অশ্লেষা

বুলা আমার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। আমি টেবিলের পাশে সাজিয়ে রাখা বোতল থেকে আরো এক গ্লাস দিলাম ওকে। গলায় ঢাললো একটু। ‘বুক জ্বলে যাচ্ছে আম্মা’ এইটুকু বলেই রেখে দিলো বাকিটা।

‘খা।’

‘আম্মা বাঁচুম না।’

আমার চোখের দৃষ্টি এতদিনে চিনেছে ও। বাধ্য হলো। বুলার চোখ ক্রমেই লাল হয়ে উঠতে শুরু করেছে, টলছেও একটু। পড়ে যাবে না তো? আমার ভরসা হয় না। তাকে ধরে টেনে তুলি। উঠিয়ে বসাই।  টলছে, টলুক, যেনতেন রোগ তো নয়। মেয়েটা গতকাল একবার বলেছিল বাড়ি যাবে, আমার চিৎকারে ঢাকা পড়ে গেল সব। একবার ভেবেছি যাক, চলে যাক। পরক্ষণেই মনে হয়েছে এই যে আমার এত রাত জাগা, কাচের গ্লাসের এলোমেলো ভেঙে পড়ে থাকা, অ্যাশট্রেতে জমিয়ে রাখা ছাই – এগুলো সরিয়ে রাখার জন্যও তো লোক লাগে। বুলা গেলে আমার শরীর সারাই করবেই বা কে? আচ্ছা বুলা সুস্থ হবে তো? অবশ্যই। কেন না? অ্যালকোহলে সারে এসব, অ্যান্টিবায়োটিক কী কী দিলাম না দুপুরে? রাতে যদি কাঁদে? কেন কাঁদবে। কার জন্য কাঁদবে? ছ-মাস ধরে পড়ে আছে এ-বাসায়, একবারও কি কেউ এসেছে দেখতে। অবশ্য আমিই বলেছিলাম কেউ যেন না আসে। একা থাকতে ভালো লাগে আমার। কেন জানি না, ডিভোর্সের পর থেকে লোকজন একদম সহ্যই হয় না। অথচ এরকম ছিলাম না আগে। একটু মানুষ সঙ্গের আশায় একসময় দিনের পর দিন, রাতের পর রাত পড়ে থেকেছি এখানে-ওখানে। যাই হোক সময় পাল্টেছে। রোবোটিক জীবন মন্দ লাগছে না। জীবনের অর্থ এখন আমার কাছে অন্যরকম। কিছু নামিদামি ব্র্যান্ড, বেশি ডিপ্রেসড থাকলে স্লিপিং পিল। মামুনকে উটকো কিছু গালি দিতে পারলে অর্গাজমের ব্যাপারটাও ঘটে।

‘আম্মা পানি’ – বুলা আবার চোখ খুলেছে। আমি বিরক্ত হই। আমাকে কেন সে আম্মা বলে, হোয়াই। হাউ স্টুপিড! মেয়েটাকে এত বলি! শুধু কি বলি? বেসামাল হলে কোনো কোনোদিন এমন আচরণ করি ঘেন্নায় থুতু ফেলে ও। আরো এক পেগ শ্যাম্পেইন এগিয়ে দিই, ফরাসি ব্র্যান্ড। এমন করে গিলে যেন র‌্যাটল স্নেক ওয়াইন, মূর্খ কোথাকার! বুলার জবুথবু ব্যাপারটায় জম্বি-জম্বি ভাব। অসুখের কারণে ওর সস্তা তুলোর ন্যাতানো বালিশ আমার বিছানার পাশেই। ঘেন্না! বাড়ি থেকে নিয়ে এসেছে। এটা ছাড়া নাকি ঘুম হয় না। যাক ঘুমোক। আমি কাবার্ড খুলে কফিবার খুঁজতে থাকি। কিছু নেই কোথাও। রাত যত বাড়ে, ততই এমন হয়। কোথাও কিছু খুঁজে পাওয়া যায় না। আমার বিরক্তির কাঁটা দ্রুত ঊর্ধ্বমুখী হয়। ইদানীং প্রায়ই চিন্তায় আসে আঠারো তলার ওপর থেকে লাফ দিলে কেমন হবে? অথবা বুলাকে ফেলে দিলে? একটা জলজ্যান্ত মানুষের মাথা থেঁতলে গেলে কেমন লাগবে দেখতে? বুলা কি ভয় পাবে। একবার রাস্তায় একটা কুকুরের মাথা দেখেছিলাম এমন, কী যে কুৎসিত! আমি বেসিনের কল ছেড়ে কলকল শব্দ শুনি, মগজ থেকে কুকুর তাড়াই। প্রায় সাড়ে চার মাস ধরে গৃহবন্দির কাল চলছে, ভাবা যায়! ইন্দোনেশিয়ান প্রজেক্ট ডেভেলপমেন্টের বিলটা একসঙ্গে হাতে না পেলে কী অবস্থা হতো এখন! সৎবাপের রেখে যাওয়া সম্পত্তির কিছু কি আর বেঁচে আছে। ভাগ্যিস অ্যালকোহল এখনো পুরো মাথা কব্জা করতে পারেনি :  টুকটাক করে-টরে তো খাওয়া যাচ্ছেই। হাতের সিগারেট নিভে গেছে। এর ওপরও নাকি কাদের শকুনি দৃষ্টি পড়েছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় খুব শোরগোল চলছে কদিন ধরে। ফাকিং মিডলক্লাসের অ্যাটেনশন সিকিং হাইপ। আচ্ছা বুলা যদি এবার বাড়ি গেলে আর না আসে? উঁহু আসবে। ড্যাম শিওর! ইস্, না এলে কী যে বিপদ! দুদিন পরপর এজেন্সি ধরে হাউজ মেইড খোঁজা সো ডিসটার্বিং! এরচেয়ে ভালো হবে একেবারেই যেতে না দিলে। নো ওয়ে টু গো। ধুর এসব কী ভাবছি। কোথায় কবে ঠিক হবে সব, তারপর না বাড়ি। যাই বুলার পাশে গিয়ে বসি। জ্বর বেড়েছে ওর। ঘরে কোথাও থার্মোমিটার আছে হয়তো। বুলা আমার হাত টেনে বুকের কাছে নেয়। ওর আচরণ আমার নিকির মতো। আদর পেলে নেতিয়ে যায়। আমি আমার আরেকটা হাত রাখি বুলার মাথায়! কুঁচকে যায় ও। আমি ডাকতে শুরু করি –

‘বুলা বুলা। আপেল খাবি?’

নো সাউন্ড, আমি নিজেই খাই। ছোটবেলায় আমার যখন জ্বর হতো, আমি একা একা কামড়ে আপেল খেতাম। সে বিস্বাদ এখনো মুখে লেগে আছে। কখন যে এত ক্ষুধা লেগেছে বুঝিনি। এই বিল্ডিংয়ের কেয়ারটেকার আমার মাসকাবারি বাজার করে দেয়। বাজারের সঙ্গে আড়চোখে আমাকেও মাপে। অবশ্য এদিকটায় এমন দেখতে মেয়েমানুষ যে আর নেই তাও না, তবু কেমন করে! আচ্ছা বুলা কি প্রেগন্যান্ট! ওকে তো বাইরে যেতে দিই না, তবু কেমন করে কী হলো। হোমোসেক্সে বাচ্চা হওয়ার রেকর্ড নেই কোথাও। তাছাড়া এইটুকু বয়সে কি বাচ্চা হয়? হতেও পারে, বুলার কিশোরী বুক লোভনীয়। আমি হাত বাড়াই। ওর অপরিস্ফুট স্তন নেতানো, গায়ে শকিং টেম্পারেচার। নিশ্চয়ই বাচ্চা হবে। কে আসে এখানে। বুলা ঘুমের ঘোরে কাঁপছে। ফুলে ফুলে উঠছে পিঠ। আমার কম্বলটা কি দেব? না থাক, বুলার গায়ে বিশ্রী গন্ধ! সস্তা তেল দেয় মাথায়, কী যেন নাম ওটার। এসির পয়েন্ট কমিয়ে দিই। আচ্ছা মামুনের দেশে এখন সকাল না দুপুর। উফ্, আবার সেই মামুন! ফ্রড একটা। আমার মুখে থুতু জমে। সাড়ে তিন বছর সংসার করেও ঘুণাক্ষরে টের পাইনি হারামজাদা আমার জমানো সব টাকাপয়সা নিয়ে ভেগে যাবে। আলাস্কায় গিয়ে রোদ পোহাবে ওই ঘোড়ামুখীর সঙ্গে। আসলে ছোটলোকের ঘরের ছেলে চোর-ছ্যাঁচড় তো হবেই। অ্যা সান অব অ্যা বিচ, অ্যা বিট্রেয়ার। মুখে দেওয়া আপেলটা ছোটবেলার মতোই বিশ্রী লাগতে শুরু করেছে আবার।

‘আম্মা আম্মা’ – বুলা কাতরাচ্ছে।

‘পানি খাবি বুলা?’

‘না আম্মা, খামু না, বমি করমু।’ কিছু ভাবার আগেই বুলা উগড়ে দেয় সব। আমার ভেতরটা সিঁটিয়ে যায় ঘেন্নায়।

‘বুলা এসব কী?’

‘আমি মইরা যাইতাছিগা আম্মা আমার বাপেরে খবর দ্যান।’ আমার কোলের ওপর ধপ করে পড়ে যায় ও।

‘কী সব ন্যুইসেন্স কথাবার্তা! তুই মরবি কেন। ওষুধ দিচ্ছি। ঘরে এত্ত এত্ত ওষুধ। জ্বর সারবে বুলা।’

‘সারবে না আম্মা, আমি মইরা যামু, এই রোগে মানুষ বাঁচে না।’

‘ধুর কী সব বলিস, পেইন হচ্ছে? পেইন কিলার দেব?’

‘আম্মা আফনে আমারে বাড়ি পাঠায়া দ্যান, আমি বাঁচুম না।’

আমি বুলাকে কোল থেকে সরিয়ে দিই। রাগ লাগছে। ওকে কি সত্যি পাঠিয়ে দেব বাসায়? এত রাতে? ওই তো কেমন নিঃসাড় হয়ে যাচ্ছে। হঠাৎ কেমন যেন লাগে আমার। ওর আম্মা ডাকে এত রাগ না হলেও তো হয়। মামুনকে একবার বলেছিলাম বেবি এক্সেপ্টিংয়ের কথা। লিভিংয়ের প্রথম প্রথম। ও আমলে নেয়নি। আমার মুখে আবার থুতু জমে। আমি ড্রয়ার খুলে ফার্স্ট এইড খুঁজি। কাকে ফোন দেওয়া যায়। এসব পেশেন্ট কি নেবে ভর্তি এখন? কত কিছু হচ্ছে চারপাশে। কয়েকজন ডক্টরের প্রেসক্রাইব করা সাজেশন আছে ফোনে। ওষুধও কিছু কিনিয়ে এনে রেখেছি। আমার জন্য নয়। বুলার জন্যই। আমি জানি আমার কিছু হবে না। কেন হবে, আমি কি মানুষ? প্রেসক্রিপশন থেকে মিলিয়ে কয়েকটা ওষুধ বাছাই করি। মেয়েটার কাছে গিয়ে দেখি হাঁ হয়ে আছে মুখ। ওর কি শ^াসের কষ্ট হচ্ছে? কী জানি! আমি ওকে ঝাঁকিয়ে তুলি। চোখ খোলে না। আশ্চর্য! আমি ঠেলেঠুলে একটু বসাই, মুখে কয়েকটা ওষুধ পুরে দিই। অদ্ভুত সে চিবিয়ে চিবিয়ে ভাতের মতো খাচ্ছে; যেন দ্রুত আমার হাত থেকে নিস্তার মেলে। ভয়ে বুলা কুণ্ডলি পাকিয়ে যায় আরো। আমি ওর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকি। আমার যখন ওর মতো অল্প বয়স, তখন আমিও রাতের বেলা হরর মুভি দেখে ভয় পেতাম। আম্মুর দরজার পাশে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কাঁদতাম। যতই নক করতাম, আম্মু খুলত না। আমার মনে হতো আমার কিছু হয়ে গেলে দু-সপ্তাহ পর হয়তো আম্মু বুঝবে, আমি মারা গেছি। খুব ইচ্ছে হতো কোনো একদিন ঘুমের ঘোরে ডাইনি আম্মুর গলা চেপে ধরি। ও কি বুলার চোখ-মুখ এমন হয়ে যাচ্ছে কেন? আমার বুকের ভেতরে ধুকপুক শুরু হয়। বুলা যদি উঠে বসে আমার গলা টিপে ধরে। আমি ঘেমে যাই খুব। বুলাকে রেখে সরে আসি। স্টাডি রুমের কোনায় একটা সিঙ্গেল বসার চেয়ার। মামুনের খুব প্রিয় এটা। আমি একটা লাথি মেরে আসি। রাতগুলো কেন এত দীর্ঘ!

বুলার উগরে দেওয়া পচা অ্যালকোহলের গন্ধ এতক্ষণ আমার নাকে লাগেনি, এখন লাগছে। মেয়েটা ভিজিয়েছে। বমি পায় আমার। আমার ঘরে রুম স্প্রে রাখি সব সময়। তড়িঘড়িতে ওটাও খুঁজে পাই না। কী একটা পারফিউম টেবিলে কাত হয়ে পড়ে আছে। ওটা নিয়ে পুরো ঘরে ছিটিয়ে দিই। বাহ দারুণ তো। কী ফুলের স্মেল? কামিনী না জেসমিন? ফুল নিয়ে বুলার কাছে যাই। ওর আধখোলা পিটপিট করা চোখ দেখি, জিভ এখন বের হয়ে যাচ্ছে জলাতঙ্কে আক্রান্ত কুকুরের মতো। ছিঃ কী জঘন্য! আমি ফ্রিজ থেকে বরফকুঁচি নামাই। চানাচুর বয়ামে পড়ে আছে এখনো কিছু, গ্লাসে দু-তিন পেগ ঢেলে দ্রুত চালান করে দিই পেটে। আজ এমনিতেই একটু বেশি হয়ে গেল। সন্ধ্যার পর থেকে আমরা দুজনেই কিছু খাইনি। বুলার জ্বর, কাশি, শরীর ব্যথা। কিছুই বানায়নি। না রুটি না স্ন্যাকস। গতকাল রেঁধেছিল লতি দিয়ে চিংড়ি। কেন যে রাঁধে এগুলো। লতাপাতা, পোকামাকড় কে খায়, আম্মুকে কখনোই আমি ওসব রাঁধতে দেখিনি। কবরে এখন কী করছে ভদ্রমহিলা? আচ্ছা আম্মুর ডিভোর্সের প্রভাব কি আমার জীবনে পড়েছে। পড়ুক! বুলা হাঁপাচ্ছে খুব। আমি এগিয়ে যাই। রাত প্রায় শেষের দিকে। কেমন জানি গা-ছমছম করা সময়। নেশার ঘোরও হতে পারে। আমি তৃতীয়বারের মতো জিজ্ঞেস করি –

‘বুলা পানি খাবি?’

‘আম্মা আম্মাগো আমার বাপে আরেকটা বিয়া করছে আম্মা।’ বুলা হড়হড় করে আরো কি যেন বলতে চায়, বমির তোড়ে বলতে পারে না। নেতিয়ে পড়ে থাকে আমার কোলে। ওর ঠোঁট গড়ানো পীত আর সাদায় মেশানো ফেনা ফেনা পানি। এমন কেন? ওষুধের প্রভাব? আমার গা গোলায়। আমি ঢুলতে ঢুলতে বাথরুমে পৌঁছাই। গিজার ছাড়ি। একটা হট শাওয়ার নিই। শ্যাম্পু করি। নেশার ঘোর কেটে যাচ্ছে। আমি আবার ফ্রিজ খুলি। বাসি পিৎজা আছে। কতদিন আগের কে জানে, খাই একটু। অ্যাসিড হতে পারে, হোক। শোবার ঘরে ঢুকতে ইচ্ছে করে না। বুলা কার্পেটের ওপর চিৎ হয়ে পড়ে আছে। গেলেই হয়তো হাত-পা জড়িয়ে ডাকতে শুরু করবে ‘আম্মা আম্মা!’

বেশিরভাগ সময়ই বুলাকে আমার কুৎসিত লাগে। এখনো লাগছে। নিতান্তই নিরুপায় না হলে ওকে আমি কাছে টানি না। আম্মু আমাদের বেছে বেছে যে খেলনাগুলো কিনে দিত সেগুলো সবসময় খুব সুন্দর হতো। এমনকি কোলে নিয়ে রাখার জন্য যেসব জীবন্ত পুষি বা ডগি এনে দিত সেগুলোর গাও থাকত নরম তুলতুলে। অথচ মেইডগুলো সব এমন কেন? এসব বললে মামুন আমাকে বলতো ‘ন্যাকা’। রেগে রেগে বলতো – ‘যাও বাইরের গিয়ে দেখে এসো নেড়িকুত্তাগুলো, ঠিকঠাক খেতে-পরতে না পারলে সবই এমন ফাটাকাঠ হয় – কি কুত্তা-বিলাই কি মানুষ!’ আচ্ছা বুলার ওপর আমার এইসব টর্চার এগুলো কি মামুনের ওপর প্রতিশোধ? না হয়তো। চোখ বন্ধ করলে সবার আগে আমার মায়ের দ্বিতীয় স্বামীর মুখ মনে পড়ে। ওই লোকটার অস্তিত্ব পৃথিবীতে না থাকলে কখনো না কখনো হয়তো আমিও মানুষকে ভালোবাসতে শিখে যেতাম।

অবশেষে আমি দীর্ঘ সময় ধরে বুলার একটানা ‘আম্মা আম্মা’ ডাক উপেক্ষা করার ধৈর্যে উত্তীর্ণ হই। আর একবার ডাকলেই টোয়েন্টি মিলিগ্রাম ফ্রিজিয়ামের পুরো কৌটা খাইয়ে দেব ভেবেছিলাম। বুলাকে মাথা থেকে সরিয়ে আমি সুন্দর কোনো সময় ভাবতে শুরু করি এবার। শেষ কবে আম্মুর সঙ্গে বেড়াতে গিয়েছিলাম। খুব ছোটবেলায় হিল ট্র্যাকিং আর রিভার ক্রুজে যাওয়া আমার খুব শখের ছিল। আচ্ছা আম্মু কেন ওভাবে মরে গেল? ওটা কি সত্যি স্বাভাবিক মৃত্যু, না মার্ডার? আম্মু খুব ঘুমের ওষুধ খেত, হয়তো আকস্মিক ওই মৃত্যুটা সুইসাইডই হবে। আমার আম্মুর কপালটাই খারাপ ছিল। যে লোকটার সঙ্গে আম্মুর দ্বিতীয় বিয়ে; সে ঘাড়ের রোঁয়া উঠে যাওয়া বুড়ো শকুনের মতো। আম্মুর সঙ্গে কী যে করত; কখনো কখনো বেশি মাতাল হয়ে পড়লে আমাকেও খুঁজত। তখন পশুদের গলায় শিকল বাঁধার মতো আমার কোমরেও থাকতো শক্ত বেল্ট। কাউকে বলার উপায় ছিল না, কতটা কুকুরজীবন ছিল সে-সময় আমাদের।

 এত কষ্টের পরও আম্মুকে কখনো দেখিনি আমাকে আমার নিজের আব্বুর কাছে ফেরত পাঠানোর কথা ভাবতে। এমনকি আমার প্রতি এমন নির্দেশও ছিল, ‘আম্মু মরে গেলেও যেন আমি এ-বাড়ির চৌকাঠ না মাড়াই।’ আমি খুব ভালো করেই জানি, আম্মুর অজস্র দীর্ঘশ^াসের বিনিময়ে আমার আজকের এই বিলাসী জীবন। অবশ্য ওই বুড়োর সম্পত্তি ভোগ করার মতো ছিলও না কেউ। আম্মুর হিসাব-নিকাশ কাজে দিয়েছে। এত হিসাব করে চলা আমার সেই অর্থলোভী আম্মুটাকেও বেঘোরে মরে যেতে হলো। স্কুল থেকে ফিরে দেখি, আম্মুর শক্ত দাঁতে আটকে আছে নীল জিভ। এটা ঘৃণা নাকি ভালোবাসা জানি না, আম্মুর সবকিছুই আমার করে দেখতে ইচ্ছে করে। আমার আবার অস্থির লাগছে। আমি এ-ঘর  থেকে ও-ঘরে যাই। মেঝের ঠিক মাঝখানে বুলা এখনো পড়ে আছে। লাল কার্পেটে লাল ফুল। আমি কি ভেবেছিলাম, থাকবে না, হাওয়ায় উড়ে যাবে বুলা? আমি ওর গায়ে হাত দিই। জ্বর নেই। ঘামও নেই। আশ্চর্য শীতল শরীর। আশ্চর্য বুলার চেহারা এখন আম্মুর মতো লাগছে আমার! মাথার চুলে একটু বিলি কাটি। চিটচিটে তেলের গন্ধটা আর খারাপ লাগছে না। ওর হাঁ করা মুখটা বন্ধ করার চেষ্টা করি। হচ্ছে না। না হোক। আমি বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াই। আকাশ ঘোলাটে হয়ে আছে, একটু পর লাল হবে। আমি আতিপাতি করে খুঁজে বের করি নেসক্যাফের প্যাকেট। কফি মেকারটা নষ্ট কি না কে জানে। এক মগ কফি বানাতে এত বেগ পেতে হয়! ধোঁয়া-ওঠা কফির মগ হাতে আবার আকাশ দেখি। কী সুন্দর! ভোর হবে হবে অবস্থা। এই সময়টার কী নাম? মামুন জানতে পারে। ওর স্টকে কুৎসিত গালিগালাজের সঙ্গে বেশ ভালো ভালো বাংলা শব্দও ছিল, প্রত্যুষ, সৌপ্তিক, অহরাত্র, চণ্ডালিনী এইসব! অথচ আর্ট-ফার্ট রেখে এখন ঘুরে ঘুরে মরছে এক ঘোড়ামুখী বিদেশিনীর সঙ্গে। ইনটারকম বাজছে। এই সময়ে কে খুঁজবে আমায়। কেয়ারটেকার? ওকে কী বলব বুলার কথা, না থাক মেয়েটা ঘুমোক।

‘হ্যালো।’

‘আফা এই শহরের কুত্তাগরে লকডাউনে খাওন দেওয়ার জন্য যে ব্যাডারে ঠিক করছেন হেই ব্যাডা টেকা চাইতে আসছিল কাল, বাজারে যাইব।’

‘আমি বিকাশ দিচ্ছি রশিদ।’

‘আইচ্ছা, আফা আফনের মতো ভালা মানুষ দুনিয়ায় নাই। আইজকাইল মাইনষে মাইনষেরে দেহে না আর আফনে দেহেন কুত্তা-বিলাই!’

‘কেন অপ্রয়োজনে কথা বলছ, তাও এই শেষরাতে।’

‘আর কমু না। কুত্তারে কি মাংস দিমু আফা?’

‘দাও। শোন কিছুদিন আর ফোন দেবে না, বাজারও লাগবে না। তোমাকে আরো কিছু পেমেন্ট দিয়ে রাখছি, কেউ যেন আমাকে ডিসটার্ব না করে দেখবে।’

খট করে ফোন রাখি। রশিদকে আর কিছু বলার সুযোগ দেওয়া উচিত না। এই বাসায় বছরখানেক সময় ধরে থাকছি। কখনোই লোকটাকে সুবিধের লাগেনি, অবশ্য আমার কাউকেই লাগে না। এই লোকটা অসময়ে হুটহাট ফোন দিয়ে অজস্র কথা বলে। সামনাসামনি দেখা হলে কেমন করে যেন তাকায়। আচ্ছা বুলা কি কিছু বলেছে ওকে আমার সম্পর্কে? বলুক। আমি জানি রশিদ বাড়তি টাকা পেলেই চুপ। রশিদদের মতো মানুষগুলো আমার নিকির মতো। পাতে কিছু পেলেই লেজ নাড়ে। ওহ বুলা আসার আগে আমার একটা কুকুর ছিল। নিকি। দিনের পর দিন, মাসের পর মাস আমি আর নিকি। নিকি আর আমি। তারপর! নাহ্ তার আর পর নাই। আমি ঘরের দিকে আগাই। সূর্য উঠে গেছে। বুলার গা বরফশীতল। ঘুমুচ্ছে নাকি মরে গেছে জানি না। পেটের চনমনে ক্ষুধা জানান দিচ্ছে, আমার আবার খেতে হবে। একটু আগেই না খেলাম। কিচেন খুঁজে দেখি ড্রাইফুডের স্তূপ। বুলা পুরো মাসের বিস্কিট, কেক, পেস্ট্রি স্টোরেজ করে রেখেছে। আপৎকালীন সতর্কতা।

আচ্ছা একটা লাশ পচেগলে নষ্ট হতে কত দিন লাগে? আম্মুর লাশটা সপ্তাহখানেক ছিল, এরপর পুলিশ এসে নিয়ে যায়। পুরনো স্মৃতিগুলো মনে হতেই আমি উৎফুল্ল হয়ে উঠি নতুন কিছু নিয়ে চিন্তা করার পুঁজি পেয়ে। কিচেন রেখে শোবার ঘরে আসি। টেবিলে অনেকগুলো ঘুমের ওষুধ ছিটকে আছে। আমি গোছাই সবগুলো। যত্ন করে গুনে দেখি ছাপ্পান্নটা। এক গ্লাস পানিতেই হয়ে গেল, ব্যস। মুহূর্তেই মিষ্টি এক আলস্য জড়িয়ে ধরতে ধেয়ে আসছে, আরাম লাগছে আমার। বুলার পাশেই শুয়ে পড়ি। বরফশীতল গা। আপন গর্ভজাত সন্তান অনুভবে জড়িয়ে ধরি ওকে। সকাল হচ্ছে, কী পবিত্র সকাল।