এই কবিতাটা কতোভাবে লিখি

লেখক:

বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর

লিরিক কবিতার অন্তর্ঘাতী চরিত্র নিয়ে আমরা কথা বলতে বলতে মধ্যরাত পার করি, কিংবা কফি খেতে খেতে আমরা জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্রের নিরাপত্তার অসম্ভব খিদের কথা বলতে বলতে ভোরবেলায় পৌঁছে যাই, কিংবা সুরাইয়া তোমার কি মনে আছে গুন্টার গ্রাসের কথা, কলকাতা থেকে ঢাকায় এসেছিলেন একদিনের সফরে, তাঁকে আমরা ধরে এনেছিলাম আমাদের সেন্টারে, তাঁর মুখে টিন ড্রাম কীভাবে লিখেছিলেন সে-কথা শোনার জন্য। টিন ড্রাম : নাৎসিদের পায়ের আওয়াজে সারা জার্মানি ভরে উঠেছে; ডানজিগ : স্বতন্ত্র স্বাধীন একটা বাণিজ্যবন্দর, বন্দরকে ঘিরে ধরেছে নাৎসিদের দ্রিমি দ্রিমি টিন ড্রামের আওয়াজ, সবাই ছুটে চলেছে উত্তরে কিংবা দক্ষিণে, পুবে কিংবা পশ্চিমে, যেদিকে আওয়াজ শোনা যায়। গুন্টার গ্রাস বই থেকে একপাতা দুপাতা পড়ছিলেন, অথবা মুখে বলে যাচ্ছিলেন টিন ড্রামের উন্মত্ততা। এই উন্মত্ততা তৈরি হলে সেখান থেকে সরে আসা যায় না, তাই না সুরাইয়া। টিন ড্রাম কি লিরিক কবিতার অন্তর্ঘাত কিংবা রাষ্ট্রের নিরাপত্তার অসম্ভব খিদে? গুন্টার গ্রাসের আর একটি বই, নাকি উপন্যাস, নাকি বিভিন্ন গল্পের সংকলন, নাম : আমার শতাব্দী, প্রকাশকাল : ১৯৯৯, সুরাইয়া তুমি আর আমি এই অসম্ভব বই পড়ে পাগল হয়ে গিয়েছিলাম। বইটি পড়েছি বার্লিনে, ইংরেজি অনুবাদে, একই বছরে। বইটি জার্মান ভাষায় প্রকাশিত হয়েছে, আর একই বছরে ইংরেজিতে। এই এক অসম্ভব বই উপন্যাস নাকি দার্শনিকতা নাকি কবিতা নাকি গল্পগুচ্ছ : বইটি শেষ করে বার্লিনের তুষারপাতের মধ্যে আমরা মাতালের মতো হেঁটে বেরিয়েছি। গুন্টার গ্রাসের ১৯৪৪-এ লেখা গল্প কিংবা উপন্যাস দুজনে মিলে ফের পড়ি; ‘শিগ্গির কিংবা কিছু পরে শো-ডাউন হবেই। বাতাসে তার গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে বলে নয়। একসঙ্গে এতগুলো মানুষ একত্র হলে টের পাওয়া যায়। তখন আমাদের আলাপচারীর একমাত্র বিষয় : রিট্রিট – ‘কিয়েভ’ এবং ‘লভুভ’, শত্রুর হাতে, আইভান মার্চ করছে ওয়ারশর দিকে… – যখন নেটুনো ফ্রন্ট ছোট হয়ে এসেছে, রোমের পতন হয়েছে যুদ্ধ  ছাড়াই, আর নরমান্ডি ইনভেসন অপ্রতিরোধ্য আটলান্টিক ওয়ালের  ঠাট্টা-মশকরা, যখন শহরের পর শহর বোমার ঘায়ে ছিন্নভিন্ন, যখন খাদ্য কোথাও নেই, যখন কয়লা চুরি করো না কিংবা দেয়ালেরও কান আছে পোস্টারগুলো পড়লে হাসি আসে, যখন আমাদের মতো নামজাদা রিপোর্টাররা ঠাট্টা-মশকরার মধ্যে মাথা গুঁজে থাকি, তখন  প্রপাগান্ডা ক্যাম্পেইনের কেউ কেউ যারা কখনো রণাঙ্গন দেখেনি, তারা নরম চেয়ারে বসে যুদ্ধের দিন কাটিয়েছে আর বেস্টসেলার লিখেছে, হিটলারের আস্তিনের তলায়, ‘মিরাকল ওয়েপনের’ কথা লিখে লিখে কলমের কালি শেষ করেছে।

গুন্টার গ্রাসের ১৯৭৫-এ লেখা গল্প কিংবা উপন্যাস দুজনে মিলে ফের পড়ি : বহুদূরের সাইগন পতনের ক্লোজ-আপ টিভিতে দেখি। শেষ আমেরিকানরা ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে তাদের দূতাবাসের ছাদ থেকে উড়ে পালাচ্ছে। এটা হচ্ছে প্রত্যাশিত তামামশোধ, কফি, কেক এবং পুডিং খেতে খেতে আলাপ করার বিষয় নয়। রেড ব্রিগেডদের টেরর ট্যাক্টিক্সের মতো অনুকরণীয় কিছু না, এই ট্যাক্টিক্স তারা স্টকহোমে কেবল নয়, যেখানে তারা হোস্টেস নিয়েছে, তাদের মধ্যে কেবল নয়, নিজেদের মধ্যে এই ট্যাক্টিক্স ব্যবহার করেছে স্টামহিমের বন্দিদের মধ্যেও, যেখানে পরের বছর উলরিখ মেইনওফ নিজেই নিজের গলায় দড়ি দিয়েছেন কিংবা নিজের সেলে কেউ তার গলায় ফাঁস দিয়েছে।

গুন্টার গ্রাসের ১৯৯৩-এ লেখা গল্প কিংবা উপন্যাস দুজনে মিলে ফের পড়ি : যখন তুমি নেহায়েতই একজন পুলিশ, তখন তোমার হাত বাঁধা। অবশ্য নীতিগতভাবে না। কয়েক বছর আগে, যখন আমাদের ও পশ্চিম জার্মানির মধ্যে সুরক্ষিত বর্ডার ছিল, তখন আমাদের সরকারের বিভিন্ন সংস্থা তাদের কাজ করেছে, অর্থাৎ আইন ও শৃঙ্খলা রক্ষা করেছে, তখন তোমাদের পাঁচ কিংবা ছশো স্কিন হেড ছিল না, যারা ভয়ঙ্কর দক্ষিণপন্থী, তারা ঘোরাফেরা করত বেইসবল ব্যাট হাতে নিয়ে, ঘোরাতে থাকত কোনো কালা চামড়ার লোককে সামনে পেলে। নিশ্চয়ই তুমি অনেককে শুনেছ পোলদের সম্বন্ধে গজগজ করতে, পোলরা আমাদের দেশে এসে যা দেখে সবই কিনে নেয়। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে যারা নাৎসি, সংগঠিত, রাইখ মিলিটারি পতাকা নিয়ে চলাফেরা করে, তাদের দেখা পাওয়া যায় শেষবেলায়, তাদের কথার তোড়ে বড় বড় কমরেডরা পেশাব করা শুরু করে। স্কিন হেডরা দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিম জার্মানিতে বসবাস করছে, তাদের উপস্থিতি স্বাভাবিক বলে ধরে নেওয়া হয়। কিন্তু যখন তাদের পূর্ব জার্মানিতে, আমাদের দেশে, দেখা যায়, প্রথমে হইয়ারসোয়ের ডায়, পরে আমাদের নিজস্ব রসটক – লিকটেনহাগেনে, কারণ বাসিন্দারা রিফিউজি সেন্টার, পাশের দরজায় ভিয়েতনামিজ শ্রমিকদের হোস্টেল দেখে ক্ষুব্ধ : আমাদের হাত ভালোভাবেই বাঁধা, তারা আমাদের মতো না, শীর্ষ ব্যক্তিরা মনস্থির করতে পারছে না। মানুষজন বলাবলি করছে টিপিক্যাল এবং পূর্ব গোলার্ধে এসব অসভ্যের দেখা মেলে, পুলিশরা অন্যদিকে চেয়ে থাকে। ঠিক তাই না? মানুষজন তাই বলাবলি করে। গুন্ডা-পান্ডাদের সঙ্গে আমাদের খোলামেলা সম্পর্ক আছে, এ সন্দেহ একেবারে অমূলক না। শেষমেশ মুলনে যখন আগুন লাগে, তিনজনকে হত্যা করা হয়, সলিন জেনে হত্যা করা হয় পাঁচজনকে, স্কিনহেড ফায়ার ট্যাক্টিক্স ছড়িয়ে যায়, নিখিল জার্মান ঘটনায় পর্যবসিত হয়, স্বাভবিক বলে ধরে নেওয়া হয়, মানুষজন এখন আর বলে না, এ ধরনের কান্ডকারখানা ইস্টেই দেখা যায়। যদিও এখানে রসটকে, ফুল এমপ্লয়মেন্ট, বিদেশিদের বিরুদ্ধে মানুষজনের কোনো অভিযোগ নেই, তবুও হাজার হাজার মানুষের ওয়ার্কফোর্স থেকে সাময়িকভাবে সরিয়ে নেওয়া হয়, বেকার করা হয়। মানুষজন খুশি, রায়টের পর থেকে রিফিউজি হোস্টেলগুলো খালি, কালা আর ভিয়েতনামিজরা উধাও, উধাও ঠিক না, তারা অন্য কোথাও আছে, তাদের দেখা পাওয়া যায় না।

 

দুই

জানো সুরাইয়া।

বলো।

তোমার শরীর আমাকে পাগল করে দেয়।

সুরাইয়া একটু হেসে বলে, তোমার শরীর আমাকেও পাগল করে দেয়।

আমরা দুজনই এখন স্বাধীন।

এই স্বাধীনতা দেশে পাইনি।

দেশে আমরা ভয়ে ভয়ে থাকতাম।

কে দেখল, কে কী ভাবল।

এখানে কেউ দেখে না, কেউ ভাবে না।

আমরা নিজেদের মধ্যে স্বাধীন হয়ে আছি।

 

তিন

আমরা নদী দেখে দেখে, গাছপালা দেখে দেখে, পাখপাখালি দেখে দেখে, স্বাধীন হয়ে যাই। টেমস আমাদের স্বাধীন করে দেয়, সেন আমাদের স্বাধীন করে দেয়, রাইন আমাদের স্বাধীন করে দেয়। এই স্বাধীনতা বুড়িগঙ্গা আমাদের দেয়নি, শীতলক্ষ্যা আমাদের দেয়নি। আমাদের নদীগুলি মরে যাচ্ছে, যেমন আমরা মরে যাচ্ছি আমাদের ভিতর।

দেশের বাইরে এসে আমরা জেগে উঠেছি। আমাদের চোখে গাছপালাগুলি তরুণ হয়ে চারদিকে ডালপালা মেলে ধরেছে। আমাদের শরীর তরুণ গাছের মতো চারদিকে হাত বাড়াচ্ছে। মনে হয় আমি সুরাইয়ার হাত ধরে এক স্পেস থেকে অন্য স্পেসে উড়ে চলেছি। সুরাইয়া আমার হাত ধরে নতুন এক মহাদেশ তৈরি করেছে।

সুরাইয়া।

কি?

তোমাকে দেখে মনে হয় কখনো তুমি ঘুমাও না।

জাবীন।

বলো।

তোমাকে দেখে মনে হয় সারারাত তুমি আমার দিকে চেয়ে থাকো।

হ্যাঁ তাই। তুমি ঘুমালে আমি হারিয়ে যাব। তুমি না জেগে থাকলে আমি মরে যাব। অথচ আমাদের কোনো ক্লান্তি নেই। আমরা দুজনই ক্লান্তিহর। আমরা ভাবি : আমরা দুজনই চিরকালের তরুণ।

 

চার

যারা বিজ্ঞানী তারা পৃথিবী নিয়ে ভিন্নভাবে ভেবেছেন। তারা নতুন কিছু উদ্ভাবন করেছেন, তারা নতুন কিছু আবিষ্কার করেছেন। তারা কি আমাদের জানিয়েছেন : কেন আমরা পরস্পরের দিকে জেগে থাকি। জেগে থাকার মতো উদ্ভাবন নেই। জেগে থাকার মতো আবিষ্কার নেই। সেজন্য ঈশ্বর জেগে থাকেন।

আইনস্টাইন ঘুমাননি বলে হিটলারের আমলকে তুড়ি মেরে প্রিন্সটন চলে যেতে পেরেছেন।

ওয়ালথার নারনস্ট ইহুদিবিরোধী পলিসির বিরোধিতা করেছেন, তার ডিপার্টমেন্ট সেজন্য পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। ফ্রিটজ হাবারকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিতাড়িত করা হয়েছে ইহুদি বলে। শেষ পর্যন্ত সুইজারল্যান্ডে পালিয়ে গিয়ে তিনি রক্ষা পেয়েছেন।

আর ম্যাক্সপ্ল্যাঙ্ক? তিনি হিটলারের সঙ্গে দেখা করে তাকে অনুরোধ করেছেন বিজ্ঞানীদের হেনস্থা না করার জন্য। হিটলার তাকে দূর-দূর করে তাড়িয়ে দিয়েছেন। মহাযুদ্ধের পুরো সময়টা ম্যাক্সপ্ল্যাঙ্ক তার স্ত্রীকে নিয়ে গভীর অরণ্যে, যেখানে আলো নেই, কেবল বাতাসের গর্জন, সেই অন্ধকার অরণ্যে পালিয়ে বেরিয়েছেন।

ঈশ্বরকে সেজন্য জেগে থাকতে হয়। সেজন্য আমাদেরও জেগে থাকতে হয়। তাই না সুরাইয়া, তাই না জাবীন।

যারা উদ্ভাবন করেন তারা ঘুমান না। আমরা ভালোবাসা উদ্ভাবন করেছি, আমরা ঘুমাই না। ঘুমালে আমরা পরস্পর থেকে চোখ ফিরিয়ে নেব। আমাদের কেউ রক্ষা করতে পারবে না।

 

পাঁচ

জাবীন।

বলো সুরাইয়া।

সব কথা কি মনে থাকে তোমার?

কিছু কথা মনে থাকে। কিছু কথা থাকে না।

সুরাইয়া।

বলো।

সব কথা কি তোমার মনে থাকে?

থাকে না। কিন্তু কিছু কথা মন থেকে কখনো হারিয়ে যায় না।

বলো, বলো। সেই কথা বলো।

তোমার রউফের কথা মনে আছে। তোমার বন্ধু রউফ। আমার বন্ধু রউফ।

মনে আছে।

রউফের স্ত্রী আমার খুব ঘনিষ্ঠ ছিল। জীবনের সব কথাই খুলে বলত।

রউফও সব কথা আমাকে বলত।

রীনা, রউফের বউ, ওর ইচ্ছা ছিল রউফ বড়মাপের পেইন্টার হবে। রউফ মাঝারি মাপের পেইন্টার ছিল। এই অবস্থানটা রীনাকে খুব কষ্ট দিত। আর একটা ব্যাপারে রীনার খুব কষ্ট ছিল। রীনা চাইতো শরীরের দিক থেকে রউফ ওকে তুষ্ট করে রাখবে। সেদিক থেকেও রউফ ব্যর্থ। দুই ব্যর্থতা রীনাকে দূরে ঠেলে দিয়েছে রউফের কাছ থেকে। তোমাদের গ্রিন রোডের কলোনিতে, আমি মাঝে মধ্যে যেতাম। সে তো তুমি জানই। রউফেরও ওখানে একটি ফ্ল্যাট ছিল। রীনা খুব কম সময় ফ্ল্যাটে থাকত। গ্রিন রোডের রাস্তার দুপাশে ছোট ছোট চায়ের দোকান ছিল। আর ছিল একটি মাঝারি আবাসিক হোটেল। রীনা ভালো গান করত, আর ওই হোটেলে পড়ে থাকত। সেখানে তার বহু বন্ধু জুটে যায়। বন্ধুদের সঙ্গে সে মদ খাওয়া শুরু করে। ওই হোটেলটায় আর একটা আড্ডা হতো : রাজনৈতিক আড্ডা। আওয়ামী লীগ, কমিউনিস্ট পার্টি, ভাসানী ন্যাপের ছাত্র সংগঠনগুলো হোটেলের পিছন দিককার দুটি ঘরে দেশকে স্বাধীন করার পথ নিয়ে তর্ক-বিতর্ক করত, কিছু কিছু অস্ত্রশস্ত্র ডাম্প করত। পাকিস্তান মিলিটারি ইনটেলিজেন্স হোটেলটার ওপর সহস্র চক্ষু বিস্তার করে রাখত। যে রাতে, ২৫ মার্চে, ঢাকা শহরে, পাকিস্তান মিলিটারি, ট্যাঙ্ক নিয়ে আগুন জ্বালাতে জ্বালাতে, সারা শহর ভস্মস্তূপে পরিণত করেছে, সে-রাতে গ্রিন রোডের এই হোটেলটা ট্যাঙ্ক ও মেশিনগানের গুলিতে ঝাঝরা হয়েছে। আগুনে পুড়েছে হোটেল, ছাত্ররা পিছন দিক দিয়ে কাঁঠালবাগানের নানা গলির ভিতর সরে গেছে, শুধু সরেনি রীনা, অগ্নিদগ্ধ হয়ে, নিজের শরীর ছাই করেছে বাংলাদেশের উদ্ভিদ্যমান মানচিত্রের মতো। রাস্তার ওপারে, কলোনি, সেখান থেকে ‘রীনা রীনা’ করে দৌড়ে এসেছে রউফ স্ত্রীকে বাঁচাতে। রউফ রাস্তার এপারে মেশিনগানের গুলিতে ঝাঝরা হয়ে রাস্তায় দুদিন পড়ে ছিল, আর রাস্তার ওইপারে অগ্নিদগ্ধ হোটেলে ছাই হয়ে দুদিন পড়ে ছিল রীনা। এভাবে বাংলাদেশের জন্ম হয়েছে।

জানো জাবীন। জানো সুরাইয়া। এভাবে আমরা একটা জাতিতে পরিণত হয়েছি।

 

ছয়

আমরা কি আমাদের জীবনে যা-কিছু ঘটে, সব ভুলে যাই। সুরাইয়া তুমি কি তোমার জীবনের সব ঘটনা ভুলে গেছ। তোমার বিবাহিত জীবন বাতিল করার পর তুমি এবং আমি যখন স্বাধীন জীবনে পা বাড়াই, তখন সব ঘটনার মধ্যে আমরা অভিনব কিছু খুঁজে পাই। গুন্টার গ্রাস কি তাই পাননি যখন তিনি লেখেন টিন ড্রাম কিংবা আমার শতাব্দী। আমরা যখন রীনা এবং রউফের জীবনের দিকে ফিরে তাকাই তখন কি আমরা ভিন্ন কিছু খুঁজে পাই না। ব্যক্তিগত জীবন থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধের অন্য অর্থ আমাদের কাছে ধরা পড়ে। কোনো কিছু ভোলা যায় না। গুন্টার গ্রাস যেমন কোনো কিছু ভুলতে পারেন না, নাৎসি জার্মানির বিজ্ঞানীরা যেমন কোনো কিছু ভুলতে পারেন না, আমরাও তেমনি জীবন থেকে ভিন্ন অর্থ খুঁজে পাই। ভুলতে না পারাটাই ইতিহাস।

 

সাত

রণজিৎ এবং সোনালি : তাদের দুই ছেলে নিখিল ও বিক্রমকে নিয়ে যখন সুনামির ঢেউয়ের মধ্যে হারিয়ে যায়, তখন, কিছুদিন আমি এবং সুরাইয়া, ঘুমাতে পারিনি। সুনামির অর্থ কি মৃত্যু মহাকাল শূন্য বিলীন হওয়া। সুরাইয়া এবং আমি, রাত্রির দিকে হাত বাড়িয়ে, সোনালি এবং রণজিৎ, তাদের দুই ছেলে নিখিল ও বিক্রমকে, খুঁজতাম, যদি তাদের ঈশ্বর যেখানে থাকেন সেখানে খুঁজে পাই। সোনালি এবং রণজিৎ আমাদের সিংহলি বন্ধু, তাদের দুই ছেলে : নিখিল ও বিক্রমকে নিয়ে সুনামির তরঙ্গের মধ্যে সাঁতার কেটে কেটে ঈশ্বরের বিশাল তরঙ্গের ভিতর প্রত্যহ হারিয়ে যায়।

এই ইতিহাস কখনো উদ্ধার করা যায় না।

 

আট

জীবন অনেক লিরিক কবিতার জন্ম দেয়।

আমরা সেসব পড়ে পড়ে মৃত্যুর দিকে এগোই।

মৃত্যু এক ধরনের লিরিক কবিতা।

এই কবিতাটা কতোভাবে লিখি।