আবেদিন

লেখক:

এস. আমজাদ আলী

ইংরেজি থেকে অনুবাদ : সুব্রত বড়ুয়া

এ-কথা বলা যাবে না যে, জয়নুল আবেদিন তাঁর কালের তরুণ শিল্পীদের মধ্যে শৈল্পিক প্রকাশের প্রতিভা সঞ্চারিত করেছেন, তবে তিনি অবশ্যই সে-প্রতিভার পরিপোষণ ও বিকাশের জন্যে অনেক কিছু করেছেন। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর, এমনকি তাঁর নিজের সৃজনশীল শিল্পকর্মের বিনিময়েও, তিনি নিজেকে নিয়োজিত করেছিলেন চারুকলা কলেজ গড়ে তোলার কাজে। সেজন্যেই এতে বিস্ময়ের কিছু নেই যে, তাঁর অনুজ শিল্পীরা, যাঁরা সবাই তাঁর ছাত্র, তাঁকে ভালোবাসেন ও শ্রদ্ধা করেন পিতার মতোই।

শারীরিক গঠনের দিক থেকে দীর্ঘাকৃতির শক্তপোক্ত ধরনের, কিন্তু মোটেই স্থূলকায় নন, এই মানুষটির গায়ের রং তিনি যাদের গভীরভাবে ভালোবাসেন সেই কৃষকদের মতোই কালো ও অপরিশীলিত; কিন্তু তিনি যে-মুহূর্তে কথা বলতে শুরু করেন, তখনই তাঁর মুখ হাসিতে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে এবং আপনি বুঝবেন যে, আপনি আছেন একজন শিল্পীর সান্নিধ্যে। তিনি উচ্চকণ্ঠ নন বা নিজেকে প্রকাশ করার জন্য তাঁর বিশেষ প্রয়াসও চোখে পড়ে না। কিন্তু তিনি কথা বলেন গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে সত্যিকারের উষ্ণতা ও হৃদ্যতা নিয়ে এবং তাঁর অনুচ্চ আন্তরিক উচ্চারণ ও মাঝেমধ্যে হাসির দমকসহযোগে। তাঁর সাদাসিধে পোশাক ও নিরুত্তেজ-স্বচ্ছন্দ ভাবভঙ্গি প্রত্যেককে সহজ করে তোলে এবং তাঁর শুদ্ধ আত্মবিশ্বাস একজন ব্যাপক ভ্রমণকারী ও বহুদর্শী মানুষের দ্যুতিই ছড়িয়ে দেয়।

বাংলার দুর্ভিক্ষ নিয়ে ১৯৪৩ সালে ড্রাইব্রাশ বা চারকোলে আঁকা তার স্কেচগুলি বিশ্ববিবেককে নাড়া দিয়েছিল এবং সেগুলোই তাঁকে এনে দিয়েছিল খ্যাতি। এই স্কেচগুলোর নিরাভরণ কালো রেখাগুলোতে মূর্ত হয়ে উঠেছিল বাংলার ত্রিশ লাখ মানুষের দুঃখ-কষ্ট ও যন্ত্রণা। এই মানুষগুলির কঙ্কালসার দেহ ও দুমড়ানো মৃতদেহগুলো ছড়িয়ে ছিল বাংলাজুড়ে। ওই স্কেচগুলি একদিকে যেমন শিল্পীর সদাজাগ্রত সামাজিক সচেতনতা ও নিজ দেশের মানুষের প্রতি তাঁর গভীর ভালোবাসা প্রকাশ করে, অন্যদিকে তেমনি তাতে প্রকাশ পেয়েছে তাঁর ড্রইংয়ের শক্তি এবং সার্বিক নৈপুণ্যসহ অঙ্কন-সরঞ্জামের কঠোর মিতব্যয়িতা।

১৯৪৭ সালের স্বাধীনতার পর তিনি যেসব ছবি আঁকেন তাতেও তাঁর এসব মৌলিক গুণের প্রকাশ অব্যাহত থাকে। এসব ছবিতেও ছিল বিষয়কে আলাদা করে দেখানোর জন্য মোটা কালো রেখার ব্যবহার এবং বিষয় নির্ধারণ করার ক্ষেত্রে নিজ দেশের মানুষের প্রতি তাঁর গভীর সংশ্লিষ্টতার পরিচয়। সবসময় তাঁর আঁকার ছবিগুলোর বিষয় থাকত – গ্রামীণ নিত্যদিনের চিত্র – লাঙল দিয়ে জমি চাষ করা, ফসল কাটা, নৌকার গুণটানা, অথবা গান গাওয়া ও নাচ করা।

এমনকি সবচেয়ে সরল ড্রইংগুলিতেও তাঁর নকশা আঁকার প্রাচ্যরীতির প্রতি ঝোঁক তুলির প্রতিটি আঁচড়কে যেমন পরিচালিত করেছে, তেমনি তা একটির সঙ্গে অন্যটির ভারসাম্যও সৃষ্টি করেছে। ছবিতে প্রাণিদেহের অবস্থান নির্ধারণ এবং স্থানদৃশ্যের পরিকল্পনা সেগুলিকে একটি প্যাটার্ন দিয়েছে এবং নকশার উপাদানগুলোকে আরো জোরালো করে তুলেছে।

তিনি শক্তি প্রদর্শনমূলক কাজের ছবি আঁকতে পছন্দ করতেন। সেগুলোতে মানুষ অথবা প্রাণীর টানটান করে দেখানো পেশিগুলো রেখার স্বাভাবিক ছন্দ ফুটিয়ে তোলে। অনুরূপভাবে, তাঁর নাচের বিষয়গুলি কিংবা নাচের ভঙ্গিগুলির উদ্ভব ঘটে একই ভালোবাসা থেকে। তবে তাঁর এই প্রবণতাকে সার্বিক বলা ঠিক হবে না, যেহেতু ছবির বিষয় নির্বাচনের ক্ষেত্রে তিনি বিভিন্ন উৎস থেকে আহরণকারী এবং প্রায়শ কাজের দৃশ্য হিসেবে তিনি আঁকেন জিরিয়ে নেওয়ার দৃশ্য। কিন্তু তাঁর স্বাধীন বিস্তারধর্মী তুলির সোজাসুজি আঁচড়গুলি ফুটিয়ে তোলে বাঁশের আগার ইঙ্গিত, আর সরল অগোচর সার্বিক নকশা এসব ছান্দিক রেখাকে এমনভাবে একীভূত করে, যেন তা চিহ্নিত করছে আবেগঘন কোনো বর্ণসমন্বয়।

তাঁর কাজের ধরন প্রধানত রৈখিক সমন্বয়ধর্মী এবং দৈহিক বা বস্ত্তগত গঠন তাতে তেমন বেশি অবয়ব লাভ করে না। যদি তাঁর তুলির আঁচড়, যা কখনো মোটা বা কখনো চিকন, মাত্রিকবৈশিষ্ট্য নির্দেশের পক্ষে যথেষ্ট এবং তাঁর রং কিছুটা বস্ত্তগত গঠনও উপস্থাপন করে, তাঁর ছবির রূপের মধ্যে থাকে নির্দিষ্ট হালকা আভা ও অনির্দিষ্ট গঠনগত গুণ, যা প্রাচ্যের প্রাচীন ঐতিহ্যে উপস্থিত।

জয়নুল আবেদিন তাঁর দেশ ও জনগণের ভালোবাসায় সমর্পিত এবং বিমূর্ত চিত্রকলার অরূপ সমুদ্রে ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্যে তাঁর দেশের মাটির সঙ্গে নৈকট্যের সম্পর্ক ভেঙে ফেলার মতো হৃদয়ের অধিকারী তিনি নন। তাঁর বহুবার বিদেশ ভ্রমণ এবং তাঁর পুরনো ছাত্রদের প্রায় সবারই কমবেশি অবয়বিক চিত্রাঙ্কন-রীতি পরিত্যাগ করার ঘটনা তাঁকে ভাবিয়ে তুলেছিল এবং নিজের পথ নতুন করে নির্ধারণ করতে উদ্বুদ্ধ করেছিল। তিনি সম্ভবত উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন যে, দেহাবয়ব ও বস্ত্তগত গঠনের সরাসরি উপস্থাপন ছবির দর্শকের মনে বাস্তবতার অনিয়ত স্বীকৃতি জাগিয়ে তুলতে পারে না, যদি শিল্পী বস্ত্তজগতের চিরপরিচিত ও ক্লান্তিকর মুখাবয়বের ওপরকার পর্দা তুলতে সমর্থ হন। এদের বৈশিষ্ট্যসূচক চরিত্র তুলে ধরার জন্যে অবয়বিক গঠনের কিছুটা পরিবর্তন ও ব্যতিক্রম অত্যাবশ্যক।

এটি করা যেত কিউবিক পদ্ধতিতে অথবা বিগত একশ বছরে ইউরোপে উদ্ভাবিত ও রূপায়িত প্রধান অঙ্কনরীতিগুলোর মধ্যে যে-কোনো একটি পদ্ধতিকে অবলম্বন করে। কিন্তু আবেদিন বুঝতে পেরেছিলেন যে, এসব রীতি তাঁর দেশের মানুষের হৃদয়ের ভাষায় কথা বলতে পারে না, কারণ এই মানুষদের অনুভূতি আধুনিক ইউরোপীয় চিত্ররীতির স্তরগুলির ভেতর দিয়ে পরিণত রূপ অর্জন করেনি। সর্বোপরি তিনি চেয়েছিলেন মানুষের সঙ্গে আত্মিক সংযোগ স্থাপন করতে এবং সে-লক্ষ্যে তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন লোকশিল্পের সমৃদ্ধ উৎস ও শক্তিশালী প্রকাশভঙ্গি অর্জনের জন্যে যে-বিস্ময়কর এশীয় রীতি তারা গড়ে তুলেছিল, তা থেকে তাঁর শিল্পরীতির বিষয় গ্রহণ করতে। লেগার কি মোটা তুলির সাহায্যে ছবির বিভিন্ন রঙের প্রভেদরেখা সৃষ্টির জন্যে ব্যবহৃত কালীঘাটের পটচিত্রের আকর্ষণীয় রীতি ব্যবহার করেননি, যার মাধ্যমে চিত্ররীতিতে আশ্চর্য গভীরতা ও গাম্ভীর্য এসেছিল? আর্চার এই দিকটি নির্দেশ করেছেন। সৌন্দর্যের নতুন জগৎ সৃষ্টির জন্যে আবেদিন লোকশিল্পের সুপরিচিত কৌশল ব্যবহার করে তার সঙ্গে যোগ করেছিলেন আধুনিক পাশ্চাত্য শিল্পকলা বিষয়ে তাঁর নিজস্ব অধ্যয়ন। এর প্রকাশ ঘটেছে তাঁর একান্ত নিজস্ব শিল্পসৃষ্টি ও বিমূর্ত রীতির কাজগুলোতে – সেখানে নারীর দীর্ঘায়িত গলদেশ ও বেঁকে-যাওয়া নারীশরীর, ত্রিভুজাকৃতির একান্তমনে বসে থাকা নারী এবং মানবশরীরের বৈশিষ্ট্যসূচক দেহভঙ্গি অনবদ্য নকশার আকারে ফুটে উঠেছে। দেহচিত্রের ফাঁকা স্থানগুলোই শুধু এতে তুলে ধরা হয়েছে এবং রং ও রেখার সাহায্যে চিহ্নিত করা হয়েছে প্রভেদগুলো, যাতে একটি ক্ষেত্র অন্য একটি ক্ষেত্রের বিপরীতে উঠে আসতে পারে। এ-ধরনের পরীক্ষামূলক কাজের অধিকাংশই করা হয়েছে প্রথমে জলরঙে আঁকা ছোট স্কেচের সাহায্যে এবং এগুলোর মধ্যে অল্প কয়েকটি মাত্র শেষ করা হয়েছে জলরঙে। কিন্তু এমনকি, এমন অল্প কয়েকটি কাজেও তাঁর ছবি আঁকার লক্ষ্যের দিকটি পরিস্ফুট হয়েছে।

তবে এ-পর্যন্ত অর্জিত তাঁর সবচেয়ে বড় বিজয় খোলামেলা অবয়বিক কাজের ক্ষেত্রে। এতে তিনি বিমূর্ত শিল্পের গুণও যথেষ্ট সঞ্চারিত করতে পেরেছেন, যেহেতু এসব গুণ অধিকাংশ আধুনিক রুচির মানুষের উৎসাহব্যঞ্জক মনোযোগও আকর্ষণ করতে পেরেছে। সুন্দর জলরঙে আঁকা তাঁর নৌকাগুলো এ-ধরনেরই কাজ। এসব ছবিতে অবশ্যই চোখে-দেখা বস্ত্তগুলোই উঠে এসেছে – যেমন, দুটি নৌকার খোল রয়েছে আড়াআড়িভাবে একটির পেছনে আরেকটি এবং অনুরূপভাবে রয়েছে নৌকার ওপরে তুলে দেওয়া বড় আকারের ত্রিভুজাকৃতির পালগুলো, একটি আরেকটিকে কিছুটা আড়াল করে। ছবির কাঠামোক্ষেত্রের এসব আকৃতি স্থাপিত হওয়ার ফলে অন্তর্গত আকৃতি-সম্পর্কের ছন্দ বিমূর্ত রীতির আভাস তৈরি করেছে।

সর্বোপরি, এতে জলরং মাধ্যমের সৌন্দর্য পরিস্ফুটিত হয়েছে সর্বোত্তম রূপে, মোটা খসখসে কাগজের ওপর রঙের ওপর তুলির সহজপূর্ণ আঁচড়ে – যা চোখের সামনে নকশার অপূর্বতার আনন্দ তুলে ধরে। এতে বিস্ময়ের কিছু নেই যে, শিল্প-সংগ্রাহকরা এগুলোর জন্যে আগ্রহী হয়ে উঠবেন। ডিউক অব এডিনবরাও ঢাকায় এই ছবিগুলো দেখে পছন্দ করেছিলেন এবং পরে শিল্পীর সঙ্গে সাক্ষাৎও করেছিলেন।

প্রথম প্রকাশ :