একটি মেয়ে

লেখক:

আফসার আমেদ

\ ১৭ \

 

দরজা
খুলে দিলো আলমের মা। আর আলমের ব্যান্ডেজ দেখে হাউমাউ করে উঠল।

‘ক্যা
হুয়া রে মেরা জিস্ম কা টুকরা? এ লেড়কি কৌন?’

আলম
চাপা স্বরে বলল, ‘জো হামারা জান বাঁচায়া। চিল্লা মত্। পানি দে তো।’

‘ক্যা
হুয়া, কোই লাফড়া?’

‘লাফড়া-ফাপড়া
নেই, স্রিফ অ্যাকসিডেন্ট।’

‘ক্যায়সে?’

‘খামোশ, বাদমে শুনো।’

‘বাদমে?’

‘হাঁ বাদমে।’

তক্তপোশের বিছানায় বসতে ইশারা করে আলম সেঁজুতিকে।
সেঁজুতি দেখল একটা অপরিসর ঘর। ওপরে মাচা। মাচার ওপর থেকে উঁকি মেরে বসে আছে দুটি
মুখ। একজন বয়স্ক পুরুষের, অন্যজন কমবয়সী এক বালিকার। ইশারা করে আলমের কাছ থেকে
জানতে চাইল সেঁজুতি, ওরা কারা। আলম বলল, ‘আববাজি আর বহিন।’

আলমের মা বোতল বাড়িয়ে দিলো আলমের হাতে। তারপর
পাশে বসে গায়ে হাত বুলোতে লাগল। আর নিচু স্বরে
কেঁদে চলেছে। ‘মেরা লালকা ক্যা হুয়া রে। কলিজা কা টুকরা।’

তখন জল খাচ্ছিল আলম। ঘটনাটা বানিয়ে বলল সেঁজুতি
আলমের মাকে। আলমের মায়ের বছর বিয়াল্লিশ বছর। খুবই সুন্দরী। চমৎকার মমত্ববোধ। আলম
ভিড় বাসে ঝুলে ঝুলে যাচ্ছিল, পড়ে যায়। তাকে রক্তাক্ত অবস্থায় তুলে হাসপাতালে নিয়ে
যায় সেসহ আরো অনেকে। ওখানে আলমের চিকিৎসা হয়। আলমের মোবাইল খোয়া গিয়েছে, তাই খবর
দিতে পারেনি। বস্তির যেসব ইয়ার দোস্ত আছে, তাই তারা কেউ যায়নি। তারাই সব দেখভাল
করত। চিকিৎসার জন্য ডাক্তার রেখে দিলেন কিছু সময়ের জন্য, তাই রাত হলো। ভাবনার কিছু
নেই। আলমের বিপদ কিছু হয়নি। ভালো আছে। এখন আর কান্নাকাটি করে লাভ নেই।

মা বলল, ‘খুদা খায়ের করেছে।’

আববাজি ও বহিন আমিনা দুজনেই নেমে এলো। ওরা আলমের
কাছে এসে আলমকে দেখল। ছুঁয়ে দেখল, কথা বলে দেখল। তাদেরকে আলম বলল যে, তার কিছু
হয়নি।

ঘরের দরজা খোলাই ছিল। আলমের মা বাইরে বেরিয়ে
চেঁচিয়ে কেঁদে উঠল, ‘হায় মেরে লাল, জিস্ম কা টুকরা, তেরা ক্যা হুয়া  রে।’ –

আলমের আববাজি বেরিয়ে কাছে যায় তার কান্না থামাতে।

সেঁজুতি মাথানত করে বসেছিল।

আমিনা কাছে এসে তার হাত ধরল, ‘তুমি না থাকলে আমার
ভাইয়ার জান যেত। তুমি ফেরেশতার মতো চলে গিয়েছিলে?’

‘হ্যাঁ।’

‘দিদি তুমি তোমার বাড়িও যেতে পারলে না?’

‘না।’

‘তোমার আল্লা ভালো করুক।’

‘তুমি পড়ো?’

‘হ্যাঁ।’

‘কোন ক্লাস?’

‘এইটে। বাংলায়।’ একটু চুপ করে থেকে বলল, ‘জানো,
ভাইয়াও খুব ভালো ছাত্র ছিল, মাধ্যমিকে স্টার পেয়েছিল। আববাজির অসুখ না করলে ভাইয়া
এতদিনে ইঞ্জিনিয়ার হয়ে যেত।’

‘ও তাই? এ তো জানতাম না।’

‘সবই বদ নসিব।’ মাকে সামলাতে আমিনা বাইরে চলে
গেল।

আলম অপরাধবোধ নিয়ে মাথা নিচু করে বসে আছে।
তক্তপোশের এক কোনায় সেঁজুতি বসে থেকে ভাবল, এখানে সে এলো কেন? মনে করতে পারল, যেন
নিয়তির মতো তার এ চলে আসা। বস্তির এই জীবনযাপন আগে সে দেখেনি। দূর থেকেই দেখেছে।
আজ অভ্যন্তরে এসে পড়ে হতচকিত সে। এখন মনে হলো, কেনই বা আলমের সঙ্গে তার দেখা
হয়েছিল? আর গণপ্রহারের সময় কেন সে পৌঁছে গিয়েছিল? এই ঘটনা তার জীবনে ঘটল কেনই বা?

আলমের মায়ের কান্নায় বস্তির কিছু মানুষের ঘুম
ভাঙল। চারজন আলমের সমবয়সী বন্ধু চলে এলো। তারা জানতে চাইল, তাকে বেপাড়ার কেউ
মেরেছে কিনা? মানু, পচা, কাদির, জুম্মান লাফালাফি করতে লাগল। তারা জনে জনে ঘরে এসে
দেখে গেল আলমকে। বুঝতে চাইল ব্যাপারটা। সেঁজুতির প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাল। এ-ঘটনা
ভালোবাসা আর সম্পর্কের আন্তরিক এক বাতাবরণ তৈরি করল। দেখল, তাদের বস্তির ছেলের
প্রতি তাদের কী মমত্ব।

আলম অপরাধীর মতো মাথা নিচু করে আছে। আলম বলল,
‘আরে ইয়ার যা না, লাফড়া-ফাপড়া কুছ নেহি হুয়া, নিদ হারাম করিস কেন? আমি ঠিক আছি।
একটু লেগেছে। কুছ হোগা নেহি। থোড়াসা দর্দ। আর কুছ নেহি।’

বাইরে বেরিয়ে বন্ধুরা দূরে দাঁড়িয়ে আবার জটলা
করতে লাগল। কথা বলতে লাগল নিজেদের মধ্যে।

অদ্ভুত এক পরিবেশ। প্রাণ আছে, মনে করল সেঁজুতি।
রাত দেড়টা বেজে গেছে। বস্তির ভেতরে এখনো কিছু মানুষ জেগে আছে। অনেক মানুষ ঘুমিয়েও
আছে। কান্নাকাটি, চেঁচামেচি ঝুট- ঝামেলার মধ্যেও তারা ঘুমোতে পারে। আলম গুম মেরে
আছে। শুধু জল খাচ্ছে। ও কি বমি করবে? বমি না করুক। ডাক্তারবাবু বলেছেন, বমি করলে
খারাপ লক্ষণ, ডাক্তারের শরণাপন্ন হতে হবে। সে বুঝতে পারল, আলমের পকেটমার পরিচয়টা
বস্তিতে নেই, ভালো ছেলে বলে পরিচিত। বাগবাজারে গ্রিল কারখানায় কাজ করে। বাবা
পার্কসার্কাসে রুটির কারখানায় কাজ করে। বছর পঞ্চাশ বয়স। কিন্তু রোগে ভুগে
অকর্মণ্য, অকালবৃদ্ধ, রুগ্ণ। ভালো করে নিজেই হাঁটতে পারেন না। সংসারের ভার নিতে
তিনি অসমর্থ। মা ঠিকা ঝিয়ের কাজ করে ফ্ল্যাট বাড়িতে বাড়িতে। বোন পড়ে।

আলমের পকেটমার হওয়ার সব সম্ভাবনাই ছিল। সম্ভাবনা
ছিল ইঞ্জিনিয়ার হওয়ারও। ফলে আলমকে দোষ দেওয়া যায় না।

মা খেতে দেওয়ার আয়োজন করতে লাগল।

ছোট ঘরেই স্টোভ ও রান্নার ব্যবস্থা, বিশ্রামেরও
বিছানা। একটা টিভিও আছে।

দেয়ালের দিকে মুখ ঘুরিয়ে বসেছিল আলম, বলল,
‘দিদিকে আমার খাবারটা দাও, আমি খাব না।’ আর কেঁদে উঠল।

পিঠে হাত দেয় সেঁজুতি, ‘আলম কেঁদো না, চুপ করো।’

‘আমার খিদে নেই।’

‘তোমার খাবার তুমি খাবে, আমি এখানে তোমাকে দিতে
এসেছি, খেতে আসিনি।’

‘দিতে এসেছ শুধু? কেন দিতে এলে? আমি তো একাই চলে
আসতে চেয়েছিলাম।’

‘তুমি ভুল বুঝছ, আমার খিদে নেই।’

‘আমাদের খাবার খাবে না? ও তাই বলো।’

‘তা কেন? আসলে তুমি ব্যাপারটা বুঝতে পারছ না।’

আলমের মা বলল, ‘আমাদের খাবার খেতে নারাজ বেটি?’

‘না না দিন, খাব। এক টুকরো রুটি।’

‘না, তোমাদের দুজনের হয়ে যাবে। রুটি-সবজি-ডাল
আছে। তোমার নাম কী?’

‘সেঁজুতি।’

‘তোমরা হিন্দু?’

‘হ্যাঁ।’

‘তাই খেতে চাইছিলে না? আমরা সবাইকে আপন মনে করি।’

‘আমি তাই মনে করে খেতে চাইনি মা। আসলে খিদেটা মরে
গেল।’

মা দীর্ঘশ্বাস ফেলল, ‘তুমি আলমের জান বাঁচিয়ে
এনেছ, আর সেই তুমি না খেয়ে রাত কাটাবে, তা কী করে হয়? আমি মা, আমার বরদাশত হবে না।
আলমকা দিল বহোত সাচ্চা, উনকো কসুর নিও না মা। একটুতেই রেগে যায়।’

‘আমিও তো।’ হেসে ফেলে সেঁজুতি। ‘এতগুলো রুটি,
ডাল, সবজি কে খাবে?’

‘খাও খাও মা, রাত জ্যাদা হোয়েছে।’

আমিনার চোখের ভাষায় খাওয়ার আমন্ত্রণ।

আলমের চোখ চিকচিক করছে।

এই তো সামান্য খাবার। কিন্তু আমন্ত্রণের মধ্যে
কী  আন্তরিকতা।

সেঁজুতি খেতে আগ্রহ প্রকাশ করল। সত্যিই তো এই
পরিবেশে খাবার খেতে অনীহা হওয়ারই কথা। কিন্তু সম্পর্কগুলো কেমন ঘনিয়ে এলো এই
ঘণ্টাখানেক যাপনের মধ্যে। তার ভেতর কিসের যেন আলো। আর খিদেবোধও এলো। আগে একটু জল
খেল। তারপর খাবারে হাত দিলো।

আলমও খেতে শুরু করেছে। আলম খুব নীরব হয়ে গেছে।
চোখের চাহনিতে অস্বস্তি। কিন্তু অসুস্থ বোধ করছে কি-না? অমন গণপ্রহারের পর
মস্তিষ্কে হ্যামারেজ হলো কি-না? বমি পাচ্ছে কি-না? জ্বর অথবা গায়ের ব্যথা ভেতরে
ভেতরে যন্ত্রণাকাতর দুঃসহ করে তুলছে কি-না তাকে? এসব দুশ্চিন্তা সেঁজুতির মনকে
সহসা কাতর করে তুলল। প্রার্থনা করল, আলম ভালো থাকুক। আর সে যে তাকে বাঁচিয়ে তোলার
চেষ্টা করেছে, সেই কাজে সে সফলতা পাক। আর মা-বাবা-বোনকে দেখে তাদের চোখের ভাষা
দেখে এ-প্রার্থনা আরো উন্মুখ হলো। সে কি দ্রুত পালিয়ে যেতে চায় এই বস্তির জীবন
থেকে? সে স্বার্থপরতার এই স্বস্তি খুঁজছে কি? নিজেকে নিয়ে সে কি খুব ব্যস্ত?
পালিয়ে গেলেই বাঁচে? হয়তো সে পালিয়ে যাওয়া চাইছে। তাতেই যেন বাঁচে। কেন সেই
গণপ্রহারের জায়গায় সে পৌঁছল। তাহলে তো এতক্ষণ নিজের বিছানায় শুয়ে আরামে ঘুমিয়ে
থাকতে পারত। একটা কিছু রান্না করে খেয়ে নিত। মোবাইলে প্রয়োজনীয় কথা সেরে নিত। তার
আগে একটা বড়ো চা বানিয়ে তারিয়ে তারিয়ে খেত বিছানায় বসে।

অথবা রবি ব্যানার্জির ফ্ল্যাটে বেশ কিছু সময়
কাটাত সে। প্রহর নীরজাদের সঙ্গে কখনো নয়। অন্তত আজকের রাতে। আজকের রাতটা তার জীবনে
পূর্বনির্দিষ্ট ছিল? সে কি এড়াতে পারত না? এখানে এতো আলো আর রং কম কেন? কেন গুমট
গরম আর প্রাণবায়ুর অভাব? শুধুই অপরিসর আর সংকীর্ণতা। আলো-বাতাস রং হ্রস্ব ঠেকছে
শুধু।

আলমের বন্ধুরা এসেছিল। তারা এখন ফিরে গেছে। এই
বস্তির ভেতরই তার বসবাস। ওদের প্রতিরোধের আর্তস্বরের ভাষা ও শব্দ এখনো ওই ঘরে
বাজছে। সেই আর্তরব এখনো কানে বাজছে সেঁজুতির। ঘুমোবে না, কিছুতেই ঘুমোবে না আজ সে।
কিছুতেই ঘুম আসবে না, কিছুতেই ঘুমোবে না সে। এখানে স্থাণু হয়ে বসে বিনিদ্র কাটাবে।
এখানে আলো, রং আর বাতাসে দীনতা দেখে বেড়াবে।

খাওয়ার পর আলমকে ওষুধ খাওয়াতে সাহায্য করল
সেঁজুতি।

তারপর আলমকে নিয়ে ওর মা মাচায় উঠে গেল।

বুঝল নিচের বিছানায় তার আর আমিনার বিশ্রাম নেওয়ার
জায়গা হলো।

আমিনা বলল, ‘দিদি শুয়ে পড়ো। আমি আর ঘুমোব না।’

‘আমি শোব? কেন?’

‘কতক্ষণ তো আরাম করোনি।’

‘এ-ই বেশ, বসে থাকি।’

‘বসে থাকবে? একটু শুয়ে নিলে আরাম পেতে।’

‘তুই শো।’

‘আমি শোব না, তুমি শোও।’

‘বরং তোর সঙ্গে গল্প করি।’

‘গল্প করো না শুয়ে শুয়ে।’

‘না, যদি ঘুম এসে যায়!’

‘হায় আল্লা, নিদকে ডর।’

‘হায় আল্লা। বেশ তো শোনাল কথাটা। আর একবার বল।’

হেসে ফেলে আমিনা, ‘হায় আল্লা!’

‘বেশ। তা তুই বড়ো হয়ে কী হতে চাস?’

‘নার্স।’

‘নার্স? ডাক্তার নয় কেন?’

‘আমি সেবা করব।’

‘আর কী স্বপ্ন দেখিস?’

‘খোয়াব? পাকা ঘরে থাকার। ভদ্রলোকের পাড়ায়। তুমি
যেমন থাকো।’

‘আমি? তোকে কে বলল?’

‘আমি দেখে বলতে পারি। তুমি কোথায় থাকো?’

‘সন্তোষপুরে। তুই এইটে পড়িস তো?’

‘হ্যাঁ। বাংলা মিডিয়ামে।’

‘বাংলা মিডিয়াম?’

‘হ্যাঁ। দাদা পড়েছিল উর্দু মিডিয়ামে। আমি বাঙালি
হয়ে গেছি। আমার বাঙালি হতে খুব ইচ্ছা। দেখবে আমি একদিন বাঙালি হয়ে যাব।’

আমিনার কথা শুনে হেসে ওঠে সেঁজুতি। ‘তুই কি হতে
চাস না?’

‘ঠিকা ঝি হতে চাই না। ওটা বাজে কাজ।’

‘হ্যাঁ ঠিকই তো, তুই করবি কেন?’

‘মাঝে মাঝে করে থাকি। মায়ের বিরাম হলে।’

‘সে কী?’

‘না করে উপায় থাকে না।’

‘স্কুল?’

‘সেদিন, সেদিন বন্ধ রাখি।’

‘কেন, তুই ওসব করবি কেন?’

‘আমি বিয়েও করব না।’

‘সে কী? কেন?’

‘ওটা গন্দা কাম মনে হয়। সোহরের সঙ্গে বিবির
ঝামেলাই তো দেখছি।’

‘ভালো বলেছিস। কিন্তু অতটা অমন নয়।’

‘তাহলে বলছ ভালো।’

‘কিছু কিছু ভালো স্বামী-স্ত্রী তো থাকে। তুই গান
জানিস?’

‘না। আবৃত্তি জানি। বলব রবীন্দ্রনাথের ‘প্রশ্ন’
কবিতাটা?’

‘না থাক। এত রাতে একা একা ‘প্রশ্ন’ কবিতা আবৃত্তি
করে কোনো লাভ নেই।’

‘তুমি কি ভাইয়াকে আগে চিনতে?’

‘না। তোর কেন মনে হলো?’

‘কীভাবে যেন মনে হলো।’

‘কীভাবে মনে হলো?’

‘ভাইজানের অাঁখ দেখে।’

‘আমাকে দেখে তোর কী মনে হয়?’

‘তোমার খুব -’ চুপ করে যায় আমিনা।

‘বল, থামলি কেন?’

‘বলব?’

‘বল না।’

‘তুমি খুব জিদ্দি আছো, কিন্তু তোমার মন খুব ভালো।
তুমি ভেতরে লুকিয়ে থাকো।’

‘এতো তোর বুদ্ধি কবে হলো?’

দুজনেই চুপ করে যায়। সেঁজুতির স্বতই হাই ওঠে।
একটা সিগারেট খেতে ইচ্ছে করল। ‘এই আমিনা, বাইরে নিয়ে যাবি?’

‘কেন, বাথরুম যাবে?’

‘না, অন্য দরকার আছে।’

‘কী দরকার?’

‘আমি সিগারেট খাই।’

‘আগে বলবে তো।’

‘তোর খারাপ লাগল শুনতে?’

‘না, এখানে তো অনেক মেয়ে বিড়ি খায়।’

‘বেশ।’

‘বাইরে খাবে চলো, এখানে কোনো ভয় নেই এত রাতেও।’

ঘরের দরজা খুলল নিঃসাড়ে আমিনা। মাচার অন্য সবাই
বোধহয় ঘুমিয়ে গেছে। আলম ও আলমের বাবা-মা। সে আর আমিনা দরজা খুলে অচলায়তন রাস্তায়
নেমে এলো। বাইরে লোকজন নেই। ছায়াময়তা। দূরে জ্বলা লাইটপোস্টের আলো কিছু গড়িয়ে
এসেছে। বসবাসের গন্ধ চারপাশে। দূরে কেউ কেউ আছে। কিন্তু তাদের বেরোনোও স্বাভাবিক
মনে করে তারা ব্যাঘাত করতে আসছে না। আমিনা বলল, আর কোনোদিন যদি তার সঙ্গে দেখা হয়,
তাহলে এই বস্তির নানা বিচিত্র কাহিনি বলবে সেঁজুতিকে। সেসব শোনার উন্মুখতায় আবার
এখানে আসার বাসনা তৈরি হলো তার। আসবে, নিশ্চিত হয়তো আসবে সে। এমনই রাত বইবে
আমিনাকে সঙ্গে নিয়ে তার কাটবে। এমনই আলো-ছায়া রং ও বাতাসের মধ্যে তার কাটবে। আলমকে
তখনো বাঁচিয়ে রাখা যাবে কি? নাকি গণপ্রহারে মারাই যাবে ছেলেটি? জানে না, কিছুই
জানে না সেঁজুতি। নাকি আলম পকেটমারি ছেড়ে দিয়ে স্বাভাবিক জীবনে বেঁচে উঠবে? সে না
বেঁচে থাকলে আমিনার কাছে এই বস্তির কাহিনি শুনতে আসা অবান্তর হয়ে যাবে। প্রহররা
জানে না, সে এখন কোথায় আছে, কীভাবে আছে? আত্মকাহিনির মতো হয়তো এই ঘটনাগুলো
অপ্রকাশিত রয়ে যাবে। আত্মকাহিনির কথাটা যেন কেমন শোনাল নিজের কাছে সেঁজুতির। সেকি
সত্যিই জড়িয়ে যাচ্ছে, জড়িয়ে যাবে এই বস্তির জীবনের সঙ্গে? না, পালিয়ে যাবে সে?

সঙ্গে সঙ্গে আমিনার হাত ধরে ফিরে এলো সেঁজুতি
বস্তির ঘরে। রাস্তা শূন্য ফাঁকা পড়ে থাকল। ঘরে এসে বলল, ‘আলোটা নিভিয়ে দে আমিনা,
আমার ঘুম পেয়েছে।’

আলোটা তৎক্ষণাৎ নিভিয়ে দেয় আমিনা।

সেঁজুতি
শুয়ে পড়ে বিছানায়। কিন্তু অন্ধকারে কেমন ভয় পেল। হাতড়াতে লাগল আমিনাকে। ‘আমিনা,
আমার পাশে শুবি আয়।’

‘আমি শুলে তোমার অসুবিধে হবে।’

‘না, আমার ভয় করছে।’

সঙ্গে সঙ্গে আমিনা পাশে এসে শুলো। একটা টেবিলপাখা
তার দিকে দিয়েছে আমিনা। প্রচন্ড গরমে ঘেমে-নেয়ে যাচ্ছে। কিন্তু ঘুমের জন্য কাতর।
ঘুমিয়ে পড়তে চাইছে। ঘুম। ঘুম। ঘুম। ঘুমিয়ে পড়ছে সেঁজুতি।

আম্মিজি ঘুমোয়নি। ঘুমোয়নি আলম। দুজনেই নিঃসাড়ে
শুয়ে পড়ে আছে। আলম নিচের দুজনের গতিবিধি মাচার ওপর শুয়ে সব টের পাচ্ছিল। আর বুঝতে
পারছিল, মা তাকে ঘুমিয়ে যেতে দেওয়ার জন্য নিঃসাড়ে ঘুমিয়ে পড়ার ভান করে পড়ে আছে,
তারই গায়ের পাশটিতে। মায়ের অন্য পাশটিতে বাবা ঘুমিয়ে গেছে। নিচের ওরা বাইরে গেল।
ফিরে এলো। তারপর শুয়ে পড়ল। এখন নিশ্চিত হলো সেঁজুতি ঘুমিয়ে পড়েছে। এই ঘরে, এই ঘরের
বিছানায় দিদি কীভাবে শোবে? কীভাবে ঘুমোবে? অথচ ঘুমোল? এ এক অলৌকিক ঘটনা।

মায়ের গায়ের গন্ধের ঘ্রাণ অন্য এক মায়ালোক তৈরি
করে। সেই ঘ্রাণের ভেতর শুয়ে আছে সে। সেই সংশ্লেষে আচ্ছন্ন হয়ে উঠতে থাকে মাথার
ভেতরটা। শীতল ঘন দুধের সরের মতো মোহময় এক আচ্ছন্নতা তাকে ঘিরে ধরছে। পাশে মা শুয়ে
নেই, যেন দিদি শুয়ে আছে। তার সেবা-শুশ্রূষা করছে। তার যেন কঠিন অসুখ, তাকে সারিয়ে
তোলার চেষ্টা করছে। দিদি একজন নার্স। পরনে সাদা শাড়ি অাঁটো করে পরা। চোখে চমশা।
তাকে শুইয়ে রেখে জল খাইয়ে দিচ্ছে।

‘আমাকে একটু বারান্দায় নিয়ে যাবে?’

‘কেন?’

‘ওখানে আকাশ আছে।’

‘তুমি একা যেতে পারো না?’

‘না, আমার সারা শরীরে ব্যথা!’

‘কেন ব্যথা?’

‘অনেকে ফেলে মারল রাস্তায়।’

‘কেন মারল?’

‘ওরা মারবার জন্য মারল।’

‘তুমি কোনো অন্যায় করোনি?’

‘না, ওদের কাছে কোনো অন্যায় করিনি।’

‘তাহলে কার কাছে অন্যায় করেছ?’

‘তোমার কাছে। তোমার চশমাটা চুরি করতে চেয়েছিলাম,
আমার মা চোখে কম দেখে। মাকে দিতে চেয়েছিলাম চশমাটা।’

‘বারান্দায় গিয়ে কী দেখবে তুমি?’

‘একটা চড়ুই এসেছিল, থাকলে দেখব। দেখব আকাশও।’

‘একটু পরে নিয়ে যাব, তোমার খুব অসুখ।’

‘আমার অসুখ কেন?’

‘কথা বলো না, চুপ করে থাকো।’

‘কেন?’

‘তোমার সব কথা জানি।’

‘আমি তোমাকেই সব বলে থাকি।’

‘সে কথা তুমি জানো?’

‘জানি।’

একটি মেয়ে

আফসার আমেদ

\ ১৭ \

দরজা খুলে দিলো আলমের মা। আর আলমের ব্যান্ডেজ দেখে হাউমাউ করে উঠল।

‘ক্যা হুয়া রে মেরা জিস্ম কা টুকরা? এ লেড়কি কৌন?’

আলম চাপা স্বরে বলল, ‘জো হামারা জান বাঁচায়া। চিল্লা মত্। পানি দে তো।’

‘ক্যা হুয়া, কোই লাফড়া?’

‘লাফড়া-ফাপড়া নেই, স্রিফ অ্যাকসিডেন্ট।’

‘ক্যায়সে?’

‘খামোশ, বাদমে শুনো।’

‘বাদমে?’

‘হাঁ বাদমে।’

তক্তপোশের বিছানায় বসতে ইশারা করে আলম সেঁজুতিকে। সেঁজুতি দেখল একটা অপরিসর ঘর। ওপরে মাচা। মাচার ওপর থেকে উঁকি মেরে বসে আছে দুটি মুখ। একজন বয়স্ক পুরুষের, অন্যজন কমবয়সী এক বালিকার। ইশারা করে আলমের কাছ থেকে জানতে চাইল সেঁজুতি, ওরা কারা। আলম বলল, ‘আববাজি আর বহিন।’

আলমের মা বোতল বাড়িয়ে দিলো আলমের হাতে। তারপর পাশে বসে গায়ে হাত বুলোতে লাগল। আর নিচু স্বরে কেঁদে চলেছে। ‘মেরা লালকা ক্যা হুয়া রে। কলিজা কা টুকরা।’

তখন জল খাচ্ছিল আলম। ঘটনাটা বানিয়ে বলল সেঁজুতি আলমের মাকে। আলমের মায়ের বছর বিয়াল্লিশ বছর। খুবই সুন্দরী। চমৎকার মমত্ববোধ। আলম ভিড় বাসে ঝুলে ঝুলে যাচ্ছিল, পড়ে যায়। তাকে রক্তাক্ত অবস্থায় তুলে হাসপাতালে নিয়ে যায় সেসহ আরো অনেকে। ওখানে আলমের চিকিৎসা হয়। আলমের মোবাইল খোয়া গিয়েছে, তাই খবর দিতে পারেনি। বস্তির যেসব ইয়ার দোস্ত আছে, তাই তারা কেউ যায়নি। তারাই সব দেখভাল করত। চিকিৎসার জন্য ডাক্তার রেখে দিলেন কিছু সময়ের জন্য, তাই রাত হলো। ভাবনার কিছু নেই। আলমের বিপদ কিছু হয়নি। ভালো আছে। এখন আর কান্নাকাটি করে লাভ নেই।

মা বলল, ‘খুদা খায়ের করেছে।’

আববাজি ও বহিন আমিনা দুজনেই নেমে এলো। ওরা আলমের কাছে এসে আলমকে দেখল। ছুঁয়ে দেখল, কথা বলে দেখল। তাদেরকে আলম বলল যে, তার কিছু হয়নি।

ঘরের দরজা খোলাই ছিল। আলমের মা বাইরে বেরিয়ে চেঁচিয়ে কেঁদে উঠল, ‘হায় মেরে লাল, জিস্ম কা টুকরা, তেরা ক্যা হুয়া রে।’ –

আলমের আববাজি বেরিয়ে কাছে যায় তার কান্না থামাতে।

সেঁজুতি মাথানত করে বসেছিল।

আমিনা কাছে এসে তার হাত ধরল, ‘তুমি না থাকলে আমার ভাইয়ার জান যেত। তুমি ফেরেশতার মতো চলে গিয়েছিলে?’

‘হ্যাঁ।’

‘দিদি তুমি তোমার বাড়িও যেতে পারলে না?’

‘না।’

‘তোমার আল্লা ভালো করুক।’

‘তুমি পড়ো?’

‘হ্যাঁ।’

‘কোন ক্লাস?’

‘এইটে। বাংলায়।’ একটু চুপ করে থেকে বলল, ‘জানো, ভাইয়াও খুব ভালো ছাত্র ছিল, মাধ্যমিকে স্টার পেয়েছিল। আববাজির অসুখ না করলে ভাইয়া এতদিনে ইঞ্জিনিয়ার হয়ে যেত।’

‘ও তাই? এ তো জানতাম না।’

‘সবই বদ নসিব।’ মাকে সামলাতে আমিনা বাইরে চলে গেল।

আলম অপরাধবোধ নিয়ে মাথা নিচু করে বসে আছে। তক্তপোশের এক কোনায় সেঁজুতি বসে থেকে ভাবল, এখানে সে এলো কেন? মনে করতে পারল, যেন নিয়তির মতো তার এ চলে আসা। বস্তির এই জীবনযাপন আগে সে দেখেনি। দূর থেকেই দেখেছে। আজ অভ্যন্তরে এসে পড়ে হতচকিত সে। এখন মনে হলো, কেনই বা আলমের সঙ্গে তার দেখা হয়েছিল? আর গণপ্রহারের সময় কেন সে পৌঁছে গিয়েছিল? এই ঘটনা তার জীবনে ঘটল কেনই বা?

আলমের মায়ের কান্নায় বস্তির কিছু মানুষের ঘুম ভাঙল। চারজন আলমের সমবয়সী বন্ধু চলে এলো। তারা জানতে চাইল, তাকে বেপাড়ার কেউ মেরেছে কিনা? মানু, পচা, কাদির, জুম্মান লাফালাফি করতে লাগল। তারা জনে জনে ঘরে এসে দেখে গেল আলমকে। বুঝতে চাইল ব্যাপারটা। সেঁজুতির প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাল। এ-ঘটনা ভালোবাসা আর সম্পর্কের আন্তরিক এক বাতাবরণ তৈরি করল। দেখল, তাদের বস্তির ছেলের প্রতি তাদের কী মমত্ব।

আলম অপরাধীর মতো মাথা নিচু করে আছে। আলম বলল, ‘আরে ইয়ার যা না, লাফড়া-ফাপড়া কুছ নেহি হুয়া, নিদ হারাম করিস কেন? আমি ঠিক আছি। একটু লেগেছে। কুছ হোগা নেহি। থোড়াসা দর্দ। আর কুছ নেহি।’

বাইরে বেরিয়ে বন্ধুরা দূরে দাঁড়িয়ে আবার জটলা করতে লাগল। কথা বলতে লাগল নিজেদের মধ্যে।

অদ্ভুত এক পরিবেশ। প্রাণ আছে, মনে করল সেঁজুতি। রাত দেড়টা বেজে গেছে। বস্তির ভেতরে এখনো কিছু মানুষ জেগে আছে। অনেক মানুষ ঘুমিয়েও আছে। কান্নাকাটি, চেঁচামেচি ঝুট- ঝামেলার মধ্যেও তারা ঘুমোতে পারে। আলম গুম মেরে আছে। শুধু জল খাচ্ছে। ও কি বমি করবে? বমি না করুক। ডাক্তারবাবু বলেছেন, বমি করলে খারাপ লক্ষণ, ডাক্তারের শরণাপন্ন হতে হবে। সে বুঝতে পারল, আলমের পকেটমার পরিচয়টা বস্তিতে নেই, ভালো ছেলে বলে পরিচিত। বাগবাজারে গ্রিল কারখানায় কাজ করে। বাবা পার্কসার্কাসে রুটির কারখানায় কাজ করে। বছর পঞ্চাশ বয়স। কিন্তু রোগে ভুগে অকর্মণ্য, অকালবৃদ্ধ, রুগ্ণ। ভালো করে নিজেই হাঁটতে পারেন না। সংসারের ভার নিতে তিনি অসমর্থ। মা ঠিকা ঝিয়ের কাজ করে ফ্ল্যাট বাড়িতে বাড়িতে। বোন পড়ে।

আলমের পকেটমার হওয়ার সব সম্ভাবনাই ছিল। সম্ভাবনা ছিল ইঞ্জিনিয়ার হওয়ারও। ফলে আলমকে দোষ দেওয়া যায় না।

মা খেতে দেওয়ার আয়োজন করতে লাগল।

ছোট ঘরেই স্টোভ ও রান্নার ব্যবস্থা, বিশ্রামেরও বিছানা। একটা টিভিও আছে।

দেয়ালের দিকে মুখ ঘুরিয়ে বসেছিল আলম, বলল, ‘দিদিকে আমার খাবারটা দাও, আমি খাব না।’ আর কেঁদে উঠল।

পিঠে হাত দেয় সেঁজুতি, ‘আলম কেঁদো না, চুপ করো।’

‘আমার খিদে নেই।’

‘তোমার খাবার তুমি খাবে, আমি এখানে তোমাকে দিতে এসেছি, খেতে আসিনি।’

‘দিতে এসেছ শুধু? কেন দিতে এলে? আমি তো একাই চলে আসতে চেয়েছিলাম।’

‘তুমি ভুল বুঝছ, আমার খিদে নেই।’

‘আমাদের খাবার খাবে না? ও তাই বলো।’

‘তা কেন? আসলে তুমি ব্যাপারটা বুঝতে পারছ না।’

আলমের মা বলল, ‘আমাদের খাবার খেতে নারাজ বেটি?’

‘না না দিন, খাব। এক টুকরো রুটি।’

‘না, তোমাদের দুজনের হয়ে যাবে। রুটি-সবজি-ডাল আছে। তোমার নাম কী?’

‘সেঁজুতি।’

‘তোমরা হিন্দু?’

‘হ্যাঁ।’

‘তাই খেতে চাইছিলে না? আমরা সবাইকে আপন মনে করি।’

‘আমি তাই মনে করে খেতে চাইনি মা। আসলে খিদেটা মরে গেল।’

মা দীর্ঘশ্বাস ফেলল, ‘তুমি আলমের জান বাঁচিয়ে এনেছ, আর সেই তুমি না খেয়ে রাত কাটাবে, তা কী করে হয়? আমি মা, আমার বরদাশত হবে না। আলমকা দিল বহোত সাচ্চা, উনকো কসুর নিও না মা। একটুতেই রেগে যায়।’

‘আমিও তো।’ হেসে ফেলে সেঁজুতি। ‘এতগুলো রুটি, ডাল, সবজি কে খাবে?’

‘খাও খাও মা, রাত জ্যাদা হোয়েছে।’

আমিনার চোখের ভাষায় খাওয়ার আমন্ত্রণ।

আলমের চোখ চিকচিক করছে।

এই তো সামান্য খাবার। কিন্তু আমন্ত্রণের মধ্যে কী আন্তরিকতা।

সেঁজুতি খেতে আগ্রহ প্রকাশ করল। সত্যিই তো এই পরিবেশে খাবার খেতে অনীহা হওয়ারই কথা। কিন্তু সম্পর্কগুলো কেমন ঘনিয়ে এলো এই ঘণ্টাখানেক যাপনের মধ্যে। তার ভেতর কিসের যেন আলো। আর খিদেবোধও এলো। আগে একটু জল খেল। তারপর খাবারে হাত দিলো।

আলমও খেতে শুরু করেছে। আলম খুব নীরব হয়ে গেছে। চোখের চাহনিতে অস্বস্তি। কিন্তু অসুস্থ বোধ করছে কি-না? অমন গণপ্রহারের পর মস্তিষ্কে হ্যামারেজ হলো কি-না? বমি পাচ্ছে কি-না? জ্বর অথবা গায়ের ব্যথা ভেতরে ভেতরে যন্ত্রণাকাতর দুঃসহ করে তুলছে কি-না তাকে? এসব দুশ্চিন্তা সেঁজুতির মনকে সহসা কাতর করে তুলল। প্রার্থনা করল, আলম ভালো থাকুক। আর সে যে তাকে বাঁচিয়ে তোলার চেষ্টা করেছে, সেই কাজে সে সফলতা পাক। আর মা-বাবা-বোনকে দেখে তাদের চোখের ভাষা দেখে এ-প্রার্থনা আরো উন্মুখ হলো। সে কি দ্রুত পালিয়ে যেতে চায় এই বস্তির জীবন থেকে? সে স্বার্থপরতার এই স্বস্তি খুঁজছে কি? নিজেকে নিয়ে সে কি খুব ব্যস্ত? পালিয়ে গেলেই বাঁচে? হয়তো সে পালিয়ে যাওয়া চাইছে। তাতেই যেন বাঁচে। কেন সেই গণপ্রহারের জায়গায় সে পৌঁছল। তাহলে তো এতক্ষণ নিজের বিছানায় শুয়ে আরামে ঘুমিয়ে থাকতে পারত। একটা কিছু রান্না করে খেয়ে নিত। মোবাইলে প্রয়োজনীয় কথা সেরে নিত। তার আগে একটা বড়ো চা বানিয়ে তারিয়ে তারিয়ে খেত বিছানায় বসে।

অথবা রবি ব্যানার্জির ফ্ল্যাটে বেশ কিছু সময় কাটাত সে। প্রহর নীরজাদের সঙ্গে কখনো নয়। অন্তত আজকের রাতে। আজকের রাতটা তার জীবনে পূর্বনির্দিষ্ট ছিল? সে কি এড়াতে পারত না? এখানে এতো আলো আর রং কম কেন? কেন গুমট গরম আর প্রাণবায়ুর অভাব? শুধুই অপরিসর আর সংকীর্ণতা। আলো-বাতাস রং হ্রস্ব ঠেকছে শুধু।

আলমের বন্ধুরা এসেছিল। তারা এখন ফিরে গেছে। এই বস্তির ভেতরই তার বসবাস। ওদের প্রতিরোধের আর্তস্বরের ভাষা ও শব্দ এখনো ওই ঘরে বাজছে। সেই আর্তরব এখনো কানে বাজছে সেঁজুতির। ঘুমোবে না, কিছুতেই ঘুমোবে না আজ সে। কিছুতেই ঘুম আসবে না, কিছুতেই ঘুমোবে না সে। এখানে স্থাণু হয়ে বসে বিনিদ্র কাটাবে। এখানে আলো, রং আর বাতাসে দীনতা দেখে বেড়াবে।

খাওয়ার পর আলমকে ওষুধ খাওয়াতে সাহায্য করল সেঁজুতি।

তারপর আলমকে নিয়ে ওর মা মাচায় উঠে গেল।

বুঝল নিচের বিছানায় তার আর আমিনার বিশ্রাম নেওয়ার জায়গা হলো।

আমিনা বলল, ‘দিদি শুয়ে পড়ো। আমি আর ঘুমোব না।’

‘আমি শোব? কেন?’

‘কতক্ষণ তো আরাম করোনি।’

‘এ-ই বেশ, বসে থাকি।’

‘বসে থাকবে? একটু শুয়ে নিলে আরাম পেতে।’

‘তুই শো।’

‘আমি শোব না, তুমি শোও।’

‘বরং তোর সঙ্গে গল্প করি।’

‘গল্প করো না শুয়ে শুয়ে।’

‘না, যদি ঘুম এসে যায়!’

‘হায় আল্লা, নিদকে ডর।’

‘হায় আল্লা। বেশ তো শোনাল কথাটা। আর একবার বল।’

হেসে ফেলে আমিনা, ‘হায় আল্লা!’

‘বেশ। তা তুই বড়ো হয়ে কী হতে চাস?’

‘নার্স।’

‘নার্স? ডাক্তার নয় কেন?’

‘আমি সেবা করব।’

‘আর কী স্বপ্ন দেখিস?’

‘খোয়াব? পাকা ঘরে থাকার। ভদ্রলোকের পাড়ায়। তুমি যেমন থাকো।’

‘আমি? তোকে কে বলল?’

‘আমি দেখে বলতে পারি। তুমি কোথায় থাকো?’

‘সন্তোষপুরে। তুই এইটে পড়িস তো?’

‘হ্যাঁ। বাংলা মিডিয়ামে।’

‘বাংলা মিডিয়াম?’

‘হ্যাঁ। দাদা পড়েছিল উর্দু মিডিয়ামে। আমি বাঙালি হয়ে গেছি। আমার বাঙালি হতে খুব ইচ্ছা। দেখবে আমি একদিন বাঙালি হয়ে যাব।’

আমিনার কথা শুনে হেসে ওঠে সেঁজুতি। ‘তুই কি হতে চাস না?’

‘ঠিকা ঝি হতে চাই না। ওটা বাজে কাজ।’

‘হ্যাঁ ঠিকই তো, তুই করবি কেন?’

‘মাঝে মাঝে করে থাকি। মায়ের বিরাম হলে।’

‘সে কী?’

‘না করে উপায় থাকে না।’

‘স্কুল?’

‘সেদিন, সেদিন বন্ধ রাখি।’

‘কেন, তুই ওসব করবি কেন?’

‘আমি বিয়েও করব না।’

‘সে কী? কেন?’

‘ওটা গন্দা কাম মনে হয়। সোহরের সঙ্গে বিবির ঝামেলাই তো দেখছি।’

‘ভালো বলেছিস। কিন্তু অতটা অমন নয়।’

‘তাহলে বলছ ভালো।’

‘কিছু কিছু ভালো স্বামী-স্ত্রী তো থাকে। তুই গান জানিস?’

‘না। আবৃত্তি জানি। বলব রবীন্দ্রনাথের ‘প্রশ্ন’ কবিতাটা?’

‘না থাক। এত রাতে একা একা ‘প্রশ্ন’ কবিতা আবৃত্তি করে কোনো লাভ নেই।’

‘তুমি কি ভাইয়াকে আগে চিনতে?’

‘না। তোর কেন মনে হলো?’

‘কীভাবে যেন মনে হলো।’

‘কীভাবে মনে হলো?’

‘ভাইজানের অাঁখ দেখে।’

‘আমাকে দেখে তোর কী মনে হয়?’

‘তোমার খুব -’ চুপ করে যায় আমিনা।

‘বল, থামলি কেন?’

‘বলব?’

‘বল না।’

‘তুমি খুব জিদ্দি আছো, কিন্তু তোমার মন খুব ভালো। তুমি ভেতরে লুকিয়ে থাকো।’

‘এতো তোর বুদ্ধি কবে হলো?’

দুজনেই চুপ করে যায়। সেঁজুতির স্বতই হাই ওঠে। একটা সিগারেট খেতে ইচ্ছে করল। ‘এই আমিনা, বাইরে নিয়ে যাবি?’

‘কেন, বাথরুম যাবে?’

‘না, অন্য দরকার আছে।’

‘কী দরকার?’

‘আমি সিগারেট খাই।’

‘আগে বলবে তো।’

‘তোর খারাপ লাগল শুনতে?’

‘না, এখানে তো অনেক মেয়ে বিড়ি খায়।’

‘বেশ।’

‘বাইরে খাবে চলো, এখানে কোনো ভয় নেই এত রাতেও।’

ঘরের দরজা খুলল নিঃসাড়ে আমিনা। মাচার অন্য সবাই বোধহয় ঘুমিয়ে গেছে। আলম ও আলমের বাবা-মা। সে আর আমিনা দরজা খুলে অচলায়তন রাস্তায় নেমে এলো। বাইরে লোকজন নেই। ছায়াময়তা। দূরে জ্বলা লাইটপোস্টের আলো কিছু গড়িয়ে এসেছে। বসবাসের গন্ধ চারপাশে। দূরে কেউ কেউ আছে। কিন্তু তাদের বেরোনোও স্বাভাবিক মনে করে তারা ব্যাঘাত করতে আসছে না। আমিনা বলল, আর কোনোদিন যদি তার সঙ্গে দেখা হয়, তাহলে এই বস্তির নানা বিচিত্র কাহিনি বলবে সেঁজুতিকে। সেসব শোনার উন্মুখতায় আবার এখানে আসার বাসনা তৈরি হলো তার। আসবে, নিশ্চিত হয়তো আসবে সে। এমনই রাত বইবে আমিনাকে সঙ্গে নিয়ে তার কাটবে। এমনই আলো-ছায়া রং ও বাতাসের মধ্যে তার কাটবে। আলমকে তখনো বাঁচিয়ে রাখা যাবে কি? নাকি গণপ্রহারে মারাই যাবে ছেলেটি? জানে না, কিছুই জানে না সেঁজুতি। নাকি আলম পকেটমারি ছেড়ে দিয়ে স্বাভাবিক জীবনে বেঁচে উঠবে? সে না বেঁচে থাকলে আমিনার কাছে এই বস্তির কাহিনি শুনতে আসা অবান্তর হয়ে যাবে। প্রহররা জানে না, সে এখন কোথায় আছে, কীভাবে আছে? আত্মকাহিনির মতো হয়তো এই ঘটনাগুলো অপ্রকাশিত রয়ে যাবে। আত্মকাহিনির কথাটা যেন কেমন শোনাল নিজের কাছে সেঁজুতির। সেকি সত্যিই জড়িয়ে যাচ্ছে, জড়িয়ে যাবে এই বস্তির জীবনের সঙ্গে? না, পালিয়ে যাবে সে?

সঙ্গে সঙ্গে আমিনার হাত ধরে ফিরে এলো সেঁজুতি বস্তির ঘরে। রাস্তা শূন্য ফাঁকা পড়ে থাকল। ঘরে এসে বলল, ‘আলোটা নিভিয়ে দে আমিনা, আমার ঘুম পেয়েছে।’

আলোটা তৎক্ষণাৎ নিভিয়ে দেয় আমিনা।

সেঁজুতি শুয়ে পড়ে বিছানায়। কিন্তু অন্ধকারে কেমন ভয় পেল। হাতড়াতে লাগল আমিনাকে। ‘আমিনা, আমার পাশে শুবি আয়।’

‘আমি শুলে তোমার অসুবিধে হবে।’

‘না, আমার ভয় করছে।’

সঙ্গে সঙ্গে আমিনা পাশে এসে শুলো। একটা টেবিলপাখা তার দিকে দিয়েছে আমিনা। প্রচন্ড গরমে ঘেমে-নেয়ে যাচ্ছে। কিন্তু ঘুমের জন্য কাতর। ঘুমিয়ে পড়তে চাইছে। ঘুম। ঘুম। ঘুম। ঘুমিয়ে পড়ছে সেঁজুতি।

আম্মিজি ঘুমোয়নি। ঘুমোয়নি আলম। দুজনেই নিঃসাড়ে শুয়ে পড়ে আছে। আলম নিচের দুজনের গতিবিধি মাচার ওপর শুয়ে সব টের পাচ্ছিল। আর বুঝতে পারছিল, মা তাকে ঘুমিয়ে যেতে দেওয়ার জন্য নিঃসাড়ে ঘুমিয়ে পড়ার ভান করে পড়ে আছে, তারই গায়ের পাশটিতে। মায়ের অন্য পাশটিতে বাবা ঘুমিয়ে গেছে। নিচের ওরা বাইরে গেল। ফিরে এলো। তারপর শুয়ে পড়ল। এখন নিশ্চিত হলো সেঁজুতি ঘুমিয়ে পড়েছে। এই ঘরে, এই ঘরের বিছানায় দিদি কীভাবে শোবে? কীভাবে ঘুমোবে? অথচ ঘুমোল? এ এক অলৌকিক ঘটনা।

মায়ের গায়ের গন্ধের ঘ্রাণ অন্য এক মায়ালোক তৈরি করে। সেই ঘ্রাণের ভেতর শুয়ে আছে সে। সেই সংশ্লেষে আচ্ছন্ন হয়ে উঠতে থাকে মাথার ভেতরটা। শীতল ঘন দুধের সরের মতো মোহময় এক আচ্ছন্নতা তাকে ঘিরে ধরছে। পাশে মা শুয়ে নেই, যেন দিদি শুয়ে আছে। তার সেবা-শুশ্রূষা করছে। তার যেন কঠিন অসুখ, তাকে সারিয়ে তোলার চেষ্টা করছে। দিদি একজন নার্স। পরনে সাদা শাড়ি অাঁটো করে পরা। চোখে চমশা। তাকে শুইয়ে রেখে জল খাইয়ে দিচ্ছে।

‘আমাকে একটু বারান্দায় নিয়ে যাবে?’

‘কেন?’

‘ওখানে আকাশ আছে।’

‘তুমি একা যেতে পারো না?’

‘না, আমার সারা শরীরে ব্যথা!’

‘কেন ব্যথা?’

‘অনেকে ফেলে মারল রাস্তায়।’

‘কেন মারল?’

‘ওরা মারবার জন্য মারল।’

‘তুমি কোনো অন্যায় করোনি?’

‘না, ওদের কাছে কোনো অন্যায় করিনি।’

‘তাহলে কার কাছে অন্যায় করেছ?’

‘তোমার কাছে। তোমার চশমাটা চুরি করতে চেয়েছিলাম, আমার মা চোখে কম দেখে। মাকে দিতে চেয়েছিলাম চশমাটা।’

‘বারান্দায় গিয়ে কী দেখবে তুমি?’

‘একটা চড়ুই এসেছিল, থাকলে দেখব। দেখব আকাশও।’

‘একটু পরে নিয়ে যাব, তোমার খুব অসুখ।’

‘আমার অসুখ কেন?’

‘কথা বলো না, চুপ করে থাকো।’

‘কেন?’

‘তোমার সব কথা জানি।’

‘আমি তোমাকেই সব বলে থাকি।’

‘সে কথা তুমি জানো?’

‘জানি।’

১ thought on “একটি মেয়ে