একটি মেয়ে

লেখক:

আফসার আমেদ
॥ ২৩ ॥
দূরপাল্লার বাসটা ছাড়তে সন্ধ্যা হয়ে গিয়েছিল। ঘড়িতে তখন ছটা দশ। জুনের মাঝামাঝি, বর্ষাকাল চলছে। আকাশে মেঘ। বাসটা বর্ধমান শহর ছাড়াচ্ছিল ধিমেতালে। গতি এখন হ্রস্ব। বাসের মাঝামাঝি বাঁদিকে টু-সিটে তারা বসেছে। সেঁজুতি আর আলম। আলমের গায়ের পাশেই। আলমের অস্বস্তি হচ্ছিল, তাকে বোঝায় তার কোনো অসুবিধে হচ্ছে না, আলম আরাম করেই বসুক। জানালার ধারে বসেছিল সেঁজুতি। কোথায় গন্তব্য কিছুই আলমকে বলেনি সে। তাকে আরো তিনদিন সঙ্গ দিতে পারবে কিনা, এটুকু জেনে নিয়েছিল। আলমের আপত্তি নেই। কিন্তু আলম কিছু ভাবছে, ধন্ধে পড়ে গেছে। পড়ুক। পড়াই উচিত তার।
রাতের জন্য বউদি লুচি, আলুর দম কষা বানিয়ে দিয়েছে। জল নেওয়া হয়েছে। আলম তার আজ্ঞাবহ, দাসানুদাস।
প্রথম থেকেই আলম ঘুমিয়ে পড়ছে। যাত্রার মজাটাই হারিয়ে বসছে। সেঁজুতি নন্দিনীর কথা ভাবে। গতকাল সন্ধেয় ঘণ্টা দেড়েক তাদের সঙ্গে কাটে। যে নন্দিনীর রূপের কোনো তুলনা হয় না, যে ক্লাসে ফার্স্ট-সেকেন্ড হতো, অঙ্কে একশতে একশ পেত, উচ্চমাধ্যমিকের পর তার বিয়ে হয়ে যায়। বাবা ছোটখাটো স্টেশনারি দোকানদার। একটা সন্তান হওয়ার পর নন্দিনীর রূপ হারিয়ে গেছে। আন্তরিকতা ছিল কথায়, আচরণে; কিন্তু প্রাণ ছিল না। যেন কোনো মৃত জোনাকির মতো আলো দিয়ে চলেছে। আশা-স্বপ্ন এর মধ্যেই হারিয়ে বসেছে। স্বামী মাঝারি চাষি। বেশিদূর পড়াশোনা করেনি। কিন্তু খেতে-পরতে দিতে পারে। সিনেমাকে ‘বই’ বলে, সম্মানকে ‘সর্মান’, প্রাইভেটকে ‘পেরাইভিট’, স্ত্রীকে ‘পরিবার’ – এই কদর্যতা নিয়ে নন্দিনী থাকে, বাঁচে, সহবাস করে। কোনো আলোই নেই সেখানে। একটা যদি নদীর কথা থাকত! থাকত যদি হাঁসেদের সাঁতারের ডানার ঝাপটে জলকণা ছড়িয়ে যাওয়ার কথা, তাহলে কিছু বাঁচা থাকত।
মোটা করে নম্য নেয় নন্দিনীর বর। তাই শীতলাতলা থেকে ফেরা তার সহজ হলো। দাদা দাদার মতো আছে। বাবা-মা তাদের মতো করে আছে। বউদি হয়তো এখনো কিছু স্বপ্ন নাড়াচাড়া করে, সেও হারিয়ে ফেলবে সব। তাদের মতো করে তারা ঠিকই আছে। শুধু সেঁজুতি ঠিক নেই। তাই তার এই লড়াই আর পরিভ্রমণ। কী লড়াই করছে সে। মনে হয় কিছু একটা করছে সে।
প্রহর নীরজাদের কথা মনে পড়ে, মনে পড়ে খাপছাড়ার আড্ডার কথা। এতখানি নিজেকে তাদের থেকে সরিয়ে নেওয়া ঠিক হয়নি। তারা সবাই তাকে তেমন অপরাধী মনে করে না। অন্যায় হয়তো আছে সমাজ-সংগঠনে। সে অনাবিল এক নারী, মাতৃগর্ভে খেলা করে গেছে শুধু। এখন চলেছে কোথাও একটা। সে-এক যাত্রা, নিয়তিতাড়িত হয়ে। কিছু একটা করে দেখাবে? সে কি ব্যর্থ হবে? হয়তো। তাতে তার কিছু করার থাকবে না।
দূরগামী বাসের সিটে চেপে বসেছে, সে বাসের যেখানে গন্তব্য সেখানে যাবে? সেখানে সে কী পাবে? প্রহর তার কত ভালো বন্ধু। আহা, কী সুন্দর মানুষ। চমৎকার তার উদারতার মন। হিসাব না রেখে কতবার কত টাকা তাকে দিয়েছে। কিন্তু বন্ধু মৌরি সেন? সে মাথার রোগে ভুগছে। এতদিনে হয়তো পাগল হয়ে গেছে। সৌমী কী করছে? হয়তো ভালো আছে। তাদের ভালো থাকাতে তার কোনো আপত্তি নেই। তারা ভালো না থাকলেই মনে অসন্তোষ।
বাসটা কোথায় যেন থামে, আলম চা খেতে যায়। সে কোনো গন্তব্য জানে না। বাসটা চলতে চলতে এভাবে থামবেই। আলম তাকে শুধিয়েছিল, সে চা খাবে কি-না? না, সে চা খাবে না। সে কোনো দ্বন্দ্ব তৈরি করতে জানে না। আলমের সঙ্গে কথার ঘষাঘষির মধ্যে কোনো আগুন নেই। সে এক নিভন্ত চুল্লি। যেভাবে তাকে রাখা হয়, সে সেভাবে থাকে। নিরুচ্চার নিরুত্তাপ মানুষ একজন। অথচ আদেশ করা হলে একশ আটটা পদ্ম এনে দিতে পারবে। এমন মানুষকে গয়না করা যায়, মালা করা যায় না।
তবু আলমকে সে চায়। তার এই আত্মসমর্পণে সম্রাজ্ঞীর অনুভূতি পায় সেঁজুতি। আলম একা-একা শুধু ঘুমিয়ে পড়তে পারে। আর কোনো কিছু তার উদ্দেশ্য নেই। বাসে তার পাশে বসে সারাক্ষণ ঘুমোচ্ছে।
এখন নেমে গেছে চা খেতে। ভয় হয়, কোনোদিন ফিরল না যদি। বিশ্বাস করে কোনোদিন কোনো সাধারণ মানুষও বুদ্ধদেব হয়ে যেতে পারে, তাই এ-আশঙ্কা হয়। আলম ফিরে আসতে সাধারণ হয়ে যায়।
নন্দিনীদের এতখানি উপেক্ষা ও অবজ্ঞা করা তার উচিত হয়নি, এই মাঝরাতে বাসের ভেতর মনে হলো তার। তাদের নিজেদের মতো জীবনদর্শন থাকতেই পারে। যে-যেভাবে বাঁচতে চায় আর-কি! সব সময় মানুষ রাজকীয়ভাবে বাঁচবে কেন, দীনহীনভাবে বাঁচুক না! মনে-মনে তাদের কাছে ক্ষমতা চায় সেঁজুতি। ক্ষমা চায়, প্রহর নীরজার কাছেও।
বেশ তো আছে বরকে নিয়ে নন্দিনী। তাদের চাষ আবাদ, মেঠো কথা, মোটা সম্ভাষণ, তার কিছু নিহিত অর্থান্তর ঘটাতে পারে হয়তো নন্দিনী। হয়তো কিছু আলো খুঁজে নিতে পারে। ফসলের রস, মাটির গন্ধ, চাঁদের আলো, নদীর চর, এসব মাখামাখি করে তার জীবনের অনুভূতিতে। সেই সম্পদ হয়তো তার নেই। তুলনা করলে সে অনেক বেশি দীনদরিদ্র।
সে এখন চলেছে কোথায়? জানে না। জানলেও বলবে না আলমকে। আলমকে নিয়ে পৃথিবীর শেষ সীমানায় পৌঁছে যেতে পারে সে। এই বাস অনন্তকাল চলুক – এই প্রার্থনা করতে পারে। আলমের সঙ্গে কতক্ষণ কথা বলেনি। বলবেও না। যেন আলম কোনো গাছ বা পাথর, যার সঙ্গে অনেক কথা বলা যায়, যা ভেবে রেখে ডেকে বলতে হয় না। আলমকে শুধু নিরুত্তর থেকে যেতে হয়।
আলম প্রশ্ন করল ঘুম থেকে উঠে, ‘কোথায় যাচ্ছ?’
‘জানি না।’
‘জানতা নেহি কিঁউ।’
‘দেখা যাক, কোথা যায় বাসটা।’
‘কোথায় যাবে?’
‘দেখি।’
‘নর্থ বেঙ্গলকা বাস।’
‘আপাতত নর্থ বেঙ্গল।’
‘তারপর?’
‘দেখি।’
‘ওখানে কে আছে?’
‘অনেকেই তো আছে।’
‘বিশেষ কেউ?’
‘দেখতে পাবি তুই।’
‘তোমার অসুবিধে হচ্ছে বসতে? বারিষ হচ্ছে?’
‘না। আমি কষ্ট পেলে তোর অসুবিধে হয়।’
‘তা তো জানি না।’
সেঁজুতি ভাবল আলম নিজেকে লুকিয়ে রাখার ভাষা খুঁজে পাচ্ছে। সেও পলায়নবাদী মানুষ হয়ে পড়ছে। সে যেমন পলায়নবাদী, মা-বাবাকে ছেড়ে পালাচ্ছে! পালাতেই চায় কি সে? না বেশি করে পেতে চায়? নিজের মনের খবর নিজেই জানে না। প্রহর- নীরজাদের খবর কী? ফিরে গিয়ে দেখা করবে। বন্ধু বিরল হয়ে যাচ্ছে। বন্ধুদের হারাতে চায় না সে। কিন্তু আত্মবিষয়ে টিটকারি দিলে, পরিহাস করলে কার ভালো লাগে? ওরাও বুঝবে। প্রহর তার কত ভালো বন্ধু। ওদের কথা ভাবতে-ভাবতে চোখে ঘুম এসে যায়। এক আরাম আসে মনে। ঘুমিয়ে যায়, ঘুমোতেই থাকে চলন্ত বাসের মধ্যে। আলম তার গায়ের পাশে থাকে, সেও ঘুমিয়ে থাকে। আর সেই ঘুমের পিঠে ঘুমিয়ে-ঘুমিয়ে প্রহরদের সঙ্গে যাপন করে। মনে পড়ে তারও একটা দত্তকেন্দুয়া নামে গ্রাম আছে। আছে দেশবিভাগের স্মৃতি। তার জন্য অশ্র“কান্না আছে। দুই বাংলার এই বিচ্ছেদ সে মেনে নিতে পারছে না। ঘুমের মধ্যে চলন্ত বাসে সেই যন্ত্রণায় সে বিধুর হয়ে উঠল। ভুলে গেল, সে এপার বাংলার লোক, ওপার বাংলা তাকে শুধু স্মৃতিকাতর করছে। মনে করল সেই স্মৃতি তার। সে সেই বাংলায় একদিন ছিল, দত্তকেন্দুয়া তার গ্রাম ছিল একদিন। দত্তকেন্দুয়া। দত্তকেন্দুয়া থেকে চলে আসা মানুষদের সে দেখেছে। সেই স্মৃতিসভা এখন এই বাসের মধ্যে উঠে এলো। কয়েকটা চেয়ার আর টেবিল, কিছু মানুষের সমাগম। তার  ভেতর দাঁড়িয়ে গান গাইছে সেঁজুতি। তার নিজের গান। কত তার বেদনা আর অভিমান। প্রহররা হয়তো বোঝে।
রবি ব্যানার্জি কেমন আছেন এখন? স্ত্রী ও দত্তক মেয়েকে নিয়ে ভালোই হয়তো থাকছেন। বড়ো স্বেচ্ছাচারী ও দুঃখী মানুষ। শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের জীবন ও কবিতার প্রভাবে জীবনকে ধ্বস্ত করে তুলেছে। এই সমাজ সংগঠনে কবিরা হয়তো কিছু। যেমন জীবনানন্দ দাশ। তাঁর জীবনের দিকে তাকালে দুঃখ হবে, আফসোস হবে। কবিতার ভেতর দিয়ে কত জীবনের অন্তর্মূল দেখান তিনি। রবি ব্যানার্জি তার বন্ধু। নিয়মিত তার সঙ্গে আড্ডা দেওয়া যায়, সহমর্মিতায় থাকা যায়। হয়তো মদও খাওয়া যায়। মদ খাবে না কেন?
বাসটা কোথায় যেন থামে।
‘কটা বাজে?’
আলম বলল, ‘আড়াই।’
‘কোথায় এলো?’
‘মালুম নেই।’
‘চল নামি, গরম চা খাই।’
আলমকে ধরে নামে সেঁজুতি। নিচে নেমে জানতে পারল, তারা মালদা এসেছে।
একটা দোকানে গরম-গরম জিলিপি ভাজা হচ্ছিল, চারটে করে খেল তারা। তারপর গরম চায়ে চুমুক দিলো। এখানে বাস কুড়ি মিনিট থামবে। আকাশে বর্ষার জ্যোৎস্না। মেঘে ছেয়ে আছে। মনে হচ্ছে সকাল। একে বলে কাকজ্যোৎস্না। বাবা শিখিয়েছিল। বাবার জন্য মনটা হু-হু করে ওঠে। ওদের ছেড়ে থাকবে। ছেড়েই থাকবে? কোনো উপায় নেই? না, কোনো উপায় নেই। পথ কেটে চলতে হলে এভাবে তাকে পিছু না ফিরে চলতে হবে। যেন সেই রূপকথার গল্পের মতো, পিছু ফিরতে নিষেধ।
‘আমি মায়ের শাড়িটা নিয়ে চলে এসেছি।’
আলম বলল, ‘কী বললে?’
‘ও কিছু নয়।’
‘কিছু একটা তো বললে?’
‘নিজের মনে বললাম।’
‘ও’, আর কিছু শুধোয় না আলম। চা খেতে-খেতে রাত দেখে আলম। এখানে বাস টার্মিনালটা সরকারি আর বেশ বড়ো। রাস্তার ইলেকট্রিকের আলোগুলোকে জ্যোৎস্না নিষ্প্রভ করে রেখেছে। বাসের সব যাত্রীই উঠে পড়েছে। দোকানগুলোতে দেদার বিক্রি হচ্ছে।
এই যাত্রা সে চেয়েছিল। সমুদ্রের কলস্বনের মতো মুখরতা চেয়েছিল। এমনই আকাশতলে ফুটে উঠতে চেয়েছিল। চেয়েছিল এমনই জ্যোৎস্না, এমনই আকাশ হয়তো। উদার প্রসন্নতায় হারিয়ে যেতেই চায়। আলমের সব কাজ ভণ্ডুল করে দিয়েছে। বেশ করেছে। তারও পথশিশুদের সে হারিয়ে ফেলছে। তারা যেন আকাশের জোনাকিদের মতো, তারই পাশে-পাশে উড়ে-উড়ে থাকছে। আয় তো আমার এমপি মুখার্জি, আয় তো আমার হরিশ মুখার্জি। এমন নাম মাহাত্ম্যের অধিকার আর কেউই এমনি করে ছিনিয়ে নিতে পারেনি। তারা এখন এই মুহূর্তে পথের পাথরে শুয়ে আছে অবহেলায়, অবজ্ঞায়।
আঁখি সৌমী মৌরি, ওরা সব কোথায় গেল? এই আকাশে খুঁজবে নাকি তাদের? জ্যোৎস্নার এই আকাশে? সব আছে, সবাই ভালো আছে। সে শুধু ভালো নেই। ভালো থাকার চেষ্টা করে যাচ্ছে। ভালো থাকার জন্য কত চেষ্টা করে যাওয়া যেতে পারে?
একটু তফাতে গিয়ে নির্জনে সিগারেট ধরাল সেঁজুতি। জুত করে বাড়িতে সিগারেট খেতে পারছিল না বলে হয়তো বেশিদিন থাকতে পারল না। তা হয়তো নয়, ভেবে দেখল, তার মনটা অস্থির উতলা হয়েছে। কোনোকিছুর নিশ্চিন্তি খুঁজতে চাইছে সে। তাই তার এমন হুট করে বেরিয়ে যাওয়া। নিজেকে খুঁজে পেতে হবে তাকে, তাই এই পরিভ্রমণ। এক স্থান থেকে আরেক স্থানে ছুটে যেতে হতে পারে তার। চেষ্টা চালাবে। বুঝে দেখবে। তমোঘ্নকে সে হাতের তেলোর মতো করে চেনে। বড়ো ভালো মানুষ। সেখানেই তো ভয়। তমোঘ্র সরলতা তমোঘ্নকে ধ্বংস করে দিতে পারে। বেশ কিছুদিন তমোঘœকে মোবাইলে পাচ্ছে না। তমোঘœও যোগাযোগ করেনি। এখন চলেছে সে তার খোঁজে, একেবারে খোদ তার কাছে। আলমকে সঙ্গী করেছে। কেউ সঙ্গে থাকল, এই তো বেশ। কোথায় পাবে তমোঘ্নকে? তার ভাড়া বাড়ি ঝালংয়ে। স্কুলের ঠিকানাটাও জানা আছে। এসব প্রশ্নের উত্তর আলমকে দেবে নাকি? আলম তো তার আজ্ঞাবহ। তাকে কোনো জবাবদিহি দেওয়ার প্রশ্নই নেই। সে শুধু দেখে যাবে।
একটু মদ সন্ধ্যায় খেয়ে নিলে এই পথযাত্রাটা বেশ আয়েশ করে উপভোগ করা যেত। আলমের মাথায় সেসব উদ্ভাবন নেই। হয়তো মদ কোনোদিন ছোঁয়নি আলম। ঘৃণা করে, হারাম মনে করে।
বলতে-বলতে আবার বাসের ভেতর ঘুমিয়ে পড়ল সেঁজুতি।
বাসের ড্রাইভার চেঞ্জ হয়েছে। যে-ড্রাইভারটি এতক্ষণ চালিয়ে এসেছে, সে এখন সিটে বসে ঘুমিয়ে পড়েছে। এতক্ষণ ঘুমিয়ে থাকা ড্রাইভার চালাতে শুরু করেছে। রাইফেলধারী দুই পুলিশের মধ্যে এই পরিবর্তন হলো। ওরা সব সামনের সিটে বসেছে।
আলমকে নিয়ে সে করবে কী? জলের মাছকে ডাঙায় কিছুক্ষণ রেখে আবার জলে ছেড়ে দেবে। যাও, তুমি তোমার দেখে নাও। ওই গ্রিল কারখানাই তার নিয়তি হবে। আলম কম্পিউটার জানে, আরো কীসব জানে বলছিল। যে যত জানে, তার ততো মঙ্গল হবে। যাকগে, ওকে নিয়ে বেশি ভাববে না। বস্তির ছেলে, পকেটমার, তাকে শুধরোনোর চেষ্টা করেছে শুধু। নিজে নিজেরটা ভালো না বুঝলে কিছু করার নেই। জাহান্নামে যেতে চাইলে জাহান্নামে যাবে। এই কথা ভাবার পর আলমের বাঁ-হাতটা ছোঁয় সেঁজুতি, যেন অসাবধানে – এটা বোঝায়; কিন্তু সচেতনতা ছিল তার।
আলম বলল, ‘কিছু বলছ?’
‘না। ঘুমিয়ে গেলি নাকি?’
‘নিদ লাগ রাহা।’
‘তবে ঘুমিয়ে যা।’
‘এদিকে প্রথম আসছি।’
‘ভালো লাগছে?’
‘খুব ভালো। তুমি ঘুমতে এলে?’
‘তাই মনে কর না।’
‘আমার বেড়াতে খুব ভালো লাগে। আজমির গিয়েছি একবার। শিলিগুড়ি থেকে দার্জিলিং যাওয়া যায় না?’
‘হ্যাঁ। সিকিম-গ্যাংটক কার্শিয়াং-কালিম্পং কত কী বেড়াবার জায়গা।’
‘আমরা কোথায় চলেছি?’
‘কোথাও একটা।’
‘কোথায়?’
‘সেখানকার বিউটি চোখ জুড়ানো।’
‘কোথায়?’
‘জলঢাকা। ওখানে একটা বিদ্যুৎ প্রকল্প আছে। তারই কাছে ঝালং-নামে একটি গ্রাম, সেখানেই যাব।’
‘সেখানে কে আছে?’
‘গেলেই দেখতে পাবি।’
‘আমারও চেনা?’
‘না। সে আমার বন্ধু।’
‘খুব কাছের বন্ধু?’
‘হ্যাঁ, ঠিক তাই।’ হেসে ফেলে সেঁজুতি।
‘যা ভেবেছি, তাই সত্যি হলো।’
‘তুই তো ভাববি, তোর ভাবনাকে বাধা দিতে পারব না।’
কিছুক্ষণ ভাবতে থাকল আলম। তারপর বলল, ‘তোমাকে বিয়ে করবে?’
‘জানি না। তুই এসব নিয়ে ভাবিস না।’
‘ও আচ্ছা। কিন্তু’ –
‘চল, আবার আমরা ঘুমিয়ে পড়ি।’
চলমান বাসের মধ্যে সেঁজুতি আবার ঘুমিয়ে পড়তে থাকে। আলম ঘুমোতে পারে না, কিছু হয়তো ভাবে। ওকে জানতে দিয়ে ওর হাতে হাত রাখে সেঁজুতি। চাপ দিয়ে ঘুমিয়ে পড়তে বলে। এ- কথা বোঝে হয়তো আলম, ঘুমিয়ে পড়তে চাওয়ার নিশ্চিন্তি শ্বাস ফেলে।
বাস চলার একঘেয়ে শব্দটা হয়েই চলে। ভোর হতে চলেছে। বাইরে প্রসন্ন আলোয় ভরা মাঠ, দিগন্ত, গাছপালা, ঘরবাড়ি, গ্রাম প্রতিবেশ।
যত কাছাকাছি চলে আসছে, ততোই দুর্ভাবনা হচ্ছে সেঁজুতির, তমোঘœ ঠিকঠাক আছে তো? কোনোভাবে নিজেকে হারিয়ে ফেলেনি তো? আবেগপ্রবণ, বড়ো বেশি আবেগপ্রবণ। কীভাবে আছে, আগে থেকে অনুমান করা খুব কঠিন। বন্ধু থেকে কাছের মানুষ হিসেবে চয়ন করেছে। সেই চয়নে ধরাও দিয়েছিল তমোঘœ। আবার হারিয়েও গিয়েছে। তাকে খুঁজে নেওয়ার প্রয়োজন বড়ো সেঁজুতির। তার তো ঠিকঠাক ঠিকানা আছে, পৌঁছতে তার চেয়ে বেশি কিছু লাগে না। একটা-দুটো বাসের যাত্রা শুধু। আর কিছু সময়। সেই যাত্রার মনোরমতার ভেতর পৌঁছনো যায়। এই মেঘলা আকাশ, বৃষ্টি, জ্যোৎস্না, বাতাস, সবকিছু উপভোগ করতে-করতে চলেছে সে।  এই আয়োজন যদি এতোই সামান্য তো আগে আসেনি কেন? আগে তমোঘœকে এতো মনে পড়েনি, প্রয়োজনের আকুতিও এত তীব্র হয়নি।
তমোঘ্নর কাছে প্রায় চলে আসা, তার যেন জেগে ওঠা। জেগে ওঠার শক্তি খুঁজে পায়নি সে এতোদিন। নিজে মরে ছিল, সবাইকে মরা দেখত। এলো তো এতদিন পর শীতলতলায়। এতদিন বিচ্ছেদের পর তমোঘœর কাছে যাচ্ছে মিলনে।
সকাল সাড়ে ৮টায় শিলিগুড়িতে নামল। ভিজে রোদ। গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টি পড়ছে। আবার চা খাওয়া গেল। বিস্কুটও।
ঝালংয়ে যাওয়ার বাস দেরি আছে। একজন প্রাইভেট কারের ড্রাইভারকে পাওয়া গেল, সে ওদিকে যাবে। ‘চলুন অনেকটা পৌঁছে দিই, সেখান থেকে অনেক বাস পেয়ে যাবেন।’
‘তুমি কতদূর নিয়ে যাবে?’
‘মালবাজার। ফুস করে পৌঁছে যাবেন। তারপর ওখান থেকে বাস পেয়ে যাবেন।’
‘কত নেবে, কত?’
‘দুজনে একশ টাকা দেবেন।’
‘তাই চলুন।’
ড্রাইভার রাজি হয়ে গেল।
অতএব আলমকে নিয়ে উঠে বসল সেঁজুতি। বলল, ‘ও ড্রাইভার, তুমি এতো কমে রাজি হলে কেন?’
‘মিলিটারি অফিসারের গাড়ি। সাহেবকে ট্রেনে তুলতে এসেছিলাম। ফিরছি, আপনাদের নিয়ে নিলাম।’
‘কতটা পথ?’
‘অনেকটাই পৌঁছে যাবেন আপনারা। বেড়াতে যাচ্ছেন?’
‘হ্যাঁ।’
‘বিন্দুতে যান, ভালো লাগবে।’
‘কোথায় দিয়ে যাবে?’
‘এই তো, তিস্তা ব্রিজ পেরোবো, একটু পরেই, বর্ষার তিস্তা দেখতে ভালোই লাগবে।’
‘এদিকে তো অনেক চা বাগান?’
‘সে তো আছে। এখানে ফরেস্ট তো ভালো।’
‘খুবই ভালো।’
‘ফরেস্টে কী আছে?’
‘জন্তু-জানোয়ার আর হাতি।’
বলতে-বলতে তিস্তা ব্রিজ এসে গেল। বিস্তৃত বিশাল খরস্রোতা তিস্তা। ভয়ংকর সুন্দর তার রূপ। বৃষ্টি আর রোদে ঝকঝক করছে। আকাশের বিশালতা ঝুঁকে আছে তার দিকে। অনন্ত আকাশ। তিস্তা বুড়ি রূপ নিয়ে যেন কথা বলে চলেছে। খরস্রোতা। পাহাড় থেকে নেমে আসছে সে-জল। খুবই ঠান্ডা, স্বচ্ছ সে-জল।
দেখানোর জন্য খুবই ধীরে-ধীরে গাড়িটা চালাচ্ছিল ড্রাইভার ছেলেটি। (চলবে)