ঋতুরেখায়

লেখক: ফয়জুল ইসলাম

কায়া নামের একজন নারী এবং ঘুরঘুরে নামের একজন পুরুষের গল্পটা বলার আগে তাদের সঙ্গে আপনাদের একটু পরিচয় করিয়ে দেওয়া যাক।

ঘুরঘুরে এবং কায়া কীটপতঙ্গের জগতের মান্তিস রেলিজিওসা প্রজাতির পতঙ্গ। এই প্রজাতির পতঙ্গের পরিণত সদস্যদের গায়ের রং গাঢ় সবুজ বলে তাদের ‘পাতাফড়িং’ নামে ডাকা যেতে পারে। তাদের মাথা ত্রিভুজ, মাথার দুপাশে দুটো অ্যান্টেনা। তাদের বুক সরু, পেট দীর্ঘ, ছ-টা পা – তাও দীর্ঘ, ঘাসফড়িংদের মতো। সামনের দুটো পা তারা প্রায়ই ভাঁজ করে রেখে চুপচাপ বসে থাকে শিকারের আশায়। তখন তাদের দেখে মনে হয়, তারা যেন গভীর প্রার্থনায় রত! এদের নারী-পুরুষের ভেতরে শারীরিক গঠনগত পার্থক্যটা সুস্পষ্ট। গড়ে পাঁচ থেকে ছ-ইঞ্চি লম্বা হয়ে থাকে স্ত্রী-পাতাফড়িংরা। পুরুষ-পাতাফড়িংরা আকারে তুলনামূলকভাবে ছোট। তারা দৈর্ঘ্যে দুই ইঞ্চি বা তার কিছুটা বেশি।

তাদের মা যে কে তা ঘুরঘুরেরা কেউই জানে না। গত শরতে নিজের শরীর থেকে নিঃসৃত লালা দিয়ে বিভিন্ন গাছের কাণ্ডে, শাখা-প্রশাখায়, বাঁশের বেড়ায় ঘুরঘুরেদের মা অনেক বাসা বানিয়েছিল, সব মা যেমন বানায়। প্রতিটি বাসায় শ-তিনেক ডিম পেড়েছিল তাদের মা। তারপর শীতের শুরুতেই দশ মাসের জীবনচক্র সম্পূর্ণ করে যথারীতি তাদের মা মারা গিয়েছিল আর দশটা পাতাফড়িংয়ের মতোই। বসন্তে যখন আবহাওয়ার তাপমাত্রা বেড়ে গেল, তখন বাসাগুলো ফেটে বেরোতে লাগল হালকা হলুদ রঙের শিশু-পাতাফড়িংরা। রক্তকরবীর শাখায় বানানো একটা বাসায় এই বসন্তে এমন করেই ডিম থেকে জন্ম হয়েছিল ঘুরঘুরে আর তার সহোদর-সহোদরাদের। তাদের বাসার গোটাষাটেক ডিম অবশ্য ফোটেইনি! বাসা ফেটে তখন হলুদ রঙের যে ছোট ছোট পাতাফড়িং বের হয়েছিল তারা রক্তকরবী গাছের কা- বেয়ে নেমে নিচের ঝোপঝাড়ের অন্ধকারে ঢুকে গিয়েছিল। আমাদের ঘুরঘুরেও ছিল সে-দলে। ঘুরঘুরের মনে পড়ে, সেসব ঝোপঝাড়ে মাথাচাড়া দিয়েছিল নীল নিশিন্দা, বেত, ভাট, রক্তকুচ, সন্ধ্যামালতি; বেড়ে উঠেছিল আকন্দ, বাসক, সর্পগন্ধা, পারুল। গুল্মসকলের গা বেয়ে ঊর্ধ্বে উঠে আসছিল লতারা – অনন্ত, অপরাজিতা, নীলমণি, ঝুমকো, কুঞ্জ আর মাধবী। তাই সেখানে, ফুলে ফুলে, বর্ণে-গন্ধে আকৃষ্ট হয়ে মধু খেতে আসছিল রাজ্যের মৌমাছি, প্রজাপতি, মথ, নলিমাছি, বোলতা। গাছেদের কা-ে, পাতায়-পাতায় জমেছিল গুবরেপোকা, গান্ধিপোকা, শুয়োপোকা, মাকড়সা, কেন্নো, কাচপোকা, সোনাপোকা, বিছা, সাপ ও ব্যাঙের ছানাদের দল। এরা সবাই নানা বয়সের পাতাফড়িংয়ের খাদ্য। প্রকৃতিগতভাবে পাতাফড়িংরা কেউই তৃণভোজী নয় – উদরপূর্তির জন্য দিন-রাত মাংস খোঁজে তারা। শিশু ঘুরঘুরেও তাই-ই করেছে সে-সময়টায়। গত সাত মাসের জীবনে পূর্ণ তরুণ ঘুরঘুরে লক্ষ করে দেখেছে, ক্ষুধার্ত পাতাফড়িংদের ভেতরে স্বজাতির সদস্যদের হত্যা করাটা খুবই সাধারণ একটা ঘটনা। পাতাফড়িংরা – সমলিঙ্গের বা বিপরীত লিঙ্গের – শেষ পর্যন্ত পরস্পরকেও খাদ্য হিসেবেই বিবেচনা করে থাকে। ‘স্বজাতি হত্যা’র দ্বিতীয় মাত্রা তৈরি করে ক্ষুধার্ত স্ত্রী-পাতাফড়িংরা : যৌনসঙ্গমের সময় তারা পুরুষ-পাতাফড়িংদের খুন করে খেয়ে ফেলে। তার কারণটা এমন : স্ত্রী-পাতাফড়িংদের পেটে যখন ডিম পরিপক্ব হয়, তখন তারা ক্ষুধার্ত হয়ে ওঠে আরো। তখন তারা তাদের সামনে কীটপতঙ্গ বা ক্ষুদ্র প্রাণী যা পাবে তা-ই খেয়ে ফেলবে। স্বজাতির পুরুষদেরও সেখানে কোনো রেহাই নেই। মৃত হলেও কবন্ধ পুরুষ-পাতাফড়িংরা মিনিটপাঁচেক ধরে নারীদের যোনিতে তাদের বীর্য স্থাপন করতে পারে এবং তারপরই নিস্তেজ হয়ে যায় তাদের মু-ুহীন দেহ। তাই বংশবিস্তারের জন্য স্ত্রী-পাতাফড়িংদের প্রতি ঘুরঘুরে যতই আকৃষ্ট হোক না কেন, স্ত্রী-পাতাফড়িংদের সে ভয়ই পায়। স্বজাতির নারীদের সঙ্গে নৈকট্য তৈরির প্রশ্নে চিৎপটাং, ফিচকে, বদখত, মুখগোমড়া, চতুর, অচল মেশিন অথবা রগচটা নামের পুরুষরাও এভাবে প্রাণ হারানোর ভয়ে সবসময় আতঙ্কিত থাকে।

এখানে প্রশ্ন উঠবেই : তাহলে যৌনসঙ্গমের সময় পুরুষ-পাতাফড়িংরা কেন স্ত্রী-পাতাফড়িংদের হত্যা করছে না, খেয়েও ফেলছে না? গবেষকরা বলছেন, পুরুষ-পাতাফড়িংরা এ-কাজটা কখনো করবে না। কেননা তার শুক্রাণু ধারণ করছে যে-নারী, তাকে খুন করলে তো আর নিজের জিনকে রক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে না! যৌনসঙ্গম ছাড়া পুরুষ-পাতাফড়িংরা স্রেফ খাদ্য হিসেবে অবশ্য স্ত্রী-পাতাফড়িংদের খুন করতে পারে।

আমাদের এই গল্পে পাতাফড়িংদের বংশবিস্তার এবং স্বজাতির পুরুষনিধন প্রসঙ্গ এলেই ফিরে ফিরে আসতে থাকবে কায়া নামের একজন স্ত্রী-পাতাফড়িংয়ের কথা। কায়া সম্পর্কে একটু পরেই আমরা আলোচনা করব। তার আগে আমরা ঘুরঘুরের প্রাত্যহিক জীবনটাকে একটু দেখে আসি।

এ-মুহূর্তে সাদা রঙের একটা লাউফুলে শিকার ধরার অপেক্ষায় বসে আছে ঘুরঘুরে। এই লাউমাচায়, সে যেখানে বসে আছে তার থেকে একটু দূরের আরেকটা লাউফুলে একই উদ্দেশ্যে ওতপেতে বসে আছে চিকনি নামের জনৈক পূর্ণ তরুণী পাতাফড়িং। চিকনির অবস্থান থেকে একটু দূরে লাউয়ের একটা লতার ডগায় ঝুলছে আরেকজন সদ্যতরুণী। তার নাম সাজুগুজু। লাউমাচার ওপরে, শূন্যে, উড়ছে একঝাঁক মৌমাছি। ঘুরঘুরের মতো করে চিকনি আর সাজুগুজু – এই দুজন তরুণী-পাতাফড়িংও মনোযোগ দিয়ে মৌমাছিদের গতিবিধি লক্ষ করছে। এই দুই তরুণী দেখতে তেমন একটা আকর্ষণীয় নয়। শরীরে পুষ্টির অভাবকেই এর জন্য দায়ী করতে হবে। সৌন্দর্যের মাপকাঠি এখানে খুবই সহজ – তুমি যত পুষ্টি গ্রহণ করতে পারবে ততই মাংসল হবে তোমার শরীর, ততই তুমি দৈর্ঘ্য-েপ্রস্থে বাড়বে, ততই জেল্লা খুলবে তোমার। এ-কারণেই রোদ পড়লে ততটা চিকচিক করছে না চিকনি আর সাজুগুজুর শরীর। তবে যেহেতু খাদ্যগ্রহণের পরে বংশবিস্তারই প্রাণীদের জরুরি একটা তাড়না, কাজেই স্বাস্থ্যহীন হলেও সমবয়সী চিকনি আর সাজুগুজুর সঙ্গে এই গতকালই যৌনসঙ্গম করেছে আমাদের ঘুরঘুরে। আর এখন, একই কারণে লাউফুলে বসে থাকা চিকনির দিকে যৌনসঙ্গমের লক্ষ্যে পৃথকভাবে বৃত্তাকারে এগোচ্ছে তিনজন পুরুষ-পাতাফড়িং – চিৎপটাং, ফিচকে আর বদখত। আর সাজুগুজুকে কেন্দ্র করে চক্কর দিচ্ছে মুখগোমড়া, চতুর, অচল মেশিন এবং রগচটা।

ঘুরঘুরে বুঝতে পারে, চিকনি আর সাজুগুজুর যৌনক্ষুধায় আক্ষরিক অর্থেই বলিদান দিতে হতে পারে এসব পুরুষ-পাতাফড়িংয়ের কাউকে কাউকে। চালাক পুরুষেরাই কেবল নানা ছলে নিজেদের হত্যাকা-ের হাত থেকে বাঁচিয়ে চটজলদি যৌনসঙ্গম করে ভেগে যায়। যেমন – গতকাল যৌনসঙ্গমের ঠিক আগমুহূর্তে সমবয়সী চিকনিকে একটা মাকড়সা উপহার দিয়েছিল ঘুরঘুরে। মাকড়সা খেতে মগ্ন হয়ে পড়েছিল ক্ষুধার্ত চিকনি। সেই ফাঁকে নিচ থেকে চিকনির তলপেট চেপে ধরে চিকনির যৌনাঙ্গে বীর্য স্খলন করে এক লহমায় ঘুরঘুরে সটকে পড়েছিল।

মৌমাছিদের লোভে লাউফুলে চুপচাপ বসে থাকতে থাকতে ক্লান্ত হয়ে ঘুরঘুরে নেমে যায় ফুলের ঠিক নিচে বাড়তে থাকা সবুজ কচি লাউটার গায়ে। তার সবুজ শরীরটা এবার কচি লাউয়ের সবুজে একেবারে মিশে যায়। তখনই খাবার মিলে যায় তার। ত্রিকোনাকার মাথার দুপাশের যৌগিক চোখদুটো দিয়ে তাকিয়ে সে দেখতে পায়, লাউফুলের মধু খাওয়ার জন্য উড়তে উড়তে ফুলের ওপরে গিয়ে বসেছে একটা ছোট্ট সাদা প্রজাপতি এবং প্রজাপতিটা মধু খেতেও শুরু করেছে। সাদা প্রজাপতিটার গায়ের রংটা লাউফুলের সাদা রঙের মতোই। দূর থেকে দেখে বোঝার কোনো উপায়ই নেই যে, ফুলের ওপরে আদৌ কোনো পতঙ্গ বসে আছে কি না! কচি লাউটার শরীর থেকে ধীরে ধীরে উঠে গিয়ে লাউফুলে বসে থাকা সাদা প্রজাপতিটার ঠিক পেছনে গিয়ে ঘুরঘুরে দাঁড়ায়। তারপর এক থাপ্পড়ে প্রজাপতিটাকে উলটে ফেলে দিয়ে তাকে সে চেপে ধরে তার সামনের দিকের পা-দুটোর ব্লেডের ভেতরে। প্রজাপতিটার নরম শরীরে সহজেই বসে যায় তার সামনের পায়ের ব্লেডদুটো এবং তখন নিশ্চল হয়ে পড়ে আহত প্রজাপতিটা। মুখের নিচের চারটে ছোট ছোট শুঁড় দিয়ে পাখা বাদে প্রজাপতিটার শরীরের অংশগুলো ধীরে ধীরে মুখের ভেতরে পুরে ফেলে সে। এভাবে প্রজাপতিটাকে পুরোপুরি খাওয়া হয়ে গেলে পর আলস্যে নিশ্চল হয়ে সে লাউফুলের ওপরে পড়ে থাকে কিছুক্ষণ। তারপর দ্বিতীয় তাড়না অর্থাৎ বংশবিস্তারের জন্য যৌনসঙ্গমের চিন্তাটা মাথায় ফিরে আসতে শুরু করে তার। কায়া নামের এক সদ্যতরুণীর গল্পটা এখান থেকেই শুরু হয়।

এই বসন্তে ঘুরঘুরেদের জন্মের পরে লতাগুল্মের ছায়ায় ছায়ায় গ্রীষ্মকাল এসেছিল, তারপর বর্ষাকাল। শিশুকাল থেকে ক্রমান্বয়ে তারুণ্যের দিকে অগ্রসর হচ্ছিল বিভিন্ন বাসা থেকে জন্ম নেওয়া পাতাফড়িংদের দল। তাদের শরীরের রং হলুদ থেকে ক্রমান্বয়ে হালকা সবুজ এবং শেষে গাঢ় সবুজ হয়ে উঠছিল আর তারা ঝোপঝাড়ের জগৎ ছেড়ে উঠে আসছিল বিভিন্ন লতাগুল্ম ও বৃক্ষের কা-ে। মগডাল পর্যন্ত উঠে যাওয়াটা তাদের লক্ষ্য। মগডালে পোকামাকড় মেলে বেশি। তখন বিপদ হলো এই যে, তারা চোখে পড়ে যেতে থাকল টুনটুনি, ফিঙে, বুলবুলি, ঘুঘু, কবুতর, শালিক, চামচিকে, বাদুড় আর পেঁচাদের। এসব দানব অহর্নিশি তাড়া করে ফিরছে তাদের; সুযোগ পেলে খেয়েও ফেলছে। এভাবে কমে এলো ঘুরঘুরেদের সহোদর-সহোদরাদের সংখ্যা। শরতে, পূর্ণ তারুণ্যে, তারা সবাই কা- বেয়ে উঠে এলো বৃক্ষদের মগডালে; মাচায় বেড়ে ওঠা লাউ, কাঁকরোল, শসা, করলা, চালকুমড়ো, শিম ইত্যাদি লতাগাছের ডগায়। লাউমাচার পাশের একটা কালকাসুন্দার কমলা রঙের ফুলের ওপরে তখন জীবনে প্রথম সদ্যতরুণী কায়াকে দেখেছিল ঘুরঘুরে।

সেটা এখন থেকে তিন সপ্তাহ আগের কথা। শরতের এক সকালে লাউমাচা হয়ে শিমের মাচায় খাবারের সন্ধানে গিয়েছিল ঘুরঘুরে – কিছুটা ছ-পায়ে হেঁটে, কিছুটা উড়ে উড়ে। শিমের মাচায় তরুণ, যুবক এবং বৃদ্ধ অন্যান্য নারী আর পুরুষ পাতাফড়িং শিকারে বের হয়েছে তখন। সেখানে বেগুনি শিমফুলের ওপরে কীটপতঙ্গ শিকারের জন্য ঘাপটি মেরে বসে থাকা একটা ঘাসফড়িং ধরে খাওয়ার পর ঘুরঘুরে আর কোনো খাদ্য খুঁজে পায় না। কাজেই অনেকক্ষণ শিমলতার ডগাগুলোতে বেগুনি ফুলদের ওপরে বেকার বসে থাকার পর সে পাশের ছোট বনটায় রওনা দেয়। রক্তজবা, কালকাসুন্দা, কাউফল, পাতিলেবু, বাতাবিলেবু, পেয়ারা, টগর, কাঠগোলাপ, দেশি বরই, বকফুল, স্বর্ণচাঁপা, সুলতানচাঁপা ইত্যাদি গাছে সে ঘুরে বেড়ায় সারাদিন-সারারাত। ঘুরে ঘুরে সে শিকার করে নানা জাতের কীটপতঙ্গ। তখন সন্ধের আগ দিয়ে কালকাসুন্দার কমলা রঙের ফুলের ওপরে অল্পবয়সী কায়াকে দেখতে পায় ঘুরঘুরে। মৌমাছি ধরার জন্য সেখানে ওতপেতে বসে ছিল কায়া। বাহ্! তরুণী-পাতাফড়িংদের দলে আরেকজন সুন্দরী যোগ হলো তবে! যৌনসঙ্গমের জন্য সেখানে এগোনো যেতেই পারে কোনো-না-কোনোদিন! কায়ার আশপাশে, কালকাসুন্দার ডালে ডালে বসে থেকে, তখন কায়াকে লক্ষ করছিল সদ্য-তরুণ কজন চঞ্চল পাতাফড়িং। কায়া অথবা এসব পুরুষ-পাতাফড়িংকে ঘুরঘুরে আগে কখনো শিমের জাংলায় অথবা তার আশপাশের লতাগুল্মে, বৃক্ষে দেখেনি। নিশ্চয় ভিন্ন কোনো মহল্লা থেকে খাবারের খোঁজে সেখানে গিয়েছিল তারা সবাই।

কালকাসুন্দার কা- বেয়ে উঠে আসা একটা উচ্চিংড়েকে সামনের দুপায়ের ব্লেডে আটকে ধরে খেতে ব্যস্ত ছিল কায়া। অপরিণত কায়ার প্রায় তিন ইঞ্চি লম্বা শরীর থেকে একটা মাদকতাপূর্ণ গন্ধ ভেসে আসছিল। এটা তার শরীর থেকে নিঃসৃত ফেরোমন নামের সেক্স হরমোনের গন্ধ। গন্ধটা ঘুরঘুরেকেও আকর্ষণ করছিল, তার ভেতরে জাগিয়ে তুলছিল যৌনতা। তারুণ্যে পৌঁছানোর পরে ঘুরঘুরে বুঝে ফেলেছে যে, ক্ষুধার্ত স্ত্রী-পাতাফড়িংদের শরীর থেকে মিষ্টি একটা গন্ধ বের হবে, গন্ধটা মাতাল করবে স্বজাতির পুরুষদের, তাদের প্রলুব্ধ করবে যৌনক্রিয়ায়।

এদিকে কালকাসুন্দার কমলা রঙের ফুলে ফুলে দীর্ঘক্ষণ বসে থেকে কোনো পোকামাকড় ধরতে না-পেরে ঘুরঘুরে তখন মনস্থির করেছিল, খাবার জোগাড় করতে সে বরং দেশি বরইয়ের তল্লাটে চলে যাবে। তার মনে হয়েছিল : আগে কিছু খেয়ে নেওয়া যাক। তারপর দেখা যাবে যৌনসঙ্গমের জন্য কোথাও কোনো তরুণীকে খুঁজে পাওয়া যায় কি না!

দেশি বরইয়ে ধরেছে অজস্র সবুজাভ ফুল। মগডালে বাদামি কা-ের ওপরে শিকার ধরার আশায় বসে ছিল ঘুরঘুরের চেয়ে বয়সে বড় বিশালা। দৈর্ঘ্যে বাড়তে বাড়তে বিশালা তখন প্রায় পাঁচ ইঞ্চিতে পৌঁছেছে। তাকে পূর্ণবয়স্ক নারী বলাটাই শ্রেয়। কীটপতঙ্গদের ধোঁকা দেওয়ার জন্য নিজের শরীরের সবুজ রং বদল করে সে বাদামি রং ধারণ করেছিল। তেমনি একটা ছদ্মবেশ নিয়েছিল ঘুরঘুরে নিজেও। তখন ভীষণ খিদে পেয়েছিল তার! বিশালা যে-ডালটায় বসেছিল তার ঠিক নিচের একটা ডালে তাই চুপচাপ বসেছিল সে; পেয়েও গিয়েছিল কয়টা মশা এবং চিকনচাকন একটা ফড়িং। নিজের

মাথাটাকে ১৮০ ডিগ্রি কোণে বাঁকিয়ে তখন সে দেখেছিল, বিশালা থেকে একটু দূরে বরইয়ের বিভিন্ন ডালে দঙ্গল পাকাচ্ছে কতিপয়

তরুণ এবং সদ্যতরুণ পাতাফড়িং – টিংটিঙে, গরুগাড়ি, নাচনেওয়ালা, মুখচোরা, উজ্জ্বল প্রমুখ। বিশালাকে মুগ্ধ করার জন্য তখন ডালে ডালে নাচছিল তারা। এছাড়া সেখানে কজন যুবক এবং পৌঢ়কেও দেখা গেল। এদের ভেতরে যুবক মাঞ্জা এবং পৌঢ় হঠকারী পুরুষ হিসেবে আকারে বড়। তার দৈর্ঘ্য প্রায় তিন ইঞ্চিমতো হবে। সেসব তরুণের নাচের দিকে অবশ্য কোনো মনোযোগ ছিল না বিশালার। স্থিরদৃষ্টিতে সে তাকিয়েছিল বরই ফুলের দিকে অগ্রসরমান একটা লাল ফড়িংয়ের দিকে। আর বিশালার শরীর থেকে ধেয়ে আসা মিষ্টি গন্ধটা ঘুরঘুরেকে দুর্বল করতে শুরু করেছিল।

বরই ফুলের কাছাকাছি চলে আসার পরে ছদ্মবেশ নিয়ে থাকা বিশালার মুখোমুখি পড়ে যায় মশা খুঁজতে এদিকে আসা লাল ফড়িংটা। সামনের পাদুটো উদ্যত অবস্থায় ঠিক তার সম্মুখে বিশালাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে লাল ফড়িংটা যেন ভড়কেই যায়! সে পিছিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে সঙ্গে সঙ্গেই। কিন্তু বিলম্ব হয়ে গেছে ততক্ষণে। ভাঁজ করে রাখা সামনের পাদুটো ঝটিতি প্রসারিত করে ফেলেছে বিশালা। তারপর লাল ফড়িংটাকে শক্তভাবে সে তার পায়ের ধারালো ব্লেডে আটকে নিয়েছে এবং লাল ফড়িংটার মু-ুটা কুড়মুড় করে চিবোতেও শুরু করে দিয়েছে সে। একমুহূর্তে ধড় থেকে আলাদা হয়ে গেছে লাল ফড়িংটার মু-ুটা। তারপর বিশালা আয়েশে খেতে শুরু করেছে লাল ফড়িংটার নরম ধড়। সেই ফাঁকে পেছন থেকে এসে বিশালার পিঠে চড়ে বসে টিংটিঙে নামের চতুর এক পাতাফড়িং। সামনের দুই পা দিয়ে সে আঁকড়ে ধরে বিশালার কাঁধ এবং এক নিমিষেই বিশালার তলপেটের শেষপ্রান্তে স্ফীত হয়ে ওঠা যৌনাঙ্গে নিজের যৌনাঙ্গ প্রবেশ করিয়ে দেয়। নিজের তলপেট সংকুচিত করে বীর্য নিঃসরণ করতেও শুরু করে সে। বিশালার সঙ্গে যৌনসঙ্গমে টিংটিঙে ব্যয় করে বড়জোর তিন মিনিট। টিংটিঙের তড়িঘড়ি করার কারণ একটাই : লাল ফড়িং ভক্ষণপর্বে হয়তো টিংটিঙের দিকে মনোযোগ দেবে না বিশালা। এমন তো হতেই পারে যে, মাথাটাকে ১৮০ ডিগ্রি কোণে ঘুরিয়ে এনে সঙ্গমরত টিংটিঙেকে পিঠ থেকে একঝটকায় নিজের মুখের কাছে নিয়ে আসবে বিশালা এবং টিংটিঙের ধড়টা থেকে মাথাটা ছিঁড়ে নিয়ে সে খেতে শুরু করে দেবে। টিংটিঙে বিশালাকে সে-সুযোগ আর দিতে চায়নি।

তবে উজ্জ্বলটা আগ বাড়িয়েই তখন আত্মাহুতি দিলো! উত্তেজিত হয়ে বিশালার দিকে এগিয়ে যাওয়ার সময় ঘুরঘুরেকে সে বলে গেল : ক্ষুধার্ত বিশালার কাছে নিজেকে সমর্পণ করাটাই ভালো। না-হয় যৌনসঙ্গমের সময় তার মু-ু কেটে নিয়ে খেয়েই ফেলল বিশালা! খাক না! সেই ফাঁকে তার মু-ুহীন ধড় ঠিকই দীর্ঘক্ষণ ধরে বিশালার যৌনাঙ্গে বীর্য ঢালতে থাকবে। তড়িঘড়ি বীর্যস্খলন করলে বিশালার গর্ভাধারে বেশিসংখ্যক শুক্রাণু পৌঁছানোর সম্ভাবনাটা কমে যায় না কি? তাহলে বিশালার থাবার নিচে মরণ মেনে নেওয়াটাই কি ভালো নয়? উজ্জ্বলের সেই যুক্তি ঘুরঘুরেকে মেনে নিতেই হয়েছিল। পূর্ণবয়স্ক পাতাফড়িংদের লক্ষ করতে করতে ঘুরঘুরে নিজেও প্রজননের প্রয়োজনে আত্মাহুতির এমন কৌশল সম্পর্কে ইতোমধ্যেই জেনে গেছে।

নিজের সামনের পায়ের ব্লেডের চাপে এক নিমিষে উজ্জ্বলের মু-ু নামিয়ে নিল বিশালা। কবন্ধ উজ্জ্বলের মু-ুহীন ধড়টা তখন এত শক্ত করে বিশালার যৌনাঙ্গে সেঁটে ছিল যে, বিশালার পিঠে চেপে বসা উজ্জ্বলের ধড়টাকে ঘুরঘুরে কিছুতেই সরাতে পারছিল না। বারতিনেক পেছনের চার পা দিয়ে লাথি মারার পরে বিশালার যৌনাঙ্গ থেকে উজ্জ্বলের ধড়টা বিযুক্ত হয়ে গেল এবং সেটা বরইগাছ থেকে গড়িয়ে সোজা পড়ে গেল মাটিতে।

তখন আর কালক্ষেপণ না করে বিশালার যৌনাঙ্গে নিজের যৌনাঙ্গটা ঢুকিয়ে দিয়ে বীর্য নিঃসরণ করতে শুরু করেছিল ঘুরঘুরে। তবে কাজটা নির্বিঘেœ ঘটেনি। উজ্জ্বলের ধড়টা কুটকুট করে খেতে খেতে ১৮০ ডিগ্রি কোণে মাথাটা ঘুরিয়ে ঘুরঘুরেকে বারকয়েক ঝাঁকি মেরে তার মুখের কাছে নিয়ে যাওয়ার জন্য সচেষ্ট হয়েছিল বিশালা। কিন্তু তখন প্রাণপণে বিশালার কাঁধ শক্ত করে ধরে বসেছিল ঘুরঘুরে। একটু পরই তার দিক থেকে মনোযোগ হারিয়ে ফেলেছিল বিশালা। কেননা তার নাগালের ভেতরে ততক্ষণে বোকার মতো ঢুকে পড়েছে তার আরেকজন প্রেমপ্রার্থী। ‘মুখচোরা’ তার নাম। বেচারা মুখচোরাও আত্মাহুতি দিলো উজ্জ্বলের মতো করেই – বলা নেই, কওয়া নেই উজ্জ্বল ঝাঁপিয়ে পড়ল বিশালার মুখের সামনে। ঘুরঘুরে দেখতে পেল, মুখচোরার মাথাটা সযতেœ চিবিয়ে খাচ্ছে বিশালা। সেই ফাঁকে বিশালার পিঠ থেকে চটজলদি নেমে সটকে পড়েছে ঘুরঘুরে। মুখচোরার মু-ুহীন ধড়টা বীর্যস্খলনের তাড়নায় পরে বিশালার যৌনাঙ্গ বরাবর আদৌ অগ্রসর হয়েছিল কি না বা হলেও কতক্ষণ সেটা সেখানে আটকে ছিল তা আর দেখা হয়নি ঘুরঘুরের। যৌনসঙ্গমের পরে তখন ঘুরঘুরের আবারো প্রচ- খিদে পেয়েছিল। তাই বকফুলের গাছটার সাদা সাদা ফুলে মৌমাছি ধরতে গিয়েছিল ঘুরঘুরে।

 

দুই

তিন সপ্তাহ পরে বকফুলের গাছের পাশে যে রক্তজবাটা বেড়ে উঠেছে সেই গাছটার বাদামি কা-ে কায়াকে দ্বিতীয়বারের মতো দেখতে পাই আমি। হেমন্তের সেই বিকেলে রক্তজবার মগডালে একগুচ্ছ লাল ফুলের পাশে শিকার ধরার আশায় ওতপেতে বসে আছে কায়া। রক্তজবার কা-ের সঙ্গে যথারীতি গায়ের রং মিলিয়ে সে ধারণ করেছে বাদামি রং। এবার কায়ার আকার তিন ইঞ্চি থেকে বেড়ে গিয়ে চার ইঞ্চিতে পৌঁছেছে। এর অর্থ এই যে, গেল তিন সপ্তাহে নিজের জন্য পর্যাপ্ত পুষ্টির ব্যবস্থা করতে পেরেছে কায়া। এ-মুহূর্তে তার শরীরের মিষ্টি গন্ধটা গাঢ়তর হয়েছে। গন্ধের মাদকতায় তার আশপাশে যথারীতি ভিড় করেছে মহল্লার বিভিন্ন বয়সের পুরুষেরা। সুন্দরী কায়াকে দেখে তাই ফের লোভ জাগে আমার ভেতরে : আহা! এমন যৌনাবেদনময়ীর সঙ্গে যদি সঙ্গম করা যেত, যদি তার গর্ভের মধ্য দিয়ে আমার সন্তান আসত এ-জগতে! আহা! এমন সুন্দর শরীরের মেয়ের সঙ্গে একবার যৌনসঙ্গম করতে পারলে তারপরে মরে গেলেও কোনো আফসোস থাকবে না আমার! সত্যিই থাকবে না!

কায়ার কাছাকাছি যাওয়ার জন্য বকফুলের গাছ পরিত্যাগ করে ডাল আর পাতা বেয়ে আমি বসি গিয়ে রক্তজবার আরেকটা ডালে এবং আমি কায়াকে তার প্রতি আমার অপার মুগ্ধতার কথা সরাসরি জানাই। আমার কথা শুনে নলিমাছি খেতে খেতে হাসিতে ভেঙে পড়ে সদ্যতরুণী কায়া। তার ত্রিকোনাকৃতি মাথার দুপাশের অ্যান্টেনা দুটো কাঁপতে থাকে হাসির দমকে।

বেশ বিরক্তি নিয়েই আমি তাকে প্রশ্ন করি, ‘একজন পুরুষ একজন নারীকে পছন্দ করবে, পছন্দের কথা জানাবে – এর ভেতরে আপনি হাসির কী দেখলেন, শুনি?’

অ্যান্টেনা দুলিয়ে হাসতে হাসতে সে আমাকে বলে, ‘এমন মুগ্ধতার কথা শুনতে শুনতে মেয়েদের কান পচে গেল! তাহলে এসব তরল কথা আবারো শুনলে তাদের তো হাসি পাবেই!’

কায়ার সহজ স্বীকারোক্তিতে আমি অসহজ হয়ে যাই। কথা আর বাড়ানোর প্রয়োজন বোধ করি না আমি। তখন আমার সিগারেটের  তৃষ্ণা পায়। কিন্তু এই রেস্তোরাঁয় সিগারেট খাওয়া যায় না।

এবার সরাসরি কথায় আসে কায়া। সে আমাকে বলে, ‘বেশ। আপনার সঙ্গে না-হয় আমি ঘনিষ্ঠ হবো। তবে আপনি জানেন তো যে, সে-সময়ে আপনার মাথা আর ধড় খেয়ে ফেলতে পারি আমি?’

কায়ার কথা আমি ঠিকঠাক বুঝতে পারি। তারুণ্যে পৌঁছানোর পরে তো এমনটাই দেখছি আমি : স্ত্রী-পাতাফড়িংরা প্রায়শই সঙ্গমের সময়টায় স্বজাতির পুরুষ-সঙ্গীদের হত্যা করে খেয়ে ফেলে। স্ত্রী-পাতাফড়িংদের কাছে স্বজাতির পুরুষ হত্যা সন্তান ধারণের জন্য তাদের পুষ্টি সংগ্রহের একটা প্রক্রিয়া মাত্র। এমনও দেখেছি আমি, কোনো রাক্ষুসে স্ত্রী-পাতাফড়িং যদি তার সঙ্গম-সহযোগী পুরুষদের খেয়ে ফেলে তবে সে অধিক সংখ্যায় ডিম দিতে সমর্থ হয়।

সামনের পা-দুটো ভাঁজ করে প্রার্থনার ভঙ্গিতে রক্তজবার পাতায় বসে থাকতে থাকতে আনমনে আমি কায়ার কথাটা নিয়ে ভাবতে     থাকি। স্বজাতির কোনো সদস্যের হাতে নিজের মৃত্যুর সম্ভাবনা প্রগাঢ় হচ্ছে দেখে আমি দুশ্চিন্তিত হই। কাজেই আমি কায়ার আকাক্সক্ষার বিরুদ্ধে দাঁড়াই, ‘আচ্ছা! বলুন তো, স্রেফ প্রজননের জন্য এসব রক্তপিপাসা, খুনখারাবির কি আদৌ কোনো প্রয়োজন আছে?’

আমার প্রশ্ন শুনে আবারো হাসতে শুরু করে কায়া। হাসির দমকে তার হালকা সবুজ রঙের স্বচ্ছ পাখাগুলো ঈষৎ মেলে যায় দুদিকে। তখন সে উত্তর দেয়, ‘আলবৎ প্রয়োজন আছে!’

কায়া আমাকে বলে, তার মতো সুন্দর একজন মেয়ে আমার বীর্য ধারণ করবে, ডিম জমিয়ে রাখার জন্য নিজের শরীরের নিঃসরণ থেকে বাসা বানাবে, সে-বাসাতে সে ডিম দেবে, ডিম নিষিক্ত হবে, ডিম থেকে আমার সন্তান জন্মানোর সব ব্যবস্থা সে-ই সম্পন্ন করবে আর তার সেবার বিনিময়ে আমি তাকে পুষ্টি উপহার দেবো না? মুফতে মৌজ করে ভেগে যাব আমি? এটা তো হতে পারে না! আমার মতলবটা আসলে মোটেই সুবিধের নয়।

কায়ার কথায় অবাক না-হলেও আমি থমকে যাই কায়ার প্রতি আমার মুগ্ধতার অমোঘ পরিণতির কথা কল্পনা করে। তাই হয়তো তীব্র শ্লেষ নিয়ে কায়াকে প্রশ্ন করি আমি, ‘তবে বলি, আপনার ডিম থেকে যে আমারই সন্তানের জন্ম হবে তার নিশ্চয়তা                       কোথায়? একাধারে তো অনেক পুরুষের সঙ্গেই সম্পর্ক থাকতে পারে আপনার?’

আমার প্রশ্ন শুনে যেন খুব মজা পায় কায়া! তার সবুজাভ বুকে আরো উজ্জ্বলতা দেখা দেয় তখন। হাসতে হাসতে সে আমাকে বলে, ‘শোনেন সাহেব! এসব আলোচনা অবান্তর। পুরুষ হিসেবে এই আপনিও কিন্তু একগামী নন!’

তারপর কী মনে করে কায়া আমাকে প্রবোধ দিতে বসে, ‘নারী-পুরুষের সম্পর্ক অনেক পুরনো একটা ফরম্যাট, বুঝলেন তো! এই ফরম্যাটে দুজনের একজনকে আত্মাহুতি দিতেই হবে। আপনি যদি আমার চেয়ে শক্তিশালী হতেন অথবা ভীষণ চতুর তবে কী করতেন আপনি? আপনি আমাকে খুন করে আমার মাথা-ধড় খেয়ে ফেলতে পারতেন। তা-ই নয় কি?’

উত্তর দিই আমি, ‘তা বটে।’

তারুণ্যে ঢোকার পর থেকে হরহামেশাই স্বজাতি হত্যার এই ফরম্যাটটার পুনরুৎপাদনই প্রত্যক্ষ করছি আমরা। আমার আগের ব্যাচ এবং আমার একই ব্যাচের অজস্র পুরুষ-পাতাফড়িং তাদের জিন প্রবহমান রাখতে গিয়ে অনিচ্ছায় বা স্বেচ্ছায় তাদের চেয়ে শক্তিশালী স্ত্রী-পাতাফড়িংদের হাতে খুন হয়েছে, নিঃশেষিত হয়েছে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে এমনও ঘটেছে যে, শক্তিময় পুরুষ-পাতাফড়িংরাও দুর্বল স্ত্রী-পাতাফড়িংদের খুন করে খেয়ে ফেলতে ছাড়েনি। পার্থক্য একটাই : সেক্ষেত্রে পুরুষ-পাতাফড়িংরা নিজেদের বংশগতি বজায় রাখার জন্য সঙ্গম করতে মোটেই সচেষ্ট ছিল না। স্ত্রী-পাতাফড়িংদের তারা উচ্চিংড়ে, ঘাসফড়িং, কাচপোকা অথবা মৌমাছিদের মতো খাদ্য হিসেবে বিবেচনা করে খেয়ে ফেলেছিল।

কায়াকে আমি বলি, গণিতশাস্ত্রের ভাষায় এটাকে ‘ব্যাটেল অব সেক্স’ বলা হয় – একজন নারী এবং একজন পুরুষের ভেতরে অন্য সেক্সের ওপরে প্রভুত্ব করার ক্ষমতা যার বেশি সে-ই এই গেমটায় জিতবে। যুদ্ধে যুদ্ধে শান্তি আসবে না কখনো। তাই শান্তির শর্তে এই গেমে কারো না কারো আত্মত্যাগের প্রয়োজন দেখা দেয়। আর দুজনেই যদি জিততে চায়, তবে সহযোগিতার ক্ষেত্র থেকে ছিটকে পড়ে যাবে তারা দুজনেই। ব্যাটেল অব সেক্সের এই                     কো-অর্ডিনেশন গেমটা আমেরিকান গণিতবিদ জন ন্যাশের প্রখ্যাত গেম থিওরির ওপরে ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে।

নারী-পুরুষের সম্পর্ক নিয়ে তাত্ত্বিক কাজ হয়েছে দেখে বেশ মজা পায় কায়া। বুদ্ধিদীপ্ত কায়া আমাকে বলে, প্রকৃতি কিন্তু যে-কোনো সময় পালটে দিতে পারে নারী-পুরুষ পাতাফড়িংদের সহযোগিতার এ-সূত্র। তখন হয়তো দেখা যাবে, নারীরাই উলটো পুরুষদের সেক্স ক্যানিবলিজমের শিকার হয়ে গেছে! এভাবে বংশবিস্তারের ক্ষেত্রে নারী ও পুরুষের ভূমিকার সম্ভাব্য বিবর্তন নিয়ে দীর্ঘ একটা জ্ঞানগর্ভ বক্তব্য দেয় কায়া।

তারপর কায়া বেশ করুণা নিয়েই নরম কণ্ঠে আমাকে বলে, ‘আমি আপনাকে বলব, এই পৃথিবীর সবকিছুই কোনো না কোনো ফরম্যাটমতো চলে। বংশবিস্তারের এই ‘রুল অব দ্য গেম’ মেনে চলতেই অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি আমরা নারী-পুরুষ সবাই। আর আপনি যদি এই ফরম্যাট না-মানতে চান তবে আপনি হয়তো সহজে আপনার জিন ট্রান্সফার করতে পারবেন না। আপনি নিশ্চয় আর রেইপিস্ট নন! এ নিয়ে আপনি মন খারাপ করবেন না দয়া করে।’

‘না। করব না।’ মনে মনে নিজের নিরাপত্তা বিধানের বিভিন্ন উপায় খুঁজতে খুঁজতে রাজ্যের বিবমিষা নিয়ে সংক্ষেপে বলি আমি।

‘গুড। এই ফরম্যাটে আপনি রাজি থাকলে আসবেন। ভেবে দেখব তখন।’ এই বলে ফের শরীর দুলিয়ে হাসতে শুরু করে দেয় বিজয়ী কায়া। তার মাথাটা এবং মাথার দুদিকের অ্যান্টেনাদুটোও হরষে দুলতে থাকে এদিক-ওদিক।

হতবিহ্বল হয়ে তখন আমি কায়ার দিকে তাকালে সে আমাকে শেষ কথাটা বলে : যৌনসঙ্গমের কথা না-হয় বাদই দেওয়া যাক। এমন তো হতে পারত যে, আমার অপ্রস্তুত অবস্থাতেই আমাকে খুন করতে পারত কায়া, আমাকে খেয়েও ফেলতে পারত সে স্রেফ খাদ্য হিসেবে, যেমন করে পাতাফড়িংরা মৌমাছি বা বোলতাদের খেয়ে ফেলে! সেটা তো আর কায়া করছে না! সে বরং আমাকে তার নিজের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হওয়ার সুযোগ করে দিতেই চাইছে। বংশবিস্তারই যখন প্রকৃতির মূল লক্ষ্য, তখন একজন নারী বা একজন পুরুষ সঙ্গমের পরে বেঁচে থাকল না মারা গেল তাতে কীইবা যায়-আসে এই

পৃথিবীর? কায়া তো তার শরীর থেকে আমার সন্তান উৎপাদনের ব্যবস্থা করবেই! তাহলে সঙ্গমের সময় নিজের পুষ্টির প্রয়োজনে আমাকে কায়া খেয়ে ফেললে আমার আপত্তি থাকতে যাবে কেন?

কায়ার কথা শুনতে শুনতে আমি তার সুন্দর সবুজ শরীর, তার পুরুষ্টু বুকের স্বাস্থ্য এবং তার তলপেটের শেষপ্রান্তে গভীর যৌনাঙ্গের দিকে সতৃষ্ণে তাকাই। দর্শনেই আমি তখন চরমভাবে উত্তেজিত হয়ে পড়ি। তবে বংশ রক্ষার রক্তাক্ত পথটার কথা ভাবতেই আমার ভেতরে আবারো ভয়ানক আতঙ্ক দেখা দেয়। তাই আমি ছোট্ট করে উত্তর দিই, ‘তাহলে এসব থাক। নিজের জীবন ঝুঁকিতে ফেলে আপনার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা তৈরি করার কোনো প্রয়োজন দেখছি না আমি!’

সঙ্গে সঙ্গেই কায়া ত্রস্তে বলে ওঠে, ‘আহা! থাকবে কেন? পুরুষ হিসেবে আপনাকে আমার খুব পছন্দ হয়েছে।’

সবিস্ময়ে কায়ার চোখে আমি তাকাই। আমার মতো স্বাস্থ্যহীন একজন পুরুষ-পাতাফড়িংকে কেন পছন্দ করবে কায়ার মতো একজন সুন্দরী? সঙ্গমে মেয়েদের প্রলুব্ধ করার জন্য বিভিন্ন মুদ্রায় নাচতেও পারি না আমি ভালোমতো; উপঢৌকনও জোগাড় করতে পারি না!

আমার চোখে নিশ্চয় ভেসে ওঠে প্রশ্নটা। বুদ্ধিমতী কায়া তা চটজলদি ধরেও ফেলতে পারে। তারপর সে আমাকে বলে, পুরুষ-পাতাফড়িংদের দলে সবচেয়ে লম্বা আর বলশালী যে-যুবক আছে, যার নাম মাঞ্জা, তার সঙ্গে কায়া কখনো নিজেকে জড়াতে যাবে না। তার কারণ হিসেবে কায়া আমাকে বলে যে, মাঞ্জা তার চেয়ে আকারে ইঞ্চিদুয়েক ছোট হলেও মাঞ্জার ছ-টা পা-ই ভীষণ লম্বা, চওড়া তার বুক আর তার মুখগহ্বরটা অনেক বড়। কাজেই মু-ু খেয়ে ফেলার জন্য মাঞ্জাকে যদি কায়া আক্রমণ করে তবে মাঞ্জা তা প্রতিরোধ করবেই! তাছাড়া এ-ও ঠিক যে, সুযোগ পেলেই কিন্তু উলটো কায়াকেই খুন করে খেয়ে ফেলতে পারে বলশালী মাঞ্জা! সমীকরণটা যদি এমন দাঁড়ায় তবে মাঞ্জার মতো পরাক্রমশালী পুরুষের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা তৈরির এমন ঝুঁকি কায়া কেন নেবে?

তারপর কায়া আমাকে তার পছন্দের পুরুষের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করে : বংশবিস্তারের জন্য কায়ার প্রয়োজন আমার মতো নরমসরম পুরুষদের। যেমন, আমার শরীর মাঞ্জার মতো মজবুত নয় মোটেই। তাই যুদ্ধটুদ্ধ না-করে আত্মাহুতি দেওয়ার জন্য কায়ার মুখের সামনে আমি নির্দ্বিধায় ঝাঁপ দেবো; কায়ার নাগালের ভেতরে বাড়িয়ে দেবো আমার মাথাটা। আর তা যদি আমি না-করি তবে কায়া আমার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হওয়ার জন্য আগ্রহবোধ না-ও করতে পারে!

নলিমাছি খেতে খেতে তার ত্রিকোনাকৃতি মাথাটা আমার মুখের খুব কাছে নিয়ে আসে কায়া। তার নীলরঙের যৌগিক চোখ এবং মাথার মাঝে বিন্যস্ত আরো তিনটা একাকী চোখ স্থির হয় আমার মুখের ওপরে। জ্বলজ্বল করতে থাকে তার চোখগুলো। তার মাথার দুপাশের অ্যান্টেনা দুটো দুলতে থাকে। আমি বুঝতে পারি যে, কায়া আমার শরীরের ঘ্রাণ নিচ্ছে, যেমন করে অনতিদূরের সম্ভাব্য খাদ্যকে মেপে দেখে পাতাফড়িংরা সবাই।

তারপর আমাকে বোঝাতে শুরু করে কায়া : কায়ার মতো সুন্দরী এবং শক্তিশালী নারীদেরই আমার প্রয়োজন, কেননা আমি চাইব আমার পরবর্তী প্রজন্ম বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে যেন আকর্ষণীয় হয়, স্বাস্থ্যবান হয়, বলশালী হয়। তা না-হলে তারা ক্রূর এই জগতে সংগ্রাম করে টিকে থাকবে কী করে? বকফুলের গাছে বসে থাকা মাকালার মতো কোনো স্বাস্থ্যহীনা এবং অনাকর্ষণীয়া স্ত্রী-পাতাফড়িংদের দিয়ে তো আর আমি আমার ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থ রক্ষা করতে পারব না! কাজেই কায়া যে ফরম্যাটটার কথা বলছে সেটাই আমাদের দুজনের প্রত্যাশার ভারসাম্য রক্ষা করবে। আর এ-ও বলতে হয় যে, এটা তো আর নতুন কোনো ফরম্যাট নয়! আজ থেকে কমপক্ষে চার হাজার বছর আগে, সম্ভবত প্রাচীন মেসোপটেমিয়াতেই, এই ফরম্যাটটা অনুসরণের ব্যাপারে প্রথমবারের মতো ঐকমত্যে পৌঁছেছিল আমাদের পূর্বপুরুষেরা।

তারপর আমি কায়ার সঙ্গে বাকবিতণ্ডার আর কোনো যুক্তি খুঁজে পাই না। কায়ার শরীরের মিষ্টি গন্ধটার আবেশে আমি উত্তেজিত হতে থাকি। শারীরিক উত্তেজনাই বরং পরম বলে মনে হয় আমার কাছে, যুক্তি নয়।

হয়তো আমাকে চাঙ্গা করার জন্যই একটা মৌমাছি ধরে আমার দিকে বাড়িয়ে দেয় কায়া। তারপর সে সাজুগুজু নামের তরুণীর পাগলামি নিয়ে অনর্গল সব লঘু কথা বলে যায়। আমি চুপ করে বসে মৌমাছি খেতে খেতে কায়ার শরীরের সামনের দুপায়ের ধারালো ব্লেডদুটোকে কাছ থেকে লক্ষ করে চলি। আর সব পাতাফড়িংয়ের মতোই তার সামনের দুপায়ের সবুজাভ ফিমার এবং টিবিয়ার ভেতরের দিকেই খাঁজকাটা ব্লেড আছে – ফিমারে দুই সারি ব্লেড আর টিবিয়ায় এক সারি। আমার ধড়টাকে নিশ্চয় এই ধারালো ব্লেডগুলো দিয়েই পয়লাতে আটকে ফেলবে কায়া, তারপর সে আমার ধড় আর মাথা চিবিয়ে খেয়ে ফেলবে। অবশ্য বাইরে থেকে আর দেখা যাচ্ছে না তার মুখের ভেতরের ধারালো দাঁতগুলোর অস্তিত্ব। এই দাঁতগুলো দিয়েই স্বজাতিখাদক কায়া আমার ধড় থেকে মু-ুটা ছিন্ন করে ফেলবে এক নিমিষে। তার মাথার নিচের দিকে মুখগহ্বরের ওপরে আর নিচে ক্রমাগত নড়ছে দুই জোড়া ছোট ছোট লোব। এই লোবগুলো দিয়ে কায়া আমার ছিন্নমস্তক টুকরো টুকরো করে তার মুখের ভেতরে ঢুকিয়ে নেবে। এমনটাই তো চলছে আমাদের আশপাশে, চলবেও তা-ই।

এসব দুর্ভাবনার ভেতরেও আমি নির্লজ্জ হয়ে কায়ার সবুজ রঙের বিশাল বুক এবং একই রঙের তলপেটের নিচের দিকে বিস্তৃত গভীর যৌনাঙ্গের দিকে আবারো তাকিয়ে থাকি। দর্শনে আমি উত্তেজিত হই আবারো। আমার কোষে কোষে ক্রমশ জেগে ওঠে অনতিক্রম্য একটা তাড়না : এ মুহূর্তেই আমি কায়ার যোনিতে আমার বীর্যস্খলন করতে চাই। প্রাণসংহৃত হওয়ার দুশ্চিন্তা আমাকে আর স্পর্শ করতে পারে না তখন। আমার মনে হয় : যা হয়, হবে! কায়ার শরীর আমি চাই!

– তার শরীরে ঘুরে বেড়ানো আমার নগ্নদৃষ্টিকে ক্ষমা করে দিয়ে নির্বিকারভাবে আমার সঙ্গে কথা বলে চলে কায়া। সে আমাকে জানায়, মেঠেলের ধারের লাউয়ের মাচাটার পুবে – জাম আর কাঁঠালগাছের ফাঁকের জঙ্গলে – নীল অপরাজিতা আর কুঞ্জলতায় ফুল এসে ভরে গেছে। সেখানে মধুর লোভে মৌমাছি আর বোলতা জমেছে অনেক। কালকে কায়া ওখানেই থাকবে।

কায়ার সঙ্গে কথোপকথন শেষ হলে আমি রক্তজবার অন্য একটা ডালে শিকার খুঁজতে রওনা দিই। পথিমধ্যে আমার মুখোমুখি হয় মাঞ্জাসহ একদল পুরুষ। কায়ার সঙ্গে আমার সাম্প্রতিক ঘনিষ্ঠতার কারণে ঈর্ষার বশেই সামনের দুই পা দিয়ে আমাকে আক্রমণ করে বসে বলশালী মাঞ্জা। শক্তিতে পারব না জেনেও আমি তখন মাঞ্জার সঙ্গে দ্বন্দ্বযুদ্ধে অবতীর্ণ হই। তাতে করে ক্ষতিগ্রস্ত হয় আমার বাঁ-চোখ এবং গলা।

 

তিন

পরদিন নীল অপরাজিতা আর কুঞ্জলতায় যাওয়া পড়ে না ঘুরঘুরের। এ-তল্লাটে নারকেলগাছের পরে মাথায় উঁচু একটা স্বর্ণচাঁপার গাছ আছে, জামগাছটার ঠিক পাশেই, মেঠেলের ধারে। খাবার সংগ্রহের রক্তাক্ত প্রতিযোগিতা এড়ানোর জন্য বরং সেই উচ্চতাতেই ঘুরঘুরে উঠে যায়। হালকা কমলা ফুলে সয়লাব হয়ে গেছে স্বর্ণচাঁপার গাছটা। আর মিষ্টিমধুর লোভে সেখানে ভিড় জমিয়েছে অসংখ্য মৌমাছি, ফলের মাছি, বোলতা আর নানা জাতের ফড়িং। ঘুরঘুরে দেখে, তার আগেই সেই লম্বা বৃক্ষের বিভিন্ন শাখা-প্রশাখায় শিকারে নেমেছে বিভিন্ন বয়সের জনাবিশেক পাতাফড়িং। তবু বলতে হবে, উচ্চতার কারণে খাদ্যসংগ্রহের প্রতিযোগিতা সেখানে তুলনামূলকভাবে কম। তবে একটা বিপদ দেখা দিয়েছে : স্বর্ণচাঁপা গাছটা অনেক উঁচুতে বলে চারদিকে খোলামেলা। তাই খুব সহজেই ঘুরঘুরেদের যখন-তখন আক্রমণ করে বসছে, জান নিয়ে নিচ্ছে দানবেরা – খুঁড়লেপেঁচা, হুতুমপেঁচা, লক্ষ্মীপেঁচা, টুনটুনি, বাদুড়, চড়–ই, শালিকের দল। তারাও এসেছে স্বর্ণচাঁপায় কীটপতঙ্গ শিকারের আশায়।

শিকারের ভূমিতে কেউ কারো বন্ধু নয়। তাই একটা বোলতা ধরা নিয়ে ফরফরানি নামের এক সদ্যতরুণীর সঙ্গে স্বর্ণচাঁপার একটা ফুলের ওপরে যুদ্ধ হয়ে যায় ঘুরঘুরের। তারা তাদের সামনের দুটো পা এবং ধারালো দাঁত দিয়ে পরস্পরকে আক্রমণ করে বসে। মাত্র সাড়ে তিন ইঞ্চির মতো লম্বা সদ্যতরুণী ফরফরানি তখনো খুব একটা শক্তিশালী হয়ে ওঠেনি। কাজেই আকারে বেশ বড় হলেও ফরফরানি তার সামনের পা-দুটো দিয়ে ঘুরঘুরের মাথাটাকে তখন টেনে নিজের মুখের কাছে নিয়ে আসতে ব্যর্থ হয় বারবার। এদিকে ফরফরানির চেয়ে আকারে ছোট ঘুরঘুরে নিজেকে বাঁচানোর জন্য তার সামনের দু-পায়ের ব্লেডগুলো দিয়ে জোরে চেপে ধরে ফরফরানির মাথা। তারপর ফরফরানি উপায়ান্তর না-দেখে ঘুরঘুরেকে মস্তবড় একটা ঝাঁকি মেরে ফেলে দেয় ঠিক নিচের একটা পাতায়। এভাবে ফরফরানি আলগা হয়ে বেরিয়ে যায় ঘুরঘুরের আয়ত্তের ভেতর থেকে। যুদ্ধপর্বে ফরফরানির শরীর বেশ কিছুটা জখমও হয়। ক্ষুধার্ত ঘুরঘুরের ভেতরে সঙ্গমের ইচ্ছার চেয়ে উদরপূর্তির তাড়নাই প্রবল হয়েছে তখন। তাই সে গুটিগুটি পায়ে গাছটার ডাল বেয়ে স্বর্ণচাঁপার ফুলটায় ফিরে যায়। আহত ফরফরানির শারীরিক দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে তারপর ফরফরানিকে সামনের পা-দুটো দিয়ে ফের আক্রমণ করে বসে ঘুরঘুরে এবং পায়ের ভাঁজের ব্লেডে তার ধড় আর পেট আটকে নিয়ে সে খেয়ে ফেলে ফরফরানির মাথাটা।

তারপর একদিন ঘুরঘুরের সঙ্গে দেখা হয় স্বর্ণচাঁপার ফুলে বসে থাকা সুজলা নামের একজন সদ্যতরুণীর সঙ্গে এবং সুজলায় উপগত হয় সে। সঙ্গমকালে নিজেকে সুজলার খাদ্য হতে দেবে না বলে ঘুরঘুরে আগেভাগেই ক্ষুধার্তাকে উপহার দেয় একটা ফলের মাছি। কাজ হয় তাতে। ফলের মাছি খেতে ব্যস্ত হয়ে যায় সুজলা এবং সেই ফাঁকে নির্বিঘেœ সঙ্গম করে চম্পট দেয় ঘুরঘুরে।

এভাবে প্রায় পনেরো দিন স্বর্ণচাঁপার গাছটার ফুলে ফুলে পড়ে    থাকা কীটপতঙ্গ খেয়েটেয়ে ঘুরঘুরে আবার নেমে আসে গাছটার নিচের বিস্তৃত শিমের জাংলায়। দিনদুয়েক শিমের জাংলায় জীবন কাটিয়ে ঘুরঘুরে আরো নিচে নেমে যায় – সোজা জমিনে, যেখানে মাথাচাড়া দিয়েছে আলু, বেগুন আর বাঁধাকপির গাছ। সেখানে আলুগাছে ধরেছে সাদা সাদা ফুল, বেগুনি রঙের ফুল এসেছে বেগুন গাছে, বাঁধাকপিতে হলুদ রঙের ফুল। ফুলে ফুলে জমেছে কীটপতঙ্গের দল। সেসব কীটপতঙ্গ খাওয়ার লোভে জমিন থেকে গাছেদের খর্বাকায় কা-ে উঠে এসেছে যত উচ্চিংড়ে, সাপের ছানা, গিরগিটির ছানা, গান্ধিপোকা, সোনাপোকা, কাচপোকা, মাকড়সা, নলিমাছি ইত্যাদি। সেখানে মনের সুখে খাওয়া-দাওয়া চলে ঘুরঘুরের। উদরপূর্তির একটু পরেই আবার খিদে পায় তার। তাই সে খাদ্যের সন্ধানে জমিন থেকে উঠে যায় পেয়ারা গাছটায়। পেয়ারা গাছের একটা মগডালে আবারো কায়ার সঙ্গে তখন দেখা হয় তার।

কীটপতঙ্গদের বোকা বানানোর জন্য বাদামি রঙের ছদ্মবেশ ধারণ করেছে সুন্দরী কায়া। সপ্তাহতিনেকের ব্যবধানে চার ইঞ্চি থেকে সে আকারে বেড়েছে পাঁচ ইঞ্চির কাছাকাছি। পুষ্টির প্রাচুর্যে নবযৌবনা এখন আগের চেয়ে আরো আকর্ষণীয়া হয়ে উঠেছে। ক্ষুধার্তার শরীর থেকে যথারীতি ধেয়ে আসছে মাদকতাময় একটা গন্ধ। আর যা হয়, তার শরীরের গন্ধে আবিষ্ট হয়ে তাকে সঙ্গমে প্রলুব্ধ করার জন্য ক্রমাগত নাচছে এই তল্লাটের সদ্যতরুণ, তরুণ এবং যুবকদের অনেকেই।

চিৎপটাং নামের একজন সদ্যতরুণ তার ছয় পা দুলিয়ে নানা মুদ্রায় পেয়ারা গাছের একটা ডালে আনুভূমিকভাবে একবার এদিক যাচ্ছে, আরেকবার অন্যদিকে। অন্য একটা ডালে পেছনের পায়ে ভর দিয়ে তার ধড় এবং পেটে নানা ভঙ্গিমায় ঢেউ খেলাচ্ছে নাচনেওয়ালা নামের এক তরুণ। পাশের একটা ডালে পেছনের চার পা বিছিয়ে বসে সামনের পা দুটো আর মাথাটা এদিক-ওদিক নাচাচ্ছে ফিচকে।

যুবক মাঞ্জার নাচের কায়দাটা খুবই অভিনব। বুক মেলে দিয়ে সোজা দাঁড়িয়ে, পাখাগুলো ছড়িয়ে দিয়ে, ধড় থেকে প্রায় ৪৫ ডিগ্রি কোণে দুপাশে সে ছড়িয়ে দিয়েছে তার সামনের দু-পা। অনেকটা ইংরেজি হরফ ওয়াইয়ের মতো দেখাচ্ছে তার দাঁড়ানোর ভঙ্গিটাকে। তারপর সে তার যৌনাকাক্সক্ষা প্রকাশের জন্য তার পেছনের চার পায়ের ওপরে ভর দিয়ে নাচছে অনবরত। কুংফু যোদ্ধারা তাদের শত্রুকে আক্রমণ করার জন্য পাতাফড়িংদের মতো এমন করে প্রায়শই ওয়াই পজিশনে দাঁড়ায়।

একটু দূরের একটা পেয়ারার ডালে বসে কায়াকে কেন্দ্র করে পুরুষ-পাতাফড়িংদের এসব আবেদনপূর্ণ নাচ দেখছিল ঘুরঘুরে। কায়ার শরীরের সুন্দর গন্ধে প্রলুব্ধ হয়েছে সে নিজেও। নাচে সে খুব একটা দক্ষ নয়। তবু না-নেচে আর উপায়ই বা কী? তাকেও তো নামতে হবে কায়ার নৈকট্যলাভের প্রতিযোগিতায়! তাই পেয়ারা গাছের ডালের ওপরে বসে ঘুরঘুরে তার মাথা আর ধড়টাকে খুবই সরল একটা ভঙ্গিতে নানাদিকে ঝোঁকাতে থাকে।

পয়লায় কায়ার দিকে উদ্বাহু ভঙ্গিতে নাচতে নাচতে অগ্রসর হয় মাঞ্জা নামের সবচেয়ে শক্তিশালী পুরুষ। মাঞ্জার দৈর্ঘ্য প্রায় তিন ইঞ্চি। ঘুরঘুরেদের সবার চেয়ে সে আকারে কমপক্ষে এক ইঞ্চি বড়ই হবে। মাঞ্জার সঙ্গে তাই সহজে কোনো প্রতিযোগিতাতেই নামতে চায় না আশপাশের কোনো পুরুষ-পাতাফড়িং। তবে মাঞ্জাকে একেবারেই পাত্তাই দেয় না কায়া। কায়ার এই অসম্মতি মেনে নিতে পারে না মাঞ্জা। সে তার সামনের পাদুটো দিয়ে আক্রমণ করে বসে কায়াকে। কায়ার মাথাটাকে কব্জা করাটাই তার লক্ষ্য ছিল। নিজেকে বাঁচানোর জন্য কায়া তার ততোধিক লম্বা আকারের সামনের দুই পা দিয়ে তখন একটা জোর লাথি ঝাড়ে মাঞ্জার পেট বরাবর। পেয়ারা গাছের ডাল থেকে ছিটকে নিচে পড়ে যায় মাঞ্জা।

মাঞ্জার ব্যর্থতার পরে কায়াকে লক্ষ করে এগোয় ফিচকে। ফিচকে তার সামনের দুই পায়ের ফাঁকে আটকে রাখা একটা মৌমাছি উপহার দেয় কায়াকে। কায়া মৌমাছিটাকে খেতে ব্যস্ত হয়ে গেলে কায়ার পিঠে উঠে তার কাঁধ চেপে ধরে ফিচকে; তারপর সে চটজলদি কায়ার যোনিতে বীর্যস্খলন করে উড়ে পালিয়ে যায়।

তারপর স্বজাতি হত্যার নেশায় মেতে ওঠে কায়া। নাচনেওয়ালাকে তার দিকে এগিয়ে আসার জন্য সংকেত দেয় কায়া। চালাকি করে ফিচকে প্রাণে বেঁচে গেলেও নাচনেওয়ালা মারা পড়ে রাক্ষুসে কায়ার হাতে। পেয়ারার ফুলে হঠাৎ উড়ে এসে বসা একটা বোলতাকে ধরে যখন সাবাড় করছিল কায়া তখন চকিতে কায়ার পিঠে উঠে বসে নাচনেওয়ালা এবং কায়ার পুচ্ছদেশের যোনিতে নিজের যৌনাঙ্গ প্রবেশ করিয়ে দিয়ে বীর্য ঢালতে শুরু করে দেয় সে। বোলতা-ভক্ষণে ব্যস্ত থাকলেও ব্যাপারটা ঠিকই লক্ষ করে কায়া। ধীরেসুস্থে বোলতাটাকে খাওয়ার পরে সে তার মাথাটাকে ১৮০ ডিগ্রি কোণে বাঁকিয়ে নিয়ে এক লহমায় কামড়ে ধরে নাচনেওয়ালার     মাথাটা। নাচনেওয়ালাকে একটানে মুখের কাছে এনে সে কুড়মুড় করে খেতে থাকে নাচনেওয়ালার মাথা এবং ধড়।

টানাটানিতে ততক্ষণে কায়ার নিম্নাঙ্গ থেকে বিযুক্ত হয়ে পড়েছে কবন্ধ নাচনেওয়ালার এঁটে বসা যৌনাঙ্গ এবং নিচের জমিনে গড়িয়ে পড়ে গেছে নাচনেওয়ালার নিথর মু-ুহীন ধড় এবং তলপেটটা। সেই ফাঁকে পেয়ারা গাছটার অন্য একটা ডাল থেকে ত্বরিতে এগিয়ে এসে সুন্দরী কায়ার প্রশস্ত পিঠে উঠে যায় ঘুরঘুরে। নিজের সামনের দুই পা দিয়ে কায়ার কাঁধটা শক্ত করে আটকে ধরে কায়ার যৌনাঙ্গে নিজের যৌনাঙ্গটাকে জলদি প্রবেশ করিয়ে দিতে পারে সে। উত্তেজিত কায়া কোনো বাধা দেয় না। এর আগে কায়ার সঙ্গে ঘুরঘুরের শারীরিক সংযোগ ঘটেনি কখনো। কাজেই সঙ্গমের ব্যাপারটা আরো উত্তেজনাকর হয়ে দাঁড়ায় ঘুরঘুরের বেলায়।

বীর্যস্খলনের সুখে বিবশ হয়ে আসে কায়ার কাঁধ খামচে ধরে বসে থাকা ঘুরঘুরের শরীর। এভাবে সে কায়ার শরীরে পড়েই  থাকতে চায় এবং দীর্ঘক্ষণ ধরে সে কায়ার গর্ভাধারের খুব গভীরে চালান করে দিতে চায় তার নিজের সব শুক্রাণু। সঙ্গমরত ঘুরঘুরে যেন দেখতে পায়, আগামী বসন্তের শুরুতে হলুদ রঙের অজস্র শিশু-পাতাফড়িং দলবেঁধে বাসা থেকে বের হচ্ছে এবং ঝোপঝাড়ের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ছে তারা। তাদের উর্বরা মায়ের মতোই তারা স্বাস্থ্যবান, অপরূপ। এর চেয়ে আর বেশি কী চাইতে পারে একজন পুরুষ-পাতাফড়িং!

ততক্ষণে কায়া নাচনেওয়ালার মাথা আর ধড় খেয়ে ফেলেছে পুরোটুকুই। কায়ার পিঠে চেপে বসা ঘুরঘুরে দেখতে পাচ্ছে, নাচনেওয়ালার শরীর থেকে বিযুক্ত হয়ে যাওয়া সবুজাভ পাতলা পাখাগুলো বাতাসে ভাসছে, ভাসতে ভাসতে তারপর পড়ে যাচ্ছে জমিনে। আর ১৮০ ডিগ্রি কোণে মাথাটাকে বাঁকিয়ে নিয়ে ঘুরঘুরের মগ্ন চোখে শীতল দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে কায়া। প্রতিক্রিয়া হিসেবে এর পরের পর্যায়েই ঘুরঘুরেকে আক্রমণ করার কথা কায়ার।

ঘুরঘুরে তখন আত্মরক্ষার্থে নিজের মু-ুটাকে আরো খানিকটা পেছনের দিকে সরিয়ে ফেলতে চায়। কায়ার কাঁধ খামচে ধরে রাখা সামনের পা-দুটো যতটুকু সম্ভব প্রসারিত করে, পেছনের পা-দুটোর ওপরে ভর দিয়ে তাই নিজের ধড় এবং পেটটাকে অনেকখানি সোজা করে নেয় সে।

শেয়ার করুন

Leave a Reply