আনন্দগাথা

লেখক: ছন্দা বিশ্বাস

পার্থ ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টের সামনে এসে গাড়িটা দাঁড়াল। পেছনের সিটে বসা বিজ্ঞানী ড. রবার্ট স্মিথ মৃদু স্বরে একবার জানতে চাইলেন, এটাই কি দুই নম্বর গেট?

গাড়ির চালক রজার ঘাড় নেড়ে তার কথার উত্তর দিলো। রবার্ট ফুল সিস্নভ সোয়েটারের হাতাটা একটু টেনে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে নিজের মনেই বললেন, আমরা তো তাহলে অনেকটা আগেই চলে এসেছি।

পেছনের ডিকি থেকে ফোল্ডিং হুইল চেয়ারটা বের করে গাড়ির পাশে রেখে রবার্টকে আস্তে আস্তে গাড়ি থেকে নামিয়ে হুইল চেয়ারে বসিয়ে দিলো রজার। রবার্টের ক্যারি অন লাগেজ হিসেবে আনা ছোট ব্যাগটা তার কোলের ওপর রেখে দিলো। এই ব্যাগের ভেতরে রবার্টের প্রয়োজনীয় সবকিছু রয়েছে।

এর ভেতরেই রবার্টকে দেখে তাঁর প্রিয়জনরা প্রায় ছুটে চলে এলেন তার কাছে। মেয়ে নিনিশা এগিয়ে এসে বাবাকে জড়িয়ে ধরলেন। অন্য ছেলেমেয়েরাও তাঁর পাশে এসে দাঁড়ালেন। এয়ারপোর্টের এন্ট্রান্স গেটের সামনে খুব বেশি সময় এভাবে গাড়ি দাঁড় করানোর নিয়ম নেই, রজার তাই রবার্টের কাছ থেকে বিদায় নিতে এলো। রবার্টের সঙ্গে তাঁর বহুদিনের যোগাযোগ। শুধু গাড়ির চালক বললে ভুল হবে, একসময় তাঁর প্রায় সর্বক্ষণের সঙ্গী ছিল বলা যেতে পারে। সকাল ৮টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত সে রবার্টের ফার্মে থাকত। গাড়িতে করে যখন-যেখানে দরকার পড়ত সেখানে রবার্টকে নিয়ে যেত।

রিটায়ারমেন্টের পর থেকে প্রায় নববই বছর বয়স পর্যন্ত বিজ্ঞানী  বাইরে কোথাও ঘুরতে গেলে নিজেই ড্রাইভ করতেন। কখনো তিনি ড্রাইভার রাখার প্রয়োজন বোধ করেননি। তিনি একদিকে যেমন কাজপাগল মানুষ, অন্যদিকে গভীর সৌন্দর্যপিয়াসী। সময় পেলেই চলে যেতেন গ্রেট ব্যারিয়ার রিফ, রেড ক্লিফ, কেপবায়রন এবং কাকাডু ন্যাশনাল পার্কে। অবসর সময়ে সমুদ্রের ধারে ঘুরে বেড়াতেন। ভালোবাসতেন তাসমানিয়া সি বিচে হাঁটতে। সময় কাটাতেন সিডনি হার্ভারে। প্রিয় শহর পার্থের প্রতিটি অলিগলি তাঁর হাতের তালুর রেখার মতোই পরিচিত। স্ত্রী-বিয়োগের পর তিনি একাই বেরিয়ে পড়তেন। পৃথিবীর বিভিন্ন মনোমুগ্ধকর বিচে তিনি সময় কাটাতে ভালোবাসতেন।

কিন্তু নববই বছর বয়সের পর তাঁর ড্রাইভিং লাইসেন্স যখন বাতিল করা হলো, তখন তিনি বেশ হতাশ এবং মানসিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়লেন। গাড়ি ছাড়া এ-বয়সে তাঁর চলবে কী করে। বলা হলো এরপর তিনি আর কখনো স্টিয়ারিংয়ে হাত রেখে পথ চলতে পারবেন না। এটাই নাকি তাঁর দেশের নিয়ম। ট্রাফিক রুলকে তো তিনি অগ্রাহ্য করতে পারেন না। যদিও তিনি সে-সময়ে যথেষ্ট সমর্থ একজন মানুষ।

পার্থের মাথার ওপরের আকাশটা আজ উজ্জ্বল রোদে ঝলমল করছে। নীল আকাশের বুকে রাশিকৃত দুধ-সাদা মেঘের দল রাজহাঁসের মতো সাঁতরে বেড়াচ্ছে। এতো উজ্জ্বলতার ভেতরে নিনিশার মুখের ওপরে আজ ধূসর প্রলেপ লক্ষ করল রজার। আশপাশের যাত্রীসব যে যার মতো লাগেজ নিয়ে গেটের দিকে এগিয়ে চলেছে। নিনিশাও বাবার হুইল চেয়ার ধরে দাঁড়িয়ে আছে এখন। রজার বিষাদঘন চোখে রবার্টের দিকে তাকিয়ে বিদায় নিল।

রবার্ট সামান্য হেসে প্রথাসিদ্ধ ভঙ্গিতে হাতটা উঁচু করলেন।

নিনিশা হুইল চেয়ার ঠেলতে ঠেলতে ভেতরে প্রবেশ করলেন। তাঁর বয়স এখন প্রায় সত্তরের কাছাকাছি। কিন্তু তাঁকে দেখলে বোঝার উপায় নেই। বাবার মতোই তিনিও নীরোগ দেহের অধিকারিণী।

আজ এয়ারপোর্টে রবার্টের সঙ্গে দেখে করতে এসেছিলেন তাঁর দুই ছেলে আর চারজন নাতি-নাতনি। সিডনি, মেলবোর্ন এবং আমস্টারডাম থেকে গতকাল রাতে বড় মেয়ে এবং আরো তিনজন নাতি তাঁকে উইশ করেছে। তাঁর এই সিদ্ধান্ত এবং জীবনের এই জার্নিটা যাতে সহজ এবং মসৃণ হয় সেই কামনা করেছেন তাঁরা। কয়েকদিন ধরে ফোনে তাঁর সঙ্গে কথা বলেছেন তাঁর অগণিত ছাত্রছাত্রী, পরিচিতজন এবং নিকট-পরিজনরা। রবার্টের সঙ্গে কথা বলতে বলতে অনেকে কেঁদেও ফেলেছেন।

রবার্ট কিন্তু সবার সঙ্গে হেসে হেসেই কথা বলেছেন। সবার কথার উত্তর দিয়েছেন। বরাবরই তিনি একজন দৃঢ়চেতা, মিশুক এবং অমায়িক স্বভাবের মানুষ।  

 সিকিউরিটি চেকিংয়ের আগে পর্যন্ত নিনিশা বাবার সঙ্গেই ছিল। বিশেষ পারমিশন নিয়েই সে এসেছে আজ। বিজ্ঞানী রবার্টকে চেনে না বা জানে না এমন লোকের সংখ্যা খুবই কম। গত এক বছর ধরে তাঁকে নিয়ে দেশজুড়ে বিতর্কের ঝড় বয়ে গেছে। কেউ কেউ তাঁর সিদ্ধান্তকে উন্মাদ মস্তিষ্কের বিকার বলেছেন, আবার দেশ-বিদেশের অনেকেই তাঁকে স্বাগত জানিয়েছেন। তাঁকে নানানভাবে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন।

আজো বাইরে প্রচুর সাংবাদিক, আলোকচিত্রীরা ভিড় করেছিলেন। তাঁর দেশ ছেড়ে যাওয়ার, তাঁর শেষ সাক্ষাৎকারের ফটো তুললেন। হুইল চেয়ারের চারপাশে একেবারে হুমড়ি খেয়ে পড়ছিলেন তাঁরা। একেবারে নাছোড়বান্দা হয়ে বিজ্ঞানীকে কিছু প্রশ্ন করার আগেই নিনিশা বাবাকে নিয়ে ভেতরে ঢুকে গেলেন। তিনি চান না বাবাকে এ-সময় আর কেউ বিরক্ত করুক। আর যা বলার সে তো অনেকবার বলা হয়ে গেছে। নতুন করে তাঁর আর কিছুই বলার নেই। আর তো হাতেগোনা কিছুটা মুহূর্ত। এ-সময়টুকু তিনি একলা বাবার সঙ্গেই কাটাতে চান।

দুই

সিকিউরিটি চেকিং পর্যন্ত নিনিশা লাউঞ্জে অপেক্ষা করলেন। খানিকটা দূর থেকে দেখতে পাচ্ছিলেন বাবাকে। হুইল চেয়ারে বসে আছেন তাঁর জন্মদাতা। মাথাটা সামনের দিকে কিছুটা ঝুঁকে পড়েছে। গায়ে কুয়াশারঙের একটা সোয়েটার। কয়েক বছর আগে বাবাকে উপহার দিয়েছিলেন নিনিশা। বাবার একশ বছরের জন্মদিনের উপহার। বাবার প্রচুর পোশাক থাকা সত্ত্বেও বাবা এই সোয়েটারটাই বেশিরভাগ সময়ে গায়ে দিতেন।

নিনিশা ছাড়া রবার্টের অন্য প্রিয়জনরা সবাই এয়ারপোর্টে দেখা করেই ফিরে গেছেন। শুধু নিনিশা একা বসে আছেন বাবাকে শেষ বিদায় জানাতে। ইন্টারন্যাশনাল ফ্লাইটে ট্রাভেল করার নানা হ্যাপা। কাস্টমস চেকিং, সিকিউরিটি চেকিং ইত্যাদি হাজারো কাজেই সময় কেটে যায়। নিনিশা হিসাব করে দেখলেন প্রায় চার ঘণ্টা কেটে গেছে তাঁর এখানে। এই চার ঘণ্টায় নিনিশা ফিরে গেছেন তাঁর শৈশবে, তাঁর বাল্যে এবং কিশোরীবেলার সেই দিনগুলোতে। হাজার কাজে ব্যস্ত বাবা কিন্তু সময় করে নিনিশার খবর নিতেন। বিদেশে গেলে তাঁর জন্য নানা সব কিউরিও আনতেন। নিনিশার শোকেসে এখনো সেগুলো সযতনে রাখা আছে।   

 কাস্টমস চেকিংয়ে সবার আগে রবার্টকে ছেড়ে দেওয়া হলো। কাচের দেয়ালের এপাশে নিনিশা আর ওপাশে বাবা। দুজন দুজনাকে দেখতে পাচ্ছেন; কিন্তু কাছে যাওয়ার উপায় নেই। নিনিশা যেন আজ ছোট্ট মেয়েটি হয়ে গেছেন। সেই ছেলেবেলায় পার্কে বেড়াতে গিয়ে বাবাকে ধরার জন্য যেভাবে ব্যাকুল হতো আজ তাঁর সেরকম অনুভূতি হচ্ছে। বাবার সঙ্গে যেতে চেয়েছিলেন সুইজারল্যান্ড। কিন্তু বাবা রাজি হননি। বলেছিলেন, শেষের এই জার্নিটুকু তিনি একাই পাড়ি দিতে চান। নিনিশাও জানেন ব্যাসেলে বাবাকে ছেড়ে আসতে তাঁকে অনেক বেশি কষ্ট পেতে হবে।

নিনিশা ঘড়ি দেখলেন। এবার সত্যি সত্যি বাবাকে বিদায় জানাতে হবে। বাবাও ঘড়ি দেখছেন আর উশখুশ করছেন। ভাবতে ভাবতেই হুইল চেয়ারসহ একজন এয়ার হোস্টেজ ঢুকে গেলেন গেট দিয়ে। তারপর রবার্টকে সেই চেয়ারের ওপর বসিয়ে দিলেন। বিজ্ঞানী শুধু একটিবার মেয়ের দিকে তাকিয়ে হাতটা ঈষৎ উঁচু করলেন, তারপর সামনের দিকে এগিয়ে গেলেন।

নিনিশার চোখের কোণ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল। যেভাবে রাতের কান্না জমা থাকে গাছের পাতায়, ঘাসের মাথায়, আলশের কোণে, তারপর একসময়ে শিশিরবিন্দু হয়ে টুপটাপ ঝরে পড়ে নিঃশব্দে সেইভাবে। 

জানালার ধারে বসেছিলেন মি. রবার্ট। মুগ্ধ দৃষ্টিতে দেখছিলেন তাঁর প্রিয় শহর পার্থকে। আজ যেন অন্যভাবে ধরা দিলো শহরটা তাঁর কাছে। তিনি মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে ছিলেন নীল আকাশটার দিকে। আর কিছুক্ষণ বাদেই তাঁকে তাঁর প্রিয় শহর এবং প্রিয় দেশ ছেড়ে চলে যেতে হবে শেষবারের মতো। তাঁর জন্মভূমি যদিও লন্ডন কিন্তু পাঁচ বছর বয়সে মা-বাবার সঙ্গে তিনি ইংল্যান্ড ছেড়ে অস্ট্রেলিয়া চলে আসেন এবং শেষদিন পর্যন্ত এখানেই ছিলেন। রানওয়েতে অপেক্ষারত বেশকিছু ইন্টারন্যাশনাল ফ্লাইটের দিকে তাকিয়ে ছিলেন রবার্ট। কিছুটা দূরে একটা পেস্নন বাজপাখির মতো ডানায় ভেসে আস্তে আস্তে নামতে লাগল। বিজ্ঞানী ভাবছিলেন জীবনের এই আগমন এবং প্রত্যাগমনের কথা। প্রতিটি মানুষের জীবন এই রানওয়েতে অপেক্ষারত পেস্ননগুলোর মতোই। একটা নির্দিষ্ট সময়ে তাকে ল্যান্ড করতে হয়, তারপর সময় হলে ফিরে যেতে হবে সঠিক ডেস্টিনেশনে। সময়ের কাছে সবাই বন্দি।

রবার্টের জীবনের এই আসা আর যাওয়ার জার্নিটা বড় কম সময় নয়। শতবর্ষ পেরিয়ে গেলেও তিনি নীরোগ এবং সুস্থ দেহের অধিকারী। শরীরে রোগ বলতে তেমন কিছুই নেই। শুধু বার্ধক্যের কারণে কিছুদিন ধরে তিনি হাঁটাচলা করতে পারছিলেন না। কানে হিয়ারিং এইডের সাহায্যে অল্পস্বল্প শুনতে পেলেও তাঁর দৃষ্টিশক্তি ক্রমশ কমে আসছে। রবার্ট বরাবর নিজের কাজ নিজেই করতে ভালোবাসেন। বহু বছর পার্থের লোটাস অ্যাপার্টমেন্টের এ-বস্নকে পঁচিশতলায় তিন হাজার স্কয়ার ফুটের ফ্ল্যাটে তিনি একাই থাকতেন। রিটায়ারমেন্টের দশ বছর বাদে তাঁর পত্নী-বিয়োগ হয়। ছেলেমেয়েরা ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বাস করছে। কর্মসূত্রে তাদের সেখানে কাটাতে হচ্ছে। ছেলেমেয়ে, নাতি-নাতনি নিয়ে তাদের সংসার। বড় মায়ায় ভরা এই সংসার। তাই সেই মায়াজাল কাটিয়ে তারা তাদের বৃদ্ধ বাবাকে সেভাবে দেখার সময় পায় না। ফোনে কথা হয়, ব্যস এটুকুই। একমাত্র নিনিশাই অস্ট্রেলিয়ায় থাকেন বলে কিছুদিন অন্তর এসে বাবাকে দেখে যান। 

রবার্ট অবশ্য এতশত কোনোদিন ভাবেননি। তিনি কাজপাগল মানুষ। সারাটা দিন ইউনিভার্সিটিতে নয়তো ফিল্ডে ফিল্ডেই কাটিয়ে দিয়েছেন জীবনের বেশিরভাগ সময়। দিনে-রাতে যেটুকু সময় পেয়েছেন বই পড়ে আর রিসার্চ ওয়ার্ক করেই কেটে গেছে। ঘুরে বেরিয়েছেন প্রায় গোটা পৃথিবী। জীবনের অধিকাংশ সময়ে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে তিনি তাঁর মূল্যবান বক্তব্য রেখেছেন। জুনিয়র এবং সিনিয়র রিসার্চাররা মুগ্ধ হয়ে শুনেছেন তাঁর কথা। রবার্ট মূলত উদ্ভিদবিদ্যা নিয়ে গবেষণা করলেও তিনি একজন ইকোলজিস্ট, পরিবেশবিদ। ‘বিশ্বের উষ্ণায়ন এবং তার ভবিষ্যৎ’ – এটাই ছিল মূলত তাঁর গবেষণার বিষয়। পরিবেশ নিয়ে তিনি প্রায় একশর বেশি মূল্যবান প্রবন্ধ লিখেছেন। বিজ্ঞানী মহলে সেগুলো বিশেষ প্রশংসা পেয়েছে। সত্তর বছর বয়সে তিনি লিখে ফেললেন ‘ইকোসিস্টেম অব দ্য ওয়ার্ল্ড’। তাঁর বৈজ্ঞানিক কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁকে বিভিন্ন পুরস্কার দেওয়া হয়। তিনি ‘অর্ডার অব অস্ট্রেলিয়া’র সদস্য নির্বাচিত হন।

 একজন এয়ার হোস্টেজ তাঁর সামনের ডেস্কে রেখে গেলেন খাবারের ট্রে। রবার্ট আজ বিজনেস ক্লাসে যাচ্ছেন। সুতরাং তাঁর আদর-আপ্যায়ন তো ইকোনমি ক্লাসের চেয়ে আলাদা হবে। তিনি ট্রেতে রাখা খাবারগুলো খুলে খুলে দেখলেন। দেখলেন তাঁর প্রিয় খাবারগুলো সেখানে রাখা আছে, – চিজ পকৌরা, চিজ কেক, চিপস, একটা ফিশ ফ্রাই আর বস্ন্যাক কফি।

কিছুটা সময়ের জন্য রবার্ট নস্টালজিক হয়ে পড়েছিলেন। জীবনের এই দীর্ঘ যাত্রাপথে কত কিছুই না ঘটে গেছে। কত মধুর স্মৃতিতে ভরা ছিল তাঁর কর্মজীবন। কিন্তু জীবনের শেষ পর্বে এসে যখন তিনি দেখলেন কাছের মানুষেরা আস্তে আস্তে দূরে চলে গেল, একের পর এক বন্ধুবিয়োগ ঘটল, বৃহৎ পৃথিবীটা ক্রমশ সংকীর্ণ হয়ে এলো, বিজ্ঞানী আস্তে আস্তে একা হয়ে গেলেন, ক্রমেই অশক্ত হয়ে পড়লেন। তখন থেকে দুর্বিষহ হয়ে উঠল তাঁর জীবন। তিনি আরো একা হলেন যেদিন তাঁর ড্রাইভিং লাইসেন্স বাতিল করা হলো।  বাইরে ঘুরে বেড়ানোর আর কোনো আনন্দই তাঁর রইল না। একজন ড্রাইভারকে বেশ কয়েক বছর রেখেছিলেন, কিন্তু পরের দিকে খরচ কুলিয়ে উঠতে পারছিলেন না। তার মাইনে দেওয়াটা বেশ বোঝা হয়ে দাঁড়াচ্ছিল। তিনি কার্যত তখন থেকে ঘরে বন্দি অবস্থায় দিন কাটাতে লাগলেন। বই পড়ে যে সময় কাটাবেন সেটাও আর সম্ভব হচ্ছিল না।

গত কয়েক বছর রবার্ট কার্যত ঘরে বন্দি অবস্থায় দিন কাটাচ্ছিলেন। আজকাল নিজেকে জেলখানার কয়েদিদের মতো মনে হয়।  ঘরের দেয়ালগুলো যেন সরে এসে তাঁকে পিষে মারতে চায়। বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়-পরিজন কেউ সেভাবে আসে না তাঁর কাছে। বন্ধুরা তাঁর মতো দীর্ঘায়ু নয়, অনেকে দশ-বারো বছর কি তার আগে আগেই চলে গেছেন এই পৃথিবীর মায়া ছেড়ে। সারাটা দিন ভীষণ অস্থিরতায় কাটে তাঁর। কীভাবে যাপন করবেন এই দীর্ঘ দিন, দীর্ঘ রাত্রি, ভেবে পান না। ভেতরে ভেতরে চরম অস্থির হয়ে ওঠেন। কিচ্ছু ভালো লাগে না তাঁর। কেমন যেন পাগল পাগল লাগে। বিস্বাদ মনে হয়, বিবর্ণ মনে হয় এ-জীবনটাকে। তিনি বুঝতে পারছেন এ-পৃথিবীর কাছ থেকে তাঁর আর কিছু পাওয়ার নেই। তাঁর কিছু দেওয়ার নেই এই জগৎকে। দেওয়া-নেওয়ার পালা সাঙ্গ হয়ে গেছে অনেক আগেই। এখন তিনি রয়ে গেছেন বাতিলের খাতায়। ঝরাপাতার মতোই অপেক্ষায় আছেন কবে খসে পড়বেন জীবন-বৃক্ষ থেকে। তাঁর সামনে এখন রুখুসুখু এক তপ্ত সাহারা।

রবার্ট যেবার একশ বছরে পা দিলেন তাঁর মেয়ে নিনিশা সে-বছর পরিবারের সবাইকে নিয়ে বাবার জন্মদিন উদযাপন করেছেন। বিজ্ঞানী নিজের হাতে কেক কেটেছেন। কিন্তু একটা জিনিস অনুভব করেছেন, ইদানীং তিনি আর কোনো কিছুতেই সেভাবে উৎসাহ পাচ্ছেন না। জীবনের প্রতি কেমন যেন একটা অবহেলা চলে এসেছে। কোনো কিছুই ভালো লাগছে না তাঁর। সঙ্গীহীন এভাবে একা একা বেঁচে থাকার কোনো মানে হয় না। একাকিত্ব যে কতটা ভয়ংকর সেটা তিনি পলে পলে অনুভব করতে লাগলেন। ছেলেমেয়েরা তাঁকে তাদের কাছে নিয়ে যেতে এসেছিলেন; কিন্তু রবার্ট কারো কাছেই থাকতে চান না। এ-শহর ছেড়ে কোথাও গিয়ে থাকতে তাঁর মন চায় না।

তিন

এক্সিট ইন্টারন্যাশনাল থেকে স্বয়ং ডিরেক্টর মিস মিশিলিকা আজ উপস্থিত আছেন ব্যাসেল এয়ারপোর্টে। নির্ধারিত সময়ের বেশ কিছুটা আগেই তিনি চলে এসেছেন। তিনি জানেন বিজ্ঞানী একাই আসছেন অস্ট্রেলিয়া থেকে। সুতরাং তাঁর থাকাটা বেশ জরুরি। তিনি অবশ্য বিজ্ঞানীকে সেকথা আগেই জানিয়ে দিয়েছিলেন, যাতে তিনি নির্ভার এবং চিন্তামুক্ত থাকতে পারেন।

যেদিন থেকে রবার্ট তাঁর সিদ্ধামেত্মর কথা জানিয়েছেন তার পর থেকে নিয়মিত যোগাযোগ রেখে চলেছেন মিশিলিকা। বেশ কয়েক বছর আগে সুইজারল্যান্ডে একটা সেমিনারে অ্যাটেন্ড করতে গিয়ে রবার্টের পরিচয় হয়েছিল এক্সিট ইন্টারন্যাশনালের একজন অ্যাডভাইজারের সঙ্গে। নানা কথার পরিপ্রেক্ষিতে তিনিই রবার্টকে এই ব্যাসেল ক্লিনিকের ঠিকানাটা দিয়েছিলেন। রবার্টের মুখ থেকে যেদিন তাঁর ইচ্ছার কথাটা শুনলেন, তারপর নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন। চিকিৎসকের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। ফরম ভরা থেকে শুরু করে আইনি জটিলতার, চিকিৎসা-সংক্রান্ত যাবতীয় গুরুত্বপূর্ণ কাজ তারাই করে দিয়েছিল। সুতরাং রবার্টের দিক থেকে আর কোনো ঝক্কি রইল না।

এখানেই একদিন তাঁর সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল এক্সিট ইন্টারন্যাশনালের ডিরেক্টর মিস মিশিলিকার সঙ্গে। প্রায় সাড়ে পাঁচ ফুট লম্বা, সুশ্রী, আলাপচারী, বিনয়ী এবং সদাহাস্যময়ী মিশিলিকার কথার চুম্বনে রবার্ট মোহিত এবং আকৃষ্ট হলেন। জীবন সম্পর্কে কত কঠিন কথাগুলো কত স্বচ্ছন্দে এবং অবলীলায় মিশিলিকা বলে যাচ্ছে। স্রোতের অনুকূলে পাল তোলা নৌকার মতোই স্বচ্ছন্দ এবং সাবলীল তাঁর কথাগুলো। মিশিলিকা বলছেন আর জীবন সম্পর্কে উদাসীন, নির্লিপ্ত একজন প্রৌঢ় মুগ্ধ হয়ে তাঁর কথাগুলো শুনছেন।

এয়ারপোর্টে মিশিলিকা এগিয়ে এসে রবার্টের সঙ্গে করমর্দন করলেন। রবার্টের কাছ থেকে পিঠের ব্যাগটা নিয়ে সেটা নিজের কাঁধের একপাশে ঝুলিয়ে নিলেন। তারপর হুইল চেয়ারটা ঠেলতে ঠেলতে এক্সিট গেট দিয়ে বাইরে বেরিয়ে এলেন।

সাংবাদিকদের কাছে কিছুই গোপন থাকে না। কীভাবে যেন তাঁরা খবর পেয়ে গেছেন বিজ্ঞানী রবার্ট আজ ব্যাসেলে আসছেন। সেই কোন কাকভোর থেকে বাইরে অপেক্ষা করছেন। বিজ্ঞানীর অবশ্য এসব ব্যাপারে কোনো হেলদোল নেই। তিনি জীবনে এতো প্রেস কনফারেন্স করেছেন, এত এতবার সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের সম্মুখীন হয়েছেন, তাঁদের তির্যক বাক্যবাণ, ফিচেল-মধুর কটাক্ষ, তিক্ত কষায়িত শেস্নষমিশ্রিত কথায় জারিত হয়েছেন; সুতরাং এখন আর এসব ব্যাপারে তাঁর নতুন কিছু মনে হয় না।

গেট থেকে বাইরে বের হওয়া মাত্র সাংবাদিক এবং আলোকচিত্রীরা তাঁকে ঘিরে ধরলেন। বিজ্ঞানী তাঁদের দিকে মধুর একটা হাসি ছুড়ে দিলেন। শিশুর সারল্যমাখা হাসি। কয়েকজন সাংবাদিক এগিয়ে এসে কিছু বলার চেষ্টা করতেই বিজ্ঞানী তাঁদের জানিয়ে দিলেন আগামীকাল তিনি প্রেস কনফারেন্সে যা বলার বলবেন। সেই মতো তাঁরা অ্যারেঞ্জ করেছেন ব্যাসেল ক্লিনিকের কাছাকাছি ভেন্যুটা। সেখানেই প্রেসের সামনে তিনি অকপটে সব বলবেন। তাঁর হাতে আর বেশি সময় নেই। তাই আগামীকাল রাতটাকেই তিনি বেছে নিলেন।

চার

ব্যাসেলের একটি বিখ্যাত হোটেলে রবার্ট ঠিক সময়ে এসে উপস্থিত হলেন। হুইল চেয়ারে বসে তিনি সবার অভিনন্দন গ্রহণ করলেন। তাঁর মুখের সামনে তখন শতাধিক স্পিকার। সবাই অবাক হয়ে দেখছে একশ পাঁচ বছরের এই মানুষটিকে। একমাথা সাদা চুল, অসংখ্য জ্যামিতিক রেখাঙ্কিত মুখাবয়ব, কপালে গভীর তিনটি ভাঁজ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। কুঞ্চিত চামড়ার কোটরের ভেতরে চোখদুটিকে দেখলে পাখির নীড়ের কথাই মনে পড়ে। যেন ভগ্ন কোনো বাসা, যে-বাসা ছেড়ে পাখি তার ছানাসহ বিদায় নিয়েছে বহুকাল আগেই। গাছের ডালে পড়ে আছে জীর্ণ দুটি বাসা।

সামনের সারিতে বসা একজন সুইস সাংবাদিক রবার্টকে উদ্দেশ করে বললেন, ‘আপনি তো নীরোগ-সুস্থ একজন মানুষ। আপনি কেন এরকম একটা কঠিন সিদ্ধান্ত নিলেন? যারা কঠিন কোনো দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত এবং যন্ত্রণাপীড়িত, তাঁরা জানেন তাঁদের সামনে মৃত্যু নিশ্চিত, তাঁদের ক্ষেত্রে এই সিদ্ধান্ত নেওয়াটা উপযুক্ত বলে মনে হতে পারে। কারণ তাঁরা জানেন এ থেকে পরিত্রাণের আর কোনো পথ নেই। সুতরাং অহেতুক যন্ত্রণা এবং কষ্ট ভোগ করার চেয়ে মৃত্যুই শ্রেয়। কিন্তু আপনি কেন এ সিদ্ধান্ত নিলেন?’ রবার্ট সাংবাদিকের কথাগুলো বেশ মন দিয়ে শুনলেন। এক মিনিটের কম সময় নিলেন উত্তর দিতে। ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি এনে তিনি বললেন, ‘আই ফিল ভেরি রিসেন্টফুল, আই নো হাউ আনস্যাটিস্ফ্যাক্টরি মাই লাইফ ইজ। আনস্যাটিস্ফ্যাক্টরি ইন অলমোস্ট এভরি রেসপেক্ট। দ্য সুনার ইট কামস টু অ্যান এন্ড দ্য বেটার।’

দ্বিতীয়জন জানতে চাইলেন, ‘এটা কি আপনার একার সিদ্ধান্ত, নাকি, – ’

রবার্ট তাঁর প্রশ্ন অসমাপ্ত রেখেই উত্তরে বললেন, ‘ইটস মাই ওন চয়েস।’

এক মিনিট চুপ করে সাংবাদিকের দিকে তাকিয়ে রইলেন, তারপর একটু দম নিয়ে বললেন, ‘মাই ফিলিং ইজ দ্যাট অ্যান ওল্ড পারসন লাইক মাইসেলফ শুড হ্যাভ ফুল সিটিজেনশিপ রাইটস ইনক্লুডিং দ্য রাইট অব অ্যাসিস্টেড সুইসাইড।’

একজন পাশ থেকে বললেন, ‘আপনি কি সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেলেছেন?’

‘ইয়েস। আই নো লঙ্গার ওয়ান্ট টু কন্টিনিউ লাইফ।’

‘কিন্তু কেন? আপনার তো এখনো যাওয়ার সময় হয়নি? মানে আপনি তো এখনো পর্যন্ত সুস্থ আছেন? চিকিৎসকরা বলছেন আপনার যা শারীরিক কন্ডিশন তাতে আপনি এখনো পাঁচ-ছয় বছর দিব্যি হেসেখেলে কাটিয়ে দিতে পারেন। সে-বার্ধক্য এলে দৃষ্টিশক্তি, শ্রবণশক্তি কমে যেতেই পারে, এটাই তো স্বাভাবিক। তাই না? বাস্তবটাকে তো মেনে নিতে হবে। তার জন্য এত তাড়াতাড়ি আত্মহননের পথ বাছাটার ভেতরে কী যুক্তি আছে?’

রবার্ট মাথা নিচু করে সব কথা শুনলেন। তারপর মাথা তুলে সবার দিকে এক নজর দেখে হাসতে হাসতে তাঁর গায়ের জ্যাকেটের চেনটা এক টান দিয়ে খুলে ফেললেন। ভেতরে সাদা রঙের টি-শার্টের দিকে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করালেন।

সবাই দেখল বুকের কাছে কালো কালি দিয়ে বড় বড় করে লেখা আছে ‘রিসেন্টফুল লাইফ’।

‘সত্যি কি আপনি রিসেন্টফুল? আপনি যেভাবে সবার সঙ্গে হেসে হেসে কথা বলেন, আমরা সত্যি মেলাতে পারছি না।’

পাশ থেকে একজন প্রশ্নটা ছুড়ে দিলো।

বিজ্ঞানী একবুক শ্বাস টেনে ছেড়ে দিতে দিতে বললেন, ‘জীবনের এই শেষপর্বে এসে বেশ কয়েকটা বছর আমি ভীষণ একাকিত্বে কাটিয়েছি এবং কাটাচ্ছিও। আমি নিজে একা হাঁটাচলা করতে পারি না, সবসময় অন্যের ওপর নির্ভর করতে হয়। এত পরনির্ভরতা আমার পছন্দ নয়। আমি আজকাল পরিষ্কার করে কানে শুনতে পাই না, চোখেও ঠিকমতো দেখতে পাই না। যে পাখির কলরব শুনতে পায় না, ঝরনার জলের শব্দ, সমুদ্রের ঢেউয়ের গর্জন যার কানে আসে না, তার বেঁচে থাকা অর্থহীন। আমি বই পড়তে ভালোবাসি, অবসর যাপনের জন্য বই আমার শেষ বয়সের সঙ্গী ছিল। আজ আমার চোখ দুটোই আমার সঙ্গে প্রতারণা করছে। আজ আর কাউকে আমার কিছু দেওয়ার নেই। কারো কাছ থেকে কিছুই পাওয়ার নেই। চাওয়া-পাওয়ার হিসাব থেকে ছুটি হয়ে গেছে বহুদিন। সো আই ওয়ান্ট টু এন্ড মাই লাইফ। আই অ্যাম হ্যাপি টু হ্যাভ দ্য চান্স টুমরো টু এন্ড ইট।’

বিজ্ঞানীর শেষ কথাগুলোতে গভীর বিষণ্ণতা ঝরে পড়ল। জ্যোৎস্নাভরা আকাশ ঢেকে গেল মেঘের চাদরে। সবাই হঠাৎ করে নির্বাক হয়ে গেলেন। 

 ‘আপনি নিজের দেশ ছেড়ে এখানে এলেন কেন?’

একজন জুনিয়র সাংবাদিক বোকার মতো তাঁকে প্রশ্নটা করে বসলেন।

রবার্ট এতোটুকু ক্লান্ত না হয়ে জানালেন, ‘আমি খুব দুঃখের সঙ্গে জানাচ্ছি যে, অস্ট্রেলিয়ায় স্বেচ্ছামৃত্যু বৈধ নয়। তাই তো আমাকে এতোটা পথ পাড়ি দিয়ে সুইজারল্যান্ডে আসতে হয়েছে।’

এরপরও সাংবাদিকরা তাঁকে বেশকিছু প্রশ্ন করলেন। তিনি সবার প্রতিটি প্রশ্নের যথাযথ উত্তর দিলেন। একটাই কথা তিনি ঘুরেফিরে বলতে চাইলেন, ‘মাই রিসেন্টফুল লাইফ হ্যাজ নট বিন এনজয়েবল।’

কিছুটা সময় নীরবতায় কেটে গেল। সাংবাদিকরা এর-ওর মুখ চাওয়া-চাওয়ি করলেন। তারপর একজন বলে উঠলেন,
‘ইউথানাশিয়ার খরচ তো শুনেছি সাধারণের ধরাছোঁয়ার বাইরে। এই বিপুল অঙ্কের টাকা আপনি জোগাড় করলেন কোত্থেকে?’

যদিও কথাটা বেশ আপত্তিকর, তবুও রাখলেন একজন।

বিজ্ঞানী বললেন, ‘আমার এ সিদ্ধামেত্মর কথা শুনে দেশে আমার প্রচুর ফ্যান এগিয়ে আসে। প্রায় চারশোজন মিলে কুড়ি হাজার ডলার অর্থসাহায্য করে তারা। আমার এখানে আসার জন্য ফ্লাইটের বিজনেস ক্লাসের টিকিটও কেটে দেয় তারা।’

‘মানে, তাঁরা তাহলে সবাই আপনাকে সাপোর্ট করেছেন?’

 ‘ঠিক তাই। প্রচুর মানুষ আছেন যাঁরা চান, স্বেচ্ছামৃত্যু যাতে আইনি বৈধতা পায়। মানুষের জন্ম যদি আড়ম্বরপূর্ণ হতে পারে তাহলে মৃত্যুর জন্য কেন এতো যন্ত্রণা বইতে হবে? তাকে আহবান জানাতে হবে রাজার মতো। কেন তাকে চোরের মতো নিঃশব্দে আসতে হবে? জন্ম আর মৃত্যু – জীবনের দুই অমোঘ সত্যিটাকে সমানভাবে গ্রহণ করা শিখতে হবে।’

তারপর আস্তে আস্তে বললেন,  ‘আমি ওষ্ঠে আমার মৃত্যুর স্বাদ পেয়েছি। দেখেছি সেই স্বাদ অপার্থিব।’  

 পাঁচ

এয়ারপোর্ট থেকে কুড়ি কিমি পথ ব্যাসেল ক্লিনিক। দুই ধারে ঢেউ খেলানো পাহাড় আর সবুজ সর্ষেক্ষেত। রবার্টের পাশে বসে আছেন মিশিলিকা। তাঁর হাত ধরা আছে রবার্টের হাতে। ব্যাসেল ইউনিভার্সিটির পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় রবার্টের আজ মনে পড়ল ষাট বছর আগের এক স্মৃতি। এর আগেও রবার্ট সুইজারল্যান্ডে বহুবার এসেছেন। বেশ কয়েকবার এই ব্যাসেল ইউনিভার্সিটিতে বক্তৃতা দিয়েছেন। তখন দেশটার বিভিন্ন জায়গায় ঘুরেছেন। মুগ্ধ হয়েছেন এদেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং স্থাপত্য দেখে। বরফে ঢাকা পাহাড়, মিউজিয়াম আর প্রায় পাঁচশো বছরের প্রাচীন এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগ্রহশালা দেখে অবাক হয়েছেন। যেমন মুগ্ধ হয়েছেন রাইন নদীর রূপ আর বনভূমি দেখে, ততোধিক মুগ্ধ হয়েছিলেন সুন্দরী সুইস লেডি অ্যালেনা জুরিকে দেখে। এখানেই সে পোস্ট ডক্টরেট করেছিল। বেশ ঘনিষ্ঠতা হয়েছিল রবার্টের সঙ্গে। মিশিলিকার সঙ্গে তাঁর অদ্ভুত মিল। তাঁর মতোই অ্যামারেল্ড গ্রিন চোখের মণি, ঢেউ খেলানো চুল, পেলব ঠোঁট, গালের দুপাশে গোলাপি আভা, তার এডুকেশন, তার অ্যাপিয়ারেন্স, তার ইন্টেলিজেন্সি বারবার মনে করিয়ে দিলো রবার্টকে।

ব্যাসেলের মূল ভূখণ্ডের প্রায় আশি শতাংশই পাহাড়-নদী আর বনভূমি, বাকি অংশে জনপদ, শস্যক্ষেত্র। বেশ জনবহুল এই শহরটা। গত দুদিন রবার্ট এখানকার একটা হোটেলে উঠেছেন। ক্লিনিক থেকে সামান্য কিছুটা দূরে। মিশিলিকা কাজের ফাঁকে এসে তাঁর সঙ্গে কিছুটা সময় কাটিয়ে গেলেন। গতকাল সাংবাদিক-বৈঠক শেষ করে অনেকটা হালকা লাগছে তাঁর। রাতে সিডেটিভ পিল খেয়ে ঘুমিয়েছিলেন। আজ ঘুম থেকে উঠলেন প্রায় ৮টার দিকে। বেশ ঝরঝরে লাগছে মনটা।

এক্সিট ইন্টারন্যাশনালের কয়েকজন তাঁকে আজ হোটেল থেকে নিতে এসেছেন। রবার্টকে গুডমর্নিং জানিয়ে তাঁর হাতে ধরিয়ে দিলেন একশ পাঁচটি কার্নেশন দিয়ে বানানো বুকে।

রবার্ট বুকের কাছে ধরে রেখেছেন বুকেটা। স্পর্শসুখ অনুভব করছেন মিশিলিকার। গতকাল মিশিলিকার সঙ্গে গোটা শহরটা ঘুরে দেখার সময় কথা প্রসঙ্গে তিনি তাঁর কার্নেশনপ্রিয়তার কথাটা বলেছিলেন। ভাবতে পারেননি মিশিলিকা সেই কথাটা মনে করে আজই তাঁকে পাঠাবেন। বেশকিছু জায়গায় মিশিলিকা তাঁকে ঘুরিয়ে দেখিয়েছেন। তাঁর পছন্দের খাবার খাইয়েছেন। রবার্টের কাছ থেকে তাঁর জীবনের মধুর স্মৃতির কথা শুনেছেন। পাইনের আলস্য জড়ানো ছায়ায় সময় কাটিয়েছেন দুজনে। একশ পাঁচ বছরের এই প্রবীণ ব্যক্তির এই অনুরোধ তিনি কেমন করেই বা ফেলবেন। মিশিলিকা লক্ষ করলেন রবার্টকে বেশ সতেজ এবং প্রাণবন্ত লাগছে। একসময় মিশিলিকার হাতটা নিজের হাতের ভেতরে নিয়ে তিনি মুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে রইলেন।

মিশিলিকা জানতে চাইলেন, ‘কিছু বলবেন?’

রবার্ট মনে মনে বললেন, ‘বড় দেরিতে তোমার সঙ্গে আমার পরিচয় ঘটেছে মিশিলিকা। আমার সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে যদি তোমার সঙ্গে আমার আলাপ হতো আমি হয়তো এই কঠিন সিদ্ধান্তটা নিতে পারতাম না।’

মিশিলিকাকে ছোট্ট একটা অনুরোধ করলেন রবার্ট। তাঁর শেষ অনুরোধ।

কিন্তু কোথায় মিশিলিকা? তাঁর দেরি হচ্ছে কেন এত? রবার্টকে এতটা উদ্বিগ্ন হতে আগে কেউ কখনো দেখেনি। তিনি কিছু সময় অন্তর সিস্টারদের কাছে খোঁজ নিচ্ছেন মিশিলিকার।

একেবারে ছিমছাম পরিপাটি করে রাখা আছে তাঁর কেবিনটি। দুধসাদা বিছানা, বালিশ। মাথার কাছে দেয়ালজোড়া কাচের জানালা। জানালা দিয়ে ঝকঝকে নীল আকাশ আর সাদা মেঘের সন্তরণ দেখা যাচ্ছে। জানালার সামনে ফুলদানিতে রাখা আছে কিছু সতেজ গস্নাডিওলাস আর কার্নেশন। পাশেই একটা সোফা।

সামনে সেন্টার টেবিল। সেখানে রাখা আছে কিছু জার্নাল।

বিজ্ঞানী অল্প সময়ের জন্য বসলেন সোফার ওপরে। জানালা দিয়ে বাইরের দিকে তাকালেন। দূরে একটা গির্জার চূড়া দেখা যাচ্ছে। মনে হচ্ছে আকাশ ফুঁড়ে ঢুকে গেছে সেই চূড়াটি। সাদা মেঘপুঞ্জ আজ যেন আনন্দে ছোটাছুটি করছে। আকাশের বুকে লুটোপুটি খাচ্ছে। তাঁকে আজ বেশ উদ্বিগ্ন দেখাচ্ছে। এতটা উতলা হতে এর আগে তাঁকে কেউ দেখেনি।

 রবার্ট বারবার ফিরে তাকাচ্ছেন কেবিনের দরজার দিকে। একটু আওয়াজ কানে এলেই মনে হচ্ছে, এই বুঝি সে এলো। কিন্তু কার জন্য এই অপেক্ষা?

ডা. মিলোনোভা এগিয়ে এসে রবার্টের কাঁধে হাত রাখলেন। রবার্ট শিশুর মতো আবদার করলেন মিশিলিকা না আসা পর্যন্ত তিনি অপেক্ষা করবেন।

একজন সিস্টার একটা ট্রলি ঠেলতে ঠেলতে নিয়ে এলেন। তাঁর পেছনে আরো কয়েকজন সিস্টার, ব্রাদার আর তিনজন চিকিৎসক এলেন। রবার্ট সোফার ওপরে অনড় রইলেন। যে-মানুষটা এতটা দিন সবার সঙ্গে হেসে হেসে কথা বলেছেন, আলাপ করেছেন, সিস্টারদের কাজে সব রকম সাহায্য করেছেন তাঁকে আজ যেন সম্পূর্ণ অন্য এক মানুষ বলে মনে হচ্ছে। অথচ গতকাল পর্যন্ত তিনি বেশ ভালো মুডেই ছিলেন।

সময় গড়াচ্ছে। এক এক মুহূর্তকে এখন মহামূল্যবান মনে হচ্ছে  তাঁর কাছে। সময়টা যে এতটাই মহার্ঘ এই প্রথম তাঁর মনে হলো। আরো কিছুটা সময় চাইলেন তাঁর চিকিৎসকের কাছে। উপস্থিত সবাই ঘড়ি ধরে অপেক্ষা করছে। রবার্টের মনে ঝড় উঠেছে, সত্যি সে আসবে তো? তার দায়িত্ব শেষ, অতএব সে নাও আসতে পারে। কিন্তু তাঁর অনুরোধ? মিশিলিকা তাঁর শেষ ইচ্ছাটুকুর দাম দেবে না?

ডা. মিলোনোভার অনুরোধে রবার্ট বেডে শুয়ে পড়লেন।

মিশিলিকা অল্প সময়ের ভেতরেই চলে এলেন ব্যাসেল ক্লিনিকে। যেখানে সবাই তাঁর জন্য অপেক্ষা করছেন। সেই একশ দশ
নম্বর কেবিনে ঢুকে গেলেন। তারপর রবার্টের দিকে হাত উঁচু করে বোঝালেন যে তিনি এসে গেছেন, সুতরাং আর কোনো চিন্তা নেই। 

সবাই তাকিয়ে আছেন মিশিলিকার দিকে। মিশিলিকা সোফার ওপরে বসলেন। তারপর তাঁর কাঁধ থেকে নামালেন একটা ব্যাগ। তারপর সেই ব্যাগ থেকে টেনে বের করলেন একটা বাক্স।

সিস্টার এবং ডাক্তাররা দেখছেন মিশিলিকা কী করতে চলেছেন। মিশিলিকা ডা. মিলোনোভাকে বললেন কাজ শুরু করতে।

সিস্টাররা ডক্টরের নির্দেশমতো ট্রে-টাকে এগিয়ে নিয়ে গেলেন রবার্টের কাছে। ডা. মিলোনোভা দুই হাতে গস্নাভস পরে ট্রে থেকে তুলে নিলেন ইনজেকশনের ভায়েলটা। সিস্টার সিরিঞ্জের প্যাকেটটা ট্রে থেকে তুলে ইনজেকশন রেডি করলেন।

রবার্টের দৃষ্টি তখন মিশিলিকার দিকে। তিনি দেখলেন মিশিলিকা সেই বাক্স থেকে বের করলেন একটা সাউন্ড সিস্টেম
বক্স। তারপর সোফার ওপরে সেটা রাখলেন। এগিয়ে গেলেন রবার্টের দিকে। তাঁর হাতে হাত ছোঁয়ালেন, মাথায় হাত বুলিয়ে ফিরে এলেন সোফায়। তারপর তাঁর কোমল হাতে পেস্ন-বাটনটা প্রেস করলেন।

আস্তে আস্তে বেজে উঠল মিউজিক। ঘরময় ছড়িয়ে পড়ল সুর মূর্ছনা – বিটোফেনের নাইন্থ সিম্ফনি, ‘ওড টু দ্য জয়’। আনন্দগাথা।

মিউজিকের সঙ্গে সঙ্গে রবার্টের মুখে দেখা গেল প্রসন্নতা। তিনি চোখ বন্ধ করে তন্ময় হয়ে শুনতে লাগলেন সেই সুর। তারপর বললেন, ‘আই অ্যাম রেডি, ডক্টর।’

চিকিৎসক মিলোনোভা রবার্টের শিরায় পুশ করলেন লিথাল ইনজেকশন। মিশিলিকা দাঁত দিয়ে ঠোঁট চেপে ধরলেন। তারপর ধীরপায়ে কেবিন থেকে বেরিয়ে এলেন।

Leave a Reply

%d bloggers like this: