অ্যামেলিয়া

লেখক: তিলোত্তমা মজুমদার

\ ৬ \

 

একটি মিক্সি ধরনের বড় জারওয়ালা যন্ত্র। তার প্রকোষ্ঠে বাদাম। বোতাম টিপলেই যে যেমনটি চায়, গুঁড়ো অথবা পেস্ট, বেরিয়ে আসবে। একটি কল লাগানো, তার মুখে পাত্র ধরলে নির্দিষ্ট পরিমাণ বস্ত্ত পাওয়া যাবে। চ্যাং চিনেবাদামের মাখন বানাচ্ছে আর হাঁ করে দেখছে। হাসিমুখে আনন্দ মাখিয়ে বলছে, দিস ইজ আমেরিকা। অল মেশিন। অল রেডি। চ্যাঙের ছেলেমানুষি খুশি দেখে অভিভূত হয়ে যাচ্ছে অমলিনী। এমন অমল বিস্ময় প্রকাশইবা করে কজন! আমি, এক মৃত লোক, প্রেমামৃত পান করার ইচ্ছায়, অমলিনীর চোখ দিয়ে, মন দিয়ে, বুদ্ধি দিয়ে দেখছি এই জীবনলীলা! চ্যাঙের বয়স প্রায় ষাটের দিকে। সে কবি, প্রাবন্ধিক, তাইওয়ানে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ায়। অমলিনী ভাবছে এমন বিস্মিত হওয়ার সামর্থ্য যার, সে তো উজ্জীবিত! বয়স তাকে ফুরিয়ে নেয় না! এমন যার প্রকাশ, সে তো অকপট! মানুষ আজ আর বিস্ময় প্রকাশ করে না, পাছে কোনো অজ্ঞতা বেরিয়ে পড়ে! হায়, অজ্ঞতা ঢাকতে চাওয়ার চেয়ে বড় অজ্ঞানতা আর কী! সে মনে মনে, প্রায় বামনাকার চ্যাংকে বলল, সুন্দর! আমি আমার অ্যামেলিয়াকে বললাম।

অমলিনী দেখল জিয়াং ও সাইয়ুন টিনড মাছ আর স্যুপ কিনেছে, সঙ্গে তৈরি নুডলসের বাক্স। এই নুডলস ঠিক অমলিনীর দেশে যেমন পাওয়া যায়, দু-মিনিটের রান্না, তেমন নয়। মাইক্রো চুলিস্নতে বানিয়ে দিলেই খাবার জন্য তৈরি। এর আগেরবার যখন আমেরিকায় আসে, খেয়েছিল অমলিনী। অত্যন্ত বিস্বাদ। সে আর এসব খেতে চায় না। দিনের পর দিন আলুসেদ্ধ ভাত খেয়েও থাকতে পারে সে। আর টিনের মাছ বা মাংস সে কখনো খেতে পারবে না। খাবারে আঁশটে গন্ধ সে সহ্যই করতে পারে না। সে বরং দু-চারটে ফল নেবে কি না ভাবছে। অ্যালিস অল্প সবজি আর কাঁচা চিকেন নিল। অমলিনী কিছু আলু নিল। বাইশ ডলার খরচ হয়ে গেল তার। কাল সাতাশ ডলার গেছে, আজ বাইশ, তার মন হায় হায় করে উঠল। সবাই বাইরে বসে খাবে বলে আইসক্রিম কিনল, অগত্যা সে-ও আরো সাড়ে তিন ডলার ব্যয় করল।

বাইরে দুটো টেবিলজুড়ে ঘিরে বসল ইয়াপের রাইটাররা। প্রায় ত্রিশজনের দল। জেরেমিস আর ইয়াকভের সঙ্গে অ্যাঞ্জেলিনাও এলো। জিয়াং চেয়ারের পাশে বাজারের থলে রেখে, ব্যাগ থেকে ছোট্ট খাতা ও কলম বের করে চীনে ভাষায় লেখা শুরু করল। কী লিখছ? রোজনামচা? না। কবিতা। অমলিনী জিয়াংয়ের খাতায় উঁকি দিলো। কালো কালির বলপেনে লেখা চৈনিক অক্ষর। খুব কাটাকুটি। খাতাটিও নেহাত মামুলি। ছোট্ট পাতলা রুল টানা খাতা। এমন খাতায়, দ্বিতীয় বা তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ার সময় লিখত সে। সাত-আট বছর বয়সে। তারপর আর ব্যবহার করেনি। সুন্দর প্রচ্ছদসমেত ভালো কাগজের খাতায় লিখতে সে পছন্দ করে। যদিও, খাতার প্রচ্ছদে সত্যিই খুব কিছু যায়-আসে না। ফুরিয়ে গেলে এই প্রচ্ছদের মূল্য কী! বই, সুন্দর বই, সংগ্রহে রাখার জিনিস, খাতা নয়।

নিজের লেখা প্রথম উপন্যাসটির কথা মনে পড়ল অমলিনীর। পুরনো ডায়েরির হলদে বিবর্ণ পাতায় লেখা!

সে বলে ফেলল, ‘এমন ছোট্ট খাতা!’

জিয়াং লেখা থামিয়ে বলল, ‘এ তো দুদিনেই ফুরিয়ে যাবে। ঘরে ফিরে ল্যাপটপে লিখে নেব।’

অমলিনী বিস্মিত হলো। পাতলা ছোট খাতা হলেও, দুদিনে কবিতা লিখে শেষ করে ফেলা শক্ত কাজ। সে আইসক্রিমে মন দিলো। শোনার চেষ্টা করল কে কী বলছে!

অ্যাঞ্জেলিনা : সবাই আইসক্রিম খাচ্ছে দেখছি। দারুণ।

ইয়াকভ : যাই আমিও নিয়ে আসি। জেরেমিস? অ্যাঞ্জেলিনা?

অ্যাঞ্জেলিনা : রোজ খেতে ইচ্ছে করবে কিন্তু, আমেরিকার আইসক্রিম দারুণ খেতে।

জেরেমিস : আমিও একটু খেতে চাই। মিস মিস মিস অ্যাঞ্জেলিনা মিস, আই ওয়ান্ট টু লিক আইসক্রিম ফ্রম ইয়োর লিপস।

অ্যাঞ্জেলিনা : ধন্যবাদ। আমি আইসক্রিম ঠোঁটে মাখিয়ে খাব না।

জেরেমিস : আমিও তাহলে খাব না। আমি বিয়ার খাব।

অ্যাঞ্জেলিনা : কাছে-পিঠে বিয়ার খাওয়ার ভালো জায়গা সোশ্যাল ক্লাব।

জেরেমিস : যাবে আমার সঙ্গে? বিয়ার খেলে তোমার সৌন্দর্য আরো ঝকঝকে হয়ে যাবে।

অ্যাঞ্জেলিনা : ধন্যবাদ, আমি এখন বিয়ার খাব না।

[অ্যাঞ্জেলিনার মুখখানা একটু রাগী দেখাল। জেরেমিসের দুর্বল ইংলিশে মানেটা দাঁড়াল, চলো বিয়ার খাই। তোমায় সুন্দর দেখাবে।]

ইয়াকভ : জেরেমিস, তোমার আইসক্রিম। অ্যাঞ্জেলিনা, আশা করি তুমি এই কোকো আর বাদাম দেওয়াটা পছন্দ করবে।

অ্যাঞ্জেলিনা : আরে! আমি খাব না বললাম যে!

ইয়াকভ : পিস্নজ! আমার ভালো লাগবে!

অ্যাঞ্জেলিনা : দাম নিতে হবে কিন্তু ইয়াকভ। তোমরা আমাদের অতিথি।

সে চার ডলার রাখল টেবিলে। চামচে আইসক্রিম কাটছে। সবার কথা ছাপিয়ে উঠল লোরেনটিনার কণ্ঠ!

লোরেনটিনা : ওই দেখো! আরে! ওরা আমাদের দিকে ক্যামেরা তাক করছে কেন?

পাঁচ-ছয়টি টিভি ক্যামেরা ব্রেড গার্ডেন সীমানার বাইরে ভিড় করেছে। ছবি উঠছে। লোরেনটিনা ন্যাপকিন দিয়ে নিজের মুখখানা ঢেকে ফেলল। চেঁচিয়ে বলল, ‘কেন এভাবে ছবি তুলছে?’

অ্যাঞ্জেলিনা : তোমাদেরই ছবি তুলছে। রাইটারদের। + Add New Author

লোরেন : এভাবে অনুমতি না নিয়ে ছবি তোলার কোনো অধিকারই ওদের নেই। কী বলো তোমরা?

মোলি : এটা তো পাবলিক পেস্নস। ছবি তুললে অন্যায়টা কী? আমরা কতখানি গুরুত্বপূর্ণ ভাবো। পাপারাৎজির মতো ক্যামেরা আমাদের ধাওয়া করছে। সে-ও আমেরিকায়।

লোরেন : তোমার ভালো লাগতে পারে, আমার লাগছে না। অ্যাঞ্জেলিনা, তুমি কি আমার মুখের ঢাকনা সরাতে সাহায্য করবে? অ্যাঞ্জেলিনা ছুটে গেল ক্যামেরার সামনে। একটি মেয়ে তার সঙ্গে এসে বোঝাবার চেষ্টা করল, ‘আমরা খুবই উৎসাহিত বোধ করছি তোমাদের আগমনে। রাইটারদের এই ফল রেসিডেনসির জন্য সারাবছর অপেক্ষায় থাকি আমরা। এটা একটা বড় খবর যে, তোমরা এসে গেছো। আইওয়ায় স্বাগত।

লোরেনটিনা : ধন্যবাদ। কিন্তু আমরা এখন ক্যামেরার সামনে আসতে প্রস্ত্তত কি না, সেটুকু জিজ্ঞেস করার ভদ্রতা তোমাদের কাছে আশা করতে পারি তো!

মেয়েটি : নিশ্চয়ই। আমরা খুবই দুঃখিত। তবে তোমাদের খবর যত বেশি লোকের কাছে পৌঁছায় ততই তো ভালো। ইয়াপের সঙ্গে সঙ্গে তোমাদেরও প্রচার ও প্রসার হবে।

লোরেন : আশ্চর্য! তুমি কি এখন আমাদের শেখাবে, টিভিতে মুখ দেখানোর উপকারিতা কী!

অ্যাঞ্জেলিনা : ওদের হয়ে আমি ক্ষমা চাইছি লোরেনটিনা। তুমি শান্ত হও। ওরা আর ছবি নেবে না।

লোরেন : কী ভাবে কী আমাদের? আমরা কি টিভিতে যাই না? প্রায় প্রতি সপ্তাহে আমি টিভিতে বিভিন্ন বিষয়ে বক্তব্য রাখি।

কাম্বা : আমাকেও রাখতে হয়। সুবক্তা এবং সমাজবিশেস্নষক হিসেবে আমার খুবই খ্যাতি আছে।

আদনাশে : আমার অভিজ্ঞতাও কম নেই। এখানে আসার আগেই আমি একটি অর্থনৈতিক দুর্নীতি নিয়ে আলোচনা করে এসেছি।

মেইমি : আমাকেও নিয়মিত যেতে হয়, কারণ আমি একটা অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করি।

আলেক্স : কী অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করো?

মেইমি : রাজনৈতিক অবশ্য। আসলে ওটা আমার চাকরি।

অমলিনীর খারাপ লাগছে। কী হতো ছবি নিলে? তারা তো ব্যক্তিগত কিছু করছে না! তাছাড়া, এই যে আত্মপ্রচার, এই যে নিহিত প্রতিযোগিতা, এসব করে কী লাভ! মানুষের চরিত্র সব দেশেই একরকম!

সকালের মতো জমজমাট আড্ডা আর হলো না। কয়েকজন সোশ্যাল ক্লাবে মদ খেতে যাবে ঠিক করল। ইয়েরমেন জিনেটের গলা জড়িয়ে ধরল। জেরেমিস অ্যাঞ্জেলিনাকে জড়িয়ে গালে চুমু খেল। তারপর ওকিওকির কোমর জড়িয়ে চলতে লাগল। তারা যখন ব্রেড গার্ডেন থেকে বেরোচ্ছে, দেখল, কাজাখস্তানের সের্গেই ইরোনভস্কি ও ভেনিজুয়েলার ভেরোনিকা হাত ধরাধরি করে আসছে।

এখন কাম্বার সঙ্গে তার পাতানো গিন্নি রুথ নেই। সে অমলিনীকে চুপিচুপি বলল, ‘ওরা ডেটিং করছে।’

মোলি : কারা?

কাম্বা : সের্গেই আর ভেরোনিকা। তুমি জানো না?

মোলি : এখনই? মানে মাত্র তো চবিবশ ঘণ্টা হলো।

কাম্বা : নিউইয়র্ক জেএফকে থেকে আইওয়া পর্যন্ত একই ফ্লাইট ছিল দুজনের। প্রথম দর্শনেই প্রেম। সবাই জানে ওরা কাল রাতে একসঙ্গে ছিল। তুমি জানো না?

মোলি : কাম্বা, আমার কাছে সবসময়ই সব খবর সবার শেষে পৌঁছোয়।

কাম্বা : কারণ তুমি ভাবের ঘোরে থাকো।

মোলি : কী করে বুঝলে?

কাম্বা : দেখলেই বোঝা যায়। চোখদুটো খুব উজ্জ্বল কিন্তু তোমার মধ্যে সবসময় একটা অন্যমনস্কতা আছে। আমি তোমাকে বলছি আরো একটা সহবাস ঘটতে চলেছে।

মোলি : তোমার ও রুথের?

কাম্বা : পাগল নাকি? ওসব স্রেফ মজা। আমি ধর্মপ্রাণ ও রক্ষণশীল মুসলিম পরিবারের ছেলে। আমি বলছি না, এই বত্রিশ বছর বয়সেও যৌনসংসর্গ করিনি। করেছি। কিন্তু তাকে আমি ভালোবাসতাম। বিয়ে করব ঠিক করেছিলাম। ভারতীয় মেয়ে। নাইজেরিয়ার ভারতীয় দূতাবাসে চাকরি করতে এসেছিল। আমরা পরস্পরকে গভীরভাবে ভালোবেসেছিলাম। ওকে ওর বাড়ি থেকে বিয়ের জন্য চাপ দিচ্ছিল। আর আমি তখন সবে সংবাদপত্রে চাকরি পেয়েছি। সামান্য মাইনে। সে আমার চেয়ে ছ-বছরের বড় ছিল। বলল, আমি যথেষ্ট বেতন পাই। দুজনের মিলিয়ে চলে যাবে। অনেক ভাবলাম। মনে হলো, দুজনের রোজগার কাছাকাছি হওয়া দরকার। না হলে এ নিয়ে সমস্যা হবে। নাইজেরিয়া উন্নয়নশীল দেশ। কিন্তু অর্থনৈতিক বৃদ্ধির ফলাফল একটা শ্রেণির মধ্যে সীমাবদ্ধ। দীর্ঘকাল সাংবাদিকতার সূত্রে গরিব দেখতে দেখতে আমি ক্লান্ত। অন্তত নিজের পরিবারে দারিদ্র্য ঢুকতে দিতে আমি চাইনি।

মোলি : ভারতীয় দূতাবাসে কাজ করত, রোজগার তো ভালো হওয়ার কথা। দারিদ্রে্যর কথা বলছ কেন?

কাম্বা : ঠিক দারিদ্র্য হয়তো নয়। বলতে পারো উপার্জনগত অসাম্য। স্বামী-স্ত্রীর রোজগারে ভারসাম্য না থাকলে সংসারে অশান্তি অনিবার্য।

মোলি : সে বিয়ে করে নিল?

কাম্বা : কী করবে বলো? আমার কোনো অভিযোগ নেই। তুমি তো ভারতীয়, তোমাকে দেখি আর তাকে মনে পড়ে যায়। ছাড়ো এসব। তোমাকে আরো একটা সহবাসের কথা বলছিলাম। ওই দেখো, উলটো ফুটে, সোশ্যাল ক্লাবে ঢুকছে, জিনেট ও ইয়েরমেন।

মোলি : আমার তো বেশ উত্তেজিত লাগছে! বাসরে! এত তাড়াতাড়ি এত কাছে আসা যায়!

কাম্বা : এটাকে তুমি কাছে আসা বলো! ইউরোপীয় বা আমেরিকানরা যৌন তাড়নার নির্বাপণ জানে না এশিয়ান বা আফ্রিকানদের মতো। ওরা শুধু যৌনসঙ্গী খুঁজছে মোলি। এই তিন মাস ফাঁকা থাকবে! চলো, মজা মারো। ওই ইয়েরমেন তো এক মাস পরই চলে যাবে। ঘরে বউ আছে। ছ-মাসের মেয়ে আছে। পুরো তিন মাস থাকতে পারবে না। জিনেটেরও স্বামী-সমত্মান আছে!

মোলি : তবু, হয়তো ওরা সত্যি ভালোবাসছে কাম্বা। হয়তো ওদের প্রেম প্রয়োজন। পরিবার আর প্রেম একই ছন্দে না-ও চলতে পারে।

কাম্বা : তোমার কি কাউকে ভালো লাগছে?

মোলি : সবাইকেই লাগছে। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, আমি প্রেম বা সহবাসের কথা ভাবছি। আবার আমি এমন রক্ষণশীলও নই যে, যদি কোনো আকর্ষণ বোধ করি, তাকে অস্বীকার করব। আমার কাছে ভালোবাসা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিন মাস এত অল্প সময়, সত্যিই কাউকে প্রণয়ে চাই কি না বুঝতে বুঝতেই কেটে যাবে। আসলে আমি বলতে চাইছি পরিবার প্রতিপালন ও ব্যক্তিগত প্রণয় অনেক সময় একবিন্দুতে মেলে না। আর প্রেম খুব সুন্দর। সামান্য সময়ের জন্য হলে কি তার সৌন্দর্য কমে যায়?

তারা ইমু পৌঁছল। কাম্বার ঘরখানি অমলিনীর পাশেই। ঘরে প্রবেশ করার আগে কাম্বা ঘালোন্দা বলে উঠল, ‘Let me not to the marriage of true minds/ Admit impediments. Love is not love/ Which alters when it alteration finds/ Or bends with the remover to remove/ O, no! it is an ever fixed mark…’

অমলিনী বলল, ওটা শেক্সপিয়রের ধারণা ছিল। প্রেমের নড়ন-চড়ন নেই। সেটা ভাবতে ভালো লাগে। সেরকম প্রেম পৃথিবীতে নেই এমনও বলব না। কিন্তু যা চিরস্থায়ী নয় তাই মিথ্যা – এমন সহজ উপসংহারে যেতে আমি রাজি নই। কত লোক প্রেম কী তা না জেনেই মরে যায় বলো তো। তার পরিবর্তে, তারা যদি সাময়িক স্বাদটুকুও পেত, কত আনন্দের হতো। আমার তো মনে হয় প্রেমের জন্য মানুষ কবরের তলা থেকে উঠে আসতে পারে। ম্যয় জন্নতসে ভি ওয়াপস আনা চাহুঙ্গা আগর তুম কহো কি মুঝে প্রেম দোগি, জাহান্নুমমে যা কর। I will return from the heaven if you say you love me in the hell.

কাম্বা হাসল। কালো কুচকুচে নির্মেদ ছেলেটির মাথায় কোঁকড়ানো কুচিকুচি চুল! চোখদুটো বড় ও টানাটানা। দাঁত উঁচু আর আফ্রিকীয় আদলের পুরু ঠোঁট! সে দু-হাত বাড়িয়ে দিলো মোলির দিকে। চুম্বন-আলিঙ্গন তাদের সংস্কৃতি নয়। কিন্তু আমেরিকায় সবারই খানিক শিথিল মন, খানিক উদার নিবিড়তা। অনভ্যস্ত ভঙ্গিতে আলতো আলিঙ্গন করল তারা। চুমু খেল না। যে যার ঘরে চলে এলো।

হাতের জিনিসপত্র গুছিয়ে নিল অমলিনী। চায়ের জল চাপাল। অতিথির চেয়ারে বসে আমি তাকে দেখতে লাগলাম। সে যদি জানে, প্রেমের কী তীব্র আকাঙক্ষায় আমি কবরের অতল থেকে উঠে এসেছি, সে কি ভয় পাবে? সে কি ভালোবাসবে। আমার পা-ুলিপি কোথায় কেমন করে শেষ করব আমি! কী হবে আমার পুনরাবির্ভাবের অক্ষয় প্রাপ্তি!

অমলিনী দরজা খুলেই লালচে কাগজের গুচ্ছ কুড়িয়ে নিয়েছিল। দরজার তলা দিয়ে গলিয়ে দিয়েছেন সারা। পুরো নয়দিনের অনুষ্ঠানসূচি। তার মনে পড়ল স্বাগতপত্রটির কথা, যাতে এক চৈনিক কবির কবিতা আছে, যা কি না মেক্সিকান নাট্যকার আলেক্স জারভিরোভার পছন্দ হয়নি। সে চায়ের সঙ্গে কাগজের গুচ্ছ নিয়ে বসল। আমি তার গা ঘেঁষে দাঁড়ালাম। কোলে বসলেও সে বুঝতে পারবে না। কারণ আমার অসিত্মত্ব থেকেও নেই। আমি নিরাকার চিমত্মা। আবার চিমত্মার অবয়ব। আমি অতীতের শরীরীসত্তা পাব বটে। চাইলেই। কিন্তু সূক্ষ্ম থেকে স্থূলত্বে পৌঁছনো, সত্তাহীনতা থেকে সত্তায় যাত্রা হলো কালের বিপরীত পরিক্রমণ, তাকে আমারই মধ্যে রাখতে হবে। গল্পের ভূতের মতো ভূত নই আমি! এই আছি এই নেই! আমি তিন মাস আছি! আমার অসমাপ্ত পা-ুলিপি, আমার অ্যামেলিয়া আছে! দেহহীন এ-মুহূর্তে আমি, কিন্তু লজ্জা করল খুব। আমি পুরুষ। আমি প্রেমিক। আমারই তো তাকে কোলে তুলে নেওয়ার কথা। তার সঙ্গে সঙ্গে আমিও কাগজগুলো পড়তে লাগলাম। কবিতার শিরোনাম The Art of Poetry. কবি বেই দাও, চায়না, আই ডবিস্নউ পি ১৯৮৮।

In the great house where I live now only a few

tables stand.

A boundless marsh lies all around.

 

The moon gleams down from various angles

Dream-frail, a rickety skeleton still waits in                                                                              the distance.

Like an undismantled scaffold.

 

Not to mention the muddy tracks across this

page of a well-fed fox

Who brandishes his flaming brush to flatter or to

injure me.

 

Not to mention you, of course, sitting across from me.

Flashing in your hand, a bolt of lighting out of the blue

turns to kindling, then to ash.

 

কবিতাটি পড়ে কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইল অমলিনী। ভাবছে, ভালো বলবে, নাকি মন্দ বলবে। ভারি নিষ্প্রাণ কবিতা। হয়তো দোষটা অনুবাদকের। ভাষান্তরণের মাধ্যমে কাব্যসাহিত্য নতুন করে জন্ম নেয়। এই কবিতায় যেন সেই নতুন প্রাণের পরশ নেই। সে পত্রটি পড়তে শুরু করল। তার খারাপ লাগছিল যে, এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ ও সুন্দর অভ্যর্থনা তার চোখ এড়িয়ে গেছে।

 

The University of Iowa              International Writing

Programme

Shambaugh House

Iowa City. Iowa

 

প্রিয় অমলিনী

প্রতিবছর, আইওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের এই আন্তর্জাতিক লিখন কর্মশালায় বিশ্বের নানা দেশের কবি-সাহিত্যিক উপস্থিত থেকে আমাদের ধন্য করেন। এবার ভারতীয় লেখক হিসেবে তোমার আগমন আমাদের আনন্দাপস্নুত করছে। তোমাকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানাই। তোমার প্রতিভাদীপ্ত লেখনী, চিমত্মা, তোমার নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের সমৃদ্ধ করবে এবং ভারত-আমেরিকার ঐতিহ্যপূর্ণ সাংস্কৃতিক আদান-প্রদানের ক্ষেত্রে ইতিবাচক অবদান সৃষ্টি করবে।

তোমার সঙ্গে দেখা হওয়ার অপেক্ষায় রইলাম।

শ্রদ্ধাসহকারে

 

মেডেসা মার্টিন

প্রোগ্রাম কো-অর্ডিনেটর

 

চিঠির কোথাও কোনো তারিখ নেই। সে ভাবতে লাগল, সুন্দর এই অভ্যর্থনা। সুন্দর এই চিঠি। একই বয়ান কি সবাইকে লেখা হয়েছে? একই কবিতা কি সবাইকে পাঠানো হয়েছে? এখানে আসার আগে পুরো আড়াই মাস ধরে মেডেসা মার্টিনের সঙ্গে ক্রমাগত পত্রালাপ, মত ও তথ্য বিনিময় চলেছে। কখনো কখনো মার্ক জুমেরের সঙ্গেও। মেডেসা, মার্কের সঙ্গে একরকম বন্ধুত্ব বোধ করতে শুরু করেছিল অমলিনী। মার্কের দেখা এখনো পায়নি। মেডেসাকে দেখে তার মনে হলো, অত্যন্ত নম্র-ভদ্র, মধুরভাষিণী এই নারী কারো বন্ধু হবে না। হওয়া সম্ভব নয়। তার পক্ষ থেকে সে আর মেডেসা পত্রবিনিময় করত। মেডেসার পক্ষ থেকে মেডেসা এবং আরো চৌত্রিশজন রাইটার। তৎসমেত পঞ্চাশ বছর হওয়ার জন্য প্রাক্তনদের মধ্যে থেকে আরো দশজন। অমলিনীর ধারণার বাইরেও আরো কত! সবার প্রতি সে সমান নম্র, সমান উষ্ণ। এই সমতা রক্ষা তার পেশার অন্তর্ভুক্ত। তার আঁটোসাঁটো বাঁধন কাটিয়ে বন্ধুত্ব সহজ নয়।

প্রত্যেকের তথ্য সংগ্রহ, আসা-যাওয়া, থাকা-খাওয়া, অনুষ্ঠানের আয়োজন, ভ্রমণের কর্মসূচি ব্যবস্থাপনা – কী বিশাল এই যজ্ঞ! প্রতিবছর! শুধু সাহিত্যের জন্য। শুধু কি পরিশ্রম, কী বিপুল ব্যয়ভার। সরকার বহন না করলে কতদিন চলবে। ব্যক্তিগত বা প্রতিষ্ঠানগত বা বাণিজ্যিক সংস্থার অনুদাননির্ভর হলে ইয়াপ তার বৈশিষ্ট্য ও স্বাধীনতা বজায় রাখতে পারবে কি? সারা পৃথিবীতে সতেরোটি শহর ইউনেস্কোর কাছ থেকে ‘সিটি অব লিটারেচার’ আখ্যা পেয়েছে। তার মধ্যে আইওয়া সিটি অন্যতম। এত প্রলম্বিত সাহিত্য কর্মশালা আর কোথাও হয় না।

সে অন্যমনস্কভাবে রঙিন কাগজগুলো দেখতে লাগল। সাধারণ পাতায় ছাপা কর্মসূচি, নেহাতই কেজো ব্যাপার, তবু তারও শুরুতে কয়েকটি কবিতার পঙ্ক্তি। কবি এমিলি ডিকিনসন। ইয়াপ যেন আইওয়ার আলো-বাতাসে, ঘাসে ঘাসে কাব্যের অনন্য সুবাস ছড়িয়ে দিতে চায়।

 

It sounded as if the streets were running –

And then – the strict stood still –

Eclipse was all we could see at the window

And Awe – was all we could feel. r [চলবে]

Leave a Reply

%d bloggers like this: