অ্যামেলিয়া

লেখক: তিলোত্তমা মজুমদার

        \ ১৩ \

ঠিক আড়াইটেয় ইয়াপ সদস্য জাপানি মেয়ে তাকিকো ওকামারি এলো রন্ধনেচ্ছু রাইটারদের পাকশালায় নিয়ে যেতে। এক কাঁধে চাল, ডাল, তেল, নুন, মশলাপাতি, সবজি, অন্য কাঁধে বাসন, ছুরি, রান্নাকরা খাবার আনার পাত্র আর হাতে ডিমের খাঁচা নিয়ে লবিতে নেমে অমলিনী শুনল পাকশালায় যাওয়ার জন্য কোনো গাড়ি নেওয়া হয়নি। হেঁটে যেতে হবে।
‘অতটা পথ এত সব নিয়ে যাব কী করে?’
‘খুব দূর নয়। কাছেই।’ বিনীত হেসে বলল তাকিকো। তারা আর কথা বাড়াল না। যে যার জিনিস নিয়ে পথে নেমে পড়ল।
ঝলমলে রোদ্দুরে পোঁটলা-পুঁটলি নিয়ে, কোন সুদূর প্রবাসে রাইটাররা রান্না করতে চলল। লেখকদের খিদে, ঘুম, গা ম্যাজম্যাজ, পেট কামড়ানি, সবই অন্যদের মতো। তবু পথচলতি লোকজন, ছাত্রছাত্রী ভারি কৌতূহলী হয়ে দেখতে লাগল তাদের। যেন চিড়িয়াখানার জন্তু দেখছে। অমলিনীর ‘হাল্লা চলেছে যুদ্ধে’ গাইতে ইচ্ছে করল। হাল্লার সেনার মতোই তারা জুটেছে কম নয়।
লোরেনটিনা, আদনাশে, মেইমি, জিনেট, রোজানা, শবনম, হারিক, জেরেমিস, আমাদায়ুং, নিবাস, লিলি, চ্যাং, সাইয়ুন, ক্যাথি, হাসিন, রুথ, জর্জ। এরা রন্ধনেচ্ছু। তাদের সঙ্গে চলেছে মানঘিল, অ্যালেক্স, ইয়াকভ, ইয়েরমেন, ফিলিপ। উৎসাহদাতা। ইয়াকভের হাতে বাঁশি। রাঁধুনেদের বাঁশি বাজিয়ে শোনাতে চায়। যারা রাঁধবে না, তাদের হাতে জিনিসপত্রও নেই। অন্যদের তৈজসপত্র তারা নিজ স্কন্ধে তুলে নিল। এখনো পরস্পরের নাম প্রতিজন হিসেবে মুখস্থ হয়নি। তবু কেমন পারিবারিকতা তৈরি হয়ে যাচ্ছে। মানঘিল হারিকের হাতের সব বস্ত্ত নিয়ে নিল। প্রায় সাত ফুট লম্বা ও স্বাস্থ্যবান মানঘিল সামান্য খুঁড়িয়ে হাঁটে। সে একাই সবার জিনিসপত্র বইতে পারে। কিন্তু হারিক, অপরূপ সুন্দরী, ধবধবে, এক ঢাল কোঁকড়া চুল হারিক, যেমন সুবিশাল স্বাস্থ্যবতী, তেমনি লম্বা। মানঘিল তার জিনিসপত্র নিচ্ছে দেখে রোজানা বলল, ‘কেন? ও তো নিজেই ওরটা বইতে পারে।’
‘পারেই তো।’ মানঘিল গম্ভীরভাবে বলল। ‘আমি কি বলেছি, পারে না? কিন্তু ও আমাদের মধ্যে সবার চেয়ে ছোট।’ হারিক হাসছে। সে খুশি। যেন, ছোট বলে এই অধিকার তার আছে। কিন্তু রোজানা অমলিনীর কাছে এসে বলল, ‘দেখো, কেমন পটাবার তাল করছে!’
প্রথম দিন নগরে ভ্রমণের সময় তাদের রান্নাবাড়িটি দেখিয়ে দেওয়া হয়েছিল। একটা পুরনো বাড়ি, নাম ‘স্টুডেন্টস হল’। ভেতরে ছোট লাইব্রেরি। সভাকক্ষ। মঞ্চ। বেসমেন্টে রান্নাঘর। যাকে বলা হয় কমিউনিটি কিচেন। বেশি পরিমাণ রান্নার জন্য যে কেউ এই রান্নাঘর ভাড়া নিতে পারে। অনেক সময় ছাত্রছাত্রীর দল একত্রে রান্না করে চড়ুইভাতি উৎসবে মাতে। কখনো কোনো সম্মেলনের বিপুল পরিমাণ খাবার এখানে রাঁধা হয়। এমনকি কোনো পরিবার একত্রিত হয়ে এমনতর রান্নাঘর ভাড়া নিয়ে সপরিবারে রান্না করে নেয়।
একটি বড় ঘরের দুদিকের দেয়াল জোড়া তাক। তাক লেগে যাবার মতোই আয়োজন। রান্নাঘরের ন্যাপকিন, গরম পাত্র ধরার তুলো-পোরা ন্যাপকিন, চপিং বোর্ড, ছুরি, হাতা, খুমিত্ম, হাঁড়ি, কড়াই, থালা, বাটি, গেলাস, কাপ কিছুর অভাব নেই। ঝুড়িতে ডাঁই করা। তাকে সাজিয়ে রাখা। একদিকে দুটি সিঙ্ক। তার পাশে বাসন মাজার তরল সাবান ও স্ক্রাব। এক কোণে ঘর মোছার ন্যাতা লাগানো ডান্ডা। আমেরিকার ভাষায় ফ্লোর ওয়াইপস। আর এক দেয়ালে বিশাল চুল্লি। বৃহৎ দাহক মাচায় সারি সারি কুড়িটি উনুন। চারটি সারিতে পাঁচটা করে। মাচার সামনের দিকে গ্যাস জ্বালানোর বোতাম। অতগুলি বোতাম দেখলে মনে হয় এখান থেকে মঙ্গলগ্রহে যাবার রকেট নিয়ন্ত্রিত হবে!
‘বাপস্, কী উনুন!’ বলে উঠল অ্যালেক্স। ইয়াকভ বলল, ‘ভাগ্যিস আমি রান্নাবান্না করব না।’
আমাদায়ুং : এখানে তো আস্ত একখানা গরু সেদ্ধ করা যাবে।
ইয়াকভ : আস্ত গরু সেদ্ধ করা খাবার তো আছেই। তবে তার জন্য বিশাল চুল্লি লাগে। কমিউনিটি কিচেনে হবে না।
অমলিনী : আমাদের দেশে তন্দুর বলে একরকম উনুন হয়। বিশাল।
শবনম : তানদোর। তানদোর। আমাদেরও আছে।
অমলিনী : একবার দিল্লিতে এক মহিলাকে নিজের রেসেত্মারাঁর তন্দুরে পুড়িয়ে ফেলে একটা লোক।
অ্যালেক্স : মহিলা নিশ্চয়ই ওর বউ ছিল।
অমলিনী : ঠিক। তুমি জানো নাকি ব্যাপারটা?
অ্যালেক্স : আরে জানতে হবে কেন? বউ ছাড়া কার ওপর এত রাগ থাকে মানুষের?
মেয়েরা হইহই করে উঠল!
‘বাজে কথা বোলো না, বউকে ছাড়া কোন পুরুষমানুষের চলে শুনি?’
‘যত খারাপ সব বউরা? ছেলেরা ধোয়া তুলসীপাতা?’
‘আরে ছেলেরা খারাপ বলেই তো বউ পোড়ায়। পেটায়। অত্যাচার করে।’
বিষয়টা নারী বনাম পুরুষে গড়াল ঠিকই; কিন্তু বিবদমান দুই পক্ষই মজায় ছিল, হালকা মেজাজে ছিল। চিরকালীন এই দ্বন্দ্ব নিয়ে গম্ভীর আলোচনা যেমন আবহমানকাল জুড়ে হয়ে আসছে, তেমনি রসিকতারও শেষ নেই।
হঠাৎ চিৎকার করে উঠল রোজানা। ‘তোমরা জঘন্য অ্যালেক্স! কোন সাহসে এরকম নিষ্ঠুর কথা বলতে পারলে! তোমরা ঘৃণ্য। নিষ্ঠুর।’ রুথ ইন্ধন জোগাল, ‘রোজানা ঠিক বলেছে!’
রসিকতার রস শুকিয়ে উঠছে। অ্যালেক্স বলে উঠল, ‘সরি! কাউকে আঘাত দেওয়ার জন্য কিছু বলিনি!’
ইয়াকভ হাত জোড় করে, বাঁশি বগলে চেপে বলল, ‘পিস্নজ তোমরা শান্ত হও। আমরা বন্ধু। কেউ আহত হলে আমি ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। পিস্নজ।’
আমি, দানিয়েল এলফিনস্টোন, কমিউনিটি কিচেনের বদ্ধ হাওয়ায় আরো ঘন হয়ে মিশে আমার শ্যামল, সতেজ, সুন্দর অ্যামেলিয়ার বড় চোখদুটি দেখতে লাগলাম। কী বিষাদ! আমি জানি সে অত্যন্ত অনুতপ্ত। সে ভাবছে, কেন মৃতদেহ পোড়াবার কথা সে তুলল! ঘটনাটা জঘন্য। নিষ্ঠুর। অমানবিক ও নোংরা। এই কথা উত্থাপন করে সে কী বোঝাতে চাইল! অ-কারণ অর্থহীন কথা বলা তার স্বভাব নয়। বেশিরভাগ সময় একাকী থাকে বলেই হয়তো দলে পড়লে সে উত্তেজিত ও প্রগলভ হয়ে যায়! সে রোজানার গনগনে মুখের দিকে তাকিয়ে আছে।
এবার তাকিকো পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করল। তাকে সাহায্য করবে বলে ড্রাইভার ম্যাটকেও এখানে পাঠানো হয়েছে।
তাকিকো বলে উঠল, ‘প্রিয় অতিথিরা, পিস্নজ আমার কথা শোনো! এই যে ড্রয়ারগুলো দেখছ, এর মধ্যে আরো অনেক জিনিসপত্র আছে। যার যা লাগবে ব্যবহার করতে পারো। ড্রয়ারের তাকগুলো দেখো।’
সে নিজেই একখানা ড্রয়ার খুলল। ড্রয়ার না বলে চেম্বার বলাই যুক্তিযুক্ত। ভেতরের তিন সারি তাকে আরো কত সরঞ্জাম। বিশালাকার প্রেসার কুকার থেকে চপিং বোর্ড – কী নেই! দেখে তাদের একেবারে তাক লেগে গেল। তাকিকো বলে উঠল, ‘যা খুশি ব্যবহার করতে পারো। কিন্তু যাবার আগে সমস্ত বাসন ধুয়েমুছে, মেঝে পরিষ্কার করে, তোয়ালে ধুয়ে রেখে যেতে হবে। ঠিক তিনটে বাজে। ছ-টার মধ্যে শেষ হয়ে যাবে আশা করি।’
অ্যালেক্স চেঁচিয়ে উঠল, ‘টাইম স্টার্টস নাউ। কুইক। উই আর ইন এ রিয়েলিটি শো।’
‘উই আর ইন এ রিয়েলিটি শো’, হা হা হা হা হো হো হো। কিচেনে সাউন্ড সিস্টেম আছে। দুর্বোধ্য উচ্চারণ এবং ভয়ংকর শব্দওয়ালা তাল-ঠোকা গান চালিয়ে দিলো অ্যালেক্স। অ্যালেলুইয়া, অ্যালেলুইয়া। ধুমধাড়াক্কা নৃত্য শুরু হলো রান্নাঘরে। হাতে কিচেন টাওয়েল বেঁধে ভাঙরা শুরু করল অ্যালেক্স। চিৎকার করতে লাগল, ‘ভাঙরা ভাঙরা পুঞ্জাবি পুঞ্জাবি। Your faith was strong but you needed proof/ You saw her bathing on the roof/ Halleluiah Halleluiah!’ একদিকে গানের সঙ্গে গলা মেলানো গান ও নাচ, অন্যদিকে, যারা রাঁধবে তাদের মধ্যে হুড়োহুড়ি পড়ে গেল বাসনকোসন, ছুরি, চপিং বোর্ড সংগ্রহ করার। একটাই কড়াই নিয়ে টানাটানি করছে রোজানা-লোরেনটিনা। বড় ডেকচি নিজ অধিকারে রাখতে চাইছে চ্যাং। ফ্রাইংপ্যান নিয়ে ঝগড়া বাধল লিলি হেববায় ও হারিকের। কেউ হাতা-কুমিত্ম ছিনিয়ে নিচ্ছে, কেউ
ছুরি-চপার, কেউ গামলা, কেউ ডেকচি! অমলিনী তার নিজস্ব স্টিলের পাত্রে চাল-ডাল, সবজি, মশলা রেখে এই হুলেস্নাড় থেকে সরে দাঁড়িয়েছে। এ যেন রত্নভান্ডারে আলিবাবার সেই চল্লিশ চোর! তারই মতো নিষ্ক্রিয় জেরেমিস। বেশির ভাগ রাইটারের এটা আমি নেব, আমার চাই, আমি আগে ধরেছি, আমি আগে পেয়েছি – এই আত্মসর্বস্বতা, এই স্বার্থপরতা তাদের নিমেষে কাঙাল জনতায় পরিণত করছে।
খুব জোর হাওয়া ও শিলাবৃষ্টির পর মেঘ যেমন ভিজে হাওয়ার মধুরতা ও শামিত্মবারি ঝরায়, তেমনি এই হুড়োহুড়ির পর, সবাই যখন সবজি কাটায় মন দিচ্ছে, অমলিনী এক ঢাউস ফ্রাইংপ্যান ও ঢাকনা-হারানো বৃহৎ প্রেসার কুকার নিজের দখলে আনতে পারল। আর জেরেমিস পেল মাঝারি মাপের সুপপ্যান। অমলিনীর নিজস্ব ছুরি আছে, জেরেমিস একটি সবজি কাটার বোর্ড সংগ্রহ করেছে। তারা পরস্পর বস্ত্তদুটি পর্যায়ক্রমে ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নিল।
ওদিকে ঘরের এক কোণে নাচানাচি জমে উঠেছে। হাতে মাংস কাটার চওড়া ভারী ভারী ছুরি নিয়ে নাচতে নামল শবনম। আরবীয় ঐতিহ্যশালী নৃত্য। শালীনও বটে। কিছু পরেই যখন বেলি ডান্সের একটু নমুনা দিতে লাগল সে, অমলিনীর চোখে বালির কুচি পড়ল খানিক। পরিহিত টি-শার্ট বক্ষাবরণী পর্যন্ত তুলে পেটের পেশিতে ঢেউ খেলাতে লাগল শবনম। সে হাসছে, নাচছে। অমলিনী ভাবছে, এটা ঠিক নয়, এটা বাড়াবাড়ি। শবনমের মসৃণ পেট ও ঝিনুকের মতো নাভির ঢেউ অতীব চিত্তাকর্ষক। উত্তেজকও কি নয়? না না, এমনটা ঠিক নয়, মনে হল অমলিনীর! শবনমের হাতের চপার ঝলসে উঠতে লাগল! যতই উদারচিত্ত হও, কিছু সংস্কার তোমাকে তাড়া করবেই।
ইয়াকভ নাচের দলে ঢুকে শবনমের হাত থেকে ছুরি কেড়ে নিল। ‘ইউ ম্যাদ।’
শবনম : দোনত ওয়ারি। আই অ্যাম নত দ্রাঙ্ক।
চ্যাং : নো নিদ দ্রাঙ্ক। নো নিদ। পোয়েত অল তাইম দ্রাঙ্ক।
অমলিনী চেঁচিয়ে উঠল, ‘নিদ নাহি আঁখিপাতে।’
ইয়াকভ : হোয়াত দিদ ইউ সে? নিদ সামথিং?
অমলিনী : আই নিদ তু লিসন ইয়োর ফ্লুত।
ইয়াকভ : হা হা হা। ইউ ফানি। ইউ আর ইমিতেতিং মি! এখানে এই হল্লার মুডে আমার বাঁশি কে শুনবে।
জেরেমিস : একটু সময় দাও ইয়াকভ। একটু পরেই এদের নাচাগানার জোশ থিতিয়ে যাবে। তখন তুমি বাঁশি শোনাবার সুযোগ পাবে।
ইয়াকভ ও জেরেমিস নিজেদের মধ্যে নিজস্ব ভাষায় বাতচিত করতে লাগল।
কাটাকুটির ধুম পড়েছে। আরব, আফ্রিকান ও চৈনিকরা মস্ত মস্ত গোমাংসের চাঙড় চপাত চপাত শব্দে খ- করছে। ইউরোপিয়ানরা মোটা মোটা চিকেনের ঠ্যাং থেকে ছাল ছাড়াচ্ছে। শুয়োরের মাংস টুকরো করছে। আমাদায়ুং ও নিবাস মাছের টুকরো করছে। ঘরের ঠিক মধ্যিখানে উঁচু, চৌকো, সুবিশাল পস্ন্যাটফর্ম। তার নিচে ক্যাবিনেট। সেই পস্নাটফর্মেই কাটাকুটি ও রান্নাকরা খাবার রাখার বিধি।
গান চলতে লাগল, নাচ চলতে লাগল, বিভিন্ন দেশ ও মহাদেশের ভিন্নধর্মী ও বিচিত্র সংস্কৃতির রাইটারের দল একের পর এক উনুন জ্বেলে রান্না চাপাতে লাগল। চপিং বোর্ড নিয়ে কাড়াকাড়ি পড়ছে, এ ওরটা টেনে নিচ্ছে, কেউ নাচতে, গাইতে বা ধোয়াধুয়ির জন্য সিঙ্কে গেলেই তার ছুরি উধাও হয়ে যাচ্ছে। মাঝে মাঝেই শোনা যাচ্ছে, আরে আমার ছুরি! এ কী, আমার খুমিত্ম কে নিল। ও হো, সাঁড়াশিটা রাখলাম, গেল কোথায়।
বাসন-কোসন নিয়েও কম টানাটানি হল না। সবাই সুবিধামতো পাত্র চায়। আরব ও আফ্রিকানরা সবচেয়ে বড় ডেকচি, গামলা ও কড়াইগুলো অধিকার করল। ইউরোপ নিল মেজ গামলা, সসপ্যান ও ফ্রাইংপ্যান। এশীয়রা দখলদারিতে বিশেষ সুবিধে করতে না পেরে বড়, ছোট, মাঝারি যা পেল, তাতেই রান্না চাপাল।
অমলিনী যে একটা প্রেশার কুকারের নাগাল পেয়েছিল, ঢাউস এবং ভারী, তারই মধ্যে সে রাঁধতে লাগল। কাজটা কারো পক্ষেই সহজ নয়। দেয়ালের দিকের শেষ সারির উনুন ব্যবহার করা গেল না। অত দূর খুমিত্মসমেত হাত নিলে হাত ঝলসে যাবে। উনুনের ব্যবহারযোগ্যতা বাড়ানোর জন্য মাঝখানের পস্ন্যাটফর্মের মতো চারদিক খোলা রাখার প্রয়োজন ছিল। পনেরোটি উনুনে পনেরোটি রকম রান্না হতে চলেছে। মাছ, গোমাংস, চিকেন, শুয়োর পাশাপাশি সেদ্ধ হচ্ছে। কোনোটায় আলু, কোনোটায় ভাত, ডাল, বেগুনভাজা, ডিম অথবা পালং। একেবারে বাঙালি কায়দায় বেগুন ভাজছে ইরাকের হারিক! এক রান্নার ধোঁয়ায় মিশে যাচ্ছে অন্য ধোঁয়া, এক গন্ধে মিশে যাচ্ছে অন্য গন্ধ। পেঁয়াজ, রসুন, ফোঁড়ন, মশলা, মাছ-মাংস, সুগন্ধী বাসমতী মিলে এমন মিশ্রিত ম-ম করা গন্ধে সকলের মন কেমন করে উঠল। গায়ে গা লাগিয়ে রাঁধছে রাইটাররা। অমলিনী একটু শঙ্কিত। এই বুঝি ঝগড়া বাধে। এই বুঝি ঐতিহাসিক দোষারোপগুলি শুরু হয়। কিন্তু রাইটাররা অনেকেই এখন রান্নায় মশগুল। কাড়াকাড়ি, হুড়োহুড়ি গিয়ে উনুনের পাশে জমেছে। মোলির একদিকে জেরেমিস অন্যদিকে হারিক, সবচেয়ে উত্তেজিত শবনম। রাঁধছে, হুলেস্নাড় করছে, মাংস কাটল, ধুয়ে ফেলল। ফোন বের করে সরাসরি ইউটিউবে একেবারে ধারাভাষ্য দিতে শুরু করল নিজের ভাষায়। রাইটারদের রান্নার জীবন্ত ছবি। নাচাগানার ছবি। অর্ধপক্ব খাবার ও বিশাল উনুনের ছবি। এতগুলি উনুন জ্বলছে, ঘর গরম। রাইটাররা স্বেদসিক্ত। সারা ঘরের শব্দ, গান, নাচ ও কর্মব্যস্ততার মধ্যে একরকম মায়া আছে। পৃথিবীতে খাদ্যের আয়োজনের চেয়ে মায়াবী আর কী থাকতে পারে?
নাচ থেমে গিয়েছে। গান চলছে। কথা চলছে। হঠাৎ অমলিনীকে চমকে দিয়ে বেজে উঠল অরিজিৎ সিং। ফির ভি তুমকো চাহুঙ্গা। সে অবাক হয়ে তাকাল। ভারতে অত্যন্ত নামী শিল্পী সে এখন। বাংলার মুর্শিদাবাদ জেলায় বড় হয়েছে। সুকণ্ঠী, সুগায়ক। তার গান কে চালাল?
তুম মেরে হো ইস পল মেরে হো
কাল সায়দ ইয়ে আলম না রহে
কুছ অ্যায়সা হো তুম তুম না রহো
কুছ অ্যায়সা হো হাম হাম না রহে
ইয়ে রাসেত্ম আলগ হো যায়ে
চলতে চলতে হাম খো যায়ে
ম্যায় ফির ভি তুমকো চাহুঙ্গা …
ইয়াকভ : আই দোনত আনদারসত্ম্যান্দ দ্য ল্যাঙ্গোয়েজ। বাত, দ্য সং ইজ মেলোদিয়াস।
জেরেমিস : সত্যি খুব সুন্দর গান।
অ্যালেক্স : দিস ইজ বলিউড মুভি সং। আই লাইক ইট।
মোলি : দিস ইজ এ হিন্দি সং। তুমি এটা বোঝো?
অ্যালেক্স : না। সুরটা ভালো লাগে বলে রেখে দিয়েছি। তোমার ভাষা তো?
মোলি : আমার ভাষা ঠিকই, কিন্তু এ-ভাষায় আমি লিখি না। আমার মাতৃভাষা বাংলা।
জেরেমিস : বলিউড মানে?
অ্যালেক্স : ভারতের সবচেয়ে বড় ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি। বম্বে শহরের বলে হলিউডের অনুকরণে বলিউড। ফিল্মের বিশাল জগৎ!
জেরেমিস : মোলি, তুমি কি এই ভাষাতেই গান গাও?
মোলি : গাই। তবে ওই যে বললাম, এটা ভারতের অনেক ভাষার একটা। আমার ভাষা বাংলা।
অ্যালেক্স : তুমি একটা বাংলা গান বলো, চালাই।
লোরেন : আমি একটা জ্যামাইকান গান বলছি, চালাও।
শবনম : আমার গানই বা নয় কেন?
অ্যালেক্স : একসঙ্গে তেত্রিশটি ভাষায় তো গান শোনানো সম্ভব নয়। তোমরা এমন বাচ্চাদের মতো করো কেন? ভারতীয় গান ও নাটকের কোনো তুলনা হয় না, বুঝলে? যাকগে! তাহলে তোমরা পিঙ্ক ফ্লয়েড শোনো।
চ্যাং : পিং লয়েদ? চায়না?
… The lunatic is in the hall
The lunatics are in my hall
The paper holds their folded faces to the floor
And every day the paper boy brings more… (চলবে)

Leave a Reply

%d bloggers like this: