও না …?’

‘মন্দিরা …!’

‘তোমার রাধা …।’

সুফিয়ার সঙ্গে যে-রাতে বাসর করি ওই রাতেই মন্দিরা আত্মহত্যা করে। অমল আমাদের সম্পর্কে কিছু জেনে থাকলেও জানতে পারে, কিংবা কিছু একটা অনুমান করেছিল অমল, তাছাড়া অনুমান করি, বিশ্বাসও করি, আমাদের প্রেম-ভালোবাসা-অভিসার, মন্দিরা-কাশেমের রাধা-কৃষ্ণের সংকীর্তন – এসব বিষয়ে গাঁয়ের কেউ কিছু জানে না। কাকা-কাকিমা, এমনকি অমলের দাদা-বউদিরাও কেউ কিছু জানে কিংবা কেউ কিছু টের পেয়েছিল; কোনোদিনই তার কোনো আভাস পাইনি। কিন্তু আজ সুফিয়ার মুখে এ কী কথা …!

আমি এক অর্থে, অন্তত এতোটুকু বেঁচে গেছিলাম যে, অমল ওই একদিনই, মন্দিরা যেদিন আত্মহত্যা করে, ওইদিন একবার শুধু বলেছিল – ‘কাশেম, মন্দিরাকে তুই ধরে রাখতে পারলি না?’ অমল আর কোনোদিন আমার সামনে মন্দিরার প্রসঙ্গ উত্থাপন করেনি। কিন্তু আজ, এতোদিন পরে সুফিয়া বললো – আমি নাকি মন্দিরার শোকে ঘরত্যাগ করি …।

‘কাশেম, তুমি কেন ঘরত্যাগ করো …?’

‘কাশেম, তোমার তো এখন

সুখ-উপচানো সংসার। তারপরও কেন ঘরে থাকতে চাও না …?’

‘কাশেম, তুমি কি এখনো মন্দিরার শোকে উতলা হও? তার শোকেই

ঘর-সংসারের প্রতি তোমার বিতৃষ্ণা …?’

কার কাছে আছে এইসব প্রশ্নের উত্তর …?

অমল জানে আমি আর মন্দিরা লৌহজংতীরে অভিসার করেছি, সুফিয়া জানে – মন্দিরার শোকেই ঘর-সংসার আমার ভালো লাগে না; অথচ দেখো, আমার মনে হয়, এসবের কিছুই আমি জানি না। কেন ঘরত্যাগ করি তার বিন্দুবিসর্গও আমার জানা নেই। আমি শুধু এইটুকু জানি, বহু আখড়ায় সাধুসঙ্গে শুনেছি, বিশ্বাসও করি, মিছে এই জগৎ-সংসার …।

অমল বেঁচে থাকতে, শুধু ওর একটু ইঙ্গিত পেলেই, ঘর থেকে বেরিয়ে পড়তাম। যখন মা বেঁচে ছিল, চেয়ে চেয়ে দেখতো, মনে মনে অমলকে অভিসম্পাত দিত, মুখে কিছুই বলতো না। মায়ের মৃত্যুর পর সুফিয়া চেয়ে চেয়ে দেখেছে; হয়তো অভিশাপ দিয়েছে পরপারের বাসিন্দা মন্দিরাকে, মুখ ফুটে আমাকে কিছু বলেনি। একটা বিষয় পরিষ্কার ছিল, মা জানতো, সুফিয়াও জানে, আমি খুব বেশিদিন বাড়ির বাইরে থাকবো না। পাঁচ কি সাত দিন, খুব বেশি হলে পনেরোদিন। তারপরই আমি আসবো। এ-কারণে হয়তো বাড়ির কেউ আমার জন্য দুশ্চিন্তাও করতো না। তারা ধরেই নিয়েছিল – দুনিয়ায় বিরল নয় এরকম মানুষ …।

এই যে সাধুসঙ্গ করতে বেরিয়ে কদিন যেতে না-যেতে আমি বাড়ি ফেরার জন্য উতলা হয়ে উঠতাম, মায়ের মুখ, সুফিয়ার মুখ, সন্তানদের মুখ, এমনকি বাড়ির

গরু-বাছুরগুলোর মুখও মনে পড়তো; আর এই মুখগুলো দেখার জন্য বাড়ি চলে আসতাম, এজন্যে অমলের কম বকাঝকা আমাকে শুনতে হয়নি। অমল তো তিনমাসের আগে কখনোই বাড়িমুখো হতো না। পাঁচ-ছয় মাসও কখনো কখনো কাটিয়ে দিত আখড়ায় আখড়ায় ঘুরে। তো, অমল আমাকে খুব মোলায়েম ভাষায় যা বলতো, তা ছিল এরকম – ‘তোকে দিয়ে কিছুই হবে না রে কাশেম। ঘর-সংসারের প্রতি তোর বড়ো বেশি টান। নশ্বর এই পৃথিবীতে, নশ্বর জীবের প্রতি এতোটা মায়ায় জড়ালে তার পক্ষে পরম সিদ্ধিলাভ সম্ভব না …।’

অমলের মাথার কাছে বসে ছিল কাকিমা। অমল যেন দেহত্যাগ করেনি। ঘুমিয়ে আছে মাত্র। সেই সৌম্যকান্তি চেহারা। চোখ দুটো রঙিন মার্বেলের মতো জ্বলজ্বল করছে। আমিও ওর মাথার কাছেই বসলাম। কী আশ্চর্য! আমাকে দেখেই অমল দিব্যি জীবিত মানুষের মতো বললো – ‘কাশেম, এসেছিস ভক্তে। তোকে একটা কথা বলি। এখনো সময় আছে। পথে বেরিয়ে পড়। এই সমাজ-সংসার, মা-বাবা, ভাই-বোন, স্ত্রী-সন্তান – কেউ আসলে নিজের মানুষ না। যখন সময় হবে, দেখবি, চারপাশে কেউ নেই। তোর পারের কড়ি তোকেই জোগাড় করতে হবে …।’

সেদিনই সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করে ফেললাম – ঘর-সংসার আর না। ঘরের মায়া, সংসারের মায়া; সকল পিছুটান সাপের খোলস ফেলে দেওয়ার মতো ঝেড়ে ফেলে এবার পথে নামতে হবে …।

যেদিন বেরিয়ে পড়লাম, সকাল থেকে খুব বৃষ্টি। বাড়ির উঠানে পা-ডোবা পানি। পথে হাঁটুপানির কম না। আমি বেলা এগারোটার দিকে ছাতা-মাথায় বেরিয়েছি। সুফিয়া বারান্দায় বসে চাল ঝাড়ছিল। আমাকে বেরুতে দেখে কিছু বললো না। সে ভেবেছে, এই লোক এখন মদনসাধুর আখড়ায় যাবে। এই লোকের তো বৃষ্টি নামলেও সিদ্ধির টান বাড়ে, কড়া রোদ উঠলেও সিদ্ধির টান বাড়ে …।

আমি গেরুয়া পোশাক পরিনি, ঝোলা-ব্যাগও কাঁধে তুলিনি যে সুফিয়া বুঝবে, আমি দূরে কোথাও যাচ্ছি। যদি দুপুরে কিংবা রাতে বাড়িতে ফিরে না-আসি, সুফিয়া হয়তো ভাববে, আমি মদনসাধুর আখড়ায়ই আছি। পরদিন কিংবা দুদিন কি পাঁচদিনেও যদি আমার দেখা না-মেলে, সুফিয়া তখন ধরে নেবে – অমল তো নেই, অন্য কোনো শয়তান হয়তো জুটেছে, তার সঙ্গে দূরের কোনো আখড়ার উদ্দেশে বেরিয়ে পড়েছে লোকটি। কদিন গেলেই ফিরে আসবে। লোকটির যা স্বভাব …!

পাদটীকা কোথায় যাবো তা ঠিক করে বের হইনি। কতো আখড়ায়, কতো গুরুর মুখে শুনেছি – পথে নামলে পথই পথিকের পথপ্রদর্শক হয়ে ওঠে। আমিও সেই বিশ্বাস নিয়েই বেরিয়েছি। সারাদিন, সুফিয়া যা ভেবেছে, তাই ঠিক, মদনসাধুর আখড়ায় ছিলাম। কোনো সাঙাৎকে কিছু বলিনি। সন্ধ্যার দিকে বৃষ্টি ছুট দিলে বেরিয়ে পড়ি। হাঁটতে হাঁটতে ঘারিন্দা রেলস্টেশনে চলে এসেছি। রাত এগারোটায় কুষ্টিয়ার ট্রেন। এর আগে উত্তরের কোনো ট্রেন নেই। ঢাকার ট্রেন আসছে। ঢাকা যাবো না। আবার বৃষ্টি নেমেছে। ভাবলাম – স্টেশনের একটা বেঞ্চে শুয়ে কিছুক্ষণ ঘুমিয়ে নিই। সারাদিন সিদ্ধিসেবন করেছি। এখন ঘুমে চোখের পাতা ভারী হয়ে উঠছে। শুতে না-শুতেই ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। কখন দুই ঘণ্টা কেটে গেছে টের পাইনি। হঠাৎ লোকজনের শোরগোলে ঘুম ভেঙে গেল। কুষ্টিয়ার ট্রেন এসেছে। টিকেট কেটে রেখেছিলাম। ট্রেনে উঠে পড়লাম। ‘গুরু, সাঁইজি, প্রথমেই প্রণাম করতে চাই তোমার পুণ্যভূম …।’

Leave a Reply