আমার দেখা আনিস স্যার

লেখক: রফিকুন নবী

জাতীয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামান স্যার চলে গেলেন। প্রায় নীরবেই নিভৃতবাসে তাঁর চলে যাওয়ায় মর্মাহত দেশের সাহিত্য, শিল্পকলা, সংস্কৃতি, শিক্ষাঙ্গনসহ সমগ্র জাতি। দেশবরেণ্য এই মহান মানুষটি ছিলেন আমাদের সবার প্রিয়, শ্রদ্ধেয় এবং ঘনিষ্ঠজন। অসাধারণ ব্যক্তিত্ব আনিস স্যারের ভক্তজন সারা বিশ্বব্যাপী বিস্তৃত। সবাই তাঁর ভালোবাসায় সিক্ত। তিনি তাঁর সান্নিধ্য থেকে বঞ্চিত করে চিরকালের জন্যে বিদায় নিলেন।

দেশকাল, বাংলাভাষা, বাঙালির সার্বিক ব্যাপারের সুচিন্তক, রুচিবান, বিনয়ী, মিষ্টভাষী আনিস স্যারের বিদায়কে নিয়ে অপরিসীম পরিতাপের দিকটি হলো যে, তাঁর অন্তিম মুহূর্তগুলিতে শুভানুধ্যায়ীবৃন্দের অধিকাংশই উপস্থিত থাকতে পারেননি, ভয়ংকর করোনা ভাইরাসের প্রকোপ থেকে বাঁচার লকডাউন প্রক্রিয়ায় ঘরবন্দি থাকায়। এই দুঃখটি তাঁর সকল গুণগ্রাহীর অনুভবকে চিরকাল আচ্ছন্ন রাখবে।

এই মারণ ভাইরাসের কবল থেকে তিনিও শেষ মুহূর্তে রক্ষা পাননি। মৃত্যুর পর সেটি ঘোষিত হয়েছিল। তো তাঁর চলে যাওয়া কেবলই সংবাদ হয়ে রইল। শেষ শ্রদ্ধা জানাবার জন্যে যে লাখো মানুষের উপস্থিতি অপরিহার্যতা পেত তা আর হতে পারেনি প্রচণ্ড দুঃসময়টির কারণে।

ঘটনাটি দুঃস্বপ্নের মতোই ঘটে গেল। তাঁর চিরবিদায়ে জ্ঞান-চর্চার ক্ষেত্রটিতে যে বিশাল শূন্যতা সৃষ্টি হলো তা কখনোই পূরণ হবার নয়। ক্ষণজন্মা এই প্রতিভাধর ব্যক্তিত্বের অভাব প্রতি মুহূর্তে অনুভূত হবে। শিল্পকলা জগতের আমরা চিরকালীন শুভানুধ্যায়ীকে শ্রদ্ধা জানাই। তাঁর বিদেহী আত্মার শান্তি এবং শুভ কামনা করি।

আমি তাঁকে চিনতাম ষাটের দশকের শুরু থেকে। আমি তখন আর্ট কলেজের ছাত্র। আইয়ুব খানের সামরিক সরকারের নানান দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রবৃন্দ। বিশেষ করে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং বাঙালিয়ানাকে খর্ব করার সরকারি দুরভিসন্ধি রুখতে আন্দোলন চলছিল তখন। তাতে চারুকলার ছাত্র-শিক্ষকদের যুক্ততা থাকায় আমিও জড়িত। বরেণ্য শিল্পী জয়নুল আবেদিন, কামরুল হাসান, আমিনুল ইসলাম, কাইয়ুম চৌধুরী, রশিদ চৌধুরী প্রমুখের সঙ্গে প্রথম আনিস স্যারকে দেখি।

হালকা-পাতলা ছিপছিপে গড়ন। ভারি কালো গোঁফ, পরনে সাদা পাজামা-পাঞ্জাবি। আমাদের শিক্ষক-শিল্পীদের সঙ্গে ওঠাবসা করেন। একই সঙ্গে আন্দোলনে বিভিন্নভাবে জড়িত। সাংস্কৃতিক মহলটির নানা কাজে অংশগ্রহণ করেন। তখন তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছেন। তখনই বেশ নামী শিক্ষক। শুনতাম ছাত্রজীবনেও দারুণ মেধাবী ছাত্র হিসেবে সুনাম ছিল।

পুরনো ঢাকার ঠাটারীবাজারে থাকতেন। তাঁদের পারিবারিক বাড়িটি চিনতাম। ওই পাড়ায় আমার বেশ কজন বন্ধুবান্ধব থাকতো। তারা খুব গর্ব করে বলতো যে, তাঁদের এলাকায় আনিসুজ্জামান সাহেব থাকেন। তাঁর কনিষ্ঠ ভ্রাতা আখতার ছিল আমার ছোটভাই ছড়াকার সফিকুন নবীর ঘনিষ্ঠ বন্ধু। আমাদের বাসায় যাতায়াত ছিল। যদিও বহুদিন পর্যন্ত জানা ছিল না যে আখতার আনিস স্যারের ভাই।

একদিন ঠাটারীবাজার হয়ে নওয়াবপুর রেলগেটে যাবার সময় দেখি আখতার আমার চেনা আনিস স্যারের বাড়ির দরজা দিয়ে বের হচ্ছে। তখনই জানতে পারি যে সে তাঁর ভাই। পরবর্তীকালে এই পথ দিয়ে আসা-যাওয়া করতে গিয়ে একুনে দুদিন আনিস স্যারকে দেখেছিলাম। দ্বিতীয় দিন তাঁর সঙ্গে প্রথম কথা হয়। আমি নিজেই স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে তাঁর সঙ্গে আলাপ করি। যদিও তা ছিল খুবই সংক্ষিপ্ত। সেদিনই তাঁকে বলেছিলাম যে, আমি আর্ট কলেজের ছাত্র। তিনি সঙ্গে সঙ্গে কোন কোন শিল্পীর সঙ্গে পরিচিত এবং ঘনিষ্ঠ তা বলেছিলেন এবং শিল্পকলা, বিশেষ করে চিত্রকলার অনুরাগী তিনি, এই কথাটা জানতে পেরেছিলাম।

এরপর তো আর্ট কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয় পাড়ায় নানা কারণেই দেখা হতো। বন্ধুদের সঙ্গে বসলে বেশ মজার সব কথা বলতেন। তাঁর বন্ধুরা যে সবাই সমবয়সী ছিলেন তা নয়। দেখতাম শিল্পাচার্য জয়নুল-কামরুলদের মতো বর্ষীয়ান শিল্পী-কবি-সাহিত্যিকরাও তাঁকে বন্ধু বলে গণ্য করতেন তাঁর অত্যন্ত মিশুক স্বভাবের জন্যে।

মনে আছে একবার পল্টনে অবস্থিত পাক্ষিক সচিত্রসন্ধানী পত্রিকার সম্পাদক গাজী শাহাবুদ্দিন সাহেবের কথাকলি প্রিন্টার্স দফতরে কবি-শিল্পী-সাহিত্যিকদের আসরে গিয়ে উপস্থিত হয়েছিলাম ইলাস্ট্রেশন করার সুবাদে। সেখানে কবি শামসুর রাহমান, হাসান হাফিজুর রহমান, রশীদ করীম, কাইয়ুম চৌধুরী, সৈয়দ শামসুল হক, ফজল শাহাবুদ্দিন প্রমুখসহ আরো বেশ কজনের সঙ্গে তিনি বসে ছিলেন। আমি নিতান্তই কনিষ্ঠ একজন বলে কাঁচমাচু হয়ে এক কোণে বসেছিলাম। তাঁরা আলাপ করছিলেন নানা বিষয়ে। কবিতার কথা, গদ্য-সাহিত্যের কথা; শিল্পকলার কথা তাতে খুব কমই ছিল। ব্যক্তিগত রসালাপই ছিল প্রধান। আমার উপস্থিতিতে তা যে কমে গিয়েছিল খুব তাও নয়।

লক্ষ করেছিলাম আনিস স্যার ছিলেন মূলত শ্রোতা। তবে অন্যদের রসিকতা শুনে মাঝে মাঝে কিছু মজার উক্তি করছিলেন সংক্ষেপে। তাঁর জীবনের ওই সময়ের অর্থাৎ ষাটের দশকের শুরুর সময়টির একটি ঘটনা বলেছিলেন তাঁর প্রিয় শিক্ষক ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্‌কে নিয়ে।

কথাটি উঠেছিল সৈয়দ শামসুল হকের মফস্বলের কোনো শহরে বক্তৃতা দিতে যেতে হবে সেই প্রসঙ্গে। হকভাই যাবেন – এই কথা শুনেই আনিস স্যার বলেন যে, তিনি একবার এরকম একটি আমন্ত্রণে যাবেন বলে ড. শহীদুল্লাহ্ সাহেবকে বলেছিলেন গর্ব করে যে, মফস্বলেও তাঁর ডাক আসছে বক্তৃতার।

এ-কথা শোনানোর পরে মজা করে শহীদুল্লাহ্ সাহেব কী উক্তি করেছিলেন সেটা বলেছিলেন হকভাইকে শোনাতে। কথাটা ছিল এই রকম :

স্যারকে গিয়ে বললাম যে, স্যার মফস্বলে অমুক কলেজে বাংলাভাষা নিয়ে বক্তৃতা দিতে অনুরোধ এসেছে। তো আগামীকাল যাব যদি স্যার ছুটি দেন। উনি (ড. শহীদুল্লাহ্) তৎক্ষণাৎ পারমিশান দিয়ে বলেছিলেন, ‘যাও, শুরু করো এসব। এখন থেকে প্রায়ই এসব দাওয়াত পাবে। ভাল। তবে আসা-যাওয়ার ভাড়াটা আগে নিয়ে নিও। যাবার পর বক্তৃতা শেষে কিন্তু ওরা বেমালুম ভুলে যাবে ভেবে যে, কাজ হয়ে গেছে। এখন কে কার!’

এই কথা শেষ করে হকভাইকে হেসে বলেছিলেন, ‘আমি তো স্যারের কাছে অনেক কিছু শিখেছি। তাই শেখানো মোক্ষম  কথাটি আপনাকে বলে দিলাম। যাবার আগে প্রয়োজনীয় কাজটা সেরে রাখবেন।’

সবাই হেসেছিল সেদিন। তবে আনিস স্যার সারাজীবন বক্তৃতা দিতে নানান জায়গায় গিয়েছেন, ঢাকাসহ প্রায় প্রতিটি শহরের অনুষ্ঠানে প্রায়শই, এমনকি লকডাউন শুরুর কদিন আগেও। ডাকলেই  যেতেন, তা সে বড় কোনো প্রতিষ্ঠান হোক অথবা ছোট, কাউকেই বিমুখ করতেন না। বিভিন্ন সময়ে অসুস্থ শরীর নিয়েও গেছেন। কিন্তু ওই যাওয়ার ব্যাপারটি হকভাইকে ঠাট্টার ছলে শেখালেও নিজে কখনো এসব আর্থিক ব্যাপার দাবি করেননি। তিনি আসলে কাউকে নিষেধ করতে পারতেন না।

আমি চিরকালই তাঁর গুণগ্রাহীদের একজন। ষাটের দশকের প্রথম দিকে প্রায়শই কোনো না কোনো কারণে দেখা হতো, কথা হতো। এরপর বহুকাল তাঁর সঙ্গে নিয়মিত দেখা-সাক্ষাৎ ঘটতো না। স্বাধীনতার পর আমিও লেখাপড়া করতে বিদেশে ছিলাম কয়েক বছর। ফিরে আসার পর দেখতাম তিনি চট্টগ্রামে। ঢাকায় এলেও দেখা হতো না।

হঠাৎ করেই পরবর্তীকালে, কিছুকাল পর্যন্ত বেঙ্গল ফাউন্ডেশনে যুক্ততার কারণে আবার কাছাকাছি আসার সুযোগ ঘটে। আমার আঁকা, লেখা ইত্যাদির তাঁর সমালোচনা ও প্রশংসা প্রাপ্তিতে নিজেকে মূল্যায়নের কপাটটি খুলে যায় বলে বিশ্বাস করি এবং আমি তাঁর একনিষ্ঠ ভক্ত হওয়ার মতো গর্বিত একজন বলে নিজেকে মনে করি।

মনে পড়ছে, এয়ারপোর্ট রোডের বেঙ্গল ফাউন্ডেশন দালানে কালি কলম পত্রিকা এবং পুস্তক প্রকাশনা দফতর ছিল। সেখানে দোতলায় পাশাপাশি কক্ষের একটিতে বসতেন পত্রিকাটির সম্পাদক আবুল হাসনাত এবং অন্যটিতে আনিস স্যার। দোতলায় গেলেই দেখতাম নিবিষ্ট হয়ে হয় কিছু লিখছেন, না হয় পড়ছেন। তো তাঁর মনোনিবেশ ব্যাহত হতে পারে ভেবে তিনি যাতে উপস্থিতি টের না পান তার জন্যে পা টিপে টিপে সম্পাদকের কক্ষে গিয়ে বসতাম।

এই ব্যাপারটা নিয়মিতই করতাম বিঘ্ন না ঘটাতে। কিন্তু কয়েক মিনিটের মধ্যেই তিনি তাঁর স্বভাবসুলভ মিষ্টি অথচ অর্থবহ হাসি দিয়ে নিঃশব্দে এসে আমাদের সঙ্গে যোগ দিতেন। বলতেন, ‘দেখলাম ঢুকছেন, কী নিয়ে আলাপ জমেছে?’ বলা বাহুল্য, তিনি চিরকালই ‘আপনি’ বলে সম্বোধন করতেন। একবার আপত্তি জানিয়েছিলাম। তিনি হেসে বলেছিলেন, ‘অভ্যেস তো। বদলানো যায় না। অসুবিধে নেই।’

আমি এবং সঙ্গে অন্য কোনো চিত্রকর থাকলে চলতো চিত্রকলার হরেক বিষয় নিয়ে আলোচনা। আর যদি কবি-সাহিত্যিক বা সংগীতের কেউ থাকতো আমাদের সঙ্গে তবে আলোচনার ক্ষেত্রটি বহুমুখিতায় বিস্তৃত হতো। তিনি সব ব্যাপারেই অসীম জ্ঞানী ছিলেন। অতএব তিনিই নানা কথা বলতেন, আমরা শ্রোতা থাকতাম। কোনো কথা বলার সাহসও হতো না।

কয়েক বছর আগে আমার ভ্রমণ-সম্পর্কিত একটি স্মৃতিচারণধর্মী বই বেরিয়েছে। তিনি পাণ্ডুলিপি পড়ে লেখার খুব প্রশংসা করেছিলেন। বইয়ের নাম ঠিক করতে পারছিলাম না। হাসনাতও ভাবছিলেন। শেষে তিনি নামটা ঠিক করে দিয়েছিলেন রণবীর বিশ্বদর্শন। প্রকাশিত হওয়ার পর বইটির প্রশংসা এবং কাটতি দেখে আমি নিশ্চিত হয়েছিলাম যে, তাঁর দেওয়া নামটিই এর কারণ।

পরের বছর একটি ছড়ার বই বের হওয়ার সময় অতএব আবার তাঁর শরণাপন্ন হলাম। তিনি সেটারও একটা নাম দিয়ে বলেছিলেন, ‘কী ব্যাপার রফিকুন নবী! সবকিছুতেই হাত দিচ্ছেন দেখি!’ উল্লেখ্য যে, তিনি পুরো নাম বলতেন। ব্যাপারটা ভালো বা খারাপ কিছু বলেননি। কিন্তু আমি লজ্জা পেয়েছিলাম। তো এরকম অনেক স্মৃতিই মনে পড়ছে। অতো তো লেখা যায় না। তবে স্যারের একটা দিক নিয়ে না বললেই নয়। আর তা হলো তাঁর বক্তৃতার ধরন। বহু অনুষ্ঠানে তাঁর সঙ্গে মঞ্চে থেকেছি। শিল্পকলা বিষয়ে, শিশু-সাহিত্য, পুস্তক প্রকাশনা, খ্যাতিমান কাউকে সম্মাননা ইত্যাদি বিষয়ে বক্তৃতা দিতে হয়েছে তাঁর উপস্থিতিতে। কমপক্ষে আট মিনিট বক্তৃতা দিয়েও মনে হয়েছে আমার যে আসল কথাই বলা হয়নি। স্যার তাঁর প্রধান অতিথির ভাষণে বা সভাপতির ভাষণে  সমস্ত বিষয়কে সাজিয়ে, সংক্ষেপে দুই-আড়াই মিনিটেই সব কথা বলে শেষ করে দিতেন। অবাক হতাম তাঁর এই অসাধারণ বক্তৃতার সংক্ষিপ্ত ধরনটিতে। বলতেন, শ্রোতারা বিরক্ত হয়।

তিনি তো সাহিত্যের মানুষ, বাংলা ভাষা তো বটেই বিদেশি ভাষা-সাহিত্যের খুঁটিনাটি সম্বন্ধে জানা অগাধ জ্ঞানী ব্যক্তিত্ব ছিলেন। এসব নিয়েই সারাজীবন ভেবেছেন, লিখেছেন, চর্চা করেছেন, গবেষণা করেছেন, কিন্তু দেশ-বিদেশের শিল্পকলা চর্চা এবং যুগোপযোগী বিবর্তন-পরিবর্তনের গতিপ্রকৃতিও তাঁর জ্ঞানী মননে একইভাবে ঋদ্ধ ছিল। আলোচনায় প্রায়শই তা প্রকাশ হতে দেখেছি।

এইসব কারণেই নিজ ক্ষেত্রের মানুষের পাশাপাশি শিল্পীদের সঙ্গেও বন্ধুত্বটা ছিল খুবই ঘনিষ্ঠ। তাঁর সমসাময়িক বা সমবয়সী শিল্পীরাই শুধু যে তেমন ছিলেন তা নয়। পরবর্তী প্রজন্মের শিল্পীরাও তাঁর ঘনিষ্ঠতা -বঞ্চিত থাকেনি। এমনকি অতি কনিষ্ঠরাও তাঁর স্নেহধন্য হতে পেরেছিল।

শিল্পী আমিনুল ইসলাম, মুর্তজা বশীর, দেবদাস চক্রবর্তী, রশিদ চৌধুরী, কাইয়ুম চৌধুরী, আবদুর রাজ্জাক প্রমুখ শিল্পী যেমন তাঁর সান্নিধ্য পছন্দ করতেন খুব, তেমনি তিনিও তাঁদেরকে বন্ধু হিসেবে শ্রেষ্ঠত্বে আসীন রাখতেন কবি-সাহিত্যিকদের পাশাপাশি।

শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরীর আচমকা মৃত্যুতে তিনি এতটাই মর্মাহত এবং বিচলিত হয়েছিলেন যে, ঘটনাটিকে দুঃস্বপ্নের মতো ভাবতেন সবসময়। একই মঞ্চে তিনি সভাপতি ছিলেন বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের উচ্চাঙ্গসংগীতের বিশাল আয়োজনে। তাঁর সামনেই কাইয়ুম চৌধুরী ম্যাসিভ হার্ট-অ্যাটাকে মৃত্যুবরণ করেন মঞ্চেই। এই ঘটনা তিনি ভুলতে পারতেন না। বলতেন, মৃত্যু ব্যাপারটা যে অনিশ্চিত এবং কেউ কেউ ভাগ্যবান হতে পারে তা কাইয়ুমকে দিয়ে জেনেছি। নিজে ভুগলো না, কাউকে বিরক্তও করলো না। দিব্যি নিমেষে চলে গেল।

যাই হোক, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করার সময় শিল্পী রশিদ চৌধুরী এবং কবি-নাট্যকার জিয়া হায়দারের সঙ্গে একত্রে বিশ্ববিদ্যালয় এবং চট্টগ্রাম শহরে শিল্পকলা-চর্চার পরিবেশ সৃষ্টি এবং প্রসারে অনেক দুরূহ কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিলেন। সেখানেও শিল্পকলার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তৈরিতে তাঁর সক্রিয় ভূমিকা ছিল। এ-ব্যাপারে বন্ধু রশিদ চৌধুরীকে সহায়তা দিয়েছিলেন শিল্পী এবং শিল্পকলার প্রতি ভালোবাসার জন্যেই।

এই ভালোবাসা তিনি ধারণ করতেন দেশ, সমাজ, মানুষ, বাংলাভাষার ক্ষেত্রেও। তাঁর ওই ভালোবাসাকে খর্ব করতে বৈরিতার সম্মুখীনও হতে হয়েছে। একজন অত্যন্ত আধুনিক, প্রগতিশীল এবং সর্বোপরি অসাম্প্রদায়িক এবং দেশাত্মবোধের চেতনালব্ধতার জন্যে বিপক্ষ শক্তির হুমকিও পেয়েছেন। কিন্তু অকুতোভয় তিনি নিজের বিশ্বাস থেকে সরেননি। এটি সব প্রজন্মের মানুষের জন্য শিক্ষণীয় হয়ে থাকলো। একটা দুর্বিষহ-দুর্বিপাকে বিপর্যস্ত সময়ে তিনি চলে গেলেন – এটা কখনোই ভোলার নয়। তাঁর রেখে যাওয়া কর্ম এবং কথা, যেসবের জন্যে তিনি দেশে-বিদেশে পুরস্কৃত হয়েছেন, সমাদৃত হয়েছেন, সেসবের কারণেই তিনি চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন।

Leave a Reply

%d bloggers like this: