সাত্যকি হালদার

শতরূপার বিয়ে ভালোবেসে হয়নি।

শতরূপা ভালোবেসে বিয়ে করতে পারেনি। বলা যায়, শতরূপা যাকে ইউনিভার্সিটির শেষদিক থেকে ভালোবাসত তার সঙ্গে ওর বিয়ে হয়নি। ও এমন একজনকে বিয়ে করেছিল যাকে ও আগে ভালোবাসার সুযোগই পায়নি।

অথচ সেই বিয়েটাকে প্রবল ভালোবেসেছিল শতরূপা। এমন অনেক ভালোবাসা না-ভালোবাসা আঁকড়েই ওর চারপাশের জীবন।

বিক্রমজিতের চেহারা-চরিত্র-রুচি, কোনো কিছুর সঙ্গে মিল ছিল না আগের প্রেমিক সুজয়ের। তার মানে জীবনানন্দ থেকে জয় গোস্বামী, এমনটায় অবাধ যাতায়াত ছিল সুজয়ের, আর বিক্রমজিত কবিতা নিয়ে ভাবার সুযোগ পায়নি, এমন সরলীকৃত ব্যাপার মোটেই নয়। সুজয়েরও কবিতা নিয়ে কোনো উন্মাদনা বা বাড়তি আবেগ ছিল না।

তবে সুজয় যা পারত, এবং প্রায় সাত-আট বছর ধরে করে গেছে তা খানিকটা অভিভূত করে রেখেছিল শতরূপাকে। যেমন যাদবপুর থেকে চুঁচুড়া ফিরতে যে-দিনগুলোয় ওর দেরি হতো, সুজয় নিজের যাত্রাপথ সম্পূর্ণ এলোমেলো করে সেসব দিন বা রাতে চুঁচুড়া স্টেশন পর্যন্ত শতরূপার সঙ্গে এসেছে। এক-একটা বৃষ্টির দুপুরে কদাচিৎ কলকাতা যখন বিবশ, সুজয় তখন দেখা করতে এসেছে নির্ধারিত কোনো জায়গায়, মা শালিক পাখির মতো ভিজে। সন্দর্ভের রক্তকরবী দেখেছিল ওরা দুজন। পরপর দুবারের শো। রবীন্দ্রনাথের বিশু পাগল আর নন্দিনীর সংলাপে এতো মজে গিয়েছিল যে, নিজেদের ভেতর কিছুদিন সেই সংলাপ। তারপর শতরূপার এক রাতে স্বপ্নে দেখা জেটিঘাট। ভোররাতের ঘুমে ও দেখেছিল রক্তকরবীর রঞ্জন হেঁটে আসছে গঙ্গার ঘাট থেকে সুজয়ের চেহারায়। হাতে ধরা লম্বা ডাঁঠির বেগুনিরঙা কোনো ফুল। ভোররাতের স্বপ্নে জেটিঘাট ঢেকে ছিল কুয়াশায়। অনেক দূরে কারা যেন বুকজলে স্নান করছিল। হাতে-ধরা ফুল নিয়ে স্বপ্নের ভেতর খালি গা, বিজ্ঞাপনের জাঙ্গিয়া পরে উঠে আসছিল সুজয়। শতরূপার রঞ্জন। কখনো কোনো ছবিতে দেখা ভাস্কর্যের মতো।

বিক্রমজিত অবশ্য স্বপ্নে আসেনি। ও এসেছিল পারিবারিক সূত্রে। লখনৌতে যাওয়া একটা বিয়েবাড়িতে শতরূপাকে দেখেছিল ওরা। বাঙালি-অবাঙালি মিলিয়ে শতরূপার মামাবাড়ির দিকে বিক্রমজিতদের পরিবার। কানপুর আইআইটি থেকে পাশ করে বিক্রম তখন ক-বছর কাজ করছে কলকাতায়। সেক্টর ফাইভ, ইউনিটেক, ইনফোসিস ইত্যাদি শব্দ আর জগতের ভেতরে ওর ঘোরাফেরা। উচ্চমানের প্যাকেজ। ফলে প্রস্তাব সামান্য চুঁইয়ে নামতেই শতরূপার মা রাজি হয়ে গিয়েছিলেন।

চুঁচুড়া থেকে সারাজীবন ট্রেনে আদিসপ্তগ্রামে মাস্টারি করতে যাওয়া শতরূপার বাবা খানিক ধীরে চলতে চেয়েছিলেন। ধীরে এবং সাবধানে। লখনৌর পরিবার যেহেতু শতরূপার মামাবাড়ির সূত্রে, দূরসম্পর্ক হলেও ওর মা তাই খানিক জেনে নিয়েই এক কথায় হ্যাঁ করে দেন। শতরূপা সব জানার পর প্রথমে ক-দিন মৃদু আপত্তি, তারপর মৌনতায়। শেষে একদিন গঙ্গার ফেরিঘাটে যেখানে স্বপ্নে সুজয়কে হেঁটে আসতে দেখেছিল, সেখানে সুজয়ের কয়েকটি চিঠি বিসর্জন দিয়ে এসেছিল।

বিসর্জনের পর পুজো কমিটির বয়স্ক সেক্রেটারি কাঠামোর দিকে খানিকক্ষণ যেভাবে চেয়ে থাকেন সেভাবে শতরূপা ভেসে যাওয়া সাদা কাগজগুলো দেখেছিল অল্প সময়।

প্রাক্বিবাহ ঘোরার কথা হয়েছিল কয়েকদিন। বিক্রমজিত শেষ পর্যন্ত সময় করতে পারেনি। শতরূপার মা অবশ্য সময় না দিতে পারাকে সাফল্যের মানক হিসেবে দেখেছেন, যদিও তিনি চাইতেন দুজন পরস্পরকে খানিক জানুক। বিক্রমজিতের জিমঘষা চেহারা, হাসি ও মুখের চামড়ায় করপোরেট সৌকর্য, শতরূপা অচিরেই মুগ্ধ হয়ে যায়। তবে পরিবারের কয়েকজন মিলে যেদিন ওরা এলেন, বিয়ের কয়েক হপ্তা আগে একটি রবিবারের মিলনোচ্ছব, সেদিন কয়েক ঘণ্টার জন্য বিক্রমজিত পেরেছিল। লখনৌ থেকে কলকাতায় আসা ওর বাবা-মা, ব্যারাকপুর থেকে ওর এক মাসি, আরো কে কে। সেদিন বিকেলে শতরূপার নিজের ঘরে ওদের দুজনকে খানিক সময় আলাদা দেওয়া হয়েছিল। শতরূপা দেখেছে বিক্রমজিত কথার মাঝে হাত ধরে ফেলতে চায় না, বা জানে না। বা ওর করপোরেট ভাবনায় বাধে। সুজয়ের চিঠি তখন গঙ্গার অতলে। শতরূপা বিক্রমের এই দূরত্ব রক্ষাকে সংযমও ভেবেছে। ভিন্নতর রুচি ভেবে সম্মানের চেষ্টা।

বিয়ে হয়েছিল চুঁচুড়া ও কলকাতায়। ওরা তারপর বিক্রমজিতের অফিস থেকে ব্যবস্থা করা বহুতলের ফ্ল্যাটে চলে এলো। লখনৌর বাবা-মা লখনৌতে ফিরলেন। শতরূপা দেখেছে, কাচের জানালার ওদিকে ভিন্ন এক কলকাতা, দূরে এয়ারপোর্ট। ভাগীরথীর পশ্চিম কূলের মতো পূর্ব কলকাতায় এখনো খানিকটা টিকে যাওয়া সবুজ। শতরূপার দুপুর দীর্ঘায়িত হতো বিক্রমের অপেক্ষায়। বিক্রম আসত সন্ধেয়। ঘড়ির কাঁটা ধরে সাতটা চল্লিশে।

ঘড়ির কাঁটার আশ্চর্য মিশেল বিক্রমের অস্তিত্বে। যেমন স্নান বা হাত-মুখ ধোয়া সেরে সাড়ে আটটা নাগাদ শতরূপার মুখোমুখি বসত ও। বসার ঘর বা সংলগ্ন ঝোলানো ব্যালকনিটিতে। নব দাম্পত্যের সেসব সন্ধেয় শতরূপা প্রথম প্রথম চুপ করেই থাকত। অনেকদূরে এয়ারপোর্টের রানওয়ে, তার ওদিকে আলোচিহ্নিত ভিআইপি রোড। শতরূপার রবীন্দ্রসংগীতের কথা বিক্রমের মা-বাবা জেনে নিয়েছিলেন। তবু সেসব ব্যালকনির আবছায়ায় বিক্রম কখনোই গানের কথা বলেনি। শতরূপা গুনগুনিয়েছে যখন, সেই সময় বিক্রম চুপ। তাকিয়ে থেকেছে মুখে, কখনো দূরেও, তবু মন্তব্য বা অনুরোধহীন। সাড়ে নটায় বিক্রম উঠত, উঠে ল্যাপটপ খুলে ভেতরের ঘরে বসে যেত। সেখানে টানা ঘণ্টাখানেকের কাজ।

বিক্রম যে নেশা বা আসক্তির বাইরে তা জেনে নিশ্চিত হতে পেরেছিলেন শতরূপার মা। ধোঁয়ায় বা পানীয় বিন্দুমাত্র টান ছিল না বিক্রমের। শতরূপার মা যদিও জানতেন না, তার মেয়ে একদা সুজয় নামে এক প্রেমিকের হাত ধরে শুশুনিয়া নামে একটি পাহাড়ের কোলে গিয়ে মহুয়া নামক একটি পানীয়তে দ্রবীভূত হয়ে সারারাত মাতাল সমীরণে গেয়েছিল। বাড়িতে অজুহাত রাখা ছিল বান্ধবীর দিদির বিয়ে। সেসব অবশ্য গঙ্গার পলিতে অতীত, তবু শতরূপার দূরকল্পনায় ছিল উচ্চ শিখরিত বাঙালি পুরুষ সন্ধেয় স্ত্রীর রবীন্দ্রসংগীতে ভিজিয়ে দু-পেগ হুইস্কি খায়। বিক্রমজিতের ভেতর তার ন্যূনতম আকাক্সক্ষাও নয়। শতরূপার গুনগুনের ভেতর থেকে উঠে গিয়ে ল্যাপটপে বসলে বিক্রমের স্বস্তি।

শতরূপা জেনেছিল, বাড়ি বসে ঘণ্টাখানেকের এই কাজে ওয়ালেটে বিপুল অর্থাগম হয়। সেই সঙ্গে কর্মস্থলে উন্নয়ন। ওয়ালেটই তো শেষ পর্যন্ত প্রাণের আরাম, আত্মার শান্তি, ফলে ও নিজেকে হতাশ হতে দেয়নি। বরং লক্ষ করে দেখেছে, ল্যাপটপের পর্দায় ইঞ্জিনিয়ারিং বিদ্যা প্রয়োগের কালে বিক্রমজিতের একবারের জন্যও চোখে পাতা পড়ে না। ওর কান যেন ভার্চুয়াল পর্দায় ঢাকা পড়ে যায়, নিশ্বাস অপ্রয়োজনীয়। শতরূপা নিজের বিস্ময় ও মুগ্ধতা বাড়ায়।

সাড়ে দশটায় খাওয়া, এগারোটায় শুতে যাওয়া। বিক্রমজিতের শারীরিক চাওয়া ও কাছে আসাতেও নিয়মানুবর্তিতা ও আগ্রহ, দুই-ই পেয়েছে শতরূপা। যেমন, প্রথমে বাঁদিকের বুক আলগা করে মিনিট চারেক হাত বোলানো, তারপর ডান দিকে মুখ দিয়ে সাত মিনিট সাকশান, বিয়ের প্রথম তিন মাসে এর ব্যত্যয় হয়নি। ডানদিকের সাত মিনিটের পর বাঁদিকে ছ-মিনিট মুখ রাখা এবং এরপর শতরূপার উত্তেজনা ও আকর্ষণে অব্যর্থ অঙ্গ সঞ্চালন। শতরূপা বিক্রমের দৃঢ়তা ও দীর্ঘস্থায়ী প্রতাপে সত্যিই অভিভূত হয়ে পড়ত। এই অবস্থায় বিক্রমের মুখে নির্দিষ্ট শব্দ ছিল ক-টি। যেমন ডান দিকে মুখ রাখার সময় দু-বার ‘ও মাই ডিয়ার’, উত্তেজনার মধ্যপথে বারকতক ‘হোল্ড মি’ এবং শেষে ক্লান্ত অবস্থায় জোরে শ্বাস ছেড়ে ‘এনাফ’ বলা একবার। শতরূপা নিজস্ব আরাম ও প্রশান্তিতেও লক্ষ করেছে, এই শব্দ কটির আসা, দুটির উচ্চারণের ভেতর সময়কাল, এনাফ বলার ভঙ্গি ও ক্ষণ প্রথম রাত থেকে প্রতিটি রাতে হুবহু এক।

রাত এগারোটা থেকে এই চল্লিশ মিনিটের কৃতকর্মটি ছাড়া বিক্রমজিত শরীর বিষয়ে যথেষ্ট সংযমী, সাবধানী ও নিষ্ঠ।

যেমন, সেই যে এক রোববার যেদিন ওর স্বাভাবিক বাড়ি থাকা, সেদিন সকাল থেকে মেঘ। সকাল নটা নাগাদ মুখোমুখি বসে কফি খেয়েছে দুজন। বিক্রমজিত তারপর বাজারে চলে গেছে। শতরূপা ছোট একটা লিস্ট ধরিয়ে দিয়ে হেসে বলল, আজ লিস্টে কটা বেশি জিনিস, তাই লিখে দিলাম।

বিক্রমজিত একবার পড়ে নিয়েছে লিস্ট। তারপর অল্প হেসে ফেরত দিয়ে দিয়েছে। শতরূপা দেখেছে বিক্রমজিতের এই মনে রাখাও ব্যতিক্রমী ধরনের। বারো, তেরো বা কুড়িটি জিনিসের তালিকা একবার দেখে নিলে ও ক্রমানুসারে সম্পূর্ণ মনে রাখতে পারে। বাজারে সামান্য বিচ্যুতিও থাকে না। পাঁচফোঁড়ন, ভিম সাবান, জানালার কাচ পরিষ্কারের নীলচে তরল হুবহু পরপর। তেমন সময় কখনো শতরূপার মনে পড়ে গেছে বাবা-মায়ের কথা। মা-বাবার প্রাত্যহিক দাম্পত্যের খুনসুটিতে মিশে থাকত বাজারে গিয়ে বাবার অনিবার্য ভুলে যাওয়া, এটা আনতে ওটা। বাবার বাজার করা সকালে সেসব ছিল আমোদ, বাবার ভুলো মন ও বিস্মৃতি সমস্ত পরিবারের ভেতর মিশিয়ে দিত উদাসী কৌতুক। বিক্রমজিতের সঙ্গে সংসারে সে-সুযোগ নেই। নেই তার কারণ বিক্রমজিত কখনো বিস্মৃতির সুযোগ দেয় না। সমস্ত অতীত এবং তার খুঁটিনাটি ওর দিন-মাস-সময় মিলিয়ে মনে থাকে। শতরূপার সঙ্গে বিয়ের পর কবে কী নিয়ে কথা হয়েছিল, বাইরে খেতে যাওয়ার দিনক্ষণ মেনু, অতীত এমনকি ভবিষ্যতের কয়েক বছরের ক্যালেন্ডারও ওর মাথায়। শতরূপার মনে হয়, বিক্রমজিত যতক্ষণ জেগে থাকে প্রায় পুরো সময়টিতে এক ভিডিও রেকর্ডিং চলমান, স্মৃতিতেও মুগ্ধ না হয়ে উপায় থাকে না শতরূপার। ওর ভুলো বাবার কথা মনে হয়, ভুলো প্রেমিক সুজয়, সুজয়ের খানকয় চিঠি, কিন্তু সেসব এখন গঙ্গার প্রাগৈতিহাসিক পলি আর কাদা। দৈবাৎ ওর মনে হয় বিস্মৃতিতেও খানিক সুখ লেগে থাকে, নয় কি!

সেই সে মেঘলা রোববারে শতরূপার মনে গান এসেছিল। তালিকায় একবার মাত্র চোখ বুলিয়ে বিক্রম বাজারে চলে গেছে। শতরূপা গুনগুন করে, ‘পুব-সাগরের পাড় হতে কোন এল পরবাসী …’। বর্ষাকাল এলে বা অকাল বর্ষণে আদিসপ্তগ্রাম স্কুলের মাস্টারের সংগ্রহে হঠাৎই বেজে উঠত এসব, ‘শাওন গগনে ঘোর ঘনঘটা’। শতরূপা গাইছিল আর যেন ভেতরে চাইছিল কিছু। সে-চাওয়া খুব স্পষ্ট নয় নিজের কাছেও।

যা হোক, হুবহু তালিকানুসারে বাজার করে ফেরে বিক্রমজিত। বিক্রমের মুখ অফিস থেকে ফেরা মুখের মতো স্বাভাবিক ও ভাবলেশহীন। বাজার করা থেকে শরীর, কোনো কিছুই নিখুঁত সম্পন্ন করার পর ওর মুখে ছাপোষা মানুষের মুখে ফোটা চিলতে হাসি বা গর্ব ফুটে ওঠে না। ঠিকঠাক সম্পন্ন করাটা ওর কাছে এমনই। সেদিন দুপুরে খাওয়া-দাওয়ার পর বৃষ্টি ধরলেও পাড়ার গলি থেকে ফ্ল্যাটের মাথার আকাশে রোদহীন মেঘলা দিনের আনাগোনা। শতরূপার মনের বর্ষা বিলাস শেষ পর্যন্ত বিবাহিত জীবনের স্বাভাবিক নিয়মে শারীরিক আগ্রহের দিকে যায়। ও বিক্রমজিতকে প্রথমে ব্যালকনিতে ও পরে সামান্য দ্বিপ্রাহরিক বিশ্রামের অজুহাতে মাঝের ঘরের বিছানাটিতে নিয়ে যেতে চায়।

কিন্তু ওই। বিক্রমের শরীরের চাহিদাও অনেকাংশে পূর্বনির্ধারিত। তার নিয়ম আছে। নিয়ম অনুযায়ী আবেগের প্রকাশ ও অঙ্গের দৃঢ়তা আছে; কিন্তু একটি বর্ষার দিন, বর্ষার গান বা দুপুরের অবসরে তার ব্যত্যয় নেই। বিক্রম সেই মেঘলা দুপুরে তাই শতরূপার সঙ্গে কয়েকটি কথা বলার পর ওর কোম্পানির আবিষ্কৃত ভিডিও গেমটি নিয়ে বসে। কর্মীদের অবসর ও বিনোদনের জন্য কোম্পানির তরফে উপহার। ও গেমটির শব্দ বাড়িয়ে দেয়। সেই খেলায় নির্দিষ্ট কিছু কমান্ড পার হয়ে এন্টার চাপলেই মহাকাশের কিছু জীব, খানিকটা ই-টি চলচ্চিত্রের সদৃশ, তারা ল্যাপটপ ছেড়ে বেরিয়ে ঘরময় ভেসে বেড়ায়। তখন কি-বোর্ডে আঙুল চালনায় স্পেস-শাটল বার করে লেজার বিমে ধ্বংস করতে হয় ই-টিদের। প্রতিটি ধ্বংসে ঘরে অদ্ভুত এক ঝনাৎকার ও সবুজ আলো। শতরূপা আড়াল থেকে দেখেছে এই খেলা। দেখেছে, এই খেলায় বরাবর বিক্রমই জিতে যায়। এবং জেতার পরও ওর মুখ থাকে স্বাভাবিক ও টানটান। বিজয়ী সেনার মতো ও যেন স্পেস-তরণী থেকে নামে এবং তারপর হেলমেট খুলে দাঁড়ায়।

শতরূপা বলল, চলো আজ বিকেলে কোথাও সিনেমা দেখি, তারপর বাইরে খাওয়া।

বিক্রম ধীরে ল্যাপটপটি শাট ডাউন করল। সেটি তুলে রাখল নির্দিষ্ট জায়গায়। বাইরের বিকেলে তখন মেঘ সরে গেছে। সামনের গলি চলমান। ও বলল, কী ফিল্ম, কোথায় খাওয়া ঠিক করা আছে?

শতরূপা বলে, না, ঠিক করা কিছু নেই। বেরিয়েও ঠিক করে নেওয়া যায়। আর নাটক দেখার কথা ভাবলে খানিক দূরে যেতে হবে।

বিক্রম বলে, কাছাকাছি ফিল্মেই চলো। আইনক্সে একসঙ্গে অনেকগুলো দেখায়। কোনো একটায় ঢুকে গেলেই হলো।

নাটক বা ও-রকম কিছুতে বিক্রমের অনাগ্রহ শতরূপা আগেও দেখেছে। এবং এও জেনেছে যে, অমন একটি বিষয়ে বিক্রমের কোনো ধারণা নেই। নাটক ও সেই সঙ্গে গানের পৃথিবী ওর কাছে একেবারেই দূরবর্তী ও অপ্রয়োজনীয় কোনো দ্বীপ। যে-দ্বীপে ও একা কিংবা শতরূপার সঙ্গেও যেতে চায় না। এবং না যেতে পারা নিয়ে ওর কোনো অসুবিধা নেই। পরিচিত ও প্রাত্যহিক রবীন্দ্রসংগীতের কোনোটাই বিক্রম হয় শোনেনি বা শুনলেও মেমোরি সেলে জড়িয়ে রাখেনি।

সিনেমা দেখা আইনক্সেই হলো। কয়েক বছর পরপর যেসব মার্কিন সিনেমা ফিরে আসে তেমন একটি। টারমিনেটরের অত্যাধুনিক ভার্সন। অপরাজেয় সেনাবাহিনীর একটি দল লালচে আলোর কোনো গ্রহে পৌঁছেছে। সেখানের রাজকুমারী ও বিষ-মাখানো তীর চালানোয় পারদর্শী ক্ষুদে মানুষদের সঙ্গে হাতেগোনা কয়েকজন প্রশিক্ষিত কমান্ডোর লড়াই। স্বাভাবিকভাবেই শেষ পর্যন্ত ক্ষুদে মানুষদের নিশ্চিহ্নকরণ এবং বন্দিনী কালো রাজকুমারীকে সসম্মানে সমাজের মূলস্রোতে নিয়ে আসা। শতরূপার মাথা ধরে যাচ্ছিল দু-ঘণ্টা দশ মিনিটের শব্দ আর আলোর ঝলকানিতে। পাশে বসা বিক্রম সিনেমা দেখল টান হয়ে। অস্ফুটে কয়েকবার শুধু ‘মারভেলাস’ শব্দটি বলা। ফিল্ম শেষ হওয়ার পর ও আবার আগের মতোই নির্বিকার। হল থেকে বের হলো চলমান সিঁড়ি বেয়ে শতরূপার পাশে দাঁড়িয়ে। যে-সিনেমাটায় মজে ছিল সেটি নিয়ে আর একটিও কথা নয়।

বাইরে খাওয়াও হলো সেদিন। বড়মাপের রেস্তোরাঁ। দেয়ালে কাচ। জায়গাটাকে শতরূপার সঙ্গে বিক্রমও উপভোগ করল। বেশ হাসিখুশি লাগছিল তাকে। অর্ডার করল নিজে। অপেক্ষা করার মাঝে নিজস্ব মোবাইলে উল্টো দিকে বসা শতরূপার পরপর কটা ছবি নিয়ে নিল। খাওয়া শুরুর আগে সেলফিও। শতরূপা বলল, এবার তোমার একার একটা ছবি, দেয়ালের আয়না ঘেঁষে দাঁড়াও।

বাধ্য ছেলের মতো ছবির জন্য দাঁড়িয়ে গিয়েছিল বিক্রম।

এভাবেই কেটে যাচ্ছিল আরো অনেকের মতো তাদেরও দাম্পত্য। এভাবেই দিন-মাস ও শীত-গ্রীষ্ম-বর্ষা, বছর ও তারপর আরো একটি বছর। রেস্তোরাঁয় খাওয়া থেকে শপিংমলে বাজার, সবই হচ্ছিল নিয়মমাফিক হয়ে। সর্বত্রই বিক্রমজিতের ওয়ালেট থেকে ডিজিটাল পেমেন্ট। বিক্রমের জীবনের সঙ্গে খুচরো পয়সা বা কাগজের নোটের সম্পর্ক নেই। হাতখরচ বা অন্যান্য খরচের জন্য শতরূপারও ও একটি ডিজিটাল অ্যাকাউন্ট করে দিয়েছিল। সেখানে মাসের শুরুতে

বেশ খানিকটা টাকা পাঠিয়ে দিত।

 শপিংমলে মাছ-সবজি ও সংসারের জিনিস কেনা থেকে গাড়ি ভাড়া বা গাড়িতে তেল ভরা, কোথাও টাকা-পয়সা ছোঁয়ার কোনো দরকার নেই। তবু মুঠোতে খুচরা পয়সা না রাখতে পারার জন্য শতরূপার কখনো একটু আক্ষেপ তো হতোই।

বিয়ের ঠিক দু-বছরের মাথায় ইউরিন টেস্ট পজিটিভ হলো। শতরূপা খুশি, বিক্রমও। প্রথম বছরের পর থেকেই প্রেগন্যান্সি চাইছিল ওরা। দ্বিতীয় বছর শেষ হওয়ার আগে শতরূপা ডাক্তারের কাছেও যেতে চাইছিল। বিক্রমজিত আশ্বস্ত করত। বলত, দু-বছর গেলেই নাকি এসে যাবে। হলোও তাই। শতরূপার একবার মনে হয়েছিল, দু-বছরের জন্য যেন বিক্রমের ভেতরে কোথাও একটি লক-সিস্টেম কার্যকর ছিল। সেই লক যৌনতায় নয়, বীজের কার্যকারিতায়। না হলে বিক্রম নিশ্চিতভাবে দু-বছর সময়ের কথা কীভাবে বলত!

সেই শীতকালে যখন শতরূপার টেস্ট কার্ডে দুটো লাল দাগ, তখন অনেক বদলে গেছে চারপাশের আবহাওয়া। নভেম্বর পার হয়ে ডিসেম্বরের শেষ, তবু যেন ঠান্ডা আটকে রইল কোথাও। হাওয়া দফতর জানাল, আর কখনোই নাকি সেভাবে আর শীত ও বর্ষাকাল আসবে না। পাহাড়ের বরফ প্রায় শেষ। সমুদ্রের জল নাকি বেড়ে গিয়ে ডোবাতে শুরু করেছে একের পর এক দেশ।

 আর সেই না-আসা শীতের জানুয়ারিতে শতরূপার যখন চার মাস, তখন একদিন অফিস থেকে ফিরে শ্বাসকষ্ট হলো বিক্রমের। বেশ ভারী শ্বাসকষ্ট। বুকে ব্যথা নয়, তবু দম যেন আটকেই আসছিল।

আগের দু-আড়াই বছরে বিক্রমকে একদিন বা একবেলার জন্যও অসুস্থ দেখেনি শতরূপা। শ্বাসের সমস্যা তো নয়ই। ফলে বিক্রমের চাইতে শতরূপাই যেন ঘাবড়ে গেল বেশি। বিক্রমের অফিস থেকে কলকাতার বেশ কটি বড় বেসরকারি হাসপাতালের সঙ্গে টাইআপ। সেখানের এক জায়গায় কথা বলায় বাড়িতে এসেই বড়সড় একটি অ্যাম্বুলেন্স বিক্রমকে নিয়ে গেল। পেছনে ওলা ভাড়া করে শতরূপাও।

অত বড় হাসপাতাল, অত নামডাক, আশ্চর্য, বিক্রমের অসুখটা বুঝতে তাদের সময়ই লাগল। শ্বাসকষ্টের জন্য তখুনি অক্সিজেন, নেবুলাইজার, লাং ফাংশান না কী একটা বড় নামের পরীক্ষা প্রায় যেতে যেতে হয়ে গেল। শতরূপা নিচের বড় ওয়েটিং লাউঞ্জে একা। টেস্ট করার আগে ওকে একবার নাম ও বেড নম্বর ধরে ওপরে চারতলায় ডেকেছিল। সেখানে

৪০৬-এ বিক্রম। বিক্রমের মাস্ক পরানো মুখ, হাসপাতালের পোশাক। শতরূপা চোখের জল সামলেছে। টান হয়ে শুয়ে থাকা বিক্রমের দুই চোখ বোঁজা। তখনো অতি ঘন শ্বাস নেওয়ার চেষ্টা। মাঝবয়েসি ডাক্তার শতরূপাকে একটা ফরম সই করিয়ে বলেছিলেন, প্রথমে আমরা কার্ডিয়াক অ্যাজমা ভেবেছি, তা হয়। লাং ফাংশানেও খুব কিছু আসবে বলে মনে হয় না। ভেন্টিলেশনের কনসেন্টে আপনার সই করানো থাকল।

ভোরের আলো একটু একটু করে লাউঞ্জের বাইরের কাচে ফোটে। কয়েকটি কাক আসে কোথা থেকে। একজন ভ্রাম্যমাণ চা-ওয়ালা। হাসপাতালের সামনে কয়েকটি পথকুকুর। আলো আর একটু বাড়লে টুপি মাফলারের প্রাতঃভ্রমণের লোকেরা একের পর এক বেরোয়। ফুটপাতের ওপাশে বড় রাস্তায় এক-দুটি সরকারি বাস। শতরূপা ওর মোবাইলে চুঁচুড়ায় ফোন করে বাবা আর মাকে। তারা উদ্বিগ্ন হলেও তখনই আসতে আবার বারণও করে দেয়। পরিস্থিতি খানিকটা ঢেকে রেখেই বলে, ডাক্তাররা দেখছেন, তেমন মনে হলে তোমাদের পরে জানাব।

আরো কার কার সঙ্গে কথা বলে ও। নিজেকে হালকা করতে চায়। দিন-পনেরো হলো তলপেটে সামান্য নড়াচড়া বুঝতে শুরু করেছে। নিজেকে কাউন্সেলিং করে বোঝায়, এই সময়ে উদ্বেগ তত ভালো নয়। সকাল সাড়ে আটটা নাগাদ আরেকজন ডাক্তার ওকে ডেকে পাঠান। বলেন, শ্বাসকষ্টের মেজর যা যা টেস্ট রাতেই হয়ে গেছে। কিছুই তেমন আসেনি। কন্ডিশন একই।

বিপন্ন শতরূপা সেরে ওঠার সম্ভাবনা জানতে চায়। ডাক্তার বলেন, দুপুরে টেকনো মেডিসিনের একজন আসবেন। ডক্টর রাস্তোগি। উনি কী বলেন দেখা যাক।

শতরূপা নিচু গলায় বলে, টেকনো মেডিসিন মানে বড় কোনো টেকনিক্যাল বিষয়? খুব জটিল তেমন কিছু …

মাঝবয়েসি সাদা অ্যাপ্রন পরা ডাক্তার টেবিল ছেড়ে কর্মান্তরে যেতে যেতে বলেন, এমন পেশেন্ট আজকাল দু-একজন পাচ্ছি। উনি আসুন, দরকারে আপনাকে আবার ডেকে নেব।

দুপুর যায়। বিকেল যায়-যায়। শৌখিন আত্মীয়-পরিজনে ভরে থাকে ঝাঁ-চকচকে বসার জায়গা। তার ভেতরেও খানিক দূরের চেয়ারে মাথা নামিয়ে কাঁদতে থাকা কাউকে দু-তিনজন সান্ত্বনা দেয়। বিক্রমের বাবাকে লখনৌয়ে ফোন করে শতরূপা। তিনি পরদিন আসবেন বলে জানান। ওপরে ওর ডাক পরে রাত ঠিক আটটায়। শতরূপা তখন বাড়ি ঘুরে আসবে ভাবছিল। পোশাক পাল্টাবে। তেমন দরকার না থাকলে পরদিন সকালেই আসবে। তেমন‌ ভাবতে ভাবতেই শান্ত মাইক্রোফোনে ডাক, ৪০৬। ওপরে যেতে সকালের সেই ডাক্তারবাবু বলেন, তখন যেমন ভাবা হয়েছিল একেবারে তাই। টেকনো মেডিসিনের কেস। আপনি আসুন।

প্যাসেজ দিয়ে অন্য ঘরে নিয়ে যেতে যেতে ডাক্তারবাবুর ভঙ্গিতে খানিকটা যেন আশ্বাস। যে-ডিপার্টমেন্টের কেসই হোক না কেন, রোগ ধরা পড়ায় চিকিৎসার সুযোগ তৈরি হয়েছে। ঘরে নির্দিষ্ট বেডের কাছে নিয়ে যেতে যেতে তিনি বলেন, আপনি কি জানতেন যে মিস্টার বিক্রমজিত উপাধ্যায় আসলে একজন রোবট!

রোবট! চৌকাঠে পা বাধার মতো শব্দটার গায়ে হোঁচট খেয়ে পড়ছিল শতরূপা। তখনই দেখে ওর সামনেই যে বেড তাতে শোয়ানো বিক্রমজিত। দু-চোখ বোঁজা, মাথা একদিকে ফেরানো। যেন গভীর ঘুমে ডুবে রয়েছে। গলার নিচ থেকে বাকি শরীর নীলচে চাদরে ঢাকা। বিক্রমজিতের বেডের পাশে একজন সিস্টারের সঙ্গে আরো এক ডাক্তার। ইনিই কি তবে ডাক্তার রাস্তোগি, টেকনো মেডিসিন!

শতরূপা পাশে এলে ডাক্তারদের নির্দেশেই সিস্টার ধীরে চাদরটি সরিয়ে দেন। বিক্রমের আলগা বুক ও পেট দেখে চমকে ওঠে শতরূপা। ঢাকনা সরানোর মতো বুকের সামনেটা সরানো। বুকের খাঁচার ভেতর ছবিতে যেমন দেখা যায় তেমন ফুসফুস হৃদপিণ্ড নয়। তার বদলে নানা রকম কয়েল, সার্কিট, কোথাও মাঝারি কোথাও ছোট মাপের স্প্রিং। কোথাও বড় কৌটোর মতো গোলাকৃতি কোনো বাক্স। বুক থেকে গলার ভেতর দিকে ঢুকে রয়েছে সরু-মোটা

লাল-নীল-সবুজ তার। তবে সারাবুকে        কোথাও কোনো নড়াচড়া নেই। যেন ঘড়ি বন্ধ হয়ে রয়েছে।

পাশে দাঁড়ানো রাস্তোগি কথা শুরু করেন। … সি ম্যাডাম, দিস ইজ দ্য ফুল চেস্ট ইউনিট। ডানদিকের একটা প্যানেল গত দুদিন ধরে শর্ট হচ্ছিল। আই-সির প্রবলেম। আগামীকাল চেন্নাই থেকে নতুন আই-সি আসছে, আমরা চেঞ্জ করে দেব।

শতরূপা সম্পূর্ণ ঘোরের ভেতর। মাথা ঝিমঝিম। গা গোলানো ভাব। বেডের রেলিংটি ধরে নেয়। তবুও অস্ফুটে বলে, ও ভালো হয়ে যাবে তো …!

শতরূপাকে ধরে লাউঞ্জে বসিয়ে দিয়ে যাওয়া হয়। ও বাড়ি যাওয়া ভুলে যায়। পরদিন চুঁচুড়া থেকে ওর বাবা আসছেন। বিক্রমজিতের বাবা-মাও হয়তো এসে যাবেন। সন্তানের রোবট শরীরটি কি তাদের জানা? বিক্রমের মা বোঝেননি! নাকি দীর্ঘদিন বাড়ি ছেড়ে কঠিন পড়া, পরে চাকরির উন্নতি ভাবতে ভাবতে ভেতরটা বদলে গেছে বিক্রমজিতের!

শতরূপা চেয়ারে বসেই তলপেটে হাত রাখে। কাচের ওপাশে কলকাতার সন্ধে-রাত। বাস আর অটোর চলাচল। ভোরবেলার চা-ওয়ালা সন্ধেয় উঁকি মারতে এসেছে আবার। কিন্তু শতরূপার তলপেটে যে উঁকি মারতে শুরু করেছে সে কে!

অতি ছোট একটি মানুষ, নাকি রোবটদের রোবট তৈরি শুরু হলো তার ভেতরেই।

Leave a Reply