আঁধার কেটে যাবে

লেখক: হরিশংকর জলদাস

এক
একাদশ শতাব্দী।
১০৭৫ খ্রিষ্টাব্দ।
রামাবতি।
পালরাজধানী।
দ্বিতীয় মহীপালের রাজপ্রাসাদ।
দ্বিতীয় মহীপাল পালরাজবংশের দ্বাদশ রাজা। পিতা তৃতীয় বিগ্রহপাল মারা গেলে তাঁর পুত্র মহীপাল রাজা হন। রাজা হয়ে নামের শ্রীবৃদ্ধি ঘটান। নাম ধারণ করেন দ্বিতীয় মহীপাল। প্রথম মহীপাল পালবংশের অত্যন্ত খ্যাতিমান রাজা ছিলেন। প্রথম মহীপালের সঙ্গে নিজের নাম যুক্ত করলে কী হবে, ব্যক্তি হিসেবে দ্বিতীয় মহীপাল ছিলেন অত্যাচারী, শোষক, কুচক্রী এবং সন্দেহপরায়ণ। কিছু অমাত্য পালরাজার কানভারি করার দায়িত্ব নিয়েছিল, স্বেচ্ছায়। তাদের যুক্তি ও মিথ্যা তথ্যে দ্বিতীয় মহীপালের সন্দেহবাতিক প্রবল হলো। দূরসম্পর্কের আত্মীয়ের চেয়ে নিকটাত্মীয়দের প্রতি তিনি ঘোরতর সন্দিগ্ধ হয়ে উঠলেন।
তৃতীয় বিগ্রহপালের তিন পুত্র – মহীপাল, শূরপাল এবং রামপাল। তিন ভাইয়ের মধ্যে মহীপাল সবচাইতে অযোগ্য। একই গৃহশিক্ষকের কাছে, একই সেনানায়কের কাছে তাঁদের পঠন-পাঠন এবং সামরিক প্রশিক্ষণ সমাপ্ত হলেও উপযুক্ততার নিরিখে রামপাল অনেকটা এগিয়ে
ছিলেন। সেটা সম্যক জানতেন মহীপাল। তিনি আরো জানতেন – শূরপাল রামপালের মতো বিচক্ষণ না হলেও একেবারে ফেলনা নন। অন্তত তাঁর চেয়েও যে শূরপাল দক্ষ, সেটা সম্যক জানতেন মহীপাল। তাই ওঁরা সহোদর হলেও রাষ্ট্রক্ষমতার প্রবল প্রতিপক্ষ হিসেবে তাঁদের মনে করতেন মহীপাল।
জ্যেষ্ঠপুত্র হিসেবে মহীপাল রাজসিংহাসনে আরোহণ করলেন বটে, ভেতর থেকে ভাইদের প্রতিপক্ষ ভাবার বোধটা গেল না তাঁর। বরং অমাত্য অজয়পালের কুমন্ত্রণায় হিংস্র হয়ে উঠলেন তিনি।
একদিন অজয়পাল চাপাস্বরে বলল, আজকে রাজসভায় আপনার ভাইদের বিরোধিতা খেয়াল করেছেন মহারাজ?
বিরোধিতা! কোন বিরোধিতার কথা বলছ তুমি? চমকে জিজ্ঞেস করলেন দ্বিতীয় মহীপাল।
অজয়পাল বিগলিত কণ্ঠে বলল, ওই যে, বুড়ো গুপ্তচরটিকে যখন আনা হলো রাজদরবারে।
তো – ! বললেন মহারাজ।
অজয় বলল, আপনি ওই বেটার মৃত্যুদ- দিলেন। বিরোধিতা করে বসলেন আপনার ভাই রামপাল। বললেন, বুড়ো মানুষটাকে হত্যা করে লাভ কী?
দ্বিতীয় মহীপাল বললেন, হ্যাঁ, সেরকমই তো বলেছিল রাম!
শুধু রামপাল তো নন, যুবরাজ শূরপালও রামপালকে সমর্থন করে বসলেন। অথচ দেখুন, গুপ্তচরকে মৃত্যুদ- দেওয়া রাজধর্ম। একজন গুপ্তচর একশ সেনার চেয়েও অধিক ক্ষমতাশালী এবং বিপজ্জনক।
রাজা বললেন, তাই তো!
অজয়পাল শকুনির কণ্ঠে বললেন, অথচ দেখুন, দুই সহোদরের চাপে আজ রাজদরবারেই রাজদ- অপমানিত হলো। মৃত্যুদ- দিতে পারলেন না আপনি, ওই গুপ্তচরটিকে। এই যে গুপ্তচরটিকে মুক্তি দিতে বাধ্য হলেন, আপনার ভাইদের কূটকচালেই তো!
কূটকচালে?
নয়তো কী? ওই দুইজন মিলে আপনাকে কৌশলে অপদস্থ করা শুরু করেছেন রাজদরবারে। একটু ভেবে দেখুন, ওঁদের নানা বাধার মধ্যে আপনি রাজকার্য যথাযথ পরিচালনা করতে পারছেন কিনা? আমি বলি – পারছেন না। বলে একটু থামল অজয়।
তারপর স্বগতকণ্ঠে আবার বলল, না জানি প্রাসাদ-অভ্যন্তরে কী ষড়যন্ত্র হচ্ছে! কখন শুনব, মহারাজকে বন্দি করে রাজক্ষমতা দখল করে নিয়েছেন দুই ভাই! শেষের কথাগুলো অত্যন্ত চাপাস্বরে বললেও মহারাজ শুনতে পেলেন। আন কথা শোনে যারা, তাদের কান অত্যন্ত পাতলা হয়।
অজয়ের কথায় দ্বিতীয় মহীপাল ভীষণ বিচলিত বোধ করতে লাগলেন। কিছুটা শান্ত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, এখন আমি কী করি অজয়, বলো।
অজয় বলল, আমি নিতান্ত একজন অমাত্যমাত্র মহারাজ। আমার কথা বলারও একটা সীমারেখা আছে। আমার দায়িত্ব ছিল আপনাকে সতর্ক করা। করলাম। এর পরের সিদ্ধান্ত আপনার।
মহারাজ বললেন, অকূলে ভাসিয়ে দিয়ে চুপ মেরে যাবে? কিছু তো একটা বলো।
অজয়পাল বলল, আজ রাতটা ভাবুন মহারাজ। ভূত-ভবিষ্যতের ব্যাপারটি মাথায় রাখবেন। আপনার স্থিতি, স্থায়িত্ব – এগুলোকে আমলে নেবেন। বলে একেবারে চুপ মেরে গেল অজয়পাল।
কিন্তু মহারাজ চুপ মেরে থাকলেন না। তাঁর ভেতরটায় ঘূর্ণি উঠল। সেই ঘূর্ণিতে চূর্ণ-বিচূর্ণ হতে হতে ওই রাতেই সিদ্ধান্ত নিলেন মহীপাল।
কী সিদ্ধান্ত?
সিদ্ধান্তের কথা ওই রাতে বা পরদিন সকাল পর্যন্ত কেউ জানলেন না। জানলেন – রাজদরবারে।
রাজসভা গমগম করছে। মহারাজকে ঘিরে যথানিয়মে মন্ত্রী, মহামন্ত্রী, সমরনায়ক, অমাত্য এবং অন্য গণ্যমান্যরা বসেছেন। রাজসিংহাসনের দুই পাশে দুই সহোদর – শূরপাল ও রামপাল। অদূরে পাশাপাশি বসেছেন সামন্তরা – অঙ্গদেশের মথনদেব, দ-ভুক্তির জয়সিংহ, ঢেক্করীর প্রতাপ সিংহ, বরেন্দ্রীর দিব্যোক এবং আরো অনেকে। সবার দৃষ্টি মহারাজের মুখের ওপর।
এমনিতেই দ্বিতীয় মহীপালের রূঢ়-রুক্ষ চেহারা। আজ রুক্ষতার সঙ্গে হিংস্রতা যুক্ত হয়েছে। সভাসদরা কীসের যেন আশঙ্কা করছেন। মহারাজার অবয়ব দুর্বিনীত বটে, আজ সেই দুর্বিনয়ের সঙ্গে কঠোরতাও লক্ষ করছেন অমাত্যরা।

মহারাজ সমরনায়ক দেবলপালকে উদ্দেশ করে একেবারেই বরফশীতল কণ্ঠে বললেন, বন্দি করো।
সমরনায়ক মহারাজার কথা বুঝতে পারল না। কাকে বন্দি করবে? কেন বন্দি করবে? কাঁচুমাচু ভঙ্গিতে উঠে দাঁড়িয়ে মহারাজার দিকে বিচলিত চোখে তাকিয়ে থাকল দেবলপাল।
মহারাজা গর্জে উঠলেন, বুঝতে পারছ না কাকে বন্দি করতে বলছি? শূরপাল এবং রামপালকে বন্দি করে এখনই কারাগারে নিক্ষেপ করো।
রাজার কথা শুনে একেবারেই নিস্তব্ধ হয়ে গেল গোটা রাজসভা। সে কয়েক মুহূর্তের জন্য। তারপর মৃদু গুঞ্জন। ওই সময় সকল গুঞ্জনকে ছাপিয়ে একজনের কণ্ঠস্বর স্পষ্ট শোনা গেল। সে কৈবর্তসামন্ত দিব্যোকের কণ্ঠস্বর।
দিব্যোকের কণ্ঠস্বরে বিস্ময় এবং প্রতিবাদ, এ কী বলছেন মহারাজ! ওঁরা তো আপনার সহোদর! ওঁদের অপরাধ কী!
মহারাজ হিতাহিত জ্ঞান হারালেন। বললেন, তোমাকে কৈফিয়ত দিতে হবে আমায়? তুমি একজন সামান্য সামন্ত, তাও কৈবর্তদের। সেই তোমাকেই ওই ষড়যন্ত্রীদের বন্দি করছি কেন, কৈফিয়ত দিতে হবে!
শূরপাল এবং রামপাল – উভয়ের মুখ দিয়ে একসঙ্গে বেরিয়ে এলো, ‘ষড়যন্ত্রী! কারা! কার বিরুদ্ধে!’
সামন্তদের মধ্যে দিব্যোক মাননীয়। বরেন্দ্র, দিনাজপুর, বঙ্গ – এই তিন অঞ্চলের আধিকারিক তিনি। এই তিন অঞ্চল একত্রে বরেন্দ্রী নামে পরিচিত। সামন্তদের মধ্যে সবচাইতে বয়সী তিনি। মহারাজ মহীপাল তাঁকে ‘আপনি’ বলে সম্বোধন করেন। আজ মহারাজা ভব্যতা হারালেন। ‘তুমি’ বলে হেনস্থা করলেন দিব্যোককে।
অপমান হজম করে দিব্যোক সতেজে বললেন, এ আপনার অন্যায় মহারাজ। নিরপরাধ দুই সহোদরকে কারাবন্দি করা আপনার উচিত হচ্ছে না।
তুমি আমার সামনে ঔচিত্যের প্রশ্ন তুলছ! দুই কড়ি দামের সামন্ত তুমি! এখন দেখছি ওই ওদের সঙ্গে ষড়যন্ত্রে তুমিও শামিল আছো। শ্লেষ মিশিয়ে বলে গেলেন দ্বিতীয় মহীপাল।
স্তব্ধ নির্বাক দিব্যোক। কিংকর্তব্যবিমূঢ়ও। একবার অন্য সামন্তদের ওপর চোখ বোলালেন। সবাই প্রতিক্রিয়াহীন। রাজার অভিযোগের উত্তরে কী বলবেন ঠিক করতে পারছেন না দিব্যোক।
ওই সময় রাজা আবার বলে উঠলেন, আমি বুঝতে পারছি – তুমি একজন ষড়যন্ত্রকারী, দিব্যোক। তোমার মতো সামন্ত আমার দরবারে প্রয়োজন নেই। এখনই তুমি বেরিয়ে যাও আমার দরবার থেকে। আর যেন কোনোদিন তোমার মুখ না দেখি।
তারপর সমরনায়কের দিকে মুখ ফেরালেন রাজা। বললেন, এখনো দাঁড়িয়ে আছো কেন তুমি? ওদের বন্দি করে কারাগারে নিয়ে যাও।

১০৮০ খ্রিষ্টাব্দ।
রামাবতি।
পালরাজ্যের রাজধানী। রামপালের শাসনামল।
শূরপাল, রামপাল বন্দি হয়ে কারাগারে নিক্ষেপিত হলেন। দিব্যোক বিদ্রোহী হলেন। হাতে অস্ত্র তুলে নিলেন। দ্বিতীয় মহীপাল দিব্যোককে দমন করার জন্য বরেন্দ্রী আক্রমণ করলেন এবং দিব্যোকের হাতে নিহত হলেন।
শূরপাল-রামপাল কারামুক্ত হলেন। শূরপাল রাজা হলেন। অতি অল্পসময়ে তিনি মারা গেলে পালরাজ্যের সিংহাসনে বসলেন রামপাল।
এদিকে দিব্যোকের স্বাভাবিক মৃত্যু হলো। তাঁর ভাই রুদোক কৈবর্তরাজা হলেন। তাঁর মৃত্যুর পর দিব্যোকের ভাইপো ভীম কৈবর্তাধিরাজ হলেন। লোকে ভালোবেসে ভীমকে বরেন্দ্রীসূর্য উপাধি দিলো।
রামপাল সিংহাসনে চড়েই অতীতের সবকথা ভুলে গেলেন। তিনি বন্দিজীবনের কথা ভুললেন, কারাগারের অমানুষিক নির্যাতনের কথা ভুললেন, বড়দা মহীপালের চক্রান্তের কথা ভুললেন। সর্বোপরি রামপাল বিস্মৃত হলেন কৈবর্তরাজ দিব্যোকের প্রতিবাদের কথা। তাঁর কাছে তখন ভাইয়ের নিষ্ঠুরতা বড় নয়, বড় হয়ে উঠল সহোদরের হত্যার প্রতিশোধ। কিন্তু তখন তো দিব্যোক বেঁচে নেই, তখন তো কৈবর্তসিংহাসনে বরেন্দ্রীসূর্য ভীম। তাতে কী আসে-যায়? ভীমকে হত্যা করে বড়ভাইয়ের হত্যার প্রতিশোধ নিতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হলেন রামপাল।
তাছাড়া, সামান্য এক কৈবর্তবংশ, তারা কিনা রাজত্ব করছে! মাছমারা ছেড়ে সিংহাসনে চড়ে বসেছে ছোটলোকেরা? ছিল তো সামান্য এক সামন্ত। পালরাজদরবারে মাথা নিচু করে বসে থাকত ওই দিব্যোক। মহীপালের একটু করুণা পাওয়ার জন্য কী আকুলিবিকুলিই না করত সে। সুযোগ পেয়ে দাদার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে বসল! শুধু তো তা-ই নয়, বরেন্দ্রীকে স্বাধীন দেশ বলে ঘোষণা করল? আজ দীর্ঘ সাতাশ বছর ধরে পুরুষানুক্রমে বরেন্দ্রী শাসন করে যাচ্ছে ওই ইতরজাতটা। এখন নাকি ভীম ওই স্বাধীন বরেন্দ্রীর রাজা? সে নাকি বরেন্দ্রীসূর্য! ছোটজাতের কৈবর্তবংশটিকে গুঁড়িয়ে দিতে হবে, এই পৃথিবী থেকে ভীমের নাম মুছে দিতে হবে। স্বাধীন বরেন্দ্রীতে পালরাজ্যের পতাকা ওড়াতে হবে।

রামপাল বরেন্দ্রী আক্রমণ করে বসলেন। কিন্তু রামপাল ভীমের সামরিক শক্তির সঠিক খোঁজখবর না নিয়েই আক্রমণ করলেন। বরেন্দ্রীর রাজধানী ডমরনগর অত্যন্ত সুরক্ষিত। পালসেনারা রাজধানী পর্যন্ত এগোনো তো দূরের কথা, কালিন্দী নদীর তীর থেকে পর্যুদস্ত হয়ে ফিরে গেল।
তাই বলে রামপাল কৈবর্তরাজ্য আক্রমণ থেকে বিরত হলেন না। কয়েক বছর ধরে বারবার বরেন্দ্রীর ওপর আক্রমণ অব্যাহত রাখলেন।
কিন্তু যতবারই আক্রমণ করে পালবাহিনী কৈবর্তদের হাতে পর্যুদস্ত হয়ে ফিরে যায়।
এক সন্ধ্যায় মন্ত্রণাসভায় মথনদেব রামপালকে বললেন, ওভাবে পারবেন না মহারাজ, সৈন্যশক্তি দিয়ে ভীমকে পরাজিত করতে পারবেন না।
তাহলে! রামপাল বললেন।
মথনদেব বললেন, ভীমের ডান হাত চ-ককে বশ করুন।
রামপাল বললেন, তুমি চ-ককে চেনো মথনদেব? ভীমের পালিতপুত্র হলে কী হবে, ভীমের জন্য প্রাণ দিতে প্রস্তুত সে।
হা হা হা করে হেসে উঠলেন মথনদেব। পরক্ষণেই বুঝতে পারলেন মহারাজার সামনে ওভাবে হেসে ওঠা উচিত হয়নি তাঁর।
সংযত কণ্ঠে বললেন, চ-ক কৈবর্ত বাহিনীতে সাধারণ এক সমরনায়ক। সে যে রাজপ্রাসাদে যথাযথভাবে মূল্যায়িত হচ্ছে, মনে করি না আমি। ভীমের চার পুত্র। ওদের মধ্যে চ-ক অবহেলিত। আপনি তাকে লোভ দেখান, পালবাহিনীর সেনাপ্রধান হওয়ার লোভ। বলুন – ভীমকে নিধনের ব্যাপারে সহায়তা করলে সেনাপ্রধান বানাবেন তাকে, বরেন্দ্রীর রাজা হিসেবে মেনে নেবেন।
কিন্তু … ! কী যেন বলতে চাইলেন রামপাল।
চাপাকণ্ঠে থামিয়ে দিয়ে মথনদেব বললেন, আপনি তো তাকে আর সেনাপ্রধান করছেন না বা বরেন্দ্রীর রাজাও না। শুধু প্রলোভন দেখাবেন। পরের সিদ্ধান্ত তো আপনার হাতে রইলই।

১০৮২ খ্রিষ্টাব্দ।
ডমরনগর।
কৈবর্তরাজধানী।
পরের ইতিহাস অত্যন্ত বিভীষিকাময়। বেদনাঋদ্ধ। নিষ্করুণ।
সেনাপ্রধানের পদ, বরেন্দ্রীর সিংহাসন, বহুমূল্যের মণিমানিক্য, অগণ্য বৌদ্ধ তরুণীর লোভ দেখিয়ে চ-ককে বশে আনলেন রামপাল। মধ্যস্থতা করল পালগুপ্তচর বাহিনীর প্রধান অনোমদর্শী।
চ-ক ছিল কৈবর্তরাজ ভীমের দক্ষিণ হস্ত। নিজের পুত্রদের ওপরও তেমন ভরসা করতেন না ভীম, যতটুকু করতেন চ-কের ওপর। চ-ক কুড়িয়ে পাওয়া হলে কী হবে ভীমের সকল নির্ভরতার সেনানায়ক ছিল চ-ক। যুদ্ধক্ষেত্রে সে ভীমের পাশে পাশে থাকত।
সেদিনের যুদ্ধে ভীম চড়েছেন হিমালয়ে। হিমালয় ধীরস্থির বলশালী রণহস্তী। আর চ-ক চড়েছে কৈলাসে। কৈলাস অসীম শক্তিশালী মহিষ। চ-কের হাতে খড়গ। ওটাই তার যুদ্ধাস্ত্র।
যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। একদিকে পালবাহিনী, বিপরীত দিকে কৈবর্তসেনা। বর্শা, তীর, তলোয়ার, বল্লমের আঘাতে আঘাতে জর্জরিত হচ্ছে উভয়পক্ষের সৈন্যরা। পালসেনাদের লক্ষ্য আজ ভীম। ভীম অকুতোভয়। হিমালয়ের পায়ে পিষ্ট হয়ে শত শত পালসৈন্য মরছে।
অস্ত্রের ঝনঝনানি, মর্মন্তুদ হাহাকারের মধ্যে চ-ক তার ডান হাতের খড়গের অগ্রভাগটি আচমকা হিমালয়ের বাঁ-চোখে ঢুকিয়ে দিলো। দিগি¦দিক জ্ঞানশূন্য হয়ে ছুটতে শুরু করল হিমালয়। তার বাঁ-চোখ থেকে গলগল করে রক্ত গড়াচ্ছে। বেদিশা হিমালয় পালবাহিনীর চক্রব্যূহের মধ্যে ঢুকে গেল।
চ-কের মুখে তখন ক্রূর হাসি।
পালবাহিনীর হাতে বরেন্দ্রীসূর্য ভীম বন্দি হলেন।
রামপাল পুত্র বিত্তপালকে ডেকে বললেন, ভীমকে বেশিক্ষণ বাঁচিয়ে রাখা বিপজ্জনক। নির্বংশ করো ভীমকে।
কালিন্দীর তীরে মশান। ভীমকে নিয়ে আসা হয়েছে সেখানে। মশানদ-ে বাঁধা হয়েছে তাঁকে। ভীমের পুত্র, পৌত্র, ভাগিনেয়, ভগ্নিপতি, দূরসম্পর্কের জামাতা, এমনকি ছোট ছোট শিশুকেও ধরে আনা হয়েছে মশানে। চ-ক চিনিয়ে দিয়েছে সবাইকে।
ছেত্তা ভীমের সামনে একে একে সবার মস্তক ছেদন করল।
চ-ক বলল, প্রথমে ভীমপুত্র শর্বদেবের মাথা কাটো।
ভগ্নিপতি, ভাগ্নে, নাতি, পুত্রদের মাথা বিচ্ছিন্ন করবার সময় সবাই চোখ ঢাকল, ঢাকলেন না ভীম। কালিন্দীর দিকে নিষ্পলক চোখে তাকিয়ে থেকেছিলেন তিনি।
তারপর চ-কের দিকে মুখ ফিরিয়েছিলেন ভীম। বলে উঠেছিলেন, চ-ক, আমি তোমাকে নিজের সন্তানদের চেয়েও বেশি বিশ্বাস করেছিলাম। তুমি পালদের বলাৎকারের ফসল। পথের ধুলা থেকে কুড়িয়ে এনেছিলাম তোমাকে। পুত্রের স্নেহ দিয়েছিলাম তোমাকে।
ব্যঙ্গ হাসিতে ফেটে পড়ে চ-ক বলেছিল, সেই স্নেহের শোধ দিচ্ছি আজ।
নির্বিকার কণ্ঠে ভীম বলেছিল, তুমি বিশ্বাসহন্তা চ-ক। তুমি অপেক্ষা করো। তোমার দিন ফুরিয়ে আসছে।
কক্্ কক্ করে হেসে চ-ক বলেছিল, তোহার দিন শেষ, কৈবর্তের রাজত্ব শেষ।
চেত্তা নতুন খড়গ নিয়ে ভীমের দিকে এগিয়ে গেল। সূর্য তখন ডুবোডুবো। কালিন্দীতে লালচে তির্যক আলো।
এই সময় গগনবিদারী কণ্ঠে ভীম বলে উঠলেন, হে বরেন্দ্রভূমি, জননী আমার, এই দেশে আমি গণমানুষের শাসনতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলাম। বিশ্বাসঘাতক চ-কের জন্য আজ তা ব্যর্থ হলো। তুমি নিরাশ হয়ো না মা। অপেক্ষা করো তুমি। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, তোমাকে উদ্ধার করার জন্য আর একজন জননেতা আসবেন। তাঁর হাত দিয়ে পুনরায় এই বঙ্গভূমিতে গণমানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা পাবে। সেইদিন বঙ্গজননীর সন্তানরা আওয়াজ তুলবে – জয় বরেন্দ্রীর জয়, জয় বাংলার জয়।
ছেত্তা খড়গাঘাতে বরেন্দ্রীসূর্য ভীমের মাথা কেটে নামাল।

দুই
বিংশ শতাব্দী।
১৯৭৫ খ্রিষ্টাব্দ।
বরেন্দ্রীসূর্য ভীমহত্যার ৮৯৩ বছর পর।
ঢাকা।
বাংলাদেশের রাজধানী।
৩২ নম্বর ধানমন্ডি।
বরেন্দ্রীসূর্য ভীম নিহত হওয়ার পর স্বাধীন বরেন্দ্রী, মানে বঙ্গভূমি আবার পরাধীন হয়ে পড়ল। কেটে গেল দীর্ঘ সময়। মাস-বছর-শতাব্দী। শতাব্দীর পর আরো শতাব্দী। বাংলার সাধারণ মানুষ নিঃশেষিত হলো। বহিরাগতদের দ্বারা লাঞ্ছিত হতে থাকল এই বঙ্গভূমি। বরেন্দ্রীসূর্য ভীমের শেষ বাসনা বাংলার আকাশে-বাতাসে ধ্বনিত হতে থাকল। এই বাংলাকে, এই বঙ্গভূমিকে অত্যাচারীর নাগপাশ থেকে মুক্ত করার জন্য কেউ জন্মালেন না। কারো বজ্রকঠিন কণ্ঠে ঘোষিত হলো না, আমি জন্মেছি ভীম, তোমার শেষ আকাক্সক্ষা পূরণ করার জন্য তুমি আমি হয়ে বাংলা মায়ের কোলে জন্ম নিয়েছি আমি।
কিন্তু দুর্ভাগা বঙ্গদেশকে আর বেশিদিন অপেক্ষা করতে হলো না। ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ বঙ্গভূমিতে জন্ম নিলেন শেখ মুজিবুর রহমান নামে এক বাঙালি সন্তান।
সূর্য উঠল, গড়াল পশ্চিমে। সপ্তাহ-মাস-বছর করে করে ৫১ বছর কেটে গেল। গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় জন্ম নেওয়া শেখ মুজিব বঙ্গবন্ধুতে রূপান্তরিত হলেন। ১৯৭১-এর ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু ঘোষণা করলেন – এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম।
বঙ্গবন্ধুর এই ঘোষণায় বহু কোটি হাত একহাত হলো। স্বাধীনতার পাদদেশে সকল বাঙালি সমবেত হলো।
পাকিস্তানের বর্বর সেনারা বাংলার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। তারপর আগুন। ধ্বংস। মারণাস্ত্রের ঝনঝনানি। বহু মৃত্যু। বহু নারীর সতীত্ব। মুক্তিকামী বাঙালির কানের কাছে বেজে উঠল সেই মহামন্ত্র – তোমাদের হাতের কাছে যা আছে, তা নিয়ে শত্রুর বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ো।
যুদ্ধ হলো। হত-নিহত হলো। সম্ভ্রম গেল। কিন্তু বাঙালির মনোবল গেল না।
তারপর ১৯৭১-এর ১৬ ডিসেম্বর। লাল-সবুজের পতাকাটি বাঙালির হয়ে গেল। স্বাধীন বাংলাদেশের আকাশে ওই পতাকা উড়তে থাকল। শেখ মুজিবুর রহমান এই বাংলা, এই স্বাধীন বঙ্গভূমি প্রতিষ্ঠার রূপকার হলেন। তিনি রাষ্ট্রপতি, তিনি জাতির পিতা।
বিধ্বস্ত, ত্রস্ত বাংলাদেশের গণমানুষের জীবনে ধীরে ধীরে স্বস্তি ফিরে আসতে শুরু করল।
কিন্তু বঙ্গসূর্যকে তো ঠিকঠাকমতো আলো ছড়াতে দেওয়া যায় না। বঙ্গবন্ধুর চারপাশে সুবিধাবাদী মানুষের ভিড়। রাবণের ছিল বিভীষণ, ভীমের ছিল চ-ক। বিভীষণ অথবা চ-ক হয়ে শেখ মুজিবের নিকটত্ব পেল খন্দকার মোশতাক আহমেদ। মোশতাক ধীরে ধীরে চ-ক হয়ে গেল। তার মধ্যে লালসার লোলজিহ্বা। ভীম যেমন বুঝতে পারেননি চ-ককে, বঙ্গবন্ধুও বুঝতে পারেননি মোশতাককে। সেনাপতির পদের লোভে কাতর হয়েছিল চ-ক। মোশতাক কাতর হলো রাষ্ট্রক্ষমতার লোভে। মোশতাক সেনাদের সঙ্গে গোপন আঁতাত করল। মোশতাকের প্ররোচনা-প্রণোদনায় সেনাবাহিনীর বিপথগামীরা ৩২ নম্বর ধানমন্ডি আক্রমণ করে বসল।
নিহত হলেন শেখ মুজিব। একা নন। স্ত্রী-পুত্র-পুত্রবধূ আত্মীয়স্বজনসহ। ভীমের মতো তাঁরও সামনে একে একে হত্যা করা হলো পরমাত্মীয়দের।
তারপর অগণ্য বুলেট ছুটে গেল বঙ্গবন্ধুর বক্ষ লক্ষ্য করে। শেষনিশ্বাস ফেলবার আগে বঙ্গবন্ধুর মুখ থেকে বেরিয়ে এলো – আমার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ শেষ হয়ে যাবে না। হে জননী জন্মভূমি, আমার অবর্তমানে তোমার বুকে ঘন আঁধার নামবে হয়তো, আমি জানি সেই অন্ধকার কিছুদিনের জন্য। আঁধার কেটে যাবে একদিন। আমার পরিবর্তে আমার পরে এই বঙ্গদেশে আরেকজনের আবির্ভাব হবে। তুমি তার জন্য অপেক্ষা করে থেকো মা। জয় বাংলা।

Leave a Reply

%d bloggers like this: