অ্যামেলিয়া

লেখক: তিলোত্তমা মজুমদার

॥ ৪ ॥

 

ইতালির রুবা ইলিয়ানা চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়েছে। হিলহিলে শরীর। কালো চামড়া। কোঁকড়া চুলের থোকা নেমে এসেছে কাঁধে। টাইট জিনসের ওপর হাতকাটা টাইট টি-শার্ট। কানে ঝুমকো দুল। কোনো প্রসাধন নেই। নাচছে। রুবা নাচছে। যেমন ঘুমচোখ হলে, শরীরী গড়ন হলে ভারতীয় নারী সুন্দরী রূপসী আখ্যা পায়, রুবা সেরকম নয় একটুও। তার সারামুখে অনাবিল হাসি। নৃত্য তাকে গভীর আনন্দ দিচ্ছে। অমলিনীর মনে হচ্ছে, রুবা কী সুন্দর! কী অপরূপ! নৃত্যপটীয়সী কেউটের মতো লাগছে তাকে। রুবা নাচছে। হাসছে। জেরেমিস যোগ দিলো। কী সুন্দর জেরেমিস! ইয়াকভের মতো লম্বা নয়। খর্বকায়ও নয়। নির্মেদ। স্বপ্নিল দুটি চোখ। লালচে চুল। শ্বেতকায় জেরেমিসকে হাসলে কার মতো লাগে? কার মতো? সমান ও সুন্দর দন্তপঙ্ক্তিসমেত সে কি গ্রেগরি পেক? সে কি সাহিত্যের পাতা থেকে উঠে আসা বুদ্ধদেব বসু? ফ্রানজ কাফকা?

নাচতে নাচতে রুবার কোমর জড়িয়ে ধরছে জেরেমিস। নাচতে লাগল লোরেনটিনা। রুবার মতো লম্বা কিন্তু হিলহিলে নয়। আফ্রিকান চোখ তাকে সুন্দরী বলবে নিশ্চয়ই। তার পোশাক নির্বাচনের মধ্যে রঙের বাহার আছে, অলংকারের মধ্যে আছে নিজেকে সাজিয়ে তোলার যত্ন। তার নিমগ্ন নাচের পাশে এবার অ্যালেক্স জারভিরোভা। নাট্যকার ও চলচ্চিত্রকার। ছটফটে, নির্মেদ, খর্বকায়, শ্বেতবর্ণ অ্যালেক্সের বয়স

ত্রিশ-বত্রিশ। তার নাচের মধ্যেও এক ছটফটানি আছে। এরই মধ্যে সে বিরলকেশ। তার ঠিক উলটো ফিলিপিন্সের ফিল্মমেকার ও কবি জর্জ। নাচতে নাচতে সে নিজের খোঁপা খুলে ফেলল। একঢাল লম্বা রেশমি চুল ছড়িয়ে পড়ল পিঠময়। আর্জেন্টিনিয়ান ফিল্মমেকার ফিলিপ উঠে এলো এবার। নাচছে। ইয়াকভের চেয়েও লম্বা শ্বেতকায় ফিলিপ। ন্যাড়ামাথা। দেবদূতের মতো সুন্দর।

গান পালটে গিয়েছে। এখন চলছে এলভিস প্রিসলি। লাভ মি টেনডার।

Love me tender, love me dear/, Tell me you are mine

I’ll be yours through all the years/, Till the end of time.

নাচছে। গাইছে। এ ওকে জড়িয়ে ধরছে। ও তার গালে চুমু খাচ্ছে। গাইছে। নাচছে। হু উই আর, উই আর রাইটার্স। অমলিনী চুপ করে গিয়েছে। তার মনে আনন্দ ও বিষাদ। তার মনে আকর্ষণ ও উদাসীনতা। সে জানালার সামনে দাঁড়াল। কাচের জানালার ওপারে সবুজ ঘাসের ঢাল। তারপর নদীর পাশ দিয়ে চলপথ। নদী। তার স্বপ্নের, কল্পনার আইওয়া নদী। এই জানালা দিয়ে বহুদূর দেখা যায়। আমি, দানিয়েল তার পাশে দাঁড়ালাম। ইয়াকভও এলো।

মোলি : তুমি নাচ্ছ না কেন ইয়াকভ!

ইয়াকভ : ধুর। নাচ আমার আসে না। গলায়ও সুর নেই। তবু তো গলা মেলালাম। তুমি তো বেশ গাইছিলে! চুপ করে গেলে কেন?

মোলি : নদীটা দেখতে ইচ্ছে করল।

ইয়াকভ : তোমার ঘর থেকে দেখা যায় না?

মোলি : না তো। এসো একবার আমার ঘরে। ২১০।

ইয়াকভ : আমার ২৩০। নদীটা বেশ দেখা যায়, বুঝলে? আজ বিকেলে বেরোচ্ছ তো?

 

সারা এসেছে। তার উচ্ছ্বসিত কণ্ঠস্বর চড়া এবং সে স্বয়ং দৃশ্যমান।

সারা : আরে! এ তো দারুণ দৃশ্য দেখছি। এই প্রথম দেখলাম রাইটাররা এত দ্রুত বন্ধু হয়ে গিয়েছে। শোনো, তোমাদের আজকের ও কালকের পার্টি বিষয়ে শুনে নাও। যদিও একটু পরেই তোমাদের ঘরে ঘরে সাপ্তাহিক কর্মসূচি পৌঁছে দেবো। আজ সবাই ঠিক পৌনে তিনটেয় লবিতে হাজির হবে। মেডেসা মার্টিন আসবেন, সঙ্গে অ্যাঞ্জেলিনা ও সিন্থিয়া মিল্কম্যান। কাউকে জোর করা হচ্ছে না কিন্তু। আগ্রহীরা আসবে। কারো ইচ্ছে হলে ঘুমোতে পারো। তবে আমরা বলি, কাম অন। শেক অফ ইয়োর জেট ল্যাগ। মেডেসা আর অ্যাঞ্জেলিনা, সিন্থিয়ার সঙ্গে তোমরা ধীরে-সুস্থে ক্যাম্পাস ঘুরবে। ডাউনটাউন দেখবে। তারপর?

সমবেত : তারপর কী, সারা?

সারা : তারপর প্রেসিডেন্টস ব্লক পার্টি। ১০২ চার্চ স্ট্রিটে প্রেসিডেন্টের বাড়ির সামনের মাঠে আমাদের পার্টি। প্রচুর হাঁটাহাঁটি করে একপেট খিদে নিয়ে তোমরা এখানে গিয়ে কী পাবে?

সমবেত : কী পাব, সারা?

সারা : স্যা-ন-ড-উ-ই-চ! ঠান্ডা পানীয়ও থাকবে। যার যত খুশি খাও। এই ফল মরশুমের সমস্ত নতুন ছাত্রছাত্রীর আজ নবীনবরণের দিন!

সারা চলে যেতেই আর্জেন্টিনার ফিলিপ ক্রেট বলে উঠল, ‘আবার যেন স্কাউট ক্যাম্পে চলে এসেছি।’

হা হা হাসির হররা ছুটল। সবাই যেন অল্পেই বড় বেশি হাসছে। আমেরিকায় আসতে পেরে সবাই কি বড়ই খুশি? ঘরবাড়ি, প্রিয়জন ছেড়ে তিনমাসের জন্য প্রবাসে আগমনের উদ্বেগ চাপা দেওয়ার উদ্দেশ্যে এই হাসি? নাকি ইন্টারন্যাশনাল রাইটিং প্রোগ্রামে এই আইওয়া আসতে পেরে সকলেই ভাবছে, এই তো বুকার, পুলিৎজার, নোবেলের পথ খুলে গেল!

মায়ানমারের কবি আমাদায়ুং সু আং তার ছোট্ট পোনি টেল মার্কা ঝুঁটি নেড়ে বলল, ‘স্যান্ডউইচ উইচ উইচ। উই ক্যান গো ইভন ফার। টু ইট এ উইচ উইচ। টু সেভ এ ডলার।’

আবার হাসি। আবার হইচই। যেন ছিপি খোলার অপেক্ষা ছিল। প্রত্যেকেই হড়বড় করে বলতে চায় ডলার বাঁচানোর চেয়ে বাস্তব আর কিছুই হয় না।

অ্যালেক্স : ত্রিশ ডলারে ভাত-ডাল খাব, না মদ গিলব, শালার কিস্যু হবে না। দুদিনেই ফুরিয়ে যাবে।

ফিলিপ : শুধু মদ খাব। তাহলে আর খিদেই পাবে না।

জর্জ : যা বলেছ। তবে আমেরিকায় মদ সস্তা।

রুবা : ত্রিশ ডলারের মধ্যে পাঁচ ডলার বাঁচাব। মেয়েরা খুব সংযমী। পঁচিশ ডলারে বিফ আর বিয়ার্স। চিয়ার্স চিয়ার্স। মদ না খেয়ে থাকতে পারব না বাপু!

ফিলিপ : মেয়েরা নিজের অর্থ রক্ষা করে, পুরুষদের পকেট ফাঁকা করে দেয়। তাই আমার কোনো গার্লফ্রেন্ড নেই। আমি গে। বন্ধুরা, গোড়াতেই বলে দেওয়া ভালো আমি সমকামী। ঘোষিত এবং বিবাহিত সমকামী। অ্যাই অ্যাম এ গে গে গে। অ্যানি প্রবলেম?

মোলি : সমস্যা আবার কী! এটা যার যার ব্যক্তিগত ব্যাপার।

জর্জ : আমিও গে। সত্যি কথা বলতে কী, বাড়ি থেকে আমাকে জোর করে একটি মেয়ের সঙ্গে বিয়ে দিয়েছিল। আমি মানসিকভাবে একজন নারী। কিন্তু শারীরিকভাবে পুরুষ। আমি হিজড়েও নই কিন্তু। আর পাঁচজন পুরুষের মতো আমার স্বাভাবিক লিঙ্গোত্থান হয়। মন ও শরীর একই ছন্দে না চললে যে কষ্ট, তা আমি কাউকে বোঝাতে পারি না। আবার মানসিকভাবে নারী হওয়ায় আমি জানি, রমণবঞ্চিত নারীর দুঃখ কী। তাই আমার স্ত্রীর জন্য আমাকে পুরুষের অভিনয় করতে হয়। আমার একটা ছেলে আছে। বয়স আট। জানি না বন্ধুরা, এই অল্প পরিচয়েই এত ব্যক্তিগত প্রসঙ্গে চলে গেলাম কেন। আমাদের এই ক্যাম্পের আয়ু মাত্র তিন মাস। তাই এক রাত্রি একসঙ্গে থাকা মানে হয়তো পাঁচ বছর একত্রে কাটানো। আশা করি আমি তোমাদের কাছে অপ্রিয় হয়ে যাব না, যেমন হয়েছি আমার বাবা-মা, আমার স্ত্রীর কাছে। আমার স্ত্রী আমার স্বামীকে মানতে পারে না।

ফিলিপ : আমার সে-সমস্যা নেই। আমার স্বামী আছে। আমরা কেউ কাউকে ছেড়ে থাকতে পারি না। দু-সপ্তাহ পরেই বার্নি আসবে আমার কাছে। এরা তো আবার দু-হপ্তার বেশি কাউকে থাকতে দেবে না।

ইয়াকভ : দেবে না কেন? তোমরা নিজের খরচে থাকবে। অস্ট্রেলিয়ার অ্যালিস জুন একটা আলাদা অ্যাপার্টমেন্ট নিয়েছে বর আর মেয়েকে নিয়ে থাকবে বলে।

ফিলিপ : অত খরচ করা যাবে না ইয়াকভ।

জর্জ : বরং কিছু ডলার বাঁচলে পরের ফিল্মে ঢালা যাবে। আমার প্রেমিক আমাকে ছেড়ে কষ্টে থাকবে। কিন্তু বিরহে আকর্ষণ বাড়ে, জানো তো?

সমীর : আমিও তোমাদের দলে। মানে গে। বাড়িতে বলে দিয়েছি, পাত্রী-টাত্রী দেখো না। আমরা আদতে ভারতীয় ছিলাম। আজো ভারতের অনেক নিয়মকানুন আমাদের পরিবারে রয়ে গেছে। আমার সমকামিতা বাড়িতে কেউ মানতে রাজি নয়। এটাও যে স্বাভাবিক, প্রকৃতিপ্রদত্ত, তা বোঝে না। বড় কঠিন এই অস্তিত্বের লড়াই।

লোরেনটিনা : তাহলে তোমাদের কারো কোনো আত্মোপলব্ধিগত সমস্যা নেই?

ফিলিপ : কী বলতে চাও?

লোরেন : আইডেনটিটি ক্রাইসিস মাই ফ্রেন্ড। তোমরা যখন নিশ্চিত যে তোমরা দেহে পুরুষ মনে নারী, তাহলে লিঙ্গ পরিবর্তন করে নিচ্ছ না কেন?

জর্জ : উত্তরটা কি আমি দিতে পারি ফিলিপ?

ফিলিপ : নিশ্চয়ই জর্জ।

জর্জ : সমকামী মানেই লিঙ্গ পরিবর্তনকামী নয়। একটা সময় সমকামীদের মধ্যে এই প্রবণতা বেশি ছিল যে, শরীরটাও পালটাতে হবে। কিন্তু আধুনিক চেতনা প্রকৃতিপ্রদত্ত শারীর গঠনের পরিবর্তনের বিরুদ্ধে। অর্থাৎ খোদার ওপর খোদকারি কোরো না। শরীর নিয়ে সমস্যা নেই তো।

মোলি : ঠিক। ততক্ষণই সমস্যা যতক্ষণ আত্মনির্ণয় করতে অসুবিধে থাকে। বাকিটা তো বাহ্যিক লড়াই। সমাজের সঙ্গে, পরিবারের সঙ্গে।

ফিলিপ : তুমি কি সমকামী মোলি? তোমার দেশে কি সমকাম আইনসংগত?

মোলি : না ফিলিপ। আমার এ-বিষয়ে একটা উপন্যাস আছে। কিছু পড়াশোনা করেছি। তাছাড়া, আমি খুব কাছ থেকে দেখেছি। আমার দুই বান্ধবী ছিল, ওই, যাকে বলে লেসবিয়ান। ইন্ডিয়া এখনো সমকাম আইনসংগত বলেনি, কিন্তু আন্দোলন চলছে। সাধারণ মানুষের সচেতনতা বাড়ছে। শিগগিরই হয়তো আইনের ছাড়পত্র মিলবে।

ইশিমাতো সুজিয়ানো, জাপানি রাইটার, পুতুলের মতো হাত-পা নেড়ে ভাঙা ইংলিশে বলে উঠল, ‘হিয়ার নো গার্ল নো হোমোচেকচুয়াল।’

আবার অট্টহাস্য করে উঠল সবাই। কোরিয়ান সাইয়ুন অমলিনীর গায়ে গা-ঘেঁষে দাঁড়িয়ে বলল, ‘ভীষণ উদ্বেগ বোধ করেছিলাম।’ লম্বা চুল সাইয়ুনের। সোনালি গা। পাতলা লাল ঠোঁট আর ছিপছিপে শরীর। বার্বি পুতুলের মতো সুন্দর সে। খুব চাপাস্বরে কথা বলে, যেন সদাসতর্ক, যাতে কেউ তার কথা শুনে না ফেলে। সে মিষ্টি হেসে অমলিনীর হাত ছুঁলো।

মোলি : কেন সাইয়ুন?

সাইয়ুন : জানো, ছবিতে তোমার চোখ দেখেই তোমাকে আমি ভালোবেসেছি। তখন থেকেই তুমি আমার বন্ধু। ভালো ইংলিশ বলতে পারি না। কিন্তু তুমি জেনো, তোমার হৃদয় আমার হৃদয়ে মিশে গিয়েছে। তার মানে কি আমরা সমকামী? মোটেই না। আমি সমকাম ঘৃণা করি। ভাবলে গা গুলিয়ে ওঠে। যদি বলতে তুমি হোমোসেক্সুয়াল, দুঃখে কেঁদে ফেলতাম। তুমি ওদের ঘৃণা করো না?

মোলি : না সাইয়ুন। কাউকেই ঘৃণা করতে নেই। এসব আর বোলো না। ওরা শুনলে দুঃখ পাবে।

সাইয়ুন : পাবে না। ওরা অভ্যস্ত। অর্ধেক দুুনিয়া সমকামীদের ঘৃণা করে।

মোলি : দেখো, বাইরেটা কী সুন্দর! চলো নদীর ধারে যাই।

কিন্তু সাইয়ুন নদীর পারে যেতে চাইল না। তার চেরা চোখ, লম্বা চুল, পাতলা ঠোঁট আর সুন্দর শারীর গঠনসমেত সে ঘরে ফিরে যেতে চাইল। ফিল্ম কোম্পানির স্ক্রিপ্ট লেখে সে। তাকে কাজ দুঃখে খুব মদ গিলতাম। বন্ধুরা বলল, এবার অ্যালেক্স নাট্যকার থেকে কবি হয়ে যাবে। কিন্তু একটি কবিতাও এলো না। কবিতা কী করে আসে সেটাই বুঝি না আমি।

লোরেন : বিয়ে ভাঙল কেন অ্যালেক্স?

অমলিনী লোরেনটিনাকে দেখল ভালো করে। অদ্ভুত মহিলা। এমন ব্যক্তিগত প্রশ্ন এমন স্বল্পালাপে করে নাকি? অন্যরা ভাবলেশহীন হওয়ার ভান করছে। অ্যালেক্স দুটো ডিগবাজি খেল পরপর। বলল, ‘আমার দলেই সে অভিনয় করত। খুবই ভালো অভিনেত্রী। আমার প্রথম ফিল্ম তাকে নিয়েই বানিয়েছি। দেখাব তোমাদের। খুব রোমান্টিক। বিয়ের পরে আমি তার সবই মেনে নিচ্ছিলাম। নারীস্বাধীনতা বলতে আজকাল মেয়েরা যা যা বোঝে, তার সবটাই। কিন্তু সে যেদিন আমাকে না জানিয়ে ভ্রƒণহত্যা করে এলো, আর পারলাম না।’

রুথ : কোনো মেয়ে মা হতে চায় কি না সেটা তার নিজস্ব সিদ্ধান্ত অ্যালেক্স।

আদনাশে : নিশ্চয়ই। এমনকি মা হওয়ার জন্য কোনোরকমভাবে জোর করাও যায় না। সেটা ব্যক্তিস্বাধীনতার বিরোধী। নারী নিজেই তার শরীরের অধিকারী। অন্য কেউ নয়। শরীরবিষয়ক যে-কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার সম্পূর্ণ স্বাধীনতা নারীর আছে।

অ্যালেক্স : দাঁড়াও দাঁড়াও। আমি দাম্পত্য জীবনের কথা বলছি। ওই সন্তানের ওপর আমারও অর্ধেক অধিকার ছিল। কাউকে মা হওয়ার জন্য জোর করা ব্যক্তিস্বাধীনতার বিরোধী, কাউকে জোর করে পিতৃত্ব থেকে বঞ্চিত করা ব্যক্তিস্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ নয়? পুরুষমানুষ হিসেবে আমার প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করা নয়?

রুথ : বাচ্চা এখনই চাও কি না এ ব্যাপারে তোমরা আলোচনা করেছিলে কি?

অ্যালেক্স : কিছু মনে কোরো না রুথ, তুমি কি বিবাহিত? ও হ্যাঁ, তুমি বলছিলে বটে, দেশে তোমার স্বামী আছেন।

রুথ : আমার ছেলেও আছে অ্যালেক্স।

অ্যালেক্স : তাহলে তো জানোই, বাচ্চা সবসময় আলোচনা করে হয় না।

জেনিফার : আরে আমরা কবিতার ব্যাপারে কথা বলছিলাম। আলেক্স, খুবই দুঃখজনক যে তোমার বিয়ে ভেঙে গেছে। কিন্তু অতীত নিয়ে ভেবে কী লাভ? তুমি খুবই তরুণ। তোমার জন্য সুন্দর জীবন অপেক্ষা করে আছে। ইয়াকভ, তোমাকে অসংখ্য ধন্যবাদ। তুমি এবার বসো তো। আমি খুবই আরাম পেয়েছি। শোনো, আমি ইয়াপ ওয়েবসাইটে তোমার কবিতা পড়েছি, ভালো লেগেছে। আমাকে বলো কী করে কবিতা লিখতে হয়।

ইয়াকভ : আরে কবিতাই তো আমি পড়াই। বিশ্ববিদ্যালয়ে কবিতা নিয়ে লেকচার দেওয়াই আমার কাজ। এতে আমার কোনো ক্লান্তি নেই।

জেনিফার : আমাকে কবিতা লেখা শেখাবে।

জেরেমিস : কবিতা লেখা কাউকে শেখানো যায় নাকি? সে যার আসে তার আসে।

জেনিফার : তাহলে আর রাইটার্স ওয়ার্কশপ করে কী লাভ হলো? যে যা পারে না, তাকে ধরে শিখিয়ে দাও। এই হলো রাইটার্স ওয়ার্কশপ। না হলে বাষট্টি বছর বয়সে আমার এসবের কী দরকার ছিল? আমি ছিলাম সিঙ্গাপুর সরকারের রিজার্ভ ব্যাংকে ঋণ বিভাগের প্রধান। সে-জগৎ এতই গদ্যময় যে-কবিতা পড়তেও ভুলে গিয়েছিলাম। আর ইয়াকভ তো কবিতার অধ্যাপক। আচ্ছা আমাকে বলো তো, কবিতা কী করে আসে।

ইয়াকভ : কবিতার অসংখ্য ব্যাখ্যা এবং ব্যাখ্যাতীত তার উৎস। কার মনে কোন অনুভব যে কাব্য রচনার প্রেরণা হিসেবে কাজ করবে তা বলা শক্ত। একমাত্র কবিই তা বলতে পারে।

জেরেমিস : কখনো তা-ও পারে না।

ইয়াকভ : ঠিক। তাই কবিতাকে আমি দেখি একফ্রেসতিক লিতারেচার হিসেবে। কিংবা একফ্রেসতিক পোয়েতরি।

জেনিফার : একফ্রেসতিক মানে কী?

জেরেমিস : একফ্রেসটিক। এটা একটা গ্রিক শব্দ। মানে বর্ণনা।

ইয়াকভ : শুধু বর্ণনা নয়। একফ্রেসিস মানে একই সঙ্গে দ্বিমাত্রিক অভিজ্ঞতা। তুমি যেভাবেই দেখো, কবিতার দ্বিমাত্রিকতা আছে। উৎস এবং প্রকাশ। প্রকাশ এবং অর্থ। অর্থের বিভিন্নতা। অনেক সময় দুই থেকে কবিতা চলে যায় বহুমাত্রায়। আবার কবিতার এক অবয়ব আছে। কবিতার দৃশ্য অথবা দৃশ্য থেকে কবিতা। ধরো একটা ছবি, সেটা কবিতার উৎস হতে পারে। আবার ধরো একটা অভিজ্ঞতা, সেটাও তো ছবি। অঙ্কিত চিত্র আর বাস্তব চিত্র, দুই-ই তো ছবি, আবার তার থেকে লেখা কবিতা, সে-ও একটা ছবি তৈরি করে।

জেরেমিস : এ রিলেশনশিপ বিটুইন … বিটুইন ওয়ার্ডস অ্যান্ড ইমেজেস।

ইয়াকভ : ঠিক। এটাই আমি বলতে চাইছি। কবিতার উৎস এবং প্রকাশ, কবিতার অর্থকেও প্রভাবিত করতে পারে। জেনিফার তুমি জানতে চাও কবিতার উৎস কী। আমি বললাম প্রথমত কবিতার উৎস অজ্ঞাত। তখন কেবল প্রকাশ ও অর্থ দুটি মাত্রা। যদি উৎস জ্ঞাত হয়, তখন উৎস ও অর্থ অনেক কাছাকাছি। প্রকাশ তখন একটা ধরন মাত্র। একটা ফর্ম। আমি একটা উদাহরণ দিই। ম্যাসিডোনিয়ান পোয়েট ব্লেজ কোনেসকির একটা কবিতা। ‘এ ভিজিট টু এ মিউজিয়াম।’ Their arms touched each other in silent excitement at the entrance of the small hall./ They sat together, closely, on the bench./ They had no need to talk about their life – they just stared at Claude Monet’s Red water Lilies and behind them, in silence, Picasso’s Guernica. তোমরা সবাই মোনে এবং পিকাসোর এই ছবিগুলোর সঙ্গে পরিচিত। এখানে কবিতাটা শুধু শব্দ দিয়ে লেখা নয়, ছবি দিয়েও লেখা।

কাম্বা : এই বর্তমান সময়ে একফ্রেসটিক পোয়েট্রি বলতে ঠিক কী বোঝায় তার একটা ব্যাখ্যা দিয়েছেন জেমস হেফারম্যান। ÔIt represents works of art within the content of a museum, which of course, includes words that surround the pictures we see, beginning with picture titles.’

ইয়াকভ : ধন্যবাদ কাম্বা। একদম সঠিক উদ্ধৃতি। এখানে প্রশ্ন হলো, যারা ছবিগুলো দেখেনি, তারা কী করে বুঝবে? তারা ওই বোঝার জন্য ছবিগুলো দেখবে। কারণ আর্তওয়ার্ক ইজ এ ভিসুয়াল ক্যাতালিস্ত অফ পোয়েমস। আবার কবিতার মধ্য দিয়েও চিত্রকলার নব্যার্থীকরণ ঘটে। কবিতা নিয়ে যারা কাজ করতে চায় তাদের চিত্রকলার জগৎ সম্পর্কে সম্যক ধারণা রাখা উচিত এবং কবিতার ক্লাসে আমি প্রজেকটারে বিভিন্ন ছবি দেখাই ছাত্রছাত্রীদের। বিশেষত ইউরোপীয় চিত্রকলার নানা যুগ, যা সারাবিশ্বকে প্রভাবিত করেছে।

লোরেন : কে বলল?

ইয়াকভ : মানে?

লোরেন : কে বলল ইউরোপীয় চিত্রকলা সারাবিশ্বকে প্রভাবিত করেছে? তোমরা, ইউরোপীয় এবং আমেরিকানরা মনে করো তোমরা যা লেখো, যা আঁকো, যা খেলো, বাকি বিশ্ব তাই অনুসরণ করে এবং সেটাই করা উচিত।

জিনেট : হ্যাঁ, করা উচিত। আমেরিকা তো সেদিনের দেশ। তার আগে ইউরোপই তো এশিয়া ও আফ্রিকাকে সভ্য, সুশিক্ষিত করেছে। আর্ট ও লিটারেচারের ধারণা দিয়েছে। ইউরোপীয় চিত্রকলা পৃথিবীকে সমৃদ্ধ করেছে, করবে।

জেনিফার : বন্ধু জিনেট, তোমার কথা শুনে মনে হচ্ছে, ইউরোপীয় সংস্কৃতির প্রচার ও প্রসারের বিপুল দায়ভার তুমি স্বেচ্ছায় কাঁধে তুলে নিয়েছ। কিন্তু গলা চড়িয়ে বললেই কোনো বক্তব্য যুক্তিসংগত হয় না। তুমি কি প্রাচীন চৈনিক বা জাপানি চিত্রকলা দেখেছ? তুমি ভারতের মুঘল আর্ট দেখেছ? রামায়ণ-মহাভারত মহাকাব্য কি জানো? বৌদ্ধ গল্প, সংস্কৃতি ও দর্শন কত প্রাচীন বলতে পারবে? প্রাচীন মন্দিরের স্থাপত্য, অজন্তার চিত্রকলা কি তা জানো?

অ্যালেক্স : রামায়ণ-মহাভারত মহাকাব্য, বৌদ্ধদর্শন, এসবের সঙ্গে কনফুজিয়ান দর্শনের কথাই বাদ যায় কেন?

জেনিফার : আর আর্টওয়ার্কের রকমফের আছে। আর্টওয়ার্ক শুধু চিত্রকলা নয়। আফ্রিকান মুুখোশগুলোও অসামান্য আর্টওয়ার্ক। সেগুলো দেখেও কবিতা জন্মাতে পারে।

লোরেন : সমস্ত যুগে, সমস্ত সভ্যতায় নিজস্ব শিল্পবৈশিষ্ট্য তৈরি হয়। কোনোটা ব্যাপক প্রসারিত। কোনোটা নির্দিষ্ট অঞ্চলে সীমাবদ্ধ। যেটাকে আমরা বলি লোকশিল্প। আমার প্রশ্ন সেটা নয়, আমার কথা হলো, যে-দেশ অনুন্নত, দরিদ্র, তারা কোথায় কম্পিউটার পাবে, কোথায় প্রজেকটর? কীভাবেই-বা তারা প্যারিসের লুভর দেখবে কিংবা নিউইয়র্কের মোমা? তারা যা শিখবে, যেভাবে কবিতাকে জানবে, তা কি তবে পূর্ণ শিক্ষা হলো না?

রুথ : তোমাকে এসব ভাবাবে। এর মধ্যেই গুগল করে নিয়েছি। তোমার দেশে বাহাত্তর শতাংশ লোক নিরক্ষর। হিহি!

জিনেট : কার জন্য লেখো তুমি, কে বই কেনে, কে পড়ে? হা হা!

লোরেন : নিজের জন্য। আমার মৃত মেয়ের জন্য। বইয়ের পাঠক সর্বত্র আছে জিনেট। তুমি দুঃখবোধ কোরো না।

অ্যালেক্স : কী হয়েছিল মেয়ের?

লোরেন : ব্লাড ক্যান্সার। ষোলো বছর বয়সে সে আমাদের ছেড়ে যায়। আমি আগে কখনো কাব্য-সাহিত্য লিখিনি জানো। সে যখন মারা গেল, তার বিছানায় শুয়ে আছে, যেন ঘুমিয়ে আছে। আমার মনে হলো, আশ্চর্য, সে আছে, আবার সে নেই-ও। কী শূন্যতা! কী ভয়ংকর শূন্যতা! তাকে খবর দেওয়ার পর আমি ঘরে এসে দরজা বন্ধ করে দিলাম। আমার সমস্ত কান্না কবিতা হয়ে বেরোতে লাগল। আমি আমার মাকে ভীষণ ভালোবাসি। আমি আমার মেয়েদের ভীষণ ভালোবাসি। মাতৃত্ব এক বিস্ময়, অত্যন্ত অর্থবহ। মাতৃত্ব এক আশ্চর্য রহস্যময় শক্তি, যার কাছে প্রত্যেক মানুষকে নতজানু হতে হয়!

রুথ : খুবই দুঃখজনক লোরেনটিনা। কিন্তু এই আবেগ দিয়ে তুমি ইউরোপীয় চিত্রকলার শ্রেষ্ঠত্ব অপ্রমাণ করতে পারবে না।

কাম্বা : এমন একটা গভীর দুঃখের প্রসঙ্গে তোমার এই প্রতিক্রিয়া! দেখো, অ্যালেক্স আর ইয়েরমেন চোখ মুছছে। মাইডিয়ার ওয়াইফ, কে তোমার নাম দিয়েছিল রুথ! তুমি তো রুথলেস!

রুথ : আমাকে অপমান করছ তুমি কাম্বা।

জেরেমিস : এত কড়া না হলেও চলত কাম্বা। রুথ তর্কের মুডে আছে। তবে লোরেনটিনা, আমার খুব কষ্ট হচ্ছে। আমরা সবাই তোমার জন্য কষ্ট পাচ্ছি।

মোলি : প্রসঙ্গটা পালটানো যাক। চিত্রকলাই আলোচনার বিষয় হোক। কিংবা কবিতা। কিংবা সাহিত্য। দেখো, আমার মনে হয় শিল্প-সাহিত্যের কোনো দেশ নেই, মহাদেশ নেই। যেমন বিজ্ঞানের বা অংকেরও কোনো দেশ হয় না। লিওনার্দো দা ভিঞ্চি, ভ্যান গঘ, লিবনিটজ, গাউস বা আইনস্টাইন, কাফকা, লোরকা, কামু, শেক্সপিয়র বা অমর্ত্য সেন – এঁরা কি সারাবিশ্বের নন? রসাস্বাদনের উপায় থাকলেই সৃষ্টি বিশ্বজনীন হয়ে উঠতে পারে। শ্রেষ্ঠত্বের বিচার কে করবে? তুলনাই-বা কীসের জন্য? প্রচার ও প্রসার আমাদের সুবিধে যেমন দেয়, মনকে প্রভাবিতও করে। এর পেছনে থাকে শক্তি। ক্ষমতা। যে-দেশ যত বেশি ক্ষমতাধর হয়ে ওঠে, তার ভাষা, শিল্প, সাহিত্যও তত আগ্রাসী হয়।

জেনিফার : আমি সিঙ্গাপুরিয়ান। বংশানুক্রমে চায়নিজ। বিয়ে করেছি ভিয়েতনামিকে। ইংলিশ আমার মূল ভাষা। কিন্তু আমি ক্যানটোনিজ জানি, ভিয়েতনামিজ জানি। ম্যানডারিনও জানি অবশ্য। আমি আর আমার বর গতবার ইউরোপ ট্যুরে বেরিয়ে দেখলাম প্রত্যেক দেশের গাইডরা আজকাল চায়নিজ জানে। চায়না ইজ এক্সপ্যান্ডিং, চায়না ইজ পাওয়ারফুল।

অ্যালেক্স : আমেরিকা চাইনিজদের ভীষণ পাত্তা দেয়। নিউজে একরকম, আসলে অন্যরকম। চায়না আমেরিকার অর্থনৈতিক মেরুদ- কুরে খাচ্ছে। লাইক এ বিটল। আমার কাছে খবর আছে ইয়াপের খরচার বিরাট অংশ চাইনিজ কমিউনিটির অনুদান। সবকিছুতে চায়নিজরা প্রধান। দেখেছ, আমাদের স্বাগতপত্রে এক চায়নিজ কবির কবিতা দিয়েছে। কে সে? কেরন? তার নামও শুনিনি। সে আমার না হয় ‘জ্ঞান’ কম। তাই বলে কবিতাটা ভালো হবে না? আমার অন্তত ভালো লাগেনি।

মোলি : স্বাগতপত্র?

অ্যালেক্স : দেখোনি? দেখবে রাখা আছে। ইমুর ব্রোশিয়রে। [চলবে]

Leave a Reply

%d bloggers like this: