ইউজেনিও মন্তেল ইতালীয় আধুনিক কবিতার প্রধান স্থপতি

লেখক:

কামরুল ইসলাম

ইতালির সাহিত্য তথা স্ট্যান্ডার্ড ভাষাটার উৎস বলতে গেলে চতুর্দশ শতকের তুসকান ডায়েলেক্ট। এটি মূলত দান্তে, পেত্রাক ও বোক্কাসিওর তৈরি ভাষা। পরবর্তীকালে সাহিত্যের নতুন বিষয়ের সন্ধানে যখন দারিদ্র্য এবং সমসাময়িক জীবনযাপনের পরিধির মধ্যে লেখকরা খুঁজতে থাকেন নতুন কোনোকিছু, তখন গিওভ্যানি ভার্গার মতো লেখকরা নতুন বিষয়ের উপযোগী ভাষা আবিষ্কারে ব্রতী হন। উনিশ শতকের শেষপাদে এসে প্রখ্যাত পুরুষ লেখকদের পাশাপাশি নারী লেখকদেরও আবির্ভাব শুরু হয়। এ-সময়ে বিজ্ঞানী ও দার্শনিক গ্যালিলিও, নাট্যকার কার্লো গোলদোনি, গীতিকবি গিয়াকোমো লিওপার্দি, রোমান্টিক ঔপন্যাসিক এলেসান্দ্রো মানজোনি এবং কবি গিয়োসু কার্দুসি নিজ নিজ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখেন।

প্রথম জেনারেশনের নারী লেখকদের মধ্যে সার্দিনিয়ান লেখক গ্রাজিয়া দেলেদার নাম করা যেতে পারে। ১৯২৬ সালে তিনি সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পান। বিশ শতকের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য নারী লেখকের নাম এলসা মরান্তে। এই শতকের লেখকদের বিষয়বস্ত্তর বৈচিত্র্য ও ব্যাপকতা তাঁদের সৃষ্টিকর্মকে উচ্চকিত করে। এই দশকের গোড়ার দিকের গ্যাব্রিয়েল ডি’আনানজিওর সজীব দেশপ্রেম দেলেদার অস্তিত্ববাদী চেতনাকে উস্কে দিয়েছিল এবং এ-সময়ে উগো ওজেত্তি ইতালীয় জীবনের স্থানিক বিষয়সমূহের ওপর আলো ফেলেন। ফ্যাসিস্ট শাসনের সময়ে ইতালির অনেক লেখককেই গা-ঢাকা দিতে হয়েছিল, অবশ্য পাশাপাশি তাঁরা তাঁদের লেখার অনুপ্রেরণাও পেয়েছিলেন। এ-সময়ে ইলিও ভিত্তোরিনির মতো লেখকদের দ্বারা রিয়ালিজমের পুনর্জাগরণের আগে ফ্যাসিস্ট সময়ের বিষবাষ্প বুকে ইগনাজিও সিলোনে, কার্লো লেভি, ইতালো এসভেভো ও লুইগি পিরানদেলো মনোসমীক্ষণ সাহিত্যরীতির সূচনা করেছিলেন। আলবার্তো মোরাভিয়া তাঁর লেখায় উচ্চমধ্যবিত্তের দুর্নীতিপরায়ণতার কথা তুলে ধরায় বেশ খ্যাতি অর্জন করেন এবং ‘ইরোটিক ন্যারেটিভে’র জন্য ব্যাপকভাবে আলোচিতও হন।

ষাটের দশকে সামগ্রিক সাহিত্যই রাষ্ট্রীয় দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে ওঠে এবং এ-সময়ে কবিতাচর্চা হয়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে। তখন কবি, সমালোচক ও   ফিল্ম-নির্মাতা পিয়ের পাউলো পাসোলিনি প্রধানতম সৃষ্টিশীল ব্যক্তিত্ব হিসেবে ক্রিয়াশীল ছিলেন। সময়টা ছিল কবিতার। কথাশিল্পের মুখ ছিল মেঘে ঢাকা। মন্তেল ও সালভাতোর কুয়াসিমোদো কবিতায় নোবেল প্রাইজ পান। বিশ শতকের শেষপাদের সাহিত্যে ইতালো কালভিনো, উমবার্তো ইকো এবং প্রিমো লেভি দেশের বাইরে খ্যাতি অর্জন করেন। আশির দশকটা ইতালীয় সাহিত্যের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য এ-কারণে যে, প্রায় দুই দশককাল অন্ধকারে থাকার পর এ-সময়ে ন্যারেটিভ এবং ঐতিহাসিক উপন্যাসের পুনর্জাগরণ ঘটে।

বিশের দশকে ইতালীয় কবিতার আধুনিকায়নে ইউজেনিও   মন্তেল প্রধান স্থপতির ভূমিকা পালন করেন। ইতালীয় লেখক ক্যালভিনো মন্তেলের লা বাফেরা ইঅলট্রোকে (১৯৫৬) দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর সময়ের শ্রেষ্ঠ কাজ বলে মন্তব্য করেছিলেন। মন্তেল ছিলেন মূলত সংগীতের ছাত্র, তাঁর লেখায় তিনি আধুনিক ইতিহাস, দর্শন, ভালোবাসা এবং মানবিক অস্তিত্বের সংকটকে তুলে ধরেছেন।

১৮৯৬ সালের ১২ অক্টোবর ইতালির জেনোয়ায় জন্মগ্রহণকারী এই কবির পিতা ছিলেন একজন আমদানি ব্যবসায়ী। পিতামাতার পাঁচ সন্তানের কনিষ্ঠ তিনি। খারাপ স্বাস্থ্যের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়া চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি। মন্তেল তাঁর জীবনের বেশিরভাগ গ্রীষ্মকাল কাটিয়েছেন তাঁর পারিবারিক আবাস ‘লিগুরিয়ান বিভিয়েরা’য় এবং পরবর্তীকালে তাঁর কবিতায় এই অঞ্চলের রুক্ষ      ভূ-দৃশ্যের চিত্র পাওয়া যায়। মন্তেল মূলত হতে চেয়েছিলেন ‘অপেরা সিঙ্গার’। তবে সাহিত্যের প্রতি তাঁর ছিল আলাদা রকমের ঝোঁক। বিশেষ করে ইতালির ধ্রুপদ সাহিত্য, ফরাসি ফিকশন এবং আর্থার শোফেনহাওয়ার, বেনদিত্ত ক্রোচে এবং হেনরি বার্গসঁর দর্শনের প্রতি তাঁর ছিল বিশেষ অনুরাগ। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় তিনি অস্ট্রিয়ান ফ্রন্টে ইনফ্যান্ট্রি অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। যুদ্ধশেষে ফিরে এসে আবার তিনি সংগীতচর্চায় মনোনিবেশ করেন। ১৯২৩ সালে তাঁর সংগীতশিক্ষকের মৃত্যু হলে তাঁর সংগীতবিষয়ক চিন্তাভাবনার সমাপ্তি ঘটে এবং তিনি সাহিত্যের দিকে ঝুঁকে পড়েন।

১৯২৭ সালে মন্তেল ফ্লোরেন্সে যান এবং সেখানে একটি প্রকাশনা সংস্থায় অল্প কিছুদিনের জন্য কাজ করেন। ১৯২৮ সালে তাঁকে, গ্যাবিনেত্ত ভিসেক্স রিসার্চ লাইব্রেরির পরিচালক পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। তাঁর প্রথম কবিতার বই ক্যাটলফিশ বোনস (১৯২৫) মুসোলিনির ক্ষমতারোহণের দুই বছর পর প্রকাশিত হয়। এই গ্রন্থের বেশকিছু কবিতায় লিগুরিয়ার দৃশ্যাবলির সন্নিবেশ ঘটেছে। যুদ্ধোত্তর সময়ের তীক্ষ্ণ নৈরাশ্যের ছবি দেখা যায় এই গ্রন্থে। লিগুরিয়ান উপকূলের জনশূন্য ও পাহাড়ি বাস্তবতার প্রতীকে তিনি তাঁর অনুভূতির প্রকাশ ঘটিয়েছেন। মন্তেলের প্রথম দিকের কবিতায় এলিয়টের দ্য ওয়েস্ট ল্যান্ডের প্রভাব লক্ষণীয়। শুষ্ক, বন্ধ্যা, শক্রময় জনপ্রান্তরের ট্র্যাজিক ছবি এঁকেছেন তিনি তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থে।  মন্তেলের পরবর্তী কাব্যসংকলনগুলোর মধ্যে দ্য হাউস অব দ্য কাস্টমস অফিসার অ্যান্ড আদার পোয়েমস (১৯৩২), দ্য অকেশনস (১৯৩৯) এবং ল্যান্ডস এন্ড (১৯৪৩) উল্লেখযোগ্য। সমালোচকরা এ-কাব্যগ্রন্থগুলোকে তুলনামূলকভাবে জটিল ও অন্তর্দর্শনমূলক বলে মত প্রকাশ করেছেন। দ্য অকেশনস কাব্যসংকলনটি ক্যাটলফিশ বোনসের চেয়ে বেশি নাটকীয়, সুসংহত এবং মেট্রোপলিটন। এতে রয়েছে মন্তেলের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কবিতা ‘মোটেটস’ ক্লিজিয়াকে নিয়ে লেখা, যা ইতালির মূল কাব্যিক ঐতিহ্য কোর্টলি লাভের ধারাবাহিকতায় রচিত। ১৯৫৬ সালে প্রকাশিত হয় মন্তেলের ব্যক্তিগত উষ্ণতায় জারিত কাব্যগ্রন্থ দ্য স্টর্ম অ্যান্ড আদার পোয়েমস। এই গ্রন্থের কবিতাগুলোয় পাওয়া যায় কবি হিসেবে তাঁর বিশেষ দক্ষতার পরিচয়, যা আগেকার কাব্যগ্রন্থগুলোতে অনুপস্থিত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এবং যুদ্ধোত্তর সময়ের উদ্বিগ্নতা, নানান ভাঙাগড়া এবং মানুষের পৈশাচিক লোলুপ স্বভাবের চিত্রাবলি ‘and a shadowy Satan will disembark on the bank of the Thames, the Hudson, the Seine, shaking his bitumen wings half-worn by the effort to tell you : the time has come.’

এছাড়া স্যাতুরা (১৯৬২), হারমনি অ্যান্ড প্যাস্টেলস (১৯৬২), এল’ইনোসেনজা দেল কলপেভল (১৯৬৬) এবং জেনিয়া (১৯৬৬) তাঁর শেষের দিকের উল্লেখযোগ্য কবিতা সংকলন। তাঁর শেষের দিকের সংকলনগুলোয় প্রেমের কবিতাই বেশি দেখা যায়। তাঁর স্ত্রীর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনার্থে তিনি অনেক প্রেমের কবিতা রচনা করেন। উল্লেখ্য,  মন্তেল দ্রুসিলা তাঞ্জি নামে এক বিধবা মহিলাকে ভালোবেসে বিয়ে করেছিলেন। ১৯৩০ সালের শেষের দিকে এই মহিলা ও তাঁর স্বামীর ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়; কিন্তু ১৯৫৮ সালে স্বামীর মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত তিনি মন্তেলের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হননি। এই দম্পতির কোনো সন্তান ছিল না। জেনিয়ার কবিতাগুলোতে দেখা যায় বিয়ে ও প্রেমবিষয়ক আলোচনা। তাঁর স্ত্রীর ডাকনাম ছিল মোসকা বা মাছি। ১৯৬৩ সালে স্ত্রীর মৃত্যু হলে তিনি জেনিয়া কাব্যগ্রন্থের টাইটেল কবিতায় লিখেছিলেন : ‘They say my poetry/ is a poetry of unbelonging/ But if it was yours it was someone’s/ your/ who are no longer form but essence.’ দ্য অকেশনসের প্রেমের কবিতাগুলো মূলত ‘ক্লিজিয়া’কে নিয়ে লেখা। এই ক্লিজিয়া হলেন ইরমা ব্র্যান্ডিস, যিনি দান্তেবিষয়ক একজন ইহুদি আমেরিকান পন্ডিত, যাঁর সঙ্গে মন্তেলের দেখা হয় ১৯৩০ সালে এবং যাঁকে তাঁর কবিতায় কখনো বিয়াত্রিচ, কখনো লরা হিসেবে পাওয়া যায়।

তাঁর কবিতার জটিলতা, নৈরাশ্য এবং দুর্বোধ্যতার জন্য তাঁকে ‘গিসেপি উনগারেত্তি’ এবং ‘সালভাতোর কুয়াসিমোদো’র (যাঁরা কবিতায় হারমেটিজমের প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন) সঙ্গে তুলনা করা হয়। ত্রিশ ও চল্লিশের দশকে তাঁকে হারমেটিক ঘরানার কবি বলা হতো। ইতালির হারমেটিক ঘরানার কবিরা মূলত ফরাসি সিম্বলিস্ট কবি বোদলেয়ার, মালার্মে, র্যাঁবো এবং ভের্লেন দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন। সাদামাটাভাবে হারমেটিজম হলো দুর্বোধ্য ও জটিল কবিতা, যেখানে প্রতীক ও চিত্রকল্প পুরোপুরি মন্ময় (subjective) এবং শব্দসমূহের থাকে আবেগীয় দ্যোতনাবাহী শক্তি। তাঁর কবিতার দুর্বোধ্যতার মূলে দুটি বিষয় কাজ করেছে। একটি হলো হারমেটিক ঘরানার কবি হওয়া এবং অন্যটি গতানুগতিক ছন্দকে পরিত্যাগ করা, যার প্রতি দেশ-বিদেশের বৃহত্তর পাঠকের কান প্রস্ত্তত ছিল। মন্তেল অবশ্য তাঁর শেষের দিকের কবিতায় তাঁর ভাবনাগুলো সরাসরি এবং খুব সাধারণ ভাষায় প্রকাশ করেছিলেন। তাঁর আগের কবিতার দুর্বোধ্যতার মধ্যে খুঁজে পাওয়া যায় একধরনের সংগীত, যা তাঁর কবিতার একটি মৌল বৈশিষ্ট্য। মন্তেল একদা বলেছিলেন, ‘The poet does not know, often he will never know whom he really writes for’। এ-কথা জগতের সব কবির ক্ষেত্রেই সত্য। কবিতাকে মূলত তিনি কবিতাই করতে চেয়েছেন,  এ-ব্যাপারে কোনো আপস করেননি। তিনি দান্তে এবং পেত্রাকের যমজ-ঐতিহ্যে হারিয়ে যাননি বরং সেই ট্র্যাডিশনকে আত্মস্থ করে তাকে বহন করেছেন নতুন সৃষ্টির মধ্যে।

মন্তেল বরাবরই ছিলেন ফ্যাসিবাদবিরোধী। কিন্তু এজরা পাউন্ডের ফ্যাসিবাদের প্রতি সহানুভূতি থাকা সত্ত্বেও তিনি তাঁর মনীষা ও কবিতার প্রতি চরম অনুরক্ততা দেখে তাঁর প্রতি ছিলেন বেশ দুর্বল। ফ্যাসিস্ট পার্টিতে যোগদানে অস্বীকৃতি জানানোর কারণে ১৯৩৮ সালে তাঁকে তাঁর কালচারাল পদ থেকে বরখাস্ত করা হয়। এমনকি মুসোলিনির ফ্যাসিস্ট সরকারের শিক্ষা অ্যাকাডেমি, দেশের অন্যতম প্রধান কবি হওয়া সত্ত্বেও, তাঁর কবিতা স্কুল-কলেজের সিলেবাসে  অন্তর্ভুক্ত করেনি। এ-সময়ে মন্তেল অনেকখানি একাকী হয়ে পড়েন এবং নিজেকে পাবলিক জীবন থেকে সরিয়ে নিয়ে অনুবাদের কাজে ব্যস্ত থাকেন। শেক্সপিয়র, টিএস এলিয়ট, হারম্যান মেলভিল, ইউজিন ও নীলসহ ইউরোপ-আমেরিকান লেখকদের তিনি ইতালীয় ভাষায় তরজমা শুরু করেন। এলিয়টের ‘দ্য ওয়েস্ট ল্যান্ড’ কবিতা পড়ে তিনি এতটাই মুগ্ধ ছিলেন যে, এই কবিতা তিনি যত্নের সঙ্গে ইতালীয় ভাষায় অনুবাদ করেন। তাঁর প্রথম দিকের কবিতাগুলোতে এ-গ্রন্থের বেশ প্রভাব রয়েছে। এলিয়টও মন্তেলকে চিনতেন। তিনি তাঁর দ্য ক্রাইটেরিয়ানে মন্তেলের আরসেনিও ছেপেছিলেন।

যুদ্ধ শেষ হলে মন্তেল মিলানে ফিরে আসেন। এখানে ইতালির সর্বাধিক প্রচারিত ও প্রসিদ্ধ দৈনিক Corriere della sera পত্রিকার সাহিত্য-পাতায় লেখালেখি শুরু করেন। কথিত আছে, তিনি নাকি গান্ধীজি যেদিন ভারতে আততায়ীর গুলিতে নিহত হন, সেদিন এই পত্রিকায় কাজের অফার পান। সেদিন নাকি পত্রিকা-সম্পাদকের একটি গল্পের দরকার পড়েছিল। মন্তেল এক জায়গায় বসে আমাদের বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের মতো লেখাটি শেষ করেছিলেন এবং সেদিন থেকেই পত্রিকাটিতে তাঁর আসন পাকাপোক্ত হয়ে যায়। এ-সময়ে তিনি ইতালি এবং ইতালির বাইরের অনেক লেখককে নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা করেছেন। তাঁদের মধ্যে ডব্লিউ এইচ অডেন এবং ইমিলি ডিকিন্সন উল্লেখযোগ্য। এ-সময়ে তিনি ইতালির গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থগুলোর আলোচনা করেন। তাঁর এসব আলোচনা-সমালোচনা সে-সময়ে অন্য সমালোচকদের দারুণভাবে প্রভাবিত করেছিল এবং সাহিত্য আলোচনার একটি নতুন ধারা প্রবর্তনে মন্তেলের ভূমিকা ছিল অসামান্য।

১৯৬২ সালে প্রকাশিত কাব্যসংকলন Satura-তে দেখা যায় ডায়ালগ নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা। সংবাদজগতের নানা ধারণা, সংক্ষিপ্ত বাণী, পর্যালোচনা এবং কিছু ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র গানের সমাহার দেখা যায় এ-কাব্যসংকলনে। ল্যাটিন ‘satura’-এর অর্থ হলো মিশ্রিত খাবার (mixed dish)। কবিতায় মতবাদের ছড়াছড়ি অবস্থাকে তিনি বিদ্রূপ করেছেন এভাবে : Twilight began when man thought himself of greater dignity than moles or crickets. মন্তেল সারাজীবনই কবিতা নিয়ে নানারকম নিরীক্ষায় অন্বিষ্ট ছিলেন; কিন্তু কবিতা নিয়ে দলবাজি কিংবা কোনো বিশেষ মতবাদে নিজেকে জড়িয়ে প্রপাগান্ডায় মেতে ওঠেননি। কবিতার অনন্তযাত্রায় তিনি ছিলেন নিঃসঙ্গ পথিক। পৃথিবীর নানা দেশের নানা কবির কবিতার মধ্যে অবগাহন করে তিনি তুলে এনেছিলেন বহুমূল্য রত্নভান্ডার। তাঁর পথ ছিল আলাদা, তাঁকে আলাদা করে চেনা যায়।

আলোচকরা বলেছেন, মন্তেলের কবিতা দুই বাহু উন্মুক্ত করে পাঠককে আলিঙ্গন করে না। তাঁর কবিতা নর্থ-ইতালিয়ান অঞ্চলের প্রতি সব সময়ই বিশ্বস্ত থেকেছে, এটা রিভিয়েরার রৌদ্রস্নানকারীদের সেই প্যারাডাইস নয়, যা বুক খুলে বসে থাকে। এটা হলো সেই নিষ্ঠুর সৈকত, যা উদ্ভূত লিগুরিয়ান সমুদ্র-উপকূলের ঝড়োময় আঘাত থেকে।

মন্তেল  সব সময়ই চেষ্টা করেছেন কবিতায় তাঁর অভিব্যক্তিকে নতুন আঙ্গিকে ফুটিয়ে তোলার এবং নতুন মিথ তৈরির মধ্য দিয়ে তিনি কবিতার অঙ্গসৌষ্ঠবে দূরান্বয়ী সম্ভাবনার সূত্রকে আবিষ্কার করেছেন কেবল কবিতার আঙ্গিক ও বিষয়ের সুচারু অভিনিবেশ সাধনের প্রত্যয়ে। উল্লেখ্য, যে-কোনো সৃষ্টিকর্মে নতুন মিথের সন্ধানই শিল্পীর অভীষ্ট লক্ষ্য – সেই মিথ তথাকথিত মিথ নয়, আমাদের প্রাত্যহিকতার মধ্যে, চারপাশের নানা বিষয়ের মধ্যেই সেই মিথের অণু-পরমাণুর সন্ধান পাওয়া যেতে পারে। তিনি প্রাথমিক যুগের ‘ডি’আনানজিয়ান’ ছন্দকে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন; কিন্তু দান্তে ও পেত্রাকের ট্র্যাডিশন নিয়ে লড়াই করেছেন। পিকাসো বলেছিলেন, I do not seek, I find. এ-কথার প্রতিধ্বনি পাওয়া যায় মন্তেলে : I do not go in search of poetry. I wait for poetry to visit me. আসলে কবিতা কখনো জোর করে লেখা যায় না, কবিতার জন্য কবিকে অপেক্ষা করতে হয় এক বিশেষ মুহূর্তের এবং সেই মাহেন্দ্রক্ষণ আসার আগে যাঁরা জোর করে কবিতা লিখতে বসেন, তাঁরা মূলত প্রকৃত কবিতার সাক্ষাৎ পান না। কবিতা তাই কবির বিশেষ মুহূর্তের আবেগের শিল্পিত ফসল; এই ফসল ঘরে আনার জন্য কবিকে কাটাতে হয় অজস্র বিনিদ্র-রজনী জীবন ও জগতের এক নির্জন প্রান্তে। রক্তাক্ত হৃদয়ের ওপারে ওঠে কবিতার সূর্য, সেই সূর্যরশ্মির ফলায় ফলায় জীবন ও জগতের নানাবিধ সংগীত অনুরণিত হয়, সে-সংগীতের থাকে কত না লুপ্ত  প্রান্তরের নিয়তি, ফুল ফোটা কিংবা ঝরে যাওয়ার গন্ধ, কখনো অসমাপ্ত ফসলের চিৎকার অথবা নিকষ অন্ধকারের দিকচক্রবাল, বেদনার ত্রিভুজ দ্যোতনা কিংবা একটি ঢালু পাড় বেয়ে অনিরুদ্ধ নেমে যাওয়া, মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই – হয়তো এসবেরও ঊর্ধ্বে আরো শূন্যতা যা ঢেউ খেলে খেলে সাজিয়ে রাখে স্মৃতির পসরা অবারিত নিঝুম সৈকতে, মস্তিষ্কের নিউরনে জেগে-ওঠা এক চিলতে ঝড়!

মন্তেল প্রাচীন শব্দ এবং দেশি বৈজ্ঞানিক অনুষঙ্গ ও প্রবাদবাক্যের সংমিশ্রণে এক অভিনব লেখন-শৈলী রপ্ত করেছিলেন। ইতালির প্রখ্যাত লেখক ইতালো ক্যালভিনো মন্তেল সম্বন্ধে বলেছেন : ‘Montale was the poet of exactness, of justified lexical choices.’ কার্লো বো তাঁর কবিতা সম্বন্ধে মন্তব্য করেছেন এভাবে : contradiction between a lucid and ruthless cruelty and a very pure feeling of love.

আধুনিক জীবনের সবগুলো জানালায়ই তিনি উঁকি দিয়েছেন, দেখেছেন জীবনের কিনার ঘেঁষে বয়ে যাওয়া সবগুলো মিহি স্রোত। ফ্যাসিস্ট ইতালির প্রেক্ষাপটে তাঁর নন্দনতত্ত্বের সীমানায় তাঁর কবিতাকে অবশ্যই ‘পোয়েট্রি অব রেজিস্ট্যান্স’ বলতে হবে। অভিজ্ঞতার আলোকে গতিতে এগিয়ে গেছে তাঁর কবিতা। তিনি জীবনকে যেমন ভেতর থেকে দেখেছেন, তেমনি ইতিহাসের প্রেক্ষাপটকেও এনেছেন জীবনের নতুন ব্যাখ্যায়। তাঁর কবিতার উল্লেখ করে এক সময় তিনি একজন ক্রিটিকের উদ্দেশে বলেছিলেন – I always begin with the real. তাঁর কবিতা নিঃসন্দেহে কসমোপলিটান, বহুস্তরবিশিষ্ট এবং আলঙ্কারিকভাবে পাতিত। তাঁর ভাষার প্রগাঢ় শক্তিমত্তায় যেমন হতবুদ্ধি হতে হয়, তেমনি জটিল ইমেজের প্রক্ষেপে ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় স্বপ্নের জগৎ। কবিতার অন্যতম কাজ হলো সামাজিক ক্ষেত্রে একটি চিন্তা ও অনুভূতির বিকল্প পথ তৈরি করা, এক্ষেত্রে তাঁর কবিতা অনুপেক্ষণীয়। এটা ঠিক যে, প্রাথমিকভাবে তাঁর কবিতা কারো জগৎ-দৃষ্টির সামনাসামনি আসছে না; কিন্তু দেখা যাচ্ছে, কোথাও-না-কোথাও এসে তা মিশে যাচ্ছে। কবিতার এই ক্ষমতাই কবিতাকে কসমোপলিটান করে তোলে, কবিতাকে আন্তর্জাতিকতায় উন্নীত করে। তাঁর কবিতার নান্দনিক ভুবনে কোনো সহজ-সরল, কোমল আলোকিত স্বপ্নসৌধের সন্ধান মেলে না। কেবলই অমসৃণ উপলখন্ডে হোঁচট খেতে খেতে দূরের গোলাপবনের দৃশ্য দেখা যায়। যে-কারণে বলা যায়, এক কুহকী  বাস্তবতায় আচ্ছন্ন তাঁর কবিতা প্রাথমিকভাবে পাঠককে অনেকখানি হতাশ করলেও শেষাবধি নিরাশ করে না। আর সেজন্য মন্তেলের কবিতার পাঠককে মানসিক প্রস্ত্ততি নিয়ে এগোতে হয়।

মন্তেলের কবিতার প্রভাব ও প্রতিঘাত তাঁর দেশের পরবর্তী প্রজন্মের কবিদের ওপর বেশ সুদূরপ্রসারী হয়েছিল। ইতালির বাইরে অন্য ভাষাভাষীদের ওপর বিশেষ করে ইংরেজি ভাষাভাষীদের কাছে তিনি দীর্ঘকালই অপরিচিত ছিলেন অনেকটা। কেবল গুটিকয়েক ইতালি ভাষা জানা কবি-শিল্পী কিংবা গবেষকের কাছেই তিনি পরিচিত ছিলেন। উল্লেখ্য, জোনাথন গলাসির ইংরেজি অনুবাদের আগে তাঁর কবিতা পড়ার তেমন সুযোগই ছিল না। এ-কথা স্বীকার করতেই হয় যে, তাঁর কবিতা ইংরেজিতে অনুবাদের কাজটি নিতান্তই সহজ ছিল না। যে-কারণে অনেকেই শেষমেশ এ-কাজে এগিয়ে আসেননি। জোনাথন গলাসি নিজে একজন কবি এবং ইতালি ভাষার পন্ডিত হওয়ায় তাঁর পক্ষে কাজটি কিছুটা সহজ হয়েছে, যদিও তাঁর কষ্টসাধ্য এ-অনুবাদ নিয়েও নানা ধরনের কথা উঠেছে, অনেকেই বলেছেন, তাঁর অনুবাদ আরেকটি নতুন কবিতার সংকলন হয়ে উঠেছে কিংবা মূলের সঙ্গে মেলেনি ইত্যাদি। আর এ-ধরনের অভিযোগ পৃথিবীর সব অনুবাদকর্মের ব্যাপারেই হয়েছে কালে কালে। এক্ষেত্রে রবার্ট ফ্রস্টের একটি কথা আমাদের স্মরণে আসে : poetry is what gets lost in translation. কবিতা-সমালোচকরা তাঁকেই মন্তেলের কবিতার উপযুক্ত অনুবাদক হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন।

এই অনুবাদের কাজ করতে গিয়ে মন্তেলের কবিতায় তিনি দেখেছেন – ‘nervous, astringent music’ মন্তেল মূলত পাঠককে একধরনের তাৎপর্যহীন লিরিকের (lyrics of negation) মুখোমুখি করেছেন। গলাসি মূলত মন্তেলের ১৯২০-৫৪ পর্যন্ত কালেক্টেড পোয়েমসের ইংরেজি অনুবাদ করেন। এই অনুবাদ করতে গিয়ে গলাসি যে-পরিশ্রম করেছেন, তা পৃথিবীর খুব কম অনুবাদকই করেছেন। ঘটনাপঞ্জির কালানুক্রমিক গ্রন্থনা, মন্তেলের ওপর একটি সুন্দর প্রবন্ধসহ কবিতার নানা উল্লে­খ-উদ্ধৃতি নিয়ে ১৭০ পৃষ্ঠার মূল্যবান ও পান্ডিত্যপূর্ণ টীকা-টিপ্পনি দিয়ে গলাসি যথাসাধ্য চেষ্টা করেছেন অনুবাদিত কবিতাগুলোর সহজ পাঠের। এটি নিঃসন্দেহে একটি দুরূহ কাজ। গলাসি মন্তেলের কবিতা সম্পর্কে এভাবে মন্তব্য করেছেন : version of the canzoner or songbook, the collection of poems indeted to a beloved woman that has been the determining form of Italian lyric poetry since Petrarch.

দ্রুত বা সহজ পাঠের ব্যাপারটি অন্তত মন্তেলের কবিতার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। তাঁর কবিতার গোলকধাঁধায় প্রবেশ করতে হলে মধ্য থেকে আধুনিক যুগ পর্যন্ত ইতালি কবিতার কলকব্জাগুলো চেনা দরকার। ১৯২০-৫০ পর্যন্ত রচিত তাঁর মেজর তিনটি কবিতা সংকলনের চেয়ে সেকেন্ড ম্যানার কাব্যগ্রন্থটি ছিল শুষ্ক, নৈরাশ্যবাদী এবং ঊষর। এটি হয়তো তাঁর জীবনবোধের এক স্বতশ্চল অভিজ্ঞান। মানবজীবনের অধ্যায়গুলো সময়ের নানামাত্রিক অভিজ্ঞতায় অভিযোজিত হয় এবং সে-অভিযোজনের রংরক্ত মিশে যায় সৃষ্টিতে অনিবার্যভাবে। তাই প্রকৃত শিল্পমাত্রই প্রকৃত ইতিহাস – সে-ইতিহাস খুঁড়ে খুঁড়ে আবিষ্কার করা যায় কোনো জাতির অতীত ঐতিহ্যের আকরসমূহ।

মন্তেলের কবিতায় দেখা যায় অনেক সাধারণ বস্ত্ত ও ঘটনার সমাগম, যা আমরা দেখেও দেখি না অথবা যা কবিতায় বেমানান। মন্তেল তাঁর কবিতায় সেসব ঘটনা, বস্ত্তর সন্নিবেশ ঘটিয়েছেন যা তাঁর কবিতার জন্য আবশ্যক ছিল। তাঁর সৃষ্টিশীলতার জগতে অনেক  প্রান্তিক ও অকাব্যিক শব্দ এসেছে, যা ইতালীয় কবিতায় তাঁর আগে আর কেউ করেনি। roads that leads to grassy/ ditches where boys/ scoop up a few starved/ eels out of half dry puddles. অথবা লাল পিঁপড়ে পার হচ্ছে চৌচির জমিন এবং গরমে হাঁসফাঁস ফলের বাগান। উল্লেখ্য, এক্ষেত্রে আমরা মন্তেলের সঙ্গে কবি জীবনানন্দ দাশের তুলনা পাই। রবীন্দ্রনাথের পরে যিনি বাংলা কবিতায় প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন তিনি জীবনানন্দ দাশ। বাংলা আধুনিক কবিতার স্থপতি এই কবি শুধু আলাদা কাব্যভাষাই নির্মাণ করেননি, এমনসব অপ্রচলিত ও অকাব্যিক শব্দের আমদানি করেছিলেন বাংলা কবিতায়, যা সে-সময়ে ছিল কল্পনাতীত। বাংলা কবিতায় ‘কেউ যাহা শোনে নাই সে নতুন বাণী’ তিনি বয়ে এনেছিলেন, যা গতানুগতিক কাব্যামোদীরা সহজে গ্রহণ করেনি। এমনকি নামজাদা অনেক কবিও তাঁকে তাচ্ছিল্য করতে পিছপা হননি। এছাড়া তিনি ছিলেন স্বভাবে লাজুক ও প্রচারবিমুখ, যে-কারণে কবি হিসেবে, একজন প্রকৃত কবির মর্যাদা পেতে তাঁর অনেক দেরি হয়েছিল। মন্তেলও ধীরে ধীরে কবি হিসেবে, একজন বড়মাপের কবি হিসেবে আবিষ্কৃত হয়েছিলেন।

১৯৬১ সালে মন্তেল রোম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনারারি ডিগ্রি লাভ করেন এবং পরে মিলান, ক্যামব্রিজ এবং ব্রাসেল ইউনিভার্সিটি থেকেও ডিগ্রি পান। ১৯৬৭ সালে প্রেসিডেন্ট সারাগত তাঁকে তাঁর সাহিত্য-শিল্পক্ষেত্রে অবদানের জন্য আজীবন সিনেটর হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন। এ-সময়ে তিনি প্রতিদিন পত্রিকা অফিসে যাওয়ার ধকল থেকে মুক্তি পান।

কবিতায় বিশেষ অবদানের জন্য ১৯৭৫ সালে মন্তেলকে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়। এ-সময়ে সুইডিশ অ্যাকাডেমির স্থায়ী সচিবের প্রেস রিলিজটি ছিল নিম্নরূপ : ‘ক্যাটলফিশ বোনস’ (১৯২৫) প্রকাশের পর ২৯ বছর বয়স্ক ইউজেনিও মন্তেল ইতালীয় কবিতার ক্ষেত্রে তাঁর স্থান পাকাপোক্ত করার প্রস্ত্ততি নিচ্ছিলেন। তাঁর লেখা দেশের বাইরে পরিচিতি পেতে শুরু করলে সবাই তাঁকে বিতর্কের ঊর্ধ্বে সমসাময়িক পশ্চিমের একজন শক্তিশালী কবিব্যক্তিত্ব হিসেবে স্বীকৃতি দিতে শুরু করেন। মন্তেল ছিলেন প্রচারবিমুখ কবি, যে-কারণে একজন বড়মাপের কবি হিসেবে পরিচিতি পেতে তাঁর বেশ সময় লেগেছিল। পৃথিবীর সাহিত্যামোদী মানুষ তাঁর খোঁজ পেয়েছে অনেক পরে। তবে বিশ্বকবিতার মহাযজ্ঞে তাঁর দেরিতে উপস্থিতির প্রধান কারণ যেটি ছিল সেটি হলো, তিনি সময় নিয়েছিলেন নিজেকে প্রস্ত্তত করার, নিজেকে বোঝার। প্রত্যেকটি কবিতা-সংকলন প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে তিনি তাঁর শক্তি ও অবস্থানকে ক্রমাগত প্রসারিত করেছেন।’

নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পর বিশ্বকবি হিসেবে তাঁর খ্যাতি সর্বত্র ছড়িয়ে পড়লে তাঁকে কাটাতে হয়েছিল ব্যস্ততম সময়। তাঁর শেষ দিনগুলো কেটেছিল নানা উৎসবে অতিথি হয়ে কিংবা কোনো পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানের মধ্যমণি হয়ে অথবা কোনো সাহিত্য-আসরে পৌরহিত্য করে। ফ্লোরেন্সে তাঁকে অনারারি সিটিজেনশিপও দেওয়া হয়েছিল। ১৯৮১ সালের ১২ সেপ্টেম্বর এই কালজয়ী কবি ইহলোক ত্যাগ করেন। মিলানের রাষ্ট্রীয় অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় মন্তেলকে মনে হয়েছিল টেনিসনের ইতালীয় ভার্সন।

মন্তেলের কাছে এই ধরিত্রী ছিল একটি বিশাল ও ট্র্যাজিক নেটওয়ার্ক, যেখানে সকল প্রাণীর রয়েছে অবাধ যাওয়া-আসা। কেউ আসছে এখানে আবার কেউ ফিরে যাচ্ছে, কেউ দৃশ্যমান হচ্ছে, কেউ অদৃশ্য হচ্ছে। মন্তেলের দেশান্তরী মন বারবার ভেবেছে, একটি ক্ষুদ্র বানমাছ যদি স্রোতের টানে সীমান্ত অতিক্রম করে অন্যত্র চলে যায়, তাহলে মানুষ কেন পারবে না। যুদ্ধ-পরবর্তীকালে মন্তেল অনেক ভ্রমণ করেছেন এবং বানমাছের প্রতীকের আড়ালে তাঁর বিশ্বভ্রামণিক মন বিশ্বমানবের জন্য একটি সীমান্তহীন পৃথিবীর কথাই হয়তো ভেবে থাকবে, এখানে তাঁর মিউজ-ফিগার ক্লিজিয়ার কথাও তাঁর মনে হয়ে থাকতে পারে, ১৯৩৮ সালে ইহুদি হওয়ার কারণে যাঁকে ইতালি ছাড়তে হয়েছিল। মন্তেলের অনেক কবিতায়ই এই মহীয়সী রমণী ঘুরেফিরে এসেছেন। যুদ্ধের শিকার অনেক উদ্বাস্তু এবং নির্বাসিতের বিশেষ করে ইহুদি উদ্বাস্তুদের দুঃখ-দুর্দশার কথা জানা যায় তাঁর কবিতায়। ফ্যাসিজমের অধীন তাঁর এই ব্যক্তিগত কাব্যিকতাকে অনেকেই সুপ্তভাবে রাজনৈতিক বলে মতামত দিয়েছিলেন। ফ্যাসিজমের নাগপাশে মন্তেলের কবিতার যে-সত্য, সে-সত্যই তাঁর কবিতার আধুনিকতা। সে-হিসেবে মন্তেল একজন পুরোপুরি আধুনিক কবি এবং ইতালীয় আধুনিক কবিতার প্রধান স্থপতি।