একজন কলগার্লের বায়োস্কোপে ভাসা কৈশোর

লেখক:

কা জী রা ফি

শহর ছেড়ে দূরে ঐতিহাসিক ভিমের জাঙ্গালের বিস্তৃতির ওপর, টিলামতো উঁচু অংশে তিন মেয়ে আর এক ছেলে সন্তানের জনক ফয়েজের দোচালা টিনের বাড়ি। এই বাড়ির চারপাশের প্রকৃতির অবগুণ্ঠনে লুকিয়ে। থাকা ছন্দপ্রবাহ ছোটবেলা থেকেই তার মেজ মেয়ে মালিহাকে নাচের প্রতি উৎসাহিত করে থাকবে হয়তো। বাড়িটার পুবে এককালের প্রমত্তা কলুতু আর বর্তমানের শুকিয়ে খালের আকার ধারণ করা করতোয়ার সঙ্গে অবনমিত ভূমির মাখামাখি। নি¤œমধ্যবিত্ত এই পরিবারের তিন কন্যার মধ্যে বড় মেয়ে সালমা পেয়েছে কিছুটা বাবার আদল; কিন্তু মেজ মেয়ে মালিহা এবং তৃতীয় মেয়ে হেলেনা তাদের মা সালেহার মতো। মালিহা এবং হেলেনার চুলে বাঙালি নারীর মতো ঢেউখেলানো মেঘ, আর চোখগুলো অন্ধকারে বিদিশার নেশা লুকানো থাকলেও তাদের গায়ের রং, শরীরের গড়ন দেখে তাদের এদেশীয় নি¤œবিত্ত কোনো পরিবারের মেয়ে ভাবতে ভুল হয়।
মালিহার সহজাত নাচের প্রতিভা এবং জাতীয় পর্যায়ের একটা স্কুলকেন্দ্রিক নাচের প্রতিযোগিতার সাফল্য তাকে স্কুলের শিক্ষকদের কাছেও প্রিয়ভাজন করেছে। পড়াশোনায় তার মাথাটা খুব ভালো না হলেও শিক্ষকদের এই স্নেহের কারণে মালিহাকে স্কুলের পাঠ নিয়ে সচেতনও থাকতে হয়। পরিবার চালাতে আর্থিক টানাহেঁচড়া থাকলেও ফ্যাক্টরির মেশিন অপারেটর ফয়েজের জীবন বিশেষত তার মেয়েদের নিয়ে কাটছিল বেশ আনন্দে আর শান্তিতে। তার খুবই প্রিয় ইলিশ মাছ সে না কিনতে পারলেও তার তিন কন্যা আর এক ছেলের কাছে সন্ধ্যায় ঘরের নিশ্চিত শান্তির মাঝে সে-জীবনটার অনেকরকম অর্থ খুঁজে পায়। বর্ষায় বৃষ্টির ঢল নামলে ভোররাতে সে তার উঁচু ঢিবিটার নিচের দিকে প্রবাহিত ভূমির খাল থেকে অনেক মাছ ধরে বাড়িতে ফিরলে সেদিন বাড়ি ‘উৎসব’-‘উৎসব’-আনন্দে ভরে ওঠে। আর কোনো পূর্ণিমার রাতে রাতের খাবারের পর টিলার মতো উত্তর-দক্ষিণে প্রবাহিত তার উঁচু বাড়িটার সামনে সে টুল, চেয়ার অথবা বেতের মোড়া সাজিয়ে মেয়েদের ডাকে। ছোট্ট জাহাঙ্গীর তখন ঘুমায়। জোছনার রুপালি আলোয় তাদের কথোপকথন বাতাসের কানে কানে ফিসফিস হয়ে ছড়িয়ে যায়, হারিয়ে গিয়ে প্রতিধ্বনির মতো ফিরে আসে মাঠের ধানক্ষেতের ম-ম গন্ধ নিয়ে। তাদের বাবা-মেয়ের ছোট ছোট স্বপ্ন আর আশা মধুর গল্পকথার পানশি হয়ে ফিরে আসে তাদের স্বপ্নের মতো দোচালা বাড়ির ঝকঝক, শিশিরের হিম বুকে ধারণ করা টিনের চালে। ফয়েজ বলে,
মা রে! আমি তোদের ইচ্ছামতো কাপড়, ক্লিপ-ফিতা, জুতা-স্যান্ডেল কিনতে পারি না। কতদিন চেষ্টা করেও বাজার থেকে ইলিশ এনে তোদের খাওয়াতে পারি না; কিন্তু তা-ও মনে হয় আমার চেয়ে সুখী আর কেউ নয়। কলেজ-পড়ুয়া সালমা তার বাবার কথার পিঠে কথা জোড়ে,
তুমি মন খারাপ করো না তো! ডাল-ভর্তা খেয়েও এই যে আমরা জোছনারাতে, খোলা বাতাসে এখানে বসে আছি, আমাদের নিশ্চিত, একটা আশ্রয় আর আমাদের এত সুন্দর নিরিবিলি জায়গায় একটা বাড়ি আছে – এর চেয়ে সুখ আর কী আছে বাবা! মেয়ের কথায় ফয়েজের জীবনটা তার কাছে দারুণ অর্থবহ হয়ে ওঠে। সে আবেগাপ্লুুত হয়।
তার কিছুদিন পর এক পূর্ণিমার জোছনারাতে মালিহা বলল,
বাবা, কাল স্কুলে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে আমার নাচ আছে। তুমি আসবে না?
না, মা! আমি সামান্য মানুষ। জানি, তুই অনেক ভালো নাচিস। আমি যাব, তোর মা যাবে না – দেখতে খারাপ দেখাবে। এত ভালো নাচে যে-মেয়ে, তার বাবা-মায়ের সমাজে ভালো একটা অবস্থান থাকলে ভালো হতো।
যাও! মা-বাবার চেয়ে বড় আর কী হতে পারে?
না, মা। আমি বাড়ি থেকেই উপলব্ধি করব যে, নাচশেষে আমার মালিহার জন্য হাততালিতে ভরে উঠেছে অডিটরিয়াম!

মালিহা তখন অষ্টম শ্রেণিতে। কলেজের প্রথম বর্ষের ছাত্রদের জন্য নবীনবরণ অনুষ্ঠান। সন্ধ্যার সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে মালিহা নাচছে। তার সহপাঠী রৌদ্রের পাশে বসে তাদের কলেজের প্রথম বর্ষের এক ধনীর বখাটে দুলাল মালিহাকে পেতে কী কী করতে হতে পারে – এই নিয়ে পেছনের সিটে বসা বন্ধুদের সঙ্গে মশকরায় মশগুল, তখন রৌদ্র তার সিনিয়র ভাইয়ের কলার টেনে ধরে হট্টগোল পাকাল,
আপনার বোন নাই? তার সঙ্গে করেন… আমাদের স্কুলের বোনদের দিকে ওভাবে তাকান ক্যান?
সেখানে গন্ডগোল বাধার মতো পরিস্থিতি তৈরি হতেই বাংলার শিক্ষক এগিয়ে এসে তা সামাল দিলেন। কিন্তু রাতে বাড়ি ফেরার পথে সিনিয়র ছেলেটা কলেজের কয়েকজনকে নিয়ে রৌদ্রের পথ আটকে ধরে তাকে কিল, ঘুষি আর লাথি দিলো। ধনীর দুলালটি তাতেও সন্তুষ্ট না হয়ে পাশ থেকে পরিত্যক্ত এক ইট তুলে নিয়ে তার মাথায় আঘাত করতেই রৌদ্রের মাথা ফেটে গলগল রক্ত ঝরল। সেই রাতে বাবাকে সঙ্গে নিয়ে নাচের পোশাকে মালিহা অনেক রাত পর্যন্ত রৌদ্রের বিছানার পাশে বসে থাকল। মাথায় ব্যান্ডেজ নিয়ে কিশোর আবেগের রোগে আক্রান্ত রৌদ্র এমন করে মালিহার দিকে তাকাল, যেন মালিহার সঙ্গে নাটকের কোনো দৃশ্যে সে অভিনয় করছে। এই নাটকের জন্য তার মাথা ফাটানোটা প্রয়োজন ছিল। তার জন্যই মালিহার চোখ ছলছল করে উঠছে দেখে ধনীর দুলালকে রৌদ্র শুধু ক্ষমাই করল না, তার প্রতি উলটো কৃতজ্ঞ হয়ে উঠল। তারপর থেকে জীবনে যতবার রৌদ্র রাতে ঘুমের ঘোরে, স্বপ্নের আবেশে নাচের পোশাক পরে থাকা এক নারীকে দেখেছে, ততবার তার হৃদয় রোদ হয়ে উঠতে চেয়েছে। মালিহার জন্য তার ভেতরের তপ্ত উষ্ণতায় লুকিয়ে রাখা ভালোবাসাকে সে নিজের জন্যই শুধু রৌদ্রময় করে তোলেনি, তার আলো ছড়িয়ে দিয়েছিল সে তার স্কুল-কলেজের সকল ছাত্র-শিক্ষকের হৃদয়ে। স্কুলটি থেকে এর আগে কেউ-ই বোর্ড-স্ট্যান্ড করতে না পারলেও রৌদ্র হয়তো মালিহার কাছে রোদ হয়ে ওঠার জন্য সেবার এসএসসি পরীক্ষায় বোর্ডে পঞ্চম স্থান দখল করল।
এই নিয়ে যখন মালিহার মনেও এক ধরনের চুপ-চুপ আর কলকল স্রোত বয়ে চলছে, তখন মাঠ-প্রকৃতির মাঝে লুকিয়ে থাকা ফয়েজের এই বাড়িটার আশপাশে বাড়িঘর তেমন একটা চোখে না পড়লেও এই বাড়িটার ওপর চোখ পড়ল শহরের নবনির্বাচিত কমিশনার ও ভূমিদস্যু বাসেতের। সে শহরের মাদকসম্রাট মোহনের কাছে গিয়ে অমন সুন্দর একটা জায়গায় সামান্য এক ফ্যাক্টরির মেশিন অপারেটরের বাড়ি থাকা কতটা নৈতিক – এমন প্রশ্ন তুলতেই মোহন তাকে দ্বিধাহীন কণ্ঠে বলল,
খ্যায়া ফ্যালা…
সুতরাং উচ্ছেদ করে বাসেত তাকে পরিবারসহ শহরের পাশে এক পরিত্যক্ত স্থানে মাথা গোঁজার ঠাঁই করে দিলো। অভাব-অনটনের সংসারে ভিমের ওই বাড়িটাই ছিল ফয়েজের একমাত্র আশা। বড় মেয়েকে বিয়ে দিতে গিয়ে ফয়েজ হাড়ে হাড়ে টের পেল, বাসেত তার কী সর্বনাশটাই না করেছে! তবু সালমার বিয়ে হলো তার চেয়ে কম উচ্চতার একটা অর্ধবয়সী মানুষের সঙ্গে। বিয়ের পাঁচ মাসের মাথায় সালমা জানল, তার স্বামীর আরো দুটি স্থানে দুই পরিবার আছে। পরিশেষে স্বামীর মুখোশের আড়ালে আসল ব্যক্তিটি বের হয়ে এলো। বিয়ের অন্তরালে স্ত্রীদের অর্থ উপার্জনে বাধ্য করা তার পেশা। মেয়ের ভোগান্তির কথা গোপনেই জানল ফয়েজ এবং তারপর থেকেই সে খুব আনমনা হয়ে গেল। তার নতুন করে শুরু হওয়া এই আনমনা স্বভাবের জন্য একদিন ফ্যাক্টরির মেশিনে সময়মতো ডিজেল না ঢালায় মেশিন বন্ধ হয়ে গেল। মেশিন বন্ধের কারণে মাত্র নিজস্ব আকৃতি ধারণ করা প্ল­াস্টিকের বিভিন্ন সামগ্রীর গুণগত মান খুব খারাপ হয়ে গেল। ম্যানেজার তাকে ডেকে মালিকের সামনে হাজির করাল। ফুঁসতে ফুঁসতে ফ্যাক্টরির মালিক তাকে বলল,
মেয়েকে আর কতভাবে ভাড়া খাটিয়ে উপার্জন বাড়ানো যায় সেই ধান্দায় আছিস? হারামখোর! তিন মেয়ে মানে তুই তো এখন তিনটা ফ্যাক্টরি-মালিক। ফ্যাক্টরি চালু করে বসে বসে খা… চাকরি করার আর দরকার কী?
ফয়েজকে বাসেত যেদিন তার বাস্তুভিটা থেকে উৎখাত করেছিল সেদিনও তার বুকে এত তীব্র চিনচিন রক্তস্রোত ঝরেনি। এক বৃহস্পতিবার সাঁঝের আলো-অন্ধকারে চুপচাপ বাড়ি ফিরছিল ফয়েজ। অন্ধকার পেরিয়ে বাঁ-মোড় নেওয়া রাস্তাটায় উঠতে গিয়েই ঘটল অঘটন। ভাঙা হেডলাইটের মোটরসাইকেল আরোহী নবীন-কিশোর চালক ফয়েজকে অন্ধকারে তার গায়ের ওপর দিয়ে মোটরসাইকেল চালিয়ে দিলো।
অজ্ঞান অবস্থা থেকে ফয়েজ যখন জাগল তখন সে সরকারি হাসপাতালে সাধারণ এক ওয়ার্ডে নিজেকে আবিষ্কার করল। পা নাড়াতে গিয়ে সে জানল যে, তার দুটা পা-ই ভেঙে গেছে। এটুকু জানার পর, শরীরের ব্যথার চেয়ে তার পরিবার কীভাবে বেঁচে থাকবে এই ভাবনা তাকে অস্থির করে তুলল। তার চোখের কোণ বেয়ে অশ্রু গড়াল। ইশারায় মেয়েকে কাছে ডাকলেও সালমা তার থেকে পুনরায় এমন দূরত্বে দাঁড়াল যে, ফয়েজ হাত বাড়িয়েও তার নাগাল পেল না। মেয়ের হাত ধরতে চাইলেও সে নিজের হাত আরো গুটিয়ে তা আড়াল করে আবেগ লুকাল। মেয়ের অমন অভিব্যক্তিতে সে নিজের দুর্বল আঙুলগুলো শুধু নাড়াল। তারপর চাদরের নিচে নিজের হাতটা ঢুকিয়ে মুখ ঘুরিয়ে জানালা দিয়ে বাইরে, দূরের সবুজ মাঠের দিকে নিষ্পলক তাকিয়ে থাকল। চোখে তার ফ্যালফ্যাল আর নিষ্পলক দৃষ্টি।
তারপর এক বছর তিন মাস তেরো দিন, বেঁচে থাকার এই সময়টুকু ফয়েজের সেই ফ্যালফ্যাল, নিষ্পলক দৃষ্টির কোনো পরিবর্তন হয়নি। চোখ খোলা রেখেই সে ঘুমাত। ক্র্যাচে ভর দিয়ে তার জন্য বানানো টয়লেটে তাকে বসিয়ে দিলেও তার দৃষ্টির কোনো পরিবর্তন হতো না।
দুই
সালমা বাবার দুর্ঘটনার পর স্বামীর ঘরে আর ফিরল না। স্বামীকে তালাক দিয়ে সে নিজে সংসারের হাল ধরল। মোবাইলে পরিচিত পুরুষদের সঙ্গে কথা বলে সেজেগুজে যখন মাথা নিচু করে সে বাবার ফ্যালফ্যাল আর ভাষাহীন দৃষ্টির সামনে দিয়ে বাইরে যায়, তখন ফয়েজের বুকের ভেতর কেমন চিনচিন ব্যথার স্রোত বয়ে যায়। কিন্তু সালমার সঙ্গে মিশতে গিয়ে তারা জেনে গেল মালিহার কথা। সালমা অনেক চেষ্টা করেও নতুন করে তাদের নিজের কাছে আর টানতে পারল না। কিছুদিন ইশারা-ইঙ্গিতে বোঝানোর চেষ্টা করে, পরিশেষে সালমার সঙ্গে নিয়মিত মেলামেশা করে এমন কয়েকজন স্পষ্টত মালিহাকে চাইল। উপায়ান্তর হয়ে সালমা বাসেতের কাছে গিয়ে সাহায্য চাইলে বাসেত বলল,
তুমি সেদিন কী কচ্চিলা যেন? তোমাগেরে দলিল পাওয়া গেচে? সালমা দলিলের কথা তাকে বলতে চায়নি। সালমা বুঝতে পারছে না, বাসেতের মতলবটা কী? সে কি তাদের জায়গাটা ফেরত দিতে চায়? সে মাথা থেকে ওড়নাটা বুকের ওপর ভালো করে ফেলে দুহাত বুকে আড়াআড়িভাবে রেখে বলল,
জায়গাটা তো তুমি আর ফেরত দিবা না…
হামি তাই-ই চাচ্চি। জাগাটা তুমরা ফেরত ল্যাও…
কী… মা… নে, সত্যি?
সত্যি। কিন্তুক শত্ত আচে, মা-জননী।
কী?
হামার করা বাসার খরচডা তো দেয়া লাগবি।
অত টাকা আমরা কই পাব?
একদিনে তো ট্যাকাডা শোদ দিবার কচ্চি না। মাসে মাসে, অ্যানা অ্যানা কর্জো শোদ করো। তোমরা দুই বোন মিল্যা একসময় তো কামাই কম করবা না। সালমার এবার গা রি-রি করে উঠল। বাসেতের কথায় সালমার চোখের ভাষা বদলে গেল।
ওই জায়গা না পেলে কিছু আসে যায় না। কিন্তু হেলেনাকে নিয়ে কেউ বাজে চিন্তা করলে… সালমার রাগকে প্রশমিত করতে বাসেত দ্রুত তার বাক্য শুধরে নিল। বলল,
সে তো ভালো কতা। আচ্চা, ঠিক আচে, মা। আল্ল­াহ হামাক ম্যালা দিচে…
চাচা, আমি তোমার কাছে কৃতজ্ঞ যে, তুমি জায়গাটা বাড়িসহ বিক্রি না করে আমাদের কাছেই ফেরত দিতে চাইছ। আমি চেষ্টা করব, তবু সব মাসে হয়তো ট্যাকা শোধ করতে পারব না।
আহ রে, বাবা! তোমাক হামি কি কচ্চি? যকন য্যাংকা করা পারো…
একটা শর্ত…
কও…
বাসাটা তাহলে আমাদের এই মাস থেকেই ছেড়ে দিতে হবে। ওটা না পেলে, টাকা শোধ করা কঠিন হবে।
তুমি ল্যাও না ক্যান, কালই উট্যা যাও…
সালমার চোখ চকচক করে উঠল। সারাজীবন তার কোনো অর্জন তো নয়ই, প্রাপ্তিও নেই। সে আজ এ-মুহূর্তে যেন এক রাজ্য জয় করে ফেলল। বাসেত মনে হয় সালমার উচ্ছ্বসিত মনের অলিন্দে ঢুকে কোনো যন্ত্র দিয়ে তার উচ্ছ্বাস মেপে নিল। বলল,
দুনিয়াত ট্যাকা কামান সবচে সহজ, বুজলা? বোকারা ট্যাকা ট্যাকা কর্যা মরে, কিন্তুক ওডার খোঁজ পায় না। ওগলান বেকুব মানুষ, আবেগ আর বিবেক লিয়া আচে।
অনেক টাকা চাই না চাচা। আপনার বানানো বাড়িটার দাম শোধ করতে পারলেই জীবনে আর কিছু চাই না। যেখানে থেকে বাকি জীবন ডাল-ভাত খেয়ে মরে যেতে পারলেই আমি খুশি।
কথাগুলো বলার সময় সালমা তার শৈশবের বাড়িটা থেকে জানালা দিয়ে দূরের মাঠের দিকে তাকিয়ে থাকার কল্পনায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ল। আশ্রয়! একটা নিশ্চিত, নিরিবিলি আশ্রয় প্রয়োজন। সমাজকে সে এখন থোড়াই কেয়ার করে। সমাজের মানুষগুলোকে তার চেনা হয়ে গেছে। সে কল্পনার আতিশয্য থেকে বের হয়ে প্রশ্ন করল,
কও, বাড়ি তৈরি বাবদ আমাদের কত টাকা দিতে হবে?
ওডা বানাতে হামার খরচ হচে পঁয়ত্রিশ লাক। খুব কমই কতে পারো।
পঁয়ত্রিশ লাখ!
আজকাল এডা কোনো ট্যাকা হলো?
কারো কারো জন্য হয়তো নয়, আমাদের জন্য অনেক টাকা।
হামার বুদ্দি শুনলে এই ট্যাকা তুমি সহজেই কামাবার পারবা।
কীভাবে?
ব্যবসা করো না ক্যা?
ব্যবসা? আমার তো ব্যবসা করার টাকা নাই, চাচা।
এই ব্যবসা করতে ট্যাকা লাগে না, তুমি রাজি কি-না তাই কও।
আগে শুনি, ব্যাপারটা কী?
বাসেত পাঞ্জাবির ভেতর বানানো লম্বা পকেট থেকে একটা পলিথিনের থলে বের করল। আশপাশ ভালো করে দেখে নিয়ে থলের ভেতর থেকে বিভিন্ন রঙের ট্যাবলেট বের করল। সালমা কোনোদিন এগুলো দেখেনি। তবু আন্দাজে বলল,
ইয়াবা!
ওষোদ কও। এগুলাক ইয়াবা কও ক্যা? এডা ভালো ওষোদ। শোনোনি, যুদ্দের মাটত এডা খাওয়া লাগে? হাজার হাজার ধ্বজভঙ্গ পোলাপানরে যে-জিনিসডা আনন্দ দেয়, তার থ্যাকা ভালো জিনিস আল্লাহর দুনিয়াত আর কী আচে? এডার নাম হওয়া উচিত বেহেস্তি ওষোদ।
কিন্তু…
আর কিন্তুক কিন্তুক কর্যো তুমি ক্যামা খামোকা সময় লষ্ট করিচ্চ, সালমা। বাংলাদ্যাশত কোনটে খাঁটি জিনিস পাবা, তুমি কও তো? সব খাবারত যত ফরমালিন আর ভ্যাজাল, ওর থ্যাকা ইয়াবা খ্যায়া থাকা ভালো, মা গো!
না, র‌্যাব-পুলিশ…
পাগলি! ওরা ছাড়া এই ব্যবসা কি ইমনি-ইমনি মাথা কাটা ঘোড়ার মতো দৌড়াচ্চে? যাউক, অগলান চিন্তা বাদ দিয়া তুমি আটাপাড়ার দায়িত্ব ল্যাও। ওটি থ্যাক্যা মাসে কামায় হয় লাখ টাকা। হামার অদ্দেক, তোমার অদ্দেক।
বাসায় ফিরে সে প্রথমে পলিথিনের ভেতর থেকে ইয়াবার থলে বের করল। ভালো করে খেয়াল করে দেখল, কয়েক স্তরের পলিথিন পেরিয়ে বৃষ্টির জল থলেটা স্পর্শ করতে পারেনি। সে চাবি এনে ট্রাঙ্কের তালা খুলে দলিলের সঙ্গে ইয়াবাভর্তি থলেটা রেখে দিলো। ঠিক তখনই ক্ব-ক্ব-র-ক্বর-ক্বরাত শব্দে আকাশ-মর্ত্য বিদীর্ণ করা আলোর ঝলকানির সঙ্গে তীব্র শব্দের বজ্রনিনাদ পৃথিবীকে যেন এফোঁড়-ওফোঁড় করে দিলো। মালিহা চৌকির একপ্রান্তে ছোট্ট জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে ছিল। তার ল্যাপটপের স্ক্রিনে ফেসবুকের পাতায় মালিহার প্রোফাইল খোলা। টুং-টুং শব্দ করে বিভিন্নজনের বার্তা এসে পাতার নিচের মেসেজবক্স ভরে যাচ্ছে। সেদিকে একবার তাকাল সালমা। ফিকে লাল পাড় আর কচুপাতা বর্ণের শাড়িতে আরো আকর্ষণীয় করে তোলা সরু কোমর, ভারী নিতম্বের সঙ্গে কাজল চোখের নিষ্পাপ চাউনির একটা মেয়ের কাঁধের ওপর দিয়ে পেছনে তাকানোর ছবি দেখে সালমা থমকে দাঁড়াল। তারপর নিচু হয়ে ছবিটার দিকে নিবিষ্ট হয়ে তাকিয়ে থেকে বোঝার চেষ্টা করল, অমন মনকাড়া সৌন্দর্যের মেয়েটা কে? বজ্রনিনাদের পর থেকে বাইরের তুমুল বৃষ্টি বাইরের সমগ্র পৃথিবীকে যেন তার ঝমঝম শব্দ শোনানোর জন্য স্থির আর স্তব্ধ করিয়ে দিয়েছে। সালমা ছবিটা থেকে চোখ তুলে জানালার কাঠের পাল্লায় অবশ হাত রাখা, বৃষ্টিতে – বৃষ্টির ঝাপটায় প্রায়-অদৃশ্য আর যুগ-যুগান্তরের শব্দ-মগ্নতায় বিলীন বাইরের বাঁশবাগান আর চরাচরের পানে উদাস তাকিয়ে থাকা বিষণœ মালিহাকে বলল,
ছবিটা কার রে? কিন্তু প্রথম ডাকে মালিহার ধ্যান ভাঙল না। দ্বিতীয়বার তাকে ডাকার পর শব্দটা তার কানে প্রবেশ করলেও মালিহার ঘোর কাটল না। সালমা কাছে বসে তার দুই বাহু দিয়ে ঝাঁকুনি দিতেই মালিহা অশ্রুর বিস্ময়ভরা চোখে অবাক হয়ে তাকে দেখল। দেখতেই থাকল। সালমা বলল,
কী হয়েছে? সালমার প্রশ্নের উত্তরে সে শুধু মাথা ঝাঁকাল, ‘কিছু হয়নি’।
কিন্তু তুই কাঁদছিস, মালিহা? মালিহা বোনের কাঁধে আলতো করে মাথা রাখল। তার চোখের জল যেন বৃষ্টির কাছ থেকে মাত্র কাঁদতে শিখল।
তোকে বলেছিলাম, প্রেম-ট্রেমে জড়িয়ে পড়িস না… কিন্তু মালিহা তার কথা শুনতেই পেল না। তার গলার ভেতরে বাইরের প্রবল বৃষ্টিধারার প্রবাহ। সেই প্রবাহিত ধারার বিপরীতে সে তার কণ্ঠনিঃসৃত শব্দমালাকে ছড়ানোর জন্য বলল,
আজ শুক্রবার। আব্বা নেই! থাকলে আমাকে হয়তো ডেকে বলত, ‘মা, মালিহা; আমাকে চানাচুর দিয়ে একটু মুড়ি মেখে দিবি?’ আব্বা কথাগুলো ভয়ে ভয়ে বলত…
মালিহা আর কথা বলতে পারল না। তার কথা শুনে সালমার বুকের ভেতর কোথায় যেন চিনচিন এক প্রবাহ বয়ে গেল। বাবার নিরীহ মুখটা তার মনে পড়ল। সালমা তার কাঁধ থেকে মালিহার মাথা তুলে নিয়ে চোখ মুছে বলল,
আগের বাড়ির জায়গাটা আমরা ফিরে পাচ্ছি। বাবার আত্মা শান্তি পাবে… মালিহা ঝাপসা-চোখে অবিশ্বাস্য ভঙ্গিতে তাকাল। সালমা তাকে আশ্বস্ত করতেই আবার বলল,
সত্যি…
কি-ই… কী … ভাবে?
সালমা তাকে তার নিজের নতুন ব্যবসাটায় জড়িত হওয়ার কথা না বলে একটু আগে বাসেতের সঙ্গে বিস্তারিত আলাপের সংক্ষিপ্তসার বলল। সালমা মালিহাকে চৌকি থেকে নামিয়ে আবার বলল, বিয়ের পর জীবনের শেষ অধ্যায়টা আমার দেখা হয়ে গেছে। এখন আমার জীবনের নতুন এক অধ্যায়কে নিজ থেকে তৈরি করার পর আমি আবার আমার কিশোরীবেলার স্বপ্নে ফিরে যেতে চাই। দুজন আর কোনো কথা বলল না। অনেকক্ষণ ধরে নিজেদের ভেতরের কষ্টকে সামলে নিয়ে সালমা বলল,
ল্যাপটপে ছবিটা কার?
কোন ছবি? শাড়ি পরা মেয়েটার প্রোফাইল ছবিটা দেখিয়ে দিলো সালমা। মালিহা ছবিটায় ডবল ক্লিক করলে সেদিকে বিস্ময়ভরা দৃষ্টিতে তাকিয়ে সালমা বলল,
ওমা! এটা তুই? এই ছবি কবে তুললি… বাইরে বৃষ্টি থেমে গেছে। মালিহার কণ্ঠে তার স্যাঁতসেঁতে ভেজা আর্তি ছড়িয়ে পড়ল,
ফটোগ্রাফারকে ওই একটা ছবির জন্য দুই হাজার টাকার বদলে আমার কিছু সময় উপহার দিয়েছি। সে এখন খুশি হয়ে যখন-তখন আমার ছবি তোলার জন্য প্রস্তুত। নষ্ট কিছুকে ঢেকে আকর্ষণীয় করার জন্য আমাদের কত অভিনয় করতে হয়, না রে বড় আপা! আর আমাকে না চিনেই কত যুবকের বুক ফেটে যায় এখানে… সালমা চুপ করে থাকল। একটু পর চোখের কোণ মুছে বলল,
ওই ফটোগ্রাফার কি আমার ছবি তুলে দেবে? মালিহা বোনের চোখের দিকে স্থির তাকিয়ে থাকল। মালিহার ঠোঁটের ফাঁক থেকে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে একটা বাক্য বের হয়ে এলো,
হ্যাঁ দে… বে। সালমা এবার চোখটা ঘষে-ঘষে পরিষ্কার করে নিয়ে বলল,
তুই ফেসবুকে আমার একটা অ্যাকাউন্ট খুলে দিবি?
অ্যাকা…উ…ন্ট! হ্যাঁ, ঠিক… দে…বো…
দ্যাখ, মালিহা আমার চুলগুলো আবার গজাচ্ছে। চোখের গর্তের কালি অনেকটাই কমে গেছে… গেছে না, বল?
মালিহা নিজেকে আর ধরে রাখতে পারল না। বড় বোনকে জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে-ওঠা কান্নাটা লুকাতে গিয়েও জানালার বাইরে তাকিয়ে তার গায়ের লোম খাড়া হয়ে উঠল। অসংখ্য বাঁশপাতা থেকে তখনো অবারিত টিপটিপ আর বাতাসের একটু প্রবাহে ঝমঝম ঝরে পড়া বৃষ্টির ফোঁটা গায়ে মাখতে মাখতে বাগানের ভেতর থেকে বগলের কাছে ছেঁড়া হাতাওয়ালা স্যান্ডো গেঞ্জি পরে বেরিয়ে আসছে তার বাবা! বাবার দুই হাতে দুটি ইলিশ, তাই মুখে তার স্মিত হাসি। মালিহা স্পষ্টতই এবং হঠাৎ এমন দৃশ্যঘোরে হারিয়ে গেলেও যা সে আসলে বুঝতে ব্যর্থ হলো, তা আর কিছু নয়; সামনে আঁধারি আঁধারি বৃষ্টিফোঁটা নিয়ে সরব একটা বাঁশবাগান আর ইলিশ-হাতে এলে সে দেখছে অন্তর্জালের এক পাতাকে, তার ভেতরের পুঞ্জীভূত বেদনাবিধুর এক দৃশ্য।

যদি বাবাকে এমন বৃষ্টিমুখর রাতে কখনো আবার ইলিশ রান্না করে সে খাওয়াতে পারত!

তিন
ইয়াবা ব্যবসায় জড়িত হওয়ার সঙ্গে শরীর আর বোধ নিয়ে বিকার না থাকায় কয়েকদিনের মধ্যে বাসেত ব্যবসার প্রসারের প্রয়োজনেই বাংলো বাড়িটা নির্মাণ বাবদ তার যা খরচ হয়েছে তা পরিশোধের শর্তে সত্যি সত্যি সালমাদের পুরনো জায়গায় নির্মিত তার বাংলোর চাবি সালমাকে হস্তান্তর করল। তাদের শৈশব-কৈশোরের স্মৃতিঘেরা স্থানটিতে নির্মিত এই বাসায় আসার পর মালিহা ঝকঝকে বাংলোর স্থানে নিজেদের কাঠ-মাটি-টিনের দোচালা বাড়ির অস্তিত্ব কল্পনা করল। মালিহা বারবার এই বলে শোক প্রকাশ করল, ‘যদি বাবা বেঁচে থাকত!’
কিন্তু মাসশেষে টাকা উপার্জনের বড় এক লক্ষ্য এই দুঃখের সঙ্গে সালমা আর মালিহাকে বাস করতে দিলো না। একবার নিষিদ্ধ আনন্দে মেতে ওঠা এবং তাতে নিমজ্জিত শরীর বেশিদিন বিশুদ্ধতা সয় না। নিরিবিলি, নির্জনে বিলাসবহুল বাড়িটা তাদের দুই বোনকে সেই দুঃখের বিপরীতে উদ্দাম জীবনে অভ্যস্ত করল। নিয়মিত অর্থ উপার্জনের পাশাপাশি ফেসবুকে কিছুটা হাই প্রোফাইলের পুরুষের সঙ্গে তার অদৃশ্য সম্পর্ককে সে ভিন্ন ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করল। সালমা যখন ফেসবুকের প্রোফাইলকে কাজে লাগাতে মোটামুটি ব্যর্থ এবং পরিচিত আর নিয়মিত লোকজনের সঙ্গে মোবাইলকেই একমাত্র মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করার পাশাপাশি সন্ধ্যারাতে তার ইয়াবার সরবরাহ দিন দিন বাড়িয়েও মাসশেষে পঞ্চাশ হাজার টাকা উদ্বৃত্ত করতে পারল না, তখন এক রাতে মালিহা এসে তাকে জিজ্ঞেস করল,
বাসেত কমিশনারকে মোট কত টাকা শোধ করতে হবে? বলে এক লাখ টাকার একটা বান্ডিল সালমার সামনে ফেলে দিয়ে বলল,
বাড়ি বাবদ তাকে টাকাও দেবো আর ওই কুত্তার লোকজনকে যখন ইচ্ছা তখন সন্তুষ্ট করব, তা হবে না।
ব্যস্ততার কারণে কয়েক মাস মালিহার সঙ্গে প্রয়োজনীয় কাজের কথা ছাড়া লম্বা সময় তার আড্ডা হয় না। শিকার হওয়া এবং শিকার করার মানসে তাদের সময় কোনদিক দিয়ে কেটে যায়! সালমা বলল,
তুই কি কাউকে ভালোবাসিস মালিহা? সালমার প্রশ্নে এতক্ষণ পর মালিহা তার অভিজাত ভাবগাম্ভীর্য থেকে বেরিয়ে স্মিত হাসল। বলল,
হুম, বাসি।
কে সে?
সে আমার ভেতরের রোদ। হ্যাঁ, আপা, আমি এখন আমার নিজেকে ভালোবাসি। নিজেকে এখন কাকপক্ষী তো নয়ই, গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়। যার-তার সঙ্গে মিশতে এখন গা ঘিনঘিন করে।
কিন্তু এত টাকা?
তুমি যত বড় সেলিব্রেটি, তত তোমার আয়। তার জন্য শুধু নোংরামি করে বাঁচতে হবে এমন নয়।

বাসেত ছয় মাসে চার লাখ টাকার মতো ফেরত পেয়ে খুশি হলেও মোহনের চোখে মালিহা পড়ে যাওয়ায় ঘটল যত বিপত্তি। একদিন মালিহা শহর থেকে খোলা হুডে রিকশায় বাড়ি ফিরছিল। মোড়ের কাছে মোহন চায়ের দোকানে বাসেতকে নিয়ে ঢুকতে যাবে, এমন সময় রিকশায় বসে থাকা এক তরুণীকে এক ঝলক দেখেই সে থেমে গেল। ফয়েজের কন্যা এত সুন্দরী?
বাসেত মনেমনে প্রমাদ গুনল। সে ওখানে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে থাকল। মোহনের আর তর সইল না। এক সপ্তাহের মধ্যে এক রাতে সে মালিহার ঘরে এসে হাজির হলো। মালিহা অবজ্ঞাভরে বলল,
আপনার সাহস তো মন্দ নয়? আমার ঘরে কে আসার অনুমতি দিয়েছে?
তারপর যা হওয়ার তাই-ই হলো। মোহনের বিদ্রƒপভরা হাসি একটু পরেই চিৎকারে পরিণত হলো। কেননা, মালিহা তার বিছানার নিচ থেকে এক লাঠি বের করে মোহন কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগে তার মাথায় আঘাত করতে গিয়ে লক্ষ্যচ্যুত হলো। কিন্তু তবু কাজ হলো, জায়গামতো আঘাত না করলেও লাঠিটা নেমে এলো তার নাক বরাবর। মোহনের নাক ফেটে গলগল রক্ত গড়াল। পরের আঘাত থেকে বাঁচতে মোহন একই কায়দায় মাথা সরিয়ে নিলেও এবার লাঠিটা গিয়ে পড়ল তার কানে। নাকে আর কানে হাত দিয়ে হাতে লাল রক্ত দেখে মোহন এক দৌড়ে ঘরের বাইরে গিয়ে আবার মোটরসাইকেলের পেছনের আসনে বসে তাকে নিয়ে সারাক্ষণ যান চালনাকারী ছেলেকে চিৎকার করে বলল,
হাসপাতালত চল রে মাদারচুত। মাগি হামাক ম্যারা ফ্যালাচে…

মোহন ব্যাংকক থেকে কানের ব্যর্থ চিকিৎসা আর হাজার হাজার টাকা খরচ করে ফিরে এসে মালিহাকে নিয়ে তার কৌশল ঠিক করে নিল এবং সে-অনুযায়ী তার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য মালিহাকে কীভাবে ফুসলিয়ে একবার বাগে আনা যায়, তার জন্য লোক নিয়োগ করল। সেই রাতেই বাবুলকে মোহন দেখা করতে বলল। কয়েকজন সাংবাদিককে ডেকে সে তাদের পকেটে কয়েক হাজার টাকার বান্ডিল গুঁজে দিয়ে তাদেরকেও ইয়াবা উদ্ধারের অভিযানে বাবুলের সঙ্গে থাকার পরামর্শ দিলো। আর তার পরের দিন বাসেত কয়েক হাজার নতুন ইয়াবা ট্যাবলেট সালমাকে দিয়ে আসার আগে সেগুলো বিতরণের পরিকল্পনাও শুনল। পরের রাতেই সালমা ইয়াবাসহ গ্রেফতার হলো। সাংবাদিকরা পত্রিকা-অফিসে তাদের দামি রিপোর্ট পাঠিয়ে পরদিন মোহনের পার্টির ভোজে মেতে ওঠার আনন্দে সারারাত উত্তেজনাকর সব স্বপ্ন দেখল। তারা ঘুম থেকে উঠে নিজেদের পাঠানো রিপোর্ট পত্রিকার পাতায় দেখে চায়ের কাপে স্বস্তির ঢেকুর তুলল। চোখ তাদের বারবার আটকে যাচ্ছে তাদের পৌরুষোচিত লেখায়, যা তাদের নিজ নিজ সব পত্রিকার হেডলাইনও বটে – ‘কয়েক হাজার ট্যাবলেটসহ ইয়াবাসম্রাজ্ঞী সালমা গ্রেফতার’।
মালিহা জানে, মোহনের সঙ্গে দ্বন্দ্ব লাগিয়ে নিজের শহরে আর টিকে থাকা যাবে না। ছোটবেলা থেকে পড়াশুনায় কারো প্রশংসা কুড়াতে না পারলেও নাচের জন্য শিক্ষকদের কাছে কিছুটা স্নেহ আর সহপাঠীদের সমীহ কুড়াতে পেরেছিল। ঢাকায় গিয়ে নাচটাকেই কীভাবে কাজে লাগানো যায় সেই ভাবনা নিয়ে সে শহর ছাড়ল। মালিহার জন্য রৌদ্র ফেসবুকে অনেক ধরনের পাগলামি করছে। সামনাসামনি তাকে দেখতেও চাইছে। কিন্তু সে চাইল না, রৌদ্র কোনোভাবে তার জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে যাক।
ঢাকা তার কাছে অচেনা এক শহর। সেজন্য ঢাকায় বাস করা এক ফেসবুক বন্ধুকে তার জন্য কর্মজীবী মহিলা হোস্টেলে থাকার ব্যবস্থা করার অনুরোধ করেছিল। মালিহা তাকে কাজটা করতে বললে, বিবাহিত পুরুষ মানুষটা অসাধারণ সুন্দরীর সান্নিধ্য পাওয়ার স্বপ্নে শুধু সেই কাজটি করেই তৃপ্ত হলো না, বাস টার্মিনাল থেকে তাকে হোস্টেল পর্যন্ত পৌঁছে দিলো।
ঢাকায় এসে কয়েক মাসের মধ্যেই মালিহার সামনে অনেক পথ খুলে গেল। আর তা হলো অন্তর্জালের কল্যাণেই। নিজের জন্য নিজের একটা ওয়েবপেজ খুলে নিজের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে রাখতে পেরে খুব খুশি হলো সে। নাচের জন্য একটা অডিশনে গেলে যত না, সে তার নাচের জন্য আয়োজকদের মনোযোগ আকর্ষণ করল তার চেয়ে অনেক বেশি, আলোচনা হলো তার ফটোজেনিক চেহারা আর আকর্ষণীয় দেহবল্ল­রি নিয়ে। না সেজেও মালিহা তার তাকানোর ভঙ্গির জন্য যেন জ্বলে ওঠে ক্যামেরায়। ক্যামেরার লেন্স তো আর জানে না, শাটার থেকে যখন ফ্ল্যাশ পড়ে, তখন মালিহার ভেতর জেগে থাকা বড় বোনটার জন্য তার বুকে চিনচিন ব্যথা ওঠে। ক্যামেরাম্যান জানে না, মালিহার নিষ্পলক দৃষ্টিতে যে বিস্ময়ভরা এক জগৎ সে আবিষ্কার করে চলছে, সেখানে আসলে ফুটে আছে মা, ছোট বোন আর ভাইটার জন্য ভয়ংকর উদ্বেগ।
দুই মাস ধরে ঢাকার ফেসবুক-বন্ধু মালিহাকে আর্থিক সাহায্যের বিনিময়ে প্রেমের পথে নিতে ব্যর্থ হলে তার থেকে ধার নেওয়া টাকাগুলো ফেরত চাইল। এই সময়ের মধ্যে বিস্ময়কর ক্যামেরা বস্তুটার জন্য মালিহা মডেলিংয়ের অফার পেল। বিস্ময়কর ক্যামেরার চেয়েও বিস্ময়কর উত্থান ঘটে মালিহার। বছরের পর বছর এই জগতে নিজেকে ঢেলে দিয়েও অনেকের ভাগ্যে সাফল্যের দেখা না মিললেও মালিহা উড়ে এসে জুড়ে বসা নিজেই যেন এক ভাগ্যদেবী। সফলতার সঙ্গে অচিরেই তার ভাগ্যে অনেক ঈর্ষান্বিত শত্রুও জুটল।
পণ্যের ব্র্যান্ডে ফ্যাশন-মডেলিংয়ে দারুণ পারফরম্যান্স মালিহার। পাতলা কাপড়ের নিচে পরা অন্তর্বাসের ক্যাটওয়াকে গিয়ে হঠাৎ তুমুল বৃষ্টির দিনে গোসলখানার কাছে ইলিশ-হাতে বাবার ছায়াটার কথা তার মনে পড়ল। তার চোখের দৃষ্টিতে লজ্জা নয়, ভয় নয়, ভর করল একরাশ স্মৃতি আর বুকের দুই প্রান্ত ছাপিয়ে বন্যার মতো ছাপিয়ে ওঠা কান্না। এই স্মৃতি আর কান্না থেকে নিজেকে লুকাতে সে মুখে কৃত্রিম হাসি আনতে গিয়ে গালে একটা টোল ফেলল। টিভির ক্যামেরা তখন তার মুখে জুম করা। তার মুখের অভিব্যক্তিতে লুকানো মোনালিসার মতো রহস্যময়তা কাঁপিয়ে দিলো দেশের ধেড়ে ধেড়ে ফটোগ্রাফারকে, চিন্তালোক আর চলচ্চিত্র-বোদ্ধাদের বিস্ফারিত নেত্রকে। তারা নতুন এক মোনালিসার সন্ধান পেয়েছেন এমন বিতর্কে মেতে উঠলেন এটুকু না জেনেই যে, সেই মোনালিসার তাকানোয়, গালে ফেলা টোলটায় সে লুকিয়ে রেখেছে এক স্মৃতি-ছায়াকে। সেই মোনালিসা তার গালের টোলে লুকিয়ে রেখেছে তার অসফল বাবার নিত্যদিনের চলার পথ, তার জীবনসংগ্রাম আর তাদের চার ভাইবোনের একেকটা চাহিদার বিপরীতে তার চিরন্তন অসামর্থ্যরে নিষ্পাপ হাসির সেই চিরচেনা চিত্রকে। সবচেয়ে পছন্দের খাবার ইলিশের জন্য বছরের পর বছর অপেক্ষার পর সব বর্ষায় ইলিশ কেনা মনস্থ করেও কোনো এক অজুহাতে খালি হাতে ফেরা তার বাবার মুখে তবু ফুটে থাকা একচিলতে সেই নিরীহ হাসি মালিহার হৃৎপি- কেটে কেটে যে রক্ত ঝরাল। এই হৃদয় তোলপাড় করা অনুভূতি তার মেকআপ করা মুখেও এমন রক্তিমাভা ছড়াল যে, দারুণ সামর্থ্যবান পুরুষরা এক দেবীকে কাছে পাওয়ার প্রতিযোগিতায় নামার জন্য মনে মনে প্রস্তুতি সম্পন্নের কল্পনায় ডুবে গেল।

চার
ভাইবোনকে নিয়ে একা একা বাস করা মায়ের কাছে একটা বড় অংকের টাকা পাঠিয়ে মালিহা স্বস্তি বোধ করছিল। আরো কিছু টাকা হাতে এলে একবার সে চুপিচুপি বাড়ি গিয়ে মায়ের হাতে টাকাটা দিয়ে আসার পরিকল্পনা করল। মডেলকন্যার খ্যাতির অনুপাতে দিন দিন তার কাজের চুক্তিমূল্য বেড়েই চলল। একদিন একটা ফোন তাকে ভীষণ উৎফুল্ল­ করল। ফোনের অপর প্রান্ত থেকে বলল,
একটা ইন্ডাস্ট্রির উৎপাদিত সব পণ্যের ব্র্যান্ড মডেল হিসেবে আমরা আপনাকে চাই। আপনি রাজি থাকলে মাসিক বেতনের ভিত্তিতে আমরা আপনাকে নিয়োগও দিতে চাই।
তাদের উৎপাদিত পণ্য-সংক্রান্ত সব তথ্য এবং তার জন্য পারিশ্রমিকের বাইরে মাসিক বেতনের পরিমাণ শুনে মালিহা নতুন করে স্বপ্ন দেখা শুরু করল। মালিহা রৌদ্রকে না বললেও মডেলজগতে তারকা হয়ে-ওঠা মালিহার অবস্থান জানতে মোটেও তাকে বেগ পেতে হলো না। মালিহা ঢাকায় তথ্যটুকু জানার পর রৌদ্র উৎফুল্ল হয়ে উঠল এবং ফেসবুকে টেক্সট পাঠিয়ে সে মালিহার সঙ্গে দেখা করার অনুমতি চাইল। রৌদ্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করে ঢাকাতেই একটা কোম্পানিতে কাজ করছে এবং এখনো সে মালিহার প্রতি তার স্কুলজীবনের দুর্বলতা কাটাতে পারেনি। মালিহা তাকে ইনিয়ে-বিনিয়ে তার জীবনের গল্প শোনানোর পরও তার সেই আকর্ষণে ভাটা পড়ল না। রৌদ্রের মতো একজন ভালো ছেলের সঙ্গে নিজের নষ্ট অতীতকে জড়াতে তার মন চাইল না। কিন্তু নাছোড়বান্দা রৌদ্র যখন কিছুতেই ছাড়ল না, তখন মালিহা তার বাসায় যাবে বলে তাকে কথা দিলো। মালিহার দেওয়া দিন-ক্ষণে রৌদ্র নিজে গাড়ি চালিয়ে তাকে বাসায় নিয়ে গেল। তার ফ্ল্যাটে ঢুকে মালিহার চক্ষু চড়কগাছ। রৌদ্রের ঘর মালিহার অসংখ্য ছবি দিয়ে ভর্তি। সে লাজুক আর বিনয়ী কণ্ঠে বলল,
আমি জানি, অনেক তরুণই হয়তো তোমার ছবি ঘরে ঝুলিয়ে রেখেছে। কিন্তু মালিহা আমার কাছের এই ছবিটা আর কারো কাছে নেই… বলে ড্রয়ার থেকে বাঁধাই করা একটা ছবি বের করল। অষ্টম শ্রেণিতে নাচের পোশাকে সে কখন রৌদ্রের পাশে দাঁড়িয়ে এই ছবি তুলেছিল তা মালিহা মনেই করতে পারল না। তাদের দুজনের চোখেমুখে কেমন শিশুসুলভ অদ্ভুত সারল্য। অচেনা এই ঢাকার যান্ত্রিক জীবনে আজ প্রথম মালিহা এত চেনা আর আপন কাউকে পেয়ে জীবনের ছোঁয়া পেল যেন। নিজের সারল্যভরা মুখটায় চোখ রেখে টলটল অশ্রুতে মালিহার চোখ ভরে উঠল। সে-ই মালিহাকে হারিয়ে ফেলার বেদনায় তার হৃদয় ভারাক্রান্ত হয়ে উঠল। অথচ রৌদ্রের সঙ্গে এতদিন পর দেখা হলেও রৌদ্রের আচরণ দেখে মনে হলো এতদিন তাদের মধ্যে একদিনের জন্যও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়নি।
আমার সেই দিনটার কথা খুব মনে পড়ে। হাসপাতালে আহত আমার পাশে সারারাত তুমি নাচের পোশাকে বসে ছিলে।
রৌদ্র আজ মালিহাকে তার হারিয়ে ফেলা মালিহার কাছে ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। তার হৃৎস্পন্দন বেড়েই চলছে। রৌদ্র একের পর এক স্মৃতিচারণে অবাক করে দিচ্ছে মালিহাকে। কী আশ্চর্য! নিজের অনেক কথা ভুলে গেলেও ছেলেটা কেমন করে তার স্মৃতিতে এইসব ছোট ছোট মুহূর্তকে এত জীবন্ত করে লালন করে রেখেছে! রৌদ্রের কারণেই মালিহা আজ তার কিশোরীবেলার স্বপ্ন-গন্ধে তলিয়ে গেল। রাতের খাবারের পর রৌদ্র তাকে কফি বানিয়ে খাওয়াল। তার কাছে এসে মালিহার সময়টা কত দ্রুত যেন ফুরিয়ে গেল। আরো কত কথা বলার আছে রৌদ্রের; কথা তার শেষ হচ্ছে না। তাকে রৌদ্র এতদিন মনে মনে শুধু ভালোই বাসেনি, কোনো দ্বিধা ছাড়াই সে তার জন্য অপেক্ষাও করছে!
দিন দিন পরিস্থিতি এমন হলো যে, খুব ব্যস্ততার মাঝেও চেনা আর পরিচিত এই জগৎটার কাছে, রৌদ্রের কাছে না এলে কেমন দমবন্ধ লাগা অনুভূতি পেয়ে বসল মালিহাকে। মালিহা আসলে রৌদ্রের কাছে এসে তার কিশোরীবেলার ছায়ার কাছেই ফিরে যেত। নিজেকে একবার যদি এভাবে কেউ খুঁজে পায়, তাহলে সে নিজেকে আর নিজের কাছ থেকে নির্বাসিত করতে চায় না। রৌদ্র সব জেনেও তাকে বিয়ে করতে চায় বলে তাকে নিয়েই মালিহার স্বপ্ন পাখা মেলতে শুরু করেছিল। তবু পাখনা মেলা ভাবনার ডানাকে থামিয়ে সে ফোনের অপর প্রান্তের ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসা করল,
আমার নিয়োগটা কী ধরনের?
দেশের প্রত্যন্ত কোনো জেলায় পণ্য দিয়ে বড় কোনো অনুষ্ঠান হলে আপনাকে সেখানে উপস্থিত থাকতে হবে। মালিহা কী ভেবে বলল,
আমি আধঘণ্টা পর জানাচ্ছি। বলে সে ফোন রাখার পর ঘামতে থাকল। রৌদ্র বারবার তাকে শুদ্ধতার দিকে টেনেছে, কিন্তু অনিশ্চিত এক জীবনের আবর্তে বন্দিনী মালিহা তাকে প্রতিবার প্রত্যাখ্যান করেছে। কিন্তু মাসে মাসে একটা নিশ্চিত উপার্জনের আশ্বাসের কারণে আজ আবার তার নিজের কৈশোরের খিলখিল হাসির শব্দ, পুকুরের জলে নিজের ছায়া ফেলে তার কাছে একা একা লুকিয়ে রাখা স্বপ্নগুলো, উঁচু টিলাটার ওপর তিন বোন মিলে খেলার প্রাণময়তাগুলো তার বুকে ঢিপঢিপ শব্দের স্পষ্ট তান তুলে তাকে হাতছানি দিয়ে ডেকে চলল। কতক্ষণ কেটে গেল ওভাবে মালিহা টের পেল না। ঘড়ির টিকটিক শব্দ একসময় তার স্মৃতি ছাপিয়ে, এই শহরের গলি থেকে ভেসে আসা সমস্ত শব্দ ছাপিয়েও তার হৃৎস্পন্দনের সঙ্গে প্রবল হয়ে উঠল। ঘামে এখন মালিহা পুরোই ভিজে গেছে। স্বপ্নের কাছে ফিরে যেতে এত ঘাম ঝরাতে হয়! আর দিন-রাত মালিহার একটা ফোনের আশায় অপেক্ষার প্রহর গুনে গুনে এবং কোনোদিন তার ফোন না পেয়ে, রোদ হতে চেয়েও বিষণœতার ছায়া রোগে পেয়ে বসা রৌদ্র যেন ঝলসে উঠল,
মালিহা, তুমি হাঁপাচ্ছ! ঠিক আছ তুমি?
রৌদ্র?
বলো…
তুমি আমাকে সত্যি ভালোবাস, সবকিছু জেনেও?
হ্যাঁ, সত্যি ভালোবাসি।
আমি তোমার কাছে এসে বিশুদ্ধ হতে চাই, কিন্তু ভয় লাগে।
কিসের ভয়?
তুমি আমাকে ফেরাবে না তো… যদি তোমার কখনো আমার শরীরটা আর ছুঁতে ইচ্ছা না করে।
তুমি তো বললে, তুমি ভালোবাসায় বিশুদ্ধ হবে। কিন্তু…
হ্যাঁ, আমি একটা স্থায়ী কাজের অফার পেয়েছি। তুমি অনুমতি দিলে আমি তাদের কথা দেবো…
মালিহা! তুমি সত্যিই আমাকে …
হ্যাঁ, বিয়ে করতে চাই। আমি আমার কিশোরীবেলা, আমার স্বপ্নকে আবার তোমার মাঝে ফিরে পেতে চাই। কিন্তু, রৌদ্র…
কোনো কিন্তু নয়। তোমাকে পেলে মালিহা কথা দিচ্ছি, আমি আবার রোদ হয়ে উঠব!
রৌদ্র! আমি তোমার ভালোবাসার কাছে পরাজিত হতে চাই। খুব বেশি। আই লাভ ইউ।
লাভ ইউ, মালিহা।

কথোপকথনের কয়েকদিনের মধ্যেই মালিহা আর রৌদ্রের বিয়ে হয়ে গেল। আর স্বপ্নের মতো স্বপ্নগুলো ফিরে পাওয়ার চেয়ে রৌদ্রকে রোদের মতো, তার কথার মতো সত্যি করে পেয়ে অস্থির আনন্দে বারবার মালিহা কান্না লুকাতে বাথরুমে গেল। বাথরুমে গিয়ে মুখে পানির ঝাপটা, কখনো কখনো অনেকক্ষণ ধরে পানিতে শরীর ধুয়ে রৌদ্রের জন্য বিশুদ্ধ অনুভূতি নিয়ে এলো। রাতে রৌদ্রের বুকে মাথা লুকিয়ে মালিহা বলল,
তোমাকে অনেক ভালোবেসে আমি মরে যেতে চাই। আমার যেন তোমার কোলেই মৃত্যু হয়।
কিন্তু মালিহার যখন মৃত্যু হলো, তখন সে রৌদ্রের কাছ থেকে অনেক দূরে। বিয়ের পর তিনটা মাস কোন দিক দিয়ে পার হয়ে গেল সে টের পেল না। সেই কোম্পানি থেকে এর মধ্যে বারবার তাড়া দিলেও মালিহার কেন যেন এসবে জড়াতে আর ইচ্ছা করছিল না। কিন্তু এবার সে রাজি হলো সম্পূর্ণ ভিন্ন এক কারণে। কোম্পানির উৎপাদিত পণ্যের ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসাডর হিসেবে তা বিপণনের জন্য তার প্রথম সফরস্থল নিজের শহরকে নির্বাচিত করা হয়েছে বলে সে শুধু রাজিই হলো না, আনন্দে মালিহা কেঁদে ফেলল। অফিসের ঝামেলা থাকায় ঢাকা থেকে রৌদ্র তার সঙ্গে তাদের স্মৃতিময় অতীতের কাছে একসঙ্গে যেতে পারছে না বলে মালিহার সঙ্গে পুরো রাতটাই
আড্ডা-গল্প করার ফাঁকে তাকে মাঝেমধ্যেই শক্ত জড়িয়ে ধরে লম্বা সময় ধরে তার চুলের ঘ্রাণ নিয়ে বলল,
তোমার ত্বকের ঘ্রাণটা আমার এত প্রিয়। এই ঘ্রাণটাকে আমি চিনেছি কবে জানো?
কবে?
ওই যে হাসপাতালে যে-রাতে তুমি আমার কাঁধের নিচে দুই হাত দিয়ে খুব যতেœর সঙ্গে বালিশে আমার মাথাটাকে ঠিকমতো বসিয়ে দিচ্ছিলে।
রৌদ্র, তুমি খুব অন্যরকম, সবার থেকে এত আলাদা তোমাকে পাওয়া আমার জন্য কত সৌভাগ্যের!
এরপর একটা সময় বের করে বেশ কিছুদিন আমরা আমাদের কৈশোরের দিনগুলোতে ফিরে যাব। রিকশায় ঘুরব। বিকেলে উপশহরের নিরিবিলি রাস্তা ধরে, কৃষ্ণচূড়া গাছটার নিচে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে চা খাব। অন্ধকারের ডানা ধরে ধরে শহরের চিহ্ন ছেড়ে সন্ধ্যায় আমরা এগিয়ে যাব গ্রামের দিকে। জানো মালিহা, আমি আসলে কখন তোমার প্রেমে পড়েছিলাম?
কবে?
সেই ক্লাস এইটেই…
এইটে! ওহ, গড! মানুষ জানলে তোমাকে ইঁচড়েপাকা বলবে।
সে-ই যে, বার্ষিক ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে… সেটা ভরা জোছনার রাত ছিল। মনে হচ্ছিল মাঠের মধ্যে সাজানো স্টেজের ওপর এক পরী নাচছে! সেদিনই আমি পরিটাকে মনে মনে খুব চেয়েছিলাম…। চাঁদের আলোয় বসে বসে নিজের ছায়াকেই পরিটা ভেবে কত কথা বলেছি!
ঝাপসা হয়ে উঠল মালিহার চোখ। শক্ত করে সে রৌদ্রকে জড়িয়ে ধরল। রৌদ্র তখন আনমনা ভঙ্গিতে বলেই চলছে,
কিন্তু তার পরই আমার পরিটা সত্যি সত্যি একটা ছায়া হয়ে গেল। তার পিছু নিলে সে পালিয়ে যায়, আর মন খারাপ করে ফিরে এলেও আমার সঙ্গেই ঘরে ফেরে। হঠাৎ তোমার নির্বাসন যে ছিল কী যন্ত্রণার! ভাগ্যিস আমার পরিটার নির্বাসিত ছায়াটা অন্তর্জালে আলো ফেলেছিল। তা না হলে তোমাকে আর কোথায় খুঁজে পেতাম, বলো!
রৌদ্র…
বলো।
তুমি আমাদের স্কুলের সেরা ছাত্র হয়েও এমন সাদামাটা এক হৃদয়ের মানুষ যে ভালোবাসলে আর ঘৃণা করতে জানে না। এখন বুঝি যারা অসাধারণ তারা তোমার মতো সরল, নিরহংকার। না হলে, যার এক বোন জেলে, যার পরিবার বনের এঁটো-কাদার মধ্যে মানবেতর জীবন-যাপন করে, সেই পরিবারের এক মেয়েকে তোমার মতো… রৌদ্র মালিহার ঠোঁটে নখ রেখে বলল,
চুপ! সময় বের করে আপাকে জেল থেকে বের করব আর ওই বাড়িটাও উদ্ধার করতে হবে। বুড়া-বুড়ি হলে তোমাকে নিয়ে আমি হয়তো ওখনেই থাকব… রৌদ্রের কথায় মুগ্ধ মালিহা তার চোখে তাকিয়েই থাকে। তার হৃদয় এখন স্রোতস্বিনী, আমি তোমার বাচ্চাকে আমার গর্ভে ধরে কত যে গর্বিত। মালিহার কথায় রৌদ্র চমকে সোফা থেকে উঠে দাঁড়াল। উত্তেজনার বশে কী বলবে, সে ভেবে পাচ্ছে না। ডানপাশ থেকে এবার বাঘের মতো লাফ দিয়ে সে মালিহার বাঁ-পাশে এসে বলল,
তুমি… সত্যি?
হুম, সত্যি।
ওয়াও! তাহলে তোমাকে আমি আর কোথাও যেতে দিচ্ছি না। কালই পার্টি দেবো…
না, না… রৌদ্র। বাধা দিয়ো না, প্লি­জ। এ-বছর এই একটা কাজ করলেই আমার সারা বছরের জন্য… মাসে মাসে বাসায় টাকা না পাঠালে… জানো তো!
রৌদ্র চুপ হয়ে গেল। তার মনটা কেন যেন খারাপ হলো। সে জানে, বড় কোম্পানির বড় পদে চাকরি করে সে যা আয় করে তা দিয়ে দুটো পরিবার চললেও তাদের জীবনটা সীমাবদ্ধ হয়ে যাবে। মালিহাদের স্বপ্নবলয় বাড়িটা বাসেতের হাত থেকে উদ্ধারের জন্য অথবা সালমাকে জেল থেকে মুক্ত করার মানসে সে মাসে মাসে যে-টাকা জমানো শুরু করেছে তা আর হবে না। সুতরাং মালিহার যাওয়াই স্থির হলো। মালিহা বলল,
তুমিও চলো, আমার সঙ্গে। এ-কথায় রৌদ্রের মুখ থেকে কালো মেঘ কেটে গেল। সে উচ্ছল হয়ে বলল,
আমাকে তাড়াতাড়ি জানাও তারিখটা। যেভাবেই হোক, ছুটি ম্যানেজ করব।
কিন্তু বিধিবাম; দিন-তারিখ এবং রৌদ্রের ছুটি – সব ঠিক থাকলেও যাওয়ার দুদিন আগে অফিস থেকে বিরস মুখে ফিরে রৌদ্র মালিহার হাতে একটা টিকিট ধরিয়ে দিলো,
এটা কী?
প্লে­নের টিকিট।
কেন?
পরশু একটা সেমিনারে আমাকে লন্ডন যেতে হবে।
সুতরাং রৌদ্রকে বিদায় দিয়ে একাই বের হতে হলো মালিহাকে। বাসায় দামি গাড়ি এলো। তার সফরসঙ্গী হিসেবে কোম্পানির এক কর্তাকেও পাঠানো হয়েছে। গাড়িটা যখন তার পরিচিত শহরটার চিরচেনা জগতের কাছে তাকে নিয়ে পৌঁছাল, তখন বুকের ভেতর কেমন আনন্দের কোলাহলে সে ভেতরে ভেতরে এসিতেও ঘামতে থাকল। ড্রাইভারকে মালিহা বলল,
আমি আজ রাতে কোনো হোটেল অথবা অন্য কোথাও নয়, মায়ের সঙ্গে থাকব। আপনি আমাদের বাড়ির রাস্তা চেনেন?
মাঠের মধ্যে উঁচু ঢিবিটার ওপরের বাসাটা?
না, ওখানে তো… মালিহার পাশে বসা লোকটি তাকে থামিয়ে দিয়ে বলল,
তারা সবাই এখন ওই বাসাতেই।
তাই? ফোনে তো তা তারা বলেনি! দাঁড়ান… আমি ফোন করি।
থাক না। জায়গাটার সঙ্গে আপনাকে ফিরে পাওয়াটা তাদের জন্য বড় একটা সারপ্রাইজ হোক। তারই জীবনে প্রাপ্তি তত বেশি যার জীবন অনেক বেশি সারপ্রাইজে পরিপূর্ণ…
মালিহা লোকটার দিকে সন্দেহের চোখে তাকাল। তার অতীতের সঙ্গে লোকটার কোথায় যেন যোগসূত্রের গন্ধ পেয়ে ভড়কে গিয়েই মালিহা চমকে উঠল। সে তাকে বিস্মিত স্বরে প্রশ্ন করল,
আপনি কীভাবে আমার বাড়ির কথা জানেন?
তাকে নিয়ে সমাজের আনাচে-কানাচে কত গবেষণা চলছে সেলিব্রেটিরা নিজে কি তা টের পায়? এই শহর থেকে ড্রাইভারকে ভাড়া করা, আপনার সব তথ্য দিয়ে একজন অফিসার পাঠান – কোম্পানির পক্ষ থেকে সবই করা হয়েছে আপনার সন্তুষ্টির জন্য। যদিও কোম্পানি নিজেদের লাভের জন্যই এসব করছে…
এসব কথাতে মালিহার মন ভরল না। তার ভেতর কোথায় যেন খচ-খচ করছে। চোখে বালি পড়ার মতো। সবকিছু কেমন গোলমাল মনে হচ্ছে। নিজের চেনা শহরের প্রকৃতি, রাস্তার প্রিয় বাঁকে মুখরোচক খাবার বিক্রিরত ফেরিওয়ালাদের হাঁকডাক সবকিছুতে কিসের যেন দূরাগত স্বরের এক আভাস। মালিহার মনে হচ্ছে
প্রকৃতি আর তার খুব চেনা এই শহরকে শেষ বিকেলের ছায়া আচ্ছাদিত করছে না, বরং ছায়ার ভেতর ঢুকে যাচ্ছে এই শহরের শরীর। সেই রিকশার টুং-টাং, যানের ভোঁ ভোঁ, মানুষের কোলাহল কম্পমান সেই ছায়ার ইথারে আটকে আটকে যাচ্ছে। শব্দগুলো অন্য কোনো জগতের অপার থেকে ভেসে ভেসে, থেমে থেমে তারপর তার কানে এসে পড়ছে। আসলে মালিহার ভেতর স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। সে গাড়িটা থামাতে চেয়েও তার স্তব্ধতায় মুখরিত হৃদয়-প্রান্তর থেকে কোনো সাড়া পাচ্ছিল না। তার হঠাৎ মনে হলো, আজ পূর্ণিমা এবং বাইরে মোড়া, টুল এবং চেয়ার সাজিয়ে তার বাবা তাদের ডাকছে। সেই ডাকে সাড়া দিতেই মালিহা কোনো প্রতিবাদ ছাড়াই তাদের শৈশব-কৈশোরের স্মৃতিঘেরা বাড়িটার দিকে এগিয়ে চলল।
ধীরগতিতে কারটা তার শৈশব-কৈশোরের স্মৃতিঘেরা বাড়িটার সামনে এসে থামল। গাড়ি থেকে নেমে সবার জন্য স্যুটকেসভর্তি করে আনা জিনিসপত্রের কথা ভুলে মন্ত্রমুগ্ধের মতো মালিহা বাড়ির দিকে এগিয়ে গেল। বারান্দায় উঠে আশা-নিরাশার দোদুল্যমানতা কণ্ঠে মেখে সে ডাকল,
মা! হেলেনা…। আপু… ভাইয়া… মা… আ… আ…
ঘরের দরজা আস্তে খুলে গেল। ঘরের ভেতর শূন্য-শক্তির একটা বাতি জ্বলছে। কিন্তু দরজা খুলে ভেতর থেকে কেউ বের হলো না দেখে মালিহা এবার প্রায় নিশ্চিত হলো যে, তাকে অকস্মাৎ আনন্দের তোড়ে ভাসাতেই এই ব্যবস্থা। ধীরপায়ে সে ঘরের ভেতর পা রাখল আর বাইরে থেকে তার স্যুটকেসটা না দিয়েই কে যেন দরজাটা বন্ধ করে দিলো। ঘরের এক কোণে সোফার ওপর চোখ পড়ে মালিহা হতভম্ব হয়ে গেল। মদ নিয়ে মোহন তার পা সামনের টি-টেবিলের ওপর ছড়িয়ে বসে আছে। টেবিলের ওপর ধারালো অস্ত্র আর একটা পিস্তল। মালিহার মুখ থেকে কথা সরছে না। তবু সর্বশক্তি দিয়ে ঠোঁটের ফাঁক থেকে সে একটা শব্দ বের করল, ধ্বনি-প্রতিধ্বনি তুলে যে-শব্দটা দূর থেকে ভেসে আসতে আসতে দূরেই হারিয়ে গেল,
বাস্টার্ড! বলেই উলটো ঘুরে দরজা খুলে এক দৌড়ে পালাতে গেলে সারাদিন কারে তার পাশে বসা কর্তার মুখোশধারীসহ দুজন তাকে জাপটে ধরে পাঁজাকোলে করে ঘরে এনে বিছানার ওপর ফেলে তার হাত-পা বেঁধে মুখ স্কচটেপ দিয়ে আটকে দিলো। তারা বাইরে গেলে মোহন ধীরে উঠে মালিহার কাছে এসে কাঁচি চালিয়ে তার শরীরের সব কাপড় কেটে ফেলল। মালিহাকে পুরো নগ্ন করে তার সামান্য স্ফীত পেটের দিকে তাকিয়ে বলল,
বাহ্, প্যাটত বাচ্চা নাকি? তাই তো তোর শরীল থ্যাকা মধু উপচা উপচা পড়িচ্চে। মোহনকে ঠসা বানালু, একন এমন চিৎকার কর, জ্যান আমার কানটা খুল্যা যায়। বলে সে কোমরের বেল্ট খুলে মালিহার পেটে চাবুক মারার মতো করে আঘাত করে চলল। মালিহার চামড়া ফেটে ফেটে রক্ত গড়ালেও সে চিৎকার করল না। শুধু তার শরীর বারবার কুঁকড়ে এলো। দুমড়ে-মুচড়ে ঠাস-ঠাস শব্দ করে শরীরে আছড়ে পড়া বেল্টের আঘাতের বিপরীতে তার শরীর দুমড়ে-মুচড়ে এলেও তার মুখ থেকে একটাও শব্দ বের হচ্ছে না দেখে মোহন আরো হিংস্র হয়ে উঠল। তার হিংস্রতা চরিতার্থে সে নিজের প্যান্ট খুলে প্রথমে বেল্টের আঘাতে কেটে যাওয়া মালিহার ডান স্তনের রক্তের জেগে ওঠা রেখা বরাবর জিহ্বা ছোঁয়াল। মালিহা তখন চোখ বন্ধ রেখেই মনে মনে রৌদ্রকে বলল,
ক্ষমা করে দিয়ো রৌদ্র। আমার এই নষ্ট শরীর তোমার বাচ্চাকে কি ‘রোদ’ করে তুলতে পারত?
হৃদয় বিদীর্ণ করা এই প্রশ্ন করে কোনো এক নিষ্পাপ আত্মা মালিহার শরীরকে বিসর্জন দিয়ে বাইরের আলো-অন্ধকারের রহস্যময় ছায়ায় মিলিয়ে গেল। মালিহা তাকে পরিত্যাগ করে চলে যাওয়া সত্তার ত্বকের গন্ধের সঙ্গে চোখে দেওয়া কাজল আর বেবি-পাউডারের গন্ধ পেল। অশ্রুর ধারা তার চোখ বেয়ে বালিশ ভিজিয়ে তুলছিল। বেঁচে থাকার প্রয়োজনে, পরিবারের অবলম্বন হয়ে-ওঠার ভাবনায় কতবার এভাবে উলঙ্গ হয়ে রক্তপিপাসুদের রক্তের স্বাদ তাকে মেটাতে হয়েছে। নিজের শরীরে যে-উৎসব লুকিয়ে আছে, তার সন্ধান সে প্রথম পেয়েছিল রৌদ্রের উত্তাপে। কিন্তু এখন রৌদ্র নয়, মাত্র জন্মানো এক শিশুত্বকের মিষ্টি গন্ধ মালিহার ভাবনাকে আচ্ছন্ন করে ছিল। সব ব্যথা-বেদনার ঊর্ধ্বে উঠে মালিহার মনে হচ্ছিল, জানালার বাইরে তার বাবার নির্বাসিত ছায়াকে জোছনার আলো আজ আবার তার বাবার শরীরের কাছে ফিরিয়ে দিতে এসেছে। তার বাবা একটা তোয়ালে আর একটা কাঁথা নিয়ে দুহাত পেতে তার গর্ভের সন্তানকে কোলে তুলে নেওয়ার জন্য হাসিমুখে দাঁড়িয়ে আছে। তার দুহাত পেতে ধরা তোয়ালে আর কাঁথাটায় কাজলের সঙ্গে বেবি-পাউডারের স্বপ্ন-ঘ্রাণে মালিহার ঠোঁটের কোণে একচিলতে হাসির রেখা স্পষ্ট হয়ে উঠল।
মালিহা এতক্ষণে তার মাকে দেখতে পেল। তার পান-চিবানো লাল টুকটুকে ঠোঁটে একটু চুন লেগে আছে। কতক্ষণ এসব দৃশ্য দেখতে দেখতে মায়ের ওপর বিরক্ত মালিহা বলল,
মা, এতক্ষণ আমার স্যুটকেসটা খুলছ না! তোমার শাড়ি আছে, হেলেনা আর জাহাঙ্গীরের জন্য অনেক কিছু কিনেছি। ওটা না খুলে শুধু দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পান চিবোচ্ছ!
মালিহার চোখে একের পর এক দৃশ্য ছোটবেলায় দেখা বায়োস্কোপের ছবির মতো ভেসে উঠছে। বায়োস্কোপ দেখার নেশায় একটা টাকার জন্য বাবার কাছে ধরনা ধরা ছয় বছরের মালিহাকেও সে দেখতে পেল। তার মাথার খরগোশের কানের মতো ছোট্ট বেণিতে বড় বোনের ব্যবহারের পর তাকে দেওয়া ফিকে হয়ে যাওয়া ফিতা। মালিহা চোখ রাখল বায়োস্কোপের খুপরিতে কী আশ্চর্য, সে দেখছে – রৌদ্রকে নিয়ে উড়াল দেওয়া বিমান ডানা মেলা বকপাখির মতো মেঘের ভেতরে ছোট হতে হতে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে…।
মোহনের পর আরো কয়েকজন মালিহাকে একের পর এক ধর্ষণ করতে এলেও তাদের কয়েকজন মেয়েটার মিসকারেজের রক্তস্রোতের ভেতর অদ্ভুত এক দৃশ্য দেখতে পেয়ে প্যান্টের চেইন লাগাতে লাগাতে ভয়ে বাইরে পালাল। তারা বাসার বাইরে চাঁদের আলোতেও একই দৃশ্য দেখল। মাঠের মধ্যে বড় গাছটা জোছনার ছায়া-অন্ধকারে একটা নারীর মুখের অবয়ব আর শরীর নিয়ে যেন দাঁড়িয়ে আছে। সেই গাছ-সদৃশ নারীটার জননাঙ্গ বেয়ে বেরিয়ে আসা লতা-পাতা বেয়ে টিপটিপ বৃষ্টিফোঁটার মতো রক্ত ঝরছে মাটিতে।
মালিহা এবার স্পষ্ট শুনতে পেল, তার বাবা ছায়ার সঙ্গে ছায়া হয়ে মাঠের মধ্যে চিরন্তন খেলায় মেতে ওঠার জন্য তাকে ডাকছে। মোহনের লোকজন যখন মৃত মালিহার দেহটা শুকনা খালের সামান্য জলের ভেতর ফেলে দিতে গেল, তখন মালিহা ঘর ছেড়ে বের হলো। মালিহার ছায়াটা তার বাচ্চাকে বাবার হাতে তুলে দিতেই তারা দুজন উড়ে উড়ে চলল মাঠের মাঝখান দিয়ে প্রবাহিত প্রমত্তা কলুতুর দিকে। উড়তে উড়তে তারা দুজন যখন দুই নীল প্রজাপতির ছায়া হয়ে গেল, তখন জলের কিনার ধরে, খুঁজে খুঁজে একটা নলখাগড়ার ডালে বসল। বাবা প্রজাপতি বলল,
এই নদীর জলে মাত্র জন্মানো শিশুর ত্বকের কেমন ঘ্রাণ-মাখানো, পাচ্ছিস, মা?
হ্যাঁ, বাবা। পাচ্ছি। এত বিশাল নদীর সব স্রোত মিলেও কাজল আর বেবি-পাউডারের গন্ধটুকু ভাসিয়ে নিতে পারছে না।
কতকাল আগে থেকে মায়েরা তার বাচ্চাদের কাজল পরিয়ে দিত! হিমালয় পর্বত কলুতুর জন্ম দেওয়ার পর থেকে এই নদীতে পাউডার আর কাজলের গন্ধ মেয়েদের নাকে শিশুর ত্বকের ঘ্রাণ হয়ে তাদের মা হতে বলেছে। মা নদী! মা মাটি! বাংলার নদী-মাটি-জল! কিন্তু সেই গন্ধের সঙ্গে কারা যেন রক্তও মাখিয়ে দিয়েছে, মা!
রোদ, বাবা। ওটা রৌদ্রের কাজ। সে মেঘের ভেতর পাখি হয়ে আছে কেন? তার তাপ আর নেই? এই রক্তকে তার তাপে পুড়িয়ে দিলেই তো নদীর জলে শুধু বাচ্চার ত্বকের গন্ধের সঙ্গে কাজল আর পাউডারের গন্ধ ভাসত। বাংলার মেয়েরা মা হয়ে উঠত। হয়ে উঠত নদী, মাটি আর জল। কিন্তু দ্যাখো, রোদের তাপের অভাবে তাদের শরীরের জল-মাটিতে কেমন রক্ত মিশে যাচ্ছে!