আনিসুজ্জামানের সাথে দেখা-সাক্ষাতের স্মৃতি

লেখক: হামিদা হোসেন

অনুবাদ : আশফাক স্বপ্ন

ষাটের দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বসার কক্ষ ছিল সে-সময়কার ঘটনাবলি, ইতিহাস আর রাজনীতি নিয়ে সারগর্ভ ও সুবেদী আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। বঙ্গ বা বাংলা নিয়ে আলোচনা তখন তুঙ্গে – এই অঞ্চলের সমসাময়িক অস্বস্তি আর রাজনৈতিক প্রতিরোধ, এর সাংস্কৃতিক আর সাহিত্যিক পুনর্জাগরণ ছিল আলোচনার বিষয়। এসব আলাপ-আলোচনার মধ্যমণি ছিলেন অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক। তাঁকে ঘিরে থাকতেন তরুণ শিক্ষকরা, এমনকি ছাত্ররাও। এখানেই আমি প্রথম বাংলাদেশকে চিনি-জানি এবং পরিচিত হই একঝাঁক গবেষক-পণ্ডিতের সঙ্গে, যাঁরা সেসময়ের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের চালিকাশক্তি ছিলেন।
বাংলাদেশের ইতিহাসে ষাটের দশক এক ঘটনাবহুল, গতিময় সময়। তখন অর্থনীতিবিদরা বৈষম্য নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন; রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা অনুসন্ধান করছেন কী করে কেন্দ্রীভূত ক্ষমতা রাষ্ট্রকে নাগরিক থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে; বিভিন্ন সাময়িকীতে সেই সময়ের সাহিত্য চর্চা ও সাহিত্য-সমালোচনা নিয়ে লেখা প্রকাশিত হচ্ছে। অধ্যাপক রাজ্জাকের বাড়িতে, কি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের বসার ঘরে, কিংবা টিচার্স ক্লাবে – যেখানেই হোক, এসব প্রাণবন্ত আলোচনায় আনিস ছিল অপরিহার্য। এমন আলোচনাচক্রেই আনিসের সঙ্গে আমার প্রথম আলাপ এবং বিভিন্ন বিষয়ে তার মতামত শোনা। সাহিত্য, বিশেষ করে বাংলা সাহিত্য, নিয়ে উত্তপ্ত আলোচনায় তার গভীর প্রজ্ঞাময় অভিমত যখন সে ধীর-স্থিরভাবে প্রকাশ করত, তখন সেখানে একটি শান্তিময় পরিবেশের সৃষ্টি হতো।
পরিচয়ের বছর-দুই পর আনিস আমার বাংলা শিক্ষক হয়ে গেল। আমি ১৯৬৪ সালে ঢাকায় পৌঁছার পরপরই বুঝতে পারলাম, বাংলা বলতে আর বুঝতে না পারলে আমি বেশিদূর এগোতে পারব না। বাংলা না জানলে আমাকে চুপ করে থাকতে হবে। ফলে সালমা সোবহানের সঙ্গে আমি বাংলা একাডেমিতে অবাংলাভাষীদের জন্য প্রাথমিক বাংলা শিক্ষার ছয় মাসের কোর্সে ভর্তি হলাম। আমাদের পরম সৌভাগ্য যে আমরা তিনজন প্রসিদ্ধ শিক্ষক পেয়েছিলাম; তাঁদের শুধু যে ভাষায় ব্যুৎপত্তি ছিল তা-ই নয়, সাহিত্যেও ছিল ঈর্ষণীয় দখল। তাঁদের মধ্যে প্রখ্যাত নাট্যকার ড. মুনীর চৌধুরীর পাঠদান আমরা মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনতাম। এদিকে ড. মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী ভাষা-ব্যবহারের নিয়মকানুনের ব্যাপারে ছিলেন খুব কড়া। আর ড. আনিসুজ্জামান আমাদের রবীন্দ্রনাথের ‘ছেলেবেলা’র সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়। রবীন্দ্রনাথের ছেলেবেলার আনন্দদায়ক বিবরণ আরো আকর্ষণীয় হয়ে উঠত আনিসুজ্জামানের পড়ানোর প্রসাদগুণে। পড়ানোর সময় আনিস ওই রচনার সমসাময়িক রচনা সম্পর্কে বলত এবং অন্যান্য ভাষার উদাহরণ দিত।
বাংলা একাডেমির ওই শিক্ষা ছিল আনন্দপূর্ণ, কারণ দিনশেষে কোনো পরীক্ষার বালাই ছিল না। আমাদের ক্লাসে আনিসকে ছাত্রছাত্রীদের প্রশ্নবাণ সামাল দিতে হতো। একবার একটা প্রশ্ন নিশ্চয়ই তাকে বিপদে ফেলে দিয়েছিল। আমাদের ক্লাসে চীন থেকে আসা ছয়জন ছাত্র ছিল। তাদের সরকার তাদের বাংলা ভাষা শিখতে পাঠিয়েছিল। তারাও খুব অধ্যবসায়ের সঙ্গে বাংলা ভাষা শিখছিল। এই ছাত্ররা শুধু বাংলা পত্রিকা পড়ত আর সবার সঙ্গে বাংলায় কথা বলার চেষ্টা করত। ছাত্র হিসেবে যে তারা আদর্শ ছিল তাতে সন্দেহ নেই, তবে একবার তাদের একজন দাঁড়িয়ে এমন প্রশ্ন করেছিল যাতে ভাষাতত্ত্বের অত জ্ঞান সত্ত্বেও আনিসকে হিমশিম খেতে হয়েছিল। সেই ছাত্র আনিসকে প্রশ্ন করেছিল, ‘Sir, how do you translate Ôlicking dogs of imperialismÕ?’ (‘স্যার, ‘সাম্রাজ্যবাদের পদলেহী কুকুর’কথাটার বাংলা কী হবে?’) এই প্রশ্নের পর আনিসের মধ্যস্থতায় রাজনৈতিক মতাদর্শ নিয়ে ক্লাসে দীর্ঘ আলোচনা হলো। কথাটার তরজমা করতে গিয়ে আক্ষরিক অনুবাদ দেওয়া হয়েছিল নাকি উপমার আশ্রয় নেওয়া হয়েছিল, সেটা আর আজ আমার মনে নেই। সেই প্রশ্নকর্তা ছাত্র ওই কথাটা কখনো ব্যবহার করেছিল কি না সেটাও আমার জানা নেই, তবে আমরা আনিসের উত্তরে খুব চমৎকৃত হয়েছিলাম।
একসময় আমি ঢাকার আশেপাশের তাঁতিসমাজের সঙ্গে বেশ সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত ছিলাম। বিভিন্ন বাজারিব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার ভেতর তাদের তাঁতের সামগ্রী উৎপাদনব্যবস্থা কী করে টিকে ছিল সেই সম্বন্ধে জানছিলাম, শিখছিলাম। অধ্যাপক রাজ্জাক আমাকে ইতিহাস নিয়ে পড়াশোনায় উৎসাহিত করেছিলেন। আমি যখন ১৯৭৫ সালে অক্সফোর্ডে যাই, তখন বাংলার তাঁতশিল্প নিয়ে গবেষণার একটি সুযোগ আসে। আমি অভিসন্দর্ভ নিয়ে কাজ শুরু করার পর লন্ডনের ইন্ডিয়া অফিস লাইব্রেরিতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির পাণ্ডুলিপি সম্পর্কে জানাশোনা ও গবেষণার প্রয়োজন পড়ে। প্রথম দিনেই লাইব্রেরিয়ান জানান, সম্প্রতি কিছু বাংলা পাণ্ডুলিপি পাওয়া গেছে এবং এখন তারা বাংলাদেশ থেকে আগত একজন গবেষকের অপেক্ষায় আছেন, যিনি সেসব অনুবাদ করবেন। অবাক কাণ্ড! এই গুরুদায়িত্ব যে নিজ কাঁধে তুলে নিয়েছে, সে তো আমাদের আনিসুজ্জামান! দেখলাম সে মোটা ঢাউস বাঁধাই করা পাণ্ডুলিপি খুলে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে। এই পাণ্ডুলিপির মধ্যে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ঢাকায় অবস্থিত ফ্যাক্টরি প্রতিনিধির সঙ্গে ঢাকার আটটি আড়ংয়ে গোমস্তাদের পত্রালাপ, আড়ংয়ে তাঁতিদের অর্ডার, কাজের বেতন, এসবের হিসাবপত্র, তাঁতিদের অভিযোগ ও অন্যান্য বিষয় – এসব অন্তর্ভুক্ত।
যিনি রবীন্দ্র-গবেষক, যার কাজ-কারবার বিংশ শতাব্দী নিয়ে, তার পক্ষে অষ্টাদশ শতাব্দীর হস্তলিখিত চিঠিপত্র আর বিবরণের মর্মোদ্ধার বেশ কঠিন কাজ ছিল নিশ্চয়ই। এই কাজে পরিশ্রমও অনেক। তা সত্ত্বেও কয়েক মাসেই আনিস এসব পাণ্ডুলিপি ইংরেজিতে অনুবাদ করে। আনিসের কাজ ১৯৮১ সালে Factory Records and other Bengali Correspondence in the India Office and Records নামে প্রকাশিত হয়। এতে ভারতের অর্থনৈতিক-সামাজিক ইতিহাসের গবেষকরা যে অত্যন্ত উপকৃত হয়েছেন, হচ্ছেন এবং হবেন – সে-বিষয়ে সন্দেহ নেই। আমার গবেষণার জন্য তার অনুবাদের কাজটা ছিল অমূল্য, কারণ এই সূত্রগুলোর ফলে আমি ঢাকার আশেপাশের মসলিন আর জামদানি তাঁতিদের জগৎটাকে চেনার একটা বিরল সুযোগ পেলাম। আনিসের কাছে আমি গভীরভাবে কৃতজ্ঞ, কারণ সে যখন একেকটি পাতা ধরে ধরে অনুবাদ করছিল, আমি তখন সেই পাণ্ডুলিপি Bengal MS নামে ক্যাটালগে ব্যবহার করে আমার অভিসন্দর্ভ প্রস্তুত করি; যেখানে ইউরোপীয় কোম্পানিগুলোর ভয়ংকর শোষণমূলক ব্যবস্থা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। Factory Records আনিসুজ্জামানের সাহিত্যিক প্রতিভায় ইতিহাস গবেষণার একটি নতুন অধ্যায় যোগ করে। সেই থেকেই আনিসুজ্জামানের সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব। আনিস এবং তার পরিবারের সঙ্গে এই বন্ধুতার মূল্য আমার কাছে অপরিসীম।

Leave a Reply

%d bloggers like this: