আলোকের এই ঝর্ণাধারায়

লেখক:

পূরবী বসু

 

ঈর্ষা করার মতো কিছুই নেই তার। তবু আমি তাকে হিংসা করি।

হ্যাঁ, সত্যি সত্যি তাই। আমি তাকে হিংসাই করি।

করি, কেননা সে সারাক্ষণ শুধু হাসে।

কোনো কারণ ছাড়া। প্ররোচনা ছাড়া। এমনি এমনি।

মেয়েটি রূপবতী নয়।

বিশেষ কোনো গুণে গুণান্বিতা বলেও শুনিনি।

কখনো তাকে গুনগুন করে গান গাইতেও শুনিনি।

বাড়িতেই থাকে সবসময়। চাকরিবাকরি কিছু করে না, বলাই বাহুল্য।

সুন্দর বা দামি কাপড়চোপড় কখনো পরতে দেখিনি। নিজের ঘরে কেইবা পরে সেসব? তাছাড়া আছেই বা কটা ভালো শাড়ি ওর? অথবা আদৌ আছে কিনা তাই বা কে জানে! গয়না বলতে তো দুহাতে দুটো সরু সোনার চুড়ি, আর কানে ছোট্ট দুটো মটরদানার মতো ঝোলানো সোনালি বল।

সাজে না সে একেবারেই। কিংবা সাজবার উপকরণ কিছু নেই ঘরে।

চুল অাঁচড়ে পেছনে একটা হাত-খোঁপা বেঁধে রাখে সবসময়।

আর কপালে বড় আকারের খয়েরি রঙের একটি টিপ। এই তার সজ্জা।

ষোড়ষী সে নয়। বয়ঃসন্ধির বয়সী হলে এমন ওলটপালট ব্যবহারের একটা অর্থ খুঁজে পাওয়া যেতো। কিন্তু এই পরিণত বয়সে, বিবাহিত, এক সন্তানের জননী এই মেয়েটির কী হলো হঠাৎ? দিব্যি তো ছিল এতোদিন।

বয়স তার তিরিশের কোঠায় তো বটেই, চল্লিশ ছুঁইছুঁই করলেও অবাক হবো না। তাও তো বয়স কমই বলতে হবে। আমার থেকে অন্তত দু-দশকের ছোট তো হবেই।

কিন্তু কী হয়েছে তার? হঠাৎ এমন করে হাসতে শুরু করল  কেন? আগে তো এমন করতো না!

ওরা আমার বাসার লাগোয়া ঘরটিতে ভাড়াটে হয়ে এসেছে, তা কমপক্ষে ন-দশ মাস তো হলোই! কিন্তু কই? এমন করে আগে তো কখনো হাসতো না! মেয়েটির কি মাথাটাথা খারাপ হয়ে গেল নাকি হঠাৎ?

একান্তই গৃহববধূ সে। বাইরে কোথাও যেতে হয় না আমার মতো। ঘরেই থাকে। হয়তো সে আমায় দেখিয়ে দিতে চাইছে তার অনন্ত স্বাধীনতা, তার অবাধ, উন্মুক্ত জীবন, কেবল হেসেখেলে যাকে উড়িয়ে দেওয়া যায়! সাধ্য কী আমি তাকে অনুকরণ করি! অনুসরণ করি!

সবসময় এতো খুশিতে যে সে থাকে, তার আসল রহস্যটা কী, ভাবার চেষ্টা করি। জীবনে আনন্দের উপকরণ কী কী আছে তার? আর সেগুলো সব হঠাৎ করে এক্ষুনি আবিষ্কার করলো নাকি সে, না সেগুলো আপনাআপনি এসে একত্রে হাজির হয়েছে তার সামনে?

আমি জানতে আগ্রহী। কারণ আমি নিজেও, কিছুটা হলেও, হাসতে চাই বইকি!

আমি মনে করার চেষ্টা করি, ওর বয়স পার করেছি যখন, আমার জীবনের সেই সময়টার কথা। সেসবই স্পষ্ট মনে আছে। কই? তখনো তো এভাবে একটানা কয়েকদিন ধরে সারাক্ষণ খুকখুক করে হাসিনি!

হাসতে পারিনি।

ইচ্ছে হয়নি।

হাসার মতো কোনো উপকরণ ছিল না। সময় ছিল না। জায়গা ছিল না।

কারণ ছিল না। উপলক্ষও নয়।

আচ্ছা, মেয়েটি নতুন করে প্রেমে পড়েনি তো! ছেলে  কোলে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখি তাকে প্রায়ই। ঘরের বারান্দায়, উঠানে, মালতী ফুলগাছের সামনে। কিন্তু আসলেই তো! তাঁর স্বামীকে তো কিছুদিন ধরে আর দেখতে পাচ্ছি না! গেল কোথায় লোকটা? আমি উঁকিঝুঁকি মারি। ওর স্বামীকে খুঁজি। কিন্তু মেয়েটিকে দেখে চিন্তিত মনে হয় না। ওর ঘরে কোনো পুরুষ মানুষের আনাগোনা দেখি না। সে নিজেও যায় না কোথাও বাড়ি ছেড়ে। তাহলে?

সে শুধু হাসে।

খিলখিল করে হাসে।

মুষলধারায় বৃষ্টি-পতনের মতো হাসে।

ফুরফুরে চৈতি হাওয়ার যেন উড়ে যেতে যেতে হাসে।

শুকনো পাতা খালি পায়ে মাড়িয়ে যাবার কড়কড়ে শব্দের মতো হাসে।

বজ্রপাতের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে হাসে।

আকাশ জুড়ে বিদ্যুতের ঝিলিকের মতো হাসে।

কালবৈশাখির ঝড়ের সঙ্গে বাজি রেখে হাসে।

নড়বড়ে কাঠের দরজা-জানালাগুলো বন্ধ করতে করতে হাসে।

পূর্ণিমার ফকফকে জ্যোৎস্নায় চরাচর ভেসে গেলে হাসে।

অন্ধকারে একা একা হাসে। ঘোর অমাবস্যায়, চাঁদহীন শূন্য আকাশের দিকে তাকিয়ে হাসে।

 

দুবাড়ির মাঝখানে কাঠমালতীর পাশেই দাঁড়িয়ে আছে বেশ বড়সড় এক ঝুমকোজবা গাছ। সাদা আর লাল রঙের               মেলামেশা-মাখামাখিতে সৃষ্ট উজ্জ্বল আলপনা কাটা নরম পাপড়ির অজস্র ফুল ফুটেছে গাছটিতে। প্রতিটি ফুলের মাঝখান দিয়ে ঝুলে আছে লালের ওপর হলুদ পরাগের ছটা মেশানো এক অলংকৃত লকেটের মতো সরু, লম্বা জিব। কালীঠাকুর নাকি সবরকম জবাই পছন্দ করেন। তবে বিশেষ পছন্দ তাঁর  রক্তজবা।  ঝুমকো তো জবাজাতীয় ফুলই। আর সেজন্যেই কি কালীকে নকল করে লম্বা জিব বের করে বিকশিত হয়ে আছে অনিন্দ্যসুন্দর এই ঝুমকোগুলো?

ঝুমকো জবা ছিঁড়তে ছিঁড়তে মেয়েটি হাসে।

তার হাসির দমকে হাতের সাজি থেকে সদ্য তোলা কয়েকটি ঝুমকো ফুল মাটিতে পড়ে যায়। তবু হেসেই চলে  সে।

চৈত্রের ভ্যাপসা গরমে কাঁঠাল পাকে কিনা জানি না।  কিন্তু দরদর করে অনবরত ঘাম ঝরে শরীর থেকে। তারও নিশ্চয় ঝরে। তারপরেও সে হাসে। আরো হাসে। মনে হয়, কী এক বিশাল মজার কান্ড যেন ঘটে গেছে এইমাত্র। হাসতে তাকে হবেই।

এতোও পারে কেউ হাসতে! মেয়েটা, নাকি বউটা বলবো,  যেন মুখ ভার করে থাকতেই জানে না। সারাক্ষণ হাসছে। কিন্তু তার হাসির উৎস খুঁজে পাচ্ছি না কোথাও।

সে হাসে। কখনো ঝকঝকে সাদা দুপাটির দাঁতগুলো সব উন্মুক্ত করেই। কখনো ভেতরের দিকে দুঠোঁট চেপে। কখনো ছোটো ঘোমটার কাপড় থেকে একটুখানি শাড়ি মুখের ভেতরে  টেনে নিয়ে দাঁত দিয়ে সেটা ঈষৎ কামড়ে ধরে। খিলখিল করে হাসে সে।

আমি ভাবার চেষ্টা করি, এত আনন্দের ভিত্তিটা কোথায়?   কেমন করে এটা সম্ভব যে কখনো কোনো কারণেই আজকাল আর মন খারাপ হয় না তার?

ভাবছিলাম, একদিন ডাকি তাকে আমার ঘরে। অবসরপ্রাপ্ত প্রবীণ এক নারী-লেখকের ঘরে কিছুক্ষণের জন্যে আসতে দ্বিধা বা ভয় পাবে না নিশ্চয় পাশের বাড়ির বউ। তাছাড়া আমরা পরস্পরের একেবারে অপরিচিত তো নই। দু-একবার একটু-আধটু ‘কেমন আছেন, ভালো আছি’ গোছের কথাবার্তাও হয়েছে মুখোমুখি হয়ে গেলে।

কিন্তু তাকে ডাকার আগেই আমাকে অবাক করে দিয়ে সে নিজেই একদিন এসে হাজির। এক মধ্য সকালে। প্রবল বিরক্তির সঙ্গে একটা ফরমায়েশি নিবন্ধ লেখার বৃথা চেষ্টা করছিলাম। হাসিমুখে ঘরে ঢুকে ছেলে-কোলে দাঁড়িয়ে থাকে সে দরজার কাছে। আমার মুখোমুখি। তবে বেশ খানিকটা  দূরে। আমি যে-চেয়ারটাতে বসে আছি, তার সামনের  টেবিলটার ধারেকাছেও না ঘেঁষে নির্ধারিত দূরত্বে সে দাঁড়িয়ে থাকে।

দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সে কৌতূহলী দৃষ্টিতে ঘরের চারদিক দেখে ভালো করে। শেলফে রাখা বইগুলোর একটা একটা করে নাম পড়ে অস্পষ্ট শব্দ করে। লক্ষ করি, কেবল বাংলা বইগুলোর নাম পড়ছে। ইংরেজিটা বুঝি রপ্ত করা হয়নি একেবারে।

হঠাৎ ডান দিকের দেয়ালে চোখ পড়তেই কাচে বাঁধানো  ফ্রেমের ভেতর রবিঠাকুরের কবিতার কয়েকটি ছত্র গড়গড় করে অনায়াসে পড়ে যায় সে বেশ শুদ্ধ করেই।

জীবনের ধন কিছুই যাবে না ফেলা,

ধুলায় তাদের যত হোক অবহেলা

পুণ্যের পদপরশ তাদের ’পরে।

পড়া শেষ হতেই খিলখিল করে হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়তে চায় সে। দেখে মনে হয় অতিশয় মজার একটা ব্যাপার ঘটে গেছে যেন। আমি একটু বিরক্ত হই, বউটির এই প্রগাঢ় তরলতায়। ধমক দিতেও তাই দ্বিধা হয় না।

‘এই, এই, হাসছো কেন এভাবে? হাসির কী কথা লেখা আছে ওখানে?’

মেয়েটি কিছু বলে না। চোখ নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকে। কিন্তু তখনো মুখভরা হাসি তার। আবারো বিড়বিড় করে পড়তে শুরু করে, যা-হা-কি-ছু-গে-ল চু-কে…।

আবার হাসি।

‘কী, ব্যাপারটা কী বলো তো? হাসির কী আছে এই  লেখায়?’

‘লেখায় না।’

আমি অবাক হই।

‘লেখায় না তো কোথায়?’

মেয়েটি আমার টেবিলের কাছে সরে এসে আমার দিকে একটু ঝুঁকে পড়ে। তারপর নিচু কণ্ঠে হিসহিস করে আমায় একনাগাড়ে যা বলতে শুরু করে, তার কোনো অর্থ হয় কিনা বুঝে দেখার চেষ্টা করি। সে বলে, তার স্বামী সিলেটের এক এনজিওতে একটা নতুন ও ভালো  চাকরি পেয়েছে। সেখানে যাবার আগে দুই মাস ধরে তাকে প্রতিদিন শুধু স্লেট নিয়ে বর্ণজ্ঞান নয়, রীতিমতো বইখাতা কিনে নিয়ে এসে একটু-আধটু লেখাপড়া ও অঙ্ক শেখাবার চেষ্টা করেছে। বারে বারে স্ত্রীকে একটা কথা বোঝাবার প্রাণপণ চেষ্টা করেছে সে। কিন্তু পারেনি বোঝাতে। স্বামী তাঁর বলতে চেয়েছে, সে জানে না, কীভাবে সে নিজেকে বঞ্চিত করছে চারপাশের অনেক কিছু  থেকে। যা সে দেখছে, বুঝছে, অনুভব করছে, বা অন্য কেউ যা ভাবছে বা করছে, তার অনেক কিছুই সে জানতে পারছে না, বুঝতে পারছে না কেবল নিজের মুখের ভাষাটা পড়তে বা লিখতে না পারায়। এর আগে মাসতিনেক চার বছরের পুত্রের সঙ্গেও তাকে  অ-আ-ক-খ পড়িয়েছিল স্বামী। সে সিলেটে চলে যাবার সময় যখন জানতে চাইল তার চিঠি এলে নিজে পড়তে পারবে কিনা, অথবা সে নিজে স্বামীকে চিঠি লিখতে সমর্থ হবে কিনা। হঠাৎ দারুণ লজ্জায় পেয়ে বসে তাকে। সেইসঙ্গে আতঙ্ক। প্রবলভাবে মাথা নাড়িয়ে অসম্মতি জানায় সে। ‘না, না, না।’ না, কিছুতেই সে তা পারবে না। সম্ভব হবে না তার পক্ষে। চিঠি-ই যদি পড়তে পারবে, অনেকদিন আগেই তো  সেই চিঠি পড়তে পারতো সে।

আর চিঠি যে পড়তে পারবে না, সেটা প্রমাণ করার জন্যেই বুঝি স্বামী চলে যাবার পরপরই সে তার পড়ার সকল সরঞ্জাম, – বই, খাতা, স্লেট, চক, কাগজ, কলম, পেনসিল, রাবার – সবই সরিয়ে রেখেছিল ওপরের তাকে। ভেবেছিল, পড়াশোনার পাট এবার তাহলে সত্যি সত্যি শেষ হলো। তার মানে আর তাকে পড়তে বা লিখতে হবে না। ওই অচেনা ভুবনে পা না দিয়ে জীবন তো তড়তড় করে কেটে গেল একরকম। তেমন কী অসুবিধে হয়েছে!

কিন্তু হঠাৎ একদিন খুব ভোরে তার ঘুম ভেঙে যায়। চৌকি থেকে নেমে আস্তে চৌকাঠের বাইরে এসে দাঁড়ায় সে। আশেপাশের দোকানপাটগুলো তখনো খোলেনি। মানুষজন ঘুম থেকে ওঠেনি এতো সকালে। চারদিকে কেমন এক সুনসান নিস্তব্ধতা ও শান্তি। কিন্তু এই অঞ্চলের টিনের দোকানগুলোর মাথার ওপরের কিংবা সাদা-লাল-হলুদ-দালানের সামনে ছাদের কার্নিসের ওপর সাইনবোর্ডগুলো সবই সটান খোলা চোখে চেয়ে আছে। দিনে-রাত্রে সবসময়েই ওগুলো এমন উদোম থাকে। এই সাইনবোর্ডগুলোর গায়ের  ভেতর বিভিন্ন রং আর ডিজাইন জ্বলজ্বল করছে উদীয়মান সূর্যের চিকচিকে আলো পড়ে। চারদিকে সবাই তখনো ঘুমিয়ে। পুরো শহর ঝিম ধরে আছে। কিন্তু এই সাইনবোর্ডগুলো একবারে সজাগ। সারারাত না ঘুমিয়েও। দুপুরের রোদে যেমন তাকিয়ে ছিল পিটপিট করে, এখনো  তেমনি দুচোখ মেলে তার দিকে তাকিয়ে আছে ওরা। সাইনবোর্ডগুলোর চোখে কোনো ঘুম নেই। শীতে               গা-ঢাকা  দেয় না ওরা।  সব সময়েই অনাবৃত। এমনকি রাতেও। ওসব সাইনবোর্ডে এতোদিন ধরে যেসব লেখা দেখে আসছে, তা বরাবরই অগ্রাহ্য করেছে সে। ওসবের ভেতর রঙের বৈচিত্র্যই কেবল লক্ষ করেছে। কোনটা দেখতে বেশি সুন্দর, কোনটা নয়। ব্যস? এই পর্যন্ত। কয়েকটি তো দেখে দেখে প্রায় পরিচিত হয়ে গেছে। কোনটি কোন দোকানের গায়ে লাগানো তাও মোটামুটি বলতে পারে সে। কোনো কোনোটির গায়ের রং, নকশা বা ছবি প্রায় মুখস্থ তার। কিন্তু ওখানে প্রতিটির গায়ে লিখিত অক্ষরের মালাগুলো বোঝার বা পড়ার চেষ্টা করেনি কোনোদিন। ওসব তাঁর এখতিয়ারের বাইরে ভাবতো  সে।

কিন্তু সেদিন সেই ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে উঠানে একা দাঁড়িয়ে হঠাৎ তার কী হয়। ভালো করে নজর দেয় সাইনবোর্ডগুলোর লেখাগুলোর দিকে। পড়ার চেষ্টা করে একটা অক্ষরের পর আরেকটি অক্ষর। আর কী আশ্চর্য। নিজের ক্ষমতায় নিজেই বিস্মিত হয় সে। স্বামীর বকাবকি সত্ত্বেও বারবার সে বলেছে, এতোগুলো অক্ষর আকার-ইকার মুখস্থ করে মনে রাখা কিছুতেই সম্ভব নয়। আর সেগুলো মনে রাখার এখন বাস্তব কোনো মানেও সে খুঁজে পায়নি। কিন্তু সেই ভোরে বিস্ময়ের সঙ্গে সে দেখে, আলাউদ্দিনের চেরাগের মতো, রাত কেটে ভোরের ওই আলো ফোটার মতো করে ওইসব চেনা সাইনবোর্ডের ভেতর রঙের দাগের মাঝে মাঝে যত লেখা ছিল,  আস্তে আস্তে সব স্পষ্ট হয়ে চোখের সামনে ভাসছে তার। যেন কুঁড়ি থেকে সদ্য বিকশিত হলো ফুল। ‘ফরিদের চায়ের দোকান’, ‘এখানে ঝাল মুড়ি পাওয়া যায়’, ‘বইবিতান’ … এরকম কত কী! সে টের পায় সে বাংলায় লেখা সবকিছুই পড়তে পারছে। তখন কী যে আনন্দ হয় তার! সে কী করবে দিশা পায় না। জোরে জোরে একটার পর একটা সাইনবোর্ড পড়তে পড়তে নিজেই উচ্চস্বরে হাসতে থাকে। এরপর থেকে যখন যা দেখে, যা পায় হাতের কাছে তাই গড়গড় করে পড়ে সে। আর সেইসঙ্গে আনন্দে, গর্বে নিজে নিজেই হাসে। এমনকি বাজার থেকে লবণ, মরিচ, ডাল বা গুড় পেঁচিয়ে আনা কাগজগুলো খুলে খুলেও পড়তে থাকে সে। আর জোরে জোরে শব্দ করে হাসে। হাসে আনন্দে। উত্তেজনায়। গর্বে।

আমি অবাক হয়ে মেয়েটির, বউটির মুখের দিকে তাকিয়ে থাকি। সে তখন একটি গোপন কথা বলার জন্যে আমার আরো কাছে এসে দাঁড়ায়।

জানায়, যে অতি গোপনীয় অন্তরঙ্গ কথাটি সে বলতে যাচ্ছে আমাকে, তা অনেক বছর আগের কথা, যে-কথা আজ পর্যন্ত আর কাউকে সে বলেনি।

আমার কেমন সন্দেহ হয়। জিজ্ঞেস করি, ‘আমায় তাহলে বলছো কেন?’

‘আপনি লেখেন তাই।’

তার বিয়ের তিন-চার বছর আগের ঘটনা সেটা।

পাশের বাড়িতে প্রতিবেশীর কলেজে পড়ুয়া ছেলের এক বন্ধু বেড়াতে এসেছিল শহর থেকে। মাত্র তিন দিনের জন্যে। ফিরে যাবার দিন সকালে ছেলেটি হঠাৎ মেয়েটির বাসায় এসে ভাঁজ করা এক টুকরো কাগজ ঢুকিয়ে দিয়ে যায় তার মুঠো করা হাতের ভেতর। সবার অলক্ষে। কেমন নার্ভাস দেখায়  ছেলেটিকে তখন। তারপরেও কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে জানায়, একটা জবাব চায় সে সন্ধ্যার আগেই। রাত নটায় ট্রেনে ফিরে যাবার কথা তার রাজধানীতে। এর আগেই উত্তর আশা করে সে। চলে যাবার আগে কয়েকবার ঘুরঘুর করেছে ছেলেটা তার আশেপাশে। কিন্তু শহুরে তরুণটি তো জানতো না, তার সপ্তদশী পছন্দের মেয়েটি যে পড়তে পারে না। লজ্জায়, দ্বিধায়, আত্মধিক্কারে মেয়েটা ও-কথা বলতে পারেনি  ছেলেটিকে। কী লেখা আছে ওই কাগজে না জানলেও তার স্বাভাবিক বুদ্ধি দিয়েই সে বুঝেছিল ওটা – ওই চিঠিটা আর কাউকে দেখানো ঠিক হবে না। ছেলেটির মুগ্ধ দৃষ্টি, কানের কাছে তার উত্তপ্ত নিশ্বাস তাকে বলে দিয়েছে, শহরের এই যুবকের খুবই পছন্দ হয়েছে তাকে। পছন্দ তার নিজেরও হয়েছিল, অস্বীকার করে কীভাবে?

তারপরে বহু বছর কেটে গেছে। সেই ছেলেটির সঙ্গে জীবনে আর কখনো দেখা হয়নি তার। হবার কোনো সম্ভাবনাও নেই। আজ, এখন, এতোদিন পরে ভালো করে তার  চেহারাটাও আর মনে পড়ে না।

কিন্তু তা সত্ত্বেও সে ওই কাগজের টুকরোখানা ফেলে দিতে পারেনি সে। সযত্নে এবং গোপনে এতোদিন ধরে তা পাহারা দিয়ে সংরক্ষণ করে এসেছে। অতি দামি কোনো রত্নের মতো করে। শাড়ির ভাঁজের ভেতর আলমারিতে লুকিয়ে রেখেছিল। স্বামীকেও দেখায়নি কোনোদিন। বলেওনি তার কোনো কথা স্বামীর কাছে।

আসলেই কতোখানি পড়ালেখা শিখলো সে, তা পরীক্ষা করে দেখার জন্যে সেদিন দুপুরে সে ওই ভাঁজ করা সাদা কাগজটি বের করে আনে আলমারির কাপড়জামার ভেতর  থেকে। এতো বছর পরে অবশেষে সে কম্পিত হাতে ওই কাগজের টুকরোটি খুলে চোখের সামনে তুলে ধরে। তারপর আস্তে আস্তে তা পড়ার চেষ্টা করে। এবং নিজেকে বিস্মিত, অভিভূত করে দিয়ে সে টের পায়, সে পড়তে পারছে। শুধু তাই নয়। পড়তে পড়তে বুঝতেও পারছে প্রতিটি শব্দ এবং তার অর্থ।

পড়তে পড়তে শহুরে সেই ছেলেটির জন্যে বুকের                 ভেতরটা একটু টনটন করে ওঠে বইকি। কিন্তু সে আর কতক্ষণের জন্যে! পড়তে পারা আর তাকে লেখা তরুণটির কথাগুলো               এতো বছর পরে বুঝতে পারার আনন্দে-তৃপ্তিতে আত্মহারা হয়ে পড়ে সে।

এরপর থেকে প্রাত্যহিক জীবনে রুটিনের মতো করে  সে রোজ একবার করে পড়ে এই ছোট্ট চিঠিখানা। তার জীবনে প্রথম যে-পুরুষ এসেছিল, যে-মানুষের নজর কেড়েছিল সে, সেই মানুষটির বয়ানে নিজের প্রশংসা শুনে প্রাণ খুলে হাসে  সে। হাসে অনেকক্ষণ ধরে। তারপরে ঘরের বাইরে বেরোয়। চারদিকে তাকিয়ে যা দেখে তাই পড়তে শুরু করে। জোরে  জোরে। এমনকি রাস্তা দিয়ে দ্রুতবেগে ছুটে যাওয়া বাসের গায়ের বিজ্ঞাপনগুলো পর্যন্ত পড়ে সে। ‘আজ বিকেলে শিল্পকলা একাডেমীতে ‘গয়নার বাক্স’ নাটকটি …।’ আর পড়তে পারে না। বাসটি বড় রাস্তা দিয়ে দ্রুত অদৃশ্য হয়ে যায়। নিজের সঙ্গেই অতঃপর প্রতিযোগিতা চালায় মেয়েটি। কতো তাড়াতাড়ি কতো বেশি পড়ে ফেলা সম্ভব! আর পড়তে পড়তে আনন্দে উত্তেজনায় একা একাই হাসে সে।

বাস্তবিকই তার প্রচন্ড আনন্দ হয় তখন। পুলকিত হয়ে সে  থরথর করে কাঁপে। নিজেকে অনেক শক্তিশালী, অনেক গুণবতী মনে হয় তার। বিশ্বাস করতে ইচ্ছা হয়, সেই ছেলেটির চিঠির কথার মতোই সে আসলে সুন্দর ও ভালো। সে আবার পড়ে তার প্রথম প্রেমিকের চিঠি। তার জীবনের একমাত্র প্রেমপত্র। বলতে বলতে কয়েক লাইনের সেই ভাঁজ করা চিঠিটা সে খুলে মেলে ধরে আমার চোখের সামনে।  সুন্দর হস্তাক্ষরে লেখা ছোট্ট একটি চিঠি।

প্রিয় সু,

তোমাকে প্রথম দেখা অব্দি তোমার প্রেমে বাঁধা পড়ে  গেছি। তুমি এতো সুন্দর, এতো ভালো যে, চারপাশে তোমার মতো আর কাউকে দেখি না। এখন তোমাকে ছাড়া আর  কিছু ভাবতেই পারি না আমি। বুঝি, তোমাকে আমি খুব ভালোবাসি। আমার মতো তুমিও যদি আমাকে পছন্দ করো, ভালোবাস, মুখে বা লিখে সে-কথা সত্বর জানাও আমাকে। প্রেমপ্রার্থী তোমার ‘ম’।

মেয়েটি আবার হাসে। তার স্বামী ফিরে আসবে আর দু-তিন মাসের মধ্যেই। সিলেট যাবার পর এই পর্যন্ত তিনটি চিঠি দিয়েছে সে তার স্ত্রীকে। ওর ভাই যখন মাঝে মাঝে আসে বাজার করে দিতে, তখন এসে সে পড়ে দিয়ে যায় চিঠিগুলো। নিজে একবার তাকিয়েও দেখেনি ওগুলোর দিকে। পড়ার চেষ্টা করেনি। চিঠিগুলো সবই ছোট। কেজো চিঠি। সাংসারিক কথায় ভরা। কিন্তু উত্তরে মেয়েটি একটাও চিঠি লেখেনি তাকে। মোবাইলে কেবল কথা হয়েছে কয়েকবার। তার স্বামী খুব অখুশি তাই। এতোখানি সময় দিয়ে এতো পরিশ্রম করে পড়াশোনা করাবার পরেও সে আজ পর্যন্ত একটা এক লাইনের চিঠিও তাকে লেখেনি, অথবা লিখতে পারেনি, এজন্যে বড়ই কষ্ট তার। তবে চিঠি না লিখলেও এখন সে স্বামীর সেই চিঠিগুলো ঠিক-ই পড়তে পারে। তিনটা চিঠিই প্রায় প্রতিদিন খুলে খুলে করে পড়ে। পড়ে হাসে। এখানে থাকাকালীন যেমন করতো, এখনো চিঠিতে শুধু উপদেশ আর পরামর্শ।

মেয়েটি শাড়ির ভেতর থেকে তার বাঁ-হাতে ধরা আরেকটি কাগজ বের করে এনে আমাকে দেখায়। বলে, ‘আমি জানি, আপনি গল্প লেখেন। তাই এতো কথা কইলাম আপনারে।’ একটু থেমে আবার বলে সে, ‘এইটা এট্টু দেইখ্যা দিবেন?’

‘কী এটা?’

লজ্জায় রাঙা হয়ে ওঠে বউটির মুখখানা।

মুখে কিছু বলে না। কাগজটা এগিয়ে দেয়। আমি ওটা  চোখের সামনে তুলে ধরি। বুঝি, তার জীবনের প্রথম চিঠি লিখেছে সে। স্বামীকে। তার প্রথম প্রেমপত্র। কাঁচা হাতের অক্ষরে অসমান মাত্রায় লেখা :

প্রিয়,

তোমাকে প্রথম দেখা অব্দি তোমার প্রেমে বাঁধা পড়ে  গেছি। তুমি এতো সুন্দর, এতো ভালো যে চারপাশে তোমার মতো কাউকে দেখি না। এখন তোমাকে ছাড়া আর কিছু ভাবতেই পারি না আমি। বুঝি তোমাকে আমি খুব ভালোবাসি। আমার মতো তুমিও যদি আমাকে পছন্দ করো, ভালোবাস, তবে যত তারাতারি পারো বারি ফিরিয়া আস। ইতি তোমার বউ।’

আমি দ্রুত চিঠিটি পড়ে ফেলি। শেষ বাক্যের ‘তাড়াতাড়ি’ ও ‘বাড়ি’ শব্দ দুটিতে ‘র’ এর বদলে ‘ড়’ বসাতে বলে দিই।  মনে মনে হাসি। পুরো চিঠিতে শেষদিকে দশটা মাত্র নতুন শব্দ  যোগ করতে গিয়ে দুটোতেই ভুল করে ফেলেছে।

তাই শেষের সাধু ক্রিয়াপদটা শোধরাতে আর চাইলাম না। ওটা ওর চিঠিই থাক, কিছুটা হলেও। সব শুধরে দিলে চলবে কেন? তাছাড়া ‘ফিরিয়া আস’র আবেগ কি আর ‘ফিরে এসো’তে ধরা  পড়ে?