আইটিআই থিয়েটার উৎসব-২০১২

লেখক:

আ বু  সা ঈ দ  তু লু

ইন্টারন্যাশনাল থিয়েটার ইনস্টিটিউটের বাংলাদেশ কেন্দ্র গত ২৭ মে-৩ জুন, ২০১২ পর্যন্ত বাংলাদেশের শিল্পকলা একাডেমীর জাতীয় নাট্যশালা, এক্সপেরিমেন্টাল থিয়েটার ও স্টুডিও থিয়েটার হলে আয়োজন করে একাদশ আন্তর্জাতিক নাট্যোৎসব, সেমিনার ও ওয়ার্কশপের। এ উৎসবে সহযোগিতা করে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী। আন্তর্জাতিক নাট্যোৎসব উল্লিখিত হলেও মূলত এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যকার নাট্য পরিবেশন হয়েছে। এ উৎসবের শিরোনাম ছিল ‘Theatre in Asia : Asia in Theatre’  ‘এশিয়ার নাট্য : নাট্যের এশিয়া’। এ উৎসবে এশিয়াভুক্ত বিদেশি চারটি নাট্যদল ও বাংলাদেশের স্থানীয় বিশটি নাট্যদল নাট্য পরিবেশন করে। এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে ছিল চীন, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ভারতের দুটি করে নাট্যদল। এবারের উৎসবে এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে নাট্য অভিজ্ঞতার বিনিময়ই প্রাধান্য পেয়েছে। ১ মে, ২০১২ তারিখে শিল্পকলা একাডেমীর সেমিনার কক্ষে অনুষ্ঠিত হয় আন্তর্জাতিক নাট্যসেমিনার। তাছাড়া কর্মশালা ও প্রদর্শিত নাট্যের নেপথ্যকর্মীর সঙ্গে প্রতিদিন শিল্পকলা একাডেমীর লবিতে দর্শকদের মতবিনিময় অনুষ্ঠিত হয়। বিশেষত এ-উৎসবে বিদেশি দলগুলোর মধ্যে ভারতের মিডিয়া ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের দ্য পিয়ানিস্টের বিষয়, আঙ্গিক, নিরীক্ষা ও উপস্থাপন সংশ্লেষণ অত্যন্ত আকর্ষণীয় ও বৈচিত্র্যময়। বর্তমানে বিশ্বনাট্য ধারায় ‘থিয়েটার’ প্রদর্শনের ক্ষেত্রে ‘পারফরম্যান্স’ বা ‘পরিবেশনা’ বা ‘উপস্থাপন’ বলাতেই বুদ্ধিভিত্তিক-চিন্তনজাত শব্দটির বেশি ব্যবহার লক্ষ করা যাচ্ছে। প্রদর্শিত চব্বিশটি নাট্যের মধ্যে বিদেশি নাট্যগুলো ও বাংলাদেশের সুনির্দিষ্ট কিছু নাট্য বিষয়বৈচিত্র্য, নিরীক্ষা, তুলনামূলক নাট্যচিন্তন, প্রযোজনা মনস্তত্ত্ব ও উপস্থাপনকৌশলের স্বরূপ অনুসন্ধান লেখাটির মূল লক্ষ্য বা অভীষ্ট।
জাতিসংঘের বিভিন্ন অঙ্গসংগঠন সদস্যভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে উন্নয়নমুখী নানা কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে থাকে। যদিও  স্থান-কাল-সংস্কৃতিগত কারণে উন্নয়নের সংজ্ঞা নিয়ে বর্তমানে নানা বিতর্ক বিদ্যমান। শিক্ষা, বিজ্ঞান-প্রযুুক্তি, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি ধারার জাতিসংঘের অঙ্গ সংগঠন ‘ইউনেস্কো’। ইউনেস্কোর সদর দপ্তর ফ্রান্সের প্যারিসে। ইউনেস্কোর সহযোগিতা-তত্ত্বাবধান ও পৃষ্ঠপোষকতায় প্রতিষ্ঠিত হয় ইন্টারন্যাশনাল থিয়েটার ইনস্টিটিউট (আইটিআই)। এর উদ্দেশ্য আন্তর্জাতিকভাবে নাট্যচিন্তন বা নাট্যঅভিজ্ঞতা বিনিময়, থিয়েটার অব নেশনস, সেমিনার, সিম্পোজিয়াম তথা নানা কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে বিশ্বের সমস্ত সদস্যভুক্ত দেশের মধ্যে পরিবেশনা সংস্কৃতির অভিজ্ঞতা বিনিময় ও নাট্যকর্মীদের মধ্যে সম্পর্ক স্থাপন। আইটিআই ইউনেস্কো পৃষ্ঠিত প্রতিষ্ঠান বলে এর বিষয়, বিভিন্ন কার্যক্রম-কার্যপ্রণালি, তত্ত্ব, প্রয়োগ অনেকাংশে ইউনেস্কোর চিন্তাকেই প্রাধান্য দিয়ে থাকে। সম্ভবত           সে-পরিপ্রেক্ষিতেই কালচারাল আইডেনটিটির চেয়ে কালচারাল ডাইভারসিটি প্রদর্শন বেশি পরিমাণে দেখা যায়। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দেশের সাংস্কৃতিক পরিচয়মূলক ডাইভারসিটি গুরুত্বপূর্ণ, তাতে নিজ নিজ দেশীয় সংস্কৃতির সঙ্গে বিশ্বসংস্কৃতির মেলবন্ধ হয়; কিন্তু অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে ডাইভারসিটি প্রদর্শনের আধিক্য সম্ভবত দেশীয় সংস্কৃতির একবদ্ধতার বাইরে খণ্ডিত-দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করতে পারে। বতর্মান বাংলাদেশের ডেভেলপমেন্ট থিয়োরিও পশ্চিমা তত্ত্বনির্ভর, তেমনি ইউনেস্কোর শিক্ষা-শিল্প-ঐতিহ্য-সংস্কৃতি আন্তর্জাতিক তত্ত্বনির্ভর। স্বনির্ভরশীলতা অর্জনের সমস্ত বাধাকে সমূলে উৎপাটন জরুরি। ইন্টারন্যাশনাল থিয়েটার ইনস্টিটিউটের (আইটিআই) সহযোগী সদস্য হিসেবে ‘বাংলাদেশ’ অন্তর্ভুক্ত হয় ১৯৮২ সালে। ১৯৮৯ সালে ‘বাংলাদেশ’ পূর্ণ সদস্য হিসেবে আইটিআই বাংলাদেশ কেন্দ্রের যাত্রা শুরু করে। বর্তমান আইটিআই বাংলাদেশ কেন্দ্রের সভাপতি-নাসির উদ্দীন ইউসুফ, সাধারণ সম্পাদক-দেবপ্রসাদ দেবনাথ, আন্তর্জাতিক সম্পাদক-ড. ইস্রাফিল শাহিন। বর্তমান আইটিআইয়ের বিশ্বসভাপতি-বাংলাদেশের নাট্যব্যক্তিত্ব রামেন্দু মজুমদার, ডিরেক্টর জেনারেল-টোবিয়াস বেইনকন (Tobias Biancone)। সাধারণত দুবছর পরপর বাংলাদেশ কেন্দ্র আয়োজন করে আন্তর্জাতিক নাট্যোৎসব, সেমিনার ও ওয়ার্কশপের। ১৯৯১ সাল থেকে প্রথম বাংলাদেশে উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। এবার ২৭ মে-৩ জুন পর্যন্ত আট দিনব্যাপী ঢাকার সেগুনবাগিচায় বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমীর তিনটি মঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় একাদশ আন্তর্জাতিক নাট্যোৎসব, সেমিনার ও ওয়ার্কশপ। বর্তমান আইটিআইয়ের সদস্যভুক্ত দেশের সংখ্যা একশ। পরিবেশনা শিল্পের প্রায় প্রতিটি বিষয়ই এর অন্তর্ভুক্ত থাকে। যেমন – নাট্য, নৃত্য, গীতনাট্য প্রভৃতি। পরিবেশনা শিল্পের সঙ্গে সম্পর্কিত তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক চিন্তনধারার ব্যক্তিবর্গ যেমন – নাট্যকার, নির্দেশক, ডিজাইনার, শিল্পী, তাত্ত্বিক, সমালোচক, গবেষক, অধ্যাপক আইটিআইয়ের কমিটির সঙ্গে যুক্ত হতে পারেন। সম্ভবত পরিবেশনা শিল্পকলা সংস্কৃতির এটিই সবচেয়ে বড় আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান। ইউনেস্কোর সহযোগিতায় আইটিআই বিশ্ব নাট্য দিবস ও বিশ্ব নৃত্য দিবস বেশ ঘটা করে পালন করে থাকে।
২৭ মে-৩ জুন আন্তর্জাতিক নাট্যোৎসবের উদ্বোধনের দিন ২৭ মে, ২০১২ তারিখে শিল্পকলা একাডেমীর এক্সপেরিমেন্টাল থিয়েটারে প্রদর্শিত হয় ভারতের ‘আরশি থিয়েটার’-প্রযোজিত নাট্য মিডিয়া। এ নাট্যের কোনো একক রচিয়তা নেই। ইম্প্রোভাইজেশনাল পদ্ধতিতে নাট্যটি উপস্থাপিত। এ নাট্য শিল্প-সাহিত্যতত্ত্বে ডিকনস্ট্রাকশন ও উত্তর কাঠামোবাদী চিন্তনধারায় উত্তর-আধুনিক নাট্য প্রযোজনা হিসেবে বিবেচিত। দলীয় প্রযোজনা সূত্রেই উল্লেখ – ‘ÔMedia is a deconstruction performance piece of the classic media story adapted in to a 45 minute monologue delivered by Media’। ডিকনস্ট্রাকশনের (Deconstruction) বাংলায় পারিভাষিক ‘বিনির্মাণ’, ‘বিগঠন’, ‘ভাঙনবাদ’ হিসেবে স্বীকৃত। বিমলকৃষ্ণ মতিলাল ‘অবিসংযোগ’, গায়ত্রী স্পিভাক ‘অবিনির্মাণ’ হিসেবে পারিভাষিক গ্রহণ করেছেন। যদিও গত দুই বছরের বাংলাদেশের নাট্যচর্চায় এ তাত্ত্বিক প্রয়োগ লক্ষ করা গেছে। সীতা-বেহুলা চরিত্রভিত্তিক প্রযোজনা ছাড়াও নানা নাট্য প্রযোজনায় এ তত্ত্বীয় বিষয়ের নিরীক্ষা দেখা যায়। হয়তো তত্ত্বভিত্তিক নিরীক্ষা না করলেও এর কিছু প্রযোজনা এ জ্ঞানতাত্ত্বিক ধারার মধ্যেই পড়ে। তাত্ত্বিক হাইডেগারের ডিস্ট্রাকশন (Destruction) তত্ত্বভিত্তিক দার্শনিক জ্যাক দেরিদা ডিকনস্ট্রাকশন (Deconstruction)  নামের পরিপূর্ণ তত্ত্বের বিকাশ ঘটান। এক কথায় প্রচলিত সত্য, ধারণা, বিশ্বাসকে পুরোপুরি অস্বীকার করে নয়, গ্রহণ-বর্জন ও সমসাময়িক পরিপ্রেক্ষিতে এক নতুন চিন্তন ও ভাবনার বিকাশনই ডিকনস্ট্রাকশন হিসেবে স্বীকৃত। অধিবিদ্যাগতকেও (Metaphysics) ভেঙে নতুন চিন্তন দাঁড়ায়। এ নাট্যটি গ্রিক নাট্যকার ইউরিপিডিস (Euripides), জার্মানির হেইনার ম্যুলার (Heiner Müller), ইতালির পিয়ের পাওলো প্যাসোলিনির (Pier Paolo Pasolini) মিডিয়াকে কেন্দ্র করে এ নবনাট্যের উপস্থাপন গড়ে উঠেছে। একক অভিনয়ে নাট্যটি উপস্থাপিত। অভিনয়শিল্পী মনীষা আদক এবং নির্দেশনা – অবন্তী চক্রবর্তী। ‘মিডিয়া’-নামী এক নারীর একাকিত্ব, অভিমান, দুঃখ-বেদনা, আনন্দের মনো-বিশ্লেষণাত্মক জীবনবাস্তবতার প্রকাশই এ নাট্য। এ নাট্যটি অভিযোজিত উপস্থাপন। কলকাতাকেন্দ্রিক অনুবাদ ও উচ্চারণ হিসেবে ‘মিডিয়া’কে ‘মিদিয়া’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। তিনটি পাণ্ডুলিপির এক অন্তরৈখিক ব্যঞ্জনার ভিত্তিতে নাট্যের কাহিনিটি আবর্তিত। এ নাট্যে মিদিয়া নারী চরিত্রে নারীত্ব চেতনাই মুখ্য। মিডিয়াকেন্দ্রিক তিনটি নাট্যের কাহিনি, গঠন, বিষয় ও অবয়ব ভেঙে নব্য এক মনোদর্শন ব্যাখ্যাত। প্যাসোসলির মিডিয়ায় আধিপত্য, ক্ষমতার জন্য জেসনের রাজকন্যাকে বিয়ে, রাজকন্যার জন্য মিডিয়াকে পরিত্যাগ, অবস্থান ও আভিজাত্যই জেসনের মূল। মিদিয়ার একাকিত্ব ও অসহায়ত্বের নির্মমতায় জেসনকে ফেরত পেতে চায়। কিন্তু মিডিয়া রাগ ও অভিমানে জেসন, তাঁর স্ত্রী-সন্তানসহ সমস্ত কিছু ধ্বংসের গ্লানির মধ্য দিয়ে নারীত্বের মানবিক আক্ষেপ-চাওয়া, আশা-আকাক্সক্ষা, হতাশা-আকর্ষণ, প্রাপ্তি-জীবনবোধ, মনোবৈকল্য দৃশ্যত ইমেজ ও চরিত্রের আবেগের মধ্য দিয়ে সৃষ্টি হয়েছে। নাট্য শুরুর পূর্বে দর্শকদের সাধারণত ধারণা ছিল হয়তো গ্রিক ক্ল্যাসিক ‘মিডিয়া’র নাট্য উপস্থাপিত হবে। কিন্তু এ এক উপস্থাপনের মধ্য দিয়ে সমস্ত মিডিয়া বা পৃথিবীর তাবৎ বিক্ষুব্ধ নারীত্বের প্রতীকে রূপান্তরিত হয়েছে। তাই মিডিয়ার মনোজাগতিক উপলব্ধিতে সমস্ত মানবজাতিকেই ধ্বংস করে ফেলতে চায় এবং একাই থাকতে চাই। তাই তো মিডিয়ার দৃপ্ত উচ্চারণ – ‘I want to rip mankind apart in two and live within the empty middle. I no woman and no man.’ নারী-পুরুষের কোনোটাই দরকার মিডিয়ার মনে হয় না। মঞ্চে প্রবেশ মাত্রই দেখা যায় – আবর্জনামিশ্রিত বিচ্ছিন্ন দ্বীপসমেত মঞ্চ। ধুলো, গাছের পাতা ইত্যাদি নানা উপকরণে পরিবেশ। একটি নারী উপুড় হয়ে মরে পড়ে আছে। অথবা, আত্মগ্লানিত, নির্বাসিত কোনো নারী উপুড় ও মৃতপ্রায়। নাট্য শুরুর ঘণ্টার সঙ্গে সঙ্গে নারীটি উঠে বসে। এক আত্মনিমগ্ন, কষ্টদগ্ধ-অসচেতন ক্ষোভী উন্মত্তপ্রায়। অডিওতে ইউরিপিডিসের সেই বিখ্যাত সংলাপগুলো ইংরেজিতে আবৃত্তি হতে থাকে। আবৃত্তি থামলেই নারীচরিত্রটি উঠে বসে – উচ্চারণ করে – ‘আমি মিদিয়া’। আত্মকথন, স্মৃতিচারণ, স্মৃতিদগ্ধতা, আবেগ-ক্ষোভ, হতাশা একাকিত্বের যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে ঘটনা বর্ণন এগিয়ে চলে।
একক উপস্থাপনার মধ্য দিয়ে শারীরিক, বাচিক ও অভিব্যক্তির নানা চিত্রণরূপ নৈর্ব্যক্তিকতার নিরিখে উপস্থাপিত। আবহসংগীত, পোশাক পরিকল্পনা অসাধারণ। এ একক অভিনয়ের নাট্যে এমন ইলিউশন বা মায়া সৃষ্টি করেছে যে, মিদিয়া আবেগে সমস্ত দর্শকই প্রায় চৈতন্য হারিয়ে মিডিয়ার চরিত্রের সুখ-দুঃখের সঙ্গে একীভূত হয়ে গিয়েছিল। অসংলগ্ন কিছু অভিব্যক্তিতে বিশেষত কমলা খাওয়া ও দর্শকদের সঙ্গে যোগাযোগীয় আচরণে নান্দনিকতার অভাব লক্ষ করা গেছে, যদিও নান্দনিক ধারাটি স্থান-কাল-পাত্রভেদে বিবেচিত। আরো কিছু অংশে শিল্পের নান্দনিকতার দিকগুলো ক্ষীণতর। আবার পোশাক পরিবর্তনের দৃশ্যে যে নারীর দেহত্ববোধক আকর্ষণীয় ভঙ্গিমায় পশ্চিমা দেহবাদী আকর্ষণধর্মিতা প্রত্যক্ষ করা গেছে। সর্বোপরি কৃত্রিম থিয়েটারের আবহে শিল্পীর ব্যক্তিক আবেগই বেশি সঞ্চারিত। এ নাট্যে তিনটি ভাষার ব্যবহার হয়েছে – ইংরেজি, হিন্দি ও বাংলা।
ইউরোপিয়ার ‘এনলাইটেনমেন্ট’ দার্শনিক তত্ত্বভিত্তিক মডার্ন বা সমসাময়িক স্বাতন্ত্র্যিক চিন্তাচেতনার ধারায় জ্যা বদ্রিয়ার উত্তর-আধুনিক চিন্তা-ভাবনার বিকাশ ঘটান। উত্তর-আধুনিক চিন্তন কোনো কালানুক্রমিক বিষয় নয়। বর্তমান বিশ্বের শিল্প-সাহিত্য-দর্শন, মনোবিদ্যা, সমাজ-রাজনীতি থেকে শুরু করে সর্বত্র তার প্রভাব পড়ে চলেছে। এখনকার বাংলাদেশের শিল্প-সাহিত্য পাশ্চাত্যের তত্ত্বভিত্তিক বিশ্লেষণ করতেই প্রায় সবাই অভ্যস্ত। নাট্য-ভাবনায়ও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। উত্তর-আধুনিক চিন্তার বৈশিষ্ট্যগুলো সমন্বিত ও সুকল্পিত হওয়ার পূর্বেই বিভিন্ন নাট্য উপাদানের মধ্যে সে-বৈশিষ্ট্যগুলো বিচ্ছিন্নভাবে বিদ্যমান ছিল। বাংলাদেশের ‘ঢাকা থিয়েটার’, ‘প্রাচ্যনাট’, ‘সিএটি’, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘নাট্যকলা বিভাগ’ ও অন্যান্য দলের নাট্যচিন্তার মধ্যেও লক্ষ করা যায়। সাধারণত উত্তর-আধুনিক নাট্য-ভাবনায় এরিস্টটলীয় ভাবনা উপেক্ষিত হয়ে থাকে। এ ‘মিডিয়া’ নাট্য উপস্থাপন দর্শনে নাট্যতাত্ত্বিক মিক ওয়ালিসের সঙ্গে সুর মিলিয়ে বলা যায় – This theatre makes a presentation, not a representation. একজন নারীর নারীসুলভ স্বভাব, আচরণ, একাকিত্ব, অসহায়ত্ব, দুঃখ-বেদনা, রাগ-অভিমান, আনন্দ ও জিঘাংসার উপস্থাপন। নাট্যতাত্ত্বিক মেলি ইয়ামুমুর একটি মন্তব্য প্রণিধানযোগ্য – Post-modern theatre sees the various cultural and historical traditions as a vast source of signs… takes on pluralism and multiplicity in style, approach and over all process.
নাট্য প্রদর্শন শেষে নির্দেশক অবন্তী চক্রবর্তী উপস্থাপন সৃষ্টি প্রসঙ্গে বলেন, ‘আমি গ্রিক ইউরিপিডিকের মিডিয়াকেই শুধু উপস্থাপন করতে চাইনি। জনপ্রিয় তিনটি মিডিয়াকে এনে গভীরতর নারীত্বের একটি পয়েন্ট বা জায়গাকে বেছে নিয়ে অভিনয়শিল্পীর সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে বারবার বসি। দুজনের কথোপকথন, ইম্প্রোভাইজেশনের মধ্য দিয়ে নতুন আরেক ‘মিডিয়া’কে উপস্থাপন করতে চেয়েছি। যে-মিডিয়া আজকের সমাজের মিডিয়া। প্রথাগত মিডিয়াগুলোর স্টাকচার ভেঙে নব মিডিয়া যদি কারো হৃদয়ে পৌঁছে তবে আমাদের উপস্থাপন সার্থক বলে মনে করি।’
২৮ মে সোমবার স্টুডিও থিয়েটারে প্রদর্শিত হয় ঠাকুরগাঁওয়ের ‘ধামের গান’। বিষয়ের শিরোনাম – ‘হাউসের বেহাইনী রঙ্গিলা বেহাই’। নির্দেশনা – ধারানী বর্মণ। বাঙালি সমাজের ‘বিহাই’ ‘বিহানী’ বা ‘বিহাইনী’ অত্যন্ত সখ্য, আনন্দ ও কৌতুকপূর্ণ সম্পর্কযুক্ত বিষয়। গ্রামীণ পটভূমিতে  এ-বিষয় নিয়ে নানা আঙ্গিকে কৌতুকপূর্ণ নানা পরিবেশনা প্রদর্শিত হয়। এ উপস্থাপনায় কৌতুককর নানা সংগতি-অসংগতি ও হালকা বিনোদনের মধ্য দিয়ে সমাজ, সম্পর্ক-পরিণতি, জীবনচিন্তা ও সমসাময়িক বাস্তবতা প্রতিফলিত হয়েছে। এ ঐতিহ্যবাহী নাট্য পরিবেশনায় হাস্যরস প্রদানই মুখ্য থাকে। এ পরিবেশনার সঙ্গে সংযাত্রার একটি অন্তঃসাদৃশ্য লক্ষ করা যায়।
এ রীতির মতো বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে নানা আঙ্গিকের ঐতিহ্যবাহী নাট্য। বাংলা নাট্যের ইতিহাস হাজার বছরেরও পুরনো। সেলিম আল দীন, নাসির উদ্দীন ইউসুফ, জামিল আহম্মেদ হাজার বছরের নাট্য-পুরোধা ব্যক্তিত্ব। সেলিম আল দীন বাঙলা নাট্যকোষ গ্রন্থে প্রাচীন ও মধ্যযুগের অসংখ্য ঐতিহ্যবাহী নাট্য-আঙ্গিকের পরিচয় তুলে ধরেছেন। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য পাঁচালি, লীলা, গীত, গীতনাট, পালা, পাট, যাত্রা, গম্ভীরা, আলকাপ, ঘাটু, হাস্তর, মঙ্গলনাট, গাজীর গান ইত্যাদি। এগুলো স্থায়ী, অস্থায়ী বা কৃত্রিম মঞ্চে উপস্থাপিত হতো। সেলিম আল দীন মনে করেন, এ আঙ্গিক বিষয় ও রীতিকে অবলম্বন করে গড়ে ওঠা নাট্যসংস্কৃতিই বাঙালির স্বকীয় নাট্য-ঐতিহ্য ও নাট্য-বৈশিষ্ট্য। ঔপনিবেশিক শিল্পতত্ত্বে আমরা পাশ্চাত্যতত্ত্বমুখী। ফলে আমাদের শিল্পকে আমরা সাধারণত অবজ্ঞার চোখে দেখতে অভ্যস্ত। আমাদের মধ্যে উপনিবেশের অনুকৃতি বিদ্যমান। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার ত্র“টিজনিত কারণে আমাদের হাজার বছরের শিল্পকে অনেকের কাছেই দুরূহ বলে প্রতীয়মান হয়। বর্তমান বাংলাদেশেও প্রান্তিক পর্যায়ে যে ঐতিহ্যবাহী নাট্য-আঙ্গিকগুলো পরিলক্ষিত হয় – পালাগান, কবিগান, জারি, যাত্রা, আলকাপ, গম্ভীরা, সংযাত্রা, ঘাটু, পুতুল নাট্য প্রভৃতি অন্যতম। নগর বা শহর পর্যায়ে ঐতিহ্যবাহী বাংলা নাট্যধারায় অর্ধশতাধিক নাট্য মঞ্চায়িত হয়েছে এবং হচ্ছে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য কেরামতমঙ্গল, চাকা, যৈবতী কন্যার মন, বনপাংশুল, হাতহদাই, নিমজ্জন, ধাবমান, বিষাদসিন্ধু, কমলারানীর সাগরদীঘি, নিত্যপুরাণ, আরজচরিতামৃত, বেহুলার ভাসান, সং ভং চং, সীতার বনবাস, মহাজনের নাও, খনা, উত্তর খনা, চিত্রাঙ্গদা ইত্যাদি।
ধামের গান সম্পর্কে নাট্যতাত্ত্বিক ড. ইস্রাফিল শাহিন বলেন, ‘ঠাকুরগাঁওয়ের মাডিগড়া অঞ্চলের একটি পরিবেশনা ধামের গান। তারা বিশ্বাস থেকে তাদের ব্যক্তি-সমাজ, সম্পর্ক-পরিণতি, নৈতিকতা নানা বিষয় হাস্য-কৌতুকে তুলে ধরে। আমাদের বাংলার নিজস্ব নাট্যচিন্তন-পরিবেশনার মধ্যে পড়ে এগুলো। এগুলো বা এরকমের বাংলাদেশের গ্রামে-গঞ্জে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে অসংখ্য পরিবেশনা। কোনো তত্ত্ব থেকে নয়, পারিপার্শি¦কতা ও জীবনবোধের গভীর থেকে হাস্যরসাত্মক নানা বিষয় তুলে আনা ও পরিবেশনা শ্রমনিষ্ঠ। নৃত্য-সংগীত-অভিনয় এগুলোতে সংমিশ্রণ থাকে। শুধু ধামের গান নয়; এরকম পরিবেশনাগুলোই আমাদের বাংলার নাট্য-ঐতিহ্য।’
২৯ মে, মঙ্গলবার জাতীয় নাট্যশালায় চীনের নানিং সিটি অপেরা প্রযোজনা করে মাউস ডটার’স ম্যারেজ। একই শিরোনামে দুটি নাট্য পরিবেশিত হয়। প্রথমটি দ্য মাউস ডটার’স ম্যারেজ এবং অন্যটি লু হুয়া মার্স। রচনা – চুয়া সু পং (Chua Soo Pong), নির্দেশনা – হো ইয়ান (Hao Yun)। নাট্যদ্বয় মূলত তরুণ শ্রেণির দর্শকদের উদ্দেশ করেই নির্মিত। ইঁদুর কন্যার বিয়ে নাট্যের কাহিনিতে দেখা যায় – ইঁদুর কন্যার বিয়ের জন্য পাত্রের সন্ধান। বাবা-মা দুজনেই ব্যতিব্যস্ত কন্যাকে বিয়ে দেওয়ার জন্য। বিয়ের জন্য পাত্রেরও অভাব নেই। বিভিন্ন পাত্র-প্রস্তাব আসতে থাকে। তার মধ্যে পাত্র হিসেবে আসে দেয়াল, বাতাস, মেঘ ইত্যাদি। এগুলো মূলত শক্তির প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত। কিন্তু কন্যার বাবা-মা প্রত্যেককেই প্রত্যাখ্যান করতে থাকে। কারণ তাদের মতে, পাত্রকে হতে হবে ধনী, ক্ষমতাশালী ও বিখ্যাত। তাই কোনো পাত্রকেই বেছে নিতে পারে না। অপেক্ষা করতে থাকে হয়তো আরো ভালো কিছু আসবে। একসময় কন্যার মায়ের জীবন বাঁচিয়ে ছিল এক ধূসর ইঁদুর। অতএব সে ক্ষমতাশালী বিবেচনায় সিদ্ধান্ত নিলেও পরবর্তীকালে রক্ষাকারী ধূসর ইঁদুরকে প্রত্যাখ্যান করে। মা সিদ্ধান্ত নেয়, বিড়ালের সঙ্গে তার কন্যার বিয়ে দেবে। কারণ বিড়াল অপেক্ষাকৃত উন্নত ও শক্তিশালী। বিড়ালও এবিয়েতে সম্মতি দেয়। কিন্তু ধীরে ধীরে ইঁদুর কন্যার মা বিড়ালের আচরণের মধ্য দিয়ে নানা উপলব্ধিতে পৌঁছে। দুঃখজনক নানা ঘটনা ও অসংগতির মধ্য দিয়ে কন্যার পিতা-মাতা বুঝতে পারে স্বজাতির সঙ্গে সম্পর্ক হতে পারে, অন্যত্র নয়। সে পরিপ্রেক্ষিতে কন্যার ভালো লাগা ও ভালোবাসাকেই শেষ পর্যন্ত প্রধানরূপে দেখে। বাংলায় একটি প্রবাদ আছে – বন্যেরা বনে সুন্দর, শিশুরা মাতৃক্রোড়ে। যার যার স্বস্থানেই সে অনন্য। স্বজাতির সঙ্গে সম্পর্কই মূল। এভাবে নৈতিক জ্ঞান-তাৎপর্য ও বিশ্লেষণের মধ্য দিয়ে ঘটনা এগিয়ে চলে। পরের প্রদর্শিত অন্য নাট্যটি লু হুয়া মার্স (Lu Hua Marsh)। এতে অদূরদর্শীর পরিণতি ব্যাখ্যাত। এটি মিং ডাইনেস্টির হু হুয়া মার্সের চরিত্রভিত্তিক ধ্রুপদী কাহিনি-আশ্রিত। কীভাবে ইয়ো (Wu) রাজ্যের জেনারেল কর্তৃক ঝু উকে (Zhou yu) অদূরদর্শিতায় পরাজিত এবং রাজ্য থেকে বিতাড়িত হতে হয়েছিল। রাজ্যের প্রধান কৌশলবিদ বা কূটনীতিজ্ঞ সু ঝি লিয়ংয়ের (Zhu Ge Liang) ধারণামতে, রাজা ঝু উ সম্ভবত লু হুয়া মার্সের আশ্রয়ে যাবে, সে পরিপ্রেক্ষিতে যোদ্ধা জ্যাংকে (Zhang) পাঠায়। এভাবে পাতানো ফাঁদ, কূটকৌশল, অদূরদর্শিতার পরিণাম নানা মাত্রিকতায় এ নাট্য কাহিনিতে উপস্থাপিত। মূলত দুটো নাট্যের মধ্য দিয়ে মরালিটি বা নৈতিকতার মানুষিক উদ্ভাস ও মানবিক প্রয়োগই মূল উপাদানে পরিগণিত। নাট্য দুটোর উপস্থাপনে সবচেয়ে আকর্ষণীয় প্রকাশের সর্বজনীনতা। ভিন্ন ভাষার ব্যবহারে বাংলা ভাষাভাষীর কাছে কাহিনি বুঝতে কোনো সমস্যা হয়নি। ফিজিক্যাল মুভমেন্ট এমন সুপরিকল্পিত ও সুসামঞ্জস্য ছিল যে, ভাষাটাই প্রায় প্রাণহীন। ফিজিক্যাল মুভমেন্টের মধ্য দিয়ে কাহিনি চমৎকারভাবে পরিস্ফুট। চীন ও জাপানের সমসাময়িক নাট্যগুলোর মধ্যে ঐতিহ্যবাহী রীতি ও দার্শনিক ভাষ্যের প্রাধান্যই বেশি দেখা যায়। বাংলাদেশের শিল্পকলা একাডেমীর জাপানি নাট্য একশত বস্তা চাল এক অনন্যসাধারণ দৃষ্টান্ত। এ নাট্যটি চীনের নাট্যাঙ্গিক ‘ওপেরা’ উপস্থাপন নিরিখে উপস্থাপিত। সম্প্রতি চীনে
উত্তর-আধুনিক নাট্যচিন্তায় বেশ কিছু ফিজিক্যাল মুভমেন্ট বা অভিব্যক্তিক সর্বজনীনতার মধ্য দিয়ে নাট্য প্রকাশের প্রয়াস দেখা যায়। বর্তমান বিশ্বে আলোচিত ‘Crossing Boundaries’ শীর্যক পোস্ট-মডার্ন পরিবেশনায় দেহের ভাষাকে ভিত্তি করে মাল্টিডাইমেনশনালি, প্রযুক্তিনির্ভর আন্তর্জাতিক পরিবেশনা লক্ষ করা যায়।
নাট্যকার ও শিল্প-উপদেষ্টা চুয়া সু পং (Chua Soo Pong)  মন্তব্য করেন – ‘… (in the globalised world). Pop culture and information technology changed the mind-set and life style of people and people travel and migrate idea great volume and with great speed. Traditional art form evolved over hundreds of years is an anchor of belonging. But young people are losing touch with them thus losing their cultural roots…. Daughter mouse’s marriage is created especially for the young audience’.
২ জুন, ২০১২ তারিখে জাতীয় নাট্যশালায় প্রদর্শিত হয় ভারতের সন্দর্ভ নাট্যদলের প্রযোজনা বোষ্টমী। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছোটগল্পভিত্তিক নাট্য বোষ্টমী। নাটক – জোলান মুখোপাধ্যায়, নির্দেশনা – সৌমিত্র বসু। এ নাট্যে কোনোরূপ উপস্থাপন নিরীক্ষা লক্ষ করা যায়নি। অত্যন্ত সাদামাটা, অনেকাংশে রিয়ালিস্টিক সেটের মাধ্যমে বোষ্টমীর বিকাশ ও মানসিক দ্বন্দ্ব দেখানো হয়েছে। ফ্ল্যাশব্যাক স্টাইলে অতীত ঘটনা নাটকের দৃশ্যের মধ্য দিয়ে উপস্থাপিত হয়েছে। প্রয়োগ-কৌশলও গতানুগতিক। তবে বোষ্টমীর মানসিক পরিবর্তন অংশটুকু অত্যন্ত অনবদ্য ও নান্দনিক। নাট্য প্রসঙ্গে নির্দেশক সৌমিত্র বসু বলেন, ‘রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্প তাঁর মতো। আমি মূলত বোষ্টমীর ভেতরের আবেগটাকে ধরবার বা তুলে আনতে চেয়েছি। বাইরেরটা বড় নয়, ভেতরটাই বড়। আমার নাটকে চিরকালীন বোষ্টমীর আবেগ-অনুভূতিই মুখ্য করতে চেয়েছি। তাই প্রয়োগগত জায়গায় হয়তো প্রথাগত।’
৩ জুন, রোববার, শেষ দিনে জাতীয় নাট্যশালায় প্রদর্শিত হয় সংযুক্ত আরব আমিরাত-প্রযোজিত নাট্য দ্য পিয়ানিস্ট। এ নাট্যটিও একক অভিনয়ের নাটক। এবারের নাট্যোৎসবের মধ্যে সম্ভবত সবচেয়ে বেশি আকর্ষণীয়, উপভোগ্য, শৈল্পিক, চেতনার সম্প্রসারণকারী বা চিন্তন উদ্রেককারী প্রযোজনা দ্য পিয়ানিস্ট। আধুনিক শিল্প-সাহিত্য ধারায় ‘নারীবাদ’ খ্যাত শিল্প বৈশিষ্ট্যে প্রত্যুজ্জ্বল ও চিন্তনজাত নাট্য উত্তর-আধুনিক নাট্য বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত। এ নাট্যের প্রতিটি ভঙ্গি ও মুহূর্তই একেকটি ইমেজ হিসেবে সৃষ্টি হয়েছে। আরব বিশ্বের একটি সংসারের একজন নারীর জীবনের স্বপ্ন, চাওয়া-পাওয়া, প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি, পূর্ণতা-অপূর্ণতা অত্যন্ত মানবিক আবেগ ও নৈর্ব্যক্তিক-শৈল্পিক প্রকাশে অনবদ্য নাট্যটি। মিডিয়া নাট্যের মতো শুধু মনোজাগতিক বিশ্লেষণে সীমাবদ্ধ নয় এ-নাট্য। দ্য পিয়ানিস্ট নাট্যে নারীর মনোদর্শন থেকে শুরু করে ব্যক্তি, সমাজ, সভ্যতার রীতি-রীতি, আচার-প্রথা, আচরণ, সর্বোপরি নারী-চরিত্রের আত্মদ্বন্দ্ব ও অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে সামগ্রিক সমাজবাস্তবতা ব্যাখ্যাত। রচনা – ড. মিনহা আবদুল্লাহ, নির্দেশনা – লতিফা আহরারি। প্রযোজনা করেছে ফুজাইরা কালচার অ্যান্ড মিডিয়া অথরিটি। নাট্যটি কাব্যিক গঠন, উপস্থাপন, নৃত্য, সংগীত ও অভিব্যক্তিক নৈর্ব্যক্তিকতায় মাল্টিডাইমেনশনালি নারীর মনোজগতের নিরিখে সমাজবাস্তবতার প্রকাশ। আরব সমাজের নারী-পুরুষের সম্পর্ক, নারীর অবদমন, চাওয়া-পাওয়া নানা মাত্রিকতায় বিধৃত। নাট্যটি গ্রিস, লেবানন, পোল্যান্ড, সুদানসহ নানা দেশের নানা উৎসবে প্রদর্শিত হয়েছে। নাট্যের ভাষা ছিল প্রধানত আরবি, কিন্তু নারী মুক্তিচেতনার পরিপ্রেক্ষিতে কিছু বাংলা শব্দও ব্যবহৃত হয়েছে। এক সংসারী নারীর শৈল্পিক স্বপ্ন, স্বামীর সঙ্গে সম্পর্ক, জীবনের উত্থান-পতন, ঘাত-প্রতিঘাত ইত্যাদি নারীত্বের মানবিক বিষয়াদি ব্যক্ত হয়েছে নাট্যে। অভিনয়শিল্পী হচ্ছেন মরোক্কোর লতিফা আহরারি। একক অভিনয়ে নাট্যটি উপস্থাপিত। দর্শক যখন মঞ্চে প্রবেশ করে তখন দেখা যায়, সায়াক্লোমার সামনে একজন গৃহী নারী ক্রমাগত হাঁটাহাঁটি করছে। ঘণ্টাধ্বনির সঙ্গে সঙ্গেই অভিনয়শিল্পী মঞ্চমধ্যে আগমন করেন। আত্মকথক-অঙ্গভঙ্গি, সংগীত, আবহের মধ্য নিয়ে নারীত্বের মানবিক  আবেগ বিধৃত চমৎকারিত্বের নিরিখে ঘটনা আবর্তিত। এ নাট্যে মাল্টিডাইমেনশনালি আবহসংগীত ব্যবহার করা হয়েছে। মঞ্চের ডান পাশে আয়নার সাজেশন বা নৈর্ব্যক্তিকতা, মঞ্চের বাঁপাশে সংগীত পরিবেশন প্যাডকে স্বামীর সিম্বলিক ব্লেজার দিয়ে জড়ানো বা ঢাকা। মঞ্চমধ্যে গৃহ অভ্যন্তরণ ও গৃহবন্দি নারীটির জীবনযাপন, জীবনসাধনা ও প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির নৈর্ব্যক্তিক সাজেশন। সমস্ত নাট্যটি অত্যন্ত ইমেজবহুল ও ভাবব্যঞ্জক। নাট্যের শুরুতে এ গৃহবন্দি উচ্চাকাক্সক্ষী নারীর নানা ঘটন-বর্ণনা নৈর্ব্যক্তিক গাথার মধ্য দিয়ে সমাপ্তি পর্যন্ত আবর্তিত। নাট্যের শেষে এ-নারীর মুক্তি কামনা, ঐকান্তিকতা ও মুক্তিলাভের মধ্য দিয়ে নাট্যের পরিণতি ঘটে।
নাট্যটির মধ্যে নারীবাদী চিন্তন পরিস্ফুট। নারীবাদ বর্তমান বিশ্বের জ্ঞানতাত্ত্বিক একটি ডিসকোর্স। নারীকে বিভিন্ন ধর্ম, দর্শন ও সমাজ নানাভাবে, নানা উপায় ও প্রকারান্তে বিশ্লেষণ করেছে। কিছু ধর্ম নারীকে পাপের মূল হিসেবে কল্পনা করে অত্যাচার-নিপীড়ন করেছে, কিছু ধর্মদর্শন নারীকে পুরুষের সম-অধিকার দিয়েছে, আবার কিছু দর্শন নারীকে প্রকৃতি হিসেবে কল্পনা করেছে। আদিম সমাজ থেকে শুরু করে বর্তমান জীবনবাস্তবতায় একটি চিন্তন বিষয় হিসেবে স্বীকৃত। নারী, নারীত্ব ও নারীর অধিকার-অবস্থান প্রভৃতি বিষয় নিয়ে সতেরো শতক থেকে আলাদা একটি চিন্তন হিসেবে স্থান পেয়েছে। যা হোক, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তীকালে থেকে নারী-পুরুষের অবস্থান-অধিকারসহ নানা বিষয় নিয়ে এ জ্ঞানকাণ্ড আলাদাভাবে আলোচিত। এ প্রযোজনাটির মধ্যেও নারীর অবস্থান-অধিকার, প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির যোগসূত্র পাওয়া যায়। এ উপস্থাপনায় কোনো কাহিনিবিন্যাসকে ভিত্তি করেনি। একজন নারীর গৃহীত্ব-স্বপ্ন-প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির মধ্য দিয়ে উপস্থাপনাটি গতিশীল। আইটিআই প্রকাশিত বুকলেটে উল্লেখ – The play the Pianist uses theatre, poetry, dance and music to express the multi-coloured images of our life. It is a parable of the condition of a woman in the Arab world, giving a perspective idea of the Arab society, the role of religion and the relationship between men and women’.
উত্তর-আধুনিক ধারণাটি কোনো কালপর্বিক নয়। এ পরিবেশনটি আরব সমাজজীবন যাত্রার মহাকাব্যিক বিস্তরণ থেকে ক্ষুদ্র সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম উপাখ্যান বা বিশেষে সামগ্রিকতার প্রকাশ করেছে। কোনো কাহিনিবিন্যাসের নিরিখে এনাট্য মূল্যায়ন সম্ভবপর নয়। ইমেজ বা অভিব্যক্তিভিত্তিক চিত্রণবৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণই প্রধান। এ উত্তর-আধুনিক ধারণায় শিল্পীর সত্যের কোনো একক অস্তিত্বের সন্ধান পাওয়া যায় না বা একটি নারীর মনোজাগতিক জীবনচিন্তনের ভিত্তিতেই ওই সমাজের সম্পূর্ণ ধারণাও সত্য কিনা তা বিবেচ্য। তবে এ আংশিক সত্যতার মধ্য দিয়ে সমগ্রতার একটি সত্যের আভাস পাওয়া যায়। ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যিক এ শিল্পস্বপ্নচারী নারীর দুঃখ-গাথা অত্যন্ত মানবীয় ও হৃদয়কে স্পর্শ করে। জীবনের মৌল উপাদান, চাহিদা ও যুক্তিশীলতাকেও লক্ষ করা গেছে। কোনো জীবনবোধই সংশয়ের বাইরে নয়। আরবীয় এ-নারীর অন্তচেতনার অবয়ব সমস্ত দর্শককে না ভাবিয়ে পারে না। এ নাট্য প্রতিটি দর্শকই তাঁর নিজস্ব জীবনবোধ থেকে আলাদা অবয়বে বিশ্লেষণ করতে বাধ্য। শিল্পী লতিফা আহরারির উপস্থাপনক্রিয়াটি দর্শকের সঙ্গে চিন্তনের একটি যোগসূত্র স্থাপন করেছে। ছোট ছোট অভিব্যক্তির মধ্য দিয়ে একেকটি আলাদা বিস্তর চিন্তনের সুযোগ সৃষ্টি করেছে। এ উপস্থাপনে এক নারীর চিন্তনধারায় বিশ্বের সমস্ত নারীচেতনার মধ্যকার একটি ইন্টাররিয়ালিটি লক্ষ করা গেছে, যা আসলে প্রত্যেকেই পরস্পর-প্রভাবিত। এ নারীই যে অবদমিত সমস্ত নারীর প্রতীক। উত্তর-আধুনিক চিন্তা যেমন একটি মুক্ত মাধ্যম সেরূপ সব মাধ্যম এমনটি আয়রনি, ম্যাটাফিজিক্স ও হাইপার সাবজেস্টিভিটিকেও আভাসিত করে তোলে। দ্য পিয়ানিস্ট নাট্যে  নৈর্ব্যক্তিক, সুসংহত ও ঐক্যবদ্ধ শৈল্পিক মাত্রায় বিভিন্ন বিষয়ের প্রকাশ লক্ষ করা গেছে। একক পরিবেশনার মধ্য দিয়ে ঐক্যবদ্ধ, বর্ণনা, সংলাপ, অভিব্যক্তি, নৈর্ব্যক্তিকতা, অবৈক্তিক চিত্র, ভাব বা ভাষা ইমেজ উপস্থাপিত হয়েছে, যা সমাজজীবন ও মূল্যবোধকে উপস্থাপন করে। সবকিছুর সমন্বিত গতি একরৈখিক। এটি নারীত্বের জায়গা থেকে বহুমাত্রিক ও অন্তর্গত ঐক্য প্রকাশে অনন্যসাধারণ প্রযোজনা। প্রতিটি মুহূর্তেই সৃষ্টি হয়েছে একেকটি ইমেজ, যার মধ্য দিয়ে প্রতিফলিত হয়েছে ব্যক্তি, সমাজ, বাস্তবতা, জীবনচিন্তন তথা সমগ্রতা। উত্তর-আধুনিক নাট্যচিন্তায় দর্শকের উপলব্ধি বা ভূমিকাও বিবেচ্য বিষয়। এ নাট্যকে ‘থিয়েটার’ বলার চেয়ে পারফরম্যান্স বলাটাই অধিকতর যুক্তিযুক্ত। একটি নারীর অন্তরৈখিক চেতনার প্রকাশের ভিত্তিতে যেন সমগ্র নারীত্বের প্রতীকেই পরিগণিত হয়ে উঠেছে। গানের প্যাডের ওপর স্বামীর ব্লেজার দিয়ে থাকা যেমন একটি বিশেষ ইমেজ বা বিষয় প্রকাশ করে আবার তেমনি যখন একক অভিনয়ে সে ব্লেজারের পকেটে হাত দিয়ে নিজের দেহে হাত রেখে একক উক্তির মধ্য দিয়ে স্বামী-স্ত্রী সম্পর্কের স্বরূপ প্রকাশ করে তখন হয়ে ওঠে সর্বজনীন। বুকলেটে উল্লেখ – ‘The monodrama is developed as a fresco of scenes, as a message for tolerance of peace, celebrating life and its humanistic. এ নাট্যে অ্যারাবিয়ান এক নারীর আশা-আকাক্সক্ষার উপলব্ধ বাস্তবতার মধ্য দিয়ে মানবিক সত্য প্রকাশ ও সমাজবাস্তবতা উদ্ভাসিত।
দ্য পিয়ানিস্ট নাট্যের মূল্যায়নে নাসির উদ্দীন ইউসুফ বলেন, ‘এ নাট্যের ‘ইমেজ’ আমাকে সবচেয়ে বেশি তাড়িত করেছে। ‘The image is created music of your physical, body language, vocal, and also thought and facts. And you have created your own theatre language…. Very nice performance, her dream, her love, her passion, relationship with husband and aspirations for freedom and aspiration struggle for woman… overall Arabic society…’.
সমাপ্তি দিবস ৩ জুন, ২০১২ তারিখে এক্সপেরিমেন্টাল থিয়েটারে প্রদর্শিত হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটকল্যা বিভাগ-প্রযোজিত ভেলুয়া। এটি ঐতিহ্যবাহী বাংলা নাট্যধারায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশনা। পূর্ববঙ্গ গীতিকার ভেলুয়াসুন্দরীর কাহিনি অবলম্বনে প্রযোজনা ভেলুয়া। নাট্যটির নির্দেশনা দিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগের শিক্ষক সাইদুর রহমান লিপন। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ১৯২৩ সালে চন্দ্রকুমার দে-র মাধ্যমে ময়মনসিংহ অঞ্চল থেকে সংগৃহীত কিছু পালা নিয়ে ড. দীনেশচন্দ্র সেনের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় মৈমনসিংহ গীতিকা, ১৯২৬ সালে পূর্ববঙ্গ গীতিকা। আশ্চর্য যে, বিংশ শতাব্দীর বাংলা অঞ্চলের প্রচলিত এ-আখ্যান পরিবেশনাকে বাংলা সাহিত্য-শিল্পের ইতিহাসে মধ্যযুগ (১২০০-১৮০০) অধ্যায়ে অবজ্ঞাবাদী ‘ব্যালেড’ টার্মে পরিচিত। কালানুক্রমিক ১৮০০ থেকে আধুনিক যুগের সৃষ্ট ইতিহাস সৃষ্টি হলেও ১৯২৩ বা ১৯২৬ সালের সমসাময়িক সাহিত্য-শিল্প কীভাবে মধ্যযুগে অধ্যায়ে পঠিত বা বিবেচিত হয় বা হতে পারে। সেই পরিপ্রেক্ষিতে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগে’র ইতিহাসচেতনা, প্রযোজনা ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগের কমলারানীর সাগরদিঘী, বেহুলার ভাসান, সং ভং চং, সীতার বনবাস প্রযোজনা অন্যতম মাইলফলক। আইটিআই উৎসবের সমাপনী দিবসে শিল্পকলা একাডেমীর এক্সপেরিমেন্টাল হলে ঐতিহ্যবাহী নাট্যের ভেলুয়া নাট্যটি প্রদর্শিত হয়। ভেলুয়া নাট্যটি একধরনের নিরীক্ষা। প্রচলিত প্রসেনিয়াম মঞ্চবিন্যাসের মধ্যেই দর্শকের সঙ্গে যোগাযোগীয় জায়গা থেকে বাঙালি সংস্কৃতির চারদিকের খোলা মঞ্চের আবহ সৃষ্টি। উপস্থাপন, দোহার বিন্যাস নিরীক্ষা প্রসংশনীয়।
ভেলুয়ার কাহিনিতে দেখা যায় – সওদাগরপুত্র আমির সমুদ্র যাত্রাপথে শাপলা বন্দরে তার কালাধর ডিঙা ভেড়ায়। আশ্চর্যজনক মনুষ্যভাষী কবুতর দেখে মুগ্ধ হয়ে শিকার করে। এ কবুতর ছিল ভেলুয়া সুন্দরীর সাত ভাইয়ের। ক্ষুব্ধ সাত ভাই কবুতর শিকারের অপরাধে আমির সওদাগরকে বন্দি করে। ঘটনাক্রমে আত্মীয়তার পরিচয় প্রকাশ পায়। পছন্দ, প্রেম, পরিণতিতে আমির সওদাগরের সঙ্গে ভেলুয়া সুন্দরীর বিয়ে হয়। নববধূ সুন্দরী ভেলুয়াকে নিয়ে নিজ বাড়িতে ফিরে আসে আমির সওদাগর। কিন্তু আমির সওদাগরের বোন কুটনী বিভলা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারে না। কূটজাল-পিতৃ আবেগে আমিরকে আবার সওদাগরিতে যেতে বাধ্য করে। কিন্তু নব্য প্রেমে দিশেহারা আমির রাত্রে ফেরে এবং ভেলুয়ার সঙ্গ নিয়ে সূর্যোদয়ের পূর্বে ফিরে যায়। সকালবেলা কুটনী বিভলা ভেলুয়া সম্পর্কে নানা দুর্নাম রটনা করতে থাকে। ঘটনাক্রমে ভেলুয়ার অসহায়ত্বের সুযোগে ভোলাই সওদাগর লুটে নেয় ভেলুয়াকে। ভোলাইকে নানাভাবে ভুলিয়ে রেখে ভেলুয়া স্বামী আমিরের সন্ধান ও অপেক্ষা করতে থাকে। আমির বাড়ি ফিরে ভেলুয়ার মৃত্যুর কথা শুনে সংসারবিবাগী সাধুত্বের পথ বেছে নেয়। ঘটনাক্রমে সাক্ষাৎ হয় আমির-ভেলুয়ার। ভেলুয়ার কাছে সব শুনে ভোলার কাছ থেকে ভেলুয়াকে উদ্ধারের জন্য যুদ্ধে লিপ্ত হয়। এ ঘটনায় ভোলা আক্রোশে ভেলুয়ার সতীত্ব নাশ করতে গেলে ভেলুয়া কোনো উপায়ান্তর না দেখে বিষপানে আত্মহত্যা করে। এভাবেই ঘটনা এগিয়ে যায়।
ভেলুয়া নাট্য প্রযোজনা বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে ঐতিহ্যবাহী বাংলা নাট্যের তুলনামূলক পর্যালোচনায় দেখা যায় – বাংলার ঐতিহ্যবাহী নাট্যরীতির বৈশিষ্ট্যগুলোর মধ্যে মঞ্চ আসরকেন্দ্রিক। চারদিকে দর্শক বসত এবং মাঝখানে সংঘটিত হতো নাট্যক্রিয়া। ভেলুয়া নাট্যটি ঐতিহ্যবাহী নাট্য আঙ্গিকের একধরনের সমসাময়িক নিরীক্ষা। ঐতিহ্যবাহী বাংলা নাট্যে বর্ণনামূলক আখ্যান, নৃত্য, গীতম অভিনয় পরিবেশনা শিল্পের সর্বত্রই ছিল বলে সেলিম আল দীন প্রামাণিকভাবে তুলে ধরেন। সেই পরিপ্রেক্ষিতে দুশো বছরের মধ্যখণ্ডন না থাকলে আধুনিক বাংলা নাট্য কেমন হতো সে-পরিপ্রেক্ষিতে সেলিম আল দীনের নাট্য রচনাগুলো তাঁর নিরীক্ষা। ভেলুয়া উপস্থাপনের মধ্যেও আঙ্গিকগত নানা নিরীক্ষা লক্ষ করা গেছে। পরিবেশনাটি নৃত্য-গীত-অভিনয় ও উক্তি-প্রত্যুক্তি নিরিখে অদ্বৈত। বাংলা অভিনয়রীতির ক্ষেত্রে ঐতিহ্যবাহী বাংলা অভিনয়রীতিও ছিল বর্ণনাধর্মী। পাশ্চাত্যের চরিত্রাভিনয়ের মতো একই চরিত্রমোহে আবদ্ধ না থেকে আসরে উপস্থিত দর্শকের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে বর্ণনার সঙ্গে সঙ্গে অভিনয় করেন। বাংলা নাট্যরীতিতে একজন অভিনেতা একই সময়ে বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেন। পাশ্চাত্যের সংলাপের মতো ঐতিহ্যবাহী বাংলা নাট্যে সংলাপনির্ভরতা নেই। এখানে কাহিনি বা ঘটনা বর্ণনার উক্তি-প্রত্যুক্তিই প্রধান। গায়েন বা বর্ণনাকারী কখনো সরাসরি চরিত্রের সঙ্গে উক্তি-প্রত্যুক্তি করেন, আবার কখনো দোহার বা সহযোগীর সঙ্গেও উক্তি-প্রত্যুক্তি করেন। কাহিনি বিন্যাস বা বৃত্তরীতিতে নানা রকমের বৃত্ত ঐতিহ্যবাহী বাংলা নাট্যে দেখা যায়। এতে প্রথমে বন্দনা থাকে, পরে নৃত্য-গীত সহযোগে কাহিনি উপস্থাপিত হয়।
বাংলা নাট্যে একই সঙ্গে বর্ণনা, গান, নৃত্য, অভিনয়, কথা সবকিছুই এ নাট্যে একীভূত বা অদ্বৈত থাকে বলে সেলিম আল দীন দ্বৈতাদ্বৈতবাদী শিল্প বলে উল্লেখ করে থাকেন। সেলিম আল দীন দীর্ঘ পরিশ্রম ও গবেষণা দ্বারা বাঙালির নিজস্ব শিল্পবৈশিষ্ট্য তুলে ধরেছেন। নাসির উদ্দীন বাচ্চু ঢাকা থিয়েটারের মাধ্যমে তা প্রয়োগিক ও উপস্থাপনীয় পর্যায়ে নিয়ে গেছেন। সৈয়দ জামিল আহমেদের তত্ত্বচিন্তা ও প্রায়োগিক নিরীক্ষা বাংলা নাট্য শিখন পর্যায় ও বিশ্বপরিচিতি স্থানে নিয়ে গেছেন।
নির্দেশনা প্রসঙ্গে সাইদুর রহমান লিপন স্যুভেনিরে উল্লেখ করেন, ‘পূর্ববঙ্গ গীতিকার প্রতœজগৎ থেকে প্রাপ্ত ভেলুয়া সুন্দরীর আখ্যান আমাদের এই প্রযোজনায় আত্তীকৃত হয়েছে সংলাপের প্রাধান্যে। তথাপি বিশ্লেষণী বর্ণনা, গীত ও কাব্যের সমাহার এই সংশ্লেষিত নাট্যটির নতুন ব্যাখ্যান রচনায় রেখেছে নানামাত্রিক ভূমিকা। শিকার, বিবাহ, সংসার, বাণিজ্য, অতঃপর বিবাগী আমিরের জীবনের নশ্বরতার যে-সত্য উত্থাপিত হয় ভেলুয়ার মরণকে ঘিরে সেখানে আদিপাঠে ভেলুয়া অসুখে মারা যায়। এই প্রযোজনায় ভেলুয়া এক দুষ্কৃতকারী পুরুষের বাণিজ্য ভোগ-লিপ্সার খপ্পর থেকে জিয়ানোর জন্য অবশেষে বিষপানে মুক্তির পথ খোঁজে। ভেলুয়ার এই স্বেচ্ছাকৃত হনন প্রমাণ করে প্রেম অতীব মহৎ। প্রেমের এই ‘শুদ্ধরূপ’ দেহকে এক পবিত্র সত্তা হিসেবে প্রতীয়মান করে। বাঙালি বিবাহিতা নারীর এই প্রেম ‘পতির’ প্রতি নিবেদিত। আর পতি একাগ্র সাধনায় স্ত্রীব্রতী। এখানে তৃতীয় পুরুষের আবির্ভাব বর্তমান সভ্যতার বাণিজ্যকেন্দ্রিক পণ্য-ভোগবেসাতির সত্যকেই মূর্ত করে।… ভালোবাসার নৈতিকতায় দীপ্যমান এই আখ্যান মিশ্ররীতিতে প্রযোজিত। পালা পরিবেশনের আসর এখানে প্রেম ও অপ্রেমের দ্বান্দ্বিক পটভূমিতে প্রসেনিয়াম আয়তন অতিক্রমী এক পরিসরে পরিণত হলেও দর্শকের সঙ্গে অভিনেতার এক মুখোমুখি কথনের, মিথস্ক্রিয়া ভূমিতল নির্মাণ করে।’
২০১২ সালের আইটিআই বাংলাদেশ কেন্দ্রের উৎসবে প্রদর্শিত হয় থিয়েটার নাট্যদলের পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়। ২৭ মে, জাতীয় নাট্যশালায় উদ্বোধনী অনুষ্ঠান ও এ-নাট্যটি প্রদর্শনের মধ্য দিয়েই এ-বছরের উৎসব আরম্ভ হয়। নাট্যটির রচনা – সৈয়দ শামসুল হক, নির্দেশনা – আবদুল্লাহ আল মামুন। নবরূপায়ণ – সুদীপ চক্রবর্তী। ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে গ্রামীণ পটভূমিকায় কাব্যিক ব্যঞ্জনায় বিধৃত এ-নাট্য। ১৯৭৬ সঙ্গে থিয়েটার নাট্যদল এ-নাট্যটি প্রথম প্রযোজনা করে। প্রসেনিয়াম স্টাইলে এ-নাট্য উপস্থাপিত। ইতোমধ্যে এ-নাট্যটির শতাধিক প্রদর্শনী হয়েছে। বাংলার গ্রামীণ জীবন ব্যবস্থায় পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায় একটি রূপক শব্দ। একধরনের ভাবব্যঞ্জক শাব্দিক অনুসরণে অনুকৃত নামকরণ। মূলত ১৯৭১ সালে স্বাধীনতাযুদ্ধের পটভূমিকায় পাকিস্তানি বাহিনীর নৃশংসতা, ধর্ষণ, হত্যা, গ্রামীণ মোড়লের ভূমিকা, রাজাকারদের কর্ম, মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিরোধ চেতনার পরিপ্রেক্ষিতে মানবীয় আখ্যান। নাট্যটির স্যুভেনিরে উল্লেখ – ‘…আমাদের গৌরবোজ্জ্বল স্বাধীনতা সংগ্রামের রক্তবর্ণ আলেখ্য পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়। বাংলাদেশের নিরীহ, সরল ও সবল মানুষগুলো স্বাধীনতার জন্য অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছে আর এই সংগ্রামী মানুষকে ঔপনিবেশিক শক্তির অনুচররা প্রতিহত করার জন্য গোপন যড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে। এ যুদ্ধে বিশ্বাসঘাতক শুধু তার স্বজনকে হারায়নি, হারিয়েছে মানুষের বিশ্বাস এবং নিজের জীবন। হাজার হাজার মুক্তিসেনার রণজয়ী পায়ের আওয়াজ বয়ে নিয়ে এলো আমাদের স্বাধীনতার সংবাদ। লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত হলো আমাদের লাল সবুজ পতাকা। এ নাটকে কেবল রাজনৈতিক মুক্তি নয়, কুসংস্কার ও ধর্মান্ধতা থেকে মুক্তির মতো বৃহত্তর মুক্তি বলা হয়েছে।’
৩০ মে, জাতীয় নাট্যশালায় প্রদর্শিত হয় ‘দেশ নাটকে’র অরক্ষিতা। মহাভারতের শুক্রাচার্যের মন্ত্র হারানো কাহিনিকে অবলম্বন করে গড়ে উঠেছে নাট্য অরক্ষিতা। রচনা মাহবুব লীলেন, নির্দেশনায় ইশরাত নিশাত। অরক্ষিতা নাট্যের স্যুভেনিরে নাট্যের কাহিনিবিন্যাসে উল্লেখ –  দুপক্ষের বাহুতে সমান শক্তি না থাকলে শান্তিচুক্তি হয় না; হয় একপক্ষে দাসত্বের দলিল… এ অমোঘ সত্য উপলব্ধির পর বঙ্গদ্বীপের শক্তিবহরে সংযোজিত হন আচার্য শুক্র; যিনি মহামন্ত্র মৃতসঞ্জীবনীর জোরে নিহত সৈনিকদের আবার বাঁচিয়ে তোলার ক্ষমতা রাখেন। বঙ্গদ্বীপ আর শুক্রশক্তি মিলে গড়ে ওঠে অক্ষয় এক প্রতিরক্ষাব্যূহ; কিন্তু মাদকাসক্তি আর কন্যাøেহে হিতাহিতজ্ঞানশূন্য সমরবিদ শুক্রাচার্য এক উন্নাসিক ব্রাহ্মণ… শুক্রকন্যা দেবযানীর প্রেম আর শুক্রের প্রশ্রয়ে একদিন বঙ্গদ্বীপের প্রতিরক্ষাসূত্র চুরি করে নিয়ে যায় শত্র“সন্তান কচ। অস্ত্র হাতে প্রতিরোধ করে শুক্রশিষ্য বৃত্ত; নিহত হয় জনযোদ্ধা জয়দীপ। অবশেষে নিজেদের অস্ত্র শত্র“র হাতে ব্যবহৃত হওয়ার পথ রুদ্ধ করতে অরক্ষিত দেশের রাজকন্যা শর্মিষ্ঠাকে বিসর্জন দিতে হয় প্রাণ…’
অরক্ষিতা নাট্য সম্পর্কে নাট্যকার বলেন, ‘হাজার চারেক বছর আগে তাজিকিস্তানে যে দুটো জাতিকে আর্য সেনাপতি ইন্দ্র উচ্ছেদ করেন; শদুয়েক বছর পর তারই একটা; পশুরজনের স্পিতামা গোত্রে জন্ম নিয়ে আর্যবিরোধী দ্বীপায়নদেব যুদ্ধ শুরু হয় মহাভারতের শুক্রাচার্য…। মৃতদেহে প্রাণদানের ক্ষমতাসম্পন্ন শুক্রের ছিল বিবেচনাহীন কন্যাøেহ আর মাদকাসক্তি; যার সুযোগে শত্র“সন্তান কচ চুরি করে শুক্রাচার্যের ব্রহ্মাস্ত্র আর দ্বীপায়নদের সার্বভৌমত্বের প্রতীক মৃতসঞ্জীবনী মন্ত্র…। নির্দেশক ইসরাত নিশাত বলেন, ‘সকল দলের মতোই আমাদের আছে সীমাবদ্ধতা, না পারাকে ‘পারি’র সঙ্গে মেলাতে দলের প্রতিটি কর্মী পরিশ্রম করেছে। নাটকটির বিভিন্নমুখী বিস্তারের সম্ভাবনা ছিল, তবে পাণ্ডুলিপির পথ ধরেই নির্দেশনায়ও একরৈখিক ধারা বজায় রাখতে চেয়েছি। নাটকটি ধারা সরল কিন্তু চমকপ্রদ বাঁকধারী; নির্দেশনাও তাই সরল সৌন্দর্যে থেকে গল্পের বাঁকা পথগুলো নাট্যে উপস্থাপন করার প্রয়াস।’
১ জুন, শুক্রবার এক্সপেরিমেন্টাল থিয়েটারে প্রদর্শিত হয় হাজার বছরের বাংলা সংস্কৃতির লোকায়ত বিশ্বাস-আশ্রিত বিষয়কেন্দ্রিক নাট্য দমের মাদার। বাংলাদেশের সংস্কৃতি হাজার বছরের ঐতিহ্যমণ্ডিত ও সুসমৃদ্ধ। প্রাচীন জনপদকেন্দ্রিক সভ্যতার বিকাশ ধারায় আজকের বাংলার মানস, জীবনবোধ-সংস্কৃতি। সাধারণত সংস্কৃতিকে তিনটি ভাগে বিন্যস্ত করা হয়ে থাকে। ১. দৃশ্যমান সংস্কৃতি (Marerial culture), ২. অনুষ্ঠানমূলক সংস্কৃতি (Functional culture), ৩. অতীন্দ্রিয় সংস্কৃতি (Spiritual culture) (ওয়াকিল আহম্মেদ, বাংলার লোকসংস্কৃতি গতিধারা, ঢাকা, ২০০১, পৃ ২৪)। বাংলার সংস্কৃতির ভিত্তিমূল বৌদ্ধ, সনাতন ও ইসলাম ধর্মীয় সংশ্লেষণাত্মক প্রক্রিয়ায়। ব্রিটিশ উপনিবেশ শাসনের আধিপত্য, তাদের সৃষ্ট ছাপাকৃত ডকুমেন্ট ও সৃষ্ট ইতিহাসে বাংলার সাহিত্য-শিল্প-সংস্কৃতির অনেক কিছুই উপেক্ষিত। তথ্য ও উপাত্তনির্ভর ইতিহাস তাদের আধিপত্যবাদমূলক। প্রসঙ্গত যে, বাংলাদেশের নারায়ণগঞ্জের ‘সোনারগাঁও’কেন্দ্রিক ইসলামী বিশাল ও সুসমৃদ্ধ শিক্ষা-সাহিত্য ধারার একটি উপাত্ত বা নিদর্শনও নেই। উল্লেখ্য, সে-সময়ের বিখ্যাত গ্রন্থ তাসাওফ আজকে কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবে না। ইউরোপিয়ান স্থাপিত প্রেসের ডকুমেন্টভিত্তিক তাদের আচার-কর্ম এসবই পঠিত বিষয়। শুধু সোনারগাঁ নয়, এরূপ হাজার হাজার জ্ঞান, তত্ত্ব বিষয় আজো উপেক্ষিত ও বিলুপ্তপ্রায়। যা হোক, বাঙালি সংস্কৃতিতে পীরবাদ দশম-দ্বাদশ শতাব্দী থেকে বাংলার সমাজে প্রচলিত ও জনপ্রিয়। গ্রামীণ জীবনব্যবস্থায় পীরবাদকে আশ্রয় করে সৃষ্টি হয়েছে হাজারো সাহিত্য, শিল্প ও পরিবেশনা। ইউরোপিয়ান কেন্দ্র-প্রান্ত বিভাজনে বাংলার সমাজজীবন এখনো দ্বিখণ্ডিত, দ্বন্দ্বজাত, শিক্ষা-রুচি-আচার পৃথকীকৃত। ইসলামী সুলতান-মুঘল আমলেই বাংলায় সৃষ্টি হয়েছে সুসমৃদ্ধ সাহিত্য-শিল্প। শ্রীকৃষ্ণকীর্তন, মঙ্গলকাব্য ধারা, নাথধারাসহ হাজারো সনাতনী সংস্কারভিত্তিক শিল্প-সাহিত্য এ-সময়েই ও ইসলামী রাজা-বাদশাহর পৃষ্ঠপোষকতায় সৃষ্টি হয়েছে। যা হোক, বর্তমান বাংলার প্রান্তিক বা গ্রামীণ পর্যায়ে মরমি পীরবাদের অস্তিত্ব বিদ্যমান। যেসব জনপ্রিয় পীরের নাম পাওয়া যায় তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য – সত্যপীর, গাজীপীর, মনাইপীর, বদরপীর, খোয়াজখিজির, মানিকপীর, সোনাপীর, মাদারপীর, জঙ্গলীপীর ইত্যাদি। আবার বাঙালি সমাজজীবনে ইসলাম ও সনাতনী ধর্ম ঐক্যেও এদের পরিচয় মেলে। যেমন – মানিকপীর-গোরক্ষনাথ, মনাইপীর-পাঁচুঠাকুর, লক্ষ্মীবিবি-লক্ষ্মীদেবী, ওলাবিবি-শীতলা ইত্যাদি। বাঙালি সমাজের পীরবাদ ধারায় অন্যতম মাদারপীর। মাদারপীর বাংলার সমাজে স্থানভেদে নানা নামে পরিচিত। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য – ‘মাদার’, ‘জিন্দাপীর’, ‘শাহ্ মাদার’, ‘দম মাদার’ ইত্যাদি। মাদারপীরের কাহিনি নিয়েও নানা কিংবদন্তি রয়েছে। তবে এ-মাদারপীর পুুরুষ-স্ত্রী কোনোটাই নন। তাঁর আহার-বিহার-নিদ্রা কোনোটাই নেই। পীরের শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে এক পরীক্ষায় মাদারপীর বাতাসে মিলে গিয়ে নিঃশ্বাস বা দমে আশ্রয় নেন। দম বা নিঃশ্বাসে বাস করেন বলে অনেকেই তাঁকে ‘দমের মাদার’ বলে থাকেন। মাদারপীরের ভক্তদের মধ্যে নানা আচারের পরিচয় পাওয়া যায় – মাদারের বাঁশ তোলা, মাদারের শিরনি, মাদারের লুট পোড়ানো, মাদারের বাঁশ বিয়া, নল্যা ডাকা প্রভৃতি। গবেষক সাইমন জাকারিয়া বর্তমান প্রচলিত তিনটি পালায় মাদারপীরের পরিবেশনার সন্ধান দেন। নাট্যম রেপারটরির প্রযোজনা মাদারপীরের এক ভক্ত সম্প্রদায়ের জীবনবাস্তবতাভিত্তিক দমের মাদার। রচনা – সাধনা আহম্মেদ, নাট্যটির শিল্পনির্দেশনা – জুনায়েদ ইউসুফ।
দমের মাদার নাট্যের নির্দেশক ড. আইরিন পারভিন লোপা বলেন, ‘বাংলার হাজার বছরের সংস্কৃতির সবচাইতে সমৃদ্ধ আঙ্গিক বাংলার লোকপালাসমূহ, যা মূলত লোকমুখে প্রচার ও প্রসার লাভ করেছে হাজার বছর ধরে। তেমনি একটি পালা মাদারপীরের আখ্যান, যা এখনো বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে গীত হয়ে থাকে। এক্ষেত্রে ‘গীত হয়ে থাকে’ বলার কারণ লোকপালা মূলত গীতি পরিবেশনার রীতিতে উপস্থাপন করা হয়ে থাকে। মাদারপীরের এক ভক্ত সম্প্রদায়কে ঘিরে আমাদের আলোচ্য নাটকের গল্প গড়ে উঠেছে। আংশিক সত্য একটি ঘটনা নিয়ে নাট্যকার লোক আঙ্গিক রীতিতে নাটকটি রচনা করেছেন, কিন্তু পরিবেশনার ক্ষেত্রে আমি লোক আঙ্গিক থেকে সরে এসেছি কারণ এ-নাটকটি মঞ্চায়নে আমি নাগরিক পরিবেশনরীতিকেও অবলম্বন করতে চেয়েছি। তাই লোকনাটক পরিবেশনে মঞ্চ, যেখানে নিরাভরণ থাকে এখানে তা নেই শুধু তাই নয় অভিনয়রীতির ক্ষেত্রেও বিষয়টি প্রযোজ্য। দমের মাদার নাটকের নাট্যকার জীবনের একটি নিগূঢ় সত্যকে অনুসন্ধান করেছেন, তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে নির্দেশক হিসেবে আমি সকল কুশীলবকে নিয়ে নাটকের প্রতিটি ছত্রে সেই পরমের সন্ধান করেছি। ‘তারে দেখি না বলেই তার তরে সকল সাধনা’ জীবাত্মার সঙ্গে পরমাত্মার মহামিলনের যে দ্যোতনা তারই তরঙ্গে তরঙ্গায়িত হতে চেয়েছি বারবার।’
এ উৎসবে দুটি নৃত্যনাট্য প্রদর্শিত হয়। ২৮ মে, ২০১২ তারিখে ‘সাধনা’ পরিবেশনায় জাতীয় নাট্যশালায় প্রদর্শিত হয় নৃত্যনাট্য মায়ার খেলা এবং ৩১ মে, পল্লবী ডান্স সেন্টারের পরিবেশনায় জাতীয় নাট্যশালায় প্রদর্শিত হয় নৃত্যনাট্য শাপমোচন।
এছাড়া এবারের আইটিআই নাট্যোৎসবে শূন্যনের লাল জমিন, চট্টগ্রামের গণায়নের মুক্তধারা, নারায়ণগঞ্জের ঐকিক থিয়েটারের হাড় তরঙ্গ, আরণ্যক নাট্যদলের কবর, ঢাকা পদাতিকের আপদ, ইউনিভার্সেল থিয়েটারের মহাত্মা, নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়ের অচলায়তন, বাঙলা থিয়েটারের ডিসট্যান্ট নেয়ার, লোকনাট্যদলের বৈকুণ্ঠের খাতা, মহাকাল নাট্যদলের নিশিমন বিসর্জন, দ্যাশ বাংলা থিয়েটারের কঙ্কাল ও সাড়ে তিন হাত, শব্দ নাট্যচর্চা কেন্দ্রের রাইফেল প্রদর্শিত হয়। এছাড়া নির্দেশকদের সঙ্গে ‘দর্শকের মুখোমুখি’ শিরোনামে আলোচনা অনুষ্ঠান ও চীনের নাট্য বিশেষজ্ঞের তত্ত্বাবধানে ওয়ার্কশপ অনুষ্ঠিত হয়।
১ জুন, ২০১২ তারিখ শুক্রবার বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমীর ষষ্ঠতলার সেমিনারকক্ষে দিনব্যাপী বিদেশি নাট্যতাত্ত্বিক ও বাংলাদেশের নাট্যবেত্তাগণ, গবেষক, তরুণ নাট্যকর্মীদের মধ্যে নানা বিষয়কেন্দ্রিক মিথস্ক্রিয়ামূলক আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। সেমিনার তিনটি অধিবেশনে বিন্যস্ত ছিল। প্রথম অধিবেশনে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. আফসার আহম্মেদ ‘Exploring Theatres in Asia : A Comparative Study’ শিরোনামে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। সভাপতিত্ব করেন অধ্যাপক আবদুস সেলিম। ওই প্রবন্ধে এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে চীন, জাপান, ভারত ও বাংলাদেশের নাট্যসংস্কৃতির যোগসূত্রতা, সাংস্কৃতিক পরিচয় তুলে ধরেন। হাজার বছরের বাংলা নাট্য সংস্কৃতির মূল উপাদান, উপকরণভিত্তিক সমসাময়িক বাংলাদেশের নাট্যচর্চার সঙ্গে তুলনামূলকভাবে এশিয়ার অন্যান্য দেশে নাট্য আঙ্গিক-নাট্যচর্চার চিত্র উপস্থাপন করেন। দ্বিতীয় অধিবেশনে দুটি প্রবন্ধ উপস্থাপিত হয়। সিঙ্গাপুরের ড. চ্যু সু পং – ‘Some thoughts on Asian Theatre in the globalised world’ প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। দ্বিতীয় ইন্দোনেশিয়ান অধ্যাপক পুডেনশিয়া ‘Traditional Theatre in Indonesia’ শিরোনামে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশের নাট্যব্যক্তিত্ব আতাউর রহমান। দুপুরের বিরতির পর তৃতীয় অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। এতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগের অধ্যাপক ড. ইস্রাফিল শাহিন ‘Theatre Artist’s Approach to Organic Research : Sharing the Roles of Exception’ শিরোনামের প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। এতে সভাপতিত্ব করেন বাংলা একাডেমীর মহাপরিচালক দেশজ সংস্কৃতি বিশেষজ্ঞ শামসুজ্জামান খান।
বাংলাদেশে সাধারণত গ্র“প থিয়েটার ফেডারেশন ও শিল্পকলা একাডেমী প্রায় প্রতিবছরই নানা শিরোনামে নাট্যোৎসবের আয়োজন করে থাকে। আবার দলীয় পর্যায় থেকেও নাট্যোৎসব অনুষ্ঠিত হয়। আইটিআই বাংলাদেশ কেন্দ্র ১৯৯১ সাল থেকে প্রতি দুবছর পরপর উৎসব সেমিনারের আয়োজন করে। সেন্টার ফর এশিয়ান থিয়েটার (সিএটি) ধ্রুপদী সংস্কৃত নাট্যোৎসব ও সিম্পোজিয়ামসহ বিভিন্ন সময় নানা শিরোনামে নাট্যোৎসবের আয়োজন করে থাকে। স্মরণকালে ২০১০ সালে সেন্টার ফর এশিয়ান থিয়েটারের (সিএটি) ‘আন্তর্জাতিক ইবসেন নাট্যোৎসব’ শিরোনামে দর্শককে ভিন্ন ভাষাভাষী অসংখ্য নাট্যসংস্কৃতির যে-অভিজ্ঞতার সুযোগ করে দিয়েছিল তা বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে তাৎপর্যবহুল। কারণ একটি উৎসবের মধ্যে এত ভিন্ন ভিন্ন নাট্যসংস্কৃতিদর্শনের সুযোগ সৃষ্টি অত্যন্ত শ্রম-ব্যয় ও নিষ্ঠা সাপেক্ষ। এবারের আইটিআই নাট্যোৎসবে হাজার বছরের বাংলা নাট্যের ধারাবাহিকতায় আধুনিক উপস্থাপিত বাংলা নাট্যের প্রযোজনার সংখ্যা তুলনামূলক কম পরিলক্ষিত হয়েছে। যা হোক, বিদেশি নাট্যদর্শনের অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ সৃষ্টির জন্য আইটিআই নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। বিশ্বনাট্য অভিজ্ঞতার আলোকে সংশ্লেষণাত্মক প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশের নাট্যচর্চা আরো বেগমান, উন্নত, সমৃদ্ধ, বিশ্বনেতৃত্বমুখী হোক – এটা আমাদের সবার কাম্য।

২ thoughts on “আইটিআই থিয়েটার উৎসব-২০১২