এক বেশ্যা অনায়াসে ভিতরমন্দিরে ঢুকে যায়

বুদ্ধ মন্দিরের দরজা বন্ধ হয়ে গেল

এক বেশ্যা ঢুকে যায় পেছন-দুয়ার ঠেলে

দাঁড়ায় বৃদ্ধের ঠিক পাশে;

দুটি দেবদারু দেয় দ্বারপ্রান্তে সযত্নে পাহারা

কেউ যেন বুঝতে না পায়,

কবিতা কি শুধু আবেগ আর প্রেমের, শুধুই কি বৃক্ষ, অরণ্য আর নীরবতার?

প্রেম-প্রণয়ের বিপরীতে কবিতা যে অস্পৃশ্যতার বিরুদ্ধে নীরব প্রতিবাদ হয়ে উঠতে পারে, কবি অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত তাঁর প্রমাণ। বেশ্যারা এখনো এই বাঙালির সমাজবহির্ভূত, অস্পৃশ্য এবং ঘৃণ্য। কিন্তু আলো নিভিয়ে যে নাগরিক ছুঁয়ে দেয় তাদের শরীর তারাই তো পরদিন মন্দিরে গিয়ে পুজো দিয়ে আসে। তাহলে বেশ্যার শরীর-ছোঁয়া-পুরুষের মন্দিরে অনুপ্রবেশে কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। কিন্তু সমাজের এই ঘৃণ্য তকমা যাদের কপালে লেখা তাদের মন্দিরে প্রবেশ আজীবনের জন্য নিষিদ্ধ, কারণ তারা যে নিষিদ্ধ নারী। তাহলে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সেই অমর এবং চিরসত্য বাক্যটি উঠে আসতে পারে : ‘ঈশ্বর থাকেন ওই ভদ্র পল্লীতে, এখানে তাহাকে খুঁজিয়া পাওয়া যাইবে না।’ (পদ্মা নদীর মাঝি)।  সমাজের এই বিভাজন, এই শ্রেণিবৈষম্য, জাতপাতের ধুয়ো তুলে যারা মানুষকে একেবারে আলাদা করে রেখেছে তাদের বিপরীতে দাশগুপ্তের কবিতা মর্মভেদী স্লোগান হয়ে উঠুক। শ্রমণ মানে বৌদ্ধ ভিক্ষু জানতে পারলে যাচ্ছে না তাই ঘটে যাবে তাই সেদিন বৃদ্ধটিও হতভম্ব হয়ে গিয়েছিল তাদের নিঃশব্দ আগমনে। এটা হচ্ছে অলোকরঞ্জন দাশগুপ্তের ‘এক বেশ্যা অনায়াসে ভিতরমন্দিরে ঢুকে যায়’ কবিতার মূল ভাব। কবিতার শিরোনামে রয়েছে নিখুঁত নান্দনিকতা : ‘ভিতরমন্দিরে’ শব্দটা রূপালঙ্কারে সেজে উঠেছে, আর ‘অনায়াসে’ শব্দটার সঙ্গে বাধাহীন এক সাবলীলতার প্রকাশ ঘটেছে এখানে। কবিতা তখনই একটি পরিপূর্ণ কবিতা হয়ে ওঠে, যখন সে-কবিতায় নান্দনিকতার পাশাপাশি কোনো বার্তা থাকে বা কোনো সত্য প্রকাশের সাহসী গুঞ্জন থাকে। ছোট্ট একটি শব্দ যখন হয়ে ওঠে বিশাল প্রতিবাদের তীক্ষ্ণ ভাষ্য তখন তা কবিতাকে আরো শানিত করে। কবিতা তখন শুধু বইয়ের পাতায় পড়ে থাকা শব্দ নয়, বরং তা হয়ে ওঠে গণমানুষের। একই কবিতায় যখন তিনি লেখেন – ‘গাছ, ফুল, শ্রমণের ঘন ঘুম যাকে/ ভীষণ সাহায্য করে সে-নিষিদ্ধ নারী।’ নারী অবশেষে নিষিদ্ধই রয়ে যায়। তবু, কবিতার ভেতর দিয়ে যে-ধারালো প্রতিবাদ থাকে তা সাহিত্যের আর কোনো মাধ্যমে ততটা জোরালো আবেদন পাওয়া যায় না। কবিতা তো বদলে দিতে পারে সামাজিক অরাজকতা, বিরুদ্ধ-স্লোগান হয়ে উঠতে পারে যে-কোনো অন্যায়ের।

প্রথাবিরোধী লেখক হুমায়ুন আজাদের কথায় – ‘আমি জানি সবকিছু নষ্টদের অধিকারে যাবে।’ তিনি বহু আগে টের পেয়েছিলেন বাঙালির শাশ্বত আর সুন্দর যত কিছু রয়েছে অহঙ্কার করার মতো তার কোনো কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না। আজ চারিদিকে মৌলবাদীদের হুঙ্কার, শৌর্যে গর্জে ফুলে-ফেঁপে ওঠা ওরা এখন সমাজপতি। যে- দেশে প্রকাশ্যে খুন হয়ে গেলেও সঠিক বিচার হয় না সে-দেশে রাস্তার মোড়ে চুমু খেলে রাষ্ট্রীয় অনুভূতি প্রশ্নবিদ্ধ হয়। সেই  মৌলবাদী চিন্তা-চেতনার হুঙ্কারে আজ অনেকেই তারা তাদের মুক্তচিন্তাকে মুক্তি দিতে পারছে না। কবি একটি চুম্বনের প্রার্থনা করতে যেখানে ভীতসন্ত্রস্ত সেখানে মৌলবাদীদের আশকারা কোথায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে! অথচ সমাজে শিশু ধর্ষণের মতো পৃথিবীর জঘন্যতম অপরাধের বিরুদ্ধে কেউ মিছিলে নামে না। কী আশ্চর্য এই ঘুণে খাওয়া অপ্রচলিত সমাজব্যবস্থা! বিশাল অট্টালিকা, হাইওয়ে, ফ্লাইওভার আর মেট্রোরেল নিয়ে বিলাসিতার দিবাস্বপ্ন যারা দেখছেন তারা কি জানেন শিল্প-সংস্কৃতির উন্নয়ন ছাড়া একটি দেশের সুদূর ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল হতে পারে না। কবি-সাহিত্যিকদের মধ্যে দর্শনগত অনেক দিকনির্দেশনা পাওয়া যায়। কারণ তাঁরা বিশ্বের শিল্প, সংস্কৃতি, অর্থনীতি নিয়ে পড়াশোনা করেন, গবেষণা করেন। তাঁরা জানেন মানুষের মননশীলতার উন্নয়ন ছাড়া কোনো জাতি মুক্তি লাভ করতে পারে না। কবি অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত তাঁর কবিতার মধ্যে এঁকেছেন দর্শনীয় মতবাদ। হুমায়ুন আজাদের মতো তিনিও হয়তো জেনেছেন ভালো কিছু সুসংরক্ষিত না হলে তা নষ্টমানুষদের কব্জির মধ্যে শোষিত হয়। কবির মতো যাঁরা বিশ্বকল্যাণের জন্য প্রার্থনা করেন তাঁদের বিরুদ্ধে স্লোগান উজ্জীবিত হয়। বিশ্বকল্যাণের জন্য কী প্রার্থনা করতে চেয়েছেন কবি, চুম্বন! সব চুম্বনই কি যৌনতার সিম্বল বহন করে, সব চুম্বনই কি অশ্লীলতাকে সমর্থন করে? কখনো চুম্বনের মাঝেই থাকে আশীর্বাদের নিখাদ চিহ্ন। কবি আশীর্বাদের প্রত্যাশা করেছেন, একটি কল্যাণের জন্য প্রার্থনা করেছেন। কিন্তু শানিত তরবারি যখন ধেয়ে আসে কবিকে লক্ষ করে তখন সব প্রত্যাশার আলো যেন একখণ্ড বিশাল অন্ধকারে ছেয়ে যায়। কবি দাশগুপ্ত তাঁর ‘মৌলবাদী নই’ কবিতায় লিখেছেন –   

লুপ্ত হয়ে যায় শরীর, আমি আজ বিশ্বকল্যাণে

তোমার চুম্বন করেছি প্রার্থনা। মশাল জ্বেলে কারা

এখুনি ছুটে গেল, মৌলবাদী ওরা বলেই একজন

সে-দলে ভিড়ে গিয়ে আমার উদ্দেশে দেখাল তর্জনী;

এত সহজ আজ দৃষ্টিকোণগুলি নিপুণ অনায়াসে

বদল করে নেয়া! দলে না গিয়ে তবু তোমার চুম্বন

দাবি করেছি বলে ছোরা শানিয়ে ওরা আমায় ঘিরে আসে।

অলোকরঞ্জন দাশগুপ্তের কিছু কিছু কবিতা সিম্বলিক। কবিতার শিরোনাম, কবিতার মূল শরীর থেকে বেশ আলাদা, অর্থাৎ সিম্বলিকের কারুকাজ লুকিয়ে আছে তাঁর কবিতায়। একজন সুপাঠককে কবিতার ভেতর থেকে অন্তর্নিহিত অর্থ খুঁজে নিতে হয়। কবি যখন কবিতার শিরোনাম দিচ্ছেন ‘পথ ঢেকেছে মন্দিরে মসজিদে’ তখন স্বভাবতই নিজ দেশের ধর্মীয় সংস্কৃতির কথা বলছেন। কিন্তু কবিতার অর্থ করলে যা দাঁড়ায় তা হলো : কবি বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করেছেন, কিন্তু কোথাও উন্মুক্ত আকাশ পাননি, যেখানে লেনিনগ্রাদের অপরূপ সৌন্দর্যকে উপভোগ করতে চেয়েছিলেন সেখানেও সহিংস দৃষ্টি ফিরে যেতে বাধ্য করেছে কবিকে। ফেরার পথে হয়তো তিনি নিজের দেশের অবকাঠামো, জলবায়ু, প্রকৃতিকে বারবার স্মরণ করেছেন। সবসময় যে কবিকে বোঝা যাবে তা নয়, তবে কবির চিন্তাসমগ্র থেকে কিছু বুঝতে পারা খুব কঠিন নয়। তখন কবি লেখেন –    ‘ফিরে আসার রাস্তা জুড়ে ভাবি/ যেখানে থেকে রওনা হয়েছিলাম/ সেখানেতেও নেই আমাদের ভিসা?’ কবি চেয়েছেন মুক্তির আনন্দ, কবি চেয়েছেন এই নশ্বর পৃথিবী যেন একটি মাত্র ভূখণ্ডে পরিণত হয়, যেন উন্মুক্ত সিগালের মতো কখনো বাল্টিক থেকে প্রশান্ত মহাসাগর পাড়ি দিতে পারেন অনায়াসে, নির্দ্বিধায়, নিঃসংকোচে। কাঁটাতারবিহীন পৃথিবীর কথা চিন্তা করে ব্রিটিশ ক্যারিবিয়ান কবি বেঞ্জামিন জেফানাইয়া, ব্রিটিশদের উদ্দেশে এমন করে বলেছেন – এই ভূখণ্ড একদিন কারোর অধিকারে ছিল না, একদিন সব শূন্য ছিল, তাহলে আজ কেন এখানে বসবাস করতে এত বাধা?  

কবি যখন বার্লিনে বসে উপলব্ধি করেন, পৃথিবীর এই কাঁটাতার, এই বিভেদের বেড়াজাল, হিংসা-বিদ্বেষের কাদা-ছোড়াছুড়ি তখন মুক্তির আনন্দ কোথায়? মানুষ কি একই গণ্ডির মধ্যে থেকে জীবনের সঞ্চিত দিনগুলো নিঃশেষ করে ফেলবে! মানুষ কি পৃথিবী ঘুরে দেখতে পারবে না, যে এর কোনো মুলুকে কি আছে? কবি দাশগুপ্ত  বলেছেন ‘চূর্ণ করে দাও যত অলীক সীমান্ত।’ তাঁর প্রতিবাদ যেন মায়াময়, প্রেমময়; নমনীয়তা আর বিনয়ী উচ্চারণে তিনি যেন শোষণের বিরুদ্ধে লড়তে চান। প্রাণের আকুলতা দিয়ে তিনি রুখে দিতে চান ছদ্মবেশী মুখোশের আড়ালে যে-নাশকতা চুপটি মেরে থাকে। আগেই জেনেছি কবি কখন ছোরা বা বন্দুক নিয়ে তেড়ে যান না, প্রেম দিয়ে সয়ে নিতে চান ঘাত এবং ঘৃণা। এই অস্থির সময়ে তিনি শঙ্কিত নন, কিন্তু তিনি উদ্বিগ্ন। তিনি জানেন, আজকের এই চেনা বন্ধুটিও কাল অচেনা হয়ে যেতে পারে। যে প্রাণে জমা হিমালয় পরিমাণ ভালোবাসা সেখানেও নিষ্ঠুর কেউ আঘাত হানতে পারে। তাই কবি সেই মুক্তির স্বাদ খুঁজে পেতে লিখেছেন –   

উত্তর অতলান্তিকে বৃষ্টি হলে

তোমার – এখানে কেন রৌদ্র হবে

জানি তুমি ডোরাকাটা স্বাতন্ত্র্য কায়েম রাখবে বলে

থেকে-থেকে কীরকম অচেনাসমান হয়ে যাও

এমন কি কেঁপে ওঠা তোমার ডানায় যদি হাত রাখি।

রবীন্দ্রোত্তর এই কবি মনেপ্রাণে-সত্তায়-সততায় রবীন্দ্রনাথকে ধারণ করেছেন অকপটে, কিন্তু প্রতিটি লেখার ক্ষেত্রে তিনি স্বতন্ত্রতার স্বাক্ষর রেখেছেন। তিনি লেখার ক্ষেত্রে যতটা সম্ভব চেষ্টা করেছেন মৌলিক থাকার। আর এই মৌলিকতা কবি অলোকরঞ্জন দাশগুপ্তকে পৌঁছে দিয়েছে অন্যমাত্রায়। কবির জন্ম একদম আধুনিক বাংলা কবিতার জন্মোৎসবের মাহেন্দ্রক্ষণে যখন একদিকে জীবনানন্দ দাশ, অমিয় চক্রবর্তী, অন্যদিকে বুদ্ধদেব বসু। সেই ত্রিশের কবিতা পড়েই কিন্তু কবি দাশগুপ্ত জেনেছিলেন কবিতার বাঁকবদলে আধুনিক কবিতা আরো কতটা শানিত হচ্ছে। দাশগুপ্তের ছোট্ট একটি কবিতা কতটা আধুনিক এবং শিল্পগুণে কতটা সমৃদ্ধ তা পাঠ করলেও অনুধাবন করা যাবে।

চৌরঙ্গীর ফুটপাথে

আমার শতাব্দীর কামধেনু

ঢেলে দিচ্ছে কালো দুধ সীসা-রঙা

যে খাবে তাঁর মৃত্যু হবে যে খাবে না তাঁর

মূর্খতা ভালোবাসি না                   (‘চৌরঙ্গীর ফুটপাথে’) 

তবে ‘বুধুয়ার পাখি’ কবিতাটিতে রয়েছে একটু ভিন্ন সুর, একটু আলাদা রকমের বৈচিত্র্য, যেন কবি এখানে গল্প বলে যাচ্ছেন। গল্পের পাশাপাশি চিত্রকল্প ফুটে উঠছে। কবিতার মধ্যে গল্প বলে যাওয়া বেশ দেখা যায় রবীন্দ্রনাথের বেলায়ও; ‘বাঁশি’ বা ‘সাধারণ মেয়ে’ কবিতায় যে-জমাট বিষাদের গল্প রয়েছে তার কাছাকাছি যদি ভাবা যায় দাশগুপ্তের ‘বুধুয়ার পাখি’। ‘বুধুয়ার পাখি’ কবিতায় কবি যেন বুধুয়ার অব্যক্ত বা অস্ফুট কথামালাকে নিশ্চুপ অভিব্যক্তির মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলেছেন। কবি কখনো কখনো নিজের গল্প অন্যকে দিয়ে প্রকাশ করিয়ে নেন। অন্যের চোখের ক্যানভাসে এঁকে দেন

সুখ-অসুখের রেখাচিত্র। বুধুয়ার স্বপ্নকে উঁচু পাহাড়ের সীমানা পার করিয়ে এক নীল ঘেরা নিকোনো উঠোনের ঠিকানা খুঁজে দিয়েছেন। এই কবিতার মধ্যে যে দ্যোতনা, অলঙ্কার, অনুষঙ্গ, চিত্রকল্প রয়েছে তা যেন পাঠকের হৃদয়ঙ্গম করতে এতটুকু অসুবিধে হয় না। কবি দাশগুপ্ত তাঁর কবিতার মধ্যে এক টুকরো আশা বা স্বপ্নকে বপন করে দেন যাতে করে পাঠক কল্পনাকে আরো আবেগময় করে তুলতে পারে। মানুষ কল্পনাপ্রবণ এবং প্রত্যাশাকে ঘিরে আশার সে-কল্পনা দূর থেকে সুদূরে পাড়ি জমায়। কবিতার মধ্যে যখন অপার্থিব জগতের একটা মেলবন্ধন থাকে তখন পাঠক সীমাহীন ভাবনার শাখা-প্রশাখায় দোল খান। পড়া যাক ‘বুধুয়ার পাখি’ কবিতার শেষাংশ – ‘এভাবে প্রতিদিন বুধুয়ার ডাকে/ কানায় কানায় আলো পথের কলসে ভরা থাকে,/ ঝাঁকে-ঝাঁকে পাখি আসে, কেউ তার দিদি, কেউ মাসি,/ রুপোলি ডানায় যারা নিয়ে যায় বুধুয়ার হাসি।’

কবিতার মধ্যে যে-বশালতা থাকতে হয়; কবিতার মধ্যে বিচিত্রতা অর্থাৎ চিন্তার যে-ডাইভারসিটি থাকে যা কবিতাকে অনন্য করে তোলে; সেসব গুণ দাশগুপ্তের কবিতায় বিদ্যমান। ‘চৌরঙ্গীর ফুটপাথ’ থেকে চিন্তার যে-অনুষঙ্গ ব্যাপ্ত করেন তা অবশেষে জীবন বোধকে ছুঁয়ে যায়।

সমাধি এবং বাড়ি একাকার হয়ে গেল যেই

বাড়িতে অনবরত মোম জ্বালি আর সমাধিতে

খেয়ে-দেয়ে শুয়ে পড়ি, কিন্তু কবরের প্রহরীরা

বলল পান্থসদনে যুগ্মশয়নের কোনো অনুমতি নেই

(‘নামঞ্জুর’, ওষ্ঠে ভাসে প্রহত চুম্বন)

দক্ষ কবিদের মধ্যে কিছু একই রকম বৈশিষ্ট্য থাকে যেমন : কবিতা লেখার ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট বিষয় নিয়ে এগিয়ে যেতে চান। কবি অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত নিজেও তেমনি কোনো বিষয় নিয়ে লেখাটা এগিয়ে নিয়ে চান; কিন্তু শেষমেশ চিন্তার বাঁকে বাঁধা পড়ে কবিতা বদলে যায়। কবি নিজেও স্বীকার করেছেন সে-কথা। তাঁর কবিতার ক্ষেত্রে দেখা যায় একটি শব্দকে বিষয় বানিয়ে এগিয়ে চলেছেন এবং পাশাপাশি নতুন শব্দ উঠে আসছে, আর সেসব নতুন শব্দের সঙ্গে নতুন অনুষঙ্গ এসে দাঁড়িয়ে যাচ্ছে পাশাপাশি। এই যে কবিতার বুনন, যে-গঠনপ্রণালি কবি অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত রপ্ত করেছেন এবং নিজেকে অন্যের কবিতাকর্ম থেকে আলাদা করেছেন, তা নিচের কবিতা থেকে বোঝা যায় –   

ওখানে আশ্চর্য এক দরদী নদীর

বুকের দর্পণে দোলে পুরাতন দ্বাদশমন্দির।

আমারো হৃদয় এক নদী,

আমার জীবন তবে এখনো হল না কেন মন্দিরের মতো মহাবোধি।?

মন্দিরের পাশে এক মাঠ,

দিগ¦লয় হতে আরও আরও দীর্ঘ মনে হয় যাকে, কবি অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত সারাজীবন কবিতার সঙ্গে বসবাস করেছেন। কবিতা তাঁর ধ্যানমগ্নতায় আরাধ্য উপকরণ। অসংখ্য কবিতা সৃষ্টির মোহাবেশে খুঁজে পেয়েছেন উদাসী মেঘ ভিড় করা পাহাড়ের সান্নিধ্য। কবি কলকাতা থেকে যোজন দূরে অর্থাৎ প্রবাসে জীবন কাটিয়েছেন বহু বছর। ছায়ানিবিড় কথাকলি যখন জেগে উঠত তাঁর মনের খেয়ালে তখন তিনি ফিরে যেতেন স্তিমিত গানের কাছে কিংবা কলকাতার কালো গলিতে। অর্থাৎ কবিতার ক্ষেত্রে যখন অতীত এসে আবার মনে করিয়ে দেয় মা ও মাটির সৌরভ তখন মন আন্দোলিত হয়। কবি অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত জীবনের অভিজ্ঞতাকে কবিতার শব্দে রূপায়িত করেছেন, সেক্ষেত্রে কবিতার রসত্ববোধ এবং সৌন্দর্যের কোনো রকম ব্যত্যয় ঘটেনি। ভাষা, শব্দ এবং আলঙ্করিক উপকরণের ব্যবহারে যে-নান্দনিকতা তিনি দেখিয়েছেন তার জন্য তিনি বাংলা কবিতার জগতে চিরঅম্লান হয়ে থাকবেন।

Leave a Reply