আকন্দ সাহেব মন খারাপ করে বাড়ি ফিরলেন। রাহেলা দরজা খুলে দিলো। অন্যান্য দিন আকন্দ সাহেব ঘরে ঢোকার সময় রাহেলাকে কিছু না কিছু একটা বলেন। কথা না বললেও রাহেলার দিকে তাকান, তাকিয়ে একটু হাসেন। আজ তিনি ওসবের কিছুই করলেন না। রাহেলা তার বাবার দিকে তাকিয়ে থাকল। সে-ও তার বাবার মতো চুপচাপ থাকে।

আকন্দ সাহেবের মন কি খারাপ?

ঘরে ঢুকে আকন্দ সাহেব কোনো কথা না বলে কাপড়-চোপড় বদলালেন। রাহেলা দরজার কাছে দাঁড়িয়ে সব দেখছে। প্রতিদিন ঘরে ঢুকে বাবা রাহেলার দিকে তাকাবেন। কথা না বললেও রাহেলার মাথায় হাত বুলিয়ে দেবেন। এই হাত বুলিয়ে দেওয়ার অর্থ হলো, মা রে, তুই কেমন আছস?

আজ বাবার কী হলো!

আকন্দ সাহেব চোখ থেকে চশমা হাতে নিয়ে বিছানায় বসে পড়লেন। জানালা দিয়ে সন্ধ্যারাতের অন্ধকারের ছিটেফোঁটা আলো ঘরের ভেতর এসে উঁকি দিয়ে যাচ্ছিল।

রাহেলা বাবাকে বেশ ভালো করে পরখ করে। বোঝার চেষ্টা করে। বাবা কি তা বুঝতে পারে? রাহেলা যেন কিছুই হয়নি এমন একটা ভঙ্গি করে বলল,

– বাবা, মায়ের শরীরটা কী আগের চেয়ে বেশি খারাপ?

মেয়ের কথায় আকন্দ সাহেব খুব অবাক হলেন। তিনি তার মেয়ের দিকে তাকালেন।

মেয়েটা হয়েছে অবিকল মুকুলের মতো! সুরাইয়া খানম মুকুল। রাহেলার কথা শুনে আকন্দ সাহেব অবাক না হয়ে পারলেন না। রাহেলা যেন কীভাবে কীভাবে সত্যটা জেনে যায়! এর আগেও অনেকবার আকন্দ সাহেব রাহেলার এই বিষয়টির প্রমাণ পেয়েছেন। কিন্তু তাই বলে আজো খবরটা রাহেলা কীভাবে জানল!

রাহেলা বাবার পাশে এসে দাঁড়ায়। বাবার কাঁধে হাত রেখে বলল,

– বাবা, টিপু আর কচি খেলা থেকে এখনই ফিরবে। তুমি হাত-মুখ ধুয়ে আসো – আমি ছোট খালাকে চা বানাতে বলি।

রাহেলা বাবার দিকে গামছা এগিয়ে দেয়।

আকন্দ সাহেব চুপচাপ।

তিনি আর কী বলবেন!

গামছা নিয়ে বাথরুমের দিকে পা বাড়ান তিনি। বাথরুমে যাওয়ার সময় রাহেলা খেয়াল করল তার বাবার পা সরছে না। চোখ জোড়াও করমচার মতো লাল। বাথরুমের দরজা পর্যন্ত গিয়ে আকন্দ সাহেব ঘুরে দাঁড়ালেন। পেছন ফিরে দাঁড়িয়ে কপালে একটা চিন্তার রেখা তুলে তিনি রাহেলাকে বললেন,

– তোর মা তোকে ফোন করেছিল?

রাহেলা ক্ষীণকণ্ঠে জবাব দিলো, না।

– তাহলে!

রাহেলা তার বাবার কথার পিঠে কোনো কথা বলল না। সে মাথা নিচু করে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকল। মুকুলকে কিছু বললে মুকুলও রাহেলার মতো এরকম মাথা নিচু করে চুপ করে থাকে। আকন্দ সাহেব মমতামাখা দৃষ্টিতে রাহেলার ওরকম মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকা দেখতে দেখতে হাতমুখ ধোয়ার জন্য বাথরুমে ঢুকে গেলেন। রাহেলা কীভাবে জানল – এরকম একটা ধন্দ তার ভেতরে কাজ করছিল।

অনেকটা সময় নিয়ে হাত-মুখ ধুয়ে, ঘাড়-গলা পানি দিয়ে ভালো করে মুছলেন। একসময় আকন্দ সাহেব বাথরুম থেকে বেরুলেন।

না, আকন্দ সাহেবের চোখ জোড়া এখন আর আগের মতো লাল দেখাচ্ছে না। সময় নিয়ে, ভালো করে কাঁদলে চোখ পরিষ্কার হয়ে যায়।

দুই

দুপুরের পর মুকুলের ডাক্তার কেবিনে এসে মেডিক্যাল রিপোর্ট দেখে আকন্দ সাহেবকে বললেন,

– উকিল সাহেব বলেন দেখি দেশের খবর-টবর কী? এই দেখেন পত্র-পত্রিকায় একেকদিন একেক রকম উদ্বেগজনক খবর ছাপা হচ্ছে। আমরা যে কোনটা রেখে কোনটা বিশ্বাস করব বুঝতে পারি না – বলে ডাক্তার সাহেব রিপোর্টের দিকে আবারো ভালো করে তাকিয়ে থাকেন।

আকন্দ সাহেব হাইকোর্টে চব্বিশ বছর ধরে ওকালতি করছেন। কোর্ট-কাছারিতে প্রতিদিন শত শত ঘড়েলমার্কা মক্কেল চড়িয়ে বেড়ান তিনি। মক্কেল ‘ক’ বললে তিনি বুঝে ফেলেন তার মক্কেল ‘ক্যালিফোর্নিয়া’ বোঝাতে চাচ্ছেন। আর এই ডাক্তার ভদ্রলোকের কথা শুনে তার মনে হচ্ছে, এই লোক বুঝি তাদের চেয়েও অনেক বড় কিছিমের ঘড়েল।

আকন্দ সাহেব কিছু বললেন না। ডাক্তার হাবিজাবি মার্কা অনেক কথা বললেন। তিনি মনোযোগ দিয়ে সেসব শুনলেন। কখনো কখনো ইচ্ছের বিরুদ্ধেও মনোযোগ দিয়ে হাবিজাবি ধরনের কথা শুনতে হয়। এই যেমন এখন তিনি শুনছেন।

আকন্দ সাহেব ডাক্তারের ভাবভঙ্গি আর বুদ্ধিসুদ্ধি দেখে ভেতরে ভেতরে হাসলেন। হাসিটা আকন্দ সাহেবের ভেতরেই থাকল, বাইরে থেকে বোঝা গেল না। মুকুল তখন চোখ বন্ধ করে কেবিনের ধবধবে বিছানায় শুয়ে আছে। ডাক্তার সাহেব কেবিন থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় সিনেমার ডাক্তাররা যেমন করে ঠিক সেরকম বেশ একটা সিনেম্যাটিক ভঙ্গিতে আকন্দ সাহেবকে ইশারা করে তার সঙ্গে বেরিয়ে আসতে বললেন।

হাসপাতালের তিনতলায় লম্বা টানা বারান্দা। ঝকঝকা-ফকফকা। কিছুক্ষণ আগে ডেটল দিয়ে ভালো করে বারান্দা মোছা হয়েছে। ডেটলের তীব্র ঝাঁঝাল রকমের একটা গন্ধ দাগী চোর-বদমাশদের মতো চারপাশে ঘুরপাক খাচ্ছে। বারান্দার বাঁ দিকে মরচে ধরা খাজকাটা গ্রিল। তিনতলার ওপর থেকে নিচের সবুজ বাগান দেখা যায়। বাগান পেরোলে দেয়াল। দেয়ালের ওপাশে চানখাঁরপুলের প্রশস্ত রাস্তা। রাস্তাটার একদিক চলে গেছে পলাশীর দিকে আর অন্যদিক চলে গেছে ফুলবাড়িয়া। রাস্তার দুপাশে সারি সারি ট্রাক। দু-চারটা অ্যাম্বুলেন্স। পাশাপাশি টিন দিয়ে বানানো অনেক দোকান। দোকানের সাইনবোর্ডে লেখা এলেম দ্বারা চোর ধরা হয়। শেষ বিদায় স্টোর। চিরবিদায় স্টোর। বিদায় বেলা।

ডাক্তার সাহেব বারান্দার গ্রিলের কাছে দাঁড়িয়ে আকন্দ সাহেবকে বললেন,

– আপনার স্ত্রীর অবস্থা খুব একটা ভালো নয়। কথাটা বলে তিনি থামলেন। পারলে উনাকে বাসায় নিয়ে যান। যে-কয়টা দিন বাঁচেন – বলে ডাক্তার সাহেব চুপ করে থাকলেন।

ডাক্তার সাহেব, মুকুল আর কতদিন বাঁচতে পারে –

আকন্দ সাহেবের গলা দিয়ে আর কথা বের হলো না।

আকন্দ সাহেবের কথার কোনোরকমের উত্তর দিলেন না ডাক্তার।

তিনি মেডিক্যালের লম্বা বারান্দায় জুতোর শব্দ তুলে আকন্দ সাহেবের কাছ থেকে দূরবর্তী হয়ে যেতে থাকেন। পেছন থেকে আকন্দ সাহেব তার চলে যাওয়া দেখছেন। বাতাসে তার ঢিলেঢালা সাদা অ্যাপ্রন ঘুড়ির লেজের মতো দোল খেতে থাকে। আকন্দ সাহেবের নাকে ডেটলের গন্ধটা তীব্রভাবে এসে লাগে। একটা রুগ্ণ গড়নের কালো বিড়াল খুব সন্তর্পণে তার সামনে দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। বেড়ালের পায়ের সেই শব্দে ডাক্তারের জুতোর শব্দ তলিয়ে যায়। আকন্দ সাহেবের কান বেড়ালের মতো সজাগ হয়ে ওঠে।

বিকেলবেলা হাসপাতালের তিনতলায় মুকুলের কেবিনের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আকন্দ সাহেবের আর বাড়ি ফিরতে ইচ্ছে করল না।

কী লাভ প্রতিদিন একই রকম হতাশা নিয়ে বসু বাজার লেনের বাড়িতে ফিরে যাওয়া – এই ফিরে যাওয়ার কি কোনো মানে আছে!

আকন্দ সাহেবের মন খারাপ হয়ে যায়; কিন্তু রাহেলার কথা মনে হতেই তিনি যেন কোত্থেকে এক ধরনের সাহস খুঁজে পান। কে যেন তার কানের কাছে ফিসফিস করে বলে, আকন্দ সাহেব, আপনাকে ঘরে ফিরে যেতে হবে। আপনি যদি ঘরে না ফেরেন তাহলে ওদের কী হবে? ওরা কোথায় যাবে? কী করবে?

এই কথা কে তাকে বলে!

আকন্দ সাহেবের সামনে ভেসে ওঠে রাহেলার মুখ। মুকুলের মুখ।

আকন্দ সাহেব হাসপাতালে মুকুলের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নেমে আসেন নিচতলায়। আজ আর তার লিফটে করে নামতে ইচ্ছে করল না। প্রতিদিন তিনি লিফটে করে নামেন। আজ সিঁড়ি দিয়ে নামতে দেখে লিফটের পান-খাওয়া কালো কুচকুচে লোকটা তার দিকে কেমন একটা দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে থাকল।

নিচে নেমে হাতঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলেন, নয়টা বেজে দশ। রাস্তা বেশ নির্জন। নভেম্বর মাসের শেষ সপ্তাহের শীতল পবন আকন্দ সাহেবের শরীরে পরশ বুলিয়ে দিচ্ছে।

আকন্দ সাহেব ঠিক করলেন, তিনি আজ রিকশা নয়, হেঁটে বাড়ি ফিরবেন। রাস্তার আশপাশের বেশিরভাগ চায়ের দোকান বন্ধ; দু-একটা খোলা আছে। এক কাপ চা খাওয়া দরকার। এক কাপ কড়া লিকারের চা খেলেন তিনি।

তিন

অনেকদিন পর আজ তার হাঁটতে ইচ্ছে করছে। তিনি হাঁটছেন। বেশ দ্রুতগতিতে হাঁটছেন। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল ছেড়ে নিমতলীর ভেতর দিয়ে ফুলবাড়িয়া স্টেশন, ঠাটারীবাজার, বনগ্রাম, যোগীনগর, ওয়ারীর টিপু সুলতান রোড, র‌্যাংকিন স্ট্রিট, দক্ষিণ মৈশুণ্ডী পেছনে ফেলে রেখে অনেকটা পথ পেরিয়ে এসে তিনি পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছেন সামনে নারিন্দা পুলিশ ফাঁড়ি। পুলিশ ফাঁড়ি থেকে শরৎগুপ্ত রোড ধরে আট কি দশ মিনিটের হাঁটাপথে পৌঁছে যাওয়া যাবে তার বাড়ি।

পুলিশ ফাঁড়ির সামনে এসে আকন্দ সাহেব খেয়াল করলেন তিনি বসু বাজার লেনের দিকে যত এগিয়ে যাচ্ছেন, তার পা যেন কেউ ধীরে ধীরে শক্ত করে আটকে দিচ্ছে। তার পা কি মাটির নিচে দেবে যাচ্ছে! তার পা রাস্তার সঙ্গে আটকে যাচ্ছে। পা আটকে যাওয়ার কারণে তিনি আর হাঁটতে পারছেন না।

আকন্দ সাহেবের পা আর চলছে না। তিনি অন্ধকারে দাঁড়িয়ে পড়লেন।

কী আশ্চর্য!

রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে একসময় আকন্দ সাহেব বুঝতে পারলেন, তিনি একাই অন্ধকার রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছেন। অথচ তিনি পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছেন, তার হয়ে কেউ একজন শরৎগুপ্ত রোড ধরে ধীরে ধীরে হেঁটে চলে যাচ্ছে বসু বাজার লেনের দিকে। তিনি কেবল দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে লোকটার চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে থাকেন। লোকটা রাতের অন্ধকার কাটিয়ে আকন্দ সাহেবের কাছ থেকে দূরবর্তী হয়ে যাচ্ছেন। তিনি শুধু তাকিয়ে তাকিয়ে লোকটার চলে যাওয়া দেখছেন।

Leave a Reply