একুশের প্রভাব : বাংলাদেশের কাব্যভাষার বিবর্তন

লেখক:

আহমেদ মাওলা
ভাষা-আন্দোলনের সবচেয়ে উজ্জ্বল ফসল কবিতা। একুশের পর বাঙালির যেন নতুন জন্ম ঘটে, চেতনায় ও সৃজনশীলতায় নতুন এক দিগন্তের সাক্ষাৎ পায় বাঙালি। সাহিত্যের অন্য শাখার তুলনায় কবিতাই হয়ে ওঠে বাঙালির সৃজন-বেদনার প্রিয় ক্ষেত্র। ওই দশকে, একসঙ্গে এতো কবির আবির্ভাব, এতো কবিতা, সম্ভবত আর কখনো লেখা হয়নি। ভাষা-আন্দোলনের অভিঘাতই বাংলাদেশের কবিতার বাঁকবদল ঘটিয়েছে, অভূতপূর্ব রূপান্তর ঘটেছে বাংলাদেশের কাব্যভাষার।
ভাষা-আন্দোলনের পূর্বে কবিতা ছিল পুথিসাহিত্য-বাহিত আরবি, ফার্সি, শব্দবহুল, অনাধুনিক, পশ্চাৎপদ। কবিরা ছিলেন ইরান-তুরানের স্বপ্নে বিভোর। আরবের মরুভূমি, উট, জোব্বা, মেশক, শেরওয়ানি প্রভৃতি-উদ্ভূত উপমা-উৎপ্রেক্ষা রূপকের, আমদানি করে কবিরা লিখেছেন এক ধরনের বোগদাদি ভাষার কবিতা –
ক. তায়েফের পথে শোণিত স্নানের আমন্ত্রণ
জেরুজালেমের দুস্তর মাঠ
পাড়ি দিতে কারো পরাণ পণ
নিশান আমার, নিশান আমার
(‘নিশান’, ফররুখ আহমদ)
খ. জরির জোব্বা, শেরোয়ানি আর আসামার সজ্জায়
আতরের পানি, মেশকের রেণু খোশবু বিলায়ে যায়
নেকাব খুলেছে নতুন কুমার – রাত্রি হয়েছে ভোর
ইয়াকুতি আর জুমররাতের লেবাস পরিয়া সুলতানা আছে
তখতে পার বসি
জোহরা সেতারা নেমেছে মাটিতে আসমান হতে খসি।
(‘বেদনাহীন স্বপ্নের দিন’, সৈয়দ আলী আহসান)
উপর্যুক্ত উদ্ধৃতি থেকে দুটি জিনিস স্পষ্ট। এক, তাদের কবিতায় বাংলাদেশ ছিল প্রায় অনুপস্থিত। দুই, কাব্যভাষা ছিল আরবি, ফার্সি শব্দ দ্বারা দূষিত, দুর্বোধ্য। এক্ষেত্রে দুটি সংগঠনের কথা উল্লেখ করতেই হয় – কলকাতায় প্রতিষ্ঠিত ‘পূর্ব-পাকিস্তান রেনেসাঁস সোসাইটি’ (১৯৪২), ঢাকায় প্রতিষ্ঠিত ‘পূর্ব পাকিস্তান সাহিত্য সংসদ’ (১৯৪৩)। ‘রেনেসাঁস সোসাইটির সাথে সাহিত্য সংসদের কোনো নীতিগত পার্থক্য ছিলো না, শুধু পার্থক্য ছিলো এখানে যে রেনেসাঁস সোসাইটি জীবনের সমস্ত ক্ষেত্র নিয়ন্ত্রণ করতে উৎসাহী  ছিলো,  আর  সাহিত্য  সংসদ  উৎসাহী  ছিলো  শুধু পাকিস্তানি সাহিত্য নিয়ন্ত্রণে।  দুটি  সংঘই  ছিলো  সাম্প্রদায়িক ও  প্রগতিবিমুখ।’১  (‘হুমায়ুন আজাদ : ২০০৫’, পৃ ১২)। পাকিস্তানবাদী কতিপয় লেখক কবিতায় আরবি-ফার্সি শব্দের দুর্বহ বোঝা চাপিয়ে দিয়ে একধরনের মোসলমানিত্ব আরোপের অপচেষ্টা করেছিলেন। বায়ান্নর রক্তাক্ত-অভিজ্ঞতা নিয়ে একঝাঁক তরুণ মেধাবী কবি আবির্ভূত হন। তাঁরা আমাদের কবিতাকে সেই দুর্বহ বোঝা থেকে মুক্তি দেন। আমাদের কবিতা হয়ে ওঠে আধুনিক, আন্তর্জাতিক ও প্রতিবাদী চেতনার অধিকারী এবং আমাদের কবিতা স্বাধীন, স্বতন্ত্র, স্বকীয় এক কাব্যভাষার দিকে যাত্রা করে। কাব্যভাষার এই বিবর্তিত অভিযাত্রাকে নিম্নোক্ত তিন ভাগে ভাগ করা যায় –
এক. বায়ান্ন থেকে একাত্তর পর্যন্ত;
দুই. মুক্তিযুদ্ধের পর থেকে নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থান পর্যন্ত;
তিন. সামরিক স্বৈরাচারের পতন থেকে বর্তমান (২০১২) পর্যন্ত।

এক. বায়ান্ন থেকে একাত্তর পর্যন্ত
১৯৫২ সালের ২১ ফেব্র“য়ারি ১৪৪ ধারা ভঙ্গের মিছিলে গুলিবর্ষণের ঘটনায় তাৎক্ষণিক প্রতিবাদ ও ক্ষোভের অনুভূতি নিয়ে চট্টগ্রামে বসে মাহবুব-উল আলম চৌধুরী লিখেছেন একুশের প্রথম কবিতা ‘কাঁদতে আসিনি, ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি’ –

‘যারা আমার অসংখ্য ভাইবোনকে হত্যা করেছে
যারা আমার হাজার বছরের ঐতিহ্যময় ভাষার অভ্যস্ত
মাতৃসম্বোধনকে কেড়ে নিতে গিয়ে
আমার এই সব ভাইবোনদের হত্যা করেছে
আমি তাদের ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি।’২

প্রতিবাদী এ-কবিতায় একটিও আরবি-ফার্সি-উর্দু শব্দ নেই। রক্তাক্ত ঘটনার আকস্মিকতায় শোকে মুহ্যমান নয়, ফেটে পড়া ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে একেকটি শব্দ বেরিয়ে এসেছে স্বতঃস্ফূর্তভাবে। ‘অসংখ্য ভাইবোন’, ‘হত্যা’, ‘ফাঁসির দাবি’ এই শব্দগুচছ আত্মপ্রতিষ্ঠাকামী বক্তব্যকে প্রতীকায়িত করেছে। ক্রমেই কবিতার শব্দরূপে আবিষ্কৃত ও রূপায়িত হতে থাকে পৃথক অনুষঙ্গ। সমকালীন জীবন-প্রতিবেশ ও বাঙালি সংস্কৃতি রূপকল্প ও অর্থদ্যোতনা। তার প্রথম স্ফুরণ ঘটে হাসান হাফিজুর রহমান (১৯৩২-৮৩)-সম্পাদিত একুশে ফেব্র“য়ারি (১৯৫৩) প্রথম সংকলনে। প্রথম প্রকাশে মোট এগারোটি কবিতা সংকলিত হয়েছে। আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর বিখ্যাত কবিতা (আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো…) পরের সংস্করণে যুক্ত হয়। শামসুর রাহমানের কবিতার কয়েকটি পঙ্ক্তি –

‘আর যেন না দেখি কার্তিকের চাঁদ কিংবা
পৃথিবীর কোনো হীরার সকাল,

তোমরা কুটি কুটি করে ছিঁড়ে ফেলো আমার হৃৎপিণ্ড
যে হৃৎপিণ্ডে ঘন ঘন স্পন্দিত হচ্ছে আমার দেশে গাঢ় ভালোবাসা
যে হৃদয় –
মা’র পবিত্র আশীর্বাদের মতো
বোনের স্নিগ্ধ, প্রশান্ত দৃষ্টির মতো
প্রিয়ার হৃদয়ের শব্দহীন গানের মতো
শান্তির জ্যোৎস্না চেয়েছিল পৃথিবীর আকাশের নিচে
চৈত্রের তীব্রতায়, শ্রাবণের পূর্ণিমায়।’(৩)
দেশ, প্রকৃতি, সংস্কৃতি, বাংলা ভাষার যে মৌল প্রাণ – সঙ্গীতময়তা, তাই – রূপায়িত হয়েছে এ-কবিতায়। এখানে ‘কার্তিকের চাঁদ’, ‘হীরার সকালে’র মুক্ত প্রতীকের সঙ্গে তুলনা দেওয়া হয়েছে ‘হৃৎপিণ্ডের’।

আর সে-‘হৃৎপিণ্ডে’ স্পন্দিত হচ্ছে ‘দেশের (প্রতি) গাঢ় ভালোবাসা’। সেই ‘ভালোবাসাও’ সাধারণ নয়, ‘মা’র আশীর্বাদ’, ‘বোনের প্রশান্ত দৃষ্টি’, ‘প্রিয়ার শব্দহীন গান’, ‘শ্রাবণের পূর্ণিমা’র সঙ্গে উপমিত। এই যে বাক-প্রতিমা তা ব্যক্তিমনের চিত্রাত্মক ভাষাবিশ্ব হয়ে উঠেছিল, এটা প্রতিবেশ ও সময়ের উন্মোচিত মুখচ্ছবি। আবদুল গণি হাজারীর কবিতা –

‘কাল রাতে উঠেছিল ঝড়
আম-জাম-নিমের শাখায়
কাল রাতে এসেছিল
সত্যিকার ঝড়।
ফাল্গুনের রৌদ্রতপ্ত তৃষিত মাটিতে
সে ঝড় কাঁপন তুলেছিল
দিয়েছিল
কাজল মেঘের হাতছানি।’৪
ঝড়ের রূপকল্পে আসলে প্রকাশ পেয়েছিল ক্ষোভ। কারণ, অস্তিত্ব সংকট কবিকে মানবীয় অনুভব ও চৈতন্যের সূক্ষ্ম চিন্তার রহস্য তৈরি করতে বাধ্য করেছিল। কবি, সেজন্য ‘ঝড়’ দেখেছিলেন ‘আম-জাম-নিমের শাখায়’, ‘ফাল্গুনের রৌদ্রতপ্ত’, ‘তৃষিত মাটি’ কিংবা ‘কাজল মেঘ’ শব্দানুষঙ্গ ও অর্থ সম্প্রসারণে যে আপেক্ষিক জগৎ নির্মাণ করে তা ‘প্রতিবেশ’ পৃথিবীরই বাস্তব চিত্র। আলাউদ্দিন আল আজাদের কবিতায় সেটি আরো গাঢ় অথচ বস্তুভিত্তি নিয়ে দাঁড়ায় –

‘স্মৃতির মিনার ভেঙেছে তোমার? ভয় কি বন্ধু,
আমরা এখনো চারকোটি পরিবার
খাড়া রয়েছি তো। যে-ভিৎ কখনো কোনো রাজন্য
পারেনি ভাঙ্গতে

ইটের মিনার ভেঙেছে, ভাঙ্গুক। ভয় কি বন্ধু, দেখ একবার আমরা জাগরী
চারকোটি পরিবার।’৫

কাক্সিক্ষত জিজ্ঞাসা, ট্র্যাজিক বেদনার্তির সঙ্গে মিশেছে ঐতিহ্য, জাতিসত্তা, পারিপার্শ্ব। তাই কবিতার ভাষা হয়ে উঠেছে ব্যক্তিক থেকে সামষ্টিক। ভাষার ডিকশন হয়ে উঠেছে স্মৃতিচিহ্ন, স্মারক সংবলিত রূপক, প্রতিমা, উপমা, উৎপ্রেক্ষার। দেশজ শব্দসম্ভারে আকরিত হতে থাকে কাব্যভাষা। আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ্ গীতলতার আঁকেন সেই ছবি –

‘কুমড়ো ফুলে ফুলে
নুয়ে পড়েছে লতাটা
সজনে ডাঁটায়
ভরে গেছে গাছটা
আর আমি ডালের বড়ি
শুকিয়ে রেখেছি
খোকা তুই কবে আসবি।
কবে ছুটি?
চিঠিটা তার পকেটে ছিল
ছেঁড়া আর রক্তে ভেজা।’৬

দেশজ শব্দ প্রয়োগে লক্ষ করা যায় পৃথক পদবিন্যাস ও অর্থদ্যোতনা, বাক-ভঙ্গি নতুনত্ব, চিত্রাত্মক ভাষাশৈলী। বস্তুত, আমাদের কবিতার ভাষাগত স্বাতন্ত্র্য এখানেই। ঢাকা শহরকেন্দ্রিক উঠতি মধ্যবিত্তের মুখচ্ছবি ও আকাক্সক্ষা নিয়ে পঞ্চাশের দশকে গড়ে উঠতে থাকে। এখানে ‘কুমড়ো’, ‘নুয়ে পড়া লতা’, ‘সজনে ডাঁটা’, ‘ডালের বড়ি’ লোকজ শব্দের শিষ্ট চলিত রূপ, যা সংঘটিত ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে কবি চয়ন করেছেন, এটাই পঞ্চাশের মূলধারার কবিতার নতুন ভাষা।
কাব্যভাষার এই পরিবর্তনের পেছনে একুশ-উত্তর কয়েকটি সাংস্কৃতিক সম্মেলনের ভূমিকাও খুব গুরুত্বপূর্ণ। কুমিল্লার প্রাদেশিক সাংস্কৃতিক সম্মেলন (আগস্ট, ১৯৫২), ঢাকার কার্জন হলে অনুষ্ঠিত সাহিত্য-সাংস্কৃতিক সম্মেলন (১৯৫৪), টাঙ্গাইলের কাগমারীতে অনুষ্ঠিত সাহিত্য-সাংস্কৃতিক সম্মেলন (১৯৫৭) – এসব সম্মেলনের তাত্ত্বিক প্রভাব কমবেশি পড়েছিল আমাদের সাহিত্যচর্চায় ও কাব্যভাষায়।
আমরা গুরুত্বের সঙ্গে লক্ষ করি যে, বায়ান্নর একুশে ফেব্র“য়ারি গুলিবর্ষণের ঘটনা শিক্ষিত, নাগরিক মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানসে যে অসন্তোষ, ক্ষোভ ও উত্তাপের জন্ম দিয়েছিল, তার প্রত্যক্ষ প্রতিনিধিত্ব করেছিল একুশে ফেব্র“য়ারি (১৯৫৩) সংকলন। ওই সংকলনের প্রভাব ব্যাপক, গভীরভাবে পড়েছিল আমাদের কাব্যভাষায়। সেই ভাষা, ভূখণ্ডভিত্তিক, বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনা নিয়ে বিকশিত হয়। সিকান্দার আবু জাফর-সম্পাদিত সমকাল (১৯৫৭) এবং আবদুল্লাহ্ আবু সায়ীদ-সম্পাদিত কণ্ঠস্বর (১৯৬৪) পত্রিকাকে কেন্দ্র করে পঞ্চাশ ও ষাটের দশকের কবিদের হাতে নতুন কাব্যভাষা পরিপুষ্টি লাভ করে। ব্যক্তিকতা, রোমান্টিকতা থাকা সত্ত্বেও, এ-পর্বে আবেগ ও মননশীলতার তীব্রতা নিয়ে প্রকাশ পেয়েছে কাব্যভাষার স্বাতন্ত্র্য। কয়েকটি উদাহরণ :

ক. আমাদের বারান্দার ঘরের চৌকাঠে
কড়িকাঠে চেয়ারে টেবিলে আর খাটে
দুঃখ তার লেখে নাম।

আমাদের একরত্তি উঠোনের কোণে
উড়ে-আসা চৈত্রের পাতায়
পাণ্ডুলিপি বই ছেঁড়া মলিন খাতায়
গ্রীষ্মের দুপুরে ঢক্ঢক্
জলখাওয়া কুঁজোয় গেলাসে, শীত-ঠক্ঠক্
রাত্রির নরম লেপে দুঃখ তার বোনে নাম
অবিরাম।৭

খ. ফিরে এসো, তোমার নদীর কাছে
তেরোশ নদীর জল যার আছে তার মতো কে আছেন সচ্ছল?

ফিরে এসো, বাংলাদেশ, ফিরে, এসো তুমি
শিশিরে ভিজিয়ে পা।৮

গ. সহসা সন্ত্রাস ছুড়লো। ঘর-ফেরা রঙিন সন্ধ্যার ভিড়ে
যারা ছিলো তন্দ্রালস দিগি¦দিক ছুটলো, চৌদিকে
ঝাঁকে ঝাঁকে লাল আরশোলার মত যেনবা মড়কে
শহর উজাড় হবে – বলে গেল কেউ -৯

ঘ. তুমি আমার তিতাস, কালো জলের ধারা
পানকৌড়ি আমি, আমি পানির ফেনা
ডুব সাঁতারে নিত্যকালের এই চেহারা
তুমি আমার কালো শালুক, চিরচেনা।১০

ঙ. চুনিয়াতো ভালোবাসে শান্তস্নিগ্ধ পূর্ণিমার  চাঁদ
চুনিয়া প্রকৃত বৌদ্ধস্বভাবের নিরিবিল সবুজ প্রকৃতি
চুনিয়া যোজনব্যাপী মনোরম আদিবাসী ভূমি।১১

চ. নদীদের ব্যবহার ইদানিং বড় পাল্টে গেছে
ভাটিয়ালি শুনে যেরকম মনে সেরকম নয় মোটে।১২

ছ. ঐ গ্রামটির জন্ম হয়েছিল আমাকে জন্ম দেবার জন্য
এছাড়া ঐ গ্রামের আর কোনো যোগ্যতাই নেই।১৩

‘ক’. উদ্ধৃতিতে ‘ঘরের চৌকাট’, ‘কড়িকাঠ’, ‘চেয়ার’, ‘টেবিল’, ‘খাট’, ‘একরত্তি উঠোন’, ‘দুপায়ের ঢক্ঢক’, ‘শীতে ঠকঠক’ ইত্যাদিতে  ‘দুঃখ  তার  লেখে  নাম’  বাক-প্রতিমা  নির্মাণ, বস্তু বাস্তবতার উল্লেখ চিত্রাত্মক উপর্যুপরি দর্শন ইন্দ্রিয়ের ব্যবহার – এটাই আধুনিক কাব্যভাষার বৈশিষ্ট্য। অনুরূপভাবে ‘তেরোশ নদীর জল’, ‘শিশিরে ভেজা পা’ যার আছে, তার মতো ‘স্বচ্ছল’ আর কে আছে? এই আত্মপ্রবোধের মধ্যে স্বদেশপ্রেমের গাঢ় উচ্চারণ খুঁজে পাওয়া যায়।

‘গ’. উদ্ধৃতির মধ্যে নগরের বিপ্রতীপ দৃশ্যকে একটি উপমায় ‘ঝাঁকে ঝাঁকে লাল আরশোলার মত’ তুলে ধরা হয়েছে। ‘সন্ত্রাসের’ ভয়ে ছিটকে পড়া মানুষ হচ্ছে ‘আরশোলার মত’ দিগি¦দিক ছুটতে কিন্তু সময়টা ‘রঙিন সন্ধ্যা’। ‘ঘ’ উদ্ধৃতিতে আল মাহমুদ প্রিয়তমাকে তুলনা করেছেন তিতাস নদীর ‘কালো জলের’ সঙ্গে এবং চিরচেনা ‘কালো শালুকের’ সঙ্গে। এই জলজ অভিজ্ঞতার কাব্যিকভাষা আল মাহমুদের স্বোপার্জিত। ‘ঙ’ উদ্ধৃতিতে ‘চুনিয়া’ হয়ে উঠেছে ইউটোপিয়া, অহিংস ‘বৌদ্ধস্বভাবের’ ‘শান্তস্নিগ্ধ’ – এই শব্দগুচ্ছ কবির প্রত্যাশিত আকাক্সক্ষাকে প্রকাশ করেছে। ‘মনোরম’ শব্দটি সেই আকাক্সক্ষাকে উজ্জ্বল করে তুলেছে। ‘চ’ উদ্ধৃতিতে ‘নদীর’ ওপর নরত্ব আরোপ করা হয়েছে এজন্য যে, নদীও মানুষের মতো কৃপণ, অনুদার, ‘পাল্টে গেছে’। ‘ছ’ উদাহরণে ‘আমাকে জন্ম দেবার জন্য’ বাক্যবন্ধে যে কবি-অস্মিতার প্রকাশ ঘটেছে তা এজন্য যে, ওই জন্মগ্রামের সঙ্গে কবির এখন আর যোগাযোগ নেই। পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে একেকজন কবির হাতে বাংলাদেশের কাব্যভাষার অভিনবত্ব লাভ করে, উত্তরকালে তা নিজস্ব এক রূপ পরিগ্রহ করে। যা আবৃত্তিমাত্রই বাংলাদেশের প্রগতিশীল, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধসম্পন্ন ঐতিহ্যিক ভাষাপরম্পরাকেই স্মরণ করিয়ে দেয়।

দুই. মুক্তিযুদ্ধের পর থেকে নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থান পর্যন্ত
স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের কাব্যভাষায় নতুন কিছু মাত্রা যুক্ত হয়। মুক্তিযুদ্ধের সমর-অভিজ্ঞতা, রাজাকার, মুক্তি গেরিলা, বুলেট, রাইফেল, বন্দুক, বেয়নেট, অ্যাম্বুশ, ইউনিফর্ম, গ্রেনেড, হানাদার, বারুদ, ট্রিগার, মর্টার, বধ্যভূমি, পতাকা – এসব শব্দ একান্তভাবে মুক্তিযুদ্ধের অনুষঙ্গী। এছাড়া স্বাধীনতার স্বপ্ন ও স্বপ্নভঙ্গের বেদনা, জাতির জনককে হত্যা, একাধিক সামরিক অভ্যুত্থান, মূল্যবোধের দ্রুত পরিবর্তন, মোবাইল ও কম্পিউটার প্রযুক্তির শব্দ, জ্ঞানবিজ্ঞান – বৌদ্ধিকতার জগৎ, তত্ত্বমনস্ক মানুষের ভাষার বিচিত্র প্রয়োগে বাংলাদেশের কাব্যভাষা ভিন্ন এক বৈশিষ্ট্য অর্জন করে।
সত্তর, আশি ও নব্বইয়ের দশকের সময় সম্পৃক্ত হতে থাকে বৃহত্তর জীবনপট এবং বদলে যেতে থাকে কাব্যভাষা। আধুনিক গদ্যভঙ্গিযুক্ত আঙ্গিকে সংবর্তিত হতে থাকে আঞ্চলিক কথন রীতি, বর্ণনা-বিবরণ, সংলাপাশ্রয়ী লিরিসিজম এবং দৃশ্যপট রচনার কথাকাব্যিক প্রকরণ। কয়েকটি উদাহরণ –
ক. জন্মই আমার আজন্ম পাপ
মাতৃজরায়ু থেকে নেমেই জেনেছি আমি। (দাউদ হায়দার)

খ. কোন পথে যাবো?
– সব পথে যাবো, সব পথই গেছে কবিতার দিকে। (আবিদ আজাদ)
গ. আজো আমি বাতাসে লাশের গন্ধ পাই
আজো আমি মাটিতে মৃত্যুর নগ্ননৃত্য দেখি
ধর্ষিতার কাতর চিৎকার শুনি আজো আমি তন্দ্রার ভেতরে
এদেশ কি ভুলে গেছে সেই দুঃস্বপ্নের রাত, সেই রক্তাক্ত সময়?
(রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্)

ঘ. এখন যৌবন যার যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়। (হেলাল হাফিজ)
সত্তরের দশকের ওইসব চকিত চমক পঙ্ক্তি, মূলত আত্মভাষণ, চিত্রকল্পের অন্তর্বয়ন, স্বাধীনতা-উত্তর বিপর্যস্ত, অসহ্য বাস্তবতাকে প্রতিফলিত করেছে। তাই কবিকণ্ঠ উদ্দীপ্ত, প্রকাশভঙ্গি নিঃশঙ্ক, কাব্যভাষা সংবেদী, অভিনব। আশির দশকে কুহকী বাস্তবতা, লোকশ্র“তি,   ব্যক্তিময়তার  অন্তশ্চাপে  কাব্যভাষা  হয়ে  উঠেছে অন্তর্জিজ্ঞাসু, অকপট, সংজ্ঞাবাদী।

‘যাক ভেসে যাক এই দ্বাদশোর্ধ শতবার ব্যর্থ জন্ম নেয়া
অনন্তের বাহু যদি দ্রষ্টা হয়ে নেমে আসে আসমান থেকে
জামার আস্তিনে গেঁথে দুপুর রৌদ্রের অভিশাপ
পানকৌড়ির মতো নিষ্ঠা নিয়ে কচুরিপানার মধ্যে খুঁজবো
লুকোনো মোহর, ফেলে যাওয়া, গতজনমের তাপ ও সন্তাপ।’১৪

কিংবা
‘আমি সে-গানের প্রতীক্ষায় আছি যে-গানে মিহি হয়ে
আসবে ঘামের উত্তেজনা। স্বেদনির্ভর এই সমাজের
মানুষের সহজে গান গায় না, কেবল শুনতে চায়।’১৫
আশির দশকে কাব্যভাষায় শব্দনির্মাণে অভিনবত্ব লক্ষণীয়, যেমন ‘দ্বাদশোর্ধ, ‘অনন্তের বাহু’, ‘রৌদ্রের অভিশাপ’, ‘তাপ ও সন্তাপ’ এবং ‘ঘামের উত্তেজনা’, ‘স্বেদনির্ভর’ – এসব শব্দ আত্মসচেতন, যুক্তিনির্ভর চিন্তার পারম্পর্য নির্মাণ করেছে। সত্তরের দশকের চমকপ্রদ স্লোগানসর্বস্ব হালকা ভাষার তুলনায় আশির কাব্যভাষায় গাঢ় ভাবব্যঞ্জক শব্দ ভিন্ন এক মাত্রা দান করেছে।

তিন. সামরিক স্বৈরাচারের পতন থেকে
বর্তমান (২০১২) পর্যন্ত
নব্বইয়ের দশকের কবিরা আরেক ধাপ এগিয়ে আঙ্গিকের নিরীক্ষা করতে গিয়ে ভাষাকে করেছেন জটিল। প্রকাশভঙ্গি বহুমাত্রিক, টানাগদ্য বা আত্মকণ্ঠের ঘনপিদ্ধ বয়নে তৈরি করেছেন ব্যাকুল এক শব্দের জগৎ। কোনো ইজম, মূল্যবোধের দর্শনের নিটোল মূর্তি নব্বইয়ের কবিতায় ধারণ করে না। ফলে শব্দজগতে আশ্রয় নেয় অধিচেতনা, পরাবাস্তবতা, দৃশ্য থেকে দৃশ্যান্তরে বিরোধাভাসে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে ছড়িয়ে দেয় ভাষিক প্রয়াস।
ক. পথের সম্পর্কে দেখছি তোমার কোনো ধারণাই নেই।
এটি জলপিণ্ড, মুঠোয় যদিও তাকে ধরা যায় ধূলির সমুদ্র থেকে
ধীরে ধীরে বহু বছরের হাওয়ায় তাকে তুলে নিলে তার পুলক
দেখোনি? দেখেছো সে হ্রদের তলদেশে উদ্ভিদের আলোড়ন? ১৬
খ. হাওয়া, হাহাকার আর ঘোড়া বিষয়ে যত কথা তুমি আমায় লিখে পাঠিয়েছো
তার সবই প্রায় আমি অনুবাদ করে ফেলেছি। রাত শেষ হয়ে এল। রসের হাঁড়ি নামাবার জন্য আজো সেই পুত্রকন্যা-হারা
লোকটাই চলছে খেজুর গাছের দিকে। যে প্রতিরাতে বউ পেটায়,
তারপর দুজনে একসঙ্গে বসে কাঁদে।১৭
সবই আর্থসমাজগত সংকট, অধিবাস্তবতা, শব্দভাষ্য। নব্বইয়ের কবিতায় প্রযুক্ত এই শব্দব্যঞ্জনা সৃষ্টির ক্ষেত্রে বিষয়ের নির্দিষ্ট ও অটুট অর্থরূপ তৈরির লক্ষ-তাড়িত নয়। ফলে উক্ত শব্দপ্রবাহ অনিশ্চিত কিন্তু বহু অর্থের আপতিক চাপ তৈরি করে। তাই শব্দ প্রয়োগে নির্বিচারিত্বও দেখা যায়। কখনো ছোট ছোট পর্বে, মিত পরিসরে ও শব্দচিত্রের ফ্রেমে স্থাপিত হয় অসম পঙ্ক্তিপ্রবাহ। উপমা-রূপক-চিত্রকল্পে বিচূর্ণ, সতর্ক, সংবেদী। নব্বইয়ের কাব্যভাষা অর্থ প্রকাশে অনেকান্ত।

প্রাসঙ্গিক তথ্যসূচি :
১.    হুমায়ুন আজাদ    : ভাষা আন্দোলন : সাহিত্যিক পটভূমি, ঢাকা, ২০০৫, পৃ ১২।
২.     মাহবুব-উল আলম চৌধুরী    : কাঁদতে আসিনি, ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি, চট্টগ্রাম, পৃ ১০।
৩.    শামসুর রাহমান    : একুশে ফেব্র“য়ারি, ঢাকা, পৃ ৩০-৩১।
৪.    আবদুল গণি হাজারী : একুশে ফেব্র“য়ারি, প্রাগুক্ত,  পৃ ৩২।
৫.    আলাউদ্দিন আল আজাদ : একুশে ফেব্র“য়ারি, প্রাগুক্ত,      পৃ ৩৭।
৬    আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ্ : একুশে ফেব্র“য়ারি, প্রাগুক্ত,        পৃ ৩৭।
৭.    শামসুর রাহমান    : রৌদ্র করোটিতে, শ্রেষ্ঠ কবিতা, দে’জ পাবলিশিং, কলকাতা, পৃ ৩৩।
৮.    সৈয়দ শামসুল হক : ‘ফিরে এসো বাংলাদেশ’ কবিতা সংগ্রহ, ঢাকা, ১৯৯৭, পৃ ৪৪৭।
৯.    শহীদ কাদরী : বৃষ্টি, বৃষ্টি, উত্তরাধিকার, ঢাকা, ১৯৬২,     পৃ ৩২।
১০.    আল মাহমুদ : ‘কালের কলস’, কবিতা সমগ্র, ঢাকা, ১৯৯৭, পৃ ৬৫।
১১.    রফিক আজাদ : চুনিয়া আমার আর্কেডিয়া, শ্রেষ্ঠ কবিতা, ঢাকা, ১৯৯৩, পৃ ৭৬।
১২.    আসাদ চৌধুরী : দুঃখীরাও গল্প করে, কবিতা সমগ্র, ঢাকা, ২০০০, পৃ ৩০০।
১৩.    নির্মলেন্দু গুণ : দুঃখ করো না বাঁচো, কাব্য সমগ্র, ঢাকা, ১৯৯২, পৃ ২২৫।
১৪.    খোন্দকার আশরাফ হোসেন : কবিতা সংগ্রহ, একবিংশ প্রকাশনী, ঢাকা, ২০০৫, পৃ ৬৪।
১৫.    মহীবুল আজিজ    : ‘নিরানন্দপুর’, বলাকা প্রকাশন, চট্টগ্রাম, ২০০২, পৃ ১৬।
১৬.    চঞ্চল আশরাফ : ‘পাথর’ মাহমুদ কামাল-সম্পাদিত ‘অরণি’ জানুয়ারি-জুন সংখ্যা, ২০১১, পৃ ৫৬৭।
১৭.    মজনু শাহ্ : ‘বেহালা’, পূর্বোক্ত, পৃ ৫৮৬।