অ্যামেলিয়া

লেখক: তিলোত্তমা মজুমদার

\ ৮ \

সূর্য এখন সম্পূর্ণ রাহুগ্রস্ত। সঘন বরষায় জলভারনত মেঘ আকাশ ঢেকে ফেললে যেমন অকাল-আঁধার ঘনিয়ে আসে, তেমনি দশা। পাখিরা এখনো সভয়ে কিচিরমিচির করছে। গাছগুলোকে ধূসর লাগছে। সবুজ ঘাসের ওপর যেন ধুলোর আস্তরণ। সূর্যালোক না থাকলে পৃথিবীটা শুধুই ধূসর। একঘেয়ে। মৃতের জগতে সুদীর্ঘকাল আলো নেই, রোশনাই নেই, সুন্দর নেই, ভালোবাসা নেই। কালের পরিমাপবিহীন আত্মার অস্তিত্বের ভবিষ্যৎ মৃতেরাও জানে না। সে কি আলো, না সে অন্ধকার? জীবিত যেমন মৃতের জগৎ সম্পর্কে অজ্ঞ, মৃতও মৃত্যু-উত্তর জগতের পরিণাম জানে না। কারণ সেখানেও এক ভবিষ্যৎ খেলা করে। আর ভবিষ্যৎ কেবলই সম্মুখগামী। সেই অজানিত ভবিতব্য আমাকে কৌতূহলী করে, ভীত করে না। জীবিতাবস্থায় যখন কর্কট রোগাক্রান্ত ছিলাম, তখনো মৃত্যুর ভয় জয় করেছিলাম। শুধু কষ্ট ছিল। শরীরের কষ্ট। এ পৃথিবী হারাবার কষ্ট। বড় মায়া, বড় টান। আত্মাকে প্রেত বলে জীবিত মানুষ। ভূত। ভৌতিক। ভয় পায়। কষ্ট বোঝে না।

আমার ভাবনা স্থগিত রেখে অমলিনীর সঙ্গে সঙ্গে আকাশের দিকে তাকালাম। অমলিনীর ভাবনায় সূর্যগ্রহণ নিয়ে রাহুকল্পনা আছে। ধড়হীন অসুর রাহু সূর্য গ্রাস করলে তা আবার ছিন্নকণ্ঠ মাধ্যমে বেরিয়ে আসে! কী অদ্ভুত ভাবনা। এখানে ধড়-মু- আলাদা হয়ে যাওয়া প্রাণীও নিরবধিকাল জীবিত রয়ে যায়। এজন্যই পুরাণ এত সুন্দর এবং অফুরন্ত! সেখানে অমরত্ব পাওয়া যায়।

আমার অ্যামেলিয়া এসবে বিশ্বাস করতেন কি? তিনি তো ছিলেন নভোচারী! বিমান উড়িয়ে নিয়ে চলাও তো আকাশবিহার! আমি আমার এই তিন মাস পুনরুজ্জীবনের প্রধান প্রাপ্তি অমলিনীর কাছে দাঁড়ালাম।

এই সেই অপরূপ মুহূর্ত যখন সূর্য একটি উজ্জ্বলতম হিরের আংটি! হে সূর্য তোমার অঙ্গুরীর অপার্থিব প্রেমের সীমানা, আমিও পৃথিবী থেকে চলে যাব অন্য কোনো দূরে, হে সূর্য আমাকে একবার একটি আংটি দিয়ে যাও, আমার প্রেমিকা আঙুলে পরুক তাকে।

প্রেম বড় সুন্দর। আমি বুঁদ হয়ে আছি। আমার প্রিয় আববাজান, যেদিন প্রথম মদ তুলে দিয়েছিল হাতে, অপূর্বসুন্দর বেলজিয়ান কাচের ওপর রুপোর কারুকাজ করা পানপাত্রখানি, তাতে গাঢ় লাল মদ, চেরির স্বাদ ও গন্ধ, আর কিছু মনে নেই, শুধু মনে পড়ে সেই অপূর্ব পুলক, নিজেরই আনন্দে নিজের অবগাহন। প্রেম কি সেই আপন আনন্দের ব্যাখ্যাতীত নিমজ্জন নয়?

ওই যে সের্গেই, ভেরোনিকার কাঁধ জড়িয়ে দেখছে মহাবিশ্বের উজ্জ্বলতম আংটি, তার মুখে প্রেমের পুলক, মনে মনে সে-ও কি চাইছে না ওই আংটি সে পরাবে প্রেয়সীকে?

ওই হৃদয়াহত, আপমানদীর্ণ জিনেটের হাত ধরে তাকে ফিরিয়ে নিয়ে আসছে ইয়েরমেন, তাদের পাশে পাশে বন্ধু অ্যালেক্স, সে-ও কি ভালোবাসার আলোয় মন মোহিত করা দৃশ্যাবলি নয়!

ভালোবাসা ভালোবাসা, আলো আলো, প্রেম প্রেম।

আমি অমলিনীকে দেখছি। সে জেরেমিসের দিকে যাচ্ছে। শাম্বাগ হাউসের বাইরে, সিঁড়ি দিয়ে নেমে, ঘাসের গালিচা পাতা খোলা উদ্যান, সেখানে পার্ক এডওয়ার্ডকে ঘিরে ভিড়। পার্ক এডওয়ার্ড ইয়াপের অধিকর্তা, ভদ্র, বিনয়ী, সুহাস, সুদর্শন, ত্রিশটি দেশ ভ্রমণ করেছেন ইয়াপের জন্য সংযোগ বাড়াতে, তিনি ক্ষমতাধর, হয়তো বেশ কিছু আন্তর্জাতিক সাহিত্য পুরস্কারের নির্বাচক সদস্য, হয়তো আমেরিকা সরকারের গূঢ়, গোপন, গুরুত্বপূর্ণ কোনো দায়িত্বভার তাঁর ওপর, যা আপাতচক্ষে ইয়াপের প্রতি কর্তব্য, প্রকৃত প্রস্তাবে তা রাজনৈতিক, সেই পার্ক এডওয়ার্ড, তাঁকে ঘিরে ভিড়, সেই ভিড়ে ইয়াকভ, লোরেনটিনা, রুথ, রোজানা, ইয়াসমিন, জিয়াং, লিলি হেববার।

সেই ভিড়ের বাইরে জেরেমিস বসে আছে ঘাসে। অমলিনী তার কাছে গেল। বসল পাশে।

জেরেমিস : সূর্য বেরোচ্ছে তাহলে।

অমলিনী : সে তো বেরোবেই।

জেরেমিস : রাত হলে আমার মাঝে মাঝে মনে হয় আর যদি সূর্য না ওঠে!

অমলিনী : রাত্রি ভয় পাও তুমি?

জেরেমিস : তারায় ভরা আকাশ দেখতে আমি ভালোবাসি। মহাকাশ কী সুন্দর না? আমি ছোটদের জন্য তিনটি বই লিখেছি সব ওই মহাকাশ নিয়ে। ধরো, যদি এমন হয়, মানুষের মতো সূর্যেরও একদিন নিরুদ্দেশ হয়ে যেতে ইচ্ছে করল, তখন আকাশের ওই অত তারার মাঝে আমরা কী করে সূর্যকে চিনে নেব?

মোলি : দুটো উপায় আছে জেরেমিস। এক হলো অপেক্ষায় থাকা, কবে সে ফিরে আসে। আর এক বিশ্বাস করা, যে প্রিয়, যাকে ভালোবাসি, তাকে ঠিক চিনে নিতে পারব একদিন।

জেরেমিস : ভেরি ওয়াইজ মোলি।

মোলি : ধন্যবাদ জেরেমিস। অপেক্ষা আর বিশ্বাস – এই তো মানুষের প্রধান অবলম্বন, বলো।

জেরেমিস : তুমি ঈশ্বরে বিশ্বাস করো?

মোলি : করি।

জেরেমিস : আমিও করি।

মোলি : এখানে একলা বসে আছো কেন?

জেরেমিস : সবসময় ভিড় ভালো লাগে না যে। কতক্ষণ আর রঙিন চশমা পরে সূর্য দেখা যায়! দেখতে হবেই বা কেন! যেন ওরা সূর্যগ্রহণ দেখতে বলছে, আমাদেরও প্রমাণ করতে হবে আমরা কতখানি উৎসাহী। বাধ্যতামূলক ভদ্রতা। বাধ্যতামূলক আনন্দ। সূর্যগ্রহণ দেখতে বেশ লাগে। কিন্তু এমন হল্লোড় করার কী আছে? এই প্রথম সূর্যগ্রহণ দেখছে না তো কেউ!

মোলি : ওরা তো আশা করতেই পারে, আমরা খুশি থাকব, আনন্দিত থাকব। খরচ করে এনেছে। এত আয়োজন করেছে।

জেরেমিস : আমাকে আসা-যাওয়ার খরচ দিচ্ছে আমার দেশের সংস্কৃতি মন্ত্রক। ওরা অবশ্য ত্রিশ ডলার করে দিচ্ছে। তোমার খরচ কি আমেরিকা দিচ্ছে?

মোলি : হ্যাঁ অবশ্যই।

জেরেমিস : ওরা যে ফোল্ডারটা দিয়েছে, সেটা উলটেপালটে দেখছিলাম। অনেক তথ্য আছে। দেখলাম, আমেরিকার পূর্ণ খরচে এগারোজন, নামগুলো মনে নেই। আমার মতোই বেশি। এছাড়া নিজের দেশের কোনো বৃত্তি পেয়ে কেউ এসেছে। বা অনুদান। যেমন জিয়াংয়ের ব্যয় বহন করছে একটি চাইনিজ পরিবার।

মোলি : আমার ধারণা ছিল সবাইকেই আমেরিকা সরকার নিয়ে আসে। তোমার এই ভাবনাটা খুব সুন্দর। এ নিয়ে লিখেছ?

জেরেমিস : কোনটা?

মোলি : সূর্য যদি হারিয়ে যায়।

জেরেমিস : ভালো লেগেছে? তুমি লেখো।

মোলি : ধন্যবাদ। চেষ্টা করব। কিন্তু তুমি কেন লিখবে না?

জেরেমিস : কারণ, ওটা নিয়ে লেখা যায়, এটা তুমিই আগে ভেবেছ। আমার মাথায় এমন ভাবনা গিজগিজ করছে। আমি স্বপ্ন টুকে রাখি। সেসব যে কী অভিনব সব ভাবনা।

মোলি : তাই! তুমি স্বপ্ন লিখে রাখো? রোজ?

জেরেমিস : রোজ। অবশ্য মনে থাকলে। আমার মোটা মোটা ডায়েরি ভর্তি স্বপ্ন।

মোলি : কবিতার মতো শোনাল। ডায়েরি-ভর্তি স্বপ্ন।

জেরেমিস : হা হা! তোমার মন দেখছি খুবই সংবেদনশীল। সবকিছুতেই গল্প-কবিতা খুঁজে পাচ্ছ। তা, পার্কের সঙ্গে পরিচয় হলো?

মোলি : হ্যাঁ। সবার সঙ্গেই হলো।

জেরেমিস : চমৎকার মানুষ! সকালে কিছুক্ষণ কথা হলো। তিনি আমাদের লুবলিয়ানাতেও গিয়েছেন। তখন অবশ্য আমি চিনতাম না। আর মার্ক? পার্ক আর মার্ক। যেমন রামা-শ্যামা, তাই না?

মোলি : এখানে নামের খুব আকাল। এর মধ্যে আমি তিনজন ‘সারা’ পেয়েছি! মার্কের সঙ্গে আমার কয়েকবার চিঠিবিনিময় হয়েছিল। তিনি তো একজন কবি। আর দেখতেও খুব সুন্দর। ওঁকে দেখলে আমার ইতিহাস বইয়ের পাতায় দেখা সম্রাট আলেকজান্ডারকে মনে পড়ে।

জেরেমিস : আমি তো দেখছি এখানে হাঁসগুলোও কবিতা লেখে।

মোলি : আস্তে বলো!

জেরেমিস : এখানে কবিতার হাওয়া বয় মোলি।

মোলি : সে আমাদের পশ্চিম বাংলাতেও বয় জেরেমিস।

জেরেমিস : লুবলিয়ানাতেও বয়। আমাদের শহরও ইউনেস্কোর সিটি অব লিটারেচার পেয়েছে। কিন্তু তুমি যে বললে তুমি ইন্ডিয়ান।

মোলি : আমি এ-ও বলেছি যে আমি বাংলায় লিখি। পশ্চিমবঙ্গ ভারতের একটা প্রদেশ।

জেরেমিস : আই সি!

মোলি : তোমার কিন্তু ‘ট’-এর দোষ নেই।

জেরেমিস : মানে?

মোলি : তুমি ও ইয়াকভ তো একই দেশে ছিলে। যদিও তোমাদের ভাষা আলাদা! তবু, ভাষার উৎস হয়তো একই। ইয়াকভ ‘ট’ বলতেই পারে না। ‘ত’ বলে।

জেরেমিস : কিন্তু ও আমার চেয়ে ইংলিশ বেশি জানে। ইংলিশ আমার কাছে সমস্যা। এভাবে কথা বলতে আমি মোটেই স্বচ্ছন্দ নই। ঠেকে-ঠেকে, থেমে-থেমে, বুঝছি ভুল বলছি, কিন্তু শুদ্ধভাবে বলতে পারছি না। লেখকরা ভাষা সম্পর্কে স্পর্শকাতর হয়। তুমি ইংলিশে স্বচ্ছন্দ। তোমার সেই সমস্যা নেই।

মোলি : আছে। তবে কম। কারণ আমি ইংলিশ পড়াই। কিন্তু ইংলিশে রোজকার কথা বলার প্রয়োজন পড়ে না। এমনকি ছাত্রছাত্রীদেরও আমরা বাংলাতেই ইংলিশ পড়াই।

জেরেমিস : হা হা হা। এটা ভালো বলেছ! আমি সেস্নাভেনিয়ান ছাড়া কিছুই জানি না। একটা ভাষা বোঝা আর জানার তফাৎ আছে। যেমন ম্যাসিডোনিয়ান বুঝি। বই পড়তে বা বলতে পারি। জানি না। ক্রোয়েশিয়ান, সার্বিয়ান, ইতালিয়ান, রোমানিয়ান বুঝি। এমনকি একটু-আধটু ফরাসি। আমাদের ভাষা হলো সেস্নাভিন। বিদেশিরা বলে সেস্নাভেনিয়ান। ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাগোষ্ঠীর বাল্টো-সস্নাভিক থেকে সস্নাভিক, তারপর সাউথ সস্নাভিক, তারপর দক্ষিণ-পশ্চিম, কয়েকটি ধাপ পেরিয়ে সেস্নাভিন। আর দক্ষিণ-পূর্ব সস্নাভিক থেকে এসেছে ম্যাসিডোনিয়ান। ফলে কথায় মিল থাকলেও উচ্চারণ ও বর্ণমালায় প্রচুর তফাৎ। ওদের হলো সিরিলিক বর্ণ, আমাদের ল্যাটিন। চলো, লোকজন ভেতরে যাচ্ছে। এখন কী হবে বলো তো?

মোলি : তানিয়া নারভিরোভার ভাষণ! মেডেসা আমাদের অনুষ্ঠানসূচি বিষয়ে কথা বলবেন। তারপর একজন আইনজীবী আসবেন।

জেরেমিস : লয়ার? লয়ারের সঙ্গে লেখকের কী? আমরা লিখতে এসেছি, না ডাকাতি করতে?

মোলি : আমরা তো বহিরাগত। অতিথি। একটু-আধটু আইন জেনে রাখা ভালো। চলো, ফল খাবে?

জেরেমিস : ফল? তোমার ফল ভালো লাগে?

মোলি : খুব! কী সুন্দর রংবেরঙের ফল রেখেছে! চলো খাই।

জেরেমিস : চলো। ফল খুব স্বাস্থ্যকর! এখানে যেসব ফল দিয়েছে, এগুলো তোমার দেশে পাওয়া যায়?

মোলি : কয়েকটা। তরমুজ, আঙুর, পেঁপে আমরাও খুব খাই। কিন্তু সবুজ টুকরোগুলো কোন ফলের বুঝতে পারছি না?

জেরেমিস : আমিও পারছি না। খেতে ভালোই লাগছে।

মোলি : তুমি আর ইয়াকভ কি পূর্বপরিচিত?

জেরেমিস : না তো! এখানে আসার কয়েকদিন আগে ও আমাকে ফোন করেছিল। ইয়াকভের সাইটে সব তথ্য পাওয়া যায়। আমি তো সাইট দেখিইনি। তুমি সব দেখেশুনে এসেছ?

মোলি : নাহ্! সময় পাইনি।

জেরেমিস : আমারও সেই দশা।

তানিয়া ও মেডেসার কেজো লেকচার শুনতে শুনতে আমারও ঝিমুনি এসে গিয়েছিল। চেনা-পরিচিতিপর্ব শেষ করার জন্য এলো আইনজ্ঞ ডেরেক কেইনস্টার। ছোটখাটো অতি তরুণ লয়ারকে দেখে সবাই নড়েচড়ে বসল। সে প্রথমেই বলল, আইনের মূল শিক্ষা হলো আইন ভঙ্গ করা অপরাধ, করলে শাস্তি হয়। সেই শাস্তি জেল ও জরিমানা।

এতক্ষণ পর মজা করার মতো একখানা বিষয় পেয়ে রাইটারদের মগজ কিলবিলিয়ে উঠল।

রাইটার : কদ্দিনের জেল ও কত ডলার জরিমানা?

লয়ার : কী ধরনের অপরাধ, তার ওপর ভিত্তি করে।

রাইটার : কোন কোন অপরাধ আমরা করব না?

লয়ার : সেটা বলার জন্যই আমি এসেছি।

রাইটার : ধন্যবাদ। তুমি যেগুলো করতে নিষেধ করবে, তার বাইরে বাদবাকি অপরাধের স্বাধীনতা রইল।

লয়ার : না না। অপরাধ করার দরকার কী!

রাইটার : তাহলে কী করব? ওটাই তো করতে ইচ্ছে করে।

লয়ার : যাই করো না কেন, সবসময় মনে রাখবে, ধরা পড়লেই ইউ নিড এ লয়ার।

রাইটার : পাবে গিয়ে মদ খেলে?

লয়ার : মদ্যপান অপরাধ নয়। রাস্তায় মাতলামি করা দ-নীয়। ইন দ্যাট কেস ইউ নিড এ লয়ার।

রাইটার : পা টললে দোষ নেই তো?

লয়ার : পুলিশ ধরলে সাবধান। কোনো তর্কে যাবে না। কোনো কথা বলার আগে বলবে …

রাইটার্স : ইউ নিড এ লয়ার। [সমবেত]

লয়ার : নিশ্চয়ই। কারণ লোকে মাতাল হলে কী করে, কী বলে ঠিক থাকে না। তাই সাবধান হওয়া ভালো।

রাইটার : মানে আমি জাতে মাতাল তালে ঠিক।

লয়ার : তার মানে কী!

রাইটার : আমি মদ খেয়ে, মাতলামো করে ভুল বকছি; কিন্তু পুলিশ পাকড়ালেই আমার মাথা সজাগ হয়ে যাবে। আমি বলব, ওয়েট মি. পুলিশ! আই নিড এ লয়ার।

লয়ার : তাই তো দাঁড়াচ্ছে! তোমরা তো একজন লয়ারকেই ঘোল খাইয়ে দিচ্ছ!

রাইটার্স : হা হা হো হো হি হি! [সমবেত]

লয়ার : শোনো, আরো আছে। ট্রাফিক আইন ভেঙো না। অপেক্ষা করবে। রাস্তা পেরোবার সময় ‘একটা লোক হাঁটছে’ চিহ্ন দেখলে তবেই পার হবে। বাজারে গিয়ে কোনো জিনিস বিল না করে বাইরে বেরোবে না। কোনো ড্রাগ নেবে না। গাঁজা, চরস, হাশিস, হেরোইন – কিচ্ছু না!

রাইটার : এগুলো এখানে প্রচুর পাওয়া যায় বুঝি? যারা বেচে, পুলিশ তাদের ধরে না?

লয়ার : অবশ্যই ধরে। তবু ব্যবসাটা কেউ না কেউ চালিয়েই যায়।

রাইটার : কাফ সিরাপ চলবে?

লয়ার : কাফ সিরাপ?

রাইটার : ডেনড্রাইট চলবে? গাম? গস্নু?

লয়ার : এগুলো কি নেশার জিনিস? তাহলে আমাকে বই দেখতে হবে।

রাইটার : বইতে যদি উল্লেখ না থাকে?

লয়ার : এমন আর কোনো নেশা আছে, যার উল্লেখ বইতে না-ও পেতে পারি?

রাইটার : ভাত পচিয়ে হাঁড়িয়া। ধান পচিয়ে ধেনো।

লয়ার : যা খুশি খাও, বাইরে মাতলামি করো না। কাউকে বিরক্ত করো না।

রাইটার : আর একটা প্রশ্ন ডেরেক, টিকটিকির ল্যাজের বিষয়টা কী হবে?

লয়ার : তার মানে?

রাইটার : টিকটিকির ল্যাজ পুড়িয়ে খেলে দারুণ নেশা হয়। এটা নিষিদ্ধ নেশার আইনে পড়বে, নাকি বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইনে পড়বে?

লয়ার : তুমি নিশ্চয়ই মজা করছ।

রাইটার : একেবারেই না। একই প্রশ্ন সাপের কামড় নেবার ব্যাপারেও।

লয়ার : সাপ তুমি পুষতেই পারো। অনেকেই পোষে। কিন্তু সেসব নির্বিষ সাপ। বিষাক্ত সাপ বা বিছে, বা মাকড়সা সঙ্গে নিয়ে ঘোরা দ-নীয় অপরাধ। সেসব ক্ষেত্রেও …

রাইটার্স : ইউ নিড এ লয়ার। [সমবেত]

লয়ার : কারেক্ট! শেষ কথা। লাইসেন্স ছাড়া গাড়ি চালাবে না। আর কলগার্ল এড়িয়ে চলবে। এখানে প্রসটিটিউশন নিষিদ্ধ।

রাইটার : হোয়াট অ্যাবাউট এ কলবয়, আই মিন কলিং এ জিগোলো!

লয়ার : ইউ নিড এ লয়ার!

বিপুল হাস্য ও হাততালি ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে উঠল শাম্বাগ হাউস। ঘোষণা হলো, মাত্র এক ঘণ্টা সময়। ঠিক পাঁচটায় ইমুতে গাড়ি হাজির হবে। আজ ইয়াপের প্রথম দিনের উৎসব উদযাপন। সেখানে খাদ্য ও পানীয়ের আয়োজন। শহরের গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ এবং সাহিত্যপ্রেমী নাগরিক উপস্থিত থাকবেন। রীতি অনুযায়ী রাইটাররা দু-চার কথায় নিজেদের পরিচয় দেবে। স্থান : টেরি ট্রাবলউড রিক্রিয়েশন সেন্টার। ৫৭৯ ম্যাককোলিস্টার বুলেভার্দ।

 

চোখে কাজল, কপালে টিপ, নীল মুক্তোর গয়না আর ময়ূরকণ্ঠী নীল শাড়ি পরে ঠিক পাঁচটায় ইমুর দরজা ঠেলে বেরিয়ে এলো অমলিনী। এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল জগৎ! এই নারী এত সুন্দর! জিনস, শার্ট বা কুর্তি পরা একেবারে সাধারণ কালো রোগা চেহারার মেয়েটা যেন হঠাৎ কোনো স্বপ্নলোক থেকে নেমে এলো! একটা পোশাক কারো চেহারা এতো বদলে দিতে পারে!

পাঁচটি গাড়ি রওনা হয়ে গিয়েছে। শেষ গাড়িটি অপেক্ষা করছে। অ্যালেক্স, সমীর, সাইয়ুন, জর্জ আর অমলিনী। অ্যালেক্স, সাইয়ুন আর জর্জ অমলিনীর অনেকগুলো ছবি তুলল। সমীর লাজুক মুখে তার মেয়েলি ভঙ্গিতে বলল, ‘তোমাকে খুব সুন্দর দেখাচ্ছে, মোলি। আমি কি তোমার সঙ্গে ছবি তুলতে পারি?’

সমীর আর অমলিনীর সঙ্গে আমিও দাঁড়ালাম। কখনো কখনো ক্যামেরায় আত্মার অস্তিত্মত্ব ধরা পড়ে শুনেছি।

সমীরের দীর্ঘ ও বলিষ্ঠ শরীরের আড়াল নিলাম আমি। এই যুবককে দেখলে কিছুতে মনে হয় না, যৌন সংসর্গে সে নারীর ভূমিকা পালন করে। নাকি আমি ভুল ভাবছি। নারী-পুরুষ কিছু নয়, আসল হলো দুই যৌন সত্তা! সেখানে অনুভূতিই সব।

 

২৩ আগস্ট…     কবরের পাশে রেখেছিলে যে কয়টি ফুল

বৃহস্পতিবার     তার মধ্যে কিছু ভুল ছিল, ভুল

সুবিশাল অর্ধচন্দ্রাকৃতি ঝিল। তার আধা-গোল পারে ঘন বন। সেই বন আর ঝিলের মাঝে চলপথ। ডাঙার কিছু অংশ ঝিলের বুকে ঢুকে গিয়েছে। ছোট দ্বীপের মতো। পরিযায়ী পাখিরা তার দখল নিয়েছে। ডাঙার ভাগে যতদূর দৃষ্টি যায় চাষের ক্ষিত। ঝিলের কিনার ঘেঁষে টেরি ট্রাবলউড রিক্রিয়েশন সেন্টার। একটা শক্তপোক্ত উঁচু একমহলা বাড়ি, যার মধ্যে অনায়াসে হাজার লোকের বসার ব্যবস্থা করা। বাড়িটির সামনে সুবিসত্মৃত পার্কিং লট গাড়িতে ভরে গিয়েছে। ভেতরে বড় বড় গোল টেবিল ঘিরে দশ-বারোটি চেয়ার আমন্ত্রিত আইওয়াবাসীর দখলে। কথা আর হাসিতে গমগম করছে জায়গাটা। এতো লোকের মধ্যে রাইটাররা কে কোথায় বুঝতেই পারল না অমলিনী। যদিও ইয়াপের সদস্যরা তাদের চোখে চোখে রাখছিল। মেডেসা, সারা, সিন্থিয়া, অ্যাঞ্জেলিনা, মার্ক, পার্ক এবং আরো অনেকের মধ্যে ড্রাইভারদের সঙ্গেও তার দেখা হলো। একটা মণিপুরি পোশাকে সারাকে ছোট্ট মিষ্টি পুতুলের মতো লাগছে। সারা এবং জেনিফার জুং – দুজনেরই ষাটোর্ধ্ব বয়স, ত্বকে কুঞ্চন, চুলে কৃত্রিম কালো রং, কিন্তু দুজনের শরীরে কোথাও বাড়তি মেদ নেই বলে পরিপাটি বার্বি পুতুলের মতো লাগে। অমলিনী সারার সৌন্দর্যের তারিফ করে বলল, ‘এ তো ভারতীয় পোশাক সারা।’

সারা বলল, ‘আমার মেয়ে দিয়েছে। নিউজার্সিতে সে থাকে। তার অনেক ভারতীয় বন্ধু। আমার শাড়িও আছে। তিনখানা। তোমাকে কিন্তু অপরূপ সুন্দর লাগছে আজ। আচ্ছা শোনো, ওই যে বাইরে ডেক দেখছ, ওখানে যেতে পারো। তার বাইরে কোথাও যেও না। কিছুক্ষণের মধ্যেই পরিচয়পর্ব শুরু হবে।’

ডেকটা বেশ বড়। দিব্যি দুটো টেনিস কোর্ট ধরে যায়। জলাশয়ের আকৃতি অনুকরণে এ-ও অর্ধচন্দ্রাকার। বেশ কিছু অংশ জলের ওপর। নিচু রেলিংয়ে ঘেরা। ভারী কাচের দরজা ঠেলে সাইয়ুন আর অমলিনী সেখানে পৌঁছল। ধূমপায়ীর দল এরই মধ্যে সিগারেট টানছে। গলায় ক্যামেরা ঝুলিয়ে ইয়াসমিন হাসানকে দেখতে পেল সে। তার সঙ্গে শবনম, রোজানা, ইরাকের হারিক এল ওমের। রোজানার গায়ে পুরো হাতা ঝলমলে পোশাক। মাথায় সুন্দর হিজাব। শবনম ও হারিকের খোলা চুল, খোলা ও শরীর উদ্ভাসক সাজসজ্জা, শুধু ইয়াসমিনের গায়ে আধময়লা শার্ট ও জিনস। ঠোঁটে সিগারেট। শবনম ও হারিকের ঠোঁটেও। অতি তরুণ হারিক লম্বা-চওড়া, অত্যন্ত আকর্ষণীয়। তার খোলা কোঁকড়ানো স্প্রিংয়ের মতো চুলের গুচ্ছ সোনালি রং করা, কোমর ছাপিয়েছে। সে সাইয়ুনের দিকে তাকাল। লম্বা ঝুলের কালো পোশাকে সাইয়ুনও কম আকর্ষণীয় নয়। প্রত্যেকের সাজই দেখার মতো। সে আর সাইয়ুন ডেকের ধার বরাবর ঘুরতে লাগল।

সাইয়ুন : দেখো রুথকে।

মোলি : কোথায়?

সাইয়ুন : ওই তো! জেরেমিসের গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে। ইয়েরমেন আর জিনেটের ব্যাপারটা শুনেছ তো?

মোলি : কী ব্যাপার?

সাইয়ুন : সত্যি শোনোনি? গা ছুঁয়ে বলো, আমার কাছে শুনেছো এ-কথা কাউকে বলবে না!

মোলি : আমি এমনিতেও বলতাম না।

সাইয়ুন : আমি জানি। তোমার ওপর আমার খুব বিশ্বাস আছে। ইয়েরমেন আর জিনেট জুটি বেঁধেছে। একসঙ্গে থাকে। হি-হি-হি! ওদিকে সের্গেই আর ভেরোনিকা।

মোলি : তুমি বলতে চাইছ জেরেমিস আর রুথ এবার জুটি বাঁধবে?

সাইয়ুন : না। সে-কথাই তো বলছি। এখন গায়ে পা লাগিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, আর আজকেই রুথ সকালে আমাকে বলল জেরেমিস জিনেটকে পটাতে চেয়েছিল, পারেনি। জিনেট জেরেমিসের সঙ্গে কথাই বলছে না। আবার রুথকেও নাকি সারা রাস্তায় উত্ত্যক্ত করতে করতে এসেছে।

মোলি : সারা রাস্তা মানে?

সাইয়ুন : ওরা বোধহয় ফ্রাঙ্কফুর্ট থেকে আইওয়া একসঙ্গে এসেছে।

মোলি : কাম্বা ঘালোন্দাও ছিল।

সাইয়ুন : তা জানি না! তবে যে উত্ত্যক্ত করে তার গা ঘেঁষে দাঁড়ানো কীসের জন্য?

মোলি : তা, তোমাকে কেউ প্রেম নিবেদন করছে না। তুমি তো খুবই সুন্দরী।

সাইয়ুন : তুমি আর বলো না! তুমি যখন ইমু থেকে বেরোলে আমি চোখ ফেরাতে পারছিলাম না। অনেক ছবি নিয়েছি তোমার। তোমার মেল আইডি দেবে? পাঠিয়ে দেবো।

মোলি : অনেক ধন্যবাদ সাইয়ুন। তবে এই সৌন্দর্য শাড়ির গুণে। আমি কেমন দেখতে আমি জানি।

সাইয়ুন : কিছুই জানো না। আচ্ছা, কপালে ওটা কী? ধর্মীয় চিহ্ন?

মোলি : এটাকে বলে টিপ, বা বিন্দি। একসময় একটা ধর্মীয় সংযোগ ছিল বটে, এখন আর নেই। এখন সাজের অঙ্গ। আর শোনো, আমার ফোন কাজ করছে না। আপাতত মেল দেখতে পারছি না আমি। তবু তুমি আমার কার্ড রেখে দাও।

রাইটারদের ডাক পড়ল ভেতরে। আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শুরু হচ্ছে। রাইটারদের জন্য চেয়ার খালি পাওয়া গেল না। প্রায় ভূমিস্পর্শী জানালার সামনে চওড়া খাঁজগুলোয় তারা গায়ে গা ঘেঁষে বসে পড়ল যেন কতকালের বন্ধু সব। এর হাত ওর কাঁধে। ওর হাত এর পিঠে। এই মুহূর্তে আইওয়ায় রাইটাররা যেন একটি পরিবার। ছোট ছোট দল, উপদল, পছন্দের ঘনিষ্ঠতা হচ্ছে। তবু, এই সহস্র জনতার সামনে তারা এক অনুচ্চারিত পারিবারিকতায় আচ্ছন্ন।

মঞ্চ, ফুলের সজ্জা, পোডিয়াম ইত্যাকার আয়োজন কিছু নেই। সমাবেশটিকে ঘরোয়া ও আন্তরিক করার চেষ্টা। সামনে খোলা পরিসরে মাইক্রোফোন হাতে এসে দাঁড়াল পার্ক। সকলকে ধন্যবাদ জানিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে আইওয়ার পঞ্চাশতম আন্তর্জাতিক সাহিত্য কর্মশালার সূচনা করল। বিপুল করতালির মধ্যে সে আন্তরিক ধন্যবাদ জ্ঞাপন করল আইওয়াবাসীকে, যাদের সহায়তা ছাড়া এই আয়োজন সম্পন্ন করা যেত না। যথোপযুক্ত ধন্যবাদ লেখকদেরও জানাল সে। এরপর সসম্মানে নিয়ে আসা হলো নবতিপর শ্রীমতী হাউলিং এঙ্গেলকে। আজ থেকে পঞ্চাশ বছর আগে তিনি ও তাঁর স্বামী পল এঙ্গেল এই রাইটার্স ওয়ার্কশপের সূচনা করেছিলেন। জীবন্ত ইতিহাস হয়ে ক্ষীণ স্বরে দু-চারটি কথা বললেন তিনি। সমবেত করতালি ও অভিনন্দনের ভাষ্যে তাঁর কথা চাপা পড়ে গেল। তাতে কিছু না। আজ তিনি যে তৃপ্তি পেলেন তার কোনো তুলনা নেই। স্বপ্ন ও উদ্যোগ সফল হলে যে অপূর্ব পুলক, যে আবেগ ও আনন্দ, জীবিত অবস্থায় তার স্বাদ যে পেয়েছে, সে জানে। মেরি-অ্যান ক্যান্সার হাসপাতাল স্থাপন করে আমি তার সামান্যটুকু পেয়েছি।

লেখকদের পরিচয়ের পালা এলো। এবারে আর কেউ বেশি সময় নিল না। ফ্যাশন প্যারেডের মতো একজন গেল, আবার একজন এলো। তেত্রিশটি দেশের চৌত্রিশ জন রাইটার। জার্মানি, নিউজিল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, আলজেরিয়া, ইতালি, নাইজার, নাইজেরিয়া, উগান্ডা, দক্ষিণ আফ্রিকা, জিম্বাবুয়ে, হংকং, তাইওয়ান, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, ইন্দোনেশিয়া, মেক্সিকো, হাঙ্গেরি, আর্জেন্টিনা, গায়ানা, ম্যাসিডোনিয়া, সেস্নাভেনিয়া, ইরাক, প্যালেস্টাইন, ইসরায়েল, ইজিপ্ট, পাকিস্তান, ইন্ডিয়া, মায়ানমার, ব্রিটেন, স্পেন, ভেনিজুয়েলা, ফিলিপিন্স, কাজাখস্তান। লন্ডন প্রবাসী সিঙ্গাপুরের তরুণ সাহিত্যিক লাইলাক চু যখন হাতে মাইক্রোফোন পেল, কিছুই না বলে সে কেবল হাসতে লাগল, হাসতেই লাগল, মিনি স্কার্টের নিচে তার মসৃণ পা দুটি চকচক করছে, কাঁধ-খোলা, নাভিতে বেঁধানো অলংকার পরিদৃশ্যমান, ছোট কালো বস্নাউজের স্বচ্ছতার নিচে ফুটে ওঠা রক্তিম ব্রা তার যৌবনের ঔদ্ধত্য ঘোষণা করছে। সে হাসছে। জনতা হাততালি দিচ্ছে। কাকে দিচ্ছে, কাকে? একজন লেখককে? একটি যৌবনবতী শরীরকে নাকি এই আয়োজনকে?

লাইলাক চু-এর এখনো কোনো বই প্রকাশিত হয়নি। সে তার প্রথম উপন্যাস লিখছে।  r [চলবে]

Leave a Reply

%d bloggers like this: