একটি মেয়ে

লেখক:

আফসার আমেদ

॥ ২১ ॥

সন্ধ্যা সাড়ে ১০টা বেজে গিয়েছিল মেমারির শীতলাতলায় পৌঁছতে সেঁজুতিদের। মা হইচই ফেলে দেয়। বউদি শাশ্বতী বেরিয়ে আসে। মা কাঁদে। কিন্তু তার হর্ষ বেশি। কথার ঝড় তোলে। ‘আরো সকাল সকাল বেরোতে হয়। ট্রেন ঠিকঠাক পেয়েছিলি? ভিড় ছিল নাকি গাড়িতে? আসবি যখন নবর মোবাইলে ফোন করে দিলি না কেন? নব কাজ থেকে এই ফিরল দ্যাখ। রূপ ঘুমিয়েছে, খুব দস্যিপনা করছিল, ওর মা ঘুম পাড়িয়ে দিলো। বউমা, বউমা কোথায়? এই তো তুমি তো
আছই দেখছি। মনাকে খবরটা যেন দেওয়া হয়।’ তারপর আলমকে দেখে, তার জন্য একটা টুল ঘরের ভেতর থেকে বের করে ঝেড়েমুছে বসিয়ে দেয়। ‘বসো বাবা, তোমার নাম কী? তোমার নাম কী?’
সেঁজুতি বলল, ‘ওর নাম আলম।’
‘কী নাম বললি?’
‘আলম।’
‘তোর সঙ্গে পড়ে?’
‘না না, ও আমার ভাইয়ের মতো।’
‘অ।’
উঠোনেই একটা হাতলওয়ালা কাঠের চেয়ারে বসেছিল বাবা, তার কাছে যায় সেঁজুতি। বাবা হাত ধরে রাখে সেঁজুতির। ছাড়তে আর চায় না। নানা কথা বলে। বাবার কাছে ধরা দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে সেঁজুতি। এখন আর ছোটোবেলার মতো দুষ্টুমি করতে পারে না, হাত ছাড়িয়ে নিয়ে পালিয়ে যেতে পারেনি। পালিয়েই তো ছিল, আবার পালাবেও। এখন যে ধরা দিয়ে আছে, তার মধ্যে আছে পালাবার ধ্যান।
মা আলমের সঙ্গে কথা বলে। আলমের নাম শুনে মায়ের মনে অসংগতির প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। একজন মুসলমান ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে চলে এলো বুলটি? ছেলেটির ঠিক-ঠিকানা কী? সেঁজুতি ঠিক করেছে? মাকে বেকায়দায় ফেলে মনে মনে হাসে। মাকে ধরা দেয় না। বাবার কাছ থেকে মায়ের কাছ থেকে দূরে সরে যায়। এখানে কতদিন পর এসে মনটা তার িস্নগ্ধধশান্ত হয়েছে। তারই আততিতে সে ভরে আছে। আলম এসেছে, বেশ হয়েছে। আলমকে নিয়ে মায়ের যে-সমস্যা, তার জন্য সে ষড়যন্ত্রকারীদের মতো তৃপ্ত। মনে মনে হাসতে চায়। হাসেও। বাবার নানা কথা শোনে। শোনে নানা সাবধানবাণী। মনের চোখ দিয়ে এখন সে কতকিছু দেখে, সেসব শোনে।
আলম বোধহয় জল খায়। আলম বোধহয় টুলে বসে শান্ত হয়। হয়তো পালিয়ে যাওয়ার কথা ভাবে। তাকে পালিয়ে যেতে দেবে না সেঁজুতি। তার এখন অনেক শাস্তি পাওনা আছে। এটাও একটা  শাস্তি।
আলম বলল, ‘লট জানা পড়ে গা।’
‘কী বলছ কী তুমি? তুমি যাবে আমাকে ছেড়ে?’
‘না, তুমি তো তোমার বাড়িতে, আমার কাজ কী?’
‘আমাকে ছেড়ে যাওয়া তোমার কাজ?’
‘না, তোমাকে ফিরিয়ে দিয়ে আসব। কবে?’
‘তা তো জানি না।’
‘এ তো আজিব বাত।’
‘তুমি চুপটি করে থাকো, এই তো এলে। এখন তুমি আমার হাতে।’
‘আমার তো কালই কাজে জয়েন করার কথা।’
‘ওয়েল্ডিংয়ের কাজ? ছাড়ো আমার সঙ্গে থাকো, সব হবে। এখন মায়ের ভরসায় থাকো।’
আলম কী বুঝল, চুপ করে যায়।
‘ওমা, কী বলছিস?’
‘তোমার একটা শাড়ি দাও।’
‘তুই কি চুড়িদার আনিসনি?’
‘এনেছি। শাড়ি পরতে সাধ হয়েছে।’
‘সাধ?’
‘হ্যাঁ সাধ।’
মা তাকে ঘরে নিয়ে যায়। আর আলমারি খুলে নানা শাড়ি পছন্দ করাতে থাকে। মেয়ের এ-সাধের মনের নাগাল পায় না। ‘এটা পরবি না?’
‘না, ওটা দেখাও তো?’
‘এই দ্যাখ।’
‘না এটা নয়, আরেকটা দেখাও।’
‘তুই তো এমন ছিলি না, যা দিতাম তা-ই পরতিস!’
‘আসলে ইলেকশন হলো, নতুন সরকার!’
‘মানে?’
হাসে সেঁজুতি। ‘ও তুমি বুঝবে না।’
‘আলম কি তোর বন্ধু?’
‘বন্ধুর বেশি।’
‘মানে?’
‘মানে কিছু নয়। ও ভালোবাসা বেশি পেল।’
‘ওই মুসলমান ছেলেকে ভালোবাসছিস?’
‘ভালোবাসায় আবার হিন্দু-মুসলমান-খ্রিষ্টান কী?’
‘বুঝি না বাপু। শহরে গিয়ে মতিগতি কী হলো তোর? ওকি আজ এখানে থাকবে?’
‘থাকবে।’
‘ওর চায়ের কাপ, গেলাস, থালাবাসন আলাদা হবে তো? ওকেই ধুয়ে দিতে বলিস।’
‘কী বলছ মা তুমি। ও আমাদের মতোই। সব মানুষই এক। একদিন থাকলেই তুমি বুঝতে পারবে ওকে। মনেই হবে না অন্য কেউ। মানুষের ওরা-আমরা থাকতেই পারে না।’
‘কী জানি বাপু, আমার কেমন ভয় করছে।’
‘তুমি তো আমার মা, আমার চোখের দিকে তাকাও।’
‘ও কোন ঘরে শোবে?’
‘আমার ঘরে। আমার যদি একটা ভাই থাকতো?’
‘এই, আমাকে বেশি ভাবাস না, আমি চায়ের জল বসাব।’
‘তুমি এখন যাও, পরে কথা হবে।’
মা চলে গেল।
বউদি এলো।
শাশ্বতী বলল, ‘বেশ মানিয়েছে শাড়িটা।’
‘তুমি এসে তো পরালে না, আমিই পরলাম।’
‘তুমিই তো ডাকলে না।’
‘ডাকলে তুমি আসতে? আমি এসেছি Ñ’
‘রূপকে ঘুম পাড়াচ্ছিলাম।’
‘ঘুম পাড়ালে কেন অসময়ে?’
‘দস্যিপনা করছিল, কোনো কাজ করতে দিচ্ছিল না।’
‘তুমি ভালো আছ?’ গায়ে হাত দেয় শাশ্বতীর।
‘খুব।’
‘দাদা রোজগার করছে, ভালো আছ?’
‘ভালোই। তুমি আসো না কেন?’
‘এই তো এলাম।’
‘এতদিন পর?’
‘সময় পাচ্ছিলাম না।’
‘ওই ছেলেটি কে, কাকে সঙ্গে করে এলে?’
‘ও আমার বন্ধু, ওকে আমার মনের কথা কিছু জানাব।’
‘ও কি মুসলমান?’
‘ঠিকই বলেছ?’
‘তবে?’
‘কে কোন ধর্মের মানুষ, এতে কিছু যায়-আসে না। ও আমার বন্ধু হয়েছে। যদিও ওর সঙ্গে কথা হয়েছে কম। তবে ও বেশ ভালো। ওকে জানি।’
‘ওকে জল দিয়েছি, মিষ্টি দিয়েছি, মা চা বসিয়েছে।’
‘বেশ করেছ।’
‘বাবা আজ কোর্টে যায়নি, তোমার দাদা একা গেছে। চালিয়ে নিতে পারছে।’
‘রূপ জেগে থাকলে ভালো হতো।’
‘একটু পরে জাগবে, তখন সামলাতে পারবে না।’
‘তাই?’
হাসে শাশ্বতী। শাশ্বতীর গা ধরে বারান্দায় বেরিয়ে আসে।
বাবা-মায়ের ঘরে টেবিল ফ্যানটা ফিট করছে আলম। সুইচ বোর্ড পরীক্ষা করছে। অস্থায়ী তার দেখছে।
সেঁজুতি আলমের কর্মকাণ্ডের পেছনে গিয়ে দাঁড়াল।
‘দিদি, ওয়্যারিং করাওনি কেন?’
‘করানো হয়নি।’
টেবিল দিয়ে তার ওপর ফ্যানটা বসিয়ে চালিয়ে দেয় আলম।
বারান্দা থেকে সেঁজুতি অন্ধ বাবাকে ধরে ধরে বিছানায় বসিয়ে দেয়। হাওয়া লাগে বাবার গায়ে।
‘কে আনল ফ্যান? বুলটি তুই? আরে কী ব্যাপার!’
বাবার গায়ে হাত দিয়ে বলল, ‘এবার তোমার গরম লাগবে না।’
‘তুই কদিন থাকবি তো?’
‘দেখি।’
‘থাক থাক। একদিন পুকুরের মাছ ধরাব। বেড়জাল দিয়ে ভালো মাছ পড়বে। একটা বড়ো কাতলা মাছ আছে, ঘাঁই মারে প্রায়ই। আমি ঘর থেকে শুনতে পাই।’
জানালার কাছে যায় সেঁজুতি, তাকায় বাইরের দিকে। অন্ধকার বলে পুকুরটাকে দেখা যায় না। সবকিছু দেখতে ইচ্ছে করে। পুকুরধারের গাছগুলোকে। বাঁশঝাড়। উঠোনতলার তুলসীমঞ্চ। খেলার মাঠ, পুজোর মাঠ। স্কুল, কালীমন্দিরও দেখতে ইচ্ছে করে। সেসব না দেখে ছিল এতোদিন। কীভাবে ছিল। এখানে এসে নিশ্বাস-প্রশ্বাসে আরাম।
বাবা শুধল, ‘ফ্যানটা তুই কিনে আনলি?’
‘কেনা ছিল।’
‘তোর কেনা ছিল?’
‘হ্যাঁ। তোমার জন্য সুগার ফ্রি রসগোল্লা এনেছি।’
‘অত দাম, আনতে গেলি কেন?’
মা চা আনে। চা খেতে খেতে বাবার সঙ্গে কথা হয়। একটু রোগা হয়েছে, একটু বুড়িয়ে গেছে বাবা।
চা শেষ করতে কেমন ঘুম-ঘুম লাগে সেঁজুতির। চিন্তামুক্তির আলস্য। বাবার বিছানায়, বাবার বসে থাকার পাশে শুয়ে পড়ে। আর চোখ বন্ধ করলে ঘুম এসে যাচ্ছে।
মা এসে বলল, ‘ঘুমিয়ে পড়ছিস কেন বুলটি?’
‘এই একটু শুয়েছি। একটু পরেই উঠে পড়ব। তুমি আলমকে দ্যাখো। ওর কী কী লাগে দিও।’
‘তোর বাবার একটা ধুতি দিয়েছি। দুপাট করে পরেছে।’
‘দাদার একটা শার্ট দিও।’
‘নব তো এসেছে, উঁকি মেরে তোকে দেখে চলে গেল। তার সঙ্গেই তো আলম এখন, ইলেকট্রিকের তারফার কীসব দেখছে।’
‘বউদি?’
‘রান্না করছে। একটু পরে রূপকে তুলে খাওয়াবে। তুই কিছু খাবি?’
‘না। তোমাদের বিছানায় শুতে ইচ্ছে করছে। বাবা আছে কাছে, বাবার গায়ের গন্ধ পাচ্ছি।’
‘তবে একটু আরাম কর।’
‘ঘুমিয়ে পড়ব যে!’
‘তাতে কী, রাত হয়নি তেমন। তারপর খেয়ে একেবারে ঘুমোবি।’
মা ফিরে যায়। বাবার নিশ্বাসের শব্দ পায় সেঁজুতি। চারপাশের গন্ধ ব্যেপে আসে তার মনে। তাদের টালি ছাওয়া পাঁচ ইঞ্চি ইটের তিন কামরা ঘরের নিচে একফালি উঠোন আছে। তারপর রাস্তা। চারপাশে প্রতিবেশীদের বাড়ি। পাড়া। গ্রাম। এখন রাত বাড়ে তো পাড়া নিশুত হয়ে উঠতে থাকে। ঘোষপাড়ায় চল্লিশটি ঘর। তার মধ্যে কঘর সেনরা আছে। একসঙ্গে পুজো করে পাড়ার ব্রতীসংঘ। একটু এগোলেই শীতলাতলা গ্রাম শেষ। বড়ো রাস্তা। বড়ো রাস্তায় পড়লে রিকশা, অটোরিকশা স্টেশনে চলে যাচ্ছে। মাত্র দেড় কিলোমিটার দূর। মেমারি স্টেশন জমজমাট। কত কী আছে। এই এক-দেড় বছরে আরো অনেক বদলেছে। শীতলাতলার চাষের মাঠ তেমনই আছে। তাতে ধান চাষ হয়। ইলেকট্রিকের খুঁটি চলে গেছে দূরদূরান্তে। শৈশবে ওই মাঠকে কল্পনা করে রাক্ষসদের যাতায়াতে পথ বানিয়েছিল বুলটি। তখন সে শুধুই বুলটি। দাঁত ভাঙার স্মৃতি এখন দাঁতের ভেতর অনুভব করে। খেলার মাঠে বন্ধুদের সঙ্গে খেলার স্মৃতিও।
এতদিন শীতলাতলায় আসেনি কেন? তার কী হয়েছিল? কিছু একটা হয়েছিল। ভুলতে চেয়েছিল শীতলাতলাকে। মেগাসিটির সঙ্গে তখন তার লড়াই ছিল। সে কি লড়াই দিতে পেরেছে, শীতলাতলার মেয়েটি? হয়তো একভাবে পেরেছে। রাক্ষসটা এলো মাঠ পেরিয়ে। তাদের বাড়ির উঠোনের নিচে। মা তাকে আঁচল আড়াল করে সামলাচ্ছে। সে শুধু বুলটি, শুধুই বুলটি। সে জানে এখন বড়ো হয়েছে, তুলনামূলক সাহিত্যে এমএ করেছে। ফেলোশিপ পেয়েছে। স্কুল ও কলেজে চাকরি পাওয়ার জন্য পরীক্ষা দিয়ে চলেছে। রাক্ষসটা এখনো তাকে ভয় দেখায়, ছোট মনে করে। রাক্ষসটার পেছনে তমোঘœ এসে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে হাসছে। তার ভয় পাওয়াতে আনন্দ হচ্ছে তমোঘœর। কী নিষ্ঠুর তমোঘœ।
‘মা, মা।’ ঘুম ভেঙে যায় সেঁজুতির।
মা কাছেই এসে দাঁড়িয়েছিল। ‘এই তো আমি, এবার উঠে পড়। সবার খাওয়া হয়ে গেছে। এবার আমরা তিনজন খাব।’
উঠে বসে সেঁজুতি, ‘কত রাত হলো?’
‘সাড়ে দশটা।’
‘ওমা, এত রাত?’ চুলের ক্লিপটা আলগা হয়ে গিয়েছিল, সেটা আঁটে। ‘আলম?’
‘দাদা নিয়ে শুয়েছে, তোর বউদির ঘরে।’
‘ঠিকঠাক খেলো?’
‘খেয়েছে। খোরাক কম।’
‘গ্রামের মানুষ যে পেট বড়ো হবে!’
‘তোর ঘুম হলো?’
মাথাটা ছাড়ল।
বাইরে বেরিয়ে এলো সেঁজুতি। উঠোনতলার জ্যোৎ¯œায় নেমে পড়তে ইচ্ছে করল। কখন চাঁদ উঠল? এই পাটভাঙা শাড়ি পরে উঠোনতলার ধুলোয় লুটোপুটি খেতে ইচ্ছে করছে। শৈশবের কোনো খেলার মতো আনন্দ করতে ইচ্ছে করছে। মন খারাপ হচ্ছে তমোঘœর জন্য। খুব কাছে পেতে ইচ্ছে করছে তাকে। কোথায় হারিয়ে গেল? খুঁজে বের করবে কি? খুঁজতে বেরোলে বেশ হয়। মন ভালো থাকার ভেতরই তমোঘœ মনে বেশি বেশি করে আসে। তাকে সরাতে পারে না কিছুতেই।
দাদার ঘরের দরজা খোলা ছিল, ঢুকে গিয়ে সেঁজুতি দেখল দাদা আর আলম পাশাপাশি শুয়ে আছে। ‘কী রে, ঘুমোলি আলম?’
দাদা বলল, ‘ঘুমিয়ে গেছে। তুই রূপ আর শাশ্বতীর সঙ্গে শুবি।’
‘তোমার সঙ্গে দাদা কথাই হলো না।’
‘সকালে বলিস।’
‘হ্যাঁ।’ বেরিয়ে যায় সেঁজুতি।
ঘর বন্ধ না করে শুলেও এখানে চোর পড়ে না। চুরি হয় না। চোর নেই বললেই চলে।
মা আর বউদি খাবার বেড়ে আছে তার অপেক্ষায়। মুখে-চোখে জল দেয় সেঁজুতি। এই জ্যোৎøা সারারাত থাকবে? হয়তো। যদি সে জানালায় দাঁড়িয়ে সারারাত জাগে? মা যদি জানত, সে গান লেখে, অবাক হতো। বউদি তো হেসে কুটিপাটি হতো। ঠাকুরঝি কী গান লিখেছে শোনাও। কেমন সুর? এসব কথা ভেবে নিজের মনে হাসে সেঁজুতি। একগাদা পথশিশু তার বন্ধু, তাদের কথাও মা-বউদি জানে না। তাদের সঙ্গে বেশ চকটায় সে। তমোঘœও জানে না। কথায় কথায় ক্ষণে ক্ষণে তমোঘœর কথা মনে করছে সে। কেন? হয়তো তমোঘœকে ভালোবাসে সে। শীতলাতলায় এসে এ-বিশ্বাসটা তার দৃঢ় হলো। ভালোবাসে। তাকেও তমোঘœর ভালোবাসতে হবে। হারিয়ে গেলে চলবে না। দুজনে তারা কাছে আসবে। নিজেদের সব অভাব দূর করবে। কলকাতায় এসে তমোঘœ চেষ্টা করলে কলেজে চাকরি পেয়ে যাবে।
মা বলল, ‘খেতে খেতে কী অত ভাবছিলি বুলটি?’
‘যোয়ান আছে দেবে? ও কিছু নয়।’
বউদি যোয়ান আনতে চলে গেল।
‘কী জানি বাপু, তোর কিছু একটা হয়েছে।’
‘কিছুই হয়নি। কাজ নিয়ে ব্যস্ত, ভীষণ কাজ।’
‘কবে থিতু হবি?’
‘জানি না।’
‘এখানে একটা চাকরি করতে পারিস না?’
‘না।’
‘এখানে এত অফিস-ব্যাংক, কলেজ-স্কুল!’
‘চেষ্টা করে যাব, কোথাও একটা কিছু হবে।’
‘হবে?’
‘তুমি অত উতলা হচ্ছো কেন?’
‘তোর তো বয়স বাড়ছে।’
‘বাড়–ক।’
বাথরুমে গেল সেঁজুতি। বাথরুমে গিয়েই চিল চিৎকার। ‘মাগো Ñ’
মা-বউদি ছুটে এলো।
এখানেও সেই আরশোলা। মা-বউদি জেনে হাসাহাসি করতে লাগল। মা বলল, ‘তুই আগের বুলটিই আছিস।’
রূপকে মাঝখানে নিয়ে শুয়ে পড়ল বউদি আর সে।
‘বউদি, ঘুমিয়ে পড়লে?’
‘ঘুম এসে গেছে, কী বলবে বলো?’
‘বাবা একটুও দেখতে পায় না?’
‘না।’
‘আমি মা-বাবার কাছে শোব। তুমি রূপকে দেয়ালের দিকে নিয়ে শোও।’
‘বেশ যাও।’
ঘরে ঢোকার শব্দ পেয়ে মা বলল, ‘কী রে, এ-ঘরে আবার এলি?’
‘আমি তোমাদের কাছে শোব, না হলে ঘুম আসবে না।’
‘আয় তবে।’
বাবা বলল, ‘আমি সরে যাচ্ছি, তুই মায়ের পাশে শো।’
‘না, আমি তোমাদের মাঝখানে শোব।’
মশারি তুলে ঢুকে যায় সেঁজুতি। মা-বাবার গন্ধ ভরে আছে বিছানাজুড়ে। যেখানে আশ্রয়ে নিশ্চিন্তি আছে। নির্ভার এক সতেজতা। আর খুব মনে পড়তে লাগল তমোঘœকে। ভাবনার আরাম পাচ্ছে। ঘুমোবার কথা ছিল। এখন না ঘুমিয়ে থাকতে ভালো লাগছে। ভাবনার সহজতার ভেতর এক স্বস্তি ও আরাম পাচ্ছে। জানে, মাও ঘুমোচ্ছে না, ঘুমোবার ভান করে পড়ে আছে। হয়তো বাবাও ঘুমোচ্ছে না। বাইরে জ্যোৎøা, শৈশব-কৈশোরের সবকিছু।
একটু আগে তো বেশ ঘুমিয়ে নিয়েছে, এখন না ঘুমোলেও চলবে। বাবা-মা কারো সঙ্গে এখন কথাও বলবে না। সে শুধু একা ভাবে নাকি, হয়তো মা-বাবাও ভাবে। রাত ক্রমশ সূর্যের নাগাল পেতে ছুটে চলেছে দিবালোকের দিকে। সেখানে কত গড়ন-গঠন, আচার-বিধি, সখ্য-আকাক্সক্ষা, কামনা-বাসনা বিরোধ-মিলন। যুগ- যুগান্তের চিরমন সেখানে লুকিয়ে আছে। গুহায় থাকা আদিম মানুষটি কি সেখানে নেই? মনের আলোছায়া মাখতে মাখতে একসময় ঘুমিয়ে পড়তে চাইল সে। আর ভাবতে ভালো লাগল, সে ঘুমিয়ে পড়ছে।
জ্যোৎ¯œায় তখনো চারপাশ ভরে ছিল। (চলবে)