মোস্তফা তারিকুল আহসান

একজন কবি কবিতা লেখার জগতে নিজেকে সমর্পিত করার পর তাঁর সামনে অজস্র সমস্যার জন্ম হয়; অনেকে অভ্যাসবশত কবিতা লিখে চলেন কবিতার শাশ্বত সুষমার বা গঠনের কথা না ভেবে। আর যাঁরা সচেতন এবং কবিতার দীর্ঘ ব্যঞ্জনাময় ইতিহাস জানেন, জানেন যে খ্রিষ্টপূর্বাব্দ থেকে কবিতার চলমান প্রক্রিয়ার সঙ্গে কী কী অনুষঙ্গ অন্বিষ্ট হয়েছে, অথবা কীভাবে কবিতার নন্দন খুঁজে নিয়েছে কবি তাঁর যাপিত জীবন থেকে, কীভাবে চিন্তা-বুদ্ধি আর জীবনবোধের সূক্ষ্ম কারুকাজ যুক্ত হয়ে উদ্দীপ্ত করে তোলে কবিতার প্রতিটি পঙ্ক্তি। নিজের পথের রশি কবি সবসময় দেখতে পান, যদি তিনি প্রকৃত কবি হন। লঙ্গিনাস যেভাবে কবিতার চূড়ান্ত উৎকর্ষের কথা বলেছিলেন হাজার হাজার বছর আগে তা আজো সত্য। অর্থাৎ কবিতার প্রধান কাজ অন্য সত্তাকে উজ্জীবিত করা – কোমলে কুসুমে কল্পনার সুতোর ঔজ্জ্বল্যে আর প্রাণের প্রশমিত সংহত আবেগে সে-কবিতার চরণ মানবমনের প্রগাঢ় চৈতন্যকে দুলিয়ে দিয়ে যায়। বস্তুত পৃথিবীর জাগতিক সমূহ উন্নতি হলেও মানবপ্রজ্ঞা বা চিন্ময় ভুবনের তেমন কোনো পরিবর্তন হয় না; অভিজ্ঞতার অভিজ্ঞানের সারাৎসারের কোনো পরিবর্তন হয় না। সে-কারণে আমাদের গড় বুদ্ধিবৃত্তিক বা শৈল্পিক এষণার খুব বেশি রকম ফের হয়নি। তাই সময়, সভ্যতা, বিজ্ঞান আর প্রযুক্তির নানা প্রকরণের ভেতর দিয়ে কবিতা কতদূর গেছে তা গভীরভাবে ভাবা প্রয়োজন।

বাংলাদেশের কবিতার সামগ্রিক শরীর আমাদের এরকম কথা মনে করিয়ে দেয় যে, সেখানে পুষ্টিহীনতার অনেক বৈশিষ্ট্য রয়ে গেছে; অপুষ্ট রোগাক্রান্ত এসব অবয়ব নিয়ে আমরা গর্ব করি। গর্বের জায়গা আমাদের রয়েছে, তবে অগৌরবের পরিসংখ্যানও কম নয়। গত শতাব্দীর চল্লিশের বা পঞ্চাশের দশক থেকে আজ পর্যন্ত আমাদের কবিতার সামগ্রিক বৈশিষ্ট্য নিরীক্ষণ করলে দেখা যাবে, আমরা দশকওয়ারি একটা ইতিহাস লিখতে চেয়েছি, যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় বলে আমার মনে হয়। একজন কবি বিভিন্ন সময়ে লিখছেন, সে-কারণে বিভিন্ন সময়ের নানা ঘাত-প্রতিঘাত তাঁর কবিতায় প্রভাবক হিসেবে  কাজ  করবে,  সেটাই  স্বাভাবিক।  দশকের বৈশিষ্ট্য মাথায় রেখে নিশ্চয় কেউ কবিতা লেখেন না। তবে কখনো কখনো দশকের কিছু বৈশিষ্ট্য নির্দিষ্ট কবিদের বেলায় বেশ প্রযোজ্য হয়ে যায়। কবিতার গঠনকাঠামো, বাক্যবিন্যাসের ধরন কিংবা প্রয়োগকৌশল, এমনকি চিন্তার বিভূতির একটা গড় আবহ সেই সব কবির বেলায় লক্ষ করা যায়। তবে সিরিয়াস কবি বা প্রখর প্রতিভাসম্পন্ন কবিদের এসব ঘেরাটোপে বন্দি করা যাবে না। রবীন্দ্রনাথ বারবার নিজের লেখার ধরন পাল্টেছেন। ত্রিশের কবি হয়েও জীবনানন্দ আলাদা ছিলেন। যা হোক, বাংলাদেশের কবিতায় চল্লিশ-পঞ্চাশ দশক থেকে যাঁরা এ-যাবৎ লিখছেন তাঁদের কবিতার সামগ্রিক মূল্যায়নের সময় আমাদের কিছু গতানুগতিক আইডিয়া মাথায় নিয়ে এগোবার কথা ভাবলে মন্দ হয় না। তাহলে একটা ছকবাঁধা

কথাবার্তার মধ্যে থেকে কিছু সাধারণ আলোচনা-উদাহরণ দিলে কাজ সমাধা হতে পারে। সাহিত্যের বাস্তবতা অবশ্য অন্য কথা বলে। খুব বেশি প্রচল ধারায় অভ্যস্ত রচনা শিল্প থেকে অনেক দূরে থাকে সর্বদা। সাবলিমিটি দিয়ে কবিতার উৎকর্ষের যে-মানদণ্ড নিরূপণ করা হয় তা একদিকে সত্য। সেক্ষেত্রে কবি নতুন ধারার কবিতা লিখতে না পারলেও অন্তত কবিতার স্বাভাবিক শক্তি ও সম্ভাবনার নিরিখে তাকে কবিতা বলতে কারো আপত্তি থাকে না। এই পথটাও অনেকে গ্রহণ করেন।

আমাদের পঞ্চাশ দশককে সমালোচক ও কবিরা বেশ শক্তিশালী কবিতা প্রস্ফুটনের সময় হিসেবে মনে করতে গর্ববোধ করেন। যদিও কেউ কেউ মনে করেন, এটি ত্রিশের কবিতা-আন্দোলনের বীজ নিয়ে রচিত খানিকটা নিষ্প্রভ ধারা, যার রং বেশকিছু আগে ফিকে হয়ে গিয়েছিল। তবে নতুন পাকিস্তান রাষ্ট্রের উন্মাদনা এখানে স্পর্শ না করলেও স্বাধীনতার দীপ্র বোধের সামান্য নমুনা পাওয়া গিয়েছিল সে-সময়ের কবিতায়। ইউরোপীয় কবিতা দ্বারা অনুপ্রাণিত এবং প্রভাবিত কবিদের বেশ সুনাম হয়েছিল আর প্রতিক্রিয়াশীল কিছু কবি প্রকৃতি আর ঐতিহ্য থেকে উপাদান সংগ্রহ করেছিলেন। যাঁদের আমরা মূলধারা বলে জানি তার মধ্যে একদল বেশ শক্তিমান হিসেবে পরিচিতি পেয়েছিলেন। মূলধারার বাইরে একগুচ্ছ কবিকে আমরা পাই যাঁরা আলোর সামনে আসতে পারেননি; তাঁরা যা লিখেছেন তা শক্তিশালী কি না সে-প্রশ্ন বাদ দিলেও ইতিহাসের অংশ হিসেবেও তাঁদের আলোচনা হওয়া উচিত ছিল। আমাদের সমালোচনা সাহিত্যের  দুর্বলতা ও পক্ষপাতিত্বের কারণে এই কবিরা কখনো আলোর মুখ দেখেননি। পঞ্চাশ বা ষাটের এমন অনেক কবি আছেন যাঁরা বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে গেছেন; কোনো প্রজন্মই তাঁদের নাম পর্যন্ত শুনতে বা জানতে পারবে না।

কবি আহমদ রফিক আমাদের বাংলাদেশের একজন প্রবীণ কবি। পঞ্চাশের মাঝামাঝি সময় থেকে তিনি লিখছেন। কম আলোচিত কবি তিনি এবং মূলত তাঁর পরিচয় প্রাবন্ধিক হিসেবে। প্রবন্ধ লিখলে যে কেউ কবি হিসেবে হারিয়ে যাবেন – এমন নয়। মূলত আহমদ রফিক শুরু করেছিলেন গদ্য দিয়ে, কবিতাও লিখতেন। তবে প্রবন্ধ বিষয়ে তাঁর পারদর্শিতা বেশি প্রকাশিত হয়। ফলে তাঁর কবি পরিচয় খানিক আড়াল হয়ে যায় এবং তিনি অনেক পরে কবি হিসেবে তাঁর কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ করেন। এ-বিষয়ে তাঁর মতামত ব্যাখ্যা করা যায় : ‘প্রবন্ধ লেখায় আমার যেমন আগ্রহ, তেমনি  প্রকাশের জোর তাগিদ ছিল পত্রিকা সম্পাদকের পক্ষে।  … তাই পত্রিকায় বরাবর প্রবন্ধ বেরিয়েছে, কবিতা নয়। কবিতা প্রকাশ শুরুতেই গ্রন্থভুক্ত হয়েছে কখনো প্রকাশকের, কখনো নিজের আগ্রহে। এবং একটি ছাড়া আমার কবিতার সবকটা প্রকাশনা সংস্থা হয় নতুন না হয় দুস্থ। কবিতার বইগুলো তাই বড় একটা পাঠক সান্নিধ্যে পৌঁছাতে পারে নি। এদিক থেকে বিচার করতে গেলে আমার কবিতার ভাগ্য, রবীন্দ্রনাথের ভাষায় ‘যেন ঘোলাজলের ডোবা’।’ কবির এই সত্যভাষণ থেকে কিছু অনুসিদ্ধান্তে আসা যায়। কবিতার প্রতি তাঁর দুর্বলতা ছিল প্রথম থেকেই। কেউ কেউ অনুমান করতে পারেন যে, তাঁর কবিতা দুর্বল বলেই সম্পাদক মহাশয় তাঁর কাছে কবিতার পরিবর্তে প্রবন্ধ চাইতেন। কবি সম্পাদকদের ইচ্ছা পূরণ করতে গিয়ে নিজের কাব্যশক্তির প্রতি খানিকটা অবিচার করেছেন বলে আমাদের ধারণা  হতে পারে। আবার অন্য বাস্তবতা হলো, কাব্যশক্তি প্রবল হলে সম্পাদক কবিকে থামাতে পারতেন না। ষাটের দশকের শেষ পাদের রাজনৈতিক ঘটনাবর্ত নিয়ে কিংবা ভাষা-আন্দোলনের চেতনা নিয়ে তিনি যে গভীর কবিতা লিখলেন সেগুলো সে-সময়ের পাঠকসমাজ একরকম জানতে পারেনি। ফলত তিনি কক্ষপথ থেকে ছিটকে গেছেন। পঞ্চাশ বা ষাটের সিরিয়াস আলোচনায় আমরা তাঁর নাম পর্যন্ত দেখি না। বাংলাদেশের পাঠক বা সমালোচকদের চেষ্টা-চরিত্রি সম্পর্কে সবার কম-বেশি ধারণা আছে। তাঁরা খুব বেশি কষ্ট করতে চান না। এখন যখন তার কাব্যসমগ্র বের হয়েছে সেটা আগের সেই দীর্ঘ ফাঁকা জায়গা পূরণ করতে পারবে বলে মনে হয় না। এমনকি কবিতা খুবই শক্তিশালী হলেও তা সময়ের কারণে ইতিহাসবদ্ধ হওয়া সবসময় সম্ভব নয়। পঞ্চাশের দশকের কবির কাব্যসমগ্র ২০১৩-তে বের হওয়াটা ব্যতিক্রম বটে। তাতে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। 

কবি আহমদ রফিকের কবিতা তাঁর দীর্ঘ জীবনের নানা অভিজ্ঞতার নির্যাস ও ঐতিহাসিক ঘটনাবর্তের সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে হবে। তাঁর কবিতায় তন্ময় কবিতার বৈশিষ্ট্যই ধরা পড়ে; সেখানে বিপন্ন স্বদেশ আর রাজনৈতিক আবহ তাঁর কবিতাকে বেঁধে ফেলে গভীরভাবে। তিনি নিজের সমগ্রে তাঁর কবিতা সম্পর্কে দীর্ঘ আলোচনা করেছেন। বিষয়বস্তু সম্পর্কে বলেছেন, কখন কী কেন লিখেছেন বা কারা কী বলেছিলেন – সে-সম্পর্কে বিস্তারিত বলেছেন। পাঠকও সমালোচকদের জন্য এই তথ্যগুলো জরুরি বলেই মনে হয়। তবে পাঠক কবিতা পড়তে গিয়ে মনে করবেন সেটাই আসল বিষয়।

কবিতায় তিনি পরিমিত বলা যায়। কারণ ষাট-সত্তর বছর ধরে তিনি দশটি কাব্য লিখেছেন। দীর্ঘ বিরতি দিয়ে কাব্যগ্রন্থ ছেপেছেন। লক্ষ করার বিষয়, সংগ্রহে তাঁর পরে রচিত কাব্যগুলো আগে সন্নিবেশিত হয়েছে। এর ব্যাখ্যা কী বলা শক্ত। তবে আমার মনে হয়, এটা না করলে ভালো হতো। কারণ তাঁর প্রথমদিকের কাব্যগুলোতে কবির সক্ষমতার যে-উদাহরণ রয়েছে পরের কাব্যগুলোতে তা নেই; সেখানে ক্ষয়িষ্ণু কবির ক্লিশে লেখার উদাহরণ রয়েছে প্রচুর পরিমাণে। পাঠক স্বভাবতই হোঁচট খাবেন। অথচ তাঁর আগের রচনা বেশ শক্তিশালী।

সামগ্রিক রচনার বিষয়বস্তু এবং গঠনগত সৌকর্যের

দিকে তাকালে আমরা লক্ষ করব যে, কবি তাঁর সমসাময়িক জাতীয়  জীবনের সামূহিক বাস্তবতাকে গভীরভাবে অবলোকন করেছেন এবং তাকে কবিতার নিজস্ব ভাষায় মণ্ডন করে উপস্থাপন করেছেন। প্রেম-প্রকৃতির চেয়ে ক্ষুব্ধ স্বদেশ, বিপন্ন মানবতা, রাষ্ট্রীয় অবিচার, পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর অমানবিক প্রকল্পই তাঁর কবিতার প্রধান বিষয়বস্তু। আমিত্ব এখানে নেই বললেই চলে। পরবর্তীকালে রচিত কাব্যে ব্যক্তিগত হতাশার উপস্থিতি লক্ষ করা যায়। সেখানে কবিতা খুব সাধারণ চেহারা নিয়ে হাজির হয়েছে। কবির সকল শক্তি ও সম্ভাবনা আমরা খুঁজে পাবো প্রথম কয়েকটি কাব্যের মধ্যে। সেইসব কবিতার গতি শব্দযোজনা ও বিষয়ের গভীরতা কবিকে স্বতন্ত্র স্বর নির্মাণে সহায়তা করেছে। এখানে তিনি সত্যিকার অর্থে কবিতাকে তাঁর  উপলব্ধির রজ্জুপথে আটকাতে পেরেছেন; কবিতার সুষমাকে পরিপূর্ণতার চাদরে ঢাকতে পেরেছেন। স্বতঃস্ফূর্ততাও কবিতার একটি বড় বৈশিষ্ট্য, সেই উদাহরণও আমরা এই পর্বে পাই :

সে আসবে ভয়ের প্রান্তর

বিশ্বাসের দীপ্ত ফালে চিরে চিরে উর্বরতা নিয়ে

জমাট শিলায় এঁকে প্রাণের উত্তাপ;

সে আসবে, সে আসছে জেনো

হলুদ সর্ষের মাঠ আবার সুগন্ধি

নয়নাভিরাম ছবি, ডোবা বিল ‘ঝরাক্ষেত’

অন্ধকার মাঠ পাড়ি দিয়ে

বিজয়ের অভিসারে কৃষ্ণচূড়া রুমাল উড়িয়ে।

             (‘কেন এ কান্না তোমার’, রক্তের নিসর্গে স্বদেশ)

ঊনসত্তর-সত্তর সালে রচিত এই কবিতায় কবি প্রগলভ এবং বিপ্লবী। একই সঙ্গে তিনি বিশ্ববীক্ষাকে ধারণ করেছেন তাঁর কবিতায়। ইতিহাস-সচেতন কবি বিশ্বমানবতার বিপন্নতাকে কবিতার বিষয় হিসেবে নিয়েছেন গভীর কাব্যিক অনুষঙ্গে :

কফিন-স্তব্ধতা ঢাকা ধু ধু মাঠ ন্যাড়া বন গ্রাম গ্রামান্তর

আগুনে শোণিতে কালো,

আরকের বিষাক্ত ধোঁয়ায়

সবুজ পত্রালি পেশি ফসলের ক্ষেত

পোড়ামুখ চেয়ে থাকে তীব্র প্রতিবাদে;

চোখের শোণিতে স্রোতে কান্না হয়ে ভেসে যায় –

‘সং মাই’ জনশূন্য ‘মাইলাই’ গ্রাম

মাটির সম্ভ্রম চিরে হেসে ওঠে লোমশ পোষাকে

শ্বাপদ-হিংসার দাহ রক্তনখ শ্বেত অহঙ্কার।

নভেম্বর ১৯৭০ সালে তিনি লিখছেন স্বাধীনতার আকাক্সক্ষার কথা, সাধারণ মানুষের গভীর আগ্রহের বীজমন্ত্রের কথা। তাঁর কবিতা এ-সময়ে বাঙালির চেতনাকে ধারণ করেছে পঙ্ক্তিতে :

ভায়ের বোনের মুখে যে প্রহর আলোয় বিম্বিত

সে যেন রয়েছে কাছে বড় কাছে পাঁজরের নীচে,

সমস্ত মুখর দিন রাতভর তাকে আমি

খুজে ফিরি সমূহ বাসনা-সিক্ত জনারণ্যে

প্রাত্যহিক চোখের গভীরে।

একাত্তরের ফেব্রুয়ারি মাসে তিনি লিখছেন আমাদের শহিদদের প্রতি গভীর আততি জানিয়ে। তাঁরা মরেননি, তাঁরা আছেন আমাদের সত্তায়, আমাদের রক্তে, আমাদের চেতনার শিখায়। একুশের চেতনায় কবি আহমদ রফিক যেন একাত্তরে মনে করিয়ে দিচ্ছেন তাদের ভূমিকাকে। নিজে একুশের সৈনিক হয়ে তাঁর এই উপলব্ধি আমাদের উজ্জীবিত করে নতুনভাবে। মুক্তিযুদ্ধ তো একুশেরই পরবর্তী পর্যায়। তাই দুই চেতনাকে তিনি এক করে দেখেছেন। তাঁর উপলব্ধি কবিতার মহান শৈল্পিক বোধ হিসেবে আমাদের কাছে প্রতিভাত হয়।

আস্তে হাঁটো

মনে হয় দেখিনি কখনো

পথের শরীর থেকে এত রক্তপাত

স্তব্ধ করে দিতে পারে বর্ণময় রূপসী দিগন্ত;

সব গান ছুটে আসে বীতশ্বাস ব্যথিত পাঁজর

করোটি সজ্জিত পথে ধ্বনির শরীর

অবিচল তরুণী – শুভ্রতা

সমস্ত প্রয়াস তৃষ্ণা রেখে যায় করুণ সূর্যাস্তে।

মরেনি মানুষ আজো অস্থিসার প্রাণের ভুবনে।

স্বাধীনতার লড়াইকে কবি নতুন মাত্রা দিতে পেরেছেন কবিতার চরণে চরণে। সে-কারণে ‘আঁধার-মাখা রক্তকাদায় স্নিগ্ধ  ছবির দেশ/ অবাক নিরুদ্দেশ’ মনে হয় কবির কাছে। এবং তিনি অমৃতের সন্তান দৃপ্ত সৈনিকদের উদ্দেশ করে বলেছেন :

ভয় পেয় না রক্ত জলে ভেসে

ঘুমের রাত ঘাতক-রাত শেষে

সময় ভাঙা ছায়ার মিছিল

দৃপ্ত পেশির টানে 

ফুল ফোটাবে ভীর আনীল

বুনোলতার প্রাণে।

বিপন্ন স্বদেশ বিধ্বস্ত বাংলাদেশের ছবি এঁকেছেন কবি অপূর্ব কুশলতায়। আবেগ কবিকে শৈল্পিক সুষমা থেকে বেপথু করে অনেক সময়। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়ের সেই আবেগময়তাকে কবিতা করে তোলা বেশ কঠিন। কারণ সাময়িক উত্তেজিত ও জাতীয় জাগরণমূলক চেতনা বিষয়ে চিরায়ত ধারার কবিতা লেখা সেই সময় সহজসাধ্য হবার কথা নয়। তবু আহমদ রফিক খুব সচেতনভাবে শিল্পের প্রকৃত দাবি রক্ষা করে কবিতার বিষয়বস্তুকে অত্যন্ত নিজের মতো করে প্রকাশ করতে পেরেছেন। তিনি স্রেফ বর্ণনা দেননি কখনো, বরং শক্তিশালী চিত্রকল্প তৈরি করেছেন, যা কবিতার মূল চরিত্রকে শনাক্ত করে :

অজস্র শোণিতমাখা বাঁকানো ফলক

চোখের নিসর্গ ছেড়ে বারবার দেহের মাটিতে

খেলা করে, তামসিক প্রখর আবেগে

উপড়ায় অস্ত্র শিরা হৃৎপিণ্ড পেশির আগাছা,

রোদের হলুদ নীল তীব্র স্বচ্ছতায়

ছায়া ফেলে পোড়ামুখ শস্যক্ষেত

হার মানে বীভৎস্য গোর্নিকা।

আমরা লক্ষ করব, বিপন্ন স্বদেশের নানা রূপ তিনি বর্ণনা করার সময় খুব সচেতন থেকেছেন, যেন কবিতার কুসুম লাবণ্য থেকে তিনি বিচ্যুত না হন। সত্য হলো, মুক্তিযুদ্ধের সময় সংঘটিত যাবতীয় হৃদয়স্পর্শী ঘটনা থেকে তাঁর কবিতার চরণ তৈরি করা সহজ, তবে সহজ নয় সেখান থেকে প্রকৃত অনুষঙ্গ বেছে নেওয়া। যারা বেছে নিতে পেরেছেন কাব্যোপম সূক্ষ্ম অনুষঙ্গ তাঁরাই প্রকৃত কবিতার কাছাকাছি  পৌঁছতে পেরেছেন। যুদ্ধের মধ্য থেকে সেখান থেকে নিরাসক্ত দৃষ্টি নিয়ে কবিতা রচনা করা কষ্টকর। আমরা এরকম অনেক শক্তিমান কবিকে জানি যাঁরা সাময়িক বিষয় নিয়ে কবিতা লিখতে গিয়ে কবিতার প্রসাদগুণ নষ্ট করেছেন সম্পূর্ণভাবে। সেই দিক দিয়ে বিবেচনা করলে আহমদ রফিক, যিনি আলোচিত ছিলেন আমাদের উল্লেখযোগ্য দশকগুলোতে, তিনি আমাদের স্বাধীনতা মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কবিতা লেখার ব্যাপারে খুব সচেতনতার পরিচয় দিয়েছেন এবং সফলতা পেয়েছেন। এটা স্পষ্ট করে বলা যায়, এ জাতীয় কবিতা রচনায় তাঁর কবিসত্তা ও শিল্পীসত্তা যুগপৎভাবে তাঁকে সাহায্য করেছে এবং তিনি প্রাণিত হয়েছেন মহান বোধের সঞ্চারে। ফলত তাঁর কবিতায় আমরা সেই প্রেরণার উৎসধারার সন্ধান পাই যা আমাদের দীপ্র চেতনা শাণিত করে। কবি বিষ্ণু দে-কে উৎসর্গ করা ‘যমও নেয় না তাকে’ কবিতা এক বৃদ্ধ রমণীর বয়ান দিয়ে তিনি লিখেছেন একটি কবিতা। যে-রমণী বটগাছের মতো দীর্ঘজীবন পেয়েছিলেন, হারানো ছেলের অপেক্ষায় তাঁর দিন কাটত। সেই বৃদ্ধা শেষ পর্যন্ত হানাদার বাহিনীর হাতে মারা যান। এরপর ফেরে তাঁর মুক্তিযোদ্ধা ছেলে। কবি এই ঘটনাটিকে অপূর্ব শোকগাথা হিসেবে আমাদের সামনে উপস্থাপিত করেছেন –

তবু দ্যাখো, যম তাকে নিয়েছে এবার

হানাদার ঘাতকের রক্ত-মাখা বেয়নেট বিঁধে

গ্রামীণ সূর্যাস্ত-লাল ছড়িয়ে ছিটিয়ে

পথে ঘাটে খামারে প্রান্তরে ফুল ফল ঘাসের সর্বাঙ্গে।

হারানো ছেলেটি তার অবশেষে ফিরে আসে

কপালে জয়ের টিপ, ঘরে ঘরে বারুদের 

গন্ধমাখা বিষণ্ন উল্লাস ঘিরে নিশ্চিন্ত আশ্রয়ে,

নির্বিকার বিধি বাম, বর্বরতা পেরিয়ে বুড়িমা

নিশ্চিত যমের বিষ-মুখ থেকে ফিরে আসা রক্তস্নাত

পাননি ছেলের দেখা:

যুদ্ধের ভয়াবহতাকে কবি নানাভাবে বর্ণনা করেছেন এ-পর্যায়ের নানা কবিতায়। সাত কোটি মানুষের আশা-আকাক্সক্ষাকে বাস্তব রূপ দিতে যাঁরা অকাতরে প্রাণ দিয়েছেন, তাঁদের সেই প্রতিরোধ আন্দোলনের শক্তিকে কবি প্রতীকী করে তুলতে চেষ্টা করেছেন কবিতায়। এই বর্ণনাও কবিতাসুলভ সন্দেহ নেই :

সময় এসেছে আজ, পবিত্র শপথ

শোকাবহ অন্ধকারে সূর্যমুখী জ্বলে,

মাটির ইজ্জত নিয়ে ছিনিমিনি খেলার বিলাস

তরল আগ্নেয় স্রোতে ভেসে যায়, পিশাচ দম্ভের

আমূল মৃত্যুও ডাক

আর্তনাদ

প্রতিধ্বনি হয়ে ফেরে, তীক্ষè প্রতিরোধ

শাণিত অস্ত্রের দীপ্তি প্রতিটি স্নায়ুর

ঝলসানো সূচিমুখে প্রাণের উল্লাস

আরক্ত বৈভব নিয়ে রক্তে দোলে,

উদ্ধত শত্রুর

মরণ নিশ্চিত জেনে সাতকোটি প্রতিরোধ

মশালের সুতীব্র আলোয়

পথে পথে চলে।

কবিকে তাঁর নিজের অবস্থান ধরে রাখতে হয়। যে-কাব্যপথ তিনি নির্মাণ করে তোলেন তার ভেতরে তার স্থির চৈতন্যের যে-লীলা তাঁকে প্রতিপালিত করার জন্য কবির ব্যঞ্জনানিষিক্ত বোধের অণু-পরমাণু নিঃশেষ হতে পারে। নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা, পঠন-পাঠন এবং অবিরাম কাব্যময় জীবনযাপনের অভাব কবিকে প্রকৃত কবিতার জগৎ থেকে দূরে রাখতে পারে, কখনো সাময়িকভাবে কখনো দীর্ঘ সময় ধরে। কখনো তিনি চেষ্টা করলে আবার স্বভূমে ফিরে আসতে পারেন, কখনো পারেন না। তবু অনেক কবি স্বভাবজাতভাবে এবং সাময়িক খ্যাতির মোহে এই অহেতুক ক্রিয়াকলাপ চালিয়ে যেতে থাকেন। সেটা অভ্যাসজনিত একটি চর্চার ধারাবাহিকতা হতে পারে, তবে কবিতা এতোটা সুযোগ কবিকে দেয় না। অর্থাৎ আপনি অভ্যাসবশত যা মনে হয় প্রাত্যহিকের ছোটখাটো প্রসঙ্গ বা বহুকথিত ভাবনামালা বয়ান করবেন আর তা কবিতা হয়ে উঠবে – এমন ভাবার কোনো কারণ নেই। পৃথিবীর সবচেয়ে প্রাচীন, ঋদ্ধ ও সূক্ষ্ম শিল্প কবিতা বিষয়ে কবির নিজের এই অনবধানতা মহাকালও ভালোভাবে গ্রহণ করে না।

কবি আহমদ রফিক দীর্ঘদিন কবিতার প্রাণ নিয়ে আছেন। প্রবন্ধ বা গবেষণায় মনোনিবেশ করলেও তাঁর সত্তায় যে কবির অংশ গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে ছিল – সবসময়, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কবিতার বিষয়বস্তু, বোধের ব্যাপ্তি, ব্যঞ্জনার সমারোহ আর প্রকরণকৌশলের সাবলীলতা নিয়ে তিনি যে ধারাবাহিক কাব্যধারা নির্মাণ করেছেন তাকে আমাদের গুরুত্বসহকারে বিবেচনায় রাখা বাঞ্ছনীয়। তিনি বেশ বঞ্চিত হয়েছেন বলা চলে। তবে শেষ পর্যায়ের কিছু কাব্যগ্রন্থ (যেমন – ভালোবাসা ভালো নেই, বিচ্ছিন্ন পঙ্ক্তিমালা) তাঁর ধারাবাহিক সফলতাকে মøান করেছে – এমন ধারণা করা খুব স্বাভাবিক। খুব সাধারণ বিষয় নিয়েও কবিতা হতে পারে, তবে তাকে কবিতা হয়ে উঠতে হয়। 

সামগ্রিকভাবে আমরা মনে করতে পারি, একটা দীর্ঘসময় ধরে বাংলাদেশের রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক ইতিহাসের অন্যতম পর্যবেক্ষক কবি আহমদ রফিক; তাঁর জীবনের গভীরে রেখাপাত করে সাময়িক অথচ জাতীয় চেতনার তাৎপর্যপূর্ণ অনুষঙ্গসমূহ। কবি এসব বিষয়কে কবিতার স্বাভাবিক সৌন্দর্যের আবরণে উপস্থাপন করেছেন। ব্যক্তিগত প্রসঙ্গ থেকে সামষ্টিক বিষয়াদি তাঁকে বেশি আকৃষ্ট করেছে। যে সরল নিরাভরণ অবয়বে তিনি কবিতার প্রাসাদ গড়েছেন তাতে তাঁর নিজস্ব বোধের কারুকাজ মিশে আছে; মিশে আছে বাংলার প্রকৃতি, সংস্কৃতি, সভ্যতা ও ইতিহাসের নির্যাস। এভাবে একধরনের নিজস্বতা আমরা আবিষ্কার করতে পারি আহমদ রফিকের কবিতায়, যা তাঁকে স্বতন্ত্র স্বরের কবি হিসেবে চিহ্নিত করেছে।            – ছবি : ইন্টারনেট

Leave a Reply