একটি অন্যরকম প্রতিশোধ

লেখক:

সাইফুর রহমান

প্রস্তাবটি এলো হঠাৎ করেই। ওটার জন্য বোধ করি আমি মোটেও প্রস্ত্তত ছিলাম না। প্রফেসর ফিলিপ থমাসের ই-মেইলটি পেয়ে আমি সত্যি বেশ খানিকটা অবাক হলাম বইকি? কার্ডিফ বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদে এতগুলো ব্রিলিয়ান্ট স্টুডেন্ট থাকতে উনি কেন আমাকে বেছে নিতে গেলেন? কেনই-বা আমাকে ওনার এতটা আত্মপ্রত্যয়ী ও যোগ্য বলে মনে হলো? আমি স্বভাবে কিছুটা বর্ণচোরা গোছের। বেশিরভাগ সময়ই ঘর থেকে বাইরে বেরুনোর তেমন কোনো মোহ অনুভব করি না। এক্ষেত্রে শার্লক হোমসের মতো করেই বলতে হয় – বাইরে এমন কিছু লোভনীয় নেই যা আমাকে প্রলুব্ধ করতে পারে। এজন্যে মাঝেমধ্যে বন্ধুবান্ধবের কাছ থেকে ভৎর্সনাও শুনতে হয় অজস্র। তাদের মধ্যে কেউ কেউ আমার দিকে নিবিড়ভাবে তাকিয়ে ঝাঁঝালো কণ্ঠে জানতে চায় – ‘এই ঠিক করে বল তো আলভিন, ঘরের ভেতর এমন কী মধু লুকিয়ে আছে, যার লোভে তুই ঘরের ভেতর নিজেকে সীমাবদ্ধ করে রাখতে পছন্দ করিস সব সময়।’ মধু তো বটেই! সমস্যা হচ্ছে আমার কাছে যা মধু বলে বিবেচিত, ওদের কাছে হয়তো সেগুলো বিষবৎ বলে মনে হতে পারে, কে জানে?

আমার অখন্ড অবসরগুলো নিয়ে প্রায়ই লড়াই বেধে যায় মূলত তিনটি বস্ত্তর মধ্যে। বই, একটি ভালো চলচ্চিত্র ও চমৎকার কিছু গান। সহজ করে বলতে গেলে বলতে হয় বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বই বস্ত্তটির জয়ই অবশ্যম্ভাবী হয়ে ওঠে। তবে সেখানে যে আমার কোনো স্বজনপ্রীতি নেই সেটি আমি জোর দিয়ে বলতে পারব না। আমি ওগুলো নিয়েই আনন্দের সাগরে ভাসি। সুখী হই। রবীন্দ্রনাথ যেমন আক্ষেপ করে বলতেন – ‘বাঙালি জাতি হৃদয় মনের সঙ্গে আমোদ করতে জানে না।’ আমাদের মধ্যে নাকি প্রফুল্লতা নেই। আমি জীবনের অনেকগুলো বছর ধরে রবিঠাকুরের এই আপ্তবাক্যটিকে ভুল প্রমাণের চেষ্টায় ব্রত হয়েছি। আমার সুহৃদদের ঝাঁঝালো কণ্ঠের প্রতিবাদে মাঝেমধ্যেই তাদের উদ্দেশ করে বলি – আমার এ ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র চাওয়া-পাওয়া নিয়ে আমি বেশ ভালোই তো বেঁচেবর্তে আছি। এই তো ঢের। এর চেয়ে বেশি এ-জীবনে আর কী চাই? তবে চিন্তা-চেতনার ভিন্নতাও যে হয় না – সে-কথা আমি হলফ করে বলতে পারব না। কখনো-সখনো মনে হয়, বেঁচেই যখন আছি এর সঙ্গে একটু রং মেশালে ক্ষতি কী? অভিজাত কোনো কনসার্টে ঘূর্ণায়মান লাইটের মতো জীবনের ওপর যদি খানিক পরপর নানা রঙের আলো ফেলা যেত মন্দ হতো না। সেইসঙ্গে জীবনটাও অনেকখানি রঙিন হয়ে উঠত নিশ্চয়ই।

সেইসব বৈচিত্র্যহীন ও নিরেট দিনগুলোর একটিতে অকস্মাৎ ফিলিপ থমাসের কম্পিউটার-বার্তাটি পেলাম আমি। তার সঙ্গে দেখা করতে হবে। তাও আবার খুবই জরুরিভিত্তিতে। যুক্তরাজ্যের অন্যতম সেরা ল-ফার্ম ‘মরগ্যান অ্যান্ড কোলে’ আমার জন্য খন্ডকালীন একটি কাজ জোগাড় করেছে সে। নিঃসন্দেহে এটি একটি অভাবনীয় ও লোভনীয়  প্রস্তাব। ল-ফ্যাকাল্টির যে-কোনো ছাত্র এমন একটি প্রস্তাবের জন্য সবসময়ই মুখিয়ে থাকে। আমিই বা এর ব্যতিক্রম হবো কেন?

রৌদ্রস্নাত গ্রীষ্মের ঝলমলে এক বিকেলে আমি হাজির হলাম আইন অনুষদে প্রফেসর থমাসের আস্তানায়। সিঁড়ি ভেঙে দোতলায় তার জন্য বরাদ্দকৃত কামরাটির সামনে গিয়ে যে-মুহূর্তে আমি কড়া নাড়ব ভাবছি, তখনই লক্ষ করলাম দরজাটি আসলে পুরোপুরি বন্ধ নয়। ভেতর থেকে হালকা করে ভেজানো মাত্র। দরজাটি ঈষৎ ঠেলে মাথাটি ভেতরে ঢুকিয়ে বললাম – মে আই কাম ইন স্যার? ওপাশ থেকে প্রফেসর থমাস বললেন – ওহ্ আলভিন, ইয়েস ইয়েস। অফকোর্স। প্লিজ কাম ইন। টেবিলের সামনে রাখা দু-তিনটি চেয়ারের একটিতে গিয়ে বসলাম আমি। প্রফেসর সাহেব পেপারপত্র নিয়ে অসম্ভব ব্যস্ত। তারপরও সেগুলোকে একপাশে সরিয়ে রেখে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, ই-মেইলে তোমাকে তো আমি বিস্তারিত জানিয়েছিই। মামলাটি হলো একটি রেপ কেস? যাকে বলে ধর্ষণ মামলা। একটি ব্রিটিশ মেয়েকে বাংলাদেশি এক যুবক ধর্ষণ করেছে। সমস্যা হচ্ছে  – ছেলেটি ভালো করে ইংরেজি বলতে পারে না। বোঝার ক্ষমতাও তার যৎসামান্য বলতে হয়। অভিযুক্ত যুবকটির জন্য একজন ইন্টারপ্রেটার নিয়োগ দেবে বলে ভাবছে ব্রিটিশ সরকার। সেজন্যই তোমাকে এখানে ডাকা। তোমার কাজ হচ্ছে অভিযুক্ত ছেলেটি বাংলায় যা বলবে তুমি সেগুলো ইংরেজিতে অনুবাদ করে কোর্টের সামনে উপস্থাপন করবে এবং সেই সঙ্গে ব্যারিস্টার জেমস মরগ্যান যা বলবেন তুমি সেগুলোর বাংলা অর্থ করে আসামিকে শোনাবে। কাজটি কি বেশি জটিল মনে হচ্ছে? আমি মাথা নেড়ে বললাম – না।

ব্যারিস্টার জেমস মরগ্যানের কথা শুনে বিস্ময়ভরা আমার হতবিহবল চোখদুটি প্রফেসর থমাসের দৃষ্টি এড়িয়ে গেল না। তিনি ঠিকই বুঝলেন আমার মনের কথা। তিনি সকৌতুকে আমাকে উদ্দেশ করে বললেন – বুঝেছ আলভিন, তোমার ওই বাংলাদেশি যুবক যে-কোনো রেস্তোরাঁয় দুবেলা করে দশ বছর কাজ করেও জেমস মরগ্যানের ফি জোটাতে পারবে না। ওই বেটা অভিযুক্ত লোকটির জন্য মরগ্যানের ফিও শোধ করবে ব্রিটিশ সরকার।

তোমার চোখ দেখেই বুঝতে পেরেছি তুমি বেশ অবাক হচ্ছ, তাই না? ব্রিটিশ গভর্নমেন্ট জেমস মরগ্যানকে নিযুক্ত করেছে মূলত দুটি কারণে। প্রথমত, আসামির প্রতি যেন ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়। আর দ্বিতীয়টি, বাঙালি কমিউনিটি থেকে যেন এ-অভিযোগ না ওঠে যে, কোনো অযোগ্য ও অসমর্থ আইনজীবী দিয়ে তাকে ইচ্ছা করে হারানো হয়েছে। আমি বললাম – বাহ্ বেশ ব্যবস্থা তো। আমি কৌতূহল নিয়ে ফিলের কাছে জানতে চাইলাম – ল-ডিপার্টমেন্টে নিদেনপক্ষে অর্ধডজনেরও বেশি বাঙালি ছাত্রছাত্রী আছে। তুমি এ-কাজে আমার মতো এমন একজন অবিশ্রুত ছাত্রকে কেন নিযুক্ত করছ? রেজাল্টের দিক থেকে আমি তো আর শীর্ষস্থানীয় কেউ নই। ইরফান নামের একটি ছেলে তো শুনলাম দ্বিতীয় বর্ষে এবার অন্যতম সেরা ফলাফল করেছে। প্রফেসর সাহেব কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন আমার দিকে। হ্যাঁ-না কিছুই বললেন না। আমার প্রতি তার এই স্বজনপ্রীতির কারণ যে আমি অাঁচ করতে পারি না তা কিন্তু নয়। তারপরও আমি তার মুখ থেকেই শুনতে চাই কথাগুলো। আমার নিজের আত্মতুষ্টি কিংবা আত্মপ্রসাদের জন্যই হবে হয়তো। প্রফেসর ফিলিপ থমাস কৃতবিদ্য মানুষ। বছরের বেশিরভাগ সময়ই ঘুরে বেড়ান পৃথিবীময়। নানা বিষয়ে তার জ্ঞান-পান্ডিত্য ও আগ্রহ। আমাদের দুজনারই এই একটি দিকে বেশ দারুণ সাযুজ্য। সাহিত্য, দর্শন ও শিল্পরস ছাড়া আমাদের দুজনের মনই পরিশ্রুত হয় না। পাঠ্যক্রমের ধরাবাঁধা ছক ভেঙে আমি যে অন্যকিছু নিয়ে ব্যস্ত থাকি, সেটি প্রফেসর ফিল খুব ভালো করেই জানেন। এটিও তাঁর অজানা নয় যে, সব সময়ই আমার বিচরণ ইতিহাস থেকে দর্শনে, দর্শন থেকে সাহিত্যে এবং সাহিত্য থেকে শ্রুতকীর্তি সব আত্মজীবনীতে।

চুকচুক করে কফি খাচ্ছিলেন প্রফেসর সাহেব। কফি পান শেষ হতেই আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, শোনো আলভিন, মরগ্যান নামের ব্যারিস্টার ভদ্রলোকটি আমার কাছে যোগ্য একটি ছেলে চেয়েছে। যে কিনা ইংরেজি-বাংলা দুটোই ভালো করে শুনে বুঝে কোর্টে কাজ চালিয়ে নিতে পারে। ক্লাসের সেরা ছাত্র পাঠানোর কোনো ফরমায়েশ আমি পাইনি। আশা করি তুমি বিষয়টি বুঝতে পেরেছ। এক টুকরো সাদা কাগজে জেমস মরগ্যানের ফোন নম্বরটি খসখস করে টুকে দিয়ে কাগজের টুকরোটি আমার হাতে ধরিয়ে দিয়ে ফিল বলল, সম্ভব হলে আজই তুমি ফোনে ওনার সঙ্গে কথা বলে সবকিছু ঠিকঠাক করে নাও। এই উইকেন্ডের পর সোমবার থেকেই মামলাটি শুরু হচ্ছে। তাঁর মতো এমন একজন বিচক্ষণ মানুষের সামনে আমি তো নিঃসন্দেহে একটি পিপীলিকাবৎ। আমি মাথা নেড়ে সবকিছু ঠিকঠাক আছে এমন একটি ভাব করে সেখান থেকে বিদায় নিলাম চটপট।

জেমস মরগ্যানের সঙ্গে ফোনে কথা বলে আমি সবকিছু ঠিকঠাক করে রেখেছিলাম আগেই। আমরা দুজন এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিলাম যে, আমি মরগ্যানের অফিসে পৌঁছাব ঠিক আটটায়। সেখান থেকে ব্রিজেন্ড কাউন্টি কোর্টে আমরা যাব ব্যারিস্টার মরগ্যানের ব্যক্তিগত গাড়িতে করে।

‘মরগ্যান অ্যান্ড কোল’ ল-ফার্মটিতে আমি পৌঁছলাম সকাল আটটা বাজার পনেরো-বিশ মিনিট আগেই। আমাকে বসতে দেওয়া হলো তাদের বিশালাকৃতির কনফারেন্স রুমটিতে। রাজ্যের নানা দুশ্চিন্তা ও ভয় এসে ভর করছে আমার মনের ভেতর। অনুবাদকের কাজের ধরনটি কেমন হবে কে জানে? আমি তো আগে ওসব কাজের কিছুই করিনি। আমি পারব তো? নাকি সব তালগোল পাকিয়ে ফেলব। আমার কিঞ্চিৎ পড়াশোনা ও বিদ্যাবত্তার পরিচয় পেয়ে প্রফেসর ফিলিপ থমাস না-হয় আমাকে এমন একটি কাজ জুটিয়ে দিলেন কিন্তু কোর্ট বলে কথা। সেখানে তো আর ওসব চলবে না। সমুদ্র-বেলাভূমিতে অবিরাম তরঙ্গমালার মতো আমার হৃদয়েও তখন বয়ে চলেছে অবিরাম ধুকপুকানি।

ঠিক এমন সময় কক্ষে প্রবেশ করলেন জেমস মরগ্যান। দীর্ঘকায় পুরুষ। চওড়া বুক, যেন শ্বেত মর্মরের মূর্তির মতো। ব্রাউন কালারের বিন্যস্ত চুলগুলো পরিপাটি ও ব্যাকব্রাশ করা। ঠোঁটের ওপরে পুরু করে সাদা-পাকা বিশাল গোঁফ। ওনাকে দেখে মনে হচ্ছে তিনি আইন পেশাটিকে জয় করার জন্যই বোধহয় জন্মেছেন। আমাকে দেখেই প্রশস্ত ডান হাতটি বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, গুডমর্নিং জেন্টেলম্যান। আই অ্যাম জেমস মরগ্যান। আমি তার বলিষ্ঠ হাতটি করমর্দন করে ঈষৎ অপ্রতিভ কণ্ঠে বললাম – আই অ্যাম আলভিন, আলভিন আহমেদ। মরগ্যান আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, ভাবছিলাম অফিসে তোমাকে কফি খাওয়াব কিন্তু সেটি মনে হয় এখন আর সম্ভব হচ্ছে না। এমনিতেই আমরা একটু দেরি করে ফেলেছি। তোমাকে কফি খাওয়াতে গেলে আরো দেরি হয়ে যেতে পারে। কোর্ট শুরুর সময়ও প্রায় আগত। আমাদের এক্ষুনি বেরুনো দরকার। আমি বললাম, কফি না-হয় পথে কোনো কফিশপ থেকে নিয়ে নেওয়া যাবে। আমরা এখনই রওনা হয়ে যেতে পারি।

জেমস মরগ্যানের হালফ্যাশনের বিশালাকৃতির মার্সিডিজ বেঞ্জ গাড়িটিতে বসে বেশ সুখ অনুভব করলাম আমি। গাড়িটি চালাচ্ছেন স্বয়ং জেমস মরগ্যান। মোটরগাড়ির স্টেরিওটির সুইচ টিপে টিপে সুন্দর একটি ইংরেজি গান জুড়ে দিলেন তিনি।

গ্রীষ্মের রৌদ্রকরোজ্জ্বল এমন একটি সকালে গান শুনতে শুনতে চোখদুটি মনে হয় একটু ধরে এসেছিল। মরগ্যানের হাঁকডাকে ধড়ফড়িয়ে উঠলাম। মরগ্যান আমাকে উদ্দেশ করে বলল  –  হেই ইয়াংম্যান, চটপট চলো। আমরা কোর্টে পৌঁছে গেছি। নিদ্রাতুর ঢুলুঢুলু চোখে গাড়ি থেকে নেমে যতই আমি কোর্টের দিকে এগোচ্ছি, ততই যেন আমার পাদুটি হাতির পায়ের মতো ভারি ও সেই সঙ্গে অসাড় হয়ে মাটি অাঁকড়ে থেমে যেতে চাইছে।

কিছুক্ষণের মধ্যেই হয়তো হাকিম এসে যাবেন। মরগ্যান তার ফাইল ও নথিপত্র নিয়ে ব্যস্ত হয়ে উঠল। কোর্ট-কক্ষের বিশালাকৃতির সাদা দেয়ালঘড়িটি টক্-টক্-টক্ আওয়াজ করছিল। অন্যদিকে হিম হয়ে আসছিল আমার বুকের রক্ত। সামনের বেঞ্চগুলোর একটিতে আমি বসলাম মূষিকের মতো মুড়িসুড়ি মেরে। আমার আতঙ্কগ্রস্ত মনের অবস্থা অাঁচ করতে পেরে মরগ্যান আমাকে সাহস জুগিয়ে বলল – আরে এত ঘাবড়ানোর কিছু নেই বালক। কোর্টে দু-তিন দফা আসা-যাওয়া করলেই সব ঠিক হয়ে যাবে। আমার কানের কাছে তার মুখটি এনে ফিসফিস করে সংক্ষেপে আমাকে মামলাটি সম্পর্কে একটু ধারণা দিয়ে দিলেন তিনি। বাংলাদেশি যে-ছেলেটি ধর্ষণের দায়ে অভিযুক্ত তার নাম নান্নু মিয়া। বাংলাদেশের সিলেট থেকে এদেশে এসেছে সে। এখানে সে একটি রেস্তোরাঁয় পাচকের কাজ করে। ফিওনা টমসন নামে একটি মেয়ে তার বিরুদ্ধে মামলা করেছে এই বলে যে, ব্রিজেডের ব্লুবেরি নামক পার্কের নির্জন একটি স্থানে নান্নু মিয়া মেয়েটিকে ধর্ষণ ও পাশবিক নির্যাতন করেছে। মরগ্যান বললেন – আমি গারদখানায় নান্নু মিয়ার সঙ্গে দু-তিন দফা ক্লায়েন্ট কনফারেন্স করেছি। তখন অবশ্য অনুবাদক হিসেবে কাজ করত অন্য একটি ছেলে। নান্নু মিয়া আমাকে জানিয়েছে যে, সে আদৌ ধর্ষণ করেনি। বরং মেয়েটিই নাকি তাকে ধর্ষণ করেছে। কিন্তু কথা হচ্ছে এটা কীভাবে সম্ভব? আমি কিছুতেই হিসাব মেলাতে পারছি না। বেশ আশ্চর্যের সুরে কথাগুলো বললেন জেমস মরগ্যান।

ইতোমধ্যে নিঃশব্দে ও নম্র পদক্ষেপে বিচারপতি মহাশয় তার চেয়ারে এসে বসলেন। এ-সময় কোর্টে উপস্থিত প্রাণিকুল দাঁড়িয়ে তার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করল। তিনি চোখের ইশারায় আমাদের সবাইকে বসার অনুমতি প্রদান করলেন। দুজন পুলিশের ব্যূহ সঙ্গে করে নান্নু মিয়া কাঠগড়ায় এসে দাঁড়াল অনেকটা অর্ধ-উন্মাদের মতো। এদিক-ওদিক তাকাচ্ছে শুধু বারবার। চারদিকে শূন্যদৃষ্টি। এতবড় মাপের একজন নামকরা ব্যারিস্টার তার জন্য কোর্টে লড়তে এসেছে তার ভেতর সেই উপলব্ধি ও বোধগম্যতা কতটুকু অনুভূত হলো সঠিক করে সেটিও বোঝা গেল না।

প্রথমেই আমার দৃষ্টি পড়ল নান্নু মিয়ার পুরু দুটি ঠোঁটের ওপর। ওগুলো যেন হারগিলা পাখির ঠোঁটের মতো। গায়ের রংটিও বেশ গাঢ় তামাটে। তাছাড়া নাকটি পর্তুগিজ হারমাদ জলদস্যুদের মতো বেশ চ্যাপ্টা ধরনের। কেশবিন্যাস উসকো-খুসকো। ষন্ডামার্কা চেহারা। কোর্টে নান্নু মিয়া নিজেকে এমনভাবে উপস্থাপন করেছে যে, যে কেউ তাকে দেখে নির্ঘাত ধর্ষণকারী হিসেবে ভেবে নেবে। লোকটির জন্য আমার বেশ মায়া হলো ঠিক সেই কোলরিজের এলবাট্রস পাখির মতো। মনে মনে ভাবলাম, হায় খোদা! তার আত্মীয়-পরিজন তাকে একটু সাজিয়ে-গুজিয়ে আনলে বোধহয় বেশ ভালো হতো। আমি জানি, আমার এই নির্মল অনুভূতি ও মায়ার প্রকৃত কারণ। নান্নু মিয়া আর যা-ই হোক সে আমার দেশের ছেলে।

আমরা বসে আছি কোর্টের বাঁদিকের বেঞ্চগুলোর একটিতে। আর পাশের ডানদিকের বেঞ্চগুলোতে বসেছে অভিযোগকারিণী ও তার আইনজীবী ব্যারিস্টার হাওয়ার্ড জনসন। আমি এই প্রথম ভিকটিম ফিওনা টমসমকে দেখার সুযোগ পেলাম। মিষ্টি কুমড়োর মতো গোলগাল চেহারা। বেশ সুশ্রীই বলতে হয়। তবে স্বাস্থ্য বেশ একটু ভারি ধরনের। দীর্ঘাঙ্গী বলে মোটাসোটা ভাবটি দৃষ্টিকটু বলে মনে হয় না। আমি যখন তাকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখায় ব্যস্ত ঠিক তখনই সে হঠাৎ তার চিবুকটি ঘুরিয়ে আমার দিকে তাকাল। সে তার দৃষ্টিটি আমার দিকে এমনভাবে নিক্ষিপ্ত করল যেন ব্যারিস্টার মরগ্যান ভাষা অনুবাদের অন্তরালে কৌশলে আমাকে ডেকে নিয়ে এসেছেন মূলত নান্নু মিয়াকে সমস্ত অভিযোগের অন্তর্জাল ভেদ করে তাকে বিজয়ী করে নিয়ে যেতে। আমি নিশ্চিত যে, ফিওনার সেই চাহনিতে ছিল প্রগাঢ় ঘৃণা, ক্রোধ ও অসন্তোষ। মামলাটি চলল প্রায় মাসতিনেকের মতো। কোর্টের ভেতর লড়াই হলো  বাঘে-মোষে, বলতে হয় প্রায় সমানে সমান। ট্রয়ের সেই যুদ্ধের মতো। একবার গ্রিক বীর একিলিস খোলা তরবারি ও বুকে বর্ম পরে আঘাত হানছে আরেক রোমান বীর হেক্টরের ওপর। অমনি হেক্টর পিছিয়ে যাচ্ছে সাত-আট পা। আবার যখন হেক্টর সজোরে আঘাত হানছে, একিলিস পিছিয়ে যাচ্ছে পাঁচ-ছয় পা।

যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করতে গিয়ে মাঝেমধ্যে মরগ্যানের কঠোরতা ও দৃঢ়তা দেখে তাকে মনে হতো পর্বতের মতো অটল ও শক্ত একজন মানুষ তিনি। তারপর হয়তো দেখা যেত সহসাই মুখটি মেঘের মতো কালো করে তর্জন-গর্জন শুরু করে দিয়েছেন মরগ্যান। যখন তার কার্যসিদ্ধি শেষ তখন দেখা গেল শুধু তর্জনই নয়, সেই মেঘ বর্ষণ হয়ে ঝুপঝুপ করে ঝরতে শুরু করেছে ভূমিতে। সূর্য যেভাবে ভাসমান মেঘের আড়াল থেকে আচানক বেরিয়ে আসে ঠিক সেভাবে তার অভিব্যক্তিগুলো অশ্বারোহী কোনো দুরন্ত সৈনিকের মতো একলাফে বেরিয়ে আসে জনাকীর্ণ কোর্টের ভেতর। তারপর ঝলমল করে ঝরতে থাকে তার সেই অগুনতি উদ্যম হাসির ফোয়ারাগুলো। নিজ মক্কেলকে জেতানোর জন্য তার সে কী কায়দা-কানুন ও কূটকৌশল। আর একেই হয়তো বলে ওকালতি! আমি অবাক বিস্ময়ে দেখলাম, কী করে মরগ্যান যে-কোনো সময় যে-কোনো পরিস্থিতিতে রূঢ় কথার গায়ে লাগিয়ে দিতে পারেন চিনির প্রলেপ কিংবা যে-কোনো সময় মসৃণ বাক্যের গায়ে চড়িয়ে দেন কর্কশতার কণ্টকযুক্ত জামা। কিন্তু তার এই গলদঘর্ম কুটকৌশল শেষ পর্যন্ত কোনো কাজেই এলো না। নান্নু মিয়ার কপালে জুটল যাবজ্জীবন কারাবাস। আর আমার ভাষা অনুবাদের কথা কী আর বলব। ইংরেজি ভালো জানি, বুঝি ও বলতে পারি বলে আমার মনের ভেতর অহং জন্মেছিল ও বাসা বেঁধেছিল, সেই সঙ্গে মনের গহিনে তৈরি করেছিলাম পর্বতসম গর্বের প্রাসাদ-সৌধ। সেটি বোধকরি এবার শুকনো ফুলের পাপড়ির মতো ঝুরঝুর করে ঝরে পড়ল। তবে মনের ভেতর সন্দেহ কিন্তু ঈষৎ রয়েই গেল। এটি কি আমার ইংরেজি বিষয়ে দুর্বলতা নাকি কোর্টের ভেতর আমার স্বভাবজাত স্নায়ুদৌর্বল্য ও ওরকম একটি ভাবগম্ভীর পরিবেশে আত্মবিশ্বাসের অভাব। যদিও মরগ্যান সাহেব আমার কাঁধ চাপড়ে বললেন – ইংরেজি অনুবাদ তো তুমি ভালোই করেছ বৎস। কিন্তু বাংলা অনুবাদ সম্পর্কে সার্টিফিকেট দিতে পারে একমাত্র নান্নু মিয়া।

নান্নু মিয়ার কাছ থেকে সার্টিফিকেট আমি পেলাম না। সে আমাকে দুষতে লাগল নানাভাবে। প্রথমেই সে প্রশ্ন তুলল আমার ভাষা নিয়ে। বাংলা ভাষা যদিও আমার জানা কিন্তু সিলেটি ভাষা নাকি আমার আয়ত্তের একেবারেই বাইরে।

নান্নু মিয়া চরম অসন্তোষ ও বিক্ষুব্ধ কণ্ঠে আমাকে বলল – ‘কিতারে বা, তুমি সিলোটি মাততায় ফারনা তে ওই ইন্টারপিটারোর খ্যাঁমে লইল্যায়ে খ্যাঁনে। তুমি তোরে ভাই আমার হারা জীবনোর লাগি জেলের ভিতরে হারাই দিলায়। খ্যাঁমডা কিতা তুমি ঠিক খ্যঁরল্যায় নি।’

আমি জানি, অজ্ঞ মানুষ চিৎকার করে যুক্তির জোরে নয় কণ্ঠের জোরে। কারণ যুক্তি নিজেই একটি প্রকান্ড কণ্ঠস্বর। যদিও আমার কিঞ্চিৎ বোধগম্য হলো না। আসলে আমার ভুলগুলো কোথায় ও কীভাবে হয়েছে? তার সিলেটি ভাষাটি তো এমন কোনো সংস্কৃত কিংবা হিব্রু ভাষা নয় যে, সেটা বোঝা অতি দুষ্কর। তার পরও আমি অপরাধীর মতো অনেকটা নির্জীব ও অস্ফুট কণ্ঠে বললাম – ‘আমি তো আমার চেষ্টার কোনো ত্রুটি করিনি। আমি সামান্য অনুবাদক মাত্র। আমি তো আর জাঁদরেল কোনো আইনজীবী নই।’

তারপর বিচারপতির কাছ থেকে এলো সেই নিষ্ঠুর পূর্ণাঙ্গ রায়। নান্নু মিয়াকে কারাগারের নির্জন প্রকোষ্ঠে কাটাতে হবে জীবনের বাকি দিনগুলো। এখানে মামলার যুক্তিতর্কের পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা দিতে পারলে অনেক তৃপ্তি পেতাম। কিন্তু তাতে করে যে-কোনো সৌখিন পাঠকের পঠনে ধৈর্যের চ্যুতি ঘটতে পারে, এ-ব্যাপারে আমি অনেকটাই নিশ্চিত। তার পরও একটি বিষয় উল্লেখ না করলে বোধহয় নান্নু মিয়ার প্রতি অবিচার করা হবে। নান্নু মিয়ার যাবজ্জীবন কারাভোগ হলো মাত্র একটি চাক্ষুষ সাক্ষীর সাক্ষ্যে। স্থানীয় একটি চার্চের পাদ্রি, তিনিই একমাত্র ব্যক্তি, যিনি দেখেছেন বিষয়টি। কিন্তু তিনি তার সাক্ষ্যেও এক জায়গায় বললেন, যে-মানুষটি মেয়েটির ওপরে ছিল তার শ্রোণিযুগল ধবধবে ফর্সা। তার স্পষ্ট মনে আছে, রাতের ল্যাম্পপোস্টের আলোয় সেটি চকচক করছিল। নান্নুর মিয়ার গায়ের রং তামাটে। সেই অর্থে তার পশ্চাৎদেশ ধবধবে ফর্সা হওয়ার সুযোগ নেই। অন্যদিকে ফরেনসিকভাবে এটা অব্যর্থ প্রমাণিত হয়েছে যে, ফিওনার যোনিপথে যে বীর্য পাওয়া গেছে সেটি অভ্রান্তভাবে নান্নু মিয়ার শিশ্ন থেকে নিষেক হওয়া বীর্য। নান্নু মিয়া বারবার করে কোর্টে তার আঞ্চলিক উচ্চারণে আমাকে উদ্দেশ করে বলছিল – ‘আমি তানরে রেফ খ্যঁরছি না। তাইনোই আমারে খ্যঁরছইন।’ আমি সেটি পরিষ্কার ইংরেজি অনুবাদ করলাম একেবারে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে। ‘আই ডিড নট রেপ হার, রাদার সি ডিড রেপ মি।’ আমার মুখ থেকে এই কথাগুলো শোনার সঙ্গে সঙ্গে কোর্টে উপস্থিত অভ্যাগতরা হো-হো করে হেসে গড়াগড়ি খেতে লাগলেন।

কিছুদিন রাতে ঘুমোলে প্রায়ই একটি দুঃস্বপ্ন আমার গলার টুঁটি চেপে ধরত। নান্নু মিয়া যেন চিৎকার করে আমার কানের কাছে বলছে – আই ডিড নট রেপ হার, রাদার সি ডিড রেপ মি।

দিকভ্রান্ত বাতাসে উড়ে আসা সময়ের ধূলিকণার পুরু প্রলেপে মনের ভেতর জমে থাকা নান্নু মিয়ার ঘটনাগুলো চাপা পড়ে যায় আস্তে আস্তে। আমিও পরীক্ষার পড়াশোনা ও অন্যান্য করিৎকর্ম নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ি।

কিছুদিন পর একদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি স্টাডি ট্যুরে যাচ্ছিলাম স্কটল্যান্ডের এডিনবরায়। ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করছি লন্ডনের পেডিংটন রেলস্টেশনে। স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে কঠিন ইস্পাতের তৈরি বেঞ্চটিতে বাংলা শব্দ ‘দ’-এর মতো করে আয়েশি ভঙ্গিতে বসে আনমনে পিটার ক্যারির একটি উপন্যাস পড়ছিলাম বেশ মনোযোগ দিয়েই। কখন যে এক ইংরেজ ললনা এসে আমার পাশে বসেছে খেয়াল করিনি। বইয়ের পাতা ওল্টানোর সময় শুধু একবার মুখটি ঘুরিয়ে তার দিকে তাকালাম। বেঞ্চটি এজমালি সম্পত্তি। কে কখন বসল না বসল তাতে আমার কী আসে যায়? কিন্তু বইটির পাতা উল্টাতে উল্টাতে হঠাৎ মনে হলো, এই মেয়েটি তো আমার চেনা। হ্যাঁ, এই তো স্পষ্ট মনে পড়ছে। এ তো সেই নান্নু মিয়ার ধর্ষণ মামলার ভিকটিম ফিওনা টমসম। আমি মেয়েটির দিকে চোখ তুলে তাকিয়ে তাকে জিজ্ঞাসা করলাম –  কেমন আছ তুমি? আমাকে কি তুমি চিনতে পেরেছো? ফিওনা বিস্ময়ে চোখ দুটি কপালে তুলে বলল – না। আমি তোমাকে কোথাও দেখেছি বলে তো মনে পড়ছে না। আমি বললাম – কেন? নান্নু মিয়ার ট্রায়ালের সেই অনুবাদকের কথা কি তোমার একটুও মনে নেই? ফিওনা এবার বিস্ময়ভরা আতিশয্য নিয়ে বলল, ও হ্যাঁ, এবার মনে পড়েছে। আমি জানি জেমস মরগ্যান আসলে কৌশলে তোমাকে ভাড়া করেছিল নান্নু মিয়ার যাতে সুবিধে হয়, তাই না?

আমি কুঞ্চিত নেত্রে বললাম – তোমার ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। আমাকে শুধুই নেওয়া হয়েছিল ইংরেজি ভাষাটি অনুবাদ করার জন্য। এর চেয়ে বেশি কিছু নয়। তুমি শুনে অবাক হবে যে, নান্নু মিয়ারও ধারণা, তার এই পরিণতির জন্য আমিই নাকি দায়ী। তাই নাকি? তাহলে তো দেখছি তুমি সবার কাছেই খলনায়ক রূপে গণ্য হয়েছ। আমার অবস্থা হয়েছে আসলে তাই। বিষাদভরা কণ্ঠে কথাটি বললাম আমি। এরই মধ্যে ট্রেন ছাড়ার সময় হয়ে এলো। ফিওনা যাচ্ছে এডিনবরায়। ওর এক পুরনো বন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে। আমার বেশ সুবিধাই হলো বলতে হয়। গল্পে গল্পে পার করা যাবে পথটুকু।

আমরা ট্রেনে উঠে দুজন বসলাম পাশাপাশি দুটো আসনে। ফিওনার সঙ্গে আমার কথা হতে লাগল নানা বিষয়ে। মনের ভেতর এই ভাবোদয়টি আমার কেন হলো বলতে পারব না। হঠাৎ করেই আমি তাকে উদ্দেশ করে বললাম – আসলে নান্নু মিয়া তো তোমাকে ধর্ষণ করেনি। কিন্তু তার পরও তুমি তার বিরুদ্ধে কেন এমন একটি অভিযোগ আনলে? কথাগুলো যে আমি পাথরের মতো শক্ত ও দৃঢ়তার সঙ্গে বলতে পারলাম, তা কিন্তু নয়। নিজের দুর্বলতা ঢাকতে আমি তার চোখের ওপর থেকে আমার দৃষ্টি সরিয়ে নিলাম দ্রুত।

আমার কথাগুলো শুনে কিছুক্ষণের জন্য চুপ হয়ে রইল ফিওনা। তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বলল – তুমি এ-কথা কেন বলছ যে, ওই জানোয়ারটার বিরুদ্ধে আমি মিথ্যা অভিযোগ এনেছি। আমি নির্বিঘ্নে বললাম – নান্নু মিয়ার সঙ্গে এই অল্প কমাস ওঠাবসা করে আমি এটা বুঝেছি যে, সে আসলে ভালো মানুষ নয়। সে অপরাধ তো নিশ্চয় একটা কিছু করেছে। কিন্তু এই মামলায় সমস্ত সময় আমি আদালতে উপস্থিত থেকে কেন জানি আমার বারবার মনে হয়েছে কোথাও যেন একটা গোলমাল আছে। ফিওনা মেঝের দিকে তাকিয়ে অস্ফুট কণ্ঠে বলল – গোলমাল তো কিছু রয়েছেই বটে! তা না হলে কি এত কান্ড, এত অঘটন। কিন্তু সেগুলো এখন জেনে তোমার কী লাভ? আমি বললাম, তোমার-আমার লাভ-ক্ষতি সম্পর্কে আমি শুধু এতটুকুই বলতে পারি, এতে তোমার কোনো ক্ষতি হবে না। এতটুকু ভরসা আমার ওপর তুমি করতে পারো।

ফিওনা আস্তে আস্তে ঘুড়ির লাটাই থেকে সুতো ছাড়তে শুরু করল – আনুমানিক আট-ন বছর আগের ঘটনা। আমার একটি অগ্রজ বোন আছে, নাম এলিজা। সম্পূর্ণ নাম এলিজা টমসম। আমার চেয়ে মাত্র ও বছরখানেকের বড়। এলিজা জন্মান্ধ। চোখে আলো নিয়ে জন্মায়নি বলে আমরা পরিবারের সবাই ওকে একটু বেশি ভালোবাসি। সেইসঙ্গে আদর-আহ্লাদও সবার কাছ থেকে ও সব সময় বেশি পায়। এলিজার দৃষ্টিশক্তি না থাকায় ও আমাদের মতো নর্মাল স্কুলে যেতে পারেনি। তাই ওকে লেখাপড়া করতে হয়েছিল ব্রেইল পদ্ধতিতে। তারপর একটা সময়ে ব্রিজেন্ড পাবলিক লাইব্রেরিতে একটি চাকরিও জুটিয়ে নেয় সে। আমাদের আবাসস্থল থেকে ব্রিজেন্ড পাবলিক লাইব্রেরি যেতে বাসে দূরত্ব পনেরো-বিশ মিনিট। ব্লুবেরি পার্কের পাশের বাসস্টপ থেকে বাস পাকড়াও করে এলিজাকে যাতায়াত করতে হতো হররোজ তার কর্মস্থলটিতে। একদিন কী যেন একটা প্রজেক্ট নিয়ে ব্যস্ত থাকায় বেশ রাত অবধি তাকে কাজ করতে হলো লাইব্রেরিতে। একজন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীর কাছে রাত আর দিন তো একই সমান। দুটোই তার কাছে নিকষ কালো অন্ধকারময়। এলিজার সম্বল শুধু একটি সাদা রঙের ছড়ি। ছোটবেলা থেকে ওটার সাহায্যেই ও সবসময় চলাফেরা করে বলতে পারো। কাজ শেষে বাড়ি ফিরছিল এলিজা। ব্লুবেরি বাসস্টপ থেকে আমাদের বাড়ি পনেরো মিনিটের পায়ে হাঁটা পথ।

এলিজা বাসস্টপ থেকে নেমে যখন পার্কের ফুটপাত দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিল, তখনই তার মনে হলো কেউ হয়তো তাকে অনুসরণ করছে। এলিজা গতি বাড়িয়ে হনহন করে সামনে এগোতে লাগল। কিন্তু হঠাৎ জনৈক সেই লোকটি পেছন দিক থেকে তাকে শক্ত করে জাপটে ধরে একটি রুমাল দিয়ে তার মুখটি সজোরে চেপে ধরল। রুমালটিতে সম্ভবত চেতনানাশক জাতীয় কিছু একটা ছিল। মুখটি চেপে ধরার সঙ্গে সঙ্গেই সংজ্ঞা হারাল এলিজা। এরপর তাকে ব্লুবেরি পার্কের ভেতর নিয়ে করা হলো উপর্যুপরি ধর্ষণ। আর সেই জনৈক ধর্ষণকারীই ছিল নান্নু মিয়া। আমি কৌতূহলভরা দৃষ্টিতে জানতে চাইলাম – তোমরা কীভাবে নিশ্চিত হলে যে, নান্নু মিয়াই তোমার বোনকে ধর্ষণ করেছে? তাছাড়া তোমার সহোদরা তো দৃষ্টিহীন। ফিওনা একটি সকরুণ দীর্ঘ নিশ্বাস ছেড়ে বলল – আমি জানতাম, তুমি আমাকে এ-প্রশ্নটি করবে? শোনো, তোমাকে তাহলে বলি – এলিজার লাইব্রেরির চাকরিটিতে পদোন্নতির জন্য একটি শর্ত ছিল যে, ওকে প্রাচ্যদেশীয় একটি ভাষা শিখে সেখানকার শিল্প-সাহিত্য থেকে ইংরেজি ভাষাভাষী শিশু-কিশোরদের জন্য কিছু অনুবাদমূলক কাজ করতে হবে। যেহেতু যুক্তরাজ্যে অধিক পরিমাণ বাংলাদেশি ও বাঙালি নাগরিকের বসবাস সেজন্য এলিজা সিদ্ধান্ত নেয় যে, বাংলা ভাষাটি শিখবে।

দীর্ঘ তিন বছর ধরে বাংলা ভাষাটিকে ও বেশ আয়ত্ত করে নিয়েছিল। বিশুদ্ধ উচ্চারণে ভাষাটিতে কথা বলতে না পারলেও বাংলা ভাষায় ব্রেইল পদ্ধতিতে যেসব বই লেখা হয়েছে সেসব বইয়ে আঙুল বুলিয়ে বুলিয়ে প্রায় সমস্ত বই এলিজা পড়তে ও বুঝতে পারে সম্পূর্ণরূপে। যেদিন ওর সঙ্গে ওই পৈশাচিক ঘটনাটি ঘটে, ওইদিন পেছন থেকে নান্নু মিয়া যখন তাকে অনুসরণ করছিল তখন তার মোবাইল ফোনটিতে একটি কি দুটি কল আসে। অপর প্রান্তের মানুষটির সঙ্গে নান্নু মিয়ার কথোপকথনের কারণেই এলিজা জানতে পারে ধর্ষণকারীর প্রকৃত নাম। আর পেশায় সে একজন পাচক। কাজ করে রাজমহল নামে ভারতীয় একটি রেস্তোরাঁয়। রাজমহল রেস্তোরাঁটি ব্রিজেন্ড অঞ্চলটিতে বেশ জনপ্রিয় ও বিখ্যাত। সেই হিসেবে সেটিকে না চেনার কোনো কারণ নেই। বর্বরোচিত এ-ঘটনাটি যখন ঘটে, তখন আনুমানিক রাত দশটা। সেই হিসেবে শীত ঋতুর দশটা মানে অনেক রাত। এলিজা পার্কটিতে অসাড় ও চেতনালুপ্ত হয়ে পড়ে ছিল রাত দুটো অবধি।

যদিও ওর সময়মতো বাড়ি না ফেরায় আমরা কিছুটা শঙ্কিত ও উদ্বিগ্ন হচ্ছিলাম। তার পরও আমাদের সবার কাছে মনে হয়েছিল যে, সে তার কোনো বন্ধুর বাড়িতে গেছে। যদিও এলিজার বন্ধু বলতে হাতেগোনা দুই-চারজন। এলিজা বাড়ি ফেরে রাত আড়াইটার দিকে। কাউকে কিছু না বলে সে নিজের রুমে গিয়ে শুয়ে পড়ে। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, ও আমাদের কাউকে কিছুই বুঝতে দেয়নি। পরপর দুদিন সে তার কর্মস্থলে যাওয়া থেকে বিরত রইল। আমরা তো সবাই অবাক। অসুখ-বিসুখ নেই তার পরও এলিজা, কেন কামরা বন্ধ করে সারাক্ষণ শুয়ে থাকে আর বিরলে অশ্রু বিসর্জন করে। তৃতীয় দিনের দিন আমি তাকে চেপে ধরে বললাম – ‘কী হয়েছে তোর এলিজা? বাবা-মাকে না-হয় বাদ দিলাম কিন্তু আমাকে তুই তো সব খুলে বলবি, না কি? প্লিজ এলিজা প্লিজ আমাকে বলো। আমি তো শুধু তোর বোনই নই একজন বন্ধুও বটে।’ এরপর এলিজা ডুকরে কেঁদে উঠল, বলল – নির্মমভাবে ধর্ষণের শিকার হয়েছে সে, গত দুদিন আগে। আমি আর্তনাদ করে বললাম  –  ‘তুই নিজের এ কী সর্বনাশ করলি এলিজা? একে তো ধর্ষণের শিকার হয়েছিস কিন্তু এখন তো এর সুষ্ঠু বিচারও সম্ভব নয়। কারণ এই দুদিনে আলামত তো সব নষ্ট হয়ে গেছে। এখন কী উপায়? তার পরও থানা-পুলিশ-হাসপাতাল সবই করা হলো। কিন্তু থানায় ধর্ষণ মামলা রেজিস্ট্রার করা গেল না – কারণ কোনো আলামতই আর অবশিষ্ট নেই। এই একটি দুর্ঘটনা এলিজার জীবন যেন সম্পূর্ণরূপে বদলে দিলো। এলিজার মানসিক ও স্বভাবচরিত্রে এলো ব্যাপক পরিবর্তন। মাঝেমধ্যেই ঘুমের ঘোরে চিৎকার করে ওঠে সে। বিজনে নিজের সঙ্গে নিজেই কী যেন সব আবোল-তাবোল কথা বলে। দ্রুতই অবস্থার আরো অবনতি হতে লাগল এবং এক পর্যায়ে এলিজার আশ্রয় হলো কার্ডিফ উইচ চার্চ মানসিক হাসপাতালে। এলিজার এই দুর্দশায় আমিও মারাত্মকভাবে ভেঙে পড়লাম। যেভাবেই হোক নিতে হবে এর প্রতিশোধ। রাজমহল রেস্তোরাঁয় গিয়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেল ধর্ষণকারী পাষন্ড নান্নু মিয়া কুকর্মটি সম্পন্ন করার সঙ্গে সঙ্গেই  গা-ঢাকা দিয়েছে। কিংবা সম্ভবত পালিয়ে গেছে নিজ দেশে। আমি খুবই আশাহত ও হতোদ্যম হয়ে পড়লাম।

কিন্তু কিছুতেই হাল ছাড়লাম না আমি। তক্কে তক্কে রইলাম। আদৌ যদি তার খোঁজ মেলে কখনো। আট-নয় বছর পরের কথা একদিন আমার কিছু কলেজ পড়ুয়া বন্ধু আমাকে একপ্রকার  জোর করেই নিয়ে গেল রাজমহল রেস্তোরাঁটিতে। টিক্কা মাসালা, মটরপোলাও, জিন্দালু সঙ্গে আরো নানা উপাদেয় সব ব্যঞ্জনসহযোগে রাতের আহার শেষ করলাম আমরা। আমাদের বন্ধুদের মধ্যে একজনের খাবারগুলো এত ভালো লাগল যে, সে নিজ থেকেই ধন্যবাদ দিতে চাইল এসব মুখরোচক খাবারের শেফকে। ম্যানেজারের এত্তেলা পেয়ে সহসাই পাচক মহাশয় আমাদের সামনে এসে হাজির। মুখ অবয়বে খুশির গদগদ ভাব নিয়ে ভুল-শুদ্ধ ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে বললেন – আমার নাম মিস্টার নান্নু মিয়া। আমিই এই উপাদেয় খাবারগুলোর রন্ধক। খাবারগুলো আপনাদের ভালো লেগেছে জানতে পেরে খুশি হলাম। মুহূর্তেই আমার মাথাটি ঝাঁ-ঝাঁ করে উঠল। এই তো সেই নান্নু মিয়া। আমার একমাত্র সহোদরার ধর্ষণকারী। খোঁজখবর নিয়ে আরো ভালো করে নিশ্চিত হলাম। বেশ কিছুদিন হলো সে দেশ থেকে ফিরে পুনরায় চাকরি নিয়েছে এই রাজমহলেই। আমার মনের মধ্যে জ্বলে উঠল প্রতিশোধের জিঘাংসা। ক্রমেই আমি অধৈর্য হয়ে উঠলাম। কী করে চুকানো যায় পুরনো লেনদেনের হিসাব-নিকাশ। আমি মনের মধ্যে ছক আঁকা শুরু করলাম।

আমার সেই পরিকল্পিত ছক অনুযায়ী আমি নান্নু মিয়াকে অনুসরণ করতে শুরু করলাম। রাত আনুমানিক বারোটার দিকে রাজমহল রেস্তোরাঁটি বন্ধ করে নান্নু মিয়া সবেমাত্র সেখান থেকে বের হয়েছে, আমিও নিলাম তার পিছু। রেস্তোরাঁ থেকে বেরিয়ে সদর রাস্তার বাসস্টপ থেকে একটি বাসে চেপে বসল সে। আমিও সঙ্গে সঙ্গে সেই বাসে গিয়ে উঠলাম। গিয়ে বসলাম নান্নু মিয়ার পাশের সিটটিতে। নানা রকম অঙ্গভঙ্গি ও দু-চারটি কথা বলে তার সঙ্গে সম্পর্কটি কিছুক্ষণের মধ্যেই বেশ অন্তরঙ্গ করে নিলাম। বুঝলাম আমি তাকে আপন করে পেতে চাই। বাসটি ব্লুবেরি পার্কের স্টপে থামতেই আমি নেমে গেলাম বাস থেকে। সেইসঙ্গে নান্নু মিয়াকে চোখ দিয়ে ইশারা করলাম বাস থেকে নেমে আসার জন্য। কামাতুর নান্নু মিয়ার কাছে আমি যেন তখন সেই হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালা। নান্নু মিয়া আমাকে অনুসরণ করতে লাগল অন্ধের মতো। ব্লুবেরি পার্কের যৎসামান্য ভেতরে নিয়ে গেলাম তাকে। তারপর যা করার সবই করলাম আমরা। সম্পূর্ণরূপে কাজ শেষ হয়ে যাওয়ার পর আমি জোরে চিৎকার জুড়ে দিলাম – বাঁচাও বাঁচাও, হেল্প হেল্প। ঠিক সেই মুহূর্তেই ব্রিজেন্ড ব্যালিয়ন চার্চের পাদ্রি স্যামুয়েল বেকেট আমাদের প্রথম দেখতে পান। আমার চিৎকার-চেঁচামেচিতে দ্রুত পালিয়ে যায় নান্নু মিয়া। কিন্তু এ-দফায় সে রেখে যায় ধর্ষণের সমস্ত আলামত। আমি মনে মনে বলতে থাকি, নান্নু মিয়া – ইউ ক্যান রান বাট ইউ ক্যান নট হাইড অ্যাট দিস টাইম।

এরপর আমার মেডিক্যাল পরীক্ষা-নিরীক্ষা হলো। নান্নু মিয়াও ধরা পড়ল পুলিশের হাতে। এরপর যা ঘটেছে সবকিছুই তো তোমার জানা। ফিওনার মুখ থেকে এসব শুনে আমি বাকরুদ্ধ হয়ে রইলাম কিছু সময়। তারপর বললাম, সত্যি পৃথিবীতে কত আশ্চর্য ঘটনাই না ঘটে। ফিওনা দীর্ঘ নিশ্বাস ছেড়ে বলল, আমার মনে এখন আর কোনো খেদ কিংবা আফসোস নেই। দুঃখ শুধু একটাই, আমার বোনটি প্রথমে ছিল অন্ধ এরপর হলো মানসিক ভারসাম্যহীন।

আমি বললাম, এবার তোমাকে একটি চমকে ওঠার মতো খবর দিই। গত এক সপ্তাহ আগে ব্যারিস্টার মরগ্যানের কাছ থেকে আমি একটি চিঠি পেয়েছি। মরগ্যান আমাকে লিখেছে – নান্নু মিয়া নাকি এখন মানসিক বিকারগ্রস্ত। তাকে ব্রিজেন্ড জেল থেকে স্থানান্তরিত করা হয়েছে একটি মানসিক হাসপাতালে। আসলে নান্নু মিয়া অনেক দিনের পুরনো মানসিক রোগী। বছরের বেশিরভাগ সময় কিছুটা ছিটগ্রস্ত হলেও তার মনোবৈকল্য নাকি প্রকট আকার ধারণ করে শুধুমাত্র শীত ঋতুতেই। মরগ্যান আরো লিখেছে, বাংলাদেশ থেকে তার স্ত্রী ও দু-একজন আত্মীয়স্বজন এসেছে। তারা সঙ্গে করে সমস্ত কাগজপত্র নিয়ে এসেছে। আমি ফিওনাকে জিজ্ঞেস করলাম, এলিজার এ-দুর্ঘটনাটি যেন কোন মাসে ঘটেছিল? ফিওনা মৃদুস্বরে বিড়বিড় করে বলল – ডিসেম্বর মাসে।

আমার দিকে তাকিয়ে ফিওনা আমাকে জিজ্ঞেস করল, নান্নু মিয়াকে কোন মানসিক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে?

কার্ডিফ উইচ চার্চ মানসিক হাসপাতালে। আমি বললাম –  কেন বলো তো? ফিওনা দুহাতে মাথাটি চেপে ধরে চিৎকার করে বলে উঠল – ‘হায় খোদা, ঈশ্বরের একি বিচার’! বিষয়টি বুঝতে না পেরে আমি কিছু সময় হতবুদ্ধি হয়ে রইলাম। তারপর যখন আমার হঠাৎ করেই মনে পড়ল, এলিজাকেও ভর্তি করা হয়েছে সেই একই হাসপাতালটিতে। আমিও তখন অনেকটা নির্বাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম জানালার বাইরে। দ্রুতবেগে পিছিয়ে পড়া পাহাড়, অরণ্য কিংবা দিগন্তের দিকে।