একটি সামান্য খুনের খুঁটিনাটি বা পূর্বাপর

লেখক: সুদর্শন সেনশর্মা

লেন্টু সারখেল ঠিক এইখানেই চিত হয়ে পড়ে ছিল। সেদিকে তাকিয়ে পুলিশটি একমুহূর্ত দাঁড়িয়ে রইল, কী যেন ভাবল, তারপর ব্রডস্ট্রিট দিয়েই ফাঁড়ির দিকের বড় রাস্তায়… আরে মহাদেব যে এ-রাস্তা পেরিয়ে গেলেন।

মহাদেব হেঁটে যাচ্ছেন। তার পেছন-পেছন সেই পুলিশ। মহাদেবের সাজটি জববর। জটাটি অনবদ্য। এক হাতে কম-লু, অন্য হাতে ত্রিশূল। বাঘছালের তলায় একটি হাফপ্যান্ট আর সে-প্যান্টের পকেটে আছে…

রোলের দোকান, খোলাপুরি সেন্টার পানের দোকান, তারপর পেট্রলপাম্পের সীমানার শুরু। পেট্রলপাম্পের প্রায় কাছাকাছি এসে পার্কসার্কাসমুখো বড় রাস্তার বাঁদিকের লেনের সব গাড়ি লালবাতির নিষেধে দাঁড়িয়ে পড়েছিল। ব্রডস্ট্রিট দিয়ে গাড়ি এসে এখন হাজরা রোডে ঢুকছে বা গড়িয়াহাটের দিকে বাঁক নিচ্ছে। বালীগঞ্জ সার্কুলার রোড দিয়েও তাই দুদিকে গাড়ি যাচ্ছে।

দেখা গেল মহাদেব সুচিত্রা সেন স্কোয়ারের পেছনে একটা ভাঙা রেলিংয়ের ফাঁক দিয়ে কসরত করে বেরিয়ে পেট্রলপাম্পের দিকেই আসছেন। থেমে-থাকা গাড়ির খোলা জানালায় হাত বাড়িয়ে বৃহন্নলারা পয়সা চাইছে এখন। মহাদেব ত্রিশূল ঠুকে গাড়ির ভিড়ের মাঝখানে এক বৃহন্নলার সামনে দাঁড়িয়ে হাত পাতল। দীর্ঘাঙ্গী বৃহন্নলাটির সামনে সামান্য ঝুঁকে মহাদেব বোধহয় কিছু বললেনও। রাস্তার এপার থেকে তার মাথা নাড়ানো বোঝা যায়। পুলিশটিকেও দেখা গেল এদিকেই আসছেন। মহাদেব থামা গাড়িগুলোর ফাঁকফোকর দিয়ে পেট্রলপাম্পের দিকে চলে যেতেই লালবাতি নিমেষে সবুজ হয়ে গেল এবং সার দিয়ে দাঁড়িয়েপড়া গাড়িগুলো পার্কসার্কাসের দিকে ছুটল। পুলিশটি এখন রেলিংয়ের ধারে দাঁড়ালেন এবং বেশ বোঝা যাচ্ছে তিনি মহাদেবকে লক্ষ করছেন। মহাদেব এবার ওপার থেকে পুলিশটির দিকে তাকিয়ে ইশারায় কিছু জানতে চাইলেন! মহাদেব জটাসুদ্ধ মাথাটা দোলালেন। পুলিশটিও মুহূর্তে অঙ্গুলি নির্দেশে কিছু একটা বুঝিয়ে টুপি খুলে পেছন ফিরলেন। আড়ে দেখলেন, মহাদেব এবার রোল সেন্টারের ঠিক দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ত্রিশ-পঁয়ত্রিশ বছরের একজনের সামনে হাত পাতল। সে ক্যাশে বসা লোকটির সঙ্গে কথা বলছিল তখন। পুলিশবাবু এবার এদিকে ফিরে মাথাটা একদিকে হেলিয়ে একটু হাসলেন কি? ঠিক আছে। মহাদেবের সঙ্গে পুলিশের কী সম্পর্ক? মহাদেব কৈলাস থেকে মর্ত্যে নেমেছেন। ভিআইপি তো বটেই, কৈলাসের বাঘছালে অবশ্য ইলাস্টিক লাগানো। নিচে একটি হাফপ্যান্ট। সেই প্যান্টের পকেটে আছে একটি বাঁশি এবং ছোট্ট একটি খাপঅলা ছুরি… আত্মরক্ষার জন্য। নারদা তাঁকে সাবধান করেছেন? খালি গা। মাথায় নতুন ডাই করা জটা। মর্ত্যে আসবেন বলে একটু ফেসিয়ালও করেছেন… মহাদেবের তো এসবে খেয়াল ছিল না। হাতে কম-লু এবং ত্রিশূল। আজকে অনেকটা হাঁটতে হবে বলে ফাল্গুনীদা থুরি এসকর্ট, মানে পুলিশ দাদা একটু খাতির করে কম-লু ভর্তি করে স্প্রাইট দিয়েছেন। মাঝে-মাঝে আঁজলা করে মহাদেব মর্ত্যে স্প্রাইট খাচ্ছেন।

মহাদেব হাত পাতলে মধ্য তিরিশের রোগা লোকটি তীক্ষন চোখে তাকিয়ে হাসিমুখেই প্রথমে বলল, কৈলাস তো নয় বাবা, চেহারা মালুম হচ্ছে তুমি হুগলির লোক। কোথা থেকে আসা হচ্ছে ভায়া সিঙ্গুর, না রামপুর? ছিনাথ কি তোমার পূর্বপুরুষ?

যথার্থ গাম্ভীর্য রক্ষা করে মহাদেব বললেন, উহু কৈলাস থেকেই আসছি। আপনাকেই বাবা দরকার। আপনিই পুরনো বালীগঞ্জ দিশারী সংঘের সম্পাদক তো…?

চোখ ছোট করে লোকটি বলল – ও বাববা। মহাদেব গোয়েন্দাগিরিও হচ্ছে নাকি আজকাল? মহাদেব মাথা নাড়িয়ে খুব চিন্তিত গলায় যেন বললেন, তা আর কী করা! হ্যাঁ, এখন গোয়েন্দাগিরিও করতে হচ্ছে। স্ত্রীর ভালো তো সব সুস্থ স্বামীই চায়। কৈলাসের ভোলানাথও চায়।

কদিন বাদেই তো পার্বতী মর্ত্যে আসবেন, আমাকে খোঁজ নিতে হবে না? তুমি বাবা জীবন সম্পাদক তো – বল তো ভায়া তোমার পুজোর বাজেট কত? টাকাটা কোথা থেকে আসবে?

– মানে? এই ব্যাটা বহুরূপী, তোর ধান্ধাটি কী বল তো! বাঘছাল খুলে নেব কিন্তু!

– এই বাঘছালটা বাবা আমার বুলেটপ্রম্নফ, হ্যাঁচকা টান প্রম্নফ

– খুব সুবিধে হবে না। আমার সঙ্গে অভব্যতা করলে জেনে রেখো পার্বতীকে আটকে দেব। আর তুমি না হেল্প করলে, মানে সত্যি না বললে, তোমাদের সভাপতি শ্রীমান মুকুন্দ মুৎসুদ্দি…

– এই ব্যাটা, তুই কাদের লোক ঠিক করে বল! ইয়ার্কি হচ্ছে? তুই অন্য পার্টি করিস! আমাদের মহামান্য কাউন্সিলরকে, সভাপতিকে এরকম অদ্ভুতুড়ে নামে কেন ডাকছিস… উনি শ্রীযুক্ত মুকুন্দ মুৎসুদ্দি… ভালো করছিস না কিন্তু এসব…

আমি ভোলানাথ। নারদা ঢেঁকি চেপে গোপনে এধারে এসে ঘুরে গিয়ে, ফিরে অনেক কটু-কুবাক্য বলেছে – ইষ্টিঙ্গ করেছে… এখন তো  দেখছি…।

কী দেখলে চাঁদ? লোকটি মহাদেবের চিবুক ধরে ওপরে ঠেলার চেষ্টা করে। মহাদেব সরে গিয়ে বাক্যটা সম্পূর্ণ করে – তার কথা হয়তো সত্যি, পুরো অবিশ্বাস করা ঠিক হয়নি। তোমাদের পুজোর বাজেট কত? মহাদেব যথাসম্ভব তীক্ষন গলায় বললেন।

– এবার দুকোটির কাছাকাছি। সুবর্ণজয়মত্মী বর্ষ তো! হয়েছে তোর এবার?

– চিট্ ফান্ডের টাকাগুলো এখনো শেষ হয়নি? মর্ত্যে তো দেখছি নানান ঝকমারি। পুরাকালে পিতামহ, ব্রহ্মাও একবার দলবল নিয়ে মর্ত্যে এসে দারুণ অভিজ্ঞতা নিয়ে ফিরে ছিল… তখনো ফেরেববাজি ছিল… বইটা আমি পড়ে এসেছি দেবগণের মর্ত্যে…

ভাবছি শেষে পুজো নিতে এসে, খেতে এসে দুর্গার, আমার, কার্তিক, গণেশ, লক্ষ্মী, সরস্বতীর যদি কোনো বিপদ হয়? সিবিআই যদি তলব করে? উহু আমি পার্বতীকে তো আসতে দেব না তোমাদের পুজো কমিটির গত দুবছরের ট্যাক্স রিটার্ন আমাকে না দেখালে!

ওরে ফেরেববাজ দাঁড়া দেখাচ্ছি। একটা কালো টুপিপরা ছুঁচলো গুঁতো গাট্টা-গোট্টা ছেলেকে লোকটা ইশারায় ডেকে নিল… সে ব্যাটা পানের দোকান থেকে সিগারেট কিনে ধরিয়ে খোলাপুরি সেন্টারের সামনে একটা মেয়ের সঙ্গে দেয়ালা করছিল… সে এদিকে ফিরেই বলল, কী হয়েছে দাদা!

দ্যাখ তো, এ-বহুরূপীটা বড্ড ট্যানডাই-ম্যানডাই করছে… ছেলেটা মহাদেবের দিকে তেড়ে এল, মাথার টুপিটা খুলে মহাদেবের জটার ওপরে দুবার হাওয়া দিলো যেন! ছেলেটার চোখদুটো বেশ ফোলা। মাথায় টাক আর আড়াপাড়ি কোপানোর পুরনো একটা ক্ষতের দাগ। মহাদেবের নাক টিপে দিয়ে সে বলল… নতুন আমদানি। এই শালা তোকে কে পাঠিয়েছে বে!

মহাদেব ঠান্ডা গলায় বললেন – তোমাদের ক্লাবের সভাপতির ফোন নাম্বারটা দাও। দেরি করো না বাবা…

এই নে বলে মহাদেবের সাদা রং করা গালে ঠাটিয়ে একটা চড় মারল সে – মহাদেব পড়ে যেতে-যেতেও বাঘছালের ইলাস্টিকের ভেতর হাত গলিয়ে হাফপ্যান্টের পকেট থেকে অসম্ভব দ্রম্নততায় বাঁশিটা বের করে ফুঁ দিল। উলটোদিক থেকে এবার পুলিশটি মানে ফাল্গুনী মজুমদার এসআই ছুটে এসে টুপিঅলাকে জাপটে ধরে নিল… পেট্রল পাম্পে আড়াল নেওয়া জিপ থেকেও সাদা পোশাকে কজন… কী গো ফোঁপরা ভেলু… চল সকালবেলা একটু খেলু বা কেলু হয়ে যাক। – ফাল্গুনী মজুমদার বললেন। মহাদেব গালে হাত বুলোতে-বুলোতে বলল, খেলু তো হচ্ছিলই…

ফোঁপরা দাঁত ঘষে মহাদেবের দিকে তাকিয়ে বলল,

– শালা টিকটিকি।

– ফোঁপরা ভেলুর জামার কলার ধরে টেনে সোজা করে দাঁড় করিয়ে ফাল্গুনী মজুমদার বলল – খুব গায়ের জোর তাই তো! মহাদেবের গায়ে হাত তুললে!

মহাদেবের ছদ্মবেশ নেওয়া নিতাই বা বাবা মুস্তাফাপাড়া থানার সোর্স ছিনতাই ঘোষ হাসিতে মুখ ভরিয়ে বলল, আমার এমন কিছুই লাগেনি ফাল্গুনী দাদা… দ্বিতীয় সুযোগেই ওকে ছাতাপেটা করব।

– হ্যাঁ রে নিতাই, ছাতার ওপরে আর ওঠা যাচ্ছে না তাই তো! রেড কার্ড দেখালে টিমের অন্য খেলোয়াড়রা যেমন দাঁড়িয়ে পড়ে, শাসিত্ম কমানোর জন্য রেফারিকে অনুরোধ করে, চাপ সৃষ্টি করে, দিশারী সংঘের সম্পাদকও ফাল্গুনীকে সেরকম অনুরোধ করল ফোঁপরা ভেলুর জন্য। ফাল্গুনী মজুমদারও অনড়, সে বলল… আপনাকেও তুলে নিয়ে যাব কিন্তু, পুজোর তখন দফারফা হয়ে যাবে।

ভালোয় ভালোয় আপনাদের সভাপতির ফোন নাম্বারটা ভোলানাথকে দিয়ে দিন। এমন কিছু করবেন না যাতে পুজো বন্ধ করে দিতে হয়। ভোলানাথেরও ভাবনার বিষয় তো অনেক। ফোন নাম্বারটা, মনে রাখবেন ঠিক না হলে, ফেক হলে ভোলানাথ কিন্তু আবার আসবেন। আর আমাকেও তখন অন্য কিছু ভাবতে হবে।

সচিব বলল, আমি এখুনি লিখে দিচ্ছি। স্যার বলছিলাম কি ফোঁপরা আমাদের কাজের ছেলে… একটু দেখবেন…

– সে তো দেখাই যাচ্ছে…

কী ভোলানাথ! ফাল্গুনী হাসছেন, আপনাকে তো কৈলাসে ফিরে বোর্ড মিটিং ডাকতে হবে… ব্রহ্মা দাদুর ওপিনিয়ন, এন ও সি লাগবে তাই তো!

দেখুন পার্বতীকে ছাড়বেন কিনা!

ফোঁপরাকে ভ্যানে তুলে নিতাইয়ের দিকে ফিরে চোখ টিপলেন এবার। কিরে গাল জ্বলছে তো! চড়টা ভালোই খেয়েছিস নিতাই। বাট আই মাস্ট সে ওয়েলডান। তুই যে আসেত্ম আসেত্ম অপরিহার্য হয়ে উঠছিস নিতাই। শুধু তুই ছাতা চুরিটা ছেড়ে দে…

নিতাই হাসতে-হাসতে বলল, এত বড়-বড় চুরি দেখছ ফাল্গুনীদা… ছাতা চুরিটা তো কোনো চুরিই না… ফুল চুরির মতন…

 

দুই

রাত সাড়ে ১০টা বাজে। মহাবিষ্ণু জিজ্ঞেস করলেন, এই তোরা কে-কে আছিস? তৈজস সিং এসে দাঁড়াল, জি স্যার।

তোর ম্যাডাম কই?

উনি তো দেড় ঘণ্টা আগে বেরিয়েছেন… আপনারা ফিরে আসার পরপরই। – তৈজস বলল।

তুমি যাওনি কেন? মহাবিষ্ণুর গলায় স্পষ্ট ক্ষোভ। দুশ্চিমত্মা। গাড়ি নিয়ে গেছে… ?

– হ্যাঁ স্যার, আমি কত বললাম ম্যাডাম আমি যাই… ওদিকের রাস্তা ভালো নয়। একটু আগে অত সমস্তকা- হলো… লেন্টু দাদাবাবুর…। আমি বললাম তো স্যার, আপনি গাড়ি চালাবেন না ম্যাডাম, আমি যাচ্ছি…

ম্যাডাম তো স্যার আমাকে বকে দিলেন। তোমার বাবুকে পাহারা দাও, যেন আর না বেরোয়, শরীরটা খারাপ ওর এত ধকল গেল… তোমার সাহেবকে কিছু বলতে হবে না… আমি যাব আর আসব, কই এখনো এলেন না তো…

মহালক্ষ্মী বিষ্ণু আইন কলেজে অধ্যাপনা করেন। কিছুদিন থেকে একটা সমস্যার কথা মহাবিষ্ণুকে বলেছেন। এখনো তার কোনো সুরাহা হয়নি। কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষাও করতে হবে হয়তো…

আজকাল ক্লাসে মাঝে-মাঝেই পড়ানো থামিয়ে তাকে নোটস দেখতে হচ্ছে… একটা বিড়ম্বনা তো বটেই… মাঝে-মাঝেই, এটা অবশ্য একদম হালের, ক্লাসে বক্তৃতা থামিয়ে দিতে হচ্ছে হঠাৎ-হঠাৎ। কেননা সেই মুহূর্তের জন্য ব্যবহারের উপযুক্ত শব্দটি, যথার্থ শব্দটি তিনি তখন হাতড়ে বেড়াচ্ছেন… খুঁজে পাচ্ছেন না…

ছোট-ছোট বিভাগে সমষ্টি আলোচনায় বা বিতর্কে একটা প্রসঙ্গ নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে খেই হারিয়ে যাচ্ছে নাকি তার, হয়তো প্রসঙ্গান্তরে এগিয়ে আগের জায়গায় পুরনো বিষয়ে কনটেক্সটে ফিরতে পারছেন না এবং কখনো-কখনো কী নিয়ে বলা শুরু করেছিলেন সেটাই ভুলে যাচ্ছেন… ছাত্রছাত্রীদের জিজ্ঞেস করতে হচ্ছে কী যেন বলছিলাম। এখনো ক্লাসে হাসির ঢেউ ওঠেনি বটে, কিন্তু কতদিন… মহালক্ষ্মীর ভয়, এরপর তো ছেলেমেয়েরা ব্রেক ফেল বলবে…। এসব কারণেই সেই দিন ইনস্টিটিউট অব কালচারের সেমিনারে আতঙ্কে, মহালক্ষ্মী লিখিত বক্তব্য পাঠ করলেন। মহাবিষ্ণু এরপর পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টেশন করতে বলেছেন… মতি সব করে দেবে, দিতে পারে… কিন্তু মতিকে ম্যাডাম পছন্দ করেন না। মহাবিষ্ণু তৈজসকে অন্য গাড়িটা বের করতে বলে নিজে প্রস্ত্তত হচ্ছিলেন। মহালক্ষ্মীকে খুঁজতে বেরোবেন স্থির করে সম্ভাব্য সব জায়গায় ফোন করেছেন। ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ মহালক্ষ্মীর বন্ধু গয়চন্দ্র বিদ্যার্থীর কাছে জানলেন মহালক্ষ্মী লেন্টুর ব্যাপারে বিশদে কথা বলেছেন, নানা তথ্য দিয়েছেন, সোনালীকে নিয়ে যাবেন বলেছেন, কিন্তু আজ যাননি… এ-সময়েই ফোনটা বাজল… এক ট্রাফিক সার্জেন্টের গলা, বাইপাসের মহেন্দ্রনগর আইল্যান্ডের কাছে মহালক্ষ্মী পথ ভুলে চলে গেছেন…  ট্রাফিক সার্জেন্ট বললেন, উনি মহেন্দ্রনগর আইল্যান্ড সিগন্যাল পয়েন্টের কাছে আছেন…

ভুল করে অন্য লেনে চলে এসেছিলেন… একদম অসংলগ্ন কনফিউসড্।

– ফোন ডায়াল করতেও পারছিলেন না… বাড়ির ফোনের নাম্বারটাও মানে আপনার নাম্বারটা তৃতীয় চেষ্টায় ঠিক বলেছেন… প্রথমবার তিনটে নাম্বার ভুল ছিল, দ্বিতীয়বার দুটো… স্যার আমাদের সময় তো কম, খুব বিজি সিগন্যাল পয়েন্ট, স্যার ওনাকে আর একা ছাড়বেন না, স্যার বিপদ হয়ে যাবে… সার্জেন্টটির গলায় স্পষ্ট মমতা…

মহাবিষ্ণু বললেন, থ্যাংক ইউ ব্রাদার। আমি এখুনি যাচ্ছি। সিঁড়ি দিয়ে নামতে-নামতে ভাবছিলেন ও অতদূরে চলে গেল কী করে! গেটিং লস্ট। এ.ডি মানে অ্যালঝাইমার হচ্ছে না তো! ফ্যামিলি হিস্ট্রি তো আছে!! বড় শ্যালক পঁয়ষট্টি বছর বয়সেই দিক্ভ্রান্ত উদ্ভ্রান্ত হয়ে হারিয়ে গিয়েছিলেন অনেক বছর, অনেক বছর আগের এক অষ্টমীতে গড়িয়াহাট থেকে আর ফিরে আসেননি… হঠাৎ চমকে উঠলেন মহাবিষ্ণু, এই তো কদিন আগে সকালবেলা টেবিলে চা দিতে গিয়ে মহাবিষ্ণুকে দাদার নামে ডেকেছিল মহালক্ষ্মী…

তখনো চমকে গিয়েছিলেন মহাবিষ্ণু… হেসে বলেছিলেন ইয়ার্কি হচ্ছে… দাদার নামে ডাকা হচ্ছে… আমিও নিরুদ্দেশে যাই তবে?

গাড়িতে বসে অ্যাটর্নি মহাবিষ্ণু বিষ্ণু তৈজস সিংকে বললেন, সাবধানে চালিও। আফিং পাতে পড়েনি তো আজ। সব আদ্দিকালের নেশা করবে সব… ধুত্তরি…

– না স্যার, কভি নেহি স্যার।

আনমনে মহাবিষ্ণু বললেন, বে-এ-শ স্যার। বাইপাস মহেন্দ্রনগর আইল্যান্ড… তোর ম্যাডাম ওদিকে চলে গেল কী করে! সব পথঘাট ভুলে মেরে দিয়েছে!

না স্যার, ম্যাডাম ভালো গাড়ি চালান… গাড়ি জরুর ঠিক আছে…

– ধুর ব্যাটা গাড়ি গোলস্নায় যাক… তোর ম্যাডাম ঠিক আছে কিনা বল! তুই তো শেষ নামিয়েছিস, দেখেছিস… আমার ঘাট হয়েছে বাবা, চলো তোমার ম্যাডামের মত গাড়ি এই বিশ্বে কেউ চালাতে পারে না – আমিও না… তাই মহেন্দ্রনগরে তোমার ম্যাডামের গাড়ি আটকে রেখেছে – চলো দেখি…

তিন

দ্বিতীয় ইনিংসটি বেশ হেকটিক – ক্ষয়কর বা ক্ষয়প্রদ হয়ে উঠেছে! ডা. মৃদঙ্গ মৌলিক একটু হাসলেন। বড্ড দৌড় করাচ্ছে আজকাল সবাই। দিনের শেষে বেশ পাগল-পাগল অবস্থা হচ্ছে। বড্ড টায়ারিং। পরপর দুদিন বাড়ি ফিরেও সে চাপমুক্ত থাকতে পারেনি। ঘুম হয়নি। আজ সকালেও বেরোনোর সময় মেজাজটা খিচড়ে গেল। শহরতলির এক মুলুক থেকে রোজ তাকে ট্রেনে কলকাতার দক্ষিণে পৌঁছতে হয়। বাড়ির রাস্তার বাঁকেই পাড়ার ক্লাবের সচিব দয়ানন্দ ঝা পথ রোধ করে বললেন, আপনাকে তো আজকাল আর পাড়ার ক্লাবের ব্যাপারে পাওয়াই যাচ্ছে না। ভদ্রলোকরা বেশ কয়েক পুরুষ এ-তলস্নাটে এবং বিত্তবান। কিন্তু তিনি ‘অবসর’-এর আগে কী কাজ করতেন মৃদঙ্গ জানে না। পৈতৃক একটা ব্যবসা আছে – কলকাতায় শোভাবাজারের দিকে – মৃদঙ্গ একবার শুনেছিল। তিনি বললেন, জানেন তো এবার পুজোর বাজেট তেরো লাখ করা হয়েছে।

খুব বিস্ময়ে মৃদঙ্গ বলেছিল, তেরো লাখ? কোত্থেকে আসবে এত টাকা? চাঁদায় উঠবে, না বিজ্ঞাপনে!

– শুনুন না, আমরা বিধায়ককে সম্পাদক এবং সাংসদকে সভাপতি করেছি… টাকা হয়ে যাবে… হুহু বাবা, কিছু খেলা তো খেলতেই হবে।

মৃদঙ্গ বলল, আমার একটু তাড়া আছে, ট্রেনটা বেরিয়ে যাবে… তবু বলছি – ক্লাবটাকে একদম রাজনৈতিক দলের হাতে সঁপে দেওয়াটা ঠিক হচ্ছে কিনা একটু ভেবে দেখবেন…

– এটাই তো এখন দস্ত্তর, সবাই তাই করে তো… সাংসদ তিন লাখ টাকার বিজ্ঞাপনের ব্যবস্থা করে দেবেন… বল্টুদা বলেছেন।

– বল্টুদাটি কে? মৃদঙ্গ বোকার মতো জিজ্ঞাসা করে ফেলে।

– এই তো আমাদের সাংসদের এই বিধানসভার এজেন্ট। আপনি বাড়ি আর কলেজ, কলেজ আর বাড়ি করেন তো তাই জানেন না। বলুন না তিন লাখ টাকাটা আজকাল কোনো ব্যাপার হলো?

মৃদঙ্গ বললেন, তেরো লাখ?

আরে ওটাও হয়ে যাবে, হয়ে যাবে…

– আচ্ছা আপনি ট্রেনেই কেন যাতায়াত করেন…।

– হ্যাঁ তো, হ্যাঁ যা বলছিলাম হয়ে গেলেই ভালো। নয় তো গতবারের মত ভর্তুকি দিয়েও তো তবে লজ্জা সামলানো যাবে না। যাবে তো?

তবে কি বলেন ডা. মৌলিক বাজেট কমিয়ে দেবে ক্লাব? গতবার পাশের পাড়া আমাদের থেকে পরে শুরু করেও বাজেটের জন্য কেমন ফেটে বেরিয়ে গেল দেখলেন।

মৃদঙ্গ যাওয়ার তাড়ায় কথা বলে না আর, হাসে।

একটা কথা বলি, দয়ানন্দ ঝা জ্ঞান দেবার ভঙ্গিতেই বললেন, এ-সময়ে সবাই আকাশ ছুঁতে চায়, কী বলেন। আমাদেরও পুরনো
ধ্যান-ধারণা একটু পালটিয়ে ফেলা ভাল না? আমাদের সবারই কথা বলছি ডাক্তারবাবু। রিপ ভ্যান উইংকল হয়ে থাকার দিন শেষ।

মৃদঙ্গ বলল, বাহ্ ভাল বলেছেন। দয়ানন্দবাবু এ-জিনিসটাও মাথায় রাখবেন চ্যারিটি বিগিনস্ অ্যাট হোম…

আপনি কি…

মৃদঙ্গ মৌলিক কথা সম্পূর্ণ করতে না দিয়েই স্টেশনের পথে একটা রিকশা থামিয়ে উঠে পড়ে।

শেয়ালদা থেকে একটা ট্যাক্সিতে উঠেছিল মৃদঙ্গ তৃতীয় চেষ্টায়। প্রথম দুটো ট্যাক্সি দাঁড়ালই না। একটির সামনে, পেছনে, ডানে-বাঁয়ে যদিও লেখা ছিল নো রিফিউজাল। কলকাতার ট্যাক্সি ড্রাইভারদের নিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ উপন্যাস লেখার ইচ্ছে মৃদঙ্গের বহুদিনের… কিন্তু কলকাতায় ওলা, উবের এমন জাঁকিয়ে বসেছে যে, ট্যাক্সি ড্রাইভাররা নিজেদের একটু এখনই না শোধরালে ট্যাক্সির ভবিষ্যৎ খুব একটা ভাল নয়। যদিও সে-ট্যাক্সিতে উঠলেই নোট নেয়। সঙ্গে ডায়েরি থাকে। কম হয়নি যেমন পরামানন্দ শ্রীবাস্তব। ধর্মনারায়ণ গিরি। আচ্ছে লাল যাদব… মৃদঙ্গ অভ্যেসমতো ট্যাক্সি ড্রাইভারদের সঙ্গে আসেত্ম-আসেত্ম আলাপ জমিয়ে ফেলে। নানারকম খোঁজখবর নেয়। ঠিকঠাক খাওয়া-দাওয়া করে কিনা, এ-গরমে গাড়িতে জল রাখে কিনা! এ-ছেলেটির নাম বরুণ। ডানলপের দিকে থাকে এখন। দুই ছেলে – আক্ষেপ করে বলল, স্যার যার দেখার সেই যদি ঠিকঠাক শাসন না করে, আমি তো গাড়ি নিয়ে ঘুরে বেড়াই… ছেলেদুটো পড়লই না। একটা ক্লাস সিক্স… একটা ক্লাস সেভেন। তারপর খেলা শেষ। এখন তারা রঙের মিস্ত্রি!

মৃদঙ্গ একটু সাহস করে বলেছিল, আপনার পড়াশুনো?

আমার কথা ছেড়ে দিন। ছবছর বয়সে দাদার সঙ্গে বেলঘরিয়া চলে এসেছিলাম – দাদা পাটকলে কাজ নিয়েছিল… সব কাজ করতাম আর দাদার সঙ্গে ঘুরতাম।

– কেন বাবা-মা? ছবছর বয়স কি কাজ করার সময়? খেলার সময়… বালকবেলা আর শৈশব-কৈশোর! করুণ দীর্ঘশ্বাস ফেলে। মৃদঙ্গ এবার সোজা হয়ে বসে, বরুণ বলে, হাবড়া রূপকথা সিনেমা হলের কাছেই ছিল বাবার শঙ্খ বিড়ির কারখানা…

মৃদঙ্গ বলে, অশোকনগরে ছিল নবযুগ বিড়ি… আপনি অশোকনগর জানেন?

– হুঁ…

– আমি হাবড়া চিনি, রূপকথা চিনি, রাধা কেমিক্যাল চিনি, শহিদবাগ চিনি!

– কী করে… ?

– অশোকনগর হাসপাতালে ছিলাম…

– আপনি?… মৃদঙ্গ সুতো ছাড়ে, বরুণের জিজ্ঞাসা থামিয়ে বলে… আরে তোমার কথা বল…

– বলা নেই, কওয়া নেই বাবার অংশীদার বন্ধুর ছেলে হঠাৎ একদিন ক্ষিপ্ত হয়ে বাবার পেটে ছুরি বসিয়ে দিল, আমার তখন পাঁচ বছর…

– ওমা সে-কী… কেন!

– সে তো জানি না, তখন আমি ছোট তো… বাবার বন্ধু সেই পার্টনার থানাপুলিশ থাক। হাসপাতালের খরচ সব আমি দেব বলে সেই ছেলেটাকে কোথাও পাঠিয়ে দিল… আর বাবা কলকাতার হাসপাতালে বহুদিন থেকে বাড়ি ফিরল বটে… ফিরে দেখল বিড়ির কারখানা প্রায় লুট হয়ে গেছে… আরো অসুস্থ হয়ে গেল বাবা। রাগ করে নিজের অংশ অন্য আর একজনকে বেচে দিল। তারপর নতুন অংশীদারের সঙ্গে মারামারিতে… কারখানাটাই উঠে গেল…।

– বাবা আছেন… ?

– না না, বহু বছর গত হয়েছেন।

– ওদিকে এখন আর কেউ নেই? মা?

– মা আছেন দিদিকে নিয়ে। তার বিয়েটাও টেকেনি। বিয়ে হয়েছিল এক হারামজাদার সঙ্গে…

– মা-র সঙ্গে দেখা করতে যান?

– না, বহুদিন যাওয়া হয়নি। এ-কথা জিজ্ঞেস করলেন কেন?

– এমনই, আসলে মা-ও তো নিশ্চয়ই ছেলে ছেলে করেন, তারও তো দেখতে ইচ্ছে করে…

– ঠিকই বলেছেন। তা তো করে।

– তবে?

– আসলে গাড়ি তো আমার নয়। আমি চালাই। যখন ছুটি পাই, যেতে পারি তখন, হয়তো কাছে টাকা থাকে না – মায়ের জন্য অন্তত কিছু তো… আর যখন টাকা থাকে তখন ছুটি মেলে না –

আপনিও তো ওদিকটা ভালই চেনেন… নবযুগ বিড়ি বললেন।

মৃদঙ্গ হাসে। মস্নান হাসে। অশোকনগর কি শুধু নবযুগ বিড়ি দিয়ে চেনার! কত কি আছে অশোকনগরে! স্মৃতির শহর আমার। দিগন্ত বিসত্মৃত সবুজ মাঠ, বড় ঝিল… দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার যুদ্ধবিমান পোত… দৌড়পথ… মন উচাটন… হারামনি হারামনি করে সে দৌড় পথে মৃদঙ্গও কতদিন মনে মনে দৌড়ে আসে।

সেদিন অ্যাটর্নি মহাবিষ্ণু বিষ্ণু মহাশয়ের জন্মদিনের পার্টি ছিল। ঘরোয়া। একটু দেরি করে ফেলেছিল মৃদঙ্গ। পৌঁছে দেখল সেখানে বিষাদের ছায়াঘন পরিবেশ। অ্যাটর্নি মহাবিষ্ণু, অ্যাডভোকেট রায়বর্মণ, ব্যানার্জিরা অস্থির পদচারণা করছেন, ফোন করছেন। ম্যাডাম মহালক্ষ্মী বিষ্ণুর চোখে-মুখে বিলক্ষণ ঝড়ের পূর্বাভাস। কেননা, এ-অনুষ্ঠানের অন্যতম আয়োজক, ব্যবস্থাপক এবং উদ্দীপক লেন্টু সারখেলকে নাকি একটু আগে কারা ব্রডস্ট্রিট ও বন্ডেল রোডের কাটাকুটির কাছে পার্কের পাশে মৃত পড়ে থাকতে দেখেছে।

বিধ্বস্তসে-ও গিয়ে দাঁড়িয়েছিল। সেখানে পুলিশে-পুলিশে সয়লাব। গাড়ির ভিড়। ট্রাফিক জ্যাম। দুপারের তিনটে রাস্তা দিয়ে দুমুখো গাড়ি চলে, বড় রাস্তা দিয়েও তাই। যানবাহন ঘুরিয়ে দিলেও একটা বিচ্ছিরি অবস্থা, আজ তো এতক্ষণে বোধহয় সব ব্যবচ্ছেদ শুরু হয়ে শেষ হতে চলল। সন্ধের সময় মেডিক্যাল কলেজ যেতে হবে একবার। মৃদঙ্গ মনে-মনে বলল, এত চাপ নিতে পারছি না বন্ধু। এ-জীবনযাত্রা বড় ক্ষয়প্রদ। নিজেকে বাঁচাতে পারলে না বন্ধু। কতদিন একসঙ্গে আমরা কুমোরটুলিতে, মেডিক্যাল ক্যাম্পে…

আনমনা মৃদঙ্গ হঠাৎ সামনে তাকিয়ে বলল, বরুণ ভাই এবার সামনে ডানদিকে মিল্ক বুথটা ছাড়িয়ে আমায় নামিয়ে দিন। অশোকনগরে মা… ডানলপে থাকা… গ্যারেজ? এদিক দিয়েই তো যাতায়াত করি, দেখা হয়ে যাবে আবার।

বরুণ বলল, বাবু আমার ফোন নাম্বারটা রেখে দিন, প্রয়োজনে ফোন করলে যদি ফ্রি থাকি… নামটা ভুলবেন না বরুণ মিস্ত্রি… এস্ক অশোকনগর…

এস্ক নয়, এক্স… বরুণভাই। নিন টাকাটা ধরুন… আরে ঠিক আছে ফেরত দিতে হবে না…

– থ্যাংক ইউ স্যার।

পরে যেদিন দেখা হবে… সেদিন যেন শুনি মায়ের সঙ্গে দেখা করে এসেছেন…

রাইট স্যার, সিওর স্যার।

 

চার

চাইনিজ প্যাভিলিয়নের একপাশে আলোছায়ায় ফাল্গুনী মজুমদার দাঁড়িয়ে আছেন। বন্ডেল রোডে গাড়িগুলো বড় রাস্তা থেকে বাঁদিকে বাঁক নিচ্ছে। একটা ছেলে ছুটতে ছুটতে এদিকে এল, স্যার আপনি এখানে দাঁড়িয়ে!

ফাল্গুনী মজুমদার চিনলেন ছেলেটাকে। বন্ডেল রোডের ওদিকটায় বয়াল রোপ অ্যাসেমবিস্নর মানে রাজকীয় রজ্জু সমাবেশ দোকানঘরের সেই কর্মচারী। কুড়িও পেরোয়নি। ছেলেটি ইতস্তত করছিল দেখে ফাল্গুনী বললেন, তুমি কি কিছু বলবে?

– হ্যাঁ স্যার, একটা কথা বলতে এসেছিলাম। আপনাকে ধাবার ওদিক থেকে দেখতে পেয়ে ছুটে এলাম। কাল থেকে আমার চাকরি নট হয়ে গেছে। আপনারা স্যার তখন আরো ভেতরে ঢুকলেন না কেন? স্যার, এটা আমি দিতে এসেছি… আপনাকে…

– কী…

দেখুন যদি কাজে লাগে।

ফাল্গুনী দেখলেন ডায়ালভাঙা একটা ঘড়ি… একদিকের ব্যান্ড ছেঁড়া, ঘড়িটা কিন্তু চলছে… ঠিক সময় দেখাচ্ছে।

– কোথায় পেলে?

– অফিসের পেছন দিকে একটা ঘর আছে। দরজাটা দেখছি পরশু থেকে একটা আলমারি টেনে আড়াল করা। রাতে থাকতে হলে ওই ঘরে ঘুমোতাম। গজুদাদু পেছনের ঘরে আর যাস-টাস না, ওঘরে আর জায়গা নেই বলাতে আমার খটকা লাগে, সন্দেহ হয়। গজুদাদু চলে গেলে দোকান বন্ধ করার আগে তাই ওই ঘরে ঢুকেছিলাম। কেমন একটা ভ্যাপসা পচা গন্ধ। এ-ঘড়িটা পেলাম। অনেকগুলো থার্মোকলের থালা-গস্নাস… না শেষ হওয়া খাবার পেটটা গুলিয়ে উঠল, একবার ওই ঘরটায় যাবেন?

– চাবিটা দাও তবে!

– চাবি তো আজ দেয়নি… কাল থেকে দুদিন আসতে না করেছে। তারপর জানাবে আমার চাকরিটা সত্যিসত্যি নট হলো কি না?

– কোথায় থাকো তুমি?

– পাটুলি!

– লেন্টু সারখেলকে চেনো?

– কেমন দেখতে ছিল বলুন তো! রোগা-লম্বা ছোট একটু গোঁফ ছিল?

– হ্যাঁ।

– ওই মুৎসুদ্দির দলে ছিল?

– হ্যাঁ।

– হ্যাঁ স্যার চিনতাম। আমার বাবা-মা নেই স্যার। আমাকে এই দোকানে তিনিই ঢুকিয়েছিলেন। নিজের কাছে পয়সা থাকলে আমাকে খেতেও দিতেন। কিন্তু আমাকে বলতে বলা হয়েছে আমি চিনি না। কিন্তু আমি চিনি চিনি চিনি। কাল থেকে গজুদাদুকে চিনি না, চিনব না…

আচ্ছা এর আগে তোমাকে কোনোদিন দোকানে আসতে বারণ করেছিল?

– হ্যাঁ ভুলে গেছি… যেদিন লেন্টুবাবুকে রাস্তায় পড়ে থাকতে দেখা যায়… সেদিন আমায় ছুটি দিয়েছিল। আগের দিনও বিকেলের আগেই আমার ছুটি হয়ে গেছে।

– বে-এ-শ। তোমার মালিক, তোমার গজুদাদু গজেন্দ্র গুছাইতকেও আমরা গুছিয়েই দেব… সওব কেমন! এখন ওই দ্যাখ ওই যে পার্কের দিক থেকে হিজড়ে দিদি এদিকে আসছে, ওকে গিয়ে বল আমি এখানে দাঁড়িয়ে আছি… তুমি পার্কের কাছটায় মিষ্টির দোকানের উলটোদিকে দাঁড়িয়ে থাকো… আমরা তোমাকে বাড়ি দিয়াসবো… হ্যাঁ, সত্যি করে বল তো, পাটুলিতে লেন্টু কোথায় থাকত তুমি জানো?

চোখদুটো চকচক করে উঠল ছেলেটির, দুফোঁটা জলও গড়াল…একদিন ধুমজ্বর উঠল আমার দোকানে কাজ করতে করতেই – লেন্টুদা তুলে নিয়ে গেল পাটুলিতে – ওষুধ দিল… এখন অবশ্য সেই পাটুলিতেই থাকি। চালাঘর। বৃষ্টি হলে জল পড়ে। আর দাদার মেসের ঘরটা তালাবদ্ধ আছে।

দরকার হলে ওখানে নিয়ে যেতে পারবে?

খুব পারব। আমার মঙ্কু নামটাও যদ্দূর মনে পড়ে দাদারই দেওয়া, আমাগে আগে সবাই না থাক…

ঠিক আছে এখন সরে যাও, সাবধানে থেকো। ঘড়িটা দাও…মহাদেব দাদা মিষ্টির দোকানের আশপাশেই আছে… ওকে গিয়ে আমার কথা বল… আর মহাদেবের কাছাকাছি থাকবে…

 

এই বৃহন্নলাটির নাম মন্দাকিনী।

এখন মন্দাকিনীর পেছন পেছন মহাদেবরূপী নিতাই ওরফে ছিনতাই ঘোষ যিনি হালে ফাল্গুনী দা-দের থানার সোর্স। যাত্রাপালা গানেও একসময় ছিল। ছাতা চুরিটা ওর স্পেশালিটি…

ফাল্গুনী মজুমদার আড়ে দেখে নিলেন মঙ্কুটা মহাদেবের পেছনেই আছে কিনা। আছে।

মন্দাকিনী ফাল্গুনীর সামনে এসে দাঁড়িয়ে একগাল হেসে হেঁড়ে গলায় বলল, এই অফিসারবাবু এই পাতি বাঘছালটাকে আমার পেছনে ফেউ লাগিয়েছেন কেন?

– তুমি তো মন্দাকিনী… একটু পার্বতী সাজতে পারবে?

বৃহন্নলা দুলেদুলে হাসে, ওইটুকু মহাদেবের পার্বতী হবো মানাবে না তো!

– মানাবে, মানাবে। খুব মানাবে। ধরই না গাঁজা-ভাং খেয়ে মহাদেব নাটা হয়ে গেছে… তোমাদের ঠেক থেকে যে কাউন্সিলর উৎখাত করে দিতে চাইছিল নতুন বাড়ি তুলবে বলে। মনে আছে?

– খুব মনে আছে, বাবু মনে আছে, হাড়ে হাড়ে মনে আছে।

– তখন কে তোমাদের পাশে দাঁড়িয়েছিল?

– আপনি আর মুকুলবাবু।

– তবে!

– কী করতে হবে ঝটপট বলুন।

– পার্বতী হতে হবে। তোমাকে কাল সকালে বা আজই একটু পরে, মহাদেব নিতাই-ই তোমাকে সাজিয়ে দেবে।

মন্দাকিনী হাসল আবার। দুলে উঠল। মরণ আমার!! ঘোর কলি গো বাবু। হাতটান ছাতা চোর নিতাই এখন মহাদেব। হিজড়ে সাজবে পার্বতী, হিঃ হিঃ।

– না, এখুনি তোমাকে ফোন করতে হবে সেই লোকটাকে। এখন তুমি আমাদের সোনালি… সুন্দর গলায় গদগদ ঢঙে কথা বলবে লোকটার সঙ্গে…

– হেঃ হেঃ বাবু ছেনালি করতে হবে তো?

– নাও নাম্বারটা নাও।

– নাম্বার আমার আছে… হু এটাই পাক্কা নাম্বার, দুনাম্বারির।

– এখনো যোগাযোগ আছে?

– নির্লজ্জ লোক তো একটা। আমাদেরও নাচ দেখাতে ডাকে তো মাঝে মাঝে…

– কে বলো তো?

বন্ডেল রোডের ফাঁড়ির দিকের মুখটার আলোছায়ায় বৃহন্নলা আরো একবার কোমর দুলিয়ে বলল- আরে মুতু বাবু তো মুকুন্দ মুৎসুদ্দি – জানি বাবা জানি। তোমরা কাতলাটাকে একটু খেলিয়ে তুলবে বলে ভাঁজ দিচ্ছ তো বাবু। বাবু ওটাই তো সেদিন…

– বাজে কথা রেখে ফোনটা কর।

– কী বলবো গো বাবু বৃহন্নলা এবার জিজ্ঞেস করে।

– বলে দিলাম তো… ভাল লাগছে না… তুমি সোনালি ওকে টোপ দিচ্ছো… কবে ও একা থাকবে… ওয়ার্থলেস… ফাল্গুনী কপট রাগ দেখান।

বুঝিছি গো বাবু বুঝিছি… এইবার দ্যাখ ব্যাটাকে কেমন শুইয়ে দেই… আমি মন্দাকিনী মানে জানো বাবু… স্বর্গগঙ্গা… সেই গঙ্গায় হাঁটুজলে ডুবিয়ে মারছি দ্যাখ…

একটু ছদ্ম আড়াল নিয়ে বুকের ভেতর থেকে মন্দাকিনী ফোনটা বের করে নাম্বার টিপতে টিপতে ফিসফিস করে বলে ঢ্যামনা বাবুর বাসরঘরের নাম্বার। পেরাইভেট… এ নাম্বার পুলিশবাবুরও নেই…

– হ্যাঁ লো-ও-ও-ও-ও

– হ্যাঁ কে?

– কে-গো-ও-ও তুমি মুৎসুদ্দি বাবু তো আমাদের…

– হ্যালো কে?

– শোনো নাগো চটপট শোনো (যেন কানের কাছে ফিসফিস করছে মন্দাকিনী) মুখশুদ্ধি করবে নাকি?

– কে বলতে বলছি তো কে বলছ? রাধা, না শ্যামা? শরীরটা খারাপ।

– সে-শরীর তো তোমার বরাবরের খারাপ… আমি না হলে চলবে তো? তোমার বিকল শরীর আমি কল লাগিয়ে ঠিক করে দেব।

হাসিও পাচ্ছিল ফাল্গুনী মজুমদারের… পাছে হাসির শব্দ না ওদিকে ভেসে যায় নিজের মুখ নিজে চেপে একটু দূরে সরে গেল। মন্দাকিনীও তাকে ভ্রূভঙ্গিতে শাসন করল যেন।

– এই কে বলতে বলেছি তো বল না আমায়… শরীর-মন ভালও নেই… একটা কাজ করে ফেলেছি… সববাই ফেলে এখন সটকে যাচ্ছে… দলের স্বার্থেই তো করেছি…

– কী করেছো গো তুমি, খারাপ কিছু তুমি করতেই পার না… মেয়েদের ওই একটা ব্যাপারে আটকে দেওয়া ছাড়া… সে তো পুরুষেরই ধর্ম। আমি তোমায় ফেলে যাব নাগো, আমি তোমায় ফেলে… এখনো রাধা, শ্যামায় পড়ে আছো? পালিয়েছে, ওরা পালিয়েছে।

– পিস্নজ বলো না গো, কে তুমি!

– সোনালি গো, সোনালি।

ওদিকে এবার চাপা অভিমান এবং সতর্কতা, কোন সোনালি?

– ধুর। সোনালি আবার কটা! যতটুকু দরদ গলায় ঢালা সম্ভব ততটাই ঢেলে মন্দাকিনী বলল – যে-সোনালিকে আপনি চিনতেন স্যার সেই সোনালিই।

– লেন্টু সারখেলের…

মন্দাকিনী গলাটাকে আরো আর্দ্র করে যেন কান্নাভেজা গলায় বলে ‘ভুল হয়েছিল… ওসব তো চুকেবুকে গেছে এখন… তবে হ্যাঁ সুবিধাটা এই… লেন্টু তো আর নেই। পার হয়েছেন যমের দুয়ার, বলুন না স্যার, কে আছে আর… বইতে আমার হৃদয় ভার!

এই এই এ-গলাটা সত্যি সোনালির! বিশ্বাস হচ্ছে না।

কুহেলী না স্বপ্ন? চিমটি কেটে দেখব… এই দেখলাম সত্যি সোনালি!

আমার না এখনই লজ্জা করছে ধ্যাৎ – সেদিন ধাবার উলটোদিকের ‘গুণমান’-এ লেন্টুর সামনেই এমন ফ্যালফ্যাল করে তাকাচ্ছিলে… কী দেখছিলে গো?

ফাল্গুনী আশ্চর্য হয়ে ভাবে, নিতাই ব্যাটা তো ভালই ‘ব্রিফ’ করেছে মন্দাকিনীকে।

– কী দেখছিলাম… তোমাকে দেখে ভাবছিলাম কিছু মনে কোরো না…

– কী আবার ভাবছিলে… পারও বটে দেখতে-দেখতে ভাবোও…

– বানরের গলায় মুক্তোর মালা… চাল-চুলোহীন একটা অপগ–র হাতে পড়লা তুমি…

– যাক সে-বানর তো শেষ! এই জান সত্যি বলছি তোমাকে দেখে সেদিনই আমি কত কী ভেবেছিলাম – অ্যা ম্যানলি ম্যান…উইদাউট এনি….

– ছাই! গুণমানে তুমি বলেছি বলে কত কিছু শোনালে! ওগুলো কি তবে মিথ্যে?

– মিথ্যে গো সব মিথ্যে… ওসব বলতে হয় লেন্টু সঙ্গে ছিল না… সময় বৃথা নষ্ট হচ্ছে… কখন যাব বল যদি অসুবিধা থাকে তোমার থাক…

– না না, কোনো অসুবিধাই নাই, এখুনি চলে এস না তুমি, জায়গাটা তো তুমি চেনো না শুনে নাও…

ভয়েস রেকর্ডার অন করাই ছিল… এবার লাউড স্পিকার অন হল – ঠিকানাটা ফাল্গুনীও শুনে নিল…

মন্দাকিনী কখন যাবে বলবে… ইশারায় ফাল্গুনীর দিকে তাকাল…

মন্দাকিনী বলল, শোনো না গো, এখুনি হবে না… দুঘণ্টার মধ্যে আসছি সব দিক সামলে তো আসব…

ওপারের গলা এবার গদগদ – পিস্নজ এসো, খুব চাপে আছি… ফোনটা যদি দুদিন আগে করতে এত কা- তবে আর…

– ঘটত না?

– তাই তো – ওয়েট করছি… ও মাই গড! তুমি তো আবার পুলিশ… পুলিশ-টুলিশ নিয়ে এসো না কিন্তু, সুবিধা হবে না…

– ধুত্তরি চাকরিটা আমি ছেড়ে দিয়েছি…

– বে-এ-শ। আমার খুব ভয় করছে… তুমি তাড়াতাড়ি  এসো… লেন্টুর ভূত যদি শেষে…

– ওসব তুমি একদম ভেবো না গো। আমিই এখন তো তোমার দলে…

– বলছ, তোমার কথা আমি বিশ্বাস করছি… সোনালি মিথ্যে বলবে না… পিস্নজ।

 

পাঁচ

লেন্টু সারখেল হত্যা নিয়ে দৈনিক কাগজগুলো অনেক কথা লিখছে। সেদিন দুপুরে নাকি প্রায় বিকেলে কারা একটা মোটরসাইকেলের পেছনে লেন্টু সারখেলকে দেখেছিল – খুব স্পিডে বন্ডেল রোড দিয়ে আসছিল ফাঁড়ির দিকে – লেন্টুর মাথা নাকি একদিকে কাত হয়ে হেলে গেছিল… কে নাকি, চেনা কেউ নাকি মোটরসাইকেলের পেছনে দৌড়তে শুরু করেছিল। চালকের মুখ নাকি কালো কাপড়ে ঢাকা ছিল… মাথায় হেলমেটও থাকায়…এক প্রত্যক্ষদর্শী কাগজের অফিসকে নাকি বলেছে, লেন্টু সারখেলের মুখটা নাকি স্বাভাবিক ছিল না, ফোলা কেমন যেন… মৃতপ্রায়… তারপর তো দেহটা দেখা গেল পড়ে আছে।

মেডিক্যাল কলেজের ফরেনসিক বিভাগের সামনে থিকথিক করছে ভিড়। বিশেষজ্ঞ জয়চন্দ্র বিদ্যার্থী, অধ্যাপক বিদ্যার্থী কী বলেন! মৃতদেহ ফেরত পেতে-পেতে নাকি আরো  রাত  হবে।  জয়চন্দ্র   নাকি   বলবেন, এটা  হত্যাই। মৃত্যু   হয়েছে দেহ পড়ে থাকতে দেখতে পাওয়ার অন্তত কম করেও আঠারো ঘণ্টা আগে, খুন করা হয়েছে অন্যত্র। লেন্টু মারা যাওয়ার পরেও শরীরে অনেক রকম আঘাতের চিহ্ন তৈরি করা হয়েছে – ব্যাপারটাকে গুলিয়ে দেওয়ার জন্য। অকথ্য নির্যাতন করা হয়েছে লেন্টুকে মৃত্যুর আগে। শরীরের ভেতরের অনেক দরকারি যন্ত্র, গ্রন্থি বিচ্ছিরিভাবে জখম করা হয়েছে। যকৃত, পস্নীহা, অন্ত্র। মৃত্যু নিশ্চিত করার জন্য বুকের বাঁদিকে হৃৎপি- বরাবর চরম আক্রোশে ছুঁচলো লোহার কিছু ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। যা হৃৎপি–র বাঁদিকের ভেন্ট্রিকলে একটি এক সেন্টিমিটার ব্যাসের ক্ষত সৃষ্টি করে এবং প্রচ- রক্তক্ষরণের কারণ হয়ে সেটিই মৃত্যু ঘটিয়েছে – তারপর মৃতদেহটিকে সম্ভবত কোনো দ্রম্নতগতির যান থেকে ফেলে দেওয়া হতে পারে। নিহতের মৃতদেহটিকে শক্ত রজ্জু দিয়ে কোথাও সম্ভবত পিছমোড়া করা হয়েছিল – পিঠের নিচের দিকে রজ্জুর একটি গভীর দাগ পাওয়া গেছে – যেটি পেটের দিকে নেই… তবে কীভাবে এবং কোথায় বাঁধা হয়েছিল সেই রহস্য ভাবাচ্ছে…

অথচ অধ্যাপক জয়চন্দ্র বিদ্যার্থী সংবাদমাধ্যমকে কিছুই বললেন না। শুধু বললেন, এটা হত্যাই। তবে আমাকে আরো কিছু তদন্ত করতে হবে। পাকস্থলীর খাবারও পরীক্ষাগারে পাঠানো হয়েছে। ভিসেরাও। আমাকে যেখানে মৃতদেহ পাওয়া গেছে, সে-জায়গায় যেতে হবে… আরো দুটি জায়গায় যাব আমি… সেসব জায়গার কথা তদমেত্মর স্বার্থেই আপনাদের বলা যাবে না। গোয়েন্দা বিভাগ অতিদ্রম্নত খুব ভালো কাজ করেছে, করছে। হত্যায় ব্যবহৃত জিনিসপত্রও কিছু আমাদের হাতে এসেছে। বাকিটাও আসবে… কী, আপনি কিছু বলবেন… জয়চন্দ্র বিদ্যার্থী হেসে মাইকটি গোয়েন্দা বিভাগের উপপ্রধান ঘনশ্যাম জোয়ারদারের হাতে দিতে উনি বললেন, আর দুদিনের মধ্যে কিংবা আজকেই মূল হত্যাকারী, চক্রী পুলিশের জালে ধরা পড়বে বলেই আশা করছি… আমার লোকেরাও বসে নেই… তারা বেরিয়ে পড়েছে, আশা করছি কাল সকালের মধ্যেই আপনাদের ভাল কোনো খবর…

একটা সাধারণ অতিসামান্য হত্যার ব্যাপারে আপনাদের এই পদক্ষেপ খুব ভালো লাগল, সংবাদমাধ্যমের কোনো এক কচি সাংবাদিকের এই কথায় প্রেস গ্যালারিতেই প্রতিবাদের ঝড় উঠল – ঘনশ্যামও বাধা দিয়ে বললেন, এটা তো খুনিরও কথা…আমাদের এক মহামান্য অ্যাটর্নিকে আমাদের মূল সন্দেহভাজন এই একই কথা বলেছেন।

এবার সাংবাদিকদের মধ্যে মুখ চাওয়া-চাওয়ি, হাসিও চলল… ঘনশ্যামবাবু বললেন, কোনো প্রাণ-ই মূল্যহীন নয়, মাই ডিয়ার ফ্রেন্ড। প্রাণ আমরা সৃষ্টি করতে পারি না যখন… সব হত্যাই যথার্থ হত্যা… এবং লেন্টু সারখেলের এই খুন হয়ে যাওয়া হাড় হিম করা এক হত্যাশৈলীকে প্রকট করেছে… এ-হত্যা কখনো সাধারণ তকমা পেতে পারে কিনা আপনারাই ভেবে দেখবেন।

এই সোনালি, সোনালি বোন আমাদের, দরজাটা খোল। দরজা খুলে সোনালি মান্না দাঁড়িয়ে পড়ল, সে তৈরি। বোন তুই যে বলেছিলি রেইডে যাবি। খুনি ধরে এনে স্যারের পায়ের কাছে ফেলবি। চল ক্ষেত্র প্রস্ত্তত। তার আগে বলো তুমি এটা চেন কিনা? ঘড়িটা এগিয়ে দিলেন ফাল্গুনী।

সোনালি পরম মায়াভরে ঘড়িটা তুলে নিয়ে গালে ঠেকিয়ে বলল, খুব চিনি, কোথায় পেলে এটা দাদা। দাদা এখনো চলছে ঘড়িটা… অথচ লোকটাই নেই…

– কোথায় পেলাম সে তোমায় পড়ে বলছি। দু-তিনটে জায়গায় ঝড়ের বেগে ঝাঁপাতে হবে। চল বেরিয়ে পড়ি। মুৎসুদ্দিকে বলা হয়েছে সোনালি নটার সময় তার কাছে যাচ্ছে…

সোনালি মস্নান হেসে বলল… অভিসারে যাচ্ছে বলা হয়েছে তো…অভিসারই বটে। স্কাউন্ড্রেলটা খেয়েছে?… নজরদারিও পাক্কা। মুকুল দাদা একটা আলখেলস্না পরে দাঁড়িয়ে, যা লাগছে না… হ্যাঁ খেয়ে লুটিয়ে পড়েছে… বলা হয়েছে সোনালি নটার সময় তার কাছে যাচ্ছে… ঘড়িটা কার বললে না…

সোনালি ঘড়িটা গালে-মুখে বুলিয়ে ছলছল চোখে বলল… আমার লেন্টু বাবুর। কোথায় পেলে বলবে?

সব বলব তাড়াতাড়ি বেরোতে হবে। আগে…

 

সোনালির বদলে রাজারহাটের নিভৃত আবাসের দরজায় টোকা দিয়েছিল ছফুট সাড়ে তিন ইঞ্চির ফাঁড়ি চত্বরের ডাকসাইটে বৃহন্নলা মন্দাকিনী। তার তখন পার্বতীর সাজ-পোশাক, পায়ে নূপুর বাজছে… দরজা খুলতেই পেছন-পেছন মহাদেব।

মহাদেব বলল, তোমায় দক্ষ যজ্ঞের নাচ দেখাই মুতুশুদ্ধি বাবু! আমার ছাতার দামটা নিতে এলুম। না দিলে ছাতা ফেরত দাও।

– এই শুয়ার তোরা কারা? কী করে এলি! পুলিশ ডাকবো… হতভম্ব মুৎসুদ্দি বলল।

– হেঃ হেঃ তুমি ডাকবে পুলিশ? না আমরা! ধরণি দ্বিধা হও… মন্দাকিনী ছুটে গিয়ে হাঁটুর গুঁতোয় শুইয়ে দিল মুৎসুদ্দিকে। মহাদেব ছুটে গিয়ে ভুঁড়ির জামা সরাতেই দেখল বৃত্তের, রজ্জু বৃত্তের বাকিটা…। মুৎসুদ্দির কোমরের দুপাশে পেটের সামনে রজ্জুর দগদগে দাগ – মহাদেব ডাক্তারদের মত জিজ্ঞেস করল, তোমার বস্নাডসুগার এখন কত?

– শালার পো তোরা কোত্থিকা এলি… এই সদানন্দ কোথায় গেলি তোরা? গু-া পুষি অথচ কামের সময় অষ্টরম্ভা – এই ট্যারা কাটারি…

তোমার দ্বারী – তোমারি মত আনাড়ি… কে কোমরের ঘায়ের ফ্লাশ জ্বালিয়ে ছবি তুলতে-তুলতে বলল। মুৎসুদ্দি তার পায়ের ওপর বসে পড়া মহাদেবকে সর্বশক্তি উজাড় করে ফেলে দিতে চাইল – পারল না। মন্দাকিনী ছুটে গিয়ে মুৎসুদ্দির বুকের ওপর বসে পড়তেই বাঘছালের ইলাস্টিকের তলায় হাত গলিয়ে হাফপ্যান্টের পকেট থেকে বাঁশি বের করে মহাদেব ফুঁ দিলো, আর সস্তার ছুরিটা বের করে বলল, এবার এটা বুকে ভরে দেই… আমার ছাতাটা যেমন বেহুঁশ লোকটার বুকে… খুব আক্রোশ তোমার…

দরজা ঠেলে ঘরে ঢুকল পুলিশ ফোর্স। প্রথমে সোনালি মান্না। পেছন পেছন সিনিয়র অফিসাররা। সোনালি বলল, ওঠো আর কোনো ভয় নেই, আমি এসে গেছি…

মহাদেব বলল, দিদি তুমি হাত খুলে মারার আগে আমরা শিব পার্বতী ওকে একটু নাচ দেখাই…

– নাচটা ওকে লকআপে দেখাস। আমি আগে ভালবাসাটা দেখিয়ে নি…

– আমি একটা কাউন্সিলর। কী ভেবেছ তোমরা! পেছনে হাত ভরে দেব। ফাইজলামি হচ্ছে পৌরপিতার সঙ্গে? সোনালি ছুটে গিয়ে ঠাসঠাস করে দুগালে দুটো মোক্ষম চড় কষাল। মন্দাকিনী কপট গলায় বলল, দিদি কী কথা ছিল… ওমা, ছিঃ ছিঃ কী করলে! চড়ের কথা ছিল না, চড়ের কথা ছিল না… আঁচড়ের কথা ছিল, ছিলও ভালবাসার!

ফাল্গুনী মজুমদার মুখ ঘুরিয়ে নিলেন… এখন হাসবেন না।

– এই শালি তুই একদম চুপ! শালি মিথ্যুক… মুকুন্দ মুৎসুদ্দি গরজায় মন্দাকিনীর দিকে ফিরে।

মুকুল বিজয় ব্রহ্মও ঢুকলেন। আলখালস্নাটা এখনো খোলেননি। মহাদেব বলল… দাদা ওটা কী পরেছ? কিছু চিমত্মা করবেন না মুৎসুদ্দিবাবু। আপনার যত্নের কোনো বিচ্যুতি হবে না। ভয়েস রেকর্ডার অন করা হলো।

– এই তোলো মুকুলদা ডিবচ খুনিটাকে! ফাল্গুনী বলল, শালা পাকামাথার খুনি… হিংস্র জানোয়ার!

– ভালো হচ্ছে না কিন্তু…

ফাল্গুনী ক্রূর হাসি হেসে বলল, একদম ঠিক হচ্ছে। কোনো সুবিধে হবে না। আমাদেরও কোনো অসুবিধা নেই। তোমার বাবারা সব হাত তুলে, হাত ধুয়ে নিয়েছে।

লেন্টু সারখেলকে মারার আগে তো একবারও হাত কাঁপেনি।

– আমি মেরেছি লেন্টুকে। ছুঁচো মাইর‌্যা হাত গন্ধ।

– সেলফোনটা দেখিয়ে ফাল্গুনী বলল, সব ধরা আছে… যে-কথাবার্তা আপনি বলেছেন… সোনালি বলল, চলুন… ঘরটায় তালা দিয়ে এটাকে নিয়ে চলুন।

মহাবিষ্ণু বিষ্ণু ফোন তুললেন। ফোনের ওপারে মুকুল বিজয় ব্রহ্ম –

– স্যার উপযুক্ত প্রমাণসহ কাউন্সিলরকে অ্যারেস্ট করা হয়েছে।

– কোথা থেকে?

– স্যার ওর রাজারহাটের…

– থামলে কেন। আচ্ছা থাক বুঝে গেছি।

– আমরা স্যার একটা ছাতা উদ্ধার করেছি। সার্প পয়েন্টেড। ওটা আমাদের নিতাইয়ের কাছ থেকে মুৎসুদ্দি নিয়েছিল। এটা এর স্ত্রী বৃষ্টির জন্য মহাদেবের মাথায় দিতে এসেছিল… মহাদেবরূপী নিতাই তখন আমার ছাতা আমার ছাতা বলে নেচে উঠেছিল… ওই ছাতাটা মুৎসুদ্দি নাকি লুকিয়ে রাখতে বলেছিল। সার্প পয়েন্টের ছাতার ওখানে রটেন টিস্যু ছিল…

– ছাতাটা জমা করা হয়েছে…

– হ্যাঁ স্যার…

– আচ্ছা সোনালিকে নিয়ে সময় পেলে আমার এখানে একবার আসা যাবে!

আপনি বললে নিশ্চয়ই আসব স্যার। কোনো কাজ আছে?

– একটু আগে তোমাদের ম্যাডামকে নিয়ে ফিরলাম। গাড়ি নিয়ে চেনা জায়গায় বেরিয়ে পথ ভুল করে বাইপাস মহেন্দ্রনগর… এখন সামলেছে… শি ওয়াজ টোটালি কনফিউজড্। খালি বলছে সোনালিকে ডাকো আমার কথা আছে… আমার কথা আছে…

– স্যার, আমরা এদিকেই আছি, একটু বাদেই যাচ্ছি। সোনালিও যাবে। আমাদেরও একটু কথা আছে আপনার সঙ্গে…

– জানি তো… আমারও আছে, সামনাসামনি বসে কথা বলে নেওয়া ভাল তো। অনেক রাত হল যদিও।

এবার মহাবিষ্ণু নাম্বার ঘোরাচ্ছেন…

– হ্যালো…

– আমি মহাবিষ্ণু বলছি।

– বলুন। কেমন আছেন!

– একটু ম্যাডামকে দেখে দিয়ে যেতে হবে! কাল আসবেন! পারবেন?

– নিশ্চয়ই যাবো, কী হয়েছে!

মহাবিষ্ণু সব বললেন।

অস্থির গলায় মৃদঙ্গ বলল, ইনফ্যাক্ট মেডিক্যাল কলেজে গিয়ে যখন শুনলাম আজ বডি ছাড়া হবে না… স্যার চলে গিয়েছিলাম, লেন্টুর জন্য তো কাল আসতেই হবে আবার। আমি সকালেই ক্লিনিকে যাওয়ার আগে আপনার ওখানে চলে যাব। আমাকে বলুন তো স্যার ইজ সি কনশাস?

– ইয়েস।

– জ্ঞান হারিয়ে ছিলেন কী?

– নো। বাট সি ওয়াজ লিটল ড্রাউজি অ্যান্ড টোটালি কনফিউজ। তোমাকে বলি অ্যালঝাইমারের হিস্ট্রি আছে ওর ফ্যামিলিতে… ওর এক দাদা নিরুদ্দেশ বহু দিন… আজ ফিরে আসার পর বলছে ও ওর দাদাকে দেখেছে… কাল আবার তৈজসকে নিয়ে নাকি খুঁজতে যাবেন।

– কথাবার্তা বলছেন এখন?

– হ্যাঁ তা বলছে –

– ইজ সি অ্যালার্ট নাউ?

– ইয়েস।

– এখন অ্যালঝাইমারে অনেক ভাল পরীক্ষা বেরিয়েছে, কাল কথা হবে স্যার। খাওয়া-দাওয়া করেছেন?

– করব… মুকুল বিজয় ব্রহ্মরা আসবেন তো। সোনালি আসবে।

– আবার তো ইমোশনাল কথাবার্তা হবে। স্যার ঠিক আছে আমি কাল…

– আর কিছু বলবে মৃদঙ্গ! বলো না।

– একটা মজার কথা বলি।

– স্যার সকালে আমার পাড়ার একজন আমাকে রিপ ভ্যান উইঙ্ক্ল্ বলেছেন, ক্লাবের পুজোর বাজেট তেরো লাখ করায় আমি আপত্তি করেছি বলে। মজা হচ্ছে কলকাতায় একটু আগে আমার এক আত্মীয়ের বাড়িতে ওর সদ্যবিবাহিত ভাইঝিকে দেখলাম। সে আমাকে দেখেই এগিয়ে এল। অনেকদিন দেখিনি বলায় সে বলল, জেঠু দেখবেন কি করে অফিসের ছেলেটির সঙ্গে বিয়ে বাড়ির কেউ মেনে নেয়নি… একদিন গিয়েছিলাম… কাঁদিয়ে দিল জেঠু… বাবা-মা…

আমি বললাম তোমার জেঠু দয়ানন্দ বাবু – তিনি তো খুব আধুনিক…

– সেকি, ও বলল, উনিই সব নাটের গুরু… আধুনিক না ঘোড়ার ডিম এখনো অষ্টাদশ শতাব্দীতে পড়ে আছে… আর যাবো না…

আমি রাগ করে বললাম… তুমি সামনের রোববার যাবে… এবং বাবা-মায়ের সঙ্গে দেখা করে আমার বাড়িতে উঠবে… আমি দেখছি…অ্যাটর্নি হাসছেন। ওই মেয়েটিকে দিয়ে ওর বাবা, জেঠা মানসিক নির্যাতন করছে বলে একটা নালিশ লেখাও। আমি ফরোয়ার্ড করে উকিলের চিঠি ধরিয়ে দিচ্ছি আর তোমার নামে ভ্যানরিপ উইঙ্ক্ল্ শংসাপত্র। চলবে তো… কাল চলে এস।

 

সোনালি ঢুকতেই মহালক্ষ্মী জড়িয়ে ধরে বললেন… এস মাই ডার্লিং।

সোনালি বলল, কথা বলব না। অচেনা জায়গায় গিয়ে হারিয়ে গেছিলেন… স্যার খুঁজে না পেলে কী হতো। আর যাবেন না। খুব চিমত্মা করছেন ম্যাডাম আপনি। কেন?

– করছি না তো আর। তুমি আজ এখানে থাকবে। আমরা গল্প করব। চুপিচুপি শোন আমি না আজ আমার বহুদিনের হারিয়ে যাওয়া দাদাকে খুঁজে পেয়েছি… সেখানেই তো গেছিলাম। ফ্যালফ্যাল চোখে জানালার দিকে তাকিয়ে বললেন… সোনালি! লেন্টু আমার ছেলের থেকেও বেশি ছিল… সেও চলে গেল… কী হচ্ছে জানি না… তুমি কিন্তু থাকবে… একদিন এর শোধ আমি…

মুকুল-ফাল্গুনী দুজনে একসঙ্গে বলল, স্যার প্রায় রাত বারোটা বাজতে চলল, আমরা উঠব। সোনালি থাকুক। আমাদের কোনো আপত্তি নেই। কিন্তু একটা নালিশ আছে স্যার… আপনার এ-অফিসের দুজনই… মুকুন্দ মুৎসুদ্দির সঙ্গে যোগাযোগ রেখে চলছিল। আপনার ওল্ড কোর্ট হাউসে লেন্টুর চাকরির কথাও তারাই বলে দিয়েছিল…

সব আমি জানি। আর একটা মজার কথাও কদিন বাদে বাজারে শুনবে। দুটোকেই আমি খেদিয়ে দিলে। ম্যাডাম লেন্টুকে বহুদিন চেনে। স্নেহ করেছে, ভালোবেসেছে, প্রশ্রয় দিয়েছে… ওকে আমার কাছে প্রথম মুকুন্দ মুৎসুদ্দিই পাঠায় খুঁটিপুজোর নেমন্তন্ন করতে… ও নামছে ওকে দেখে মহালক্ষ্মী এগিয়ে এসে কত প্রশংসা করেছিল… যেখানেই সমাজসেবা, সেখানেই লেন্টু দেবা –

আমার একটা ইচ্ছে আছে। লেন্টুও বলেছিল ওর বাবার একটু চিকিৎসা করানো… তোমরা আমতা থেকে যদি একদিন তুলে নিয়ে আসতে পার… চিকিৎসার খরচা আমার…

– হ্যাঁ স্যার কাল লেন্টুর সৎকারটা হয়ে যাক। এ-সময়েই ফাল্গুনীর ফোন বেজে উঠল… মন্দাকিনীর ফোন… বাবু গো ফের সর্বনাশ হইছে। মঙ্কুটাকে এক পাগল এমন পিইটেছে, সে তো রক্তবমি করতেছে।

… কোথায়?

– ও তো আমাদের কাছে।

– দাঁড়াও আসছি…

ওরা দাঁড়িয়ে পড়ল। স্যার নেকস্ট টারগেট অ্যাসল্টেড। রয়াল রোপ অ্যাসেমবিস্নর কর্মচারী মঙ্কু… যে দোকানের দড়ি দিয়ে… আমরা এখন যাই। স্যার…

শেয়ার করুন