আরোগ্য লাভের জন্য মো ইয়াং

লেখক:

অনুবাদ : সম্পদ বড়ুয়া

সেদিন বিকেলবেলা সামরিক বাহিনীর একটা ছোট্ট দল সদর রাস্তামুখী মাআ কুইসানের বাড়ির সাদা দেয়ালে একটি নোটিশ টানিয়ে গেল। নোটিশে বলা হয়েছে, পরের দিন সকালে বরাবরের মতো জিয়াও নদীর সেতুমুখে প্রাণ-সংহার অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হবে।  থেকে শিক্ষা গ্রহণের জন্য সকল স্বাস্থ্য-সমর্থ গ্রামবাসীকে উপস্থিত থাকতে হবে। এ-বছর এ-ধরনের আরো অনুষ্ঠান হয়েছে বলে অনেকে এতে উৎসাহ হারিয়ে ফেলেছে। তাই সবাইকে ওই স্থানে জড়ো করার একমাত্র উপায় হচ্ছে হাজিরা বাধ্যতামূলক করা।

ঘরের ভেতর এখনো আলকাতরার কালো অন্ধকার। বাবা জেগে উঠে সলতের প্রদীপ জ্বাললেন। ডোরাকাটা জ্যাকেট পরে তিনি আমাকে ঘুম থেকে ডেকে তুলে বিছানা থেকে বের করে আনার চেষ্টা করলেন। কিন্তু এত ঠান্ডা যে, আমি কাঁথার ভেতর লেপ্টে থাকতে চাইলাম। শেষে বাবা কাঁথাটি টেনে সরিয়ে দিলেন। ‘তাড়াতাড়ি ওঠ’, বাবা বললেন, ‘সেনাদলটি সকাল সকাল তাদের কাজ শেষ করতে চাইবে। দেরি করলে আমরা সুযোগ হারাব।’

আমি গেট পর্যন্ত বাবাকে অনুসরণ করলাম। পূর্বদিকের আকাশ ধীরে-ধীরে আলো ছড়াচ্ছে। রাস্তা বরফের মতো ঠান্ডা, কোনো কোলাহল নেই। সারারাত উত্তর-পশ্চিম থেকে ঝড়ো বাতাসে ধুলো সাফ হয়ে গেছে। ধূসর রাস্তা পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। ঠান্ডায় আমার আঙুল আর পায়ের গোড়ালি এমন হয়েছে যে, মনে হচ্ছে ওগুলোকে বিড়াল চিবিয়ে খেয়েছে। মাআ পরিবারের সীমানায় যেখানে সেনাদল আস্তানা গেড়েছে, ওটা পার হতেই দেখি জানালায় আলোর রেখা। হাঁপরের মতো শব্দ শোনা গেল। বাবা নিচুস্বরে বললেন – ‘জোরে পা চালা, সেনাদলের লোকেরা প্রাতরাশ খাচ্ছে।’

বাবা আমাকে নদীর পাড়ের ওপর টেনে তুলে নিলেন। ওখান থেকে আমরা পাথরব্রিজের অন্ধকারাচ্ছন্ন সীমারেখা আর নদীগর্ভের খালি জায়গায় বরফের আবরণ দেখতে পাচ্ছি। ‘আমরা লুকোনোর জন্য কোথায় যাচ্ছি বাবা?’

‘সেতুর নিচে।’

সেতুর নিচে কালো অন্ধকার, কোনো লোকজন নেই। ঠান্ডার কথা নাইবা বললাম। আমার মাথার চামড়া কাঁটার মতো বিঁধছে। বাবাকে বললাম – মাথায় এরকম হুল ফুটছে কেন?

‘আমারও’ – বাবা বলছেন, ‘তারা এখানে অনেক লোককে গুলি করেছে, সেসব অন্যায়কারীর ভূত সবখানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে।’

সেতুর নিচে অন্ধকারে গায়ে পশম আছে এমন প্রাণীদের নড়াচড়া আমার চোখে পড়ে, আমি চিৎকার করে উঠি – ‘ওই যে অন্যায়কারীর দল!’

‘ওইগুলো অন্যায়কারী ভূত নয়’ বাবা বললেন, ‘ওরা মৃতদের মাংসখেকো কুকুর’।

আমি পেছনে সরে আসতে থাকি, যতক্ষণ না সেতুর পিলারে হাড়-কাঁপানা ঠান্ডার স্পর্শ আমাকে দুম করে আঘাত করল। তখন মনে পড়ে গেল দাদির কথা, যার চোখদুটোতে ছানি পড়ার কারণে অন্ধকার নেমে এসেছে। পশ্চিমাকাশের তিনটি তারা থেকে ঠান্ডা আলো সেতুর নিচে মিলিয়ে যেতে-যেতে আকাশ পরিপূর্ণভাবে আলোয় ভরে উঠেছে। বাবা তার সিগারেটের পাইপ জ্বালালেন। তামাকের গন্ধ সহসা আমাদের আবিষ্ট করে রাখল। ‘বাবা, আমি কি বাইরে যেতে পারি? ঠান্ডায় জমে যাচ্ছি।’ আমার ঠোঁটদুটো যেন অবশ হয়ে যাচ্ছে।’

‘দাঁতে দাঁত ঘষ, সকালের সূর্য লাল হলেই সেনাদল বন্দিদের হত্যা করবে।’

‘এ-সকালে তারা কাদের গুলি করবে বাবা?’

‘জানি না, তবে সহসা জানতে পারব’ বাবা বললেন, ‘আমি আশা করছি, তারা কিছু যুবককে মারবে।’

‘কেন?’

‘তরুণদের শরীর সতেজ থাকে। ভালো ফল পাওয়া যায়।’

আমার আরো অনেক কিছু জানার ছিল; কিন্তু বাবা ইতোমধ্যে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছেন – ‘আর কোনো প্রশ্ন নয়। এখানে নিচে আমরা যা যা বলছি সব ওপরে শোনা যাবে।’ আমরা যখন কথা বলছি, ততক্ষণে আকাশ মাছের পেটের মতো সাদা হয়ে গেছে। গ্রামের কুকুরগুলো নিজেদের মধ্যে সন্ধি করে উচ্চৈঃস্বরে ঘেউ-ঘেউ করছে, তবে তা অনেক দূরে নারীদের বিলাপের শব্দকে চেপে রাখতে পারছে না। বাবা আমাদের লুকানো স্থান থেকে বেরিয়ে এসে কিছুক্ষণের জন্য নদীগর্ভের কাছে এসে দাঁড়ালেন। গ্রামের দিকে তাঁর কানদুটো খাড়া করে রাখলেন। এখন আমি সত্যি-সত্যি নার্ভাস হয়ে পড়লাম। শিকারের সন্ধানে সেতুর নিচে ঘুর-ঘুর করে ধাঙড় কুকুরগুলো আমার দিকে এমনভাবে তাকাচ্ছে, যেন তারা আমার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ছিন্নভিন্ন করে ফেলবে। আমি জানি না, কীভাবে কত তাড়াতাড়ি সম্ভব এ-অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসব। বাবা মাথা নিচু করে গুটিসুটি মেরে ফিরে এলেন। ভোরের মৃদু আলোয় তাঁর ঠোঁটদুটি কাঁপতে থাকে। জানি না, এটা কি ঠান্ডায় নাকি ভয়ে হচ্ছে।

‘আপনি কি কিছু শুনতে পাচ্ছেন?’

‘চুপ থাক’ বাবা ফিসফিসিয়ে বলেন, ‘তারা শিগগির এখানে আসবে। আমি শুনতে পাচ্ছি, তারা দন্ডিতদের বেঁধে নিয়ে যাচ্ছে।’

আমি বাবার কাছে সরে আসি এবং একসময় আগাছার ঝাড়ের ওপর বসে পড়ি। কান খাড়া করলে গ্রামের দিক থেকে বড় ঘণ্টার শব্দ শুনতে পাই। সঙ্গে শোনা গেল একজন পুরুষের কর্কশ কণ্ঠ – ‘গ্রামবাসী, প্রাণসংহার দেখার জন্য সেতুমুখের দক্ষিণে চলে যাও। অত্যাচারী জমিদার মাআ কুইসান – তার স্ত্রী-ক্রীড়নক গ্রামের মাতবর লুয়ান ফেংসানকে গুলি করো। সেনাদলের চিফ জ্যাংয়ের নির্দেশ তাই। যারা যাবে না, তারা অপরাধীর সহযোগী হিসেবে শাস্তি পাবে।’

বাবাকে বিড়বিড় করে বলতে শুনি – কেন তারা কুইসানকে এরকম করছে? কেন তাকে গুলি করবে? গুলি করার জন্য সে-ই তো হবে শেষ ব্যক্তি।

আমি বাবার কাছে জানতে চাচ্ছিলাম, কেন কুইসানকে গুলি করা উচিত হবে না; কিন্তু মুখ খোলার আগেই বন্দুকের শব্দ শুনি। একটা বুলেট শোঁ-শোঁ শব্দ করে পাশ কেটে দূর আকাশের কোথাও মিলিয়ে গেল। তারপর আমাদের দিকে ঘোড়ার ক্ষুরের শব্দ আসতে শুরু করল, যা সেতুমুখে গিয়ে শেষ হয়েছে। যখন তারা মেঝেতে আঘাত করল, একটা ধাবমান ঘূর্ণাবর্তের মতো ক্রমাগত ঠুনঠুন শব্দ করতে থাকল। আমি আর বাবা একটু পিছিয়ে গেলাম, পাথরের ভাঙা টুকরোর ফাঁকে-ফাঁকে সূর্যের আলোর রুপালি বর্ণচ্ছটা নেমে এসেছে, যা আমাদের চোখে পড়ল। আমরা দুজনেই ভয় পেলাম। জানি না কী ঘটতে যাচ্ছে। পাইপে তামাক খাওয়া অর্ধেক মাত্র শেষ হয়েছে, এমন সময় আমাদের দিকে লোকজনের আসার শব্দ পাই। তারা চিৎকার আর উচ্চৈঃস্বরে দাবি জানাচ্ছে। আমি একজন লোকের গলা শুনতে পেলাম, পাতিহাঁসের মতো যার প্যাঁক-প্যাঁক কণ্ঠ। বলছে – তাকে যেতে দাও, ধিক। আমরা তাকে কখনো ধরব না।

প্রাণির ক্ষুরের শব্দ যেখানে শোনা যাচ্ছে, সেদিক থেকে কয়েকটা গুলির শব্দ শোনা গেল। আমরা যেখানে লুকিয়ে আছি তার দেয়ালের প্রতিধ্বনি হলো। বারুদের কড়া গন্ধ ভেসে এলো।

‘তোমরা কোন শালাকে গুলি করছ? এতক্ষণে সে পরের দেশে চলে গেছে। প্যাঁক-প্যাঁক কণ্ঠ আবার শোনা গেল।

‘সে এ-ধরনের কিছু করতে পারে আমি কখনো ভাবতে পারিনি’, কেউ একজন বলল, ‘চিফ ঝ্যাং, সে অবশ্যই একজন খেতিমজুর হবে।’

‘আমাকে জিজ্ঞেস করলে আমি বলব, সে জোতদারগোষ্ঠীর একজন বাড়াটে কুকুর।’ পাতিহাঁসের গলায় উত্তর এলো।

সেতুর রেলিং বরাবর কেউ একজন হেঁটে এসে একপাশে প্রস্রাব করে দিলো, যার বিশ্রী কটু গন্ধ চারদিক দখল করে নিল।

‘আসো, আমরা ফিরে যাই’, আবার প্যাঁক-প্যাঁক শব্দে লোকটা বলে ওঠে, ‘একটা প্রাণ নিধনকাজে আমাদের থাকতে হবে।’

বাবা আমার কানে ফিসফিসিয়ে বললেন, ‘হাঁসের মতো গলা যার, সে হচ্ছে সামরিক ছোট দলের প্রধান। জেলা সরকার তাঁকে অতিরিক্ত দায়িত্ব দিয়েছে দলের মধ্যে বিশ্বাসঘাতকদের সমূলে উৎপাটিত করতে। তাকে বলা হয় চিফ ঝ্যাং।

পূর্বদিকে আকাশ ধীরে ধীরে ফ্যাকাশে লাল হতে শুরু করেছে যেখানে পাতলা, নিচে ঝুলে থাকা মেঘদল আস্তে-আস্তে চোখে পড়ছে। তারাও অনেকটা ফ্যাকাশে। এখনো যথেষ্ট আলো আছে যার ফলে আমাদের লুকানো জায়গার মাটিতে পশুর হিমায়িত বিষ্ঠাপিন্ড, ছিঁড়ে বেরিয়ে আসা কাপড়ের টুকরো, চুলের গোছা, ক্ষয়ে যাওয়া করোটি চোখে পড়ে। দৃশ্যটা এত জঘন্য যে আমি অন্যদিকে চোখ সরিয়ে নিই। বরফ-আচ্ছাদিত এখানে-ওখানে বিস্তৃত আচ্ছাদিত ছোট গর্তগুলো ছাড়া পুরো নদীগর্ভ হাড়ের মতো শুকনো। শিশিরের চিহ্ন নিয়ে আগাছার ঝোপ ঢালুর কিনারে দাঁড়িয়ে আছে। উত্তরের বাতাস কোথায় হারিয়ে গেল। বাঁধের ওপর বৃক্ষরাজি ঠান্ডা হাওয়ায় কঠিন আর নিশ্চল হয়ে থাকে। আমি বাবার দিকে ঘুরে দাঁড়াই। তাঁর নিশ্বাসের শব্দ টের পাই। এখন সময় হচ্ছে স্থির দাঁড়িয়ে থাকা। বাবা বললেন, ‘এই তারা এসে গেছে’।

সেতুমুখে সংহার পার্টির আগমনবার্তা একটি ধাতু-নির্মিত ঘণ্টায় প্রচন্ড পেটানোর শব্দ এবং নিঃশব্দ পদধ্বনির মাধ্যমে উচ্চারিত হলো। হঠাৎ গুরুগম্ভীর একটি কণ্ঠস্বর ভেসে এলো – চিফ ঝ্যাং, চিফ ঝ্যাং, সারাজীবন আমি ভালো মানুষ হিসেবে থেকেছি…।’

‘উনি হচ্ছেন মাআ কু্ইনাস’ বাবা ফিসফিসিয়ে বললেন।

আরেকটা শব্দ শোনা গেল, অনেকটা একঘেঁয়ে, আবেগে বিদীর্ণ। ‘চিফ ঝ্যাং, করুণা করুন, গ্রামের প্রধান কে হবে সেটা দেখার জন্য আমরা অনেক প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছি… আমি কাজটা করতে চাইনি… আমরা অনেকবার বাজি ধরেছি… আমার ভাগ্য খারাপ… আমি হেরেছি… চিফ ঝ্যাং, করুণা করুন, আমার এ অশান্ত অস্থির জীবন মাফ করে দিন… বাড়িতে আমার আশি বছরের বৃদ্ধ মা আছে… তার দেখাশোনা আমাকেই করতে হয়…।

‘ওটাই লুয়ান ফেংসান’ বাবা কানে-কানে বললেন।

এর পরেই উচ্চৈঃস্বরে একটি কণ্ঠ শোনা গেল – ‘চিফ ঝ্যাং, তুমি যখন আমার বাড়িতে এসেছিলে আমি তোমাকে ভালো আপ্যায়ন করেছি। আমাদের থাকা সবচেয়ে ভালো পানীয় তোমাকে দিয়েছি। আমার আঠারো বয়সের মেয়েকে তোমার যা যা প্রয়োজন তা দেখাশোনার জন্য নিযুক্ত করেছি। চিফ ঝ্যাং, তোমার তো ইস্পাতকঠোর হৃদয় থাকার কথা নয়, আছে কি?

বাবা বললেন, গলাটা কুইসানের স্ত্রীর।

সবশেষে আমি একজন মহিলার গর্জন শুনলাম। ‘ও…লা…অ্যাঁ…ইয়া…’। বাবা জানালেন, ওটা লুয়ান ফেংসানের বোবা স্ত্রীর গলা।

শান্ত অভাবিত স্বরে চিফ ঝ্যাং বললেন, ‘তোমরা হইচই করো আর না করো, তোমাদের আমরা গুলি করতে যাচ্ছি। সুতরাং সকল চিৎকার বন্ধ করো। সবাইকে একসময় মরতে হবে। তোমরা যেহেতু আগে মরতে যাচ্ছ, তাই আর কারো রূপ ধরে তোমরা আগেই ফিরে আসতে পারো।’

তখনি কুইসান জনতার সামনে চিৎকার করে বলতে থাকে, ‘তোমরা যারা এখানে আছো, যুবক, বৃদ্ধ, জেনে রেখো, আমি মাআ কুইসান কখনো তোমাদের ক্ষতি করিনি। এখন আমি তোমাদের বলছি, আমার জন্য তোমরা কিছু একটা বলো…।’

কিছু লোক শব্দ করে হাঁটু গেড়ে বসল আর মরিয়া হয়ে প্রার্থনা জানাল, ‘দয়া করুন চিফ ঝ্যাং, তাদের বাঁচতে দিন। তারা সৎ লোক ছিল। তাদের সবাই…।’

সকল কোলাহল ছাপিয়ে এক যুবকের কণ্ঠ ভেসে এলো, – ‘চিফ ঝ্যাং, আমি বলি এই চার জারজ কুকুরের হাতগুলো এখন সেতুর ওপর নামিয়ে এনে শতবার সাষ্টাঙ্গ প্রণাম করুক। তাহলে আমরা তাদের দুঃসহ জীবন ফিরিয়ে দিতে পারি। কী বলেন আপনি?’

‘গাও রেনশান! আপনি ভালো ধারণাই রপ্ত করেছেন, ‘চিফ ঝ্যাং ভয় দেখানো স্বরে বললেন, ‘আপনি কি বোঝাতে চাচ্ছেন আমি দানবের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নেওয়ার চেষ্টা করছি? আপনার কথায় মনে হচ্ছে, আপনি দীর্ঘদিন মিলিশিয়ার প্রধান হিসেবে কাজ করেছেন। ওহে গ্রামবাসী, এখন সবাই দাঁড়িয়ে যাও। এই ঠান্ডায় এভাবে হাঁটু গেঁড়ে বসে থাকা যায় না। আমাদের নীতি পরিষ্কার। এদেরকে কেউ রক্ষা করতে পারবে না, তাই সবাই উঠে পড়ো।’

‘ওগো গ্রামবাসী, আমার জন্য কিছু বলো…’ কুইসান আবার মিনতি করে। ‘আর সময় নষ্ট করা যাবে না’, ‘চিফ ঝ্যাং তাকে থামিয়ে দিলো, সময় হয়ে গেছে।’

‘ছাড়ো জায়গা, ছেড়ে দাও’ সেতুর মাথায় বেশ কিছু যুবক দাঁড়িয়ে। সামরিক বাহিনীর দলের সদস্যরা সেতুর ওপর হাঁটু গেড়ে বসে থাকা লোকদের সরিয়ে দিলো।

কুইসান তখন ঈশ্বরের কাছে আবেদন জানালেন, ‘ওহে আকাশে অবস্থানকারী বৃদ্ধ লোক, তুমি কি অন্ধ? আমি কুইসান সারাজীবনের সুকৃতির জন্য এখন মাথায় গুলি খেতে যাচ্ছি। ঝ্যাং কুদে, বেশ্যার ছেলে তুই, তোর মরণ বিছানায় হবে না, মনে রাখিস। জারজ     সন্তান কোথাকার।’

‘একে দিয়ে শুরু করো’, চিফ ঝ্যাং গর্জন করে ওঠে, ‘নাকি তুমি তার মুখ থেকে বিষাক্ত কথা শুনতে চাও?’

আমাদের মাথায় সেতুর ওপর অনেকগুলো পায়ের শব্দ দ্রুত পার হলো। পাথরের মাঝে মাঝে ফাটল দিয়ে আমি লোকজনের উপস্থিতি টের পাচ্ছি। ‘শুয়ে পড়ো’, সেতুর দক্ষিণ দিক থেকে কেউ একজন আদেশ করল। ‘সবাই পথ ছেড়ে দাও’ উত্তর প্রান্ত থেকে উচ্চস্বর ভেসে এলো।

ঠুস, ঠুস, ঠুস – তিনবার গুলির শব্দ। আমার কানের পর্দায় এমন আঘাত করল, এক পর্যায়ে মনে হলো আমি বধির হয়ে গেছি। ইতোমধ্যে সূর্য পূর্বদিকের অনেকখানি ওপরে উঠে এসেছে, বৃত্তাকারে রক্তলাল আভা ছড়িয়ে দিয়েছে মেঘদলের কাছে, যেন মনে হচ্ছে বড় বড় দেবদারু বৃক্ষরাজির ওপর চাঁদোয়া দীপ্তি। একটি বড়, স্থূল, মানবীয় শরীর সেতু থেকে ধীরে-ধীরে গড়াগড়ি খেয়ে নিচে নেমে আসছে। মেঘের মতো অপস্রিয়মাণ গতি তার। যখন ওটা নিচে বরফময় ভূমিতে এসে ঠেকল, তখন তার স্বাভাবিক ভর ফিরে এলো এবং ধপ্ করে শব্দ হয়ে সব থেমে গেল। মাথা থেকে স্ফটিকতুল্য রক্তের ধারা ফোঁটায়-ফোঁটায় ঝরতে লাগল।

উত্তরের সেতুমুখে সবার ভেতর ভয় এবং দ্বিধা কাজ করছে বলে আমার মনে হলো। এ-প্রাণসংহার দেখার জন্য যেসব গ্রামবাসীকে জোর করে আনা হয়েছে তারা প্রচন্ড শক্তি নিয়ে চারদিকে ছোটাছুটি করছে। আবার সেতুর উত্তর থেকে দক্ষিণে পায়ের শব্দ শোনা গেল। এরপরই দক্ষিণের সেতুমুখে চিৎকার ‘হাঁটু গেড়ে বসো’। উত্তর দিক থেকে শব্দ এলো – ‘পথ ছাড়ো’। আবার তিনিট গুলির শব্দ – লুয়ান ফেংসানের দেহ – মাথায় টুপি নেই, গায়ে ছেঁড়া কোট, পায়ে গোড়ালিতে মাথা গড়াগড়ি খেয়ে নিচে নদীতীরে নেমে গেছে। প্রথমে কুইসানের ওপর দুম করে গিয়ে পড়ল তার শরীর, পরে গড়াগড়ি খেয়ে একপাশে পড়ে রইল।

এরপরের বিষয়গুলো অনেকটা সহজ করা হলো। একসঙ্গে গুলিবর্ষণের সঙ্গে সঙ্গে দুজন মহিলার মৃতদেহ গড়িয়ে-গড়িয়ে নিচে নেমে এলো। তাদের বাহু আর পাগুলো ছড়িয়ে যেতে চাচ্ছে এবং শেষে পুরুষদের মৃতদেহের ওপর এসে আছড়ে পড়ল। আমি বাবার হাত জোরে চেপে ধরি। আমার নরম পাজামার বিপরীতে তাঁর হাতটা গরম কিন্তু ভেজা মনে হলো। নিদেনপক্ষে অর্ধডজন লোক সেতুর ওপর মাঝ বরাবর দাঁড়িয়ে আছে। মনে হচ্ছে, তাদের শরীরের চাপে সেতুর তলা আমাদের মাথার ওপর ভেঙে পড়বে। তাদের ভয়ংকর চিংকার আমাদের কান বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম – ‘চিফ, আমরা কি মৃতদেহগুলো দেখে আসব?’

‘গোল্লায় যাক, তাদের মগজ পুরো জায়গায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে গেছে। জেইড সম্রাট স্বয়ং এখানে হাজির হলেও তিনি তাদের রক্ষা করতে পারবেন না।’

‘চলো যাই। বৃদ্ধ গাউয়ের স্ত্রী মটরশুঁটির দই আর তেলের ঘুগলি গাঁজিয়ে তুলেছে, যা আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে।’

তারা উত্তরদিকে সেতু পার হলো, তাদের পায়ের শব্দ পর্বতগাত্র থেকে তুষারস্তূপ পতনের মতো মনে হলো। সেতুর মেঝেতে ক্যাচ-ক্যাচ শব্দ এবং দ্রুত পদসঞ্চারণে মনে হয়, যে-কোনো সময় তা ভেঙে পড়বে। আবার নিস্তব্ধতা ফিরে এলো। বাবা কনুইয়ের গুঁতো দিয়ে বললেন, ‘বোকার মতো ওখানে দাঁড়িয়ে থাকিস না। চল, কাজে নেমে পড়ি।’

আমি চারদিকে তাকালাম কিন্তু কিছুই বুঝতে পারলাম না। ‘যাক, আমি নিশ্চিত, সকল কিছুর ব্যবস্থা আমি করে নিয়েছি।’

‘তুই ভুলে গেছিস’, বাবা বললেন, আমরা এখানে এসেছি তোর দাদির আরোগ্যলাভের জন্য। শব-ছিনতাইকারী আসার আগেই আমাদের দ্রুত কাজ সারতে হবে।’

যখন আমি সাত-আটটা বন্য কুকুর দেখলাম, কথাগুলো বারবার আমার কানে বাজতে লাগল। কুকুরগুলোর গায়ের রং বিচিত্র, তাদের দীর্ঘ ছায়া আমাদের দিকে বিস্তৃত নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। তারা আমাদের দিকে তাকিয়ে ডাক দিচ্ছিল। আমি শুধু ভাবছি প্রথম গুলির শব্দে তারা কীভাবে ভয়ার্ত চিৎকার দিয়ে প্রথমে ঘুরে দাঁড়াল এবং পরে দৌড় দিয়েছিল।

আমি লক্ষ করি, বাবা পা দিয়ে কিছু খসানো নুড়ি বের করে সজোরে সামনে আসা কুকুরগুলোর দিকে ছুড়ে মারলেন। এতে তারা দূরে সরে গেল। বাবা কোটের ভেতর থেকে একটি মাংস কাটার ছুরি বের করে আনলেন। ছুরিটা শূন্যে আন্দোলিত করলেন ভয় দেখানোর জন্যে। বাবার শরীরের অন্ধকার ছায়াবৎ রেখার চারপাশে সুন্দর রুপালি আলোকচ্ছটা চমক দিয়ে যেতে লাগল। কুকুরগুলো কিছু সময়ের জন্য দূরত্ব বজায় রাখল। বাবা এবার তাঁর কোমরের বাঁধন আরো শক্ত করলেন আর জামার আস্তিন গুটালেন।

‘আমার দিক থেকে চোখ সরিয়ে নে। বাইরের দিকে লক্ষ রাখ।’

ঈগল যেভাবে তার শিকারের ওপর ছোঁ মারতে ছুটে আসে, বাবা তেমনি এসে মহিলাদের শবগুলো টেনে একপাশে সরিয়ে রাখলেন।  তারপর কুইসানের শরীর এমনভাবে ওপরে ঘুরিয়ে দেন যেন তার চোখ ওপরের দিকে নিবদ্ধ থাকে। এবার হাঁটু গেঁড়ে বসলেন এবং লুটিয়ে তাকে প্রণাম করলেন। ‘দ্বিতীয় প্রভু কুইসান’, বাবা সুর করে পাঠ করতে থাকেন – ‘ভক্তি এবং রক্তজাত সম্পর্কগুলোর নিজস্ব সীমাবদ্ধতা আছে। তোমাকে দিয়ে আমার এ-কাজটাকে সত্যিই আমি ঘৃণা করি।’ আমি লক্ষ করি, কুইসানের রক্তাক্ত মুখ মুছে গেছে। ‘ঝ্যাং কোদে’, বাবা একটু হেসে বললেন, ‘তুমি কিন্তু বিছানায় মরবে না।’

বাবা একহাতে কুইসানের চামড়ার কোটের বোতাম খোলার চেষ্টা করলেন কিন্তু এত জোরে কাঁপছিলেন যে, সামলাতে পারছেন না। তিনি ডাক দিলেন ‘দ্বিতীয় ছেলে আমার, ছুরিটা ধর তো।’

ছুরিটা নেবার জন্য আমি অগ্রসর হই। কিন্তু ততক্ষণে তিনি তা মুখে চেপে রাখলেন, কারণ তখনো তিনি কুইসানের বুকের নিচে হলুদ বোতামগুলো খোলার চেষ্টা করছেন। বোতামগুলো গোলাকার, স্বর্ণালী, হলুদাভ এবং অনেকটা মটরশুঁটির দানার মতো বড়। কাপড়ের সঙ্গে তা এমনভাবে জড়িয়ে আছে যে, আলাদা করা কঠিন হয়ে পড়েছে। অধৈর্য হতে হতে বাবা সেগুলো কেটে ছিঁড়ে আলগা করে ফেললেন, হেঁচকা টেনে কোটটা খুলে নিলেন, কোটের ভেতরের নরম চামড়ার আবরণ বেরিয়ে এলো। গেঞ্জির মতো রেশমি কাপড়েও একই রকম বোতাম থাকায় বাবা সেগুলোকেও কেটে আলগা করে ফেললেন। এরপরই এলো রেশমি আবরণ। বাবা অধৈর্য হয়ে ফোসফাস করছেন আমি শুনতে পাচ্ছি। সত্যিই অবাক হলাম যখন দেখি পঞ্চাশোর্ধ্ব এ মোটা লোকটি সাধারণ কাপড়ের নিচে এ-ধরনের জমকালো পোশাক পরে আছে। বাবাকে মনে হলো অসম্ভব রেগে আছেন, তিনি শরীর থেকে এসব কেটে ছিঁড়ে একপাশে ছুড়ে মারলেন। শেষ পর্যায়ে কুইসানের গোল পেট আর চ্যাপ্টা বুক বেরিয়ে এলো। বাবা হাত বাড়ালেন কিন্তু পরক্ষণই পা গুটিয়ে বসলেন। তাঁর মুখে সোনালি আভা। বললেন, ‘দ্বিতীয় পুত্র আমার, দেখ তো, ওর হৃদ্স্পন্দন হচ্ছে কি-না!’

মনে আছে, আমি উবু হয়ে ওর বুকের ওপর হাত রাখি। খরগোশের বুকের চেয়েও কেমন যেন শক্ত। তবে হৃৎপিন্ড তখনো নড়ছে। ‘দ্বিতীয় প্রভু কুইসান’, বাবা তখন বলেন, ‘তোমার মাথার মগজ ছিটকে মাটিতে পড়ে আছে, জেইড সম্রাটও এখন আর তোমাকে রক্ষা করতে পারবে না, সুতরাং সন্তানোচিত ব্যবহার করে আমাকে সাহায্য করো – কী বলো!’

বাবা দাঁতে কামড়ে-ধরা ছুরিটা নিয়ে তা বুকের ওপরে-নিচে ওঠানামা করলেন, যাতে কাটার ঠিক জায়গাটা পেয়ে যান। আমি তাঁকে নিচের দিকে চাপ দিতে দেখলাম; কিন্তু ওখানে রাবারের টায়ারের মতো চামড়া অক্ষত থেকে উলটোদিকে ঠেলে দিলো। তিনি আবার নিচে চাপ দিলেন, ফল এবারও একই হলো। বাবা এবার হাঁটু গেঁড়ে বসলেন। বললেন, ‘দ্বিতীয় প্রভু কুইসান, আমি জানি মৃত্যু তোমার প্রাপ্য নয়, তবে তোমার যদি কারো বিরুদ্ধে নালিশ থাকে সেটা চিফ ঝ্যাং, আমি নই। আমি বাধ্য সন্তানের মতো থাকার চেষ্টা করছি।’

বাবা ছুরি দিয়ে মাত্র দুবার নিচে চাপ দিলেন, তাঁর কপাল ইতোমধ্যেই একেবারে ঘেমে গেছে, মুখের খোঁচা-খোঁচা দাড়ি সাদা তুষারকণায় ভেজা। অভিশপ্ত বন্য কুকুরগুলো আস্তে আস্তে আমাদের কাছাকাছি চলে আসে। গরম জ্বলন্ত কয়লার মতো তাদের চোখ। গলার কাছে পশম সজারুর কাঁটার মতো খাড়া হয়ে আছে। তাদের তীক্ষ্ণ ধারালো নখরগুলো অনাবৃত, আমি বাবার দিকে ঘুরে বললাম, ‘তাড়াতাড়ি করুন, কুকুরগুলো এসে পড়ল।’

বাবা দাঁড়িয়ে গেলেন। হাতে থাকা ছুরিটি মাথার ওপর ঘুরিয়ে এরপর বন্য কুকুরগুলোকে আক্রমণ করলেন। দৃষ্টিসীমার প্রায় অর্ধেক পিছু হটিয়ে দিলেন তাদের। তারপর তিনি দৌড়ে ফিরে এলেন; নিশ্বাস পড়ছে না, উচ্চৈঃস্বরে বললেন, ‘দ্বিতীয় প্রভু আমার, আমি যদি আপনাকে কেটে খুলে না ফেলি, কুকুরগুলো দাঁত দিয়ে তা করে ফেলবে। মনে হয় তাদের চেয়ে ওটা আমিই করি – সেটাই ভালো হবে।’

বাবার চোয়াল শক্ত, স্থির, চোখ দুটো স্ফীত, দৃঢ় সংকল্প নিয়ে তিনি হাত নামিয়ে আনলেন। কুইসানের বুকে ছুরিটা শব্দ করে ঢুকে গেল, ছুরির একেবারে হাতল পর্যন্ত। একপাশে ছুরিটাকে একটু ঝাঁকুনি দিলেন, কালো রক্তের ধারা বেরিয়ে এলো কিন্তু পাঁজরের খাঁচা তার গতিকে থামিয়ে দিলো। ‘আমি মাথা গুলিয়ে ফেলেছি’ – কিছুটা টেনে আনতে-আনতে বাবা বললেন। কুইসানের চামড়ার কোটে ছুরিটা মুছে নিলেন। এবার ছুরির হাতলটা শক্ত করে ধরে বুকটা কেটে খুলে ফেললেন।

আমি বুদ্বুদের শব্দ শুনলাম। লক্ষ করি, ছুরিটা চামড়ার নিচে মেদবহুল কোষের ভেতরে গিয়ে ফালি-ফালি করে কেটে ফেলল। সাপের মতো, পিচ্ছিল বান মাছের মতো মোচড়ানো হলদে অন্ত্রকে বের করে দিলো। চারদিকে উগ্র পূতিগন্ধ।

অন্ত্রের ভেতর থেকে হাত বের করে আনার পর বাবাকে খুব উত্তেজিত মনে হলো। তিনি সবলে টেনে ধরলেন, কটূক্তি করলেন, দোহাই পেড়ে শেষ পর্যন্ত অন্ত্র থেকে বেরিয়ে এলেন। এখন কুইসানের পাকস্থলী একেবারে খালি।

‘আপনি কী খুঁজছেন, বাবা?’ উদ্বিগ্নচিত্তে আমি প্রশ্ন করেছি মনে আছে।

‘গলব্লাডার। ধুত্তরি, তার গল ব্লাডার কোথায় পড়ে আছে? খুঁজে পাচ্ছি না।’

বাবা ডায়াফ্রাম বরাবর ছুরি চালালেন, আঁতিপাঁতি করে হাত দিয়ে সেখানে খুঁজলেন, একসময় হৃদপিন্ডের দেখা পেলেন – ওটা তখনো যথাযথ এবং লাল ছিল। এরপর তিনি ফুসফুস বের করে আনলেন। শেষে যকৃতের কাছাকাছি ডিম্বাকার গলব্লাডারটিকে খুঁজে পেলেন। খুব সাবধানে ছুরির অগ্রভাগ দিয়ে ওটাকে আলাদা করলেন যকৃৎ থেকে। পরে হাতের তালুতে রেখে পরীক্ষা করলেন। জিনিসটা ঈষৎ ভেজা এবং পিচ্ছিল। সূর্যের আলোয় ওটা দীপ্তি ছড়ায়। তখন রক্তবর্ণ এক টুকরো মণির মতো দেখায়।

বাবা এবার গলব্লাডারটি আমার কাছে রাখলেন। ‘সাবধানে এটা ধর, আমি লুয়ানের গলব্লাডারটা বের করে আনি।’ এবার বাবা অভিজ্ঞ সার্জনের মতো কাজ করলেন – অত্যন্ত কুশলী, দ্রুত এবং নির্ভুলভাবে। লুয়ান তার কোমরে বেল্টের জন্য শণের তৈরি যে-দড়ি জড়িয়েছিল প্রথমে তিনি তা কেটে ফেললেন, তার খসখসে কোটের সামনের অংশ কেটে বুকের হাড্ডিসার কংকালকে পা দিয়ে চেপে ধরে ছুরিতে চার-পাঁচটা দ্রুত আঘাত করলেন। এরপরই তিনি সকল বাধা অপসারণ করে লুয়ানের গলব্লাডার তুলে এনে ফলেন বীচির মতো হাতে ধরে রাখলেন।

‘চল, আমরা বেরিয়ে যাই’, বাবা বললেন। আমরা নদীর তীর পর্যন্ত দৌড়াই, ওখানে কুকুরগুলো পেটের নাড়িভুঁড়ি নিয়ে টানাটানি করছিল। সূর্যের একটু লাল প্রান্ত শুধু দেখা যাচ্ছিল, যার চোরা নির্বিচার আলো ছোট-বড় সবকিছুর ওপর পড়ছিল।

বিস্ময়কর শ্রমিক লু দামান মনে করে, দাদির চোখে ছানি-রোগ হয়েছে। তাঁর এ-অসুখের কারণ হচ্ছে তাপ যা তিনটি ভিসেরাজনিত গহবর থেকে বেরিয়ে আসে। এ থেকে আরোগ্যলাভের পথ বড়ই নির্মম, বেদনাদায়ক। মেঝের মতো তার দীর্ঘ কোটের প্রান্ত তুলে ডাক্তার দরজার বাইরে যাওয়ার সময় বাবা তাকে কিছু একটা   ব্যবস্থাপত্র দেওয়ার জন্য অনুনয়-বিনয় করেছিলেন। ‘যে-কোনো একটা ওষুধ দিন…।’ বিস্ময়কর শ্রমিক লু তখন বাবাকে বলেছিল, একটা শূকরের গলব্লাডার যোগাড় করার জন্য, যার তার মা দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরে নিংড়ানো নির্যাস নিতে পারবে। এতে তার চোখ কিছুটা পরিষ্কার হবে।’

‘ছাগলের গলব্লাডার হলে কেমন হবে’ বাবা জিজ্ঞেস করলেন।

‘ভালো’, ডাক্তার বললেন, ‘ভালুকের হলে আরো ভালো। যদি কোনো মানুষের গল ব্লাডার আপনি পেয়ে যান, হা…হা…, সেক্ষেত্রে আপনার মায়ের চোখ স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে এলে অবাক হবো না।’

বাবা কুইসান ও লুয়ানের গলব্লাডার থেকে তরল পদার্থের নির্যাস বের করে এনে একটি সবুজ চায়ের পাত্রে রাখলেন এবং দুহাতে তা দাদির কাছে সমর্পণ করলেন। দাদি ওটাকে তাঁর ঠোঁট বরাবর নিয়ে এলেন এবং জিহবার ডগা দিয়ে স্পর্শ করলেন। ‘গউজির বাবা,’ দাদি বললেন, ‘গল খুবই তেতো। ওটা কোত্থেকে এনেছ?’

‘ওটা মাআ (ঘোড়া) এবং রুয়ানের গল’ বাবা উত্তর দিলেন।

‘মাআ আর লুয়ানের ওটা তুমি বলছ? আমি জানি মাআ কে, কিন্তু লুয়ানকে তো চিনলাম না?

আমি নিজেকে আর সংবরণ করতে পারলাম না। বোকার মতো হঠাৎ বলে ফেলি – ‘দাদি, এটা মানুষের গলব্লাডার, মাআ কুইসান এবং লুয়ান ফেংশানের শরীর থেকে নেওয়া হয়েছে। বাবা তাদের ব্লাডারগুলো টেনে তুলে এনেছেন।’

তীব্র চিৎকার করে দাদি কঠিন শয্যার ওপর পড়ে গেলেন। তাঁর শরীর তখন পাথরের মতো নিষ্প্রাণ।

 

[২০১২ সালে সাহিত্যে নোবেল বিজয়ী চীনা ঔপন্যাসিক ও গল্পকার মো ইয়ানের জন্ম ১৯৫৫ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি শেংডন প্রদেশের গাউনি কাউন্টিতে। ১৯৭৬ সালে সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সময় মো ইয়ান পিপল্স লিবারেশন আর্মিতে (PLA) নাম লেখান এবং সৈনিক থাকা অবস্থায় লেখালেখি শুরু করেন। তাঁর প্রথম উপন্যাস Falling Rain on a Spring Night প্রকাশিত হয় ১৯৮১ সালে। ১৯৮৬ সালে তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস Red Sorghum তাঁকে বিপুল খ্যাতি এনে দেয়। মো ইয়ানের রচনা অনেকটা মহাকাব্যিক ইতিহাসধর্মী, যেখানে কল্পিত বাস্তবতার ছোঁয়া রয়েছে। নীতিকথার বেড়াজালের মধ্যেও মানুষের লোভ, তৃষ্ণা আর দুর্নীতিপ্রীতি কীভাবে সমাজে ঢুকে পড়ে, তার চমৎকার বর্ণনা রয়েছে তাঁর রচনায়। তিনি তাঁর লেখায় ইতিহাসের মিথ্যাচার, বঞ্চনা আর রাজনৈতিক ভন্ডামিকে সরাসরি আক্রমণ করেছেন। তাঁর গল্পে রয়েছে চোখ-ধাঁধানো, কড়া জটিল চিত্রকল্প। মূলত অতীত আর বর্তমান, মৃত ও জীবিত, ভালো-মন্দের মধ্যে যে-ব্যবধান, তা অনেক সময় একাকার হয়ে যান ইয়ানের রচনায়। ‘আরোগ্য লাভের জন্য’ গল্পটি মো ইয়ানের গল্পগ্রন্থ Shifu : You’ll Do Anything for a Laugh-এর (মূল চীনা ভাষা থেকে Howard Goldblattকৃত ইংরেজি অনুবাদ) The Cure গল্পের অনুবাদ।]