উড়াল-জীবন

লেখক: পারভীন সুলতানা

গুলি লাগার পরও মাটিতে লুটিয়েপড়া বকটা জলাভূমির কাদালো জমিন ঘষটে, হাঁচড়ে-পাঁচড়ে পালানোর ব্যর্থ চেষ্টা করে। এতে ক্ষিপ্ত শিকারি দৌড়ে পাখিটাকে ধরে ফেলে। তারপর ধারাল ছুরি দিয়ে ঘ্যাঁচ ঘ্যাঁচ শব্দে ওর ডানাদুটো কেটে দেয়। মুহূর্তে তাজা রক্তে সাদা বকটা লাল হয়ে ওঠে। পাখাহীন পাখিটা করুণ চোখে ওপরের শূন্যতার দিকে তাকালে শেষবারের মতো ওর চোখে আকাশের প্রতিবিম্ব পড়ে। কিছুক্ষণের মধ্যে নিস্তেজ হয়ে বেচারা জলাভূমির কাদায় ঢলে পড়ে।

ঘুমগাঢ় চোখে দেখা কোনো দুঃস্বপ্ন নয় এটা। সব ঘটছে আমার চোখের সামনে। দৃশ্যটা আমাকে প্রচণ্ড ঝাঁকুনি দেয়। আমিও জলাভূমিতে এসেছি পাখির নেশায়। শীতের সময় এ-অঞ্চলে প্রচুর পাখির দেখা মেলে। অনেক অতিথিপাখিও আসে। অদ্ভুত সুন্দর এসব পাখির রঙিন ডানার উড়াল এক রোমাঞ্চকর আনন্দ দেয় আমাকে। এ-লোভেই আসা। নিষ্ঠুর শিকারির দিকে এগিয়ে যাই। কোনোরকম ভূমিকা ছাড়া রূঢ় গলায় বলি – পাখিটাকে ডানা কেটে হত্যার আগে আপনি হয়তো মানুষ ছিলেন কিন্তু এখন পুরোপুরি জানোয়ার বনে গেছেন! লোকটার কাছ থেকে কোনো প্রত্যুত্তর শোনার আগ্রহ বোধ করি না, বরং নিষ্ঠুর প্রাণীটার সামনে থেকে দ্রুত সরে আসি। সারাপথ আমার মাথায় পাখাহীন মৃত বকটার দুঃসহ ছটফটানি কাতরায়।

আটপাড়ার নদীঘেঁষা ডাকবাংলোয় এসব গিজগিজানো ভাবনায় রাতের ঘুম না আসা প্রহর আরো প্রলম্বিত হয়। চনমনে জোছনায় শীতের শীর্ণ কংস নদকে দেখায় রেশমি ফিতার মতো। নদের মিহি সৌন্দর্যও আজ আমার অস্থির মনকে বাঁধতে পারে না। গাঙের রুপালি তরলে আমি একটা ডানাকাটা পাখির মৃতদেহ ভাসতে দেখি।

পরদিন বেলা করে ঘুম ভাঙে। গত রাতে যন্ত্রণায় ডুবতে ডুবতেও ঘুমের আয়েসি আলস্যের কাছে চোখ আত্মসমর্পণ করে। স্বপ্নেও পাখিটাকে দেখি। পাখাহীন বকের তীব্র রক্তক্ষরণে কংসের জল লাল হয়ে বইছে। বুঝতে পারি ঘটনাটা আমাকে তীব্রভাবে তাড়িত করেছে।

দুদিনের উইকেন্ডের সঙ্গে পরপর দুটো সরকারি ছুটি। বন্ধটা প্রকৃতির সঙ্গে কাটাব বলে এই হাত-পা খোলা দিগন্তরেখা আঁকা গাঁও-গেরামে আসা। বিবাহিত বন্ধুরা বলে – দোস্ত, বিয়ে করলে বউ ছুটিতে গ্রামে তো যেতই না; থাইল্যান্ড, নেপাল কি ভুটান; নিদেনপক্ষে কক্সবাজার তো টেনে নিতই। বেশ আছিস মনসুর। স্বাধীন! ওদের কথাবার্তা এরকম। কিন্তু প্রায় সবাই বিয়েটা করে বাচ্চাকাচ্চা জন্মিয়ে বউ নিয়ে দিব্যি সুখে সংসার করছে। কেবল আমিই হাত-পা ঝাড়া। জানাশোনা ছাড়া বিয়ের কথা ভাবতেও পারি না! বিয়ে করেই সম্পূর্ণ অচেনা এক মেয়েকে চুমু খাওয়া … আর শুধু কি চুমু… ! বন্ধুরা ইয়ার্কি মারে – শালা, তোমার জীবনে আর কবে প্রেম আগমন করিবে? আমার উনত্রিশ বছরের বয়সের ভার ওদের কাছেই নয়, আব্বা-আম্মা, ভাইবোনের কাছেও প্রধান আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।

শীতের লম্বা রাত পার করে সকালে প্রচণ্ড খিদে লাগে। বারান্দায় গ্রিল টপকানো ছককাটা রোদে চোখ পড়ে। হলুদ রোদের সোনালি আলো মনের বিষণ্ণতা ঝেড়ে ফেলে যেন। গতকালের কষ্ট পাওয়া অনুভূতি রোদের মিষ্টি উষ্ণতায় ফিকে হয়ে আসে। বাংলোর কেয়ারটেকার কলিম মিঞা দরোজায় উঁকি দেয় – ছার, নাস্তা তৌয়ার, ঘরো দিয়া যাইতাম? গা থেকে লেপ সরিয়ে দ্রুত মেঝেয় নামি। বাথরুমে ঢুকতে ঢুকতে বলি – টেবিলেই দাও, এক্ষুনি আসছি আমি। ভীষণ ক্ষিদে লেগেছে!

নাস্তার টেবিলে বসে রীতিমতো অবাক হয়ে যাই – নানারকমের পিঠা, চালের রুটি, ভুনা গোশত। টি-পটের নল দিয়ে উড়াল-মারা ধোঁয়ায় চায়ের সুগন্ধ। ঢাকনা তুলি – কলিম মিঞার ট্যালট্যালে চা নয়। সুন্দর, বাদামি রং। আমার রকমসকম দেখে কলিম মিঞা রহস্য ভেদ না করে পারে না – ছার, আউজগার নাস্তা কিছুই আমার আতের না। টিওনো [টিএনও] ছারের বাসা থিকা পাডাইছে। দেহুন না, ছার ঘেরান কী সোন্দর! আমার ছায়ের লাহান ঠ্যালটিইল্যা না। কলিম সরল হাসে। ওর এই স্বীকারোক্তি, সহজ-সারল্য মুগ্ধ করে আমাকে। ভীষণ ক্ষিদে পেয়েছে। প্লেটে চালের রুটি, গোশত নিতে নিতে জানাই – কাল সকালে যদি তোমার হাতের ট্যালট্যালা চা না পাই তবে তোমাকে জরিমানা করা হবে। আমার কথা শুনে ওর মুখ উজ্জ্বল হাসিতে ঝকঝক করে ওঠে। বছরপাঁচেক আগের কথা। একটা ইন্টারন্যাশনাল সাহায্য সংস্থায় কাজ করার সুবাদে প্রায়ই আমি এদিকে আসতাম। তখন রাস্তাঘাট ভালো ছিল না। ডাকবাংলোও ছিল ভাঙাচোরা। এখন রীতিমতো পিচ করা কার্পেটিং রোড, ঝকঝকে বাংলো, মেঝেয় কার্পেট, যদিও এর দরকার নেই। অহেতুক পেতে রাখা এই আভিজাত্যের গায়ে কত যে অচেনা জুতোর ধুলো জমেছে! কেবল কলিম মিঞা বদলায়নি। ওর বোকাসোকা সারল্য ওকে বদলাতে সাহায্য করেনি। ও অকপটে সংসারের গল্প করে। মাঝেমধ্যে বউয়ের সঙ্গে ঝগড়া হয়। নির্দ্বিধায় তাও বলে। বউ রাগ করে বাপেরবাড়ি চলে গেলে কষ্ট হয় – অক্লেশে সে অনুভূতির কথা জানায়। কিন্তু কলিম মিঞা কখনো আমার কাছে অর্থ-সাহায্য চায় না, কখনো বকশিশ দিলে মুখ নিচু করে লজ্জিত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকে। হাত বাড়ায় না। যখন আমি রাগ করি, লাটবাহাদুর বলে ব্যঙ্গ করি, তখন টাকা নিয়ে দাঁড়িয়েই থাকে; চলে যায় না। কিছুক্ষণ পর বলে – ছার, আমি কিন্তুক টেহার লাইগ্গা সংসারের গপ করি না। আফনের লগে কথা কইলে পরানডাত শান্তি লাগে। আমি ওর কথা শুনে হাসলে ও প্রশ্রয় পেয়ে বলে – কত সাইবেরা এই ডাকবাংলাত আয়ে! ফুট-ফরমাইশ দেয়! উনিশ-বিশ অইলেই ধমকায়। মুক মইনজা থাহি। কিতা কইতাম! ফিয়ন-কামলার চারকি করি! কতা ত হুনন লাগবই! আমি লক্ষ করি, কথাগুলো বলার সময় কলিম মিঞার চেহারার বোকাসোকা ভাবটার রংচটে বুদ্ধিমত্তার ছাপ ফুটে ওঠে। ওর কপালে বিছিয়ে থাকা লম্বা ভাঁজগুলোর ভেতর থেকে একটা বোঝদার ভাব সারা অবয়বে ছড়িয়ে পড়ে। কলিম মিঞাকে তখন অচেনা লাগে।

গতকাল এখানে আসার পথে টিএনও সাহেবের সঙ্গে দেখা।  এনজিওতে চাকরি করার সুবাদে সরকারি আমলাদের সঙ্গে আমাদের কমিউনিকেশন গড়ে ওঠে। বছরপাঁচেক আগে তিনি এখানকার ম্যাজিস্ট্রেট থাকার সময় পরিচয়। টিএনও হয়ে মাসছয়েক হলো নতুন পোস্টিং নিয়ে আবার এসেছেন। আমার ইউএন অরগানাইজেশনে চাকরি পাওয়ার কথা শুনে অভিনন্দন জানান। অনেক সাধাসাধি করেছেন তাঁর কোয়ার্টারে ওঠার জন্য। নানা অজুহাত দেখিয়ে উদ্ধার পেয়েছি। টিএনও সাহেবের বাসা মানে আরেক খণ্ড নগরীর মধ্যে নিজেকে ঠেসে দেওয়া। ড্রয়িংরুমজুড়ে কার্পেট, সোফা, শোকেসে শোপিসের ঝকঝকানি, দামি কাপে চা…। এসব আয়েসের জন্য তো মাঠঘাট পেরিয়ে এখানে আসিনি। তাঁর বাসা থেকে নাস্তা আসায় অবাক হইনি। তবে বিব্রত হয়েছি।

আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থাগুলো সাধারণত রুরাল ও প্রায় যোগাযোগবিচ্ছিন্ন জনগোষ্ঠীর সঙ্গে কাজ করে। বছরপাঁচেক আগে নেত্রকোনা জেলার আটপাড়া এমনই একটা রিমোট এরিয়া ছিল। জায়গাটা ভীষণ ভালো লাগে আমার। চারদিকে দিগন্তবিস্মৃত হাওর, বর্ষায় যেন জনবিচ্ছিন্ন দ্বীপ একটা। সারাক্ষণ রুপালি জলের উৎসব। জলের তরল আয়নায়, আকাশ সারাদিন উপুড় হয়ে থাকে। ধবল জোছনায় কংস নদ হয়ে ওঠে দুধসরোবর। শীতেও সৌন্দর্য হারায় না। পাখিদের অবিরাম ওড়াউড়িতে মুখর হয়ে উঠে শুকিয়ে যাওয়া বিলঝিল। বিস্মৃত কাদালো ভূমিতে ঝাঁক ঝাঁক পাখি নামে। সারস বক, আর অতিথি পাখির নরম পাখনার আওয়াজে হাওয়ারা নতুন সুরে গান করে।

চৈত্র-ফাল্গুনে বড় সড়কের ধারে শিমুলের লাল রূপেলা আগুন চোখে জ্বালা ধরায় না, ফসলশূন্য মাঠে ধু-ধু প্রান্তরে বাউল বাতাসের খেয়ালি আচরণে মন উচাটন হয়ে ওঠে। না-চেনা কষ্টে মন খামোকা হু-হু করে। শুধু কি প্রকৃতি। এখানকার মানুষও নিপাট সরল। তাই সুযোগ পেলে এখানে ছুটে আসি আমি।

নাস্তা শেষ হলে বাকি খাবার কলিম মিঞাকে ওর বাড়ি নিয়ে যেতে বলি। তারপর তিন লাফে ঘর থেকে বেরোই। প্রায় আটটা বাজে। শীতের সকাল বলে সময় ঠিক ঠাহর করা যাচ্ছে না। কুয়াশার চাদরঘেরা কিশোরী সকালকে ভোর ভোর লাগে। আজ জমিয়ে শীত পড়েছে। প্রচণ্ড শীতকে অগ্রাহ্য করে বাইরে বেরিয়ে পড়ি।

মাঠের পর মাঠ। দূরের গ্রামগুলোকে কুয়াশার বন্দর মনে হয়। কুয়াশার তুলোট চাদরে রোদের চিকচিকে আভা গলে গলে ঢোকার চেষ্টা করছে। দূর থেকে মনে হচ্ছে সোনালি বুটি দেওয়া একটা ধূসর আসমানি কাতান দিগন্তজুড়ে ছড়িয়ে আছে।

পুরো এলাকা চেনা আমার। আমাকেও প্রায় সবাই চেনে। তাই পাড়ার মাঝখান দিয়ে হাঁটি। জমাটি শীত। উঠানে জ্বালানো আগুন ঘিরে গোল হয়ে বসে অনেকে আগুন পোহাচ্ছে। খুব দরিদ্র এলাকা। শীত রোখার পর্যাপ্ত কাপড় এদের বেশিরভাগেরই নেই। বাঁশের আড়ে ঝোলানো ছেঁড়া কাঁথার ফোকর গলে পৌষের হু-হু বাতাস অবাধে যাওয়া-আসা করছে। দিনে রোদের উত্তাপ আর উষ্ণতা কাঁথার ভাঁজে সঞ্চয় করে রাখে এরা। পাড়ায় কেউ কেউ আমার কুশল নেয় – শইলডা বালা? আত্মীয়তার অন্তরঙ্গ গলায় বলে – বাজান, অত শীতো বাইরোইছো কেরে? আমিও আন্তরিক গলায় প্রত্যুত্তর করি – গ্রামো ঘুরতে আয়া ঘরে বইয়া থাকলে লাভ কী চাচা? নিজের পর্যাপ্ত শীতবস্ত্র দেখিয়ে আশ্বস্ত করি – শীতের লইগা মোটা জাম্পার পরছি, টুপি, হাতমুজাও লাগাইছি। এর ওপরে শাল পিনছি। বৃদ্ধের মুখ অপ্রতিভ দেখায় – হ, যে-জুইতের কাফড়-ছোফড় ফিনছুইন জার ঢুকব কেমনে! বৈষম্য ভুলে যাওয়া বৃদ্ধ সচেতন হয়ে সম্বোধন পালটায়। ‘তুমি’ থেকে ‘আপনিতে’ ওঠায় আমাকে। কী এক বোধে বুক মোচড় দিয়ে ওঠে, কিন্তু কিছু না বলে ধীরপায়ে সামনে হাঁটি। কলিম মিঞার জন্য অপেক্ষা করি। কাজ শেষ করে ও আমাকে সঙ্গ দিতে আসবে।

কলিম দ্রুত ধরে ফেলে আমাকে। এসে নতুন খবর জানায় – ছার, দক্ষিণপাড়াত পৌষসংক্রান্তির মেলা শুরু হইছে লইন যাই।

সাদামাটা গ্রাম্যমেলা। নাগরদোলার ক্যাঁচ ক্যাঁচ শব্দের সঙ্গে ভয় খাওয়া শিশুদের চিৎকার শোরগোল তুলেছে মেলা প্রাঙ্গণে। বেদেনির দল চুপড়িভর্তি লাল, নীল, সবুজ, হলুদ, কমলা চুড়ির পসরা সাজিয়ে একটা কোণ রঙিন করে রেখেছে।

নাগরদোলার ঘূর্ণায়মান শব্দের সঙ্গে ঘুরপাক খাওয়া ছেলেমেয়েদের আনন্দোল্লাস, বাঁশির নানামাত্রিক সুর, মেলায় আসা লোকজনের অবিরাম কথাবার্তা মিলেমিশে মেলা প্রাঙ্গণে একটা জমাটি আনন্দ রচিত হয়ে আছে। সুতোর ডগায় বাঁধা গ্যাস বেলুনের ওড়াউড়ির দিকে ঘাড় উঁচিয়ে তাকিয়ে আছে শিশুর দল। কোমরের ঘুনসিতে গোঁজা ঢিলা ফ্যান্ট সামলাতে সামলাতে আকাশ ও মাটির মাঝখানের শূন্যতায় মগ্ন শিশুদের দু-তিনজনের নাক বেয়ে নামা সর্দি জিভের ডগায় লেবেনচুষ হয়ে উঠেছে। কুমোরের হাতগড়া মাটির হাতি-ঘোড়া পর্যন্ত নানা হাতে হাতে বিচরণশীল হয়ে পড়ে। কলিম মিঞাকে নিয়ে মেলাটা এক চক্কর ঘুরে আবার বেদেনিদের চুড়ির পসরার কাছে এসে দাঁড়াতেই আমার দুচোখ মুগ্ধ হয়ে ওঠে। সাদা জমিনে লাল ব্লকের বাহারি শাড়ির ভেতর জড়িয়ে থাকা এক নাগরিক তরুণীর দিকে দৃষ্টি পড়ে। ওর কারুকাজ করা অবয়বজুড়ে এক নান্দনিক রূপ ঝলমল করছে। চুড়ি পরার জন্য বাড়িয়ে দেওয়া নেইল পলিশে করা আঙুলের ডগাগুলো পর্যন্ত পরিপাটি সৌন্দর্যে সজ্জিত। রোদের সোনালি একটা পাড় মেয়েটার কাঁধ ছুঁয়ে চিবুক বেয়ে ডান পাশের স্তন স্পর্শ করে নিচের জমিনে গড়িয়ে পড়েছে। ওর তির তির করে কাঁপা আঙুলের ডগা, রোদ-ধোয়া চিবুকের মোহময় খাঁজ আমাকে বিবশ করে। কলিম বোধহয় আমার চোখ পাঠ করতে পারে। আমাকে ফিসফিস করে জানায় – তাইনে টিনো সাইবের হালি, লগেরজন আমার পরিবার।

এতক্ষণে আমার চোখে পড়ে, সবুজ শাড়ির লম্বা একটা ঘোমটা। কলিম মিঞার স্ত্রী। খেয়াল করি, কলিমের চোখও নিজ স্ত্রীর উপস্থিতি উপেক্ষ করে টিএনও সাহেবের শালির রূপ দেখছে। কলিমকে মৃদু ধাক্কা দিই – এখানে থাকে, নাকি বেড়াতে এসেছে?

আমার প্রশ্ন বুঝতে একটু সময় লাগে কলিম মিঞার। বুদ করি বেড়াইতো আইছে। আগে তো দেহি নাই এনারে। মনে হয় আমার দিকে মেয়েটারও নজর পড়েছে। ওর একটু আগের স্থিতিশীল অবয়বে চিকন হাসির রেখা দেখা যায়। স্পষ্ট অনুভব করি আমার জীবনে কুসুমিত প্রেম এসে গেছে। মাসখানেকের মধ্যেই বিবাহিত বন্ধুদের তালিকায় আমার নাম যুক্ত হয়। সাথীর ধারালো সৌন্দর্য আর উষ্ণতায় যত দ্রুত ওর প্রতি মোহগ্রস্ত হয়ে উঠেছিলাম। তার চেয়ে দ্রুত ওর সান্নিধ্য ছিঁড়ে বন্ধনমুক্ত হওয়ার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠি। কিন্তু মুক্তির আগেই আরো বড় বন্ধনে জড়িয়ে পড়ি। বিয়ের মাসে সাথী অন্তসত্ত্বা হয়। জন্ম নেয় আমাদের সন্তান রিনোদ। এই প্রথম অনুভব করি সন্তানকে কেন প্রাণের অংশ বলা হয়। সাথীর আকাশচুম্বী চাহিদা, লোভ আর স্বার্থপরতায় আমি ক্রমশ হাঁপিয়ে পড়ি। বিয়ের মাত্র ছয় মাসের মাথায় একান্নবর্তী পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হতে বাধ্য হই। বিশাল অংকের লোন নিয়ে গাড়ি-বাড়ি সব কিছু …। পাঁচ বছরে থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর ভ্রমণ। বিয়ের পর আর আটপাড়া যাওয়ার সুযোগ পাইনি। কংস নদ আর পাখির কথা না হয় বাদ দিলাম; কলিম মিঞার সঙ্গেও দেখা হয়নি। অবাক হয়ে ভাবি, সাথীর মতো মেয়ে কী করে গ্রাম্য মেলায় চুড়ি কিনতে গিয়েছিল! পিয়ন কলিম মিঞার মতো লোকের জন্য আমার কষ্ট হয় শুনে টিজ করে – ওসব গেঁয়ো ছোটলোকরা টাকার জন্য পেছন পেছন ঘুরেছে; ওর জন্য কিসের এত দরদ! সন্তান রিনোদ আমার কলিজার টুকরো। কিছু হলেই সাথী রিনোদকে নিয়ে চলে যাওয়ার ভয় দেখায়। রিনোদ ছাড়া বাঁচা যায়!

বাসার কাজের বুয়া, ড্রাইভার এমনকি ছোট্ট একটা কাজের মেয়ে যে রিনোদকে সঙ্গ দেয়, ওর সঙ্গেও অমানবিক ব্যবহার করে সাথী। এ নিয়ে কিছু বললেই হলো! ওর সৌন্দর্য ফেটে থকথকে ক্রোধ জেগে ওঠে – এসব ছোটলোককে আশকারা দিয়ে প্রমাণ করো যে, তুমি নিজেও একটা ছোটলোক। শিশু রিনোদের উপস্থিতিও গ্রাহ্য করে না সাথী। অশান্তি আর কুৎসিত কলহকে এড়ানোর জন্য প্রায়ই নীরবে সব সহ্য করি। রিনোদের জন্য সুন্দর, সুস্থ একটা পারিবারিক আবহ দরকার।

 

মাঝেমধ্যে মা-বাবা, ভাইবোনের সঙ্গে দেখা করতে যাই। সাথী মন চাইলে কালে-ভদ্রে যায়। তবে রিনোদকে নিয়ে যাই আমি। দাদাবাড়ি রিনোদের খুব পছন্দের। এতেও সাথীর ক্ষোভ। আজ একটু তাড়াতাড়ি অফিস থেকে বেরোই। শরীরটা ভালো লাগছে না। অফিসের গাড়িতে বাসায় ফিরি। বুয়া দরোজা খুলেই জানায়, বিবিসাইব (সাথী তাকে এভাবে সম্বোধনের নির্দেশ দিয়েছে) তাইনের বাবার বাড়িত গেছেন। আফনেরেও যাইতে কইছে। রুমে ঢুকে ফ্রেশ হই। ফোন করে বলেছে, আবার বুয়াকেও দায়িত্ব দিয়ে গেছে বলার! গা না করে ড্রয়িংরুমে বসি। আমাদের বিশাল ড্রয়িংরুমটা মাঝারিগোছের শপিংমলের মতো লাগে। কত যে শো-পিস! নকল ফুল, বাঁশঝাড়, প্রজাপতি! স-ব নকল! মেঝে ছোঁয়া পর্দা ভেদ করে ঘরে আলো-হাওয়ার সাধ্য কী ঢোকে! সাথীর না-থাকার সুযোগে সব পর্দা একপাশে গুটিয়ে রাখি। অনেকদিন পর ঝলমলে আলোতে ঘর উপচে ওঠে। বুকভরে নিশ্বাস নিই। সোফায় লম্বা হয়ে শুয়ে টিভি অন করি। দরোজা খোলা। ডোরবেল বাজছে…। কিছুক্ষণ পর দরোজার কাছে কাজের ছেলের গলা শুনি। সম্ভবত আমাকে এরকম শুয়ে থাকতে দেখে ঢুকছে না। ডাকি ওকে – কিছু বলবে? ও জানায়, গ্রাম থেকে আসা কোনো এক কলিম মিঞা আমাকে খুঁজছে। উঠে বসি। বলি – এ-ঘরে নিয়ে আসো ওকে। কাজের ছেলেটার চোখে বিস্ময়। কামলা বা গ্রাম থেকে আসা লোকজনকে অতিথি রুমে ঢুকতে দেয় না সাথী।

কলিম মিঞার সঙ্গে বছরপাঁচেক পর দেখা। ও বেশ আবেগপ্রবণ হয়ে ওঠে – ছার, হেই যে আইলেন, আর তো গেলাইন না! আমরারে এক্কেরে ভুইল্লা গেছুইন! সম্ভবত আমার মধ্যেও অবচেতন কিছু অহমিকার ময়লা জমেছে। দূষিত বাতাস প্রভাবিত করে চারপাশ। ওকে দেখে যতটা উচ্ছ্বসিত হওয়ার কথা তা বোধ না করায় অস্বস্তি হয়। বলি – বসো কলিম মিঞা। ও বসে না, কুণ্ঠিত পায়ে দাঁড়িয়েই থাকে। আন্তরিক গলায় আবার বলি – কলিম মিঞা, আমার পাশের এই সোফাটায় বসো। বুয়াকে ডেকে কলিমের জন্য খাবারের ব্যবস্থা করতে বলে ওর ভালোমন্দ জানতে চাই। এর মধ্যে মোবাইলে সাথীর তলব – কী হলো আসছ না যে! আজ ভাইয়ার জন্মদিন। বোনেরা মিলে ডিসাইড করলাম ভাইয়াকে সারপ্রাইজ দেবো। তাই বলিনি কাউকে। আর আসার পথে রিনোদকে ওর দাদার বাসা থেকে নিয়ে আসবে কিন্তু। ওর গলায় একটা বেয়াদব-ঔদ্ধত্য ফুটে ওঠে। ওকে বলি – শরীরটা ভালো লাগছে না, যেতে পারব না। আমার কথা শেষ হওয়ার আগে ফোন কেটে দেয় সাথী।

ঘণ্টাখানেক পর গেটে গাড়ির হর্ন শোনা যায়। কিছুক্ষণ পর খুব ক্রুদ্ধ আর ধৈর্যহীন পায়ে সাথী ঢোকে ঘরে। পর্দা সরানো ড্রয়িংরুমের সোফায় বসা কলিম মিঞাকে দেখে ওর ফর্সা মুখ রাগে বেগুনি হয়ে ওঠে। কলিম মিঞা উঠে দাঁড়ায়। পাঁচ বছর মাঝখানে কেটে গেলেও কলিম মিঞা সাথীর সৌন্দর্যকে ভোলেনি। নরম গলায় জিগ্যেস করে – ভাবিসাব, বালা আছুইন? সাথী কলিমের কুশলের জবাব দেওয়ার প্রয়োজন মনে করে না। বরং আমার দিকে রূঢ় দৃষ্টিতে তাকিয়ে ঝাঁঝিয়ে ওঠে – ওকে এ-ঘরে বসিয়েছো কেন? এই ছোটলোকগুলো বসার জন্য এত দামি সোফা পেতে রেখেছি? কলিম মিঞার দিকে লজ্জায় তাকাতে পারি না আমি। সাথী এসব ভ্রুক্ষেপ না করে অভব্যভাবে বলতেই থাকে – এখন বুঝেছি, শরীর খারাপ কেন, তুমি ভাইয়ার জন্মদিনে না যাওয়ার বাহানা বানাচ্ছো…। সাথীর অশালীন ব্যবহারে কলিম বিস্মিত হলেও আমার দিকে দরদভরা চোখে তাকায় – ছার, আমি তাইলে যাই…। আটপাড়া থেকে বহন করে নিয়ে আসা কলিম মিঞার করুণ দৃষ্টি আমাকে তাড়িত করে। ধৈর্যের সমস্ত গ্রন্থি পটপট করে ছিঁড়ে যাওয়ার শব্দ শুনি আমি। নিরোদ মা-বাবার কাছে। স্কুল বন্ধ বলে সকালে অফিসে যাওয়ার পথে ওকে দিয়ে এসেছি। ও খুব বায়না ধরেছিল দাদা-দাদুর কাছে যেতে। উঠে দাঁড়াই। সাথীর রূঢ়তা আর সৌন্দর্যকে ঔদ্ধত্যভরে অগ্রাহ্য করি। কঠোর চোখে ওর দিকে তাকাই। এতে ওর শিকারি চোখ খানিকটা স্বচ্ছতা হারায়। গলা চড়িয়ে বলি – কিসের এত ঠমক তোমার? রূপের? থু দিই অই রূপে। মানুষকে কুকুর-বেড়াল ভাবো? হাউ ডেয়ার ইউ! রিনোদ এখন থেকে আমার কাছে থাকবে। তোমার মতো বাজে মায়ের কাছে বড় হলে আমার ছেলেটা নষ্ট হয়ে যাবে। কলিম মিঞাকে নরম গলায় বসতে বলি। ওর প্রতি কৃতজ্ঞতা বোধ করি। জলাভূমির বিস্মৃত প্রান্তর থেকে বহন করে নিয়ে আসা ওর ভালোবাসা আর মমতা আমার মধ্যে সাহস জুগিয়েছে। একজন দরিদ্র লোক ওর অসচ্ছলতার মধ্যেও ছুটে এসেছে শুধু আমাকে চোখের দেখা দেখবে বলে। নিষ্ঠুর শিকারির মতো সাথী আমার ওড়ার স্বাধীন পাখাদুটো কেটে দিয়েছে। শুধু রিনোদের জন্য ডানাকাটা হয়ে নীরব রক্তক্ষরণ সয়েছি আমি। কলিমের উপস্থিতি আমাকে সাহস জোগায়। সাথী আবার গর্জে ওঠে। – তুমি তো আসলেই ছোটলোক…। ধমক দিই ওকে – একদম চুপ। একটাও কথা বলবে না আর। বিয়ের ছয় মাস পরে আমাকে তুমি পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করেছ, কাজের লোকজনের সঙ্গে কুকুর-বেড়ালের মতো ব্যবহার করো। গরিবকে মানুষ মনে করো না। ছেলে নিয়ে সবসময় ব্ল্যাকমেইল করো…। রিনোদ এখন থেকে আমার কাছে থাকবে। কী করতে পার করোগে। যা জবাব দেওয়ার তা আমি কোর্টেই দেবো। নাউ ইউ গেট লস্ট…। আমার ডানাকাটা জীবনে আবার আকাশের ডাক শুনতে পাই।

কলিম মিঞা খুব বিব্রত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকে। ওকে সহজ করার জন্য বলি – জানো কলিম, আমার ছেলেটা একদম আমার মতো হয়েছে। মানুষকে খুব ভালোবাসে। এই শীতে ওকে নিয়ে তোমাদের জলার দেশে যাব। সাথী মুখ কালো করে বেরিয়ে যায়। ওকে দেখায় লক্ষ্যভ্রষ্ট শিকারির মতো। অনেকক্ষণ পর কলিম মিঞা সাহস করে একটা সুসংবাদ জানায় – জানুইন ছার, আমরার জলার দেশে অহন আর শিহারিরা যায় না। আইন হইছে, কড়া আইন। পাখ-পাখালি মারলে খালি জরিমানাই না, জেল-হাজতও অইতে পারে। অহন শিহারির দিন শেষ। কলিম মিঞার দিকে তাকাই। ওর বোকাসোকা ভাবটার রংচটে, একজন সমঝদার মানুষের অবয়ব ফুটে উঠতে দেখি।

Leave a Reply

%d bloggers like this: