একজন সম্পূর্ণ মানুষ

লেখক: সৈয়দ মোহাম্মদ শাহেদ

দেখতে দেখতে তাঁর মহাপ্রস্থানের দু-মাস পার হয়ে গেল। পরিবারের কয়েকজন ছাড়া তাঁকে সমাধিস্থ করার সময় তেমন কেউ ছিল না। টিভির পর্দায় দেখা গেছে সে-দৃশ্য; কেন যেন বাস্তব মনে হয়নি! বারবার মনে হয়, একটি সুশ্রী পাঞ্জাবি আর চওড়া পাজামা পরে স্মিত হেসে এখনই সামনে এসে দাঁড়াবেন, বলবেন, তোমাদের জন্য অপেক্ষা করছি। কিন্তু দিন যাবে, মাস যাবে, বছর যাবে – তিনি আর আসবেন না!
আনিসুজ্জামান আমাদের কালের একজন কিংবদন্তি-পুরুষের নাম। ১৯৩০-এর দশকের শেষ দিকে তাঁর জন্ম, যখন পৃথিবী ভয়াবহ দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের অশনিসংকেত শুনছে। যুদ্ধের সাইরেন ও ব্ল্যাকআউট, ’৪৩-এর মন্বন্তরে ডাস্টবিনে উচ্ছিষ্ট খাবার নিয়ে মানুষে-কুকুরে কাড়াকাড়ি, ’৪৬-এর সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় নিরীহ হিন্দু-মুসলমানের মর্মান্তিক মৃত্যু – এসবের মধ্যে মহানগরী কলকাতায় তাঁর শৈশব কেটেছে। ’৪৭-এর দেশভাগ বাঙালি মুসলমানের মন ও জীবনে যে সংকট ও দোলাচল সৃষ্টি করেছিল, তার স্রোত আনিসুজ্জামানের পরিবারকে নিয়ে এলো পূর্ববাংলার খুলনায়। কিন্তু কলকাতার প্রতিষ্ঠিত ডাক্তার এ.টি.এম. মোয়াজ্জম ঢাকাতে স্থিত হবেন, এটিই তো স্বাভাবিক। ১৯৪৮ সাল থেকে আনিসুজ্জামানের স্থায়ী আবাস হলো বিকাশমান ঢাকায় – সদরঘাট থেকে ব্রিটানিয়া সিনেমা হল পর্যন্ত যার মূল পরিধি। তারপর দ্রুত বিকশিত হয়েছে ঢাকা মহানগরী – আয়তনে, দালানকোঠায়, অর্থনীতিতে, রাজনীতিতে, সংস্কৃতিতে। আর তার মধ্যেই ধীরে ধীরে বিকশিত হয়েছেন একজন আনিসুজ্জামান।
গুণ, রূপ ও প্রকাশে বহু পর্ব ও মাত্রা নিয়ে গড়ে উঠেছিল আনিসুজ্জামানের সে-সমন্বিত সত্তা, তার মূল নাড়ি কোনটি? নামের আগে অধ্যাপক, এমেরিটাস অধ্যাপক, জাতীয় অধ্যাপক ইত্যাদি পদবি যুক্ত করে আমরা তাঁর শিক্ষক পরিচয়কেই সামনে নিয়ে আসি। তাতেই তিনি খুশি; কিন্তু আমরা বোধহয় নই। তাই আবার শিক্ষাবিদ কথাটাকে সামনে আনি। তবে পদ ও পদবি কাড়াকাড়ির এই দেশে শিক্ষাবিদেরও অভাব নেই! ক্লাস না নিয়ে, গবেষণা না করে, প্রকাশনা না করে, সেমিনার আর রাজনীতি-সংস্কৃতির মঞ্চ দখল করা শিক্ষাবিদ থেকে তিনি এখানেই সম্পূর্ণ আলাদা। সর্ব অর্থেই তাঁর প্রথম পরিচয় শিক্ষক।
আনিসুজ্জামান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে শিক্ষকতা শুরু করেছিলেন মাত্র ২২ বছর বয়সে। তাঁর প্রথম দিকের ক্লাসে একজন ছাত্রীকে বকা দেওয়ায় ছাত্রীটি বলেছিল, স্যার আপনি আমার ছেলের বয়সী। তারপর দীর্ঘ পথচলা। প্রথম এক দশক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। এখনকার মতো দ্রুত পদোন্নতির সুযোগ বা হাহাকার সে-সময়ে ছিল না। ১৯৬০-দশকের মাঝামাঝি প্রভাষক থেকে সহকারী অধ্যাপক (তখনকার পরিচয় সিনিয়র লেকচারার) হন। তারপর রিডার (বর্তমান সহযোগী অধ্যাপক) হয়ে যোগ দিলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে। সেখানে দেড় দশকে নানা পর্বে অধ্যাপক, বিভাগীয় প্রধান, প্রাধ্যক্ষ ও কলা অনুষদের ডিন। আশির দশকের মাঝামাঝি আবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে ফিরে আসা। ২০০৩ সালে এই বিভাগ থেকেই অবসর। এরপর বিভাগে সংখ্যাতিরিক্ত অধ্যাপক। সে-পদে নিয়োগ পেতে তাঁর মতো ব্যক্তিত্বেরও বছরখানেক বসে থাকতে হয়েছিল। মনে হয়, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দলীয় আনুগত্যের সঙ্গে সম্পর্কিত কোনো শিক্ষকের স্বার্থ ছিল বলে। তারপর ২০০৮ সালে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে বাংলা বিভাগের এমেরিটাস অধ্যাপক। মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্‌র মৃত্যুতে শূন্য হওয়া এ-পদ পূরণ হয় চার দশক পরে। ২০১৮ সালে বৃত হন জাতীয় অধ্যাপক পদে। ততদিনে শুধু বাংলার নন, বাংলাদেশের নন, সমগ্র বাংলাভাষী মানুষের ‘স্যার’-এ রূপান্তরিত হয়েছেন তিনি।
‘বিভাগের প্রতি আনুগত্য, ছাত্রের প্রতি কর্তব্য’ – এই নীতিবাণী নিয়ে পুরো পাঁচ দশক শিক্ষকতা করেছেন আনিসুজ্জামান। নিয়মিত শিক্ষকতার শেষদিক পর্যন্ত ক্লাসে পড়ানোর প্রস্তুতি নিতেন প্রয়োজনীয় বইপত্র পড়ে। পঠিত বিষয়ের সর্বশেষ প্রকাশিত প্রাসঙ্গিক সহায়কগ্রন্থ থাকত তাঁর সংগ্রহে। অবসর নেওয়ার বছর-দুই আগে নতুন একটা কোর্স দেওয়া হলো তাঁকে। মজা করে বললেন, এ-বয়সে নতুন করে বই পড়ার কোনো মানে হয়? ক্লাস না নেওয়া অথবা গল্প করে ক্লাসের সময় পার করা খ্যাতনামা শিক্ষকদের থেকে এখানেই তিনি পৃথক। অনুশীলনী ক্লাসের খাতা দেখতেন যত্ন নিয়ে; ভুল বানান আর বাক্য লাল কালিতে শুদ্ধ করে দিতেন। আমরা অনেকে ভাবতাম, স্যারের সময়ের অপচয়! কলাভবনের পাঁচতলার সুপরিসর পরীক্ষার হলে বেঞ্চের সারির সংকীর্ণ গলিপথে হেঁটে যেতেন দু-পাশে পরীক্ষার্থীদের ওপর সতর্ক দৃষ্টি রেখে। মাঝেমাঝে নকলও ধরে ফেলতেন। একবার এক সদ্য বিবাহিতা ছাত্রী নকল লিখেছিল হাতের মেহেদির ফাঁকে ফাঁকে আর শাড়ির আঁচলে। স্যার তাঁর নকল ধরে ‘রিপোর্ট’ করে দিলেন।
ভুল করলে তাঁর দায় গ্রহণের সাহস ছিল অনেকের জন্য অনুকরণের অতীত। নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি কিছুদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রশ্নপত্র ‘আউটে’র একটা প্রবণতা শুরু হয়েছিল। সেটি ঠেকানোর জন্য বিভাগীয় পরীক্ষা কমিটির সভাপতি কখনো কখনো নিজে পরীক্ষার হলে প্রশ্ন পৌঁছে দিতেন। স্যার একবার এরকম প্রশ্ন পৌঁছে দিতে গিয়ে দেখেন ওইদিন সকালে পরীক্ষা ছিল, দেরি হয়ে গেছে। আনিসুজ্জামান পরীক্ষার হল থেকে দোতলায় নেমে এসে নোটিশ দিলেন, এর জন্য এককভাবে তিনি দায়ী। পরীক্ষা কমিটির অন্য সদস্যদের ওপর একটুও দোষ চাপালেন না।
বিভাগের বড়-ছোট সব কাজেই যুক্ত থাকার চেষ্টা করতেন তিনি। প্রথম জীবনে মুহম্মদ আবদুল হাইয়ের সাহিত্য পত্রিকায় অন্যতম প্রধান সহযোগী ছিলেন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের যে-কোনো কাজের মূল চালিকাশক্তিই ছিলেন আনিসুজ্জামান। শেষদিকে অসুস্থ শরীর নিয়েও যোগ দিতেন ঢাকার বাংলা বিভাগের সভা-সেমিনারে, এমনকি শ্রোতা হিসেবেও – বক্তা হয়তো তাঁরই কোনো ছাত্রছাত্রী। ‘অনার বোর্ড’ বানানোর জন্য বিভাগীয় প্রধানদের তালিকা তৈরির মতো ক্ষুদ্র কাজের ক্ষেত্রেও তাঁর নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার ঘাটতি হতো না; অথচ অভিমানবশত সেই বিভাগেরই সভাপতি হতে রাজি হননি তিনি।
অনেক ছাত্রের সঙ্গে স্যারের একটা ব্যক্তিগত সম্পর্ক, এমনকি পারিবারিক সম্পর্কও গড়ে উঠেছিল। গত শতকের ষাটের দশক থেকে বর্তমান শতকের প্রথম দশক পর্যন্ত বহু ছাত্রের সঙ্গে ছিল তাঁর নিয়মিত যোগাযোগ। ষাটের দশকে এক ছাত্র রাজনৈতিক কারণে পুলিশি তৎপরতায় ক্যাম্পাসে যেতে পারছিল না। স্যার নিজে গিয়ে তাঁর পরীক্ষার ফিস জমা দিয়েছিলেন যাতে পরে ছাত্রটি পরীক্ষা দিতে পারে। একই দশকের আরেকজনের পরীক্ষার ফিসে বিশ টাকা ঘাটতি পড়ল; স্যার সে-টাকা দিলেন। দুজনই পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হিসেবে খ্যাতনামা হয়েছিলেন।
গবেষণা-তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে আনিসুজ্জামান ছিলেন নিষ্ঠ ও আন্তরিক। তবে শেষদিকে অন্যান্য কাজের চাপে অভিসন্দর্ভের-খসড়া সংশোধন করতে তাঁর বিলম্ব হতো। তথ্য ও ভাষা সংশোধনে তাঁর জুড়ি ছিল না। রেফারেন্স ও সহায়কগ্রন্থ ছিল তাঁর নখদর্পণে। সে-সাহায্য তিনি নিজের গবেষকছাত্র ছাড়া অন্য গবেষকদেরও করতেন অকাতরে। আমি তাঁর গবেষকছাত্র ছিলাম না। তবুও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসের বাসায় পরপর দশ-এগারো দিন গভীর রাত পর্যন্ত পরিশ্রম করে তিনি আমার অভিসন্দর্ভের খসড়া অনেকটা ত্রুটিমুক্ত করেছিলেন। তাঁর বিপুল সংগ্রহ থেকে অনেককেই রেফারেন্স-বই দিয়েছেন তিনি; অনেক সময় তা ফেরতও পাননি। নিজের গ্রন্থাগার-কার্ডে অন্যদের জন্য বই তুলে দিতেন; অনেক সময় বাসায় পর্যন্ত পাঠিয়ে দিতেন – হয়তো সে-বইয়ের ফরমাশ পেয়েছিলেন টেলিফোনে। রেফারেন্সের ক্ষেত্রে অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাকের পর আনিসুজ্জামানই ছিলেন সকলের ভরসার স্থল, যেন ‘Living Encyclopedia’।
তবে শিক্ষকজীবনে অপ্রত্যাশিত আঘাত যে পাননি, তা নয়। স্বাধীনতার পর অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাকের আগ্রহে ড. নীলিমা ইব্রাহিম ও ড. আহমদ শরীফের সঙ্গে অধ্যাপক করে যখন তাঁকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে আনার প্রক্রিয়া চলছিল, তখন বিভাগে এক ‘তথাকথিত’ আন্দোলন গড়ে তোলা হয়। কয়েকজন ছাত্রও এতে সক্রিয় ছিলেন। সেই ছাত্রদের একজনকে পরে তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি দিয়েছিলেন; একজন সপরিবারে তাঁর আজীবনের ভক্ত হয়েছিল। তবে স্যার প্রেস বিবৃতি দিয়ে সেবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আসবেন না বলে জানিয়ে দিলেন। আবার আশির দশকে যখন তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে অধ্যাপক পদের জন্য আবেদন করলেন, তখন তাঁর দরখাস্ত বিবেচনায় বছরখানেকের বেশি লেগেছিল অনেকটা উদ্দেশ্যমূলকভাবে। এ-রীতি তখন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গিয়েছিল; তবে আনিসুজ্জামানের ক্ষেত্রে সেটি না করলেই ভালো হতো। নিয়োগ পাওয়ার পরও উপাচার্য ফোন করে তাঁকে পরে যোগদান করতে বললেন; এর পেছনে ছিল আসন্ন ডিন নির্বাচনে ভোটের হিসাব-নিকাশ। পরে সেই উপাচার্যই কয়েকবার স্যারের সাহায্যপ্রার্থী হয়েছিলেন। যোগদানের পরও বিড়ম্বনা থামেনি। ‘প্রথাবিরোধী’ বলে খ্যাত একজন শিক্ষক আনিসুজ্জামানের থেকে সিনিয়র দাবি করে রেজিস্ট্রার অফিসে আবেদন করেছিলেন। শিক্ষকটি তাঁর প্রাক্তন ছাত্র এবং আইনের মারপ্যাঁচে তিনি ঠিকই সিনিয়রিটি আদায় করে নিয়েছিলেন। তাঁর অস্বাভাবিক মৃত্যুর পরে আনিসুজ্জামান শিক্ষকটির পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদানের পর থেকেই সেখানে আনিসুজ্জামানের প্রভাবশালী অবস্থান ছিল, বিশেষত স্বাধীনতার পরে। ডিন, সিন্ডিকেট, সিনেট, শিক্ষক সমিতি – সব নির্বাচনেই তিনি সাধারণত বিপুল ভোটে জয়লাভ করতেন। ১৯৮৫ সালে উপাচার্য প্যানেলেও জয় পান তিনি; কিন্তু চ্যান্সেলরের বিরূপতায় নিয়োগ পাননি। একজন সাপ্তাহিক পত্রিকার সম্পাদক এ-বিষয়ে চ্যান্সেলরকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন। সামরিক-শাসকের উত্তর ছিল, over my deadbody। অথচ তার আগের বছরেই আনিসুজ্জামানকে দেওয়া হয়েছে রাষ্ট্রীয় সম্মাননা একুশে পদক, তাও শিক্ষায় অবদানের জন্য। ধরে নেওয়া যায়, তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী সমর্থকরা এ-বিষয়ে অবদান রেখেছিল। তার রেশ পাওয়া যায়, এ-সময়ে তাঁর চরিত্রহনন করে প্রচারিত এক বেনামি লিফলেটে; তাতে রুচি ও শ্লীলতার সীমা লঙ্ঘিত হয়েছিল। কাপুরুষ শত্রুরা প্রকাশ্যে এ-লিফলেটের সঙ্গে তাদের সংস্রব অস্বীকার করেছিল। তবে এর অল্প সময়ের মধ্যে তাঁকে ঢাকা আসতে না-দেওয়ার জন্য চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক-কর্মচারীদের আন্দোলন, চট্টগ্রাম রেলস্টেশনে অভূতপূর্ব বিদায়ের দৃশ্য, প্রভৃতিতে তাঁর প্রতি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের ভালোবাসার প্রকাশ ওই ক্ষতকে ঢেকে দিয়েছিল।
শিক্ষকজীবনের প্রথম পর্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-রাজনীতিতে আনিসুজ্জামান অত্যন্ত সক্রিয় ছিলেন। ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের সময় ছাত্রদের সঙ্গে একদল শিক্ষকও যোগ দিয়েছিলেন। তখন আইয়ুবী কালাকানুন বাতিল করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে পথে নেমেছিলেন শিক্ষকরা। সে-সময়ের শিক্ষক সমিতির সভাপতি প্রথিতযশা ইতিহাসবিদ এ.বি.এম. হবীবুল্লাহর নেতৃত্বে তাতে সামনের সারিতে ছিলেন আনিসুজ্জামান – সঙ্গে ইংরেজি বিভাগের সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী ও আহসানুল হক, সমাজবিজ্ঞানের কে.এ.এম. সাদ উদ্দিন, ভূগোলের মনিরুজ্জামান মিয়া, পদার্থবিজ্ঞানের আবদুল লতিফ চৌধুরী প্রমুখ। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-রাজনীতিতেও আনিসুজ্জামান শুধু সক্রিয় নয়; মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ধারকপক্ষের নেতা ছিলেন। কিন্তু আশির দশকের মাঝামাঝি ঢাকায় ফিরে এসে শিক্ষক-রাজনীতি থেকে নিজেকে দূরেই রেখেছিলেন; যদিও আদর্শিক ইস্যুগুলোতে তিনিই আবার সবার সামনে থাকতেন। তিনি মনে করতেন যে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পক্ষের শিক্ষকদের দলে এই আদর্শে বিশ্বাস করে না এমন অনেক শিক্ষক ঢুকে পড়েছেন, এমনকি নেতাও হয়ে গেছেন। আরো পরে শিক্ষকদের অন্ধ দলীয় আনুগত্য ও স্তুতিবাদিতায় তিনি বিস্মিত ও বিরক্ত হয়েছিলেন। তাঁর মনোভাব ছিল, রাজনৈতিক আনুগত্য ও চর্চার ক্ষেত্রে একজন শিক্ষক ও রাজনীতিকের পথচলা অথবা কথা বলা ভিন্ন রকম হবে। পদ ও সুবিধার জন্য যারা দল করে, আদর্শ ও দলের দুঃসময়ে তাদের খুঁজে পাওয়া যায় না। পঁচাত্তরের মর্মান্তিক ঘটনার পর এটা আর একবার প্রমাণিত হয়েছিল, যদিও সে-কথা এখন সবাই ভুলে গেছে।
গবেষক হিসেবে আনিসুজ্জামানের খ্যাতির শুরু ২৫ বছর বয়সে পিএইচ.ডি ডিগ্রি অর্জন করে। বাংলা বিভাগের প্রধান মুহম্মদ আবদুল হাইয়ের আগ্রহে ও তত্ত্বাবধানে তাঁর আগে দুজন পিএইচ.ডি অর্জন করেন – অধ্যাপক আশুতোষ ভট্টাচার্য ১৯৫৯ সালে, অধ্যাপক নীলিমা ইব্রাহিম ১৯৬১ সালে; এঁরা দুজন এম.এ পাশ করেছিলেন যথাক্রমে ১৯৩২ ও ১৯৪৩ সালে। অত অল্প বয়সে ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করায় ডক্টর অভিধাটি তাঁর নামের সঙ্গে এমনভাবে সেঁটে গিয়েছিল যে, তার বিযুক্তি ছিল কঠিন। উল্লেখ্য, অধ্যাপকের পরে ও নামের আগে ড. যুক্ত করা তখনো শুরু হয়নি। গবেষক হিসেবে আনিসুজ্জামানের বড় দিক উপকরণ ও তথ্য সংগ্রহের দক্ষতা; অসাধারণ স্মৃতিশক্তি তাঁর সে-কাজে সহায়ক হয়েছিল। অথচ তথ্যের সংগ্রহকে তিনি শুধু ‘গুদামে’ পরিণত হতে দেননি; নানা তত্ত্ব ও মৌলিক চিন্তার সমন্বয়ে সূক্ষ্ম বিশ্লেষণের মাধ্যমে সেগুলোকে নবজীবন দিয়েছেন তিনি।
পিএইচ.ডি পর্যায়ের পর আনিসুজ্জামানের প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণা শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ে। অধ্যাপক ডিমকের আগ্রহে ইয়ং বেঙ্গল নিয়ে কাজ করেছেন সেখানে। পরে ভিজিটিং অধ্যাপক হিসেবে কাজ করেছেন কলকাতার আবুল কালাম আজাদ ইনস্টিটিউট (MAKAIS), নর্থ ক্যারোলিনা বিশ্ববিদ্যালয়, প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয়, বিশ্বভারতী ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে। কাজ করেছেন ইন্ডিয়া অফিস গ্রন্থাগার, ব্রিটিশ মিউজিয়াম, জাতিসংঘ বিশ্ববিদ্যালয়ে। জ্ঞানভাষণ (Learned Lecture) দিয়েছেন সারা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ জ্ঞানপীঠগুলোতে।
আনিসুজ্জামানের পিএইচ.ডি অভিসন্দর্ভের গ্রন্থরূপ মুসলিম-মানস ও বাংলা সাহিত্য (১৯৬৪)। বাঙালি মুসলমানের ভাবজগৎ ও সাহিত্যে এর প্রতিফলন ওই গ্রন্থের মূল প্রতিপাদ্য। হয়তো এর পেছনে ছিল তাঁর দাদা শেখ আবদুর রহিমের (১৮৫৯-১৯৩১) ছায়া। সাংবাদিক-সম্পাদক শেখ আবদুর রহিম উনিশ শতকের শেষদিকে প্রকাশ ও সম্পাদনা করেছিলেন একাধিক সাময়িকী। হযরত মুহম্মদের জীবনচরিত ও ধর্মনীতিসহ (১৮৮৮) মাতৃভাষায় ইসলাম বিষয়ক অন্তত দশটি গ্রন্থের রচয়িতা শেখ আবদুর রহিমের ধ্যান ছিল, বাঙালি মুসলমানদের মাতৃভাষার মন্দিরে নিয়ে এসে তাদের মধ্যে জাতীয় সাহিত্য রচনার প্রেরণা জাগানো। মুসলিম বাংলার সাময়িকপত্র (১৯৬৯) আনিসুজ্জামানের একই ধারার কাজ। সত্তরের দশকে তাঁর চিন্তা ধাবিত হয় বাঙালির স্বরূপ সন্ধানে। স্বরূপের সন্ধানে (১৯৭৬) এই চিন্তারই ভাষ্য। প্রসঙ্গত, ওই সময়েই বাংলাদেশের রাজনীতিতে আমরা বাঙালি, না মুসলমান – এই তর্ক নতুন করে তুলে একটা নতুন জাতীয়তাবাদী ধারা তৈরির বীজ বপন চলছিল।
বাংলা গদ্যের ইতিহাস পুনর্বিন্যাস আনিসুজ্জামানের গবেষণাকর্মের আর একটি বড় প্রান্ত। সাহিত্যের ইতিহাসবেত্তাদের খাতায় মূলত বাংলা গদ্যের সূচনা ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ (১৮০০) উত্তর যুগে; যদিও এর পূর্বেরও কিছু খুচরা উপকরণ সম্পর্কে তাদের ধারণা ছিল। আশির দশকের তিনদিনের এক বক্তৃতা, যা পরে পুরোনা বাংলা গদ্য (১৯৮৪) নামে প্রকাশিত হয়। তাতে আনিসুজ্জামান উনিশ শতকের পূর্ববর্তী বাংলা গদ্যের একটা ধারাবাহিক বিবরণ তুলে ধরেন। এই গবেষণার শুরু অবশ্য লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ে SOAS-এ ফেলো হিসেবে (১৯৭৪) ‘প্রাক-উনিশ শতকের বাংলা গদ্য’ নিয়ে কাজে। এর ধারাবাহিকতায় তিনি মূলত আঠারো-উনিশ শতকে ইংরেজদের বিভিন্ন বাণিজ্যকুঠি থেকে লেখা চিঠির সংকলন করেন Factory Correspondence and other Bengali Documents in the India Office Library and Records গ্রন্থে। গ্রন্থটি লন্ডন থেকে ১৯৮১ সালে প্রকাশিত হয়। পরের বছর এর কিছু নির্বাচিত চিঠি সংকলন করেন আঠারো শতকের বাংলা চিঠিতে (১৯৮২)। পরবর্তী সময়ে গবেষকরা এরই সূত্র ধরে পুরনো বাংলা গদ্যের আরো নমুনা খুঁজে পেয়েছিলেন। পুরনো বাংলা গদ্যের একটি সংকলন গ্রন্থনের কাজও শুরু করেছিলেন আনিসুজ্জামান। সে-কাজ অসমাপ্তই রয়ে গেল।
বাংলা সাহিত্যের যুগবিভাগ নিয়েও আনিসুজ্জামান নতুন করে ভেবেছিলেন। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে প্রাচীন, মধ্য ও আধুনিক যুগে ভাগ করার প্রতিষ্ঠিত রীতি ‘arbitrary’ কি না, সে-প্রশ্ন তিনি তুলেছিলেন। কয়েকজন পণ্ডিতের মত আমলে নিয়ে তাঁর মনে হয়েছিল, নতুন উপকরণের আলোকে পঞ্চদশ শতক পর্যন্ত বাংলা সাহিত্যের ধারাবাহিক প্রথম পর্ব। এই পর্ববিভাগে শ্রী চৈতন্যের প্রভাবে বাংলা সাহিত্যের নবসৃষ্টিকে তিনি বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছিলেন। বাংলা সাহিত্যের আধুনিক যুগের উন্মেষের ক্ষেত্রে তিনি অষ্টাদশ শতকের শেষে মুদ্রণযন্ত্রের প্রচলনকে নিয়ামক বলে মনে করতেন। বাংলা সাহিত্যের যুগবিভাগ নিয়ে তাঁর একাধিক উল্লেখযোগ্য প্রবন্ধ রয়েছে।
আনিসুজ্জামান মনে করতেন, সমাজের বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে পাওয়া যায় সাহিত্যের প্রকৃত স্বরূপ। তাই ইতিহাস রচনায় তিনি সমাজ ও সংস্কৃতির পটভূমিকায় সাহিত্যের বিন্যাস লক্ষ্য করবার পক্ষপাতী। তাতে সমাজ ও সংস্কৃতির সর্বতোমুখী বিকাশের সঙ্গে, মনীষার জাগরণের সঙ্গে সাহিত্যের অগ্রগতির সম্পর্ক সৃষ্ট হয় বলে তাঁর বিশ্বাস। এর প্রথম রূপায়ণ দেখা যায় তাঁর পিএইচ.ডি অভিসন্দর্ভে, যার প্রথম পর্ব সে-সময়ের বাংলার ইতিহাস। বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত তাঁর সম্পাদিত বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসের দুখণ্ডে (১৯৮৭, ২০০৮) তাঁর চিন্তার বাস্তবায়ন দেখা যায় যখন সাহিত্যের ইতিহাসের বইতে ভূগোল, ইতিহাস, নৃতত্ত্ব, শিল্পকলা ও ধর্ম বড় স্থান পায়।
১৯৭৫-৯৫ পর্বের দু-দশকে আনিসুজ্জামানের চিন্তাধারায় সংস্কৃতির বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছে। জাতিগঠন, ভাবজগৎ, সৃষ্টিশীলতা, পরিচয়ের স্বাতন্ত্র্য (identity) – এ সবকিছুতেই যে সংস্কৃতি একটি নিয়ামক-উপাদান তা তুলে ধরেছেন তিনি।
সংস্কৃতির সঙ্গে ঐতিহ্যের অবিভাজ্য বন্ধন, ঐতিহ্য ও আধুনিকতার সংশ্লেষণ, এমনকি সংস্কৃতির সঙ্গে উন্নয়নের সম্পর্কও তাঁর লেখায় স্থান পেয়েছে। তাঁর শেষ বিচারে, সংস্কৃতি বহুত্ববাদী এবং বর্তমান বিশ্বের রূপান্তরে সংস্কৃতিকে এড়িয়ে যাওয়া যাবে না। ‘Social Aspects of Endigenous Intellectual Creativity’ (1978), ‘Tradition and Modernity’ (1978), ‘Culture and Thought’ (1982), ‘Culture and Tradition’ (1983), ‘Creativity, Reality and Identity’ (1993), ‘Cultural Pluralism’ (1993) প্রভৃতি সংকলন ও বক্তৃতায় তাঁর সংস্কৃতি-চিন্তা বিধৃত। তাঁর এসব চিন্তায় মিশরীয় বুদ্ধিজীবী আনোয়ার আবদেল-মালেকের প্রভাব থাকতে পারে।
গবেষণার জগতে নতুন নতুন বিষয় সংযোজনের ক্ষেত্রে আনিসুজ্জামানের এক রকমের ক্ষিপ্রতা ছিল। এর একটি প্রমাণ তাঁর নব চর্যাপদ নিয়ে অবলোকন। ১৯৮৭ সালে বাংলা একাডেমির বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস প্রথম খণ্ডে তিনি নব চর্যাপদের আলোচনা অন্তর্ভুক্ত করেন; প্রবন্ধটিও তাঁর লেখা। উল্লেখ্য, শশিভূষণ দাশগুপ্ত-সংগৃহীত নব চর্যাপদ তখনো প্রকাশিত হয়নি; কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুথিশালায় গিয়ে পাণ্ডুলিপি দেখে তিনি ওই প্রবন্ধ লেখেন। তাঁর আগে সাহিত্যের ইতিহাসে নব চর্যাপদের কোনো স্থান ছিল না।
সম্পাদিত সংকলনের বিষয় নির্ধারণে আনিসুজ্জামান এর সামাজিক প্রয়োজন ও সাহিত্যিক উপযোগিতা – উভয়কেই সমান গুরুত্ব দিয়েছেন। এর প্রথম প্রকাশ রবীন্দ্রনাথ (১৯৬৮)। সে-সময়ে পাকিস্তান সরকারের রবীন্দ্র-নির্বাসনের অপচেষ্টার বিরুদ্ধে এই সংকলন সাংস্কৃতিক-রাজনীতিক কারণে ছিল জরুরি। আবার এতে রবীন্দ্রনাথকে ঘিরে যে-সমস্ত প্রবন্ধ রয়েছে, তা অ্যাকাডেমিক বিবেচনায়ও অত্যন্ত মূল্যবান। একই দশকের মুসলিম বাংলার সাময়িকপত্র (১৯৬৯) সংকলনে বাঙালি মুসলমানদের সম্পাদিত পত্র-পত্রিকা থেকে যে-অংশগুলো উদ্ধৃত করেছেন তা একদিকে গবেষণার দুর্লভ উপকরণ; অন্যদিকে গবেষকের কঠোর পরিশ্রম ও তীক্ষ্ণ দৃষ্টির পরিচয়বহ। ১৯৬০-এর দশকে মোনায়েমি-ফতোয়ায় পশ্চিমবঙ্গ থেকে বই আনা প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। বাংলা বিভাগের প্রধান অধ্যাপক আবদুল হাইয়ের উদ্যোগে বিভাগ থেকে প্রয়োজনীয় গ্রন্থগুলো নতুন করে সম্পাদনা ও প্রকাশ করা হয়। এর মধ্যে আনিসুজ্জামানের ভাগে পড়েছিল বিদ্যাসাগর ও দীনবন্ধু মিত্রের সংগ্রহ।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা লাভের পর বাংলা একাডেমি শহিদ লেখকদের রচনাবলি প্রকাশের উদ্যোগ নেয়। প্রাথমিক তালিকায় আনিসুজ্জামানের দায়িত্ব ছিল শহীদুল্লা কায়সার রচনাবলী সম্পাদনা। কিন্তু শিক্ষাগুরু মুনীর চৌধুরীর পরিবারের আগ্রহে তিনি মুনীর চৌধুরী রচনাবলী সম্পাদনা করেন। ১৯৮২-৮৬ পর্বে প্রকাশিত এই সংকলনে রচনাবলি সম্পাদনার নানা রীতি ও দক্ষতার পরিচয় আছে। মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ রচনাবলী (১৯৯৪, ১৯৯৫) প্রথম দু-খণ্ডের সম্পাদনায় এই রীতি আরো স্থিত হয়েছিল; বেড়েছিল দক্ষতাও। তবে সম্পাদনার ক্ষেত্রে তাঁর দক্ষতা ‘মুন্সিয়ানা’র পর্যায়ে পৌঁছেছিল চার খণ্ডের নজরুল রচনাবলী (১৯৯৩) সম্পাদনায়। ষাটের দশকে কেন্দ্রীয় বাংলা উন্নয়ন বোর্ড আবদুল কাদিরের সম্পাদনায় প্রকাশ করেছিল নজরুল রচনাবলী। অধ্যাপক মোহাম্মদ আবদুল কাইউম, অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম ও অন্যান্য সহযোগে আনিসুজ্জামান এর নতুন সংস্করণ করেন। সম্পাদনার উৎকর্ষ ও উন্নত মুদ্রণ-প্রযুক্তির ফলে বাংলা একাডেমি-প্রকাশিত চার খণ্ডের নজরুল রচনাবলী একই সঙ্গে প্রামাণ্য ও আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে।
সম্পাদনার ক্ষেত্রে আনিসুজ্জামানের শ্রেষ্ঠ কীর্তি বাংলা একাডেমির পাঁচ খণ্ডে পরিকল্পিত বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস লিপিবদ্ধ করার কাজ প্রথম পূর্ণতা পায় দীনেশ চন্দ্র সেনের বঙ্গভাষা ও সাহিত্য (১৮৯৬) গ্রন্থে। প্রযুক্তির অনুপস্থিতি ও যোগাযোগ-সংকটের ওই যুগে ব্যক্তিগতভাবে উপকরণ সংগ্রহ করে দীনেশ সেনের ওই বিশাল মাপের কীর্তির পূর্ণ মূল্যায়ন এখনো হয়নি! এর চার যুগ পরে সুকুমার সেন এই পূর্ণতাকে সম্পূর্ণতা দেন বাঙ্গালা সাহিত্যের ইতিহাস (১৯৪০, অখণ্ড) গ্রন্থে। সুকুমার সেন পরে এটি পাঁচ খণ্ডে বিন্যস্ত করেন, যাতে প্রচুর নতুন উপকরণ যুক্ত হয়। তবে দুটোই ছিল ব্যক্তির উদ্যোগ। আনিসুজ্জামান এই ইতিহাস-রচনাকে পরিণত করেন সমবায়ী কাজে; তাঁর মডেল ছিল ১৯৪০-এর দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-প্রকাশিত History of Bengal। আনিসুজ্জামান সাহিত্যের ইতিহাসকে স্থাপন করেন সমাজ-ইতিহাস-ভূগোল-নৃতত্ত্ব-শিল্পকলার বৃহত্তর পরিসরের অংশ হিসেবে। একটি পূর্ব পরিকল্পনা করে প্রতিটি অধ্যায় ওই বিষয়ের বিশেষজ্ঞ-পণ্ডিত দিয়ে লিখিয়ে অন্য পণ্ডিত দিয়ে নিরীক্ষা করানো হয়। দ্বিতীয় খণ্ডও তৈরি হয় একই প্রক্রিয়ায়। এ-কাজে তাঁর সঙ্গে ছিলেন অধ্যাপক আহমদ শরীফ ও অধ্যাপক মমতাজুর রহমান তরফদারের মতো পণ্ডিতরা। এর দ্বিতীয় খণ্ড তৈরির সময় তিনি বাংলা একাডেমিতে নিয়মিত সাপ্তাহিক অফিস করতেন; গ্রন্থাগার থেকে বই এনে প্রতিটি উদ্ধৃতির বানান ও বাক্য মূল লেখার সঙ্গে মেলাতেন; লাল কালি দিয়ে প্রমিত বানান বসাতেন; প্রবন্ধের অপ্রয়োজনীয় অংশ বাদ দিতেন; অনেক সময় নিজে অন্যের প্রবন্ধে বাক্য, এমনকি অনুচ্ছেদ পর্যন্ত লিখে দিতেন। সুব্রত বড়ুয়ার সহযোগিতায় বাংলা একাডেমির নজরুল কক্ষে ওই সম্পাদনা কাজ ছিল দেখার মতো।
গবেষণা-পত্রিকা সম্পাদনার ক্ষেত্রেও তাঁর দক্ষতা ছিল অসামান্য। এক্ষেত্রে তাঁর হাতেখড়ি হয় মুহম্মদ আবদুল হাই-সম্পাদিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সাহিত্য পত্রিকায় (১৯৫৭)। স্বাধীনতার পরে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় বাংলা বিভাগ-প্রকাশিত পাণ্ডুলিপির (১৯৭৩) সম্পাদক হন তিনি। তাঁর সম্পাদনাকালে এই পত্রিকাটি গবেষণা-প্রবন্ধ প্রকাশের ক্ষেত্রে বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেছিল। ১৯৮০-র দশকের শেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পত্রিকার (১৯৮৯) সম্পাদক হন তিনি। সাময়িকপত্র বা সাহিত্যপত্রিকা সম্পাদনার ক্ষেত্রেও তাঁর দক্ষতা ও যোগ্যতার চিহ্ন রয়েছে কালি ও কলমে (২০০৪)। সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি প্রায় ক্ষেত্রে আলংকারিক পদ হলেও তাঁর ক্ষেত্রে ছিল ভিন্ন। তিনি এ-পত্রিকার লেখা-সংগ্রহ থেকে প্রুফ দেখা পর্যন্ত যুক্ত ছিলেন সম্পাদক আবুল হাসনাতের পাশাপাশি। কলকাতার শিশু-সাহিত্য সংসদের আহ্বানে সাদা মেঘের ভেলা (২০১৩) ও ছুটির নিমন্ত্রণে (২০১৪) নামে দুটি শিশু-কিশোর বার্ষিকীও সম্পাদনা করেছেন। এর বাইরেও রয়েছে সম্পাদক হিসেবে আনিসুজ্জামানের নামসংবলিত বহুসংখ্যক স্মারকগ্রন্থ, প্রাতিষ্ঠানিক সংকলন, সংবর্ধনাগ্রন্থ ইত্যাদি। এগুলোর জন্যও তিনি যথেষ্ট সময় দিতেন; শেষ বিচারে যা তাঁর জন্য একরকমের সময়ের অপচয়ই।
বানান, অর্থ, অভিধান ইত্যাদিতে আনিসুজ্জামানের বরাবরই বাড়তি আগ্রহ ছিল। বাংলা একাডেমির বানান অভিধান ও প্রমিত বানানের নিয়ম তৈরি, উচ্চারণ অভিধান, পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের বানান প্রমিতকরণ প্রভৃতি কাজে তিনি অনেক সময় দিয়েছেন। ১৭৮৫ সালে ওগুস্তেঁ ওসাঁর সংকলিত একটি ছোট্ট বাংলা-ফরাসি শব্দকোষ (২০০৩) নতুন করে উপস্থাপন করেছেন ফ্রাঁস ভট্টাচার্য সহযোগে। গত বছরে প্রথম আলোতে ধারাবাহিকভাবে অভিধান নিয়ে একটা ছোট্ট কলাম লিখেছেন। জীবনী লিখেছেন বেশ কয়েকটি; এর মধ্যে বিশেষভাবে বলা যায় থিয়েটার-প্রকাশিত মুনীর চৌধুরী (১৯৭৫) ও শিশু একাডেমি-প্রকাশিত মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্র (১৯৮২) কথা। ভূমিকা লিখেছেন অগণিত বইয়ের; প্রায়ই এটি তাঁর জন্য চাপে পরিণত হতে দেখেছি। এর কিছু কিছু ভূমিকা স্মরণীয় হয়ে আছে; যেমন আবুল হাসনাত-সম্পাদিত মুক্তিযুদ্ধের গল্প (১৯৮৫) ও মুক্তিযুদ্ধের কবিতার (১৯৮৫) ভূমিকা।
আনিসুজ্জামানের দু-খণ্ডের আত্মজীবনী কাল নিরবধি (২০০৩) ও বিপুলা পৃথিবীর (২০১৫) শুরু অবশ্য অন্য আত্মজৈবনিক রচনা আমার একাত্তরে (১৯৯৭)। তাঁর আত্মজীবনীতে ব্যক্তির জীবন নয়, এই ভূখণ্ডের ওই কালের সমাজ-রাজনীতি- সংস্কৃতির ইতিহাস মূর্ত হয়ে উঠেছে। ইতিহাসবিদ অধ্যাপক সালাহ্উদ্দীন আহমদ বলেছিলেন, তথ্যের কারণে এটি ইতিহাসের পাঠ্যবই হতে পারে। ১৯৫০-৬০-এর দশকে কিছু ছোটগল্প লিখেছিলেন; সেগুলো এখন লোকচক্ষুর অন্তরালে। অস্কার ওয়াইল্ডের একটি এবং দুটি রুশ নাটক অনুবাদ করেছিলেন। এসব রচনায় তাঁর তীক্ষ্ণ ব্যঙ্গ ও রম্য-রসিকতার পরিচয় পাওয়া যায়।
দেশের কাজে আনিসুজ্জামানের অংশগ্রহণের শুরু পনেরো বছর বয়সে এবং সেটা জাতীয় পর্যায়ে। ১৯৫২-র অগ্নিগর্ভ ভাষা-আন্দোলনের কেন্দ্রে ছিল তাঁর অবস্থান। জগন্নাথ কলেজের প্রথম বর্ষের ছাত্র হয়েও ২১ ফেব্রুয়ারির দিনে নীতিনির্ধারণী বক্তৃতা তৈরি করেছিলেন। ভাষা-আন্দোলন সংশ্লিষ্ট প্রথম পুস্তিকা রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন কী ও কেন (১৯৫২) তাঁর রচনা। সে-বছরে শহীদুল্লা কায়সারের তত্ত্বাবধানে ছাত্র ফেডারেশনের ঐতিহ্য নিয়ে গঠিত হচ্ছিল ছাত্র ইউনিয়ন। তার ঘোষণাপত্র ও গঠনতন্ত্রের খসড়া তৈরি করেছিলেন স্যার। পূর্ব বাংলার প্রথম ধর্মনিরপেক্ষ রাজনৈতিক দল গণতন্ত্রী পার্টিতেও ছিলেন সক্রিয়; ১৯৫১ সালে হয়েছিলেন কেন্দ্রীয় যুবলীগের দফতর সম্পাদক। সে-সময়ে ছাত্র-যুবকদের বামধারার রাজনীতি করতে হতো পরিবার থেকে লুকিয়ে। কিন্তু আনিসুজ্জামান তাঁর পরিবারকেও এ-ধারার সঙ্গে যুক্ত করতে পেরেছিলেন। প্রথম অস্থায়ী শহিদ মিনারে তাঁর মায়ের স্বর্ণালঙ্কার প্রদান এর মূর্ত প্রকাশ।
১৯৬০-এর দশকে পাকিস্তান সরকার রবীন্দ্রনাথকে নির্বাসনের যে-চেষ্টা চালায়, যথাযথ মর্যাদায় ঢাকায় রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকী পালন করে তার জবাব দেয় এদেশের সচেতন সংস্কৃতিসেবীরা। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি মাহবুব মোর্শেদকে প্রধান করে এই জন্মশতবার্ষিকী উদ্যাপনে আনিসুজ্জামান সামনের সারিতেই ছিলেন। ১৯৬৭ সালে বেতার-টিভিতে রবীন্দ্রসংগীত বর্জনের শাহাবুদ্দিনীয় চেষ্টার বিরুদ্ধে বিবৃতির খসড়া তাঁরই তৈরি; নিজে গাড়ি চালিয়ে অধিকাংশ স্বাক্ষর সংগ্রহ করে বিভিন্ন পত্রিকায় পৌঁছেও দিয়েছিলেন।
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের প্রথম পর্বে চট্টগ্রামের একটা অগ্রণী ভূমিকা ছিল। এপ্রিলে কালুরঘাট যুদ্ধে পশ্চাদপসরণের পর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ওই অঞ্চলের মুক্তিযোদ্ধাদের মূল কেন্দ্রে পরিণত হয়। সে-পর্বে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আজিজুর রহমান মল্লিককে সামনে রেখে অনুঘটক ছিলেন আনিসুজ্জামানই। প্রসঙ্গত নজরুল-তাজউদ্দীনের নেতৃত্বে মুজিবনগর সরকার তখনো গঠিত হয়নি। এপ্রিলের শেষদিকে অগ্রজপ্রতিম আবদুল আউয়ালের চা-বাগানে কয়েকদিন আশ্রয় নিয়ে দুঃসাহসিকভাবে গাড়ি চালিয়ে প্রথম যান আগরতলা; পরে মে মাসের মাঝামাঝি কলকাতা। কলকাতায় বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতি গঠনে উদ্যোগ নেন এবং এর সাধারণ সম্পাদক হন। উত্তর ভারতে কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে প্রচার চালান; ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।
পরে প্রবাসী মুজিবনগর সরকার পরিকল্পনা কমিশন গঠন করলে অর্থনীতিবিদ মোশাররফ হোসেন ও স্বদেশ বসুর সঙ্গে পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য হন। কলকাতার থিয়েটার রোডে প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রীর দফতরেও কাজ করতেন তিনি। ১৬ ডিসেম্বর মুক্তিযুদ্ধের পর প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্র থেকে যে-ভাষণ দেন, তারও খসড়া তৈরি করেছিলেন আনিসুজ্জামান। বাংলাদেশে ফিরে এসে পরিকল্পনা কমিশন থেকে ইস্তফা দিয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতায় ফিরে যান তিনি।
তবে শিগগিরই ঢাকায় ডাক পড়ে। প্রথমে অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের বাজেট বক্তৃতা তৈরিতে সহায়তা করার জন্য। এরপর বাংলাদেশের সংবিধানের বাংলা পাঠ তৈরির জন্য। বাংলাদেশের সংবিধানের মূল কাঠামোটা তৈরি করেছিলেন সে-সময়ের আইনমন্ত্রী ড. কামাল হোসেন। তাঁর ভাষ্য অনুসারে, আনিসুজ্জামান শুধু বাংলা পাঠ তৈরির কারিগরই নন, বাংলাদেশের সংবিধানের এমন একজন co-draftsman ছিলেন যাঁর সাংবিধানিক ধারণা ছিল গভীর। তাঁর পাঠ যে কতটা নির্ভরযোগ্য ছিল সে-চিহ্ন রয়েছে সংবিধানের পাতাতেই। এর একটি ধারায় বলা হয়েছে, ‘বাংলা ও ইংরাজী পাঠের মধ্যে বিরোধের ক্ষেত্রে বাংলা পাঠ প্রাধান্য পাইবে।’ সংবিধানের পাঠ তৈরির অতুলনীয় গৌরব এক দেশে একবার একজন মানুষই পান – বাংলাদেশে তাঁর নাম আনিসুজ্জামান।
শিক্ষার ক্ষেত্রে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ দলিল ১৯৭২-এর শিক্ষা কমিশন রিপোর্ট। ড. কুদরত-এ-খুদার নেতৃত্বে গঠিত শিক্ষা কমিশনের খসড়াও মূলত আনিসুজ্জামানের তৈরি। আশির দশকে হাসান হাফিজুর রহমানের নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধের প্রাসঙ্গিক দলিলপত্র নিয়ে ১৫ খণ্ডের যে-প্রকাশনা, তারও প্রামাণীকরণে স্যারের ছিল সক্রিয় অবদান।
১৯৭৫ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মর্মান্তিক হত্যার পর প্রতিবাদীদের মধ্যে ছিলেন তিনি। ঝুঁকি নিয়ে নানা সভায় বক্তৃতা দিয়েছেন; লিখেছেনও বেশ কটি প্রবন্ধ। ১৯৮৯-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে ২২ বুদ্ধিজীবীর যে-বিবৃতিটি সলতে পাকানোর কাজ করেছিল, তারও খসড়া আনিসুজ্জামান ও অর্থনীতিবিদ ড. মোজাফ্ফর আহমদের হাতে তৈরি। জামায়াতমার্কা স্ব-স্বীকৃত পাকিস্তানপন্থী ও সামরিক স্বৈরাচার – এই দুইয়ের সঙ্গে কোনোরকম যৌথ আন্দোলনে তাঁর সায় ছিল না। তিনি বলতেন, একদল আমাদের স্বাধীনতা কেড়ে নিতে চেয়েছিল; অন্যজন ভোটের অধিকার কেড়ে নিয়েছিল। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে রাজপথে-টিয়ার গ্যাসে আক্রান্ত পর্যন্ত হয়েছিলেন তিনি।
মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও সংবিধানের মূলনীতি নিয়ে কোনোরকম সমঝোতা তাঁকে ক্ষুব্ধ করত। বাংলাদেশের সংবিধান সংশোধন করে ‘রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম’ তকমা বসিয়ে দিলে ১৯৮৮ সালে অন্য কয়েকজনের সঙ্গে হাইকোর্টে মামলা রুজু করেন। অনেক পরে ১৯৭২-এর সংবিধান পুনঃপ্রতিষ্ঠার পর ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ ফিরে এলেও একই সমান্তরালে ‘প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম’ রাখা তাঁর কাছে সাংঘর্ষিক মনে হয়েছে।
একই চেতনা থেকে যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে তাঁর অবস্থান ছিল কঠোর। ১৯৯২ সালে শহিদ-জননী জাহানারা ইমামের উদ্যোগে যুদ্ধাপরাধীদের প্রতীকী বিচারের জন্য গণআদালত গঠিত হলে তিনি এর বাদী হন। এজন্য এর সঙ্গে জড়িত আনিসুজ্জামানসহ ২৪ জনের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা হয়। পরে যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল সত্যিকারের বিচার শুরু করলে তিনি একাধিক যুদ্ধাপরাধীর বিচারে সাক্ষ্য দেন। ওই বয়সে সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর মতো কুখ্যাত অপরাধীর বিরুদ্ধে সাক্ষ্যদান সহজ কাজ ছিল না।
বর্তমান শতকের শুরুতে এবং পরেও এদেশে সম্পত্তি দখলের উদ্দেশ্যে সাম্প্রদায়িক কার্যকলাপের বিরোধিতা করেছেন উচ্চকণ্ঠে। একবার প্রচণ্ড শীতের মধ্যে ‘জাগো বাংলাদেশে’র সংগঠকদের নিয়ে গেছেন উত্তরবঙ্গে ঘরপোড়া সংখ্যালঘুদের আশ্বস্ত করতে। মননে তিনি যেমন ইহজাগতিক (secular) এবং অসাম্প্রদায়িক ছিলেন; সেটির প্রকাশ করতে মিছিল বা সমাবেশে যোগ দিতেন বয়স ও স্বাস্থ্যের তোয়াক্কা না করেই।
তারুণ্যের শক্তি বরাবরই তাঁকে উদ্দীপ্ত করত; নিজের মনের তারুণ্যও আমৃত্যু ধরে রেখেছিলেন। তাঁর জীবনের শেষ দশকে যুদ্ধাপরাধীদের লঘুদণ্ডের প্রতিবাদে গণজাগরণ মঞ্চ গর্জে উঠলে আনিসুজ্জামান তাতে যোগ দিয়েছিলেন। কিন্তু সেখানেও তাঁর কণ্ঠ ছিল স্বতন্ত্র; বলেছিলেন, আমি ন্যায়বিচার চাই, শাস্তি কী হবে তা বিচারকের বিবেচনার বিষয়। পরে পরিবহন-নৈরাজ্যের প্রতিবাদে ছাত্রদের আন্দোলনের সময় স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে প্রথম আলোতে লিখেছিলেন ‘শক্তির উদ্বোধন’ শীর্ষক একটি কলাম। শুনেছি, সদ্য ‘জাতীয় অধ্যাপকে’র মর্যাদা পাওয়ার পরপরই এ-কলাম লেখায় সরকারের মধ্যে কেউ কেউ অসন্তুষ্ট হয়েছিলেন। সারাজীবন শিক্ষা ও গণতন্ত্রের জন্য ছাত্রদের আন্দোলনে একাত্ম ছিলেন। কিন্তু সরকার-সমর্থক যুব ও ছাত্র প্রতিষ্ঠানগুলোর কিছু নেতার অর্থবিত্তের লোভ, ক্ষমতার দাপট দেখানো, অসহিষ্ণুতায় প্রকাশ্যেই বিরক্তি প্রকাশ করতেন আনিসুজ্জামান। তিনি বলতেন, বহু উল্লেখযোগ্য অর্জনের পরও এদের বাড়াবাড়ির জন্য সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট হচ্ছে। কিন্তু এজন্য আবার তিনি ‘সর্ববিষয়ে সরকারবিরোধী নেতিবাচক’ বিবৃতিদাতাদের সঙ্গেও যোগ দেননি।
নাগরিক অধিকারের ব্যাপারে তিনি ছিলেন অত্যন্ত সচেতন। ১৯৮০-র দশকের শেষে একদিন শেরেবাংলা নগরের নির্বাচন কমিশন কার্যালয়ে ভোটার তালিকায় নিজের নাম তুলতে দরখাস্ত করে এসেছিলেন। নির্বাচনের পরিবেশ যাই হোক, প্রতিটি নির্বাচনে ভোট দিতে যেতেন। ১৯৭০-এর নির্বাচনে ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়ায় যুক্ত হলে নিয়ম অনুযায়ী আগাম ভোট দিয়েছিলেন। তিনি মনে করতেন, সবাই যদি নিজ নিজ ভোটাধিকার প্রয়োগ করে তাহলে ধীরে ধীরে ভোটের পরিবেশ উন্নত হবে।
গত দু-যুগে বাংলাদেশের সামাজিক-সাংস্কৃতিক আন্দোলনে তিনি কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছিলেন। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছিল যে, তাঁকে ছাড়া যেন বাংলাদেশে অনুষ্ঠান হয় না। গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানে তো যেতেনই; খুব ছোটখাটো অনুষ্ঠানেও চলে যেতেন। তাতে তাঁর শরীরের ওপর চাপ পড়ছিল। পরিবার ও সুহৃদরা তাঁকে নিরস্ত করতে চাইলে বলতেন, কাউকে আশাহত করতে চান না। তাঁর নিজের জীবনের ওপর সমাজের দাবিকে অগ্রাধিকার দিতেন। যে-কোনো বিবৃতিতেই তাঁর স্বাক্ষর নেওয়ার চেষ্টা থাকত উদ্যোক্তাদের। অনেক বিবৃতির ভাষা বা বক্তব্যে আপত্তি করে সংশোধনও করতেন। তারপরও হয়তো গৌণ বিষয়ে বহুসংখ্যক বিবৃতিতে তিনি স্বাক্ষর না করলেই ভালো হতো। নীতিগত বিষয়ের বিবৃতিগুলোতে অবশ্য তিনি কঠোর অবস্থান নিতেন। এই শতকের শুরুর দিকে জগন্নাথ হলে এক পুলিশি হামলা ন্যক্কারজনক পর্যায়ে পৌঁছলে এর প্রতিবাদে বুদ্ধিজীবীরা বাংলা একাডেমির একুশের আলোচনা সভা বর্জনের সিদ্ধান্ত নেন; যদিও এই ঘটনার সঙ্গে বাংলা একাডেমির কোনো প্রত্যক্ষ সম্পর্ক ছিল না। তৎকালীন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক স্যারের অত্যন্ত প্রিয় ছাত্র হওয়া সত্ত্বেও তিনি এতে সমর্থন দেন এবং অন্যদের সমর্থন সংগ্রহ করেন। কিন্তু ব্যক্তিগত পর্যায়ে সেই ছাত্রের সঙ্গে তাঁর প্রীতির সম্পর্ক আমৃত্যু অটুট ছিল। স্যারের দীর্ঘদিনের সুহৃদ আবুল মাল আবদুল মুহিত বলতেন, বিবেক অনুযায়ী নিজের মত প্রকাশে আনিসুজ্জামান দৃঢ়চেতা – তাঁর মত শুনে কে কী মনে করবে তা ভেবে কিছু বলত না। অবশ্য স্যারের সংযত ভাষার কারণে তাতে ব্যক্তিগত আঘাতের সম্ভাবনা থাকত কম।
বিশ্ববিদ্যালয় পরিমণ্ডল ও রাজনীতির বাইরে বেশ-কটা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আনিসুজ্জামানের আত্মিক ও ব্যবহারিক যোগ ছিল। বাংলা একাডেমি এর মধ্যে সর্বাগ্রে উল্লেখের দাবি রাখে। এম.এ. পাশ করার পরের বছর তিনি পিএইচ.ডি পর্যায়ে গবেষণার জন্য একাডেমির বৃত্তি লাভ করেন। তবে পরের বছরই বিভাগে শিক্ষক হিসেবে যোগ দিলে স্বভাবতই সে-বৃত্তি বন্ধ হয়ে যায়। ১৯৬০-এর দশকে বাংলা একাডেমি অ-বাংলাভাষীদের জন্য বাংলা ভাষা শিক্ষার কোর্স চালু করলে আনিসুজ্জামান এর প্রশিক্ষক হন। ১৯৭০-এ প্রবন্ধ ও গবেষণায় বাংলা একাডেমি পুরস্কার পান তিনি। সে-বছরের একাডেমির কার্যনির্বাহী পরিষদে সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৮২ সালে ‘বাংলা একাডেমি বক্তৃতামালা’ শুরু হলে আনিসুজ্জামান ছিলেন এর প্রথম বক্তা। ১৯৯৯ সালে একাডেমির সভাপতি কবি শামসুর রাহমানের স্থলাভিষিক্ত হন আনিসুজ্জামান। কিন্তু ২০০১ সালের শেষ দিকে সরকার পরিবর্তন হলে ২০০২ সালের একুশের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তাঁকে সভাপতির আসনে না বসানোর সিদ্ধান্ত হয়। আনিসুজ্জামান এর প্রতিবাদে একাডেমির সভাপতির পদ থেকে ইস্তফা দেন। সরকারের লজ্জা আরো বেড়ে যায় যখন তিনি একাডেমির ফেলো হিসেবে আবার ওই অনুষ্ঠানেই যোগ দেন। দুঃখের বিষয়, বাংলা একাডেমির পরবর্তী সভাপতিদের সঙ্গেও একুশের অনুষ্ঠানে একই আচরণ করা হলেও তাঁরা কেউ এর প্রতিবাদ করেননি। একুশের অনুষ্ঠানে বাংলা একাডেমির সভাপতি তাঁর আসন ফিরে পান ২০০৮ সালে নির্দলীয় সরকারের আমলে। ওদিকে ২০০২ সালে আনিসুজ্জামানের কাছে হীনমন্য সরকারের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় সভাপতি হিসেবে তাঁকে দেওয়া মাসিক ২০০০ টাকার সম্মানী ও ব্যবহৃত গাড়ির খরচ ফেরত চেয়ে চিঠি দেয়। ২০১২ সালে অধ্যাপক কবীর চৌধুরীর মৃত্যুর পর আনিসুজ্জামান আবার বাংলা একাডেমির সভাপতি হন। আমৃত্যু সে-পদে থেকে একাডেমির কার্যক্রমে অত্যন্ত সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন তিনি।
১৯৫০ ও ’৬০-এর দশকে বুলবুল ললিতকলা একাডেমি (বাফা) প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনায় তিনি ছিলেন অত্যন্ত তৎপর। ছাত্রজীবন থেকেই যুক্ত ছিলেন শান্তি পরিষদের আন্দোলনে; অনেক পরে একই ধারার সংগঠন আফ্রো-এশীয় গণসংহতি পরিষদের বাংলাদেশ শাখার সভাপতি হয়েছিলেন। বাংলাদেশ জাতিসংঘ সমিতি প্রতিষ্ঠায় তাঁর সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল। সাহিত্য-সংস্কৃতির বাইরে বিশ্বশান্তি ও বিশ্বব্যবস্থা নিয়ে তাঁর ভাবনার পরিচয় রয়েছে এসব কাজে। সিপিডি, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর – এরকম বহু প্রতিষ্ঠান তাঁর অবদানে ঋদ্ধ হয়েছে। জীবনের শেষ দু-দশক তিনি বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের কাজকর্মে গভীরভাবে যুক্ত ছিলেন। প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার আবুল খায়েরের ভাষায়, তিনি ছিলেন এই প্রতিষ্ঠানের অভিভাবক। আরো কিছু প্রতিষ্ঠান তাঁর অভিভাবকত্বে চলত – বাঙালি সমগ্র জাদুঘর, শিক্ষাবার্তা, শিল্পীর পাশে, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট, বাংলা অ্যালামনাই ইত্যাদি। কয়েক বছর নজরুল ইনস্টিটিউটের ট্রাস্টি বোর্ডের সভাপতির দায়িত্বও পালন করেছেন।
আনিসুজ্জামান ছিলেন অত্যন্ত বন্ধুবৎসল মানুষ। ছাত্রজীবন থেকে শুরু করে শেষ জীবন পর্যন্ত তাঁর বন্ধুর সংখ্যা অগণিত। আর এই বন্ধুমহলের একাংশ তাঁর আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে একাত্ম হয়ে গিয়েছিল। ছাত্রছাত্রী, তাদের ছেলেমেয়ে, এমনকি অনেক নাতি-নাতনির সঙ্গেও তাঁর ঘনিষ্ঠতা ছিল। আমার স্ত্রী, ছেলেমেয়ে, এমনকি আমাদের গাড়ির চালক পর্যন্ত তাঁকে খুব কাছের মানুষ মনে করতো। আসলে সাধারণ মানুষের সঙ্গে মেশার এক অদ্ভুত ক্ষমতা ছিল তাঁর। তাদেরকে অন্তর থেকে ভালোবাসতেন, যা অধিকাংশ বুদ্ধিজীবীর মধ্যে পাওয়া যায় না। তাঁর জ্যেষ্ঠ কন্যা রুচির বিয়ের সময় আমাকে জরুরিভাবে একটা গাড়ি জোগাড় করতে বললেন। পরে দেখলাম, সে-গাড়িতে করে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় আলাওল হল থেকে বিয়েতে আসা কর্মচারীরা মিরপুর চিড়িয়াখানা দেখতে যাচ্ছে। স্যার বললেন, বিয়ে তো রাতে, ওরা সারাদিন কী করবে?
তাঁর সত্যবাদিতা মনে রাখার মতো। তাঁর প্রকৃত জন্মসাল ১৯৩৭ হলেও ম্যাট্রিক পরীক্ষার ফরম ফিলাপের ফেরে অনেকের মতো তা বদলে যায়; হয়ে যায় ১৯৩৮। তিনি কোর্টে গিয়ে বাবাকে দিয়ে অ্যাফিডেভিট করিয়ে তা ১৯৩৭ বলে লিপিবদ্ধ করান। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তা মেনে তাঁকে এক বছর আগে অবসর দিতে অস্বীকার করে। স্যার এজন্য রেজিস্ট্রার কার্যালয়ে লিখিত আবেদন জানালেন। পরদিন কলাভবনে রটে গেল যে, আনিসুজ্জামান বয়স কমানোর জন্য চিঠি দিয়েছেন! এই সত্যবাদিতা তিনি পেয়েছিলেন মা সৈয়দা খাতুনের কাছ থেকে।
জীবনে সম্মান পাওয়ার শুরু অনার্স পাশের পর ‘নীলকান্ত সরকার স্বর্ণপদক’ দিয়ে। বাংলা একাডেমি পুরস্কারসহ বাংলাদেশের সাহিত্য-সংস্কৃতি জগতের সব পুরস্কারই তিনি পেয়েছেন। জাতীয় পুরস্কার একুশে পদক (১৯৮৪) ও স্বাধীনতা পদক (২০১৫) পেয়েছেন। ভারতবর্ষের আনন্দ পুরস্কার পেয়েছেন দুবার (১৯৯৪, ২০১৭)। ভারতের রাষ্ট্রীয় সম্মাননা ‘পদ্মভূষণ’ পান ২০১৪ সালে। সাম্মানিক ডিলিট পেয়েছেন রবীন্দ্রভারতী (২০০৫), নেতাজী সুভাষ মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় (২০১৩) ও আসানসোলের কাজী নজরুল বিশ্ববিদ্যালয় (২০১৭) থেকে। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় দিয়েছে সরোজিনী বসু পদক (২০০৮)।
সমাজ-সংস্কৃতি-সাহিত্যকে সময় দিতে গিয়ে পরিবারকে সময় দিতে পারেননি। কিন্তু পরিবারের সমর্থনেই তিনি পরিপূর্ণ আনিসুজ্জামান হয়ে উঠেছিলেন; বিশেষত তাঁর স্ত্রী সিদ্দিকা জামান ছিলেন তাঁর সকল কাজের সহযাত্রী। মেয়ে রুচিরা ও শুচিতা, ছেলে আনন্দ নিজেদের চাওয়া-পাওয়া মেটাতে বাবাকে ব্যস্ত রাখেননি। আনিসুজ্জামানের জীবন ছিল তাঁর ভাষার মতোই সহজ, সরল, অনাড়ম্বর; অথচ কী গভীর, কত ব্যাপ্ত!
এক সংবর্ধনা সভায় আনিসুজ্জামান বলেছিলেন, জীবনকে তিনি কানায় কানায় উপভোগ করেছেন। নাগরিক হিসেবে যে-বাংলাদেশ চেয়েছিলেন তার অপূর্ণতায় খেদ আছে; কিন্তু ব্যক্তিজীবনে না পাওয়ার কোনো অতৃপ্তি নেই। আনিসুজ্জামান এক জীবনেই একজন সম্পূর্ণ মানুষ, আর তাঁর চারপাশের মানুষদের জন্য পরশপাথর।

Leave a Reply

%d bloggers like this: