কী  কুক্ষণেই যে কাজটা করতে গিয়েছিলাম আমি! অফিসে যাওয়ার মুহূর্তে আবিষ্কার করলাম আমার শার্টের একটা বোতাম ছেঁড়া। বাড়তি বোতাম শার্টের সাইডে লাগানো আছে, ওটা খুলে নিয়ে বুকের কাছে স্থাপন করতে হবে। এজন্য সুই-সুতো প্রয়োজন। কাজটা অত সহজ নয় ভেবে আমি মীরার শরণাপন্ন হতে চাইলাম। রান্নাঘরে গিয়ে দেখা গেল, মীরা এক হাতে রন্ধনশিল্পের বই ধরে অন্য হাতে চুলোর পাতিলে খুন্তি নাড়ছে। বোতাম লাগানোর কথাটা বলতে সে বইয়ে চোখ রেখে বলল, দেখছ না এখন আমি কত ব্যস্ত! নতুন একটা আইটেম রান্না করছি। একটু কষ্ট করে তুমিই কাজটা করে নাও না। আলমারির ড্রয়ারে সুই-সুতোর কৌটা রাখা আছে।

স্ত্রীর ব্যস্ততায় অগত্যা নিজেই কাজটা করার উদ্যোগ নিলাম। সৌভাগ্যবশত কৌটায় রাখা সুইয়ে খানিকটা সাদা সুতো পরানো ছিল। শার্টের যথাস্থানে বোতামটা ধরে যখন তার ফুটোয় সুই চালনার জন্য চাপ দিয়েছি, তখনই ঘটল অঘটন। আমার একটা আঙুলে সুই বিঁধে গেল। সুইয়ের আগার বেশ কিছুটা ঢুকে গেল আঙুলের ভেতর। পরক্ষণে সুইটাকে টান দিয়ে বের করে আনলাম। আঙুল থেকে রক্তপাত ঘটল। রক্ত বেশি না হলেও নিজের রক্ত দেখে কে ভয় না পায়?

ঘটনার আকস্মিকতায় কিঞ্চিৎ যন্ত্রণাকাতর আমি মীরাকে ডাকলাম। আমার হাঁক শুনে মীরা রান্নাঘর থেকে চলে এলো। বলল, এই সামান্য কাজটা করতে পারলে না! আজ আর অফিসে যাওয়ার দরকার নেই। তুমি ডাক্তারের কাছে যাও।

ডাক্তার! আমি জানালাম, সকালবেলা ডাক্তাররা তো চেম্বারে বসেন না।

তাহলে হাসপাতালে যাও। এ নিয়ে গাফিলতি করো না। তোমার কি এটিএস দেওয়া আছে? আগে কি অ্যান্টিসেপটিক ইনজেকশন নিয়েছিলে?

তেমন কিছু মনে পড়ছে না।

তুমি মোটেই স্বাস্থ্য সচেতন নও। মীরার কণ্ঠে আক্ষেপের সুর। বলল, যাকগে, তুমি আর দেরি করো না। আমার বড় মামার পায়ে পেরেক বিঁধে সেপটিক হয়ে গিয়েছিল। শেষে পা কেটে বাদ দিতে হয়েছে।

এক বন্ধুকে ফোন করলাম। বন্ধু পরামর্শ দিলো, তুমি গ্রিন সুপার মার্কেটে চলে যাও। সেখানে সকালেও ডাক্তার থাকেন।

গ্রিন সুপার মার্কেটের দোতলায় একজন ডাক্তারের চেম্বার খোলা পাওয়া গেল। কোনো ভিড় ছিল না। চেম্বারের সামনে ডাক্তারের সহকারী বসে ছিলেন। তিনি ভেতরে নিয়ে গেলেন। ডাক্তার ভেতরে বসে পত্রিকা পড়ছিলেন। চশমা চোখে মধ্যবয়সী ভদ্রলোক তিনি। মুখে ফ্রেঞ্চকাট দাড়ি। আমার দিকে তাকিয়ে একপ্রস্থ হাসি দিলেন। বললেন, আপনার জন্য কী করতে পারি জনাব?

আমার হাতে একটা সুই বিঁধে গিয়েছিল। আমি বললাম।

কতক্ষণ আগের ঘটনা এটা?

ঘণ্টাদুয়েক হবে।

সুইয়ের মুখটা কি পোড়ানো ছিল?

না। পোড়ানো থাকবে কেন?

ওই তো ভুল করলেন। এসব সুই-ফুই ব্যবহারের আগে আগা পুড়িয়ে নিতে হয়। সুইয়ের মুখে কতরকম জার্ম থাকতে পারে। খালি চোখে দেখলে কিছু বোঝা যায় না।

আমি শার্টে বোতাম লাগাতে গেছিলাম। সুইয়ের আগায় জার্ম থাকার কথা মনে হয়নি।

ডাক্তার কথাটা শুনলেন কি না বোঝা গেল না। সহকারীকে ডেকে আমার উচ্চতা মাপতে ও ওজন নিতে বললেন। তিনি নিজে আমার প্রেসার মাপলেন। বললেন, প্রেসার তো বেশি দেখছি। আপনি কি প্রেসারের ওষুধ খান?

না।

আপনার কি ডায়াবেটিস আছে?

না।

ছোটবেলায় কোনো বড় ধরনের অসুখ কি হয়েছিল?

হ্যাঁ। একবার নিমুনিয়া (নিউমোনিয়া) হয়েছিল।

ঠিকই ধরেছি। দেখি, আপনি হাঁ করুন।

ডাক্তারের কথায় হাঁ করতে হলো।

এবার আপনার চোখ দেখি। চোখ বড় করে তাকান।

ডাক্তারের চোখ পরীক্ষার পর তার হাত থেকে পরিত্রাণ পেয়ে বললাম, আমার হাতে তো শুধু একটা সুই বিঁধেছিল।

সে-কথা আগেই শুনেছি। ডাক্তার আবার একগাল হাসি বিলিয়ে বললেন, আমার এখানে চিকিৎসা করাতে ‘ফুল বডি চেকআপ’ হয়। আধাআধি কোনো চিকিৎসা আমি করি না। আপনি তো আমার মুখ দেখে এক হাজার টাকা ভিজিট দেবেন না?

আপনার ভিজিট এক হাজার টাকা?

হাফ-বডির ফিজিশিয়ান নই। তাহলে পাঁচশো টাকাই নিতাম।

আমি আর কথা বাড়ালাম না। তিনি হাতের কাছে প্যাডটা টেনে নিলেন। তারপর প্রেসক্রিপশন লিখে কাগজটা আমার দিকে বাড়িয়ে বললেন, এই চারটা টেস্ট করে কাল আবার আসুন। অন্য ডাক্তারদের মতো অযথা রোগীর টেস্ট করিয়ে কমিশন খাই না। মোহাম্মদপুরে আমার একটা ডায়াগনস্টিক সেন্টার আছে। টেস্টগুলো সেখান থেকে করাবেন। অন্য জায়গার টেস্ট আমি অ্যালাও করি না। বুঝতেই পারেন, আজকাল কত ভুয়া ডায়াগনস্টিক সেন্টার গজিয়েছে। সেগুলোর রেজাল্টে কোনো বিশ্বাস নেই।

প্রেসক্রিপশনের কাগজটা হাতে নিয়ে আমি বললাম, ডাক্তার সাহেব! আমাকে কোনো ওষুধ দিলেন না?

আপাতত প্যারাসিটামল দিলাম। টেস্টগুলোর রেজাল্ট না দেখে তো কোনো ওষুধ দেওয়া যায় না। টেস্ট দেখে তারপর ওষুধ।

ডাক্তারের প্রেসক্রিপশনের ওপরের দিকে তাকিয়ে আমি হতবাক। ওপরে বাঁদিকে ইংরেজিতে তার নাম লেখা। পরে লেখা ‘এ টু জেড (ওয়ার্ল্ড)’। আমি ডাক্তারকে জিজ্ঞাসা করলাম, এ-কথাগুলোর অর্থ কী?

ডাক্তার পুনরায় মুখভর্তি হাসি উপহার দিয়ে বললেন, আমার অনেকগুলো ডিগ্রি তো! সেগুলো লিখতে গেলে প্যাডে প্রেসক্রিপশন লেখার জায়গা থাকে না। ফলে ডিগ্রি বিস্তারিত লেখার বদলে ‘এ টু জেড’ সংক্ষিপ্তাকারে লিখে দিয়েছি।

আর ‘ওয়ার্ল্ড’ লেখাটার অর্থ কী?

ওটা ডিগ্রির দেশগুলোর নাম না লিখে এককথায় ‘ওয়ার্ল্ড’ লিখে দেওয়া।

আর কিছু জিজ্ঞাসার ছিল না। পকেট থেকে এক হাজার টাকার নোট বের করে তার হাতে তুলে দিতে মনে কষ্ট অনুভব করলাম। এক পাতা প্যারাসিটামলের দাম এক হাজার টাকা!

বাসায় ফিরে মীরাকে সবিস্তারে ডাক্তারের সব কথা খুলে বললাম। মীরা বলল, তুমি মেডিসিনের ডাক্তারের কাছে কেন গেলে? তুমি ভুল জায়গায় গেছ।

মানে?

তোমার যাওয়া উচিত ছিল একজন সার্জনের কাছে। আঙুল কেটে গেছে, এটা সার্জারির বিষয়।

আঙুল কেটে যায়নি, আঙুলে সুই বিঁধে গেছে।

ওই একই ব্যাপার হলো। আঙুলে একটা মেটালিক বস্তু ঢুকে গিয়ে রক্তপাত হয়েছে। এতে সেপটিক হয়ে যেতে পারে। রীতিমতো সিরিয়াস ব্যাপার। আমার বড় মামার পায়ে পেরেক বিঁধে সেপটিক হয়ে গেছিল। খোদা না করুন, তেমন যদি কিছু হয় –

মীরা তার বড় মামার কথাটা পুরো বলল না। কিন্তু ওর বলার ধরনে আমি ভয় পেয়ে গেলাম। শরীরের ব্যাপার! একটা ছোট বিষয় হঠাৎ বড় হয়ে দেখা দিতে পারে। শারীরিক কোনো কিছুই তুচ্ছ নয়। অবশেষে আমার আগের সেই বন্ধুকে ফোন করলাম। বন্ধু বলল, তোমার তো এখন তাড়া নেই। তুমি সন্ধ্যায় অমুক হাসপাতালে চলে যাও। সেখানে অনেক অভিজ্ঞ প্রফেসর ডাক্তার আছেন। তুমি একজন ভালো সার্জন নিশ্চয়ই পেয়ে যাবে।

বন্ধুর কথামতো হাসপাতালে চলে গেলাম আমি। একজন প্রফেসর সার্জনের হদিস পাওয়া গেল রিসেপশনিস্টের কাছ থেকে। প্রফেসর তিনতলায় বসেন। তার চেম্বারের সামনে গিয়ে দেখা গেল অগণিত ব্যক্তি চেয়ার দখল করে বসে আছে। প্রত্যেকের হাতে একটি করে বড় ব্যাগ। প্রত্যেকেই বয়সে নবীন এবং তারা সকলেই ধোপদুরস্ত পোশাকাদি পরা। এমন দৃশ্য আমি জীবনে দেখিনি। চেম্বারের সামনে যে সহকারী বসে ছিলেন তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, ডাক্তার সাহেব আছেন কি না।

ডাক্তার নন, উনি প্রফেসর। সহকারী বললেন, আছেন। তবে উনি আজ রোগী দেখবেন না। আজ হচ্ছে মেডিক্যাল রিপ্রেজেন্টেটিভ ডে।

মেডিক্যাল রিপ্রেজেন্টেটিভ ডে মানে?

মানে সপ্তাহের একটা দিন উনি মেডিক্যাল রিপ্রেজেন্টেটিভদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।

রোগী না দেখে মেডিক্যাল রিপ্রেজেন্টেটিভদের সঙ্গে সাক্ষাৎ?

আপনি দেখছি কিছুই জানেন না। সহকারী বিগলিতভাবে জানালেন, ওষুধ কোম্পানিগুলো তাদের ওষুধ যাতে প্রেসক্রিপশনে লেখা হয় সেজন্য ডাক্তারদের কাছে প্রতিনিধিদের পাঠায়। তারা ডাক্তারদের জন্য নানা রকম ভেট নিয়ে আসে। বেশিরভাগই ওষুধের স্যাম্পল, ডাক্তারদের দিয়ে যায়।

এত ওষুধ দিয়ে ডাক্তাররা কী করেন?

কী করেন মানে? ওষুধ তো আর ডাক্তাররা নিজেরা সেবন করেন না। তারা ফার্মেসির মালিকদের কাছে তা বিক্রি করে দেন। কেউ কেউ নিজেরাই ফার্মেসি দিয়েছেন। আমি নিজেও একটা ফার্মেসি দিয়েছি। এই কার্ডটা রাখুন। আমার ফার্মেসিতে অন্য দোকানের চেয়ে শতকরা পাঁচ ভাগ কমে ওষুধ কিনতে পারবেন।

আপনি ওষুধ পান কোথায়?

কী যে বলেন! সহকারী বিরক্তস্বরে বললেন, মেডিক্যাল রিপ্রেজেন্টেটিভদের ডাক্তারের ঘরে ঢুকতে হলে আমাকে কিছু নজরানা দিতে হয়।

নজরানা?

হ্যাঁ। প্রত্যেক কোম্পানির প্রোডাক্টস থেকে আমাকেও কিছু স্যাম্পল দিতে হয়। আমি তো কারো কাছ থেকে ঘুস নিই না।

আমি হতাশকণ্ঠে বললাম, আমি জানতাম না, ডাক্তাররা ওষুধ কোম্পানির কাছ থেকে এভাবে ওষুধ নেন।

আপনি সত্যি কিছু জানেন না। ওষুধ তো সাধারণ ব্যাপার। আসল ভেট তো হচ্ছে গাড়ি।

গাড়ি মানে?

গাড়ি মানে কার। সহকারী আমার মুখের দিকে তাকিয়ে যেন পরিহাসের হাসি হাসলেন। বললেন, কদিন আগে একটা বড় ওষুধ কোম্পানি দশজন সিনিয়র প্রফেসরকে একটি করে কার উপহার দিয়েছে। আমাদের প্রফেসর সাহেবও একটি পেয়েছেন। উপহার দেওয়ার ব্যাপারে ওষুধ কোম্পানিগুলোতে রীতিমতো প্রতিযোগিতা চলছে।

কিন্তু আমি একটা জিনিস বুঝতে পারছি না।

কী?

দশটা ওষুধ কোম্পানি যদি একজন ডাক্তারকে বছরে দশটা গাড়ি উপহার দেয়, তাহলে এত গাড়ি দিয়ে তিনি কী করবেন?

সে-অবস্থা এখনো হয়নি। তেমন হলে ডাক্তার সাহেবরা গাড়ির শোরুমও খুলতে পারেন। কিন্তু আপনি একবারে নাদানের মতো প্রশ্ন করছেন।

আমি আসলেই নাদান। মনে মনে আমি বললাম।

একজন দর্শনার্থী চেম্বার থেকে বেরিয়ে যেতে সহকারী বললেন, আপনি অ্যাপয়েন্টমেন্ট চেয়েছিলেন না? দাঁড়ান, আমি প্রফেসর সাহেবের কাছ থেকে জেনে আসি।

সহকারী ভেতরে গেলেন। কিছুক্ষণ পরে ফিরে এসে বললেন, আপনার ভাগ্য ভালো। উনি আপনাকে দু-মাস পরে সময় দিয়েছেন।

দু-মাস পরে?

হ্যাঁ। অনেককে তিন মাস পরেও অ্যাপয়েন্টমেন্ট দেন। তবে একটা শর্ত আছে।

কী শর্ত?

আপনাকে অন্য কোনো ডাক্তারের কাছ থেকে প্রেসক্রিপশন রেফার করিয়ে আনতে হবে। উনি কখনো সরাসরি রোগী দেখেন না। সিনিয়র প্রফেসর তো!

আমার ব্যাপারটা জরুরি। আমি কাতরকণ্ঠে জানালাম, গতকাল আমার হাতের আঙুলে একটা সুই বিঁধেছিল।

সহকারী বিরস মুখে বললেন, জরুরি হলে ইমার্জেন্সিতে যান। এখানে এসেছেন কেন? এখানে জরুরি পেশেন্টদের দেখা হয় না।

আর ডাক্তারের খোঁজ না করে হতোদ্যম হয়ে বাসায় ফিরে এলাম। নিজের ঘরে একান্তে বসে মনে হলো গত দুটো দিন অকারণে অফিস কামাই করেছি। অফিসের বসকে অবশ্য টেলিফোনে বলে রেখেছিলাম আমি খুবই অসুস্থ। বস আমার প্রতি সর্বদাই সংবেদনশীল। বিকেলে নিজে ফোন করে জানিয়েছিলেন আমাকে তিনি দেখতে আসবেন। কখন দেখতে আসেন সেই ভয়ে আমি নিজেই তাকে ফোন করলাম। জানালাম, আমি সুস্থ হয়ে গেছি। আগামীকাল থেকে অফিসে যাব।

একসময় ঘরে ঢুকল মীরা। আমার কাছে এসে বলল, কখন এসেছ? আমাকে জানাওনি যে! এভাবে বসে আছ কেন?

এমনি।

ডাক্তারের দেখা পেয়েছিলে। কী বললেন তিনি? কোনো ওষুধ দিয়েছেন?

আমি তার কথার উত্তর না দিয়ে বললাম, মীরা! আমাদের বাসায় কি কোনো ডেটল বা স্যাভলন আছে?

ডেটল বা স্যাভলন দিয়ে কী হবে? বললাম, হাতের আঙুলে একটু লাগিয়ে নেব। ওগুলো তো অ্যান্টিসেপটিক। আঙুলে যাতে সেপটিক না হয়, সেজন্য।

Leave a Reply