আমার বাবার বাড়ি

লেখক: বার্নার্দিন এভারিস্টো

অনুবাদ : আন্দালিব রাশদী

আসলে নিজের সম্পর্কে আমি কোনো বইয়ে কিছু লিখিনি। একমাত্র ব্যতিক্রম আমার কাব্যোপন্যাস লারা, এটা আমার পারিবারিক ইতিহাস নিয়ে রচনা। আমার যদিও একটি ব্লগ আছে, লেখালেখি হিসেবে সেটাও গণ্য, তবে তাতে অন্তরঙ্গ বা স্বীকারোক্তিমূলক কিছু পাওয়ার কথা নয়। আমাদের বর্তমান পরিবেশে আমাদের ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক পৃথিবীর সীমান্ত ক্রমাগত অস্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে টুইটার নিয়ে লাখ লাখ মানুষের উন্মত্ততা, এমনকি তুচ্ছ বিষয়ের ঘোষণা ‘আমি এইমাত্র একটি চিজরোল খেয়েছি’, ‘আজ বাইরের দিকটা রোদেলা’, আমি যদিও এই উন্মত্ততা থেকে নিজেকে নিবৃত্ত রাখতে পেরেছি। আমি ফেইসবুকে থেকে গণআলোচনায় থাকার মতো প্রশ্রয় নিজেকে দিয়েছি। স্মৃতিকথা হিসেবে নিজের কথা লেখা Ñ এ-ধরনের আত্মপ্রকাশও প্রচারণার মতোই। ‘আমি যে কী হনু’ Ñ তা দেখানোর, ‘লেখকের আড়ালে’ পেছনের মানুষটিকে উন্মোচিত করার বাসনাই। স্মৃতিকথা লিখিয়ে নেয়। এ-কথা বলার সময় এটাও বলতে চাই, লেখালেখি মানুষকেও বদলে দেয় Ñ আমার লেখাটি আমি কোত্থেকে এসেছি তারই একটি বিবরণ। এটি কোনো আকস্মিক অনুধাবন নয়, বরং আমি অতীতকে জীবনে তুলে এনেছি।

আমি বেড়ে উঠেছি উলউইচের একটি গুমোট, ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দ করা জরাজীর্ণ বিচ্ছিন্ন একটি ভিক্টোরিয়ান বাড়িতে Ñ উলউইচ তখন দক্ষিণ-পূর্ব লন্ডনের একটি গ্যারিসন শহর, শহরের সীমান্তে টেমস নদী, রয়্যাল আর্সেনাল অস্ত্র কারখানার জন্য শহরটি খ্যাত, কারখানার কারণে দুর্ভাগ্যবশত নদীর দৃশ্য ঢাকা পড়ে গেছে। ১৯৬৭ সালে এই অস্ত্র কারখানা বন্ধ হওয়ার আগে পর্যন্ত ৩০০ বছরেরও বেশি সময় ব্রিটিশদের সকল যুদ্ধের জন্য অস্ত্রের জোগান দিয়ে এসেছে। একটি নোংরা বিষণœ শহর, কৌতূহলজাগানিয়া শহর। এই শহরের সঙ্গে আমার যুগপৎ ভালোবাসা ও ঘৃণার সম্পর্ক Ñ ভয়ংকর কোনো শহর হওয়ার কারণে নয়, বরং একঘেয়েমিপূর্ণ শহর হওয়ার কারণে।
আমার বয়স যখন কম, ভানভণিতা যখন একটু বেশি, আমি ঘোষণা করতাম, উলউইচ হচ্ছে আমার বাড়ির শহর, তবে নটিংহিল হচ্ছে আমার আধ্যাত্মিক নিবাস। এতদিন বাস করার পর যখন পেছনে তাকাই, একঘেয়ে শহরটিতে বাস করে, দীর্ঘ ঈষদুষ্ণ গ্রীষ্ম কাটিয়ে, কোথাও বা গিয়ে যা কিছু করেছি তা হচ্ছে Ñ সেই উপাদানই আমাকে লেখক বানিয়েছে Ñ যে-লেখক অদ্ভুত ও বিস্ময়কর কল্পলোকে পালিয়ে যেতে পারে। আমাদের পরিবারের আটটি শিশু Ñ একটু বেশিই, তাই না?
আমার ইংরেজ মা ধর্মানুরাগী ক্যাথলিক, কাজেই মা চেয়েছেন স্বর্গের জন্য যত বেশি সম্ভব আত্মার সমাবেশ ঘটানো যায় ততই মঙ্গল। নিজে পরিবারের একমাত্র সন্তান হওয়ায় নিজের জন্য চেয়েছেন বড় পরিবার। সে-পথেই চলেছেন আমার নাইজেরিয়ান বাবা। তাঁর পৌরুষের প্রমাণ আমরা ভাইবোনেরা। দশ বছরের বেশি সময় ধরে আমরা ধাক্কাধাক্কি করে পিছলে পৃথিবীতে নেমে আসার কসরত করেছি; মেয়ে, মেয়ে, ছেলে, মেয়ে (আমি স্বয়ং), ছেলে, মেয়ে, ছেলে, ছেলে। আমি ভাবতে চাই, আমি মিডল চাইল্ড সিনড্রোমে আক্রান্ত (দেখুন, আমাকে দেখুন, অন্যরা কেন মনোযোগ আকর্ষণ করবে Ñ এটা ঠিক নয়, এটা মন খারাপ করিয়ে দেয়)।
নটর ডেম কনভেন্ট স্কুলের ঠিক পরেরটিই ১৭৩ এগলিনটন রোড, একসময় স্কুলের অংশ হিসেবে ব্যবহৃত হতো। ভবনটি চারতলা, বারোটি রুম, সামনে বেশ বড় একটি বাগান, টেরেসে ১৫০ ফুট দীর্ঘ সবজিবাগান। বেশ মোহনীয়, তবে কেবল শুনে বোকামির ফাঁদে পড়ার মানে নেই। এটা আসলে একটা আবর্জনা Ñ বড়, জীর্ণ, ভেঙে পড়ার মতো দানবীয় এই ভবনটি চারদিকে সুন্দর ছোট বাড়িগুলোর পাশে বিষফোঁড়ার মতো দাঁড়িয়ে ছিল। হাঁ, জিসাস! এই বাড়িটাকে ঢেকে রাখার জন্য কোনো উঁচু সীমানা দেয়াল কিংবা গাছ নেই। ঠিক বলিনি, আগে একটা গাছ ছিল; কিন্তু কোনো কারণে আমার বাবা কেটে ফেলেছেন। গাছ ও আরো অন্য কিছু কুপিয়ে কাটতে আমার বাবা খুব পছন্দ করতেন। আমার মনে হয়, বাবা ছিল প্রকৃতিবিরুদ্ধ মানুষ।
আমার বাবা-মা ১৯৬০ সালে ১৭৩ নম্বর বাড়িটা ১৯০০ পাউন্ড দিয়ে কেনেন। বাড়িটা মেরামত করার দরকার ছিল, কিন্তু তাঁদের হাতে টাকাপয়সা ছিল না। বাড়ি উন্নয়ন অনুদানের জন্য বাবা যখন গ্রিনিচ কাউন্সিলে আবেদন করার সুযোগ পেলেন, সন্দেহবাতিকগ্রস্ত আমার বাবা মনে করলেন, কোনো কাউবয় ধরনের বিল্ডার এসে আমাদের গোপনীয়তার পর্দা উন্মোচন করে ফেলুক Ñ এটা হতে দেওয়া যায় না। কাজেই বাড়ির উন্নয়নের কাজটা নিজেরাই করবেন। যদি কিছু কাজ হয়েও থাকে বাবা তা খুব বাজেভাবে করলেন। সামনের বাগানটা ঠিক করার জন্য এর ওপর কংক্রিট-সিমেন্ট ঢাললেন; শিগগিরই এতে বড় ফাটল দেখা দিলো, ভূমিকম্পে বিধ্বস্ত হয়ে গেছে বলে মনে হওয়ার কথা। এক গ্রীষ্মে বাবা ঘরের পাশে একটা গ্যারেজ বানাচ্ছেন, আমরা তখন খুব উত্তেজিত; কিন্তু শেষ পর্যন্ত যা তৈরি হলো তা হচ্ছে Ñ ব্রাজিলের বস্তির ঢেউটিনের ঘর। কিন্তু পুরনো গাড়ির স্তূপ থেকে তার সদ্য কেনা ভক্সহল ভিক্টর এই গ্যারেজে না রেখে বাইরে রাখতে শুরু করলেন; বরং সবাই এটা দেখুক, গাড়ি তো স্ট্যাটাসের সিম্বল। যদিও তাঁর কোনো ড্রাইভিং লাইসেন্স ছিল না, গাড়িটা বাবাই চালাতেন; কখনো গাড়ি চালানোর কোনো লেসনও নেননি, কখনো তাঁকে পরীক্ষাও দিতে হয়নি। গাড়িটা তিন বছর অলস পড়ে থাকল, ক্রমাগত মরচে পড়তে পড়তে ভেঙে পড়তে শুরু করল।
আমাদের বড়সড় কিন্তু জীর্ণ বাড়ির সামনের দরজার গাছে চার্চের মতো জানালা। ১৯৭৫ সালে দরজাটায় রং লাগানোর আগে বাবা ব্লোটর্চ দিয়ে বেশ খানিকটা পুড়িয়েছেন। আগুনে বিক্ষত এবং লম্বা লম্বা পোড়া দাগ নিয়ে দরজাটা তার বাকি প্রাকৃতিক জীবন Ñ কুড়ি বছর বা তার কাছাকাছি, এভাবেই টিকে ছিল। বাড়ির সবকিছুর মতো এ-দরজাটিও ছিল আমাদের জন্য বিব্রতকর। মিস্টার ফুটার নামের একজন বিল্ডার ঠিক আমাদের বাড়ির মুখোমুখি ধবধবে সাদা বাড়িটাতে থাকতেন, কয়েক যুগ আমরা তাঁর প্রতিবেশী হিসেবে থাকলেও একবারের জন্যও হ্যালো বলেননি! আমি তাঁকে বলতাম ‘ফাকিং ফুটার’; অবশ্য কখনো সামনাসামনি নয়, এমনকি আমার মা-বাবার সামনেও নয়। বাড়িতে গালাগাল দেওয়ার অনুমতি ছিল না। পেছনে তাকিয়ে মনে হয়, আমাদের কারণে তাঁর বাড়িটার দাম বাজারমূল্যের অর্ধেকে নেমে গিয়েছিল। ফ্যাশনে পরিণত হওয়ার আগেই আমাদের পেছনের বাগানটা ছিল বুনো। কনভেন্টের একদিকে সবজিবাগান, মাঝখানে বেড়া, বাকিটাতে বড় পদক্ষেপের রাস্তা, চোরাগলিতে গিয়ে মিশেছে। বাড়ির পেছনটা খাড়া পাহাড়ে গিয়ে ঠেকেছে Ñ বাগানের পশ্চাদ্দেশ অরণ্যের সঙ্গে মিলেছে। অরণ্য বললে অবশ্য একটু বাড়াবাড়ি শোনায় Ñ এটা ঠিক এপিং ফরেস্ট নয়, তবে পেছনের বনের গাছগুলোকে মনে হয় কোনো নো ম্যানস ল্যান্ডের ওপর, কোনো মালিক নেই। আমরা বাচ্চারা বনের তেমন ভেতরে যেতে পারতাম না। জায়গাটা অন্ধকার, পিচ্ছিল, তুষার জমাট এবং বিপজ্জনক প্রাণী রয়েছে Ñ যেমন শেয়াল, পেঁচা। রাতের বেলার অরণ্য-আতঙ্কে শিরশির করা অমঙ্গলের বার্তা বহন করে।
আমার বাবা পেছনের বাগানের পথ ধরে দেয়াল তুলেছেন, তাঁর কাজের দক্ষতা এমনই ভয়াবহ যে, ইটের কাজগুলো দুমড়েমুচড়ে গেছে, দেখলে মনে হবে কেউ সেøজ-হাতুড়ি দিয়ে দেয়ালটা পেটাতে পেটাতে সামনে এগিয়েছে। তারপর সেরকমই রয়ে গেছে।
আমাদের বাগান গাছে ভর্তি ছিল : ডুমুর, ওক, আপেল, নাশপাতি এবং চেরি। বাগানের জমিতে কিছু একটা করবেন Ñ এমন একটি পরিকল্পনা নিয়ে বাবা সব গাছ কেটে ফেললেন। তাঁর সবসময় পরিকল্পনা থাকত। বাগানটা গাছশূন্য হয়ে পরিত্যক্ত এয়ারফিল্ডের মতো হয়ে রইল বছরের পর বছর। আমি সেই গাছগুলোর জন্য এখনো শোক করি, আর গাছের সঙ্গে ঝোলানো দোলনাগুলোর জন্য। একবার আমার বোনদের একজন চেরিগাছের ওপর থেকে একটি ইট ছেড়ে দিলে আমার মাথায় পড়ে, মাথা ফেটে হাঁ হয়ে যায়। আমার বয়স তখন পাঁচ বছর, একটা কাউবয় হ্যাটও মাথায় ছিল। আমার বোন হ্যাটটাকে তার পক্ষের সাক্ষী মেনে বলেছে, সে ভেবেছে, হ্যাটের কারণে কিছু হবে না।
সে ভেবেছে হ্যাট আমাকে রক্ষা করবে। সত্যিই?

প্রত্যেক গ্রীষ্মে রামদা হাতে দিয়ে আমাদের বাগানে পাঠানো হতো, মাথা ছাড়িয়ে যাওয়া ঘাস আমাদের কাটতে হবে। গরমের মধ্যে এমন শারীরিক পরিশ্রম আমাদের খুব অপছন্দের ছিল। আমরা বিড়বিড় করতাম, আমাদের সঙ্গে ক্রীতদাসের মতো আচরণ করা হচ্ছে। তখন টেলিভিশনে অ্যালেক্স হ্যালির ‘রুটস’ সিরিজ চলছিল। শিগগির আবার যখন ঘাসগুলো বড় হতে হতে মাথা ছাড়িয়ে যাবে, আমরা যুক্তি দিতাম, তাহলে কেটে লাভ কী? কিন্তু বাবার কর্তৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন করার সাহস আমাদের কখনো ছিল না। তাঁর ছিল মিলিটারি ডিক্টেটরশিপ। সামরিক একনায়কতন্ত্র।
আমি যে-উলউইচে বেড়ে উঠি, শহরটির সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ সাদা। আজ এই শহরকে বলা যেতে পারে লিটল লাগোস। বিস্ময়কর এই রূপান্তর। তখন আমাদের রাস্তায় আর একটি মাত্র কালো পরিবার ছিল; বর্ণবাদী শিশুদের সহজ টার্গেট ছিল আমাদের বাড়ি, গলিপথ থেকে তারা আমাদের পেছনের জায়গাটায় পাথর ছুড়ত। আমি যখন টিভিতে ‘আয়রনসাইড’ কিংবা ‘টপ অব দ্য পপস’ দেখতাম সেই শৈশবে ভাবতাম নিক্ষিপ্ত মিসাইল এখনই রুমের ভেতর এসে পড়ল বলে।
আমার বাবা ক্ষুব্ধ শয়তানগুলোকে তাড়া করতেন, কখনো কখনো একটা-দুটোকে ঘাড়ে ধরে তুলে নিয়ে আসতেন এবং হেঁচড়ে তাদের বাড়ি পর্যন্ত নিয়ে যেতেন যাতে তাদের শাস্তি হয় এবং ক্ষতিপূরণ আদায় করা যায়। বাবা বলশালী ছিলেন এবং সে-আমলে ঘাড়ে ধরে তুলে আনার অনুমতি ছিল। তাদের বাবা-মা সাধারণত ক্ষমা প্রার্থনা করতেন, নতুবা বাবা ক্ষতিপূরণ আদায় করে ছাড়তেন অথবা পুলিশকে জানানোর হুমকি দিতেন; কখনো কখনো পুলিশকে রিপোর্টও করেছেন। তাঁর মৃত্যুর দিন পর্যন্ত বাবা তাঁর বালিশের পাশে একটা হাতুড়ি নিয়ে ঘুমিয়েছেন।
পেছনের বাগানের দেয়ালটা ওঠার আগে একদিন আমার মা-বাবা জেগে ওঠেন এবং দেখতে পান, বাগানের কাঠের বেড়া গলিপথে টেনে বের করে নিয়ে যাচ্ছে। ছেলেরা বলে, বহ্ন্যুৎসব রাতে। এই কাঠ দিয়ে আগুন জ্বালাবে। বাবা পুলিশ ডাকেন, পুলিশ ছেলেদের বাবা-মাকে বের করে আনে এবং সেদিনই সব কাঠ আবার বাগানে ফিরিয়ে দিতে বাধ্য করে। তবে পুলিশ সবসময়ই এমন সহানুভূতিশীল ছিল মনে করার কারণ নেই।
এখন মনে হয়, প্রতিবেশীদের কাছে আমাদেরটি ছিল সকলকে জুজুর ভয় দেখানো একটি পরিবার।
আমার বাবা বেশ বলবান ছোট আকারের আফ্রিকান, নাইজেরিয়ার মুষ্টিযোদ্ধা, পাঁচ ফুট পাঁচ ইঞ্চি, আমার চেয়ে খাটো, তবে ছ-ফুট লম্বা ছেলেদের চেয়ে অনেক খাটো। বাবা ছিলেন চিকন, পেশিবহুল এবং বুড়ো বয়সেও তাঁর যে কোমরের মাপ Ñ তাঁর জন্য অনেক নারীর আকুল হওয়ার কথা। নাস্তার সময় সরাসরি সসপ্যান থেকে তুলে নিয়ে অনেক বেশি পরিমাণ পরিজ খেতেন, দুপুরের খাবার মানে এক কাপ চা, রাতের বেলা বড় খাবার Ñ সেটা বাবা নিজেই রান্না করতেন। খাবারটা ছিল মাংস এবং আলুসেদ্ধ একসঙ্গে মিশিয়ে বাটা Ñ অনেকটা বেবিফুডির মতো; কখনো মিষ্টান্ন খাননি, কখনো কোনো স্ন্যাকস মুখে তোলেননি। আমরা যেমন করে খাবারের সঙ্গে পানি গলায় ঢুকাই, বাবা তা কখনো করতেন না। এটাই ব্যাখ্যা করে কেন তাঁকে একদিনের জন্যও অসুস্থ হতে হয়নি। বাবা খুব ক্ষীপ্র ও প্রাণবন্ত ভঙ্গিতে হেঁটে যান, পেছন থেকে দেখলে যে-কেউ তাঁকে তাঁর আসল বয়সের চেয়ে কমপক্ষে পনেরো বছর কমবয়সী বলে মনে করত। কিন্তু শিশুদের সঙ্গে বাবা ছিলেন ভয়ংকর, শারীরিক শাস্তির পুজারি, আমরা আতঙ্কগ্রস্ত থাকতাম। কিন্তু বাইরের জগতে ভিন্ন মানুষ, ক্যারিশম্যাটিক, বন্ধুবৎসল, কিছুটা জোকার, সমাজতন্ত্রী এবং স্থানীয় কাউন্সিলর Ñ মানুষকে সাহায্য করার জন্য সদাউন্মুখ। একই বাড়িতে বাবার সঙ্গে ১৮ বছরের জীবনে আমি কখনো তাঁর সঙ্গে সত্যিকারের কথোপকথন করতে পারিনি। কেবল আমাদের বকাঝকা করা ও শাস্তি দেওয়ার দরকার হলে বাবা মুখ খুলতেন Ñ বকাঝকার সময় এক ঘণ্টা ধরে তাঁর নসিহত শুনতে হতো এবং বিষণœতার ভান করে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকতে হতো।
খেলার জন্য আমাদের রাস্তায় বেরোনো নিষেধ ছিল, বন্ধুদের কাউকে দেখতে যাওয়ার ওপর ছিল ভীষণ ও স্থায়ী নিষেধাজ্ঞা। আমাকে যদি কোনো পার্টিতে যেতে হতো, তাহলে তিন সপ্তাহ আগে মাকে জানাতে হবে, তারপর ধুকধুক করা বুকে তাঁর বক্তৃতা Ñ এটার কী বিপদ, ওটার কী বিপদ Ñ সব শুনতে হবে, আর সবশেষে বলবে, না, দরকার নেই। জিজ্ঞেস না করাটাই বরং ভালো। ১৭৩ নম্বর বাড়িটার পুরোটাই তাঁর তালুক, কখনো কখনো আমার মনে হতো, এটা আমার জন্য কারাগার। আমি এখন বুঝি তাঁকে কেন এত কঠোর শৃঙ্খলা আরোপ করতে হয়েছে Ñ বাবা তাঁর লোককে বিপদাপদ থেকে দূরে রাখতে চেয়েছেন, সন্তান লালনপালনে তাঁর যে-দক্ষতা, তার সর্বোচ্চটাই ঢেলে দিয়েছেন, অথচ মানুষটা আমাদের আতঙ্কের কারণ হয়ে উঠেছেন। ১৯৪৯ সালে যে ইংল্যান্ডে বাবা এসেছেন, তা কালোমানুষের জন্য শত্রুভাবনাপন্ন ছিল। সত্তরের দশকেও কালোশিশুদের, বিশেষত ছেলেদের, জন্য লন্ডন হয়ে ওঠে বিশ্বাসঘাতকতার শহর। প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পরই কেবল আমি তাঁর সঙ্গে ভাববিনিময় করতে পেরেছি, আর হ্যাঁ, তাঁকে ভালোও বেসেছি।
বাবার দুরারোগ্য আচরণের ঠিক উলটো আমার মা Ñ উষ্ণ, আদুরে, গল্পবলা, সহজ প্রবেশ্য এবং অনেক ভালোবাসার মানুষ। মা যদি আমাদের সঙ্গে সন্ধ্যায় টেলিভিশন দেখতে বসতেন Ñ আমাদের মধ্যে প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যেত ব্যাক-স্ক্র্যাচার দিয়ে কে মার পিঠ চুলকাবে, কে তাঁর ক্লান্ত পায়ের পাতা ম্যাসাজ করবে। আমাদের প্রতিযোগিতা থামিয়ে শেষে সমঝোতা হতো কে কোন পা টিপবে। সন্তানদের সঙ্গে কোমল আচরণ করতে মা বাবাকে বলতেন, কখনো কখনো তাতে সাময়িক ফলও হতো।
১২ বছর বয়সে প্রত্যেক শুক্রবার রাত বাড়ির আতঙ্ক থেকে রেহাই হতো Ñ আমি চলে যেতাম স্থানীয় ইয়ুথ থিয়েটারে, আমি অনুমতি পেয়েছি কারণ সেখানে ‘ভালো’ শিশুরা যেত। এটাই ছিল আমার ত্রাণকর্তা মেসাইয়া। আমাদের রান্নাঘরটা মাটির তলার কারাকক্ষের মতো, এবং ভেতর দিয়ে একটি সরু প্যাসেজ পেছনের বাগানে গিয়ে পৌঁছেছে। বেজমেন্টের রান্নাঘরটাতে কংক্রিটের দেয়াল। এতটাই স্যাঁতসেঁতে যে, চুঁইয়ে ভেতরে পানি চলে আসে। মেঝেটা পাথুরে কংক্রিটের। সারাজীবন রান্নাঘরের অবস্থা এমনই রয়ে গেছে। ডিসপোজেবল ল্যাপি, ওয়াশিং মেশিন, ফ্রিজ কিংবা জীবন সহজীকরণের গ্যারান্টি দেওয়া আধুনিক যন্ত্রপাতি ছাড়া তাঁর কেমন করে চলত আমার বোধগম্য নয়। ওয়েল্ডার হিসেবে আমার বাবা কিছু কামাই করতেন। আমার মা শিক্ষক, কিন্তু আমাদের সবচেয়ে ছোটটি স্কুলগামী না হওয়া পর্যন্ত আর কাজ যোগ দেননি। এক অর্থে তাঁরা দুজনই আর্থিকভাবে প্রায় নিঃস্ব। এরপরও মা নিশ্চিত করতে চেষ্টা করতেন যেন আমাদের খাওয়াদাওয়াটা ভালো হয় Ñ আমাদের জন্য বাগানের লেটুস, ফল, সবজি এসব তো হিসাবের বাইরে। আমরা শক্ত-সমর্থ, স্বাস্থ্যবান হয়ে বেড়ে উঠি, কদাচিৎ আমরা অসুস্থ হয়েছি।
কয়লা জমিয়ে রাখার ঠান্ডা সেলারটি আমাদের ফ্রিজের সেবা দিত Ñ দুধ, বার্থডে জেলি, শনিবারে উলউইচ থেকে আনা মাংস কয়লার সেলারে রাখা হয়। বাথরুমটাও বেজমেন্টে Ñ বিশাল বড় একটি কক্ষ, এর ভেতরে আটটি বাথটাব রাখা যায়; কিন্তু কখনো এর কোনো দরজাও ছিল না, কোনো বাথটাবও নয়। আমার বাবা একটা বাথটাব কিনেছিলেন; কিন্তু দশকের পর দশক এটাকে দেয়ালে লম্বালম্বি ঠেস দেওয়া অবস্থায় রেখে দিয়েছেন।
বাড়িটার আশীর্বাদ Ñ মাঝখানে সিঁড়ি, তাতে কাঠের রেলিং Ñ ওপর থেকে একবার গড়িয়ে পড়লে পিছলে উড়ে মেঝেতে এসে ধাক্কা খেয়ে ঘাড় ভাঙার জন্য এর চেয়ে উত্তম কিছু নেই। আমাদের শৈশবে এই বাড়িটাই ছিল আমাদের খেলার মাঠ, আমরাই ছিলাম পরস্পরের খেলার সাথি।
কোনো হলওয়েতে ওয়ালপেপার কিংবা রং লাগানো ছিল না, কাজটা কঠিনও ছিল। মেইন হলটা ছিল ত্রিশ ফুট উঁচু; কাঠের সিঁড়িতে কোনো কার্পেট ছিল না Ñ উপশহরে এটাই ছিল তখনকার ফ্যাশন। ঘুমের মধ্যে আমি দেয়াল সাজাবার ফরমিকা, লাইনোলিয়াম এবং পেবলের স্বপ্ন দেখতাম। আমি আটজনের একজন হলেও আট ভাগের এক ভাগ না দেখে আস্ত একটি সাইকেলের স্বপ্ন দেখতাম। আমরা যখন বড় হয়ে উঠছি, এভারিস্টো পরিবারের জোড়ায় জোড়ায় সন্তানদের ওপর শনিবার ‘কমিউনাল এরিয়া’ Ñ সবার ব্যবহার্য সাধারণ স্পেস ঝাড়ু দেওয়ার দায়িত্ব পড়ল। আমাদের বাড়িটির যত দোষই থাকুক না কেন, বরাবরই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা হয়েছে। সব বাড়িতেই যেমন লিভিংরুম আছে, আমাদের দোতলায় ছিল সেরকম, তবে অনেক বড় ‘রেস্ট রুম’ Ñ আমরা সবাই এখানে জমায়েত হয়ে টেলিভিশন দেখতাম। তখন আমার মা অবশ্যই বেজমেন্টে স্টোভে বড় কড়াইয়ে শত ন্যাপি গরম পানিতে ধুয়ে নিচ্ছে। রেস্ট রুমে গ্যাস হিটিং, মার্বেল ম্যান্টেলপিস এবং কার্পেট ছিল। আরামদায়ক ছিল বটে তবে প্রায়ই বেশি মানুষের জন্য ভীতিকর হয়ে উঠত, সোফায় আটটি শিশুর চিড়েচ্যাপ্টা চাপাচাপি, চারটি ছেলের বায়ু নিঃসরণের প্রতিযোগিতা, যা তারা মনে করত অহংকারের প্রতীক Ñ দুর্বিষহ হয়ে উঠত আমাদের সে-ঘরটি। মজার নয়, একই রকম চলেছে বছরের পর বছর।
১৭৩ নম্বর বাড়ির সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় ছিল রেস্ট রুমের ভেতরের সজ্জা। এক গ্রীষ্মে আমার মেধাবী বোনকে দায়িত্ব দেওয়া হলো মাথা ভালো করে ঘামিয়ে এই ঘরটাকে সাজাতে হবে। রঙিন উইমেনস ম্যাগাজিনের পাতা ছোট ছোট বর্গাকৃতির অংশে কেটে এগুলো সব দেয়ালে সেঁটে দিলো। শেষ পর্যন্ত গোটা কক্ষটি রঙিন কোলাজে পরিণত হলো। আমরা সবাই এই সজ্জা অনুমোদন করলাম। রুমটিকে বিস্ময়কর মনে হচ্ছিল।
আমাদের রেস্ট রুমের পরেরটা আরো বড় ফ্রন্ট রুম; কিন্তু এটা পরিত্যক্ত কক্ষ। এটা হয়ে পড়ে বাড়ির ভাগাড়। দরজাহীন, অন্ধকার,
ভয়-ধরানো, গুহার মতো এই কক্ষে বাড়ির ভাঙা যতকিছু স্তূপ করা হয়েছে। রাতের বেলা ওপরে যাওয়ার সময় আমি এই রুমের সামনে দিয়ে
ভোঁ-দৌড় দিতাম, পাছে অবর্ণনীয় কোনো জন্তু এই রুম থেকে বেরিয়ে এসে আমাকে ধরে ফেলে Ñ সেই ভয়ে। ফ্রন্ট রুমের সম্পদ দুটো Ñ অ্যান্টিক পিয়ানো, একটার সঙ্গে পিতলের সৌখিন শামাদান যুক্ত করা। আমরা কেউই পিয়ানোবাদক হইনি; কিন্তু কখনো কখনো এতে টুংটাং করতে ভালো লাগত। কোনো এক বছর বাবা সিদ্ধান্ত নিলেন, এ দুটোকেও কেটে ফেলতে হবে। কাজেই বোঝা বয়ে চমৎকার এই দুটোকে বাগানে নামিয়ে আনলেন, কুপিয়ে কাটলেন এবং বহ্ন্যুৎসবের আগুনে পোড়ালেন। কিন্তু কেন? আমাকে জিজ্ঞেস করতে যাবেন না।
হতে পারে আমাদের এক আঙুলে লক্ষ কোটিবার বাজানো ‘ফ্রেইরে জ্যাকস’ শুনতে শুনতে বাবা হাঁপিয়ে উঠেছিলেন। একমাত্র টয়লেটটিও ছিল এই মেঝেতে। লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে, যখন কারো পালা আসবে দ্রুত ভেতরে ঢুকতে হবে, কারণ লাইনে অন্য কেউ দাঁড়িয়ে আছে। এখনো আমার দ্রুত প্রস্রাব করার দক্ষতা নিয়ে মন্তব্য শুনি। এক মিনিটের মধ্যেই ভেতরে গিয়ে বেরিয়ে আসতাম।
ওপরের তলায় তিনটি বেডরুম। আমরা যখন বড় হয়ে উঠি, বয়স লিঙ্গ বিচারে জোড়ায় জোড়ায় আমাদের জন্য রুম বরাদ্দ করা হয়। এই ফ্লোরে তিন রুম Ñ আমার চার ভাইয়ের দুটো আর বাবা-মার একটি। সবার ওপরে চিলেকোঠায় দুটি রুমে আমার তিন বোন এবং আমি। এখানে কোনো ওয়াশরুম নেই। চিলেকোঠার একটি অংশে র‌্যাক্টার্স ছিল কিন্তু ফ্লোরবোর্ড ছিল না।
একদিন বাবা চিলেকোঠায় কিছু একটা করছিলেন, কিন্তু পা পিছলে ফ্লোর ভেঙে নিচের তলায় পড়ে যান। সিলিংয়ে একটি বড় ছিদ্র রয়ে যায়, যা কখনো মেরামত করা হয়নি। নিশ্চিত মেরামত করা হয়নি।

পাঁচ বছর বয়সে আমি ছোটবোনের সঙ্গে রুম শেয়ার করতে শুরু করি। আমরা বড় হলেও আমাদের মধ্যে সমঝোতা সৃষ্টি হয়নি Ñ সবসময়ই অশ্রুসিক্ত চোখে একজন অন্যজনের বিরুদ্ধে নালিশ জানাতে নিচতলায় মায়ের কাছে ছুটতাম। যখন টিনএজার, প্রতিরাত সজোরে বই পড়ে নাটকীয় স্বরে আবৃত্তি করে এবং নিজের শব্দক্ষেপণের ধ্বনি শুনে আমার বোনের জন্য যথেষ্ট যন্ত্রণার কারণ হয়েছি। সে ঘুমোতে পারছে না Ñ এটা তার ব্যাপার, এটা আমার কোনো সমস্যা নয়। আমরা যখন এই বাড়ি ছেড়ে যার যার পথে চলে যাই, কেবল তখনই আমরা বন্ধু হতে পেরেছি। পাশের রুমে আমার আর দুবোন একটি সুতো দিয়ে তাদের যার যার পরিসর ভাগ করে নিয়েছে।
কদাচিৎ আমাদের কোনো অতিথি এসেছে। আমার মায়ের বন্ধুরা অভিবাসী হয়ে ‘বিদেশ’ নামের বিভিন্ন জায়গায় চলে গেছে, আর তাঁর পরিবারের অধিকাংশই মাকে আর তাঁদের সঙ্গে জড়াতে চাননি, কারণ তিনি সর্বনিকৃষ্ট মানুষ Ñ এক আফ্রিকানকে বিয়ে করেছেন। আমার নানি তাঁর মেয়ের বিয়ে বন্ধ করতে যা যা তাঁর পক্ষে করা সম্ভব সবই করেছেন। এই বিয়েতে তিনি ভীষণরকম মুষড়ে পড়েন। তিনি নিজেকে তাঁর আইরিশ ইংলিশ বংশোদ্ভূত শ্রমিক শ্রেণির ঊর্ধ্বে প্রতিষ্ঠা করেছেন, নিজে বাড়ির মালিক হয়েছেন, দর্জির কাজ করেছেন, আর নিজেকে মধ্যবিত্ত শ্রেণির বলে কল্পনা করেছেন (যেখানে তাঁর স্বামী, আমার নানা যেখানে গোয়ালা, সেখানে এটা কেমন করে সম্ভব তা আমার বোধগম্য নয়)।
তাঁর অনেক উঁচু আশা ছিল তাঁর একমাত্র সন্তান, আমার মা Ñ যে সাইভেট স্কুলে বৃত্তি পেয়েছে, একসময় পুরো বেতন পাবে, মধ্যবিত্ত শ্রেণির সদস্য হবে। তিনি কখনো তাঁর হতাশা কাটিয়ে উঠতে পারেননি। আমার নানির বাড়িতে তাঁর একজন মাত্র নাতনির একটি ছবি ছিল; সে আমার বড় বোন, যখন সে নিতান্তই ছোট ছিল তখনকার। নানি আমাদের ভালোবাসতেন, কেবল নাতি-নাতনিদেরই; কিন্তু আমাদের গায়ের রং নিয়ে তিনি খুবই লজ্জিত থাকতেন।
আমি যখন অনেক ছোট, আমাদের বাড়িতে ভাড়াটে থাকত। ভাড়াটেদের মধ্যে একজন নারীকে আমার বাবা-মা তাড়িয়ে দিয়েছিলেন। তাঁরা আবিষ্কার করলেন, এই নারী তাঁর শিশুসন্তানকে হুইস্কি খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে উলউইচে সৈন্যদের সঙ্গে ফষ্টিনষ্টি করতে চলে যেত। আর একজন পুরুষ বাবার সঙ্গে রীতিমতো লড়াই শুরু করেছিল, তাকে উচ্ছেদ করা হয়েছে। তারপর এলো ভারত থেকে আসা একটি পরিবার। গোয়ানিজ এই পরিবারটির একটি কি দুটি সন্তান আছে মনে করে বাবা-মা দুজনেই ভাড়া দিতে রাজি হলেন। মধ্যরাতে তারা যখন হাজির হলো, সাউদাম্পটনে বোট থেকে নামা এই পরিবারটির যে তেরোটি বাচ্চাকাচ্চা থাকতে পারে, বাবা-মা তা বিশ্বাসই করতে পারেননি। তেরোজনের সঙ্গে তাদের বাবা ও মায়ের বিশাল ট্রুপ একে একে হলওয়ে পূর্ণ করে ফেলল। আমার বাবা-মাকে ধন্যবাদ দিতেই হয়, বড়রা চাকরি না পাওয়া পর্যন্ত সপ্তাহের পর সপ্তাহ তাঁরা এখানেই থেকেছেন, শেষ পর্যন্ত তাঁদের সাতজন আমাদের বাড়িতে দু-বছর কাটিয়ে গেছে।
আমার বন্ধুদের মধ্যে একজনকেই আমাদের বাড়িতে আমন্ত্রণ জানিয়েছি, সে হচ্ছে জেনি, এখনো সে আমার ভালো বন্ধু। আমার মতো তখনকার শিশুর দৃষ্টিতে জেনিদের বাড়িটা ছিল একটু ছোট আকারের রাজপ্রাসাদের মতো Ñ মুরদের প্রাসাদ, স্বাস্থ্যকর স্থান ব্ল্যাকহিথে আঁকাবাঁকা প্রাইভেট ফ্লাইওভারের ধারে দক্ষিণ-পূর্ব লন্ডনের এটাই সবচেয়ে অভিজাত এলাকা। তাদের চোখ ধাঁধানো বাড়ির মেঝেটাকে মনে হয়েছে পলিশ করা জমাট বরফ। এখনো আমি ভাবি, আমার জরাজীর্ণ নিবাস দেখে সে তখন কী ভেবেছে।
বাড়ির অবস্থার কিছুটা পরিবর্তন ঘটাতে বাবাকে রাজি করানোর জন্য মা তাঁর সাধ্যমতো চেষ্টা করেছেন; কিন্তু বাবা তো ছিলেন একগুঁয়ে, পিতৃতান্ত্রিকতার প্রতিভূ, কাজেই তাঁর ইচ্ছেই শেষ পর্যন্ত বহাল থেকেছে।
এর অনেকটা কারণ সাংস্কৃতিক সংঘর্ষ। আমার মা এমন জায়গা থেকে উঠে এসেছেন, যাদের বিশ্বাস Ñ ‘ইংরেজের বাড়ি হচ্ছে তার দুর্গ’। আর বাবা এসেছেন এমন এক দেশ থেকে যা ইংল্যান্ড নয়। গ্রীষ্মম-লীয় নাইজেরিয়ার বাইরে অনেক মানুষ বাস করে। নাইজেরিয়ায় চমৎকার গোলাপের ঝোপ লালন করা এবং দু-এক বছর পরপর ঘর রং করার চেয়ে অনেক ঃ জরুরি কাজ পড়ে আছে। ১৯৯১ সালে আমি যখন প্রথম নাইজেরিয়াতে এলাম, আবিষ্কার করলাম, আমার বাবার কিছু
কিছু অগ্রহণযোগ্য ব্যবহারের সবটুকুই তাঁর নিজস্ব নয়, এটা সাংস্কৃতিক। শৈশবে তাঁর সংস্কৃতি। তাঁর ঐতিহ্য। এসব সম্পর্কে আমি কিছুই জানতাম না। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সহৃদয় ক্ষমার জন্য আমি ঈশ্বরকে ধন্যবাদ দিই। আমার বড়দের সামনে হাঁটু গেড়ে বসা, কিংবা ভক্তিতে শুয়ে পড়ার মতো ব্যাপারে আমার নিজেকে হত্যা করতে ইচ্ছে করছে।
১৭৩ নম্বর বাড়িটি এখন আর নেই। নব্বইয়ের দশকের শুরুর দিকে বাড়িটা বিক্রি হয়ে গেছে, ডেভেলপার বাড়িটি গুঁড়িয়ে দিয়ে সেই জমিতে একটি বিল্ডিং ব্লক করেছে।
আমাকে যদি এখন সুযোগ দেওয়া হয় আমি কি আমার শৈশব বদলাব? এ-বাড়ি বদলে ভিন্ন কোনো বাড়ি? ভিন্ন একজন বাবা? আরো কমসংখ্যক ভাইবোন? বাজি ধরলে বলব, একটা সময়ের জন্য ‘হ্যাঁ’।
কিন্তু এখন? চীনের সব চা দিয়ে দিলেও না।

[বার্নার্দিন এভারিস্টো ২০১৯ সালের বুকার পুরস্কার বিজয়ী কথাসাহিত্যিক। পুরস্কৃত উপন্যাসটির নাম গার্ল, ওম্যান, আদার।
বার্নার্দিনের জন্ম লন্ডনে ১৯৫৯ সালে, বাবা নাইজেরিয়ান অভিবাসী, মা ইংরেজ এবং সাদা। মিশ্রমানুষ হলেও কালোর যাতনা নিয়েই আট ভাইবোনের সঙ্গে তাঁকেও বেড়ে উঠতে হয়েছে। তিনি লেখক, সম্পাদক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস : লাভারম্যান, হ্যালো মাম এবং দ্য এমপায়ারার্স বেব।
তিনি মার্গারেট অ্যাটউডের সঙ্গে পুরস্কার ভাগাভাগি করেছেন।]

Leave a Reply

%d bloggers like this: